📄 গোযওয়ায়ে বনু লেহইয়ান
বনু লেহইয়ান গোত্রের লোকেরাই রাজিঈ নামক জায়গায় দশজন সাহাবাকে ধোঁকা দিয়ে নিয়ে আটজনকে হত্যা এবং দুইজনকে মক্কাবাসীদের হাতে বিক্রি ছিলো। সেখানে তারা সেই দুইজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কিন্তু বনু লেহইয়ানদের এলাকা যেহেতু মক্কার কাছাকাছি, অথচ কোরায়শ ও মুসলমানদের সাথে চরম বিরোধ চলছিলো। তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শত্রুদের অতো কাছাকাছি যাওয়া সমীচীন মনে করছিলেন না। ইতিমধ্যে কোরায়শদের বিভিন্ন দলের মধ্যে ফাটল ধরেছে, মুসলমানদের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের সঙ্কল্পের জোর অনেকটা কমে গেছে এবং পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতও তারা মেনে নিয়েছে। এ কারণে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনে করলেন যে, বনু লেহইয়ানের কাছ থেকে রাজিঈ-এর শহীদদের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের সময় এসেছে। ষষ্ঠ হিজরীর রবিউল আউয়াল অথবা জমাদিউল আউয়াল মাসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুইশত সাহাবাসহ বনু লেহইয়ান গোত্র অভিমুখে রওয়ানা হলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন। অন্যদের বলা হলো, তিনি সিরিয়া যাবেন। রসূল প্রথমে উমায এবং উসফান স্থলদ্বয়ের মধ্যখানে অবস্থিত বাতনে গাররান নামক উপত্যকায় পৌঁছন। সাহাবাদের সেখানেই হত্যা করা হয়। রসূল সেখানে সাহাবাদের জন্যে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। এদিকে বnu লেহইয়ান গোত্রের লোকেরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের খবর শুনে পাহাড়ী এলাকায় পালিয়ে গেলো। তাই তাদের কাউকেই আটক করা সম্ভব হলো না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে দুইদিন অবস্থান করেন। বিভিন্ন এলাকায় খন্ড খন্ড দলে বিভক্ত করে সাহাবাদের প্রেরণ করেন। কিন্তু কারো হদিস পাওয়া যায়নি। পরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসফান নামক জায়গায় গিয়ে সেখান থেকে দশজন ঘোড় সওয়ার সাহাবাকে কোরাউল গামীম নামক জায়গায় প্রেরণ করেন। কোরায়শদের তাঁর আগমন সংবাদ জানাতেই তাদের প্রেরণ করা হয়। মোট চৌদ্দদিন বাইরে অবস্থানের পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় ফিরে আসেন।
এ অভিযান থেকে ফিরে এসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যায়ক্রমে কয়েকটি সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। এখানে সেসব সংক্ষেপে তুলে ধরা হচ্ছে।
📄 ছারিয়্যা গামর ও ছারিয়্যা যুল কেস্সা (১)
চার) হ্যারিয়্যা গামর ষষ্ঠ হিজরীর রবিউল আউয়াল বা রবিউস সানিতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চল্লিশজন সাহাবাকে গামর নামক জায়গায় এক অভিযানে প্রেরণ করেন। গামার বনু আছাদ গোত্রের একটি জলাশয়ের নাম। হযরত মুহম্মদ বিন মাসলামা (রা.) এর নেতৃত্ব দেন। মুসলমানদের আগমনের খবর পেয়ে শত্রুরা পালিয়ে যায়। মুসলমানরা তাদের দুইশত উট মদীনায় নিয়ে আসে।
পাঁচ) হ্যারিয়া যুল কেস্সা (১) ষষ্ঠ হিজরীর রবিউল আউয়াল বা রবিউস সানিতে মোহাম্মদ ইবনে মোসলমার নেতৃত্বে দশজন সাহাবার একটি সেনাদল যুল কেস্সা নামক স্থান অভিমুখে রওয়ানা হন। এই স্থান বনু ছালাবা গোত্রের বসতি এলাকায় অবস্থিত। শত্রুদের সংখ্যা ছিলো একশত তারা পালিয়ে গিয়ে
📄 ছারিয়্যা যুল কেসসা (২)
মোহাম্মদ ইবনে মোসলমার (রা.) নেতৃত্বে প্রেরিত সেনাদলের শাহাদাতের পর ষষ্ঠ হিজরীর রবিউস সানিতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু ওবায়দা (রা.)-কে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে একদল সাহাবাকে যুল কেস্সায় প্রেরণ করেন। চল্লিশ জন সাহাবার এই সেনাদল পূর্বোক্ত নয় জন সাহাবার শাহাদাতের জায়গা অভিমুখে রওয়ানা হন। সারারাত পায়ে হেঁটে তাঁরা যুল কেস্সায় পৌছেন। সেখানে যাওয়ার পরই শত্রুদের খুঁজতে শুরু করেন। বনু ছালাবা গোত্রের এই শত্রু দল খুব দ্রুত পাহাড়ী এলাকায় পালিয়ে যায়। মুসলমানরা কিছুতেই তাদের হদিস করতে পারেননি। শুধুমাত্র একজন লোককে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। সেও ইসলাম গ্রহণ করে। এ অভিযানে বেশ কিছু বকরিসহ পশুপাল মুসলমানদের অধিকারে আসে।
📄 ছারিয়্যা জামুম ও ছারিয়্যা গাইছ
সাত) ছারিয়্যা জামুম এই সামরিক অভিযান হযরত যায়েদ ইবনে হারেছা (রা.)-এর নেতৃত্বে ষষ্ঠ হিজরীর রবিউস সানিতে জামুম নামক এলাকায় প্রেরণ করা হয়। জামুম মাররাজ জাহরান বর্তমান ফাতেমা প্রান্তরে বনু ছুলাইম গোত্রের একটি জলাশয়ের নাম। হযরত যায়েদ (রা.) সেখানে পৌঁছার পর মুজাইনা গোত্রের হালিমা নামের এক মহিলাকে গ্রেফতার করেন। সেই মহিলা বনু ছুলাইমের একটি জায়গার নাম মোজাহেদদের জানিয়ে দেন। সেখান থেকে বকরিসহ বহু পশু এবং কয়েদী মুসলমানদের অধিকারে আসে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই মেয়েটিকে মুক্ত করে বিয়ে দিয়ে দেন।
আট) ছারিয়্যা গাইছ এই অভিযানে সৈন্য সংখ্যা ছিলো ১১৭। এই অভিযানও হযরত যায়েদ ইবনে হারেছার (রা.) নেতৃত্বে ষষ্ঠ হিজরীর জমাদিউল উলায় এই একই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। এতে কোরায়শদের একটি বাণিজ্য কাফেলার মালামাল মুসলমানদের হাতে আসে। সেই কাফেলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামাতা হযরত আবুল আসের নেতৃত্বে সফর করছিলো। আবুল আস তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তাঁকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তিনি দ্রুত পলায়ন করে মদীনা এসে স্ত্রী হযরত যয়নবের (রা.) কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরপর নিজ স্ত্রীকে অনুরোধ করেন তিনি যেন তাঁর আব্বা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলে অধিকৃত কাফেলার মালামালগুলো ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করেন। হযরত যয়নব (রা.) আব্বাকে স্বামীর অনুরোধের কথা জানান। হযরত যয়নব (রা.)-এর অনুরোধের প্রেক্ষিতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের মালামাল ফেরত দেয়ার ইঙ্গিত করেন। কোন চাপ সৃষ্টি করেননি। সাহাবায়ে কেরাম সব ধন-সম্পদ ফেরত দেন। এসব মালামালসহ আবুল আস মক্কায় চলে যান এবং কোরায়শদের সব মালামাল তাদের বুঝিয়ে দিয়ে পুনরায় মদীনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতিপূর্বেকার বিবাহ অনুযায়ীই হযরত যয়নবকে (রা.) হযরত আবুল আসের হাতে তুলে দেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কন্যা-জামাতার বিবাহ নবায়ন করাননি যেহেতু তখনও মুসলমান মহিলাদের জন্যে কাফের স্বামীর সাথে বসবাস করা হারাম হওয়ার আয়াত নাযিল হয়নি। তবে একটি হাদীসে আছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যয়নব ও আবুল আস-এর বিবাহ নতুন করে দিয়েছিলেন। এই হাদীসটি অর্থ ও ছনদের দিক থেকে সঠিক নয়। উভয় দিক থেকেই দুর্বল। যারা এই যয়ীফ হাদীসের বরাত দেন, তারা আশ্চর্য রকমের বিপরীতধর্মী কথা বলেন। তারা বলেন যে, আবুল আস অষ্টম হিজরীর শেষদিকে মক্কা বিজয়ের কিছুদিন আগে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা এও উল্লেখ করেন যে, অষ্টম হিজরীর প্রথমদিকে হযরত যয়নব (রা.) ইন্তেকাল করেন। অথচ বিপরীতধর্মী এ দু'টি বক্তব্য মেনে নেয়া যায় না। কারণ, এরূপ অবস্থায় আবুল আস-এর ইসলাম গ্রহণ এবং হিজরত করে মদীনায় পৌঁছার সময় হযরত যয়নব তো (রা.) জীবিতই ছিলেন না। এমতাবস্থায় পূর্বতন বিয়ে বা নতুন বিবাহের মাধ্যমে কিভাবে তাঁকে আবুল আস-এর হাতে তুলে দেয়া হয়েছিলো?
প্রখ্যাত লেখক হযরত মূসা ইবনে ওকবা (রা.) উল্লেখ করেছেন যে, এই ঘটনা সপ্তম হিজরীতে আবুল বাছির এবং তার বন্ধুদের হাতে ঘটেছিলো। কিন্তু এ তথ্য সহীহ বা যঈফ কোন হাদীস অনুযায়ীই নির্ভুল নয়।
টিকাঃ
৭. ছুনানে আবু দাউদ, দ্রষ্টব্য
৮. তোহফাতুল আহওয়াজি, ২য় খন্ড, পৃ. ১৯৫, ১৯৬