📄 নজদের যুদ্ধ
বনু নাযিরের যুদ্ধে কোন প্রকার ত্যাগ তিতিক্ষা ছাড়াই মুসলমানরা প্রশংসনীয় সাফল্য লাভ করেছেন। এতে মদীনায় মুসলমানদের ক্ষমতা আরো মযবুত ও সংহত হয়। মোনাফেকরা হতাশ হয়ে যায় এবং তাদের মুখ কালো হয়ে ওঠে। তারা প্রকাশ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে কোন কাজ করতে সাহস পাচ্ছিলো না। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেইসব বেদুইনদের খবর নেয়ার জন্যে সচেষ্ট হন, যারা ওহুদের যুদ্ধের পর থেকেই মুসলমানদের কঠিন সমস্যায় ফেলে রেখেছিলো। ইসলামের দাঈ বা প্রচারকদের ওপর অত্যন্ত নৃশংসভাবে হামলা করে তাদের জীবন শেষ করে দিয়েছিলো। পরে তাদের সাহস এতো বেড়ে যায় যে, তারা মদীনায় হামলা করারও চিন্তা করতে থাকে।
বনু নাযিরের যুদ্ধ শেষে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় অবস্থানের অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই খবর পেলেন যে, বনু গাতফানের বনু মাহারেব ও বনু ছালাবা গোত্র মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে বেদুইনদের সমবেত করতে শুরু করেছে। এই খবর পাওয়ার পরপরই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নজদে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। নজদ এর প্রান্তর পেরিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলমানরা বহুদূর অগ্রসর হন। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিলো কঠোর প্রাণ বেদুইনদের মনে ভয় ধরানো, যেন, তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আগের মতো তৎপরতার পুনরাবৃত্তি করতে সাহসী না হয়।
লুটতরাজ, ডাকাতি, রাহাযানি, হঠকারিতা ইত্যাদিতে অভ্যস্ত ও অভিজ্ঞ বেদুইনরা মুসলমানদের এ আকস্মিক অভিযানের খবর শোনামাত্রই ভীত হয়ে পালিয়ে গিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। মুসলমানরা এসব লুটেরাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের পর মদীনার পথে রওয়ানা হন।
যুদ্ধ সম্পর্কে উল্লেখকারীরা এ পর্যায়ে নির্দিষ্ট একটি যুদ্ধের উল্লেখ করেছেন। চতুর্থ হিজরীর রবিউস সানি বা জমাদিউল আউয়ালে নজদের মাটিতে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই 'যুদ্ধকে যাতুর রেকা' যুদ্ধ নামে অভিহিত করা হয়। যতোটা তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় তাতে বোঝা যায় যে, সেই সময় নজদের ভেতরেই একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। কেননা মদীনার অবস্থা ছিলো কিছুটা সেই রকম। আবু সুফিয়ান ওহুদ যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে পরের বছর বদর প্রান্তরে যে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছিলো, মুসলমানরা সেই হুমকির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন। সেই সময় আবার ঘনিয়ে আসছিলো। বেদুইনদেরকে তাদের হঠকারিতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যেতে দিয়ে বদরের মতো অনুরূপ বড় ধরনের কোন যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে মদীনা খালি করে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ ছিলো না। বরং বদরের প্রান্তরে যেরকম ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, সেই রকম যুদ্ধের জন্যে বেরোবার আগে বেদুইনদের বাড়াবাড়ির ওপর আঘাত হানা দরকার, সেই আঘাতের কথা ভেবে ভবিষ্যতে তারা যেন মদীনার ওপর হামলা করার চিন্তা কখনো মনের কিনারায়ও আনতে না পারে।
চতুর্থ হিজরীতে রবিউস সানী বা জমাদিউল আউয়ালে যে যুদ্ধ হয়েছিলো, সেই যুদ্ধ যাতুর রেকা যুদ্ধ নয় বলেই মনে হয়। যতোটা তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে, এতে ওরকম যুদ্ধ সেই সময় হয়নি। কারণ যাতুর রেকা যুদ্ধে হযরত আবু হোরায়রা (রা.) এবং হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা.) উপস্থিত ছিলেন। আবু হোরায়রা (রা.) খয়বর যুদ্ধের অল্প কয়েকদিন আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবু মুসা আশয়ারী (রা.) খয়বরেই আল্লাহর রসূলের খেদমতে হাযির হয়েছিলেন।
৪র্থ হিজরীর বেশ কিছু কাল পরেই যে যাতুর রিকা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, তার দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে এই যে, এতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাওফের নামায ১০ আদায় করেছিলেন। খাওফের নামায সর্বপ্রথম আদায় করা হয় গাযওয়ায়ে আসফানে। আর গাযওয়ায়ে
টিকাঃ
১০. যুদ্ধাবস্থার নামাযকে খওফের নামায বলা হয়। এই নামাযের একটা নিয়ম হচ্ছে এই যে, অর্ধসংখ্যক সৈন্য অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত অবস্থাতেই ইমামের পেছনে নামায পড়বেন, বাকী অর্ধেক সৈন্য অস্ত্র-সজ্জিত অবস্থায় শত্রুদের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন। এক রাকাত নামাযের পর দ্বিতীয় অর্ধেক ইমামের পেছনে চলে আসবেন এবং প্রথম অর্ধেক শত্রুদের প্রতি দৃষ্টি রাখার জন্য সামনে চলে যাবেন। ইমাম দ্বিতীয় রাকাত পুরো করে নেবেন এবং সেনাবাহিনীর উভয় দল নিজ নিজ নামায পালাক্রমে পুরো করে নেবেন। এর সঙ্গে সঙ্গতিশীল এই নামাযের আরো কয়েকটি নিয়ম রয়েছে, যা যুদ্ধের অবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে আদায় করা হয়ে থাকে। বিস্তারিত বিবরণ হাদীসের কেতাবসমূহ দেখুন।
📄 বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ
মদীনার আশেপাশের শত্রুদের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে এবং বেদুইনদের দুর্বৃত্তপনা স্তব্ধ করে দেয়ার পর মুসলমানরা বড়ো দুশমন কোরায়শের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলেন। কেননা খুব দ্রুত বছর শেষ হয়ে যাচ্ছিলো এবং ওহুদের সময়ে নির্ধারণ করা সময়ও খুব দ্রুত এগিয়ে আসছিলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের কর্তব্য ছিলো সেই সময় বেরিয়ে পড়া এবং আবু সুফিয়ান এবং তার কওমের সাথে যুদ্ধ করে হয়ে তাদের বুঝিয়ে দেয়া যে, মুসলমানরা দুর্বল নয়। এছাড়া এই যুদ্ধে হেদায়াতপ্রাপ্ত ও বিশ্ব স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী দলই টিকে থাকার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। পরিস্থিতিও থাকবে তাদেরই অনুকূলে।
চতুর্থ হিজরীর শাবান মাস অর্থাৎ ৬২৬ হিজরীর জানুয়ারী মাসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহার ওপর মদীনার দায়িত্বভার ন্যস্ত করে পরিকল্পিত যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বদর অভিমুখে রওয়ানা হন। তাঁর সাথে ছিলো দেড় হাজার মোজাহেদ এবং দশটি ঘোড়া। সেনাবাহিনীর পতাকা হযরত আলীর (রা.) হাতে প্রদান করা হয়। বদরের প্রান্তরে পৌঁছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলমানরা শত্রুর জন্যে অপেক্ষা করতে থাকেন।
অন্যদিকে আবু সুফিয়ান পঞ্চাশটি সওয়ারীসহ দুই হাজার পৌত্তলিক সৈন্যের এক দল নিয়ে রওয়ানা হয় এবং মক্কা থেকে এক প্রান্তর দূরবর্তী মাররাজ জাহরানের মাজনা নামের বিখ্যাত জলাশয়ের তীরে তাঁবু স্থাপন করে। কিন্তু মক্কা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় থেকেই আবু সুফিয়ানের মন ছিলো ভীতবিহ্বল। ইতিপূর্বে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করে কি লাভ হয়েছে? আবু সুফিয়ান অতীত অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করতে লাগলো। মুসলমানদের বীরত্ব ও ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা ভেবে আবু সুফিয়ান এগোতে সাহস পাচ্ছিলো না। মাররাজ জাহরান নামক জায়গায় পৌছে তার মনোবল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলো। সে মক্কায় ফিরে যাওয়ার বাহানা খুঁজতে শুরু করলো। অবশেষে সঙ্গীদের সে বললো, শোনো সঙ্গীরা যুদ্ধ তো সেই সময় করা যায়, যখন প্রাচুর্য থাকে। ঘাস থাকে প্রচুর। এতে পশুরা মনের সুখে ঘাস খাবে, আর তোমরা তাদের দুধ পান করবে। এবারতো শুষ্ক মৌসুম। কাজেই আমি ফিরে চললাম, তোমরাও ফিরে চলো।
কোরায়শ দলের সৈন্যদের সবাই যেন ভয়ে কাতর হয়ে পড়েছিলো। আবু সুফিয়ানের কথার পর নতুন করে যুক্তি দেখানো কারো পক্ষেই সম্ভব হলো না। মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে কারোই আগ্রহ রইল না। ফলে তারা সবাই ফিরে চললো।
এদিকে মুসলমানরা বদর প্রান্তরে আটদিন যাবত শত্রু সৈন্যের জন্যে অপেক্ষা করেন। এ সময় ব্যবসার জিনিস বিক্রি করে এক দিরহামকে দুই দিরহামে পরিণত করতে লাগলেন। আটদিন পর মনে আনন্দ নিয়ে বীরদর্পে মুসলমানরা মদীনায় ফিরে এলেন।
পরিস্থিতি সেই সময় পুরোপুরি মুসলমানদের অনুকূলে। এই যুদ্ধ প্রতিশ্রুত যুদ্ধ, বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ, বদরের আরেক যুদ্ধ তথা বদরের ছোট যুদ্ধ নামে পরিচিত।
টিকাঃ
১১. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ২০৯, যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ১১২
📄 দওমাতুল জন্দলের যুদ্ধ
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদর থেকে ফিরে এসেছেন। চারিদিকে শান্তি ও স্বস্তির পরিবেশ। সমগ্র এলাকায় ইসলামের জয় জয়কার, প্রশান্তিময় ও স্নিগ্ধ সুরভিত অবস্থা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরবের শেষ সীমান্ত পর্যন্ত নযর দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। এটার প্রয়োজনও ছিলো। কেননা এর ফলে পরিস্থিতির ওপর মুসলমানদের সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং শত্রুমিত্র সকলেই সেকথা বুঝতে পারবে এবং স্বীকার করবে।
বদরের ছোট যুদ্ধের পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছয় মাস যাবত শান্তি ও স্বস্তির সাথে মদীনায় অতিবাহিত করেন। এরপর তাঁকে জানানো হলো যে, সিরিয়ার নিকটবর্তী দওমাতুল জন্দল এর আশে পাশে গোত্রসমূহ পথ চলতি কাফেলাগুলোর ওপর ডাকাতি ও লুটপাট করছে। মদীনায় হামলা করতে তারা এক বিরাট দলও প্রস্তুত করেছে। এসকল খবরের প্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাবা ইবনে আরফাতা গেফারীকে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে এক হাজার মুসলমানসহ রওয়ানা হলেন। পঞ্চম হিজরীর ২৫শে রবিউল আউয়াল এ ঘটনা ঘটে। পথ চিনিয়ে দেয়ার জন্যে বনু আযরা গোত্রের মাযকুর নামের একজন লোককে সঙ্গে নেয়া হয়।
এই অভিযানের সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত ছিলো এ রকম যে, তিনি রাতে সফর করতেন এবং দিনে লুকিয়ে থাকতেন। শত্রুদের ওপর আকস্মিক হামলা করার জন্যেই এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হয়। দওমাতুল জন্দলে পৌঁছে জানা গেলো যে, তারা অন্যত্র সরে পড়েছে। তাদের পশুপাল এবং রাখালদের ওপর কবযা করা হলো। কিছুসংখ্যক পালিয়েও গেলো।
দওমাতুল জন্দলের অধিবাসীরাও যে যেদিকে পারলো পালিয়ে গেলো। মুসলমানরা দওমাতুল জন্দল ময়দানে পৌঁছার পর স্থানীয় অধিবাসীদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করেন। আশেপাশের বিভিন্ন স্থানে সেনাদল প্রেরণ করা হয় কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। কয়েকদিন পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় ফিরে আসেন। এই অভিযানের সময় উয়াইনা ইবনে হাচনের সাথে চুক্তি সম্পাদিত হয়। দওমাতুল জন্দল সিরিয়া সীমান্তের একটি শহর। এখান থেকে দামেশকের দূরত্ব পাঁচ এবং মদীনার দূরত্ব পনের রাত।
এ ধরনের সুচিন্তিত পদক্ষেপ এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ পরিকল্পনার ফলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের গৌরব শক্তি ও শান্তির আদর্শ দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। সময়ের গতি মুসলমানদের দিকে আসে এবং আভ্যন্তরীণ ও বাইরের সমস্যা ও সঙ্কট কমে আসে। অথচ কিছুকাল উভয় ধরনের সমস্যা মুসলমানদের ঘিরে রেখেছিলো। এসকল সফল অভিযানের ফলে মোনাফেকরা নিশ্চুপ হয়ে যায়। ইহুদীদের একটি গোত্রকে বহিষ্কার করা হয়, অন্য গোত্র সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণের প্রতিশ্রুতি দেয়। কোরায়শদের শক্তিও হ্রাস পায়। মুসলমানরা ইসলামের সুমহান শিক্ষার প্রচার এবং আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দ্বীনের পয়গাম তাবলীগ করার সুযোগ লাভ করেন।
টিকাঃ
১১. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ২০৯, যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ১১২
📄 খন্দকের যুদ্ধ
এক বছরে বেশী সময় যাবত মুসলমানদের সামরিক তৎপরতা চালানোর ফলে জাজিরাতুল আরব তথা আরব উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। চারিদিকে মুসলমানদের প্রভাব প্রতিপত্তির বিস্তার ঘটে। এই সময়ে ইহুদীরা তাদের ঘৃণ্য আচরণ, ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতার কারণে নানা ধরনের অবমাননা ও অসম্মানের সম্মুখীন করে। কিন্তু তবু তাদের আক্কেল হয়নি, তারা কোন শিক্ষাও গ্রহণ করেনি। খয়বরে নির্বাসনের পর ইহুদীরা অপেক্ষায় থাকে যে, মুসলমান এবং মূর্তিপূজকদের মধ্যে যে সংঘাত চলছে, তার পরিণাম কোথায় গিয়ে পৌছে, দেখা যাক। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই মুসলমানদের অনুকূলে যাচ্ছিলো, দূর দূরান্তে ইসলামের জয় জয়কার ছড়িয়ে পড়ছিলো। এসব দেখে ইহুদীরা হিংসায় জ্বলে-পুড়ে ছারখার হতে লাগলো। তারা নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করলো। মুসলমানদের ওপর সর্বশেষ আঘাত হানার জন্যে তারা প্রস্তুতি নিতে লাগলো। তারা মুসলমানদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাচ্ছিলো। কিন্তু সরাসরি সংঘাতের সংঘর্ষের সাহস তাদের ছিলো না, এ কারণে উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যে তারা এক ভয়ানক পরিকল্পনা গ্রহণ করলো।
ঘটনার বিবরণ এই, বনু নাযির গোত্রের ২০ জন সর্দার ও নেতা মক্কায় কোরায়শদের কাছে হাযির হলো। তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কোরায়শদের উদ্বুদ্ধ করে বললো যে, তারাও সর্বাত্মক সাহায্য করবে। কোরায়শরা রাজি হয়ে গেলো। ওহুদের যুদ্ধের সময় কোরায়শরা পরের বছর বদরের প্রান্তরে যুদ্ধ করবে বলেও করতে পারেনি। একারণে তারা ভাবলো যে, নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে কোরায়শদের সুনাম সুখ্যাতিও বহাল রাখা যাবে, আর ইতিপূর্বে কৃত অঙ্গীকারও পূরণ করা যাবে।
ইহুদৗ প্রতিনিধিদল এরপর বনু গাতফানের কাছে গিয়ে তাদেরকেও কোরায়শদের মতোই যুদ্ধে অনুপ্রাণিত করলো। তারাও প্রস্তুত হয়ে গেলো। এরপর ইহুদীদের এই প্রতিনিধিরা আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছে ঘুরে ঘুরে তাদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপাতে লাগলো এবং একটি যুদ্ধের জন্যে আহ্বান জানালো। এতে বহু লোক যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হলো। মোটকথা, ইহুদী রাজনীতিকরা সফলতার সাথে কাফেরদের সাথে গাঁটছড়া বাঁধলো এবং বহু লোককে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর দাওয়াত এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করলো।
এরপর পরিকল্পিত কর্মসূচী অনুযায়ী দক্ষিণ দিক থেকে কোরায়শ, কেনানা এবং তোহামায় বসবাসকারী অন্যান্য মিত্র গোত্র মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলো। এদের অধিনায়ক ছিলো কাফের নেতা আবু সুফিয়ান। সম্মিলিত সৈন্যসংখ্যা ছিলো ৪ হাজার। এরা মাররাজ জাহরাহন পৌঁছালে বনু সালিম গোত্রের লোকেরাও তাদের সাথে শামিল হলো। এদিকে এই সময়ে পূর্ব দিক থেকে সাতফান গোত্র, ফাজরাহ, মাররা এবং আশজাআ রওয়ানা হলো।
ফাজরাহ গোত্রের সেনানায়ক ছিলো উয়াইনা ইবনে হাসান। বনু মাররা গোত্রের সেনাপতি ছিলো হারেস ইবনে আওফ-এবং বনু আশজা- এর সেনাপতি ছিলো মাছারাহ ইবনে রাখিল। এদের সাথে বনু আছাদ এবং অন্যান্য গোত্রের বহু লোকও জোটবদ্ধ হলো।