📄 বীরে মাউনার মর্মন্তুদ ঘটনা
রাজিঈ এর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সেই মাসেই ঘটেছিলো বীরে মাউনার ঘটনাও। রাজিঈ এর ঘটনার চেয়ে এ ঘটনাও কম মর্মন্তুদ নয়। এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই, আবু বারা আমের ইবনে মালেক মদীনায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাযির হলো। সে 'মালায়েকুল আসনা' অর্থাৎ বর্শা খেলোয়াড় উপধিতে ভূষিত ছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু সে ইসলাম এবং গ্রহণ করেনি ইসলাম যে তার অপছন্দ এ কথাও বলেনি। সে বললো, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনি যদি আপনার সাহাবাদেরকে নজদের অধিবাসীদের কাছে প্রেরণ করেন, তবে আমার বিশ্বাস, তারা ইসলামের দাওয়াত কবুল করবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার সাহাবাদের ব্যাপারে নজদের অধিবাসীদের আমার সন্দেহ হয়। আবু বারা বললো, তারা আমার আশ্রয়ে থাকবেন। একথার পর আল্লার রসূল ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মোতাবেক ৪০ জন সাহাবাকে আবু বারা'র সাথে প্রেরণ করেন। ইমাম বোখারী সহীহ বোখারীতে যে ৭০ জন সাহাবীর কথা বলেছেন, সেই বর্ণনাই সত্য। সেই ৭০ জন সাহাবীর আমীর নিযুক্ত করা হয়েছিলো মুনযার ইবনে আমরকে। তিনি বনু সায়েদা গোত্রের অধিবাসী এবং মুতাকলিল মউত উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। উল্লিখিত ৭০ জন সাহাবীর মধ্যে সকলেই ছিলেন ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন এবং অত্যন্ত পরহেজগার। তাঁরা দিনের বেলায় কাঠ কেটে সেই টাকায় আহলে সোফফার অধিবাসীদের জন্যে খাবার ক্রয় করতেন, নিজেরা কোরআন পড়তেন এবং অন্যদেরও পড়াতেন। রাত্রিকালে তারা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সামনে মোনাজাত ও নামাযে কাটিয়ে দিতেন। পথ চলতে চলতে ইসলামের দাঈ এ ৭০জন সাহাবা মাউনার জলাশয়ের কাছে গিয়ে পৌঁছুলেন। এই জলাশয় বনু আমের এবং হোররা বনি সালিমের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত। সেখানে পৌঁছার পর পরই সাহাবারা উম্মে সুলাইমের ভাই হারাম ইবনে মালহানের হাতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেরিত চিঠি ইসলামের কট্টর দুশমন আমের ইবনে তোফায়েলের কাছে পাঠালেন। এই দুর্বৃত্ত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র চিঠিখানি খুলেও দেখেনি বরং একজন লোককে ইশারা করলো। সেই লোকটি হযরত হারাম ইবনে মালহান (রা.)-এর পেছন দিক থেকে এত জোরে বর্শা দিয়ে আঘাত করলো যে, বর্শার ফলা সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেলো। রক্ত দেখে হযরত হারাম ইবনে মালহান (রা.) বললেন, আল্লাহু আকবর, কাবার প্রভুর কসম, আমি কামিয়াব হয়ে গেছি।
এর কিছুক্ষণ পরই দুশমনে খোদা কট্টর, দুর্বৃত্ত, কাফের আমের ইবনে তোফায়েল অন্য সাহাবাদের ওপর হামলা করতে তার গোত্র বনি আমের-এর লোকদের আওয়ায দিলো। কিন্তু তারা আবু বারা'র আশ্রয়ের কারণে আমেরের ডাকে সাড়া দেয়নি। এদিক থেকে হতাশ হয়ে আমের বনি সালিম গোত্রের লোকদের আওয়ায দিলো। বনি সালিমের তিন শাখা আছিয়্যা বাআল এবং জাকোয়ান সে ডাকে সাড়া দিয়ে সাহাবায়ে কেরামকে এসে ঘেরাও করলো। প্রত্যুত্তরে সাহাবারাও লড়াই করলেন। কিন্তু তাঁরা প্রায় সবাই শহীদ হয়ে গেলেন। হযরত কা'ব ইবনে যায়েদ নাজ্জার (রা.) শুধু জীবিত ছিলেন। তাঁকে শাহাদাতপ্রাপ্ত সাহাবাদের মধ্য থেকে আহত অবস্থায় তুলে নেয়া হয়। তিনি খন্দকের যুদ্ধ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। হযরত আমর ইবনে উমাইয়া জামারি একা হযরত মোনযার ইবনে ওকবা আমেরের (রা.) উট চরাচ্ছিলেন। তারা ঘটনাস্থলে পাখীর উড্ডয়ন দেখে সেখানে পৌছালেন। হযরত মোনযার (রা.) তার বন্ধুদের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হন। হযরত আমর ইবনে উমাইয়া জামারিকে বন্দী করা হয়। তিনি ছিলেন মোদার গোত্রের লোক। এই পরিচয় পাওয়ার পর আমের ইবনে তোফায়েল তাঁর কপালের উপরের দিকের কিছু চুল কেটে তার মায়ের পক্ষ থেকে তাকে মুক্ত করে দেয়। এই দুর্বৃত্তের মা একজন ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেবে বলে ইতিপূর্বে মানত করেছিলো।
হযরত আমর ইবনে উমাইয়া জামারি এই হৃদয় বিদারক খবর নিয়ে মদীনায় পৌঁছুলেন। ৭০ জন বিশিষ্ট সাহাবার শাহাদাতের ঘটনা ওহুদের দুর্বিপাকের ঘটনাই স্মরণ করিয়ে দিলো। ওহুদের যুদ্ধে তো সংঘর্ষে উভয় পক্ষে হতাহত হওয়ার সুযোগ ছিলো, কিন্তু সরল প্রাণ সাহাবারা এখানে এক নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন। হযরত আমর ইবনে উমাইয়া জামারি ফেরার পথে কানাত প্রান্তরের কাছে কারকারা নামক জায়গায় পৌঁছে একটি গাছের ছায়াতলে নেমে পড়েন। সেখানে বনু কেলাব গোত্রের দুইজন লোকও এসে হাযির হয়েছিলো। উভয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পর হযরত আমর ইবনে উমাইয়া উভয়কে হত্যা করেন। তাঁর ধারণা মতে তিনি সঙ্গীদের হত্যার প্রতিশোধ নিচ্ছেন। অথচ এই দুইজন লোকের কাছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে নিরাপত্তামূলক চিঠি ছিলো। কিন্তু হযরত আমর সেকথা জানতেন না। মদীনায় এসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ ঘটনা জানানোর পর তিনি বললেন, তুমি এমন দুইজন লোককে হত্যা করেছো যাদের হত্যার ক্ষতিপূরণ আমাকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমান এবং তাদের ইহুদী মিত্রদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ সংগ্রহে মনোনিবেশ করেন।⁴ এই ঘটনার কারণেই বনু নাযিরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যে সম্পর্কে পরে আলোচনা করা হবে।
টিকাঃ
৩. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৬৯-৭৯, যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ২০৯, সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৬৮, ৫৬৯, ৫৮৫
৪. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, ১৮৩-১৮৭, যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, ১০৯, ১১০, সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, ৫৮৪, ৫৮৬
📄 বনু নাযিরের যুদ্ধ
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইহুদীরা ইসলাম এবং মুসলমানের নামে জ্বলতো, পুড়তো। কিন্তু তারা বীর যোদ্ধা ছিলো না, ছিলো ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকারী। এ কারণে তারা যুদ্ধের পরিবর্তে ঘৃণা এবং শত্রুতা প্রকাশ করতো। তারা মুসলমানদের সাথে চুক্তি ও অঙ্গীকার সত্তেও তাদের কষ্ট দিতেও তাদের ওপর নির্যাতন চালাতে নানা প্রকার অজুহাত খুঁজে বেড়াতো। বনু কাইনুকা গোত্রের বহিষ্কার এবং কাব ইবনে আশরাফের হত্যাকান্ডের পর ইহুদীদের সাহস কমে যায়। তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে চুপচাপ থাকে। কিন্তু ওহুদের যুদ্ধের পর তাদের সাহস ফিরে আসে। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করে। মদীনার মোনাফেকরা মক্কায় মোশরেকদের সাথে গোপনে গাঁটছড়া বাঁধে এবং ইহুদীরা মোশরেকদের সহায়তা করতে থাকে।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব কিছু জেনেও ধৈর্য ধরেন। কিন্তু রাজিঈ এবং মাউনার দুর্ঘটনার পর তাদের সাহস বহুলাংশে বেড়ে যায় এবং তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শেষ করে দেয়ার কর্মসূচী গ্রহণ করে। ঘটনার বিবরণ এই, আল্লাহর রসূল হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কয়েকজন সাহাবাকে সঙ্গে নিয়ে ইহুদীদের কাছে গমন করেন। তাদের সাথে বনু কেলাবের নিহত দুই ব্যক্তির মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে আলোচনা করেন, যাদেরকে হযরত আমর ইবনে উমাইয়া জামারি ভুলক্রমে হত্যা করেছিলেন। ইহুদীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী হত্যার উল্লিখিত ক্ষতিপূরণে মুসলমানদের সহায়তা করতে তারা বাধ্য ছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সেকথা বলার পর তারা বললো, হে আবুল কাসেম, আমরা তাই করবো। আপনি আপনার সঙ্গীদের নিয়ে এখানে অপেক্ষা করুন, আমরা ব্যবস্থা করছি। একথার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদীদের একটি দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে অপেক্ষা করছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.) হযরত ওমর (রা.) হযরত আলী (রা.) এবং অন্য কয়েকজন সাহাবা সেই সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন।
ইহুদীরা একটু দূরে যাওয়ার পর তাদের কাঁধে শয়তান সওয়ার হলো। তাদের ভবিষ্যত দুর্ভাগ্যকে শয়তান সৌভাগ্য হিসাবে দেখালো। ইহুদীরা নিজেদের মধ্যে কুপরামর্শ করলো যে, এই তো চমৎকার সুযোগ, চলো আমরা মোহাম্মদকে প্রাণে মেরে ফেলি। দেয়ালের ওপার থেকে ভারি চাক্কি ফেলে আল্লাহর রসূলকে মেরে ফেলতে কে রাযি আছে? এটা জানতে চাওয়ায় আমর ইবনে জাহাশ নামে একজন ইহুদী রাজি হলো। সালাম ইবনে মাশকাম নামের একজন ইহুদী বললো, সাবধান, অমন কাজ করো না। আল্লাহর কসম, তোমার ইচ্ছার খবর আল্লাহর রসূল পেয়ে যাবেন। আল্লাহ তায়ালাই তাঁকে খবর দেবেন। তাছাড়া মুসলমানদের সাথে আমাদের যে অঙ্গীকার রয়েছে, তাও লংঘন করা হবে। কিন্তু দুর্বৃত্ত স্বভাব দুর্ভাগা ইহুদীরা কোন কথাই কানে তুললো না তারা নিজেদের অসদুদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অটল রইলো।
এদিকে রব্বুল আলামীন আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রসূলের কাছে হযরত জিবরাইল (আ.)- কে প্রেরণ করলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্রুত সেই জায়গা থেকে উঠে মদীনার পথে রওয়ানা হলেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে অনুসরণ করে তাঁকে বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনি এতো দ্রুত চলে এলেন যে, আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কুচক্রী ইহুদীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সাহাবাদের অবহিত করলেন।
মদীনা ফিরে আসার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোহাম্মদ ইবনে মোসলমাকে বনু নাযির গোত্রের কাছে প্রেরণ করেন এবং তাদের এ নোটিশ দেন যে, তোমরা অবিলম্বে মদীনা থেকে বেরিয়ে যাও। এখানে তোমরা আমাদের সাথে থাকতে পারবে না। তোমাদের দশ দিনের সময় দেয়া যাচ্ছে। এরপর যাদের পাওয়া যাবে, তাদের শিরশ্ছেদ করা হবে। এই নোটিশ পাওয়ার পর ইহুদীরা বহিষ্কার হওয়া ব্যতীত অন্য কোন উপায় খুঁজে পেলো না। কয়েক দিনের সফরের প্রস্তুতি তারা শুরু করলো। কিন্তু মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইহুদীদের খবর পাঠালো যে, তোমরা নিজের জায়গায় অটল থাকো, বাড়ীঘর ছেড়ে যেয়ো না। আমার নিয়ন্ত্রণে ২ হাজার যোদ্ধা রয়েছে যারা তোমাদের সঙ্গে দুর্গে প্রবেশ করবে। এরা তোমাদের নিরাপত্তায় জীবন দিয়ে দেবে। তবুও তোমাদের বের করে দেয়া হলে আমরাও তোমাদের সাথে বেরিয়ে যাব। তোমাদের ব্যাপারে কারো হুমকিতে আমরা প্রভাবিত হব না। তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা হলে আমরা তোমাদের সাহায্য করবো। এছাড়া বনু কোরায়যা এবং বনু গাতফান গোত্র তোমাদের মিত্র, তারাও তোমাদের সাহায্য করবে।
আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মোনাফেকের প্রেরিত এই খবরে ইহুদীরা চাঙ্গা হলো। তারা সিদ্ধান্ত নিলো যে, বহিষ্কৃত হওয়ার চেয়ে যুদ্ধ করবে। ইহুদী নেতা হুয়াই ইবনে আখতার আশা করেছিলো যে, মোনাফেক নেতা তার কথা রাখবে। তাই সে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে খবর পাঠালো যে, আমরা নিজেদের বাড়ীঘর ছেড়ে যাব না। আপনার যা করার, তা করুন।
মুসলমানদের জন্যে এই চ্যালেঞ্জ ছিলো নাযুক এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই পট পরিবর্তনের সময়ে শত্রুদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার পরিণতি সংশয়মুক্ত ছিলো না। বিপজ্জনক পরিস্থিতি যে কোন সময় সৃষ্টি হতে পারে। সমগ্র আরব ছিলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। মুসলমানদের দু'টি তাবলীগী প্রতিনিধিদলকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। বনু নাযির গোত্রের ইহুদীরা এতো বেশী শক্তিশালী ছিলো যে, তাদের অস্ত্র সমর্পণ করানো সহজ কাজ ছিলো না। এছাড়া তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ঝুঁকি নেয়াও ছিলো বিপজ্জনক। বীরে মাউনা এবং তার আগের মর্মান্তিক ঘটনার পর মুসলমানরা হত্যা, বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি অপরাধ সম্পর্কে অনেক বেশী সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। এ ধরনের অপরাধে মুসলমানরা মানসিকভাবে জর্জরিত এবং বিরক্ত ছিলেন। ফলে এ কারণে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, বনু নাযির যেহেতু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, একারণে তাদের সাথে লড়াই করতেই হবে-পরিণাম যাই হোক না কেন। তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুয়াই ইবনে আখতারের পয়গাম পাওয়ার সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহু আকবর বলে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান। এ সময়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাকতুমকে মদীনার দেখাশোনার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়। এরপর সাহাবায়ে কেরামসহ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু নাযিরের বসতি এলাকা অভিমুখে রওয়ানা হন। হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.)-এর হাতে পতাকা দেয়া হয়েছিলো। বনু নাযিরের এলাকায় গিয়ে তাদের অবরোধ করা হয়।
এদিকে বনু নাযির তাদের দুর্গের ভেতর আশ্রয় নিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। দুর্গদ্বার বন্ধ করে দিয়ে তারা তীর ও পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করে। ঘন খেজুরের বাগানগুলো তারা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছিলো, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সময় আদেশ দিলেন যে, খেজুর গাছগুলো কেটে পুড়ে ফেলা হোক। সেদিকে ইঙ্গিত করেই বিখ্যাত কবি হাসসান ইবনে ছাবেত (রা.) লিখেছিলেন,
'বনু লুওয়াই সর্দারদের জন্যে সেতো মামুলী ব্যাপার দাউ দাউ জ্বলবে অগ্নিশিখা বুয়াইবার চারিধার।'
বুয়াইবা ছিলো বনু নাযির গোত্রের খেজুরের বাগান ঘেরা এলাকা। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'তোমরা খেজুর গাছগুলো কেটেছ এবং যেগুলি কান্ডের উপরে স্থির রেখে দিয়েছ সে তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে। এটা এজন্যে যে, আল্লাহ তায়ালা পাপাচারীদের লাঞ্ছিত করবেন।' (সূরা হাশর, আয়াত, ৫)
বনু নাযিরকে অবরোধ করার পর বনু কোরায়যা গোত্র তাদের ধারে কাছেও আসেনি। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইও কথা রাখেনি। বনু নাযিরের মিত্র গোত্র গাফ্ফান গোত্রের লোকেরাও সাহায্যের জন্যে অগ্রসর হয়নি। মোটকথা কেউই ইহুদী বনু নাযিরদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেনি বা তাদের বিপদ দূর করার কাজে উদ্যোগী হয়নি। এ কারণেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন এ ঘটনার উদাহরণ পেশ করতে গিয়ে বলেছেন, 'এদের তুলনা শয়তান, যে মানুষকে বলে, কুফরী করো। তারপর যখন সে কুফুরী করে, শয়তান তখন বলে, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমি জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।' (সূরা হাশর, আয়াত ১৬)
অবরোধ দীর্ঘায়িত হয়নি। ছয় সাত রাত, মতান্তরে পনেরো রাত। এই সময়ের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের মনে মুসলমানদের প্রভাব ফেলে দেন, তাদের মনোবল নষ্ট হয়ে যায়। তারা স্বেচ্ছায় অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি হয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলে পাঠায় যে, আমরা মদীনা ছেড়ে চলে যেতে প্রস্তুত রয়েছি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদীদের প্রস্তাব অনুমোদন করেন। তিনি এটাও অনুমোদন করেন যে তারা অস্ত্র ব্যতীত অন্য জিনিসপত্র যতোটা সাথে নিয়ে যেতে পারে, নিয়ে যাবে এবং সপরিবারে মদীনা ত্যাগ করবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে এ মর্মে অনুমোদন পাওয়ার পর বনু নাযির অস্ত্র সমর্পণ করে এবং নিজেদের হাতে ঘর দোর ভেঙ্গে প্রয়োজনীয় জিনিস বাঁধাছাঁদা করতে থাকে। দরজা জানালা যতোটা সম্ভব সঙ্গে নেয়ার ব্যবস্থা করে। কেউ কেউ ছাদের কড়া এবং দেয়ালের খুঁটিও সঙ্গে নিয়ে যায়। এরপর নারী ও শিশুদের উটের পিঠে তুলে মদীনা ছেড়ে চলে যায়। অধিকাংশ ইহুদী খয়বরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে হুয়াই ইবনে আখতার এবং সালাম ইবনে আবুল হাকিক নামক বিশিষ্ট ইহুদীরা খয়বরে যায়। একদল সিরিয়ার পথে রওয়ানা দেয়। তবে ইয়ামিন ইবনে আমর এবং আবু সাঈদ ইবনে ওয়াহাব ইসলাম গ্রহণ করে। এ কারণে তাদের জিনিসপত্র মুসলমানরা স্পর্শও করেননি।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শর্তানুযায়ী বনু নাযির গোত্রের অস্ত্রশস্ত্র, জমি, ঘর ও বাগান, নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। অস্ত্রের মধ্যে ৫০টি বর্ম, ৫০টি খুদ এবং ৩৪০টি তরবারি ছিলো।
বনু নাযির গোত্রের বাগান, জমি, এবং ঘরদোর ছিলো শুধুমাত্র রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মালিকানাধীন। নিজের জন্যে রাখা বা কাউকে দান করে দেয়ার ব্যাপারে তাঁর একক অধিকার ছিলো। এ কারণে গনীমতের মালের মতো এইসব সম্পদ থেকে তিনি এক পঞ্চমাংশ বের করে নেননি। কেননা আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় রসূল (রা.)-কে এই সম্পদ 'ফাঈ' হিসাবে দান করেছেন। মুসলমানরা যুদ্ধ করে এই সম্পদ অর্জন করেননি। বিশেষ ক্ষমতা ও অধিকারের কারণে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই সম্পদ শুধু প্রথম পর্যায়ে হিজরতকারী মোহাজেরদের প্রদান করেন। দুইজন আনসার সাহাবী আবু দোজানা এবং ছহল ইবনে হোনায়েফ (রা.)-কে তাদের দারিদ্র্যের কারণে কিছু সম্পদ প্রদান করা হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জন্যে সামান্য কিছু সম্পদ রেখে দেন। সেই সংরক্ষিত সম্পদ ব্যয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবন সঙ্গিনীদের সারা বছরের ব্যয় নির্বাহ করতেন।
বনু নাযিরের এই অভিযান ৬২৫ ঈসায়ী সালের ৪ঠা আগস্ট সংঘটিত হয়েছিলো। আল্লাহ তায়ালা এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পুরো সূরা হাশর নাযিল করেন। এতে ইহুদীদের দুর্বৃত্তপনার পরিচয় তুলে ধরে মোনাফেকদের স্বরূপ উন্মোচন করা হয়।
'ফাঈ' এর নীতিমালা বর্ণনার পর মোহাজের ও আনসারদের প্রশংসা করা হয় এবং একথাও বলা হয় যে, রণকৌশলের প্রেক্ষিতে শত্রুদের গাছপালা কেটে ফেলা এবং ওতে আগুন ধরিয়ে দেয়া যায়। এ ধরনের কাজ যমিনে ফাছাদ সৃষ্টি করা নয়। এরপর ঈমানদারদের তাকওয়া অর্জন এবং আখেরাতের প্রস্তুতির তাকিদ দেয়া হয়। পরে আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর নিজের হামদ ছানা প্রকাশ এবং নিজের নাম ও গুণবৈশিষ্ট বর্ণনা করে সূরা সমাপ্ত করেন।
তাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, এই সূরাকে সূরায়ে বনু নাযির বলাই সমীচীন।
টিকাঃ
৫. ওয়াকেদী লিখেছেন, রাজিঈ এবং মাউনা উভয় ঘটনার খবর আল্লাহর রসূল একই রাতে পেয়েছিলেন।
৬. ইবনে সা'দ হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রসূল (স.) বীরে মাউনার ঘটনায় যতোটা মর্মাহত এবং শোকাহত হন, অন্য কোন ঘটনায় ততোটা হননি। মুখতাছারুছ ছিরাত, শেখ আবদুল্লাহ পৃ.২৬০
৭. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, ৫৮৬, ৫৮৭, ৫৮৮
৮. সুনানে আবু দাউদ শরহে আওনুল মাবুদ ৩য় খন্ড, পৃ. ১১৬, ১১৭
৯. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ১৯০, ১৯১, ১৯২, যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ৭১, ১১০, সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৭৪,৫৭৫
📄 নজদের যুদ্ধ
বনু নাযিরের যুদ্ধে কোন প্রকার ত্যাগ তিতিক্ষা ছাড়াই মুসলমানরা প্রশংসনীয় সাফল্য লাভ করেছেন। এতে মদীনায় মুসলমানদের ক্ষমতা আরো মযবুত ও সংহত হয়। মোনাফেকরা হতাশ হয়ে যায় এবং তাদের মুখ কালো হয়ে ওঠে। তারা প্রকাশ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে কোন কাজ করতে সাহস পাচ্ছিলো না। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেইসব বেদুইনদের খবর নেয়ার জন্যে সচেষ্ট হন, যারা ওহুদের যুদ্ধের পর থেকেই মুসলমানদের কঠিন সমস্যায় ফেলে রেখেছিলো। ইসলামের দাঈ বা প্রচারকদের ওপর অত্যন্ত নৃশংসভাবে হামলা করে তাদের জীবন শেষ করে দিয়েছিলো। পরে তাদের সাহস এতো বেড়ে যায় যে, তারা মদীনায় হামলা করারও চিন্তা করতে থাকে।
বনু নাযিরের যুদ্ধ শেষে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় অবস্থানের অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই খবর পেলেন যে, বনু গাতফানের বনু মাহারেব ও বনু ছালাবা গোত্র মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে বেদুইনদের সমবেত করতে শুরু করেছে। এই খবর পাওয়ার পরপরই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নজদে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। নজদ এর প্রান্তর পেরিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলমানরা বহুদূর অগ্রসর হন। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিলো কঠোর প্রাণ বেদুইনদের মনে ভয় ধরানো, যেন, তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আগের মতো তৎপরতার পুনরাবৃত্তি করতে সাহসী না হয়।
লুটতরাজ, ডাকাতি, রাহাযানি, হঠকারিতা ইত্যাদিতে অভ্যস্ত ও অভিজ্ঞ বেদুইনরা মুসলমানদের এ আকস্মিক অভিযানের খবর শোনামাত্রই ভীত হয়ে পালিয়ে গিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। মুসলমানরা এসব লুটেরাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের পর মদীনার পথে রওয়ানা হন।
যুদ্ধ সম্পর্কে উল্লেখকারীরা এ পর্যায়ে নির্দিষ্ট একটি যুদ্ধের উল্লেখ করেছেন। চতুর্থ হিজরীর রবিউস সানি বা জমাদিউল আউয়ালে নজদের মাটিতে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই 'যুদ্ধকে যাতুর রেকা' যুদ্ধ নামে অভিহিত করা হয়। যতোটা তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় তাতে বোঝা যায় যে, সেই সময় নজদের ভেতরেই একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। কেননা মদীনার অবস্থা ছিলো কিছুটা সেই রকম। আবু সুফিয়ান ওহুদ যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে পরের বছর বদর প্রান্তরে যে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছিলো, মুসলমানরা সেই হুমকির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন। সেই সময় আবার ঘনিয়ে আসছিলো। বেদুইনদেরকে তাদের হঠকারিতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যেতে দিয়ে বদরের মতো অনুরূপ বড় ধরনের কোন যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে মদীনা খালি করে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ ছিলো না। বরং বদরের প্রান্তরে যেরকম ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, সেই রকম যুদ্ধের জন্যে বেরোবার আগে বেদুইনদের বাড়াবাড়ির ওপর আঘাত হানা দরকার, সেই আঘাতের কথা ভেবে ভবিষ্যতে তারা যেন মদীনার ওপর হামলা করার চিন্তা কখনো মনের কিনারায়ও আনতে না পারে।
চতুর্থ হিজরীতে রবিউস সানী বা জমাদিউল আউয়ালে যে যুদ্ধ হয়েছিলো, সেই যুদ্ধ যাতুর রেকা যুদ্ধ নয় বলেই মনে হয়। যতোটা তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে, এতে ওরকম যুদ্ধ সেই সময় হয়নি। কারণ যাতুর রেকা যুদ্ধে হযরত আবু হোরায়রা (রা.) এবং হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা.) উপস্থিত ছিলেন। আবু হোরায়রা (রা.) খয়বর যুদ্ধের অল্প কয়েকদিন আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবু মুসা আশয়ারী (রা.) খয়বরেই আল্লাহর রসূলের খেদমতে হাযির হয়েছিলেন।
৪র্থ হিজরীর বেশ কিছু কাল পরেই যে যাতুর রিকা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, তার দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে এই যে, এতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাওফের নামায ১০ আদায় করেছিলেন। খাওফের নামায সর্বপ্রথম আদায় করা হয় গাযওয়ায়ে আসফানে। আর গাযওয়ায়ে
টিকাঃ
১০. যুদ্ধাবস্থার নামাযকে খওফের নামায বলা হয়। এই নামাযের একটা নিয়ম হচ্ছে এই যে, অর্ধসংখ্যক সৈন্য অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত অবস্থাতেই ইমামের পেছনে নামায পড়বেন, বাকী অর্ধেক সৈন্য অস্ত্র-সজ্জিত অবস্থায় শত্রুদের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন। এক রাকাত নামাযের পর দ্বিতীয় অর্ধেক ইমামের পেছনে চলে আসবেন এবং প্রথম অর্ধেক শত্রুদের প্রতি দৃষ্টি রাখার জন্য সামনে চলে যাবেন। ইমাম দ্বিতীয় রাকাত পুরো করে নেবেন এবং সেনাবাহিনীর উভয় দল নিজ নিজ নামায পালাক্রমে পুরো করে নেবেন। এর সঙ্গে সঙ্গতিশীল এই নামাযের আরো কয়েকটি নিয়ম রয়েছে, যা যুদ্ধের অবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে আদায় করা হয়ে থাকে। বিস্তারিত বিবরণ হাদীসের কেতাবসমূহ দেখুন।
📄 বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ
মদীনার আশেপাশের শত্রুদের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে এবং বেদুইনদের দুর্বৃত্তপনা স্তব্ধ করে দেয়ার পর মুসলমানরা বড়ো দুশমন কোরায়শের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলেন। কেননা খুব দ্রুত বছর শেষ হয়ে যাচ্ছিলো এবং ওহুদের সময়ে নির্ধারণ করা সময়ও খুব দ্রুত এগিয়ে আসছিলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের কর্তব্য ছিলো সেই সময় বেরিয়ে পড়া এবং আবু সুফিয়ান এবং তার কওমের সাথে যুদ্ধ করে হয়ে তাদের বুঝিয়ে দেয়া যে, মুসলমানরা দুর্বল নয়। এছাড়া এই যুদ্ধে হেদায়াতপ্রাপ্ত ও বিশ্ব স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী দলই টিকে থাকার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। পরিস্থিতিও থাকবে তাদেরই অনুকূলে।
চতুর্থ হিজরীর শাবান মাস অর্থাৎ ৬২৬ হিজরীর জানুয়ারী মাসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহার ওপর মদীনার দায়িত্বভার ন্যস্ত করে পরিকল্পিত যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বদর অভিমুখে রওয়ানা হন। তাঁর সাথে ছিলো দেড় হাজার মোজাহেদ এবং দশটি ঘোড়া। সেনাবাহিনীর পতাকা হযরত আলীর (রা.) হাতে প্রদান করা হয়। বদরের প্রান্তরে পৌঁছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলমানরা শত্রুর জন্যে অপেক্ষা করতে থাকেন।
অন্যদিকে আবু সুফিয়ান পঞ্চাশটি সওয়ারীসহ দুই হাজার পৌত্তলিক সৈন্যের এক দল নিয়ে রওয়ানা হয় এবং মক্কা থেকে এক প্রান্তর দূরবর্তী মাররাজ জাহরানের মাজনা নামের বিখ্যাত জলাশয়ের তীরে তাঁবু স্থাপন করে। কিন্তু মক্কা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় থেকেই আবু সুফিয়ানের মন ছিলো ভীতবিহ্বল। ইতিপূর্বে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করে কি লাভ হয়েছে? আবু সুফিয়ান অতীত অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করতে লাগলো। মুসলমানদের বীরত্ব ও ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা ভেবে আবু সুফিয়ান এগোতে সাহস পাচ্ছিলো না। মাররাজ জাহরান নামক জায়গায় পৌছে তার মনোবল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলো। সে মক্কায় ফিরে যাওয়ার বাহানা খুঁজতে শুরু করলো। অবশেষে সঙ্গীদের সে বললো, শোনো সঙ্গীরা যুদ্ধ তো সেই সময় করা যায়, যখন প্রাচুর্য থাকে। ঘাস থাকে প্রচুর। এতে পশুরা মনের সুখে ঘাস খাবে, আর তোমরা তাদের দুধ পান করবে। এবারতো শুষ্ক মৌসুম। কাজেই আমি ফিরে চললাম, তোমরাও ফিরে চলো।
কোরায়শ দলের সৈন্যদের সবাই যেন ভয়ে কাতর হয়ে পড়েছিলো। আবু সুফিয়ানের কথার পর নতুন করে যুক্তি দেখানো কারো পক্ষেই সম্ভব হলো না। মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে কারোই আগ্রহ রইল না। ফলে তারা সবাই ফিরে চললো।
এদিকে মুসলমানরা বদর প্রান্তরে আটদিন যাবত শত্রু সৈন্যের জন্যে অপেক্ষা করেন। এ সময় ব্যবসার জিনিস বিক্রি করে এক দিরহামকে দুই দিরহামে পরিণত করতে লাগলেন। আটদিন পর মনে আনন্দ নিয়ে বীরদর্পে মুসলমানরা মদীনায় ফিরে এলেন।
পরিস্থিতি সেই সময় পুরোপুরি মুসলমানদের অনুকূলে। এই যুদ্ধ প্রতিশ্রুত যুদ্ধ, বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ, বদরের আরেক যুদ্ধ তথা বদরের ছোট যুদ্ধ নামে পরিচিত।
টিকাঃ
১১. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ২০৯, যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ১১২