📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 এ যুদ্ধ সম্পর্কে কোরআনের মূল্যায়ন

📄 এ যুদ্ধ সম্পর্কে কোরআনের মূল্যায়ন


পরবর্তী সময়ে কোরআনে এই যুদ্ধের প্রতিটি দিকের ওপর আলোকপাত করা হয়। পর্যালোচনা করে এমন সব কারণ চিহ্নিত করা হয়, যেসব কারণে মুসলমানদের এতোবড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। কোরআনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এই অভিযানে ঈমানদার এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মতদের কি কি দুর্বলতা ছিলো। এই উম্মতকে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়ার স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এই উম্মতের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যেকার দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়।
এছাড়া পবিত্র কোরআন মোনাফেকদের ভূমিকা উল্লেখ করে তাদের অবস্থা খোলাখুলি প্রকাশ করেছে। তাদের অন্তকরণে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে লুকিয়ে থাকা শত্রুতার প্রকাশ করে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। সহজ সরল মুসলমানদের মধ্যে মোনাফেক এবং তাদের সাথী ইহুদীরা যেসব প্ররোচনা চালিয়েছে তাও তুলে ধরা হয়েছে। এরপর এই যুদ্ধের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই যুদ্ধ সম্পর্কে সূরা আলে ইমরানের ৫০টি আয়াত নাযিল হয়েছে। সর্বাগ্রে যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'স্মরণ করো যখন তুমি তোমার পরিজনবর্গের কাছ হতে প্রত্যুষে বের হয়ে যুদ্ধের জন্যে মোমেনদের ঘাঁটি স্থাপন করছিলে এবং আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।' (সূরা আলে এমরান, আয়াত ১২১)
পরিশেষে এই অভিযানের ফলাফল ও হেকমত সম্পর্কে সুবিন্যস্তভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'অসৎকে সৎ হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছ, আল্লাহ তায়ালা মোমেনদের সেই অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না। অদৃশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদেরকে অবহিত করবার নন, তবে আল্লাহ তাঁর রসূলদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন। 'সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের ওপর ঈমান আন। তোমরা ঈমান আনলে ও তাকওয়া অবলম্বন করে চললে তোমাদের জন্যে মহাপুরস্কার রয়েছে।' (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৭৯)

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 এই যুদ্ধে আল্লাহর সন্নিহিত হেকমত

📄 এই যুদ্ধে আল্লাহর সন্নিহিত হেকমত


আল্লামা ইবনে কাইয়েম উল্লিখিত বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। ওলামায়ে কেরাম বলেন, ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের যে সঙ্কট ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো, এর মধ্যে আল্লাহর হেকমত লুকায়িত ছিলো। যেমন, মুসলমানদের তাদের কাজের মন্দ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া। তীরন্দাজদের নিজেদের অবস্থানস্থলে অবিচল থাকার যে নির্দেশ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছিলেন, তারা তা লংঘন করেছে। এ কারণেই তাদেরকে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। এছাড়া পয়গাম্বরের কাছে সেই সুন্নতের কথা প্রকাশ করাও উদ্দেশ্য যে, প্রথমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হন, এরপর সফলতা লাভ করেন। যদি মুসলমানরা সব সময় জয়লাভ করতে থাকে, তাহলে ঈমানদারদের মধ্যে এমন লোকও প্রবেশ করবে, যারা প্রকৃত ঈমানদার নয়। এর ফলে সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীর মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হবে না। এদিকে যদি সব সময় পরাজয়ের সম্মুখীন তারা হয়, তাহলে আল্লাহর নবীর আবির্ভাবের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে। এ কারণে আল্লাহর হেকমতের কারণেই উভয়রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে সত্য মিথ্যার পার্থক্য নিরূপিত হতে পারে। কেননা মোনাফেকদের নেফাক মুসলমানদের মধ্যে লুকায়িত রয়েছে। এই ঘটনা প্রকাশ এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে মোনাফেকদের পরিচয় পাওয়ার পর মুসলমানরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাদের ঘরের ভেতরেই শত্রু রয়েছে। এতে মুসলমানরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক হন এবং মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, অনেক সময় সাহায্য আসতে দেরী হলে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। মুসলমানরা পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার পর ধৈর্য ধারণ করেন। অথচ মোনাফেকদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে যায় এবং তারা আহাযারি শুরু করে।
একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের জন্যে মর্যাদার বাসস্থান জান্নাতে এমন কিছু শ্রেণী রেখেছেন যেসকল শ্রেণীতে স্বাভাবিক আসনের সওয়ারীর মাধ্যমে উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে বিপদ-মুসিবতের কিছু উপকরণ তৈরী করে রাখা হয়েছে যাতে, ঈমানদাররা সেই মর্যাদার শ্রেণীতে উন্নীত হতে পারেন।
এছাড়া একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, আউলিয়া অর্থাৎ আল্লাহর বন্ধুদের জন্যে উচ্চতর মর্যাদা যে শাহাদাত, সেই মর্যাদা তাদের দান করা।
একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন চান যে, তাঁর দুশমনরা ধ্বংস হোক, এ কারণে তাদের জন্যে ধ্বংসের উপকরণও সৃষ্টি করেছেন। কুফুরী, যুলুম, অত্যাচার এবং আউলিয়ায়ে কেরামকে কষ্ট দেয়ার ক্ষেত্রে তারা সীমাহীন ঔদ্ধত্য এবং বাড়াবাড়ির পরিচয় দিয়েছে। তাদের এসব আমলের পরিণামে ঈমানদারদের ধৈর্য সহিষ্ণুতায় খুশী হয়ে আল্লাহ পাকে ঈমানদারদের পাকসাফ এবং কাফেরদের ধ্বংস করে দিয়েছেন।

টিকাঃ
৮৬. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯৯-১০৮ (সাইয়েদ কুতুব শহীদ তার মহান তাফসীর 'ফী যিলালিল কোরআনে'-ওও এ পর্যায়ে এক হৃদয়গ্রাহী আলোচনা পেশ করেছেন। বাংলা অনুবাদের ৪র্থ খন্ড দেখুন)
৮৭. ফতহুল বারী, ৭ম খন্ড, পৃ. ৩৪৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00