📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ওহুদের যুদ্ধে জয়-পরাজয় সম্পর্কিত পর্যালোচনা

📄 ওহুদের যুদ্ধে জয়-পরাজয় সম্পর্কিত পর্যালোচনা


ওহুদের যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণের পর উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, যা কিছু আলোচিত হয়েছে, তার আলোকে জয় পরাজয় কিভাবে নির্ধারিত হবে? এ যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহের আলোকে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা যাবে কি যে, মুসলমানরা জয়লাভ করেছে অথবা পরাজিত হয়েছে? বাস্তবতাকে অস্বীকার না করলে বলতেই হবে যে, এই যুদ্ধের দ্বিতীয় রাতে কাফেররা প্রাধান্য লাভ করেছিলো এবং যুদ্ধের ময়দান তাদের হাতেই একরকম ছিলো। প্রাণহানিও মুসলমানদের পক্ষেই বেশী হয়েছে এবং ভয়াবহভাবেই তা হয়েছে। মুসলমানদের একটি অংশ নিশ্চিতভাবে পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছেন। সেই সময় যুদ্ধের গতি কাফেরদের পক্ষেই ছিলো। কিন্তু এতো কিছু সত্তেও এমন কিছু ব্যাপার রয়েছে, যার কারণে ওহুদের যুদ্ধে কাফেরদের জয় হয়েছে এমন কথা কিছুতেই বলা যায় না। মক্কায় সৈন্যরা মুসলমানদের শিবির দখল করে নিতে পারেনি, এটা স্পষ্টতই জানা যায়। মদীনার সৈন্যদের এক বিরাট অংশ ভয়াবহ উথাল-পাথাল অবস্থা ও বিশৃঙ্খলা সত্তেও পলায়ন করেনি। তারা সীমাহীন সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সাথে সিপাহসালারে আযম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে সমবেত হয়েছিলেন। মুসলমানদের সংখ্যা এতো কমেনি যে, মক্কায় সৈন্যরা তাদের ধাওয়া করতে সক্ষম হবে। তাছাড়া একজন মুসলমানও কাফেরদের হাতে বন্দী হননি। কাফেররা কোন গনীমতের মালও হস্তগত করতে পারেনি। উপরন্তু কাফেররা মুসলমানদের সাথে তৃতীয় দফা লড়াই করতে প্রস্তুত হয়নি। অথচ মুসলিম বাহিনী তখনো তাদের শিবিরেই অবস্থান করছিলেন। কাফেররা যুদ্ধক্ষেত্রে এক দিন ও অবস্থান করেনি। অথচ সেকালে বিজয়ীরা যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের শিবিরে কমপক্ষে তিন দিন অবস্থান করতো। এটাকে যুদ্ধ জয়ের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নিদর্শন মনে করা হতো। বিজয় সংহত করার প্রমাণ দেয়াই ছিলো এর উদ্দেশ্য। কিন্তু কাফেররা চটপট যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পতিতাড়ি গুটিয়েছিলো। মদীনায় প্রবেশ, অর্থ-সম্পদ লুন্ঠন বা নাগরিকেদের গ্রেফতার করার মতো সাহসও তাদের হয়নি। অথচ ওহুদ প্রান্তর থেকে অল্প দূরেই ছিলো মদীনা নগরী। মদীনায় তখন নিরাপত্তার ব্যবস্থাও তেমন ছিলো না।
মুসলমান যোদ্ধারা সবাই ছিলেন রণক্ষেত্রে। মদীনায় প্রবেশের পথে কাফেররা কোন প্রকার বাধার সম্মুখীনও হতো না।
এসকল কথার সারমর্ম হলো, মক্কার কোরায়শ সৈন্যরা একটি সাময়িক সুযোগ পেয়ে মুসলমানদের হতচকিত করে দিতে পেরেছিলো বটে, কিন্তু মুসলিম বাহিনীকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর সবাইকে হত্যা বা বন্দী করে লাভবান হওয়ার অত্যাবশ্যকীয় সামরিক কৌশল তারা প্রয়োগ করতে পারেনি। পক্ষান্তরে মুসলিম সৈন্যরা সাময়িক ক্ষয়ক্ষতির সকল ধকল কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন। বিজয়ীদেরকে এ ধরনের সাময়িক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে এরকম উদাহরণ অনেক রয়েছে। কাজেই মুসলমানদের সাময়িক কষ্টকর অবস্থার কারণে ওহুদের যুদ্ধে কাফেরদের কিছুতেই বিজয়ী মনে করা যায় না।
যুদ্ধের তৃতীয় দফা শুরু না করে আবু সুফিয়ানের মক্কায় পথে দ্রুত পলায়ন দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, সে আশঙ্কা করছিলো যে, পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে তার সৈন্যদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি অবধারিত। হামরাউল আছাদ যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের ভূমিকায় এরই প্রমাণ পাওয়া যায়।
এমতাবস্থায় ওহুদের যুদ্ধে কোন পক্ষের জয় পরাজয় হয়েছে, এ কথা না বলে একে একটি অমীমাংসিত যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করতে পারি। উভয় পক্ষই নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে লাভবান ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন না করে এবং নিজেদের শিবির শত্রুদের নিয়ন্ত্রণের জন্যে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে না রেখে যুদ্ধ বন্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের যুদ্ধকেই বলা হয় অমীমাংসিত যুদ্ধ। এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তায়ালা রব্বুল আলামীন বলেন, 'শত্রু সম্প্রদায়ের সন্ধানে তোমরা হতোদ্যম হয়ো না। যদি তোমরা যন্ত্রণা পাও, তবে তারাও তোমাদের মতো যন্ত্রণা পায় এবং আল্লাহর কাছে তোমরা যা আশা করো তারা তা করে না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।' (সূরা নেসা, আয়াত ১০৪)
এই আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামীন কষ্ট দেয়া এবং তা অনুভব করার ক্ষেত্রে এক বাহিনীকে অন্য বাহিনীর সাথে তুলনা করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে, উভয় দলই সমান সমান অবস্থায় ছিলো এবং কেউ কারো ওপর জয়লাভ করেনি।
এ যুদ্ধ সম্পর্কে কোরআনের মূল্যায়ন
পরবর্তী সময়ে কোরআনে এই যুদ্ধের প্রতিটি দিকের ওপর আলোকপাত করা হয়। পর্যালোচনা করে এমন সব কারণ চিহ্নিত করা হয়, যেসব কারণে মুসলমানদের এতোবড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। কোরআনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এই অভিযানে ঈমানদার এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মতদের কি কি দুর্বলতা ছিলো। এই উম্মতকে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়ার স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এই উম্মতের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যেকার দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়।
এছাড়া পবিত্র কোরআন মোনাফেকদের ভূমিকা উল্লেখ করে তাদের অবস্থা খোলাখুলি প্রকাশ করেছে। তাদের অন্তকরণে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে লুকিয়ে থাকা শত্রুতার প্রকাশ করে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। সহজ সরল মুসলমানদের মধ্যে মোনাফেক এবং তাদের সাথী ইহুদীরা যেসব প্ররোচনা চালিয়েছে তাও তুলে ধরা হয়েছে। এরপর এই যুদ্ধের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই যুদ্ধ সম্পর্কে সূরা আলে ইমরানের ৫০টি আয়াত নাযিল হয়েছে। সর্বাগ্রে যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'স্মরণ করো যখন তুমি তোমার পরিজনবর্গের কাছ হতে প্রত্যুষে বের হয়ে যুদ্ধের জন্যে মোমেনদের ঘাঁটি স্থাপন করছিলে এবং আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।' (সূরা আলে এমরান, আয়াত ১২১)
পরিশেষে এই অভিযানের ফলাফল ও হেকমত সম্পর্কে সুবিন্যস্তভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'অসৎকে সৎ হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছ, আল্লাহ তায়ালা মোমেনদের সেই অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না। অদৃশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদেরকে অবহিত করবার নন, তবে আল্লাহ তাঁর রসূলদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন। 'সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের ওপর ঈমান আন। তোমরা ঈমান আনলে ও তাকওয়া অবলম্বন করে চললে তোমাদের জন্যে মহাপুরস্কার রয়েছে।' (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৭৯)
এই যুদ্ধে আল্লাহর সন্নিহিত হেকমত আল্লামা ইবনে কাইয়েম উল্লিখিত বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। ওলামায়ে কেরাম বলেন, ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের যে সঙ্কট ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো, এর মধ্যে আল্লাহর হেকমত লুকায়িত ছিলো। যেমন, মুসলমানদের তাদের কাজের মন্দ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া। তীরন্দাজদের নিজেদের অবস্থানস্থলে অবিচল থাকার যে নির্দেশ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছিলেন, তারা তা লংঘন করেছে। এ কারণেই তাদেরকে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। এছাড়া পয়গাম্বরের কাছে সেই সুন্নতের কথা প্রকাশ করাও উদ্দেশ্য যে, প্রথমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হন, এরপর সফলতা লাভ করেন। যদি মুসলমানরা সব সময় জয়লাভ করতে থাকে, তাহলে ঈমানদারদের মধ্যে এমন লোকও প্রবেশ করবে, যারা প্রকৃত ঈমানদার নয়। এর ফলে সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীর মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হবে না। এদিকে যদি সব সময় পরাজয়ের সম্মুখীন তারা হয়, তাহলে আল্লাহর নবীর আবির্ভাবের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে। এ কারণে আল্লাহর হেকমতের কারণেই উভয়রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে সত্য মিথ্যার পার্থক্য নিরূপিত হতে পারে। কেননা মোনাফেকদের নেফাক মুসলমানদের মধ্যে লুকায়িত রয়েছে। এই ঘটনা প্রকাশ এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে মোনাফেকদের পরিচয় পাওয়ার পর মুসলমানরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাদের ঘরের ভেতরেই শত্রু রয়েছে। এতে মুসলমানরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক হন এবং মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, অনেক সময় সাহায্য আসতে দেরী হলে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। মুসলমানরা পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার পর ধৈর্য ধারণ করেন। অথচ মোনাফেকদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে যায় এবং তারা আহাযারি শুরু করে।
একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের জন্যে মর্যাদার বাসস্থান জান্নাতে এমন কিছু শ্রেণী রেখেছেন যেসকল শ্রেণীতে স্বাভাবিক আসনের সওয়ারীর মাধ্যমে উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে বিপদ-মুসিবতের কিছু উপকরণ তৈরী করে রাখা হয়েছে যাতে, ঈমানদাররা সেই মর্যাদার শ্রেণীতে উন্নীত হতে পারেন।
এছাড়া একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, আউলিয়া অর্থাৎ আল্লাহর বন্ধুদের জন্যে উচ্চতর মর্যাদা যে শাহাদাত, সেই মর্যাদা তাদের দান করা।
একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন চান যে, তাঁর দুশমনরা ধ্বংস হোক, এ কারণে তাদের জন্যে ধ্বংসের উপকরণও সৃষ্টি করেছেন। কুফুরী, যুলুম, অত্যাচার এবং আউলিয়ায়ে কেরামকে কষ্ট দেয়ার ক্ষেত্রে তারা সীমাহীন ঔদ্ধত্য এবং বাড়াবাড়ির পরিচয় দিয়েছে। তাদের এসব আমলের পরিণামে ঈমানদারদের ধৈর্য সহিষ্ণুতায় খুশী হয়ে আল্লাহ পাকে ঈমানদারদের পাকসাফ এবং কাফেরদের ধ্বংস করে দিয়েছেন।

টিকাঃ
৮৬. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯৯-১০৮ (সাইয়েদ কুতুব শহীদ তার মহান তাফসীর 'ফী যিলালিল কোরআনে'-ওও এ পর্যায়ে এক হৃদয়গ্রাহী আলোচনা পেশ করেছেন। বাংলা অনুবাদের ৪র্থ খন্ড দেখুন)
৮৭. ফতহুল বারী, ৭ম খন্ড, পৃ. ৩৪৭

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 এ যুদ্ধ সম্পর্কে কোরআনের মূল্যায়ন

📄 এ যুদ্ধ সম্পর্কে কোরআনের মূল্যায়ন


পরবর্তী সময়ে কোরআনে এই যুদ্ধের প্রতিটি দিকের ওপর আলোকপাত করা হয়। পর্যালোচনা করে এমন সব কারণ চিহ্নিত করা হয়, যেসব কারণে মুসলমানদের এতোবড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। কোরআনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এই অভিযানে ঈমানদার এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মতদের কি কি দুর্বলতা ছিলো। এই উম্মতকে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়ার স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এই উম্মতের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যেকার দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়।
এছাড়া পবিত্র কোরআন মোনাফেকদের ভূমিকা উল্লেখ করে তাদের অবস্থা খোলাখুলি প্রকাশ করেছে। তাদের অন্তকরণে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে লুকিয়ে থাকা শত্রুতার প্রকাশ করে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। সহজ সরল মুসলমানদের মধ্যে মোনাফেক এবং তাদের সাথী ইহুদীরা যেসব প্ররোচনা চালিয়েছে তাও তুলে ধরা হয়েছে। এরপর এই যুদ্ধের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই যুদ্ধ সম্পর্কে সূরা আলে ইমরানের ৫০টি আয়াত নাযিল হয়েছে। সর্বাগ্রে যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'স্মরণ করো যখন তুমি তোমার পরিজনবর্গের কাছ হতে প্রত্যুষে বের হয়ে যুদ্ধের জন্যে মোমেনদের ঘাঁটি স্থাপন করছিলে এবং আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।' (সূরা আলে এমরান, আয়াত ১২১)
পরিশেষে এই অভিযানের ফলাফল ও হেকমত সম্পর্কে সুবিন্যস্তভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'অসৎকে সৎ হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছ, আল্লাহ তায়ালা মোমেনদের সেই অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না। অদৃশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদেরকে অবহিত করবার নন, তবে আল্লাহ তাঁর রসূলদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন। 'সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের ওপর ঈমান আন। তোমরা ঈমান আনলে ও তাকওয়া অবলম্বন করে চললে তোমাদের জন্যে মহাপুরস্কার রয়েছে।' (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৭৯)

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 এই যুদ্ধে আল্লাহর সন্নিহিত হেকমত

📄 এই যুদ্ধে আল্লাহর সন্নিহিত হেকমত


আল্লামা ইবনে কাইয়েম উল্লিখিত বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। ওলামায়ে কেরাম বলেন, ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের যে সঙ্কট ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো, এর মধ্যে আল্লাহর হেকমত লুকায়িত ছিলো। যেমন, মুসলমানদের তাদের কাজের মন্দ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া। তীরন্দাজদের নিজেদের অবস্থানস্থলে অবিচল থাকার যে নির্দেশ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছিলেন, তারা তা লংঘন করেছে। এ কারণেই তাদেরকে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। এছাড়া পয়গাম্বরের কাছে সেই সুন্নতের কথা প্রকাশ করাও উদ্দেশ্য যে, প্রথমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হন, এরপর সফলতা লাভ করেন। যদি মুসলমানরা সব সময় জয়লাভ করতে থাকে, তাহলে ঈমানদারদের মধ্যে এমন লোকও প্রবেশ করবে, যারা প্রকৃত ঈমানদার নয়। এর ফলে সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীর মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হবে না। এদিকে যদি সব সময় পরাজয়ের সম্মুখীন তারা হয়, তাহলে আল্লাহর নবীর আবির্ভাবের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে। এ কারণে আল্লাহর হেকমতের কারণেই উভয়রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে সত্য মিথ্যার পার্থক্য নিরূপিত হতে পারে। কেননা মোনাফেকদের নেফাক মুসলমানদের মধ্যে লুকায়িত রয়েছে। এই ঘটনা প্রকাশ এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে মোনাফেকদের পরিচয় পাওয়ার পর মুসলমানরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাদের ঘরের ভেতরেই শত্রু রয়েছে। এতে মুসলমানরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক হন এবং মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, অনেক সময় সাহায্য আসতে দেরী হলে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। মুসলমানরা পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার পর ধৈর্য ধারণ করেন। অথচ মোনাফেকদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে যায় এবং তারা আহাযারি শুরু করে।
একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের জন্যে মর্যাদার বাসস্থান জান্নাতে এমন কিছু শ্রেণী রেখেছেন যেসকল শ্রেণীতে স্বাভাবিক আসনের সওয়ারীর মাধ্যমে উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে বিপদ-মুসিবতের কিছু উপকরণ তৈরী করে রাখা হয়েছে যাতে, ঈমানদাররা সেই মর্যাদার শ্রেণীতে উন্নীত হতে পারেন।
এছাড়া একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, আউলিয়া অর্থাৎ আল্লাহর বন্ধুদের জন্যে উচ্চতর মর্যাদা যে শাহাদাত, সেই মর্যাদা তাদের দান করা।
একটা হেকমত এটাও ছিলো যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন চান যে, তাঁর দুশমনরা ধ্বংস হোক, এ কারণে তাদের জন্যে ধ্বংসের উপকরণও সৃষ্টি করেছেন। কুফুরী, যুলুম, অত্যাচার এবং আউলিয়ায়ে কেরামকে কষ্ট দেয়ার ক্ষেত্রে তারা সীমাহীন ঔদ্ধত্য এবং বাড়াবাড়ির পরিচয় দিয়েছে। তাদের এসব আমলের পরিণামে ঈমানদারদের ধৈর্য সহিষ্ণুতায় খুশী হয়ে আল্লাহ পাকে ঈমানদারদের পাকসাফ এবং কাফেরদের ধ্বংস করে দিয়েছেন।

টিকাঃ
৮৬. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯৯-১০৮ (সাইয়েদ কুতুব শহীদ তার মহান তাফসীর 'ফী যিলালিল কোরআনে'-ওও এ পর্যায়ে এক হৃদয়গ্রাহী আলোচনা পেশ করেছেন। বাংলা অনুবাদের ৪র্থ খন্ড দেখুন)
৮৭. ফতহুল বারী, ৭ম খন্ড, পৃ. ৩৪৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00