📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা

📄 অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা


সেই সময় মুসলমানরা এমন অসাধারণ বীরত্ব ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছিলেন যার উদাহরণ ইতিহাসে আর পাওয়া যায় না। হযরত আবু তালহা (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে বুক টান করে দাঁড়ালেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীর থেকে রক্ষা করতে হযরত আবু তালহা কিছুটা উঁচুতে দাঁড়ালেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন, ওহুদের দিনে সাধারণ মুসলমানরা পরাজিত হয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে না এসে এদিক ওদিক ছুটে পালাচ্ছিলো। হযরত আবু তালহা (রা.) একটি ঢাল নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে প্রতিরোধ ব্যূহ হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ। নিপুণ হাতে তীর নিক্ষেপ করতেন। সেদিন তিনি দু'টি না যেন তিনটি ধনুক ভেঙ্গে ফেলেছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশ দিয়ে কেউ ধনুক নিয়ে যাওয়ার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, এটি আবু তালহা (রা.)-কে দাও। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের প্রতি মাথা উঁচু করে তাকালে হযরত আবু তালহা (রা.) বলেন, আমার মা-বাবা আপনার উপর কোরবান হোন, আপনি মাথা উঁচু করে তাকাবেন না। খোদা না করুন, আপনার পবিত্র দেহে তীর বিদ্ধ হতে পারে। আমার বুক আপনার বুকের সামনে রয়েছে।

হযরত আনাস (রা.) থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু তালহা (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিক থেকে একটি ঢাল দিয়ে প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করেন। হযরত আবু তালহা (রা.) ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ। তিনি তীর নিক্ষেপের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা উঁচু করে দেখতেন যে, তীর কোথায় গিয়ে বিদ্ধ হলো।

হযরত আবু দোজানা (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে এসে তাঁর দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং নিজের পিঠকে ঢাল স্বরূপ পেতে দিলেন, তাঁর পিঠে এসে শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীর বিধছিলো, কিন্তু তিনি একটুও নড়াচড়া করছিলেন না।

হযরত হাতেব ইবনে আবু বলতাআ (রা.) ওতবা ইবনে আবু ওয়াক্কাসের পিছু নিলেন। ওতবা প্রচন্ড শক্তিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেহে তরবারি দিয়ে আঘাত করছিলো। হযরত হাতেব (রা.) ওতবার তরবারি এবং ঘোড়া কেড়ে নিয়ে তাকে হত্যা করলেন। হযরত সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) নিজের ভাই ওতবাকে হত্যা করার সুযোগ খুঁজছিলেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্য হযরত হাতেব (রা.) অর্জন করলেন।

হযরত সহল বিনে হুনাইফও (রা.) বিশিষ্ট তীরন্দাজ ছিলেন। তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে মরণের জন্যে বাইয়াত করেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে বীর বিক্রমে লড়াই করেছিলেন।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও তীর নিক্ষেপ করছিলেন। হযরত কাতাদা ইবনে নো'মান (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ধনুক থেকে বহু তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। এতে ধনুকের একটি কোন্ ভেঙ্গে গিয়েছিলো। সেই ধনুক পরে হযরত কাতাদা ইবনে নো'মান নিয়েছিলেন এবং তাঁর কাছেই ছিলো। সেদিন হযরত কাতাদা (রা.)-এর চোখে এমন আঘাত লেগেছিলো যে, চোখ চেহারার ওপর বেরিয়ে পড়েছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পবিত্র হাতে সেই চোখ ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দিলেন। পরবর্তী সময়ে দু'টি চোখের মধ্যে সেই চোখটিই বেশী সুন্দর দেখাতো। সেই চোখের দৃষ্টি ছিলো অধিক প্রখর।

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) লড়াই করতে করতে মুখে প্রচন্ড আঘাত পেলেন। এতে তাঁর সামনের মাড়ির দাঁত ভেঙ্গে গেলো। তিনি বিশ বাইশটি আঘাত পেয়েছিলেন। পায়েও আঘাত লেগেছিলো। এতে তিনি খোঁড়া হয়ে গিয়েছিলেন।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন, মালেক ইবনে মানানা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারার রক্ত চুষে পরিষ্কার করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, থু থু ফেলে দাও। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ আমি থু থু ফেলব না। এরপর মুখ ফিরিয়ে তিনি লড়াই করতে লাগলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কেউ যদি কোন জান্নাতী মানুষকে দেখতে চায় তবে সে যেন মালেক ইবনে মানানাকে (রা.) দেখে। এরপর তিনি লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।

ওহুদ যুদ্ধে মুসলমান মহিলাদের ভূমিকাও ছিলো অনন্য। মহিলা সাহাবী হযরত উম্মে আম্মারা নুসাইবা বিনতে কা'ব (রা.) অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি কয়েকজন মুসলমানের সাথে লড়াই করতে করতে ইবনে কোম্মার সামনে গিয়ে পৌঁছেন। ইবনে কোম্মা তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলে তাঁর কাঁধে যখম হয়। তিনিও নিজের তলোয়ার দিয়ে ইবনে কোম্মাকে কয়েকবার আঘাত করেন। কিন্তু ইবনে কোম্মা বর্ম পরিহিত থাকার কারণে কোন আঘাত তার দেহে লাগেনি। হযরত উম্মে আম্মারা লড়াই করতে করতে বারোটি আঘাত পান।

হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ইবনে কোম্মা ও অন্যদের আঘাত প্রতিরোধ করেন। তাঁর হাতেই ছিলো ইসলামের পতাকা। শত্রু সৈন্যরা তাঁর ডান হাতে এমন আঘাত করে যে, তাঁর হাত কেটে যায়। তিনি তখন তিনি বাম হাতে ইসলামের পতাকা তুলে ধরেন। কিন্তু শত্রুদের হামলায় বাম হাতও কেটে যায়। তিনি তখন বাহু দিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরেন। সেই অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেণ। তাঁর হত্যাকারী ছিলো আবদুল্লাহ ইবনে কোম্মা। এই দুর্বৃত্ত হযরত মসআব (রা.)-কে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনে করেছিলো। হযরত মসআবের (রা.) চেহারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারার সাথে কিছুটা মিল ছিলো। হযরত মসআবকে (রা.) হত্যা করার পর ইবনে কোম্মা কাফেরদের কাছে গিয়ে চিৎকার করে বলছিলো, মোহাম্মদকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হত্যা করা হয়েছে।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 নবীর শাহাদতের খবর ও প্রতিক্রিয়া

📄 নবীর শাহাদতের খবর ও প্রতিক্রিয়া


ইবনে কোম্মা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে দিলে, মুহূর্তের মধ্যে তা মুসলমান এবং কাফেরদের কাছে পৌঁছে গেলো। এটা ছিলো খুবই নাযুক মূহূর্ত। এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে দূরে যুদ্ধরত সাহাবাদের মনোবল ভেঙ্গে পড়লো। অনেকেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। সাহাবারা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লেন। চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো। তবে একটা লাভ এই হলো যে, কাফেরদের হামলা সাময়িকভাবে থেমে গেলো। কেননা তারা ভাবছিলো তাদের আসল উদ্দেশ্য পুরো হয়ে গেছে। বহুসংখ্যক মোশরেক মুসলমানদের ওপর হামলা বন্ধ করে দিয়ে শোহাদায়ে কেরামের লাশের ওপর মনের পৈশাচিক ঝাল মেটাচ্ছিলো। তারা শহীদদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলছিলো।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ

📄 মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ


হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.)-এর শাহাদাতের পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পতাকা হযরত আলী (রা.)-এর হাতে তুলে দিলেন। হযরত আলী (রা.) বীরত্বের সাথে লড়াই করলেন। সেখানে উপস্থিত অন্য কয়েকজন সাহাবাও তুলনাবিহীন বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং পাল্টা আক্রমণাত্মক যুদ্ধ করলেন। বেশ কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর এ ধরনের সম্ভাবনা দেখা দিলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে অবস্থানরত সাহাবাদের কাছে যাওয়ার জন্যে পথ তৈরী করে নেবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। এ সময়ে প্রথমে হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.) তাঁকে চিনে ফেললেন। আনন্দে চিৎকার করে তিনি বললেন, ওহে মুসলমানরা, তোমাদের জন্যে সুসংবাদ, তিনি হলেন আল্লাহর রসূল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চুপ করার ইঙ্গিত দিলেন, যাতে শত্রুরা তাকে চিনতে না পারে। কিন্তু মুসলমানরা সেই আওয়ায শুনে ফেলেছিলেন, ফলে অল্পক্ষণের মধ্যে সাহাবাগণ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে আসতে শুরু করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যে ত্রিশজন সাহাবা হাযির হলেন।

এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাহাড়ের ঘাঁটিতে অর্থাৎ মুসলমানদের শিবিরের দিকে যেতে শুরু করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিবিরে গিয়ে পৌঁছুলে কাফেরদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যাবে, এ কারণে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গতিপথ রুদ্ধ করতে প্রাণান্তকর প্রয়াস চালালো। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ সাহাবার বেষ্টনীর মধ্যে এগিয়ে চললেন। এ সময়ে ওসমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুগিরা নামের এক দুর্বৃত্ত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অগ্রসর হতে হতে বললো, হয়তো আমি থাকবো অথবা তিনি থাকবেন। কিন্তু বেশীদূর অগ্রসর হতে পারল না। কেননা আবু আমের ফাসেকের খনন করা একটা গর্তের মধ্যে তার ঘোড়া পড়ে গেল। ইত্যবসরে হযরত হারেস (রা.) হুঙ্কার দিয়ে তার সামনে গিয়ে পায়ে তলোয়ারের প্রচন্ড আঘাত করে তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর তার অস্ত্র খুলে নিয়ে হযরত হারেস (রা.) রসূলে করিমের কাছে এসে পৌছুলেন। এরই মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে জাবের নামের এক শত্রু সৈন্য হযরত হারেস (রা.)-এর কাঁধে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলো। কিন্তু মুসলমানরা তাঁকে ধরে ফেললেন। পরক্ষণে মাথায় লাল পট্টি পরিহিত হযরত আবু দোজানা (রা.) আবদুল্লাহ ইবনে জাবেরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তলোয়ারের আঘাতে তার শিরশ্ছেদ করলেন।

কুদরতের কারিশমা দেখুন, এই ধরনের জীবন-মরণ যুদ্ধের মধ্যেও মুসলমানদের চোখে ঘুম পাচ্ছিলো। পবিত্র কোরআনের বাণী অনুযায়ী এটা ছিলো আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত প্রশান্তির নিদর্শন। হযরত আবু তালহা (রা.) বলেন, ওহুদের বিভীষিকাময় যুদ্ধের সময় যাদের ঘুম পাচ্ছিলো আমিও ছিলাম তাদের একজন। ঘুমের ঝোঁকে কয়েকবার আমার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গিয়েছিলো। অবস্থা এমন হয়েছিলো যে, তরবারি পড়ে যাচ্ছিলো, আর আমি তা তুলে নিচ্ছিলাম। একাধিকবার এরকম হয়েছিলো।

মোটকথা প্রাণপণ প্রচেষ্টায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সীমিতসংখ্যক সাহাবা পাহাড়ের ঘাঁটিতে অবস্থিত মুসলমানদের শিবিরে গিয়ে পৌঁছুলেন। এরা অন্য মুসলমানদের জন্যেও পথ করে দিলেন। ফলে অন্য সাহাবারাও সেখানে এসে পৌঁছুলেন। এতে খালেদ ইবনে ওলীদের রণকৌশল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রণকৌশলের সামনে ম্লান হয়ে গেলো।

হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.)-এর শাহাদাতের পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পতাকা হযরত আলী (রা.)-এর হাতে তুলে দিলেন। হযরত আলী (রা.) বীরত্বের সাথে লড়াই করলেন। সেখানে উপস্থিত অন্য কয়েকজন সাহাবাও তুলনাবিহীন বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং পাল্টা আক্রমণাত্মক যুদ্ধ করলেন। বেশ কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর এ ধরনের সম্ভাবনা দেখা দিলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে অবস্থানরত সাহাবাদের কাছে যাওয়ার জন্যে পথ তৈরী করে নেবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। এ সময়ে প্রথমে হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.) তাঁকে চিনে ফেললেন। আনন্দে চিৎকার করে তিনি বললেন, ওহে মুসলমানরা, তোমাদের জন্যে সুসংবাদ, তিনি হলেন আল্লাহর রসূল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চুপ করার ইঙ্গিত দিলেন, যাতে শত্রুরা তাকে চিনতে না পারে। কিন্তু মুসলমানরা সেই আওয়ায শুনে ফেলেছিলেন, ফলে অল্পক্ষণের মধ্যে সাহাবাগণ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে আসতে শুরু করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যে ত্রিশজন সাহাবা হাযির হলেন।
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাহাড়ের ঘাঁটিতে অর্থাৎ মুসলমানদের শিবিরের দিকে যেতে শুরু করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিবিরে গিয়ে পৌঁছুলে কাফেরদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যাবে, এ কারণে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গতিপথ রুদ্ধ করতে প্রাণান্তকর প্রয়াস চালালো। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ সাহাবার বেষ্টনীর মধ্যে এগিয়ে চললেন। এ সময়ে ওসমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুগিরা নামের এক দুর্বৃত্ত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অগ্রসর হতে হতে বললো, হয়তো আমি থাকবো অথবা তিনি থাকবেন। কিন্তু বেশীদূর অগ্রসর হতে পারল না। কেননা আবু আমের ফাসেকের খনন করা একটা গর্তের মধ্যে তার ঘোড়া পড়ে গেল। ইত্যবসরে হযরত হারেস (রা.) হুঙ্কার দিয়ে তার সামনে গিয়ে পায়ে তলোয়ারের প্রচন্ড আঘাত করে তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর তার অস্ত্র খুলে নিয়ে হযরত হারেস (রা.) রসূলে করিমের কাছে এসে পৌছুলেন। এরই মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে জাবের নামের এক শত্রু সৈন্য হযরত হারেস (রা.)-এর কাঁধে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলো। কিন্তু মুসলমানরা তাঁকে ধরে ফেললেন। পরক্ষণে মাথায় লাল পট্টি পরিহিত হযরত আবু দোজানা (রা.) আবদুল্লাহ ইবনে জাবেরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তলোয়ারের আঘাতে তার শিরশ্ছেদ করলেন।
কুদরতের কারিশমা দেখুন, এই ধরনের জীবন-মরণ যুদ্ধের মধ্যেও মুসলমানদের চোখে ঘুম পাচ্ছিলো। পবিত্র কোরআনের বাণী অনুযায়ী এটা ছিলো আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত প্রশান্তির নিদর্শন। হযরত আবু তালহা (রা.) বলেন, ওহুদের বিভীষিকাময় যুদ্ধের সময় যাদের ঘুম পাচ্ছিলো আমিও ছিলাম তাদের একজন। ঘুমের ঝোঁকে কয়েকবার আমার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গিয়েছিলো। অবস্থা এমন হয়েছিলো যে, তরবারি পড়ে যাচ্ছিলো, আর আমি তা তুলে নিচ্ছিলাম। একাধিকবার এরকম হয়েছিলো।
মোটকথা প্রাণপণ প্রচেষ্টায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সীমিতসংখ্যক সাহাবা পাহাড়ের ঘাঁটিতে অবস্থিত মুসলমানদের শিবিরে গিয়ে পৌঁছুলেন। এরা অন্য মুসলমানদের জন্যেও পথ করে দিলেন। ফলে অন্য সাহাবারাও সেখানে এসে পৌঁছুলেন। এতে খালেদ ইবনে ওলীদের রণকৌশল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রণকৌশলের সামনে ম্লান হয়ে গেলো।

টিকাঃ
৪৭. সহীহ বোখারী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা, ৫৮২

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 উবাই ইবনে খালফের হত্যাকান্ড

📄 উবাই ইবনে খালফের হত্যাকান্ড


ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘাঁটিতে পৌঁছার পর উবাই ইবনে খালফ একথা বলে সামনে অগ্রসর হলো যে, মুহাম্মদ কোথায়? হয়তো আমি থাকবো অথবা তিনি থাকবেন। সাহাবারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমরা কি তার ওপর হামলা করবো? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওকে আসতে দাও। এই দুর্বৃত্ত কাছে এলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হারেস (রা.)-এর কাছ থেকে ছোট একটি বর্শা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। এটা ছিলো ঠিক তেমনি, যেমন গায়ে মাছি বসলে উট একটুখানি ঝাঁকুনি দেয় এতে মাছি উড়ে যায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর উবাই-এর মুখোমুখি গেলেন। ইবনে উবাইয়ের শিরস্ত্রাণ এবং বর্মের মাঝামাঝি জায়গায় একটুখানি জায়গা গলার কাছে খালি ছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই স্থান লক্ষ্য করে বর্শা নিক্ষেপ করলেন। এতে উবাই ঘোড়া থেকে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বগোত্রীয়দের কাছে ফিরে গেলো।

তার গলার কাছে সামান্য ছিড়ে গিয়েছিলো। আঘাতও তেমন ছিলো না। রক্তও বেরোয়নি। তবুও সে চিৎকার করে বলতে লাগলো, আল্লাহর শপথ, মোহাম্মদ আমাকে হত্যা করেছেন। লোকেরা তাকে বললো, কি বাজে বকছো, তোমার আঘাত তো তেমন নয়। সামান্য আঁচড় লাগার মতো দেখা যাচ্ছে। উবাই বললো তিনি মক্কায় আমাকে বলেছিলেন, আমি তোমাকে হত্যা করবো। কাজেই আল্লাহর শপথ, আমার প্রাণ চলে যাবে। পরিশেষে আল্লাহর এই চিহ্নিত দুশমন মক্কায় ফেরার পথে ছারফ নামক জায়গায় মারা গেলো। আবুল আসওয়াদ হযরত ওরওয়া (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, উবাই গাভীর মতো চিৎকার করতো আর বলতো, সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, আমি যে যন্ত্রণা অনুভব করছি, সেই কষ্ট ও যন্ত্রণা যদি যিল মাযাযের অধিবাসীরা অনুভব করতো, তাহলে তারা সবাই মরে যেতো।

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘাঁটিতে পৌঁছার পর উবাই ইবনে খালফ একথা বলে সামনে অগ্রসর হলো যে, মুহাম্মদ কোথায়? হয়তো আমি থাকবো অথবা তিনি থাকবেন। সাহাবারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমরা কি তার ওপর হামলা করবো? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওকে আসতে দাও। এই দুর্বৃত্ত কাছে এলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হারেস (রা.)-এর কাছ থেকে ছোট একটি বর্শা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। এটা ছিলো ঠিক তেমনি, যেমন গায়ে মাছি বসলে উট একটুখানি ঝাঁকুনি দেয় এতে মাছি উড়ে যায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর উবাই-এর মুখোমুখি গেলেন। ইবনে উবাইয়ের শিরস্ত্রাণ এবং বর্মের মাঝামাঝি জায়গায় একটুখানি জায়গা গলার কাছে খালি ছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই স্থান লক্ষ্য করে বর্শা নিক্ষেপ করলেন। এতে উবাই ঘোড়া থেকে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বগোত্রীয়দের কাছে ফিরে গেলো।
তার গলার কাছে সামান্য ছিড়ে গিয়েছিলো। আঘাতও তেমন ছিলো না। রক্তও বেরোয়নি। তবুও সে চিৎকার করে বলতে লাগলো, আল্লাহর শপথ, মোহাম্মদ আমাকে হত্যা করেছেন। ৪৮ কাজেই আল্লাহর শপথ, আমার প্রাণ চলে যাবে। পরিশেষে আল্লাহর এই চিহ্নিত দুশমন মক্কায় ফেরার পথে ছারফ নামক জায়গায় মারা গেলো। ৪৯ আবুল আসওয়াদ হযরত ওরওয়া (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, উবাই গাভীর মতো চিৎকার করতো আর বলতো, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, আমি যে যন্ত্রণা অনুভব করছি, সেই কষ্ট ও যন্ত্রণা যদি যিল মাযাযের অধিবাসীরা অনুভব করতো, তাহলে তারা সবাই মরে যেতো। ৫০

টিকাঃ
৪৮. ঘটনা ছিলো এই যে, মক্কায় রসূলে করিমের (স.) দেখা হলে উবাই গর্বভরে বলতো, হে মোহাম্মদ, আমার কাছে আওদ নামের একটি ঘোড়া রয়েছে। ওকে আমি প্রতিদিন তিন সাআ অর্থাৎ সাড়ে সাত কিলো খাবার খাওয়াচ্ছি, সেই ঘোড়ার পিঠে বসে আমি একদিন আপনাকে হত্যা করবো। জবাবে রসূলে করিম (স.) বলতেন, বরং উল্টোও হতে পারে। ইনশাল্লাহ আমিই তোমাকে হত্যা করবো
৪৯. ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা, ৮৪। যাদুল-মায়াদ দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা ৯৭
৫০ মুখতাসার সীরাতুর রসূল। শেখ আবদুল্লাহ পৃষ্ঠা ২৫০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00