📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মুসলমানদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা

📄 মুসলমানদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা


কাফেরদের ঘেরাও-এর মধ্যে পড়ে যাওয়ার পর একদল মুসলমান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। নিজের জীবন রক্ষার চিন্তাও তাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিলো। ফলে তারা রণক্ষেত্র থেকে পলায়নের পথ ধরলো। পেছনে কি হচ্ছে, সে সম্পর্কে তারা কিছু জানতো না। এদের মধ্যেকার কয়েকজন মদীনায় গিয়ে উঠলেন, কয়েকজন পাহাড়ের ওপরে আশ্রয় নিলেন। অন্য একদল পেছনের দিকে গিয়ে কাফেরদের সাথে মিশে গেলেন। কে যে কাফের আর কে যে মুসলমান সেটা চিহ্নিত করা যাচ্ছিলো না। এর ফলে মুসলমানদের হাতে মুসলমানরা নিহত হতে লাগলো। সহীহ বোখারীতে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, ওহুদের দিনে মোশরেকদের পরাজয় হয়েছিলো। এরপর ইবলিস এসে আওয়ায দিলো যে, ওহে আল্লাহর বান্দারা, পেছনে যাও। এতে সামনের কাতারের লোকেরা পেছনের দিকে গেলো এবং পরস্পর সম্পৃক্ত হয়ে পড়লো। হযরত হোযায়ফা (রা.) লক্ষ্য করলেন যে, তাঁর পিতা ইয়ামানের ওপর হামলা করছে। তিনি বললেন, ওহে আল্লাহর বান্দারা, এ হচ্ছে আমার পিতা। কিন্তু আল্লাহর শপথ, লোকেরা তার ওপর থেকে হাত নামিয়ে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত তাকে মেরেই ফেললো। হযরত হোযায়ফা (রা.) তখন বললেন, আল্লাহ রব্বুল আলামীন আপনাদের মাগফেরাত করুন। হযরত ওরওয়া (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, হযরত হোযায়ফা (রা.) সব সময় কল্যাণের ওপর অবিচল ছিলেন। এই অবস্থায় তিনি আল্লাহর সাথে গিয়ে মিলিত হন।।

মোটকথা এই দলের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থা দেখা দেয়। অনেকে ছিলেন বিস্ময়াভিভূত। তারা বুঝতে পারছিলেন না যে, কোনদিকে যাবেন। সেই সময় এক ব্যক্তি উচ্চস্বরে ঘোষণা করলো যে, মোহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে। এতে মুসলমানদের অবশিষ্ট মনোবলও নষ্ট হয়ে গেলো। কোন কোন মুসলমান এ ঘোষণা শোনার পর যুদ্ধ করা বন্ধ করে হতোদ্যম হয়ে হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেললেন। কিছুসংখ্যক মুসলমান এতোটুকু পর্যন্ত ভাবলো যে, মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে বলা হোক যে, আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে আমাদের জন্যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করো।

এই লোকদের কাছ দিয়ে কিছুক্ষণ পর হযরত আনাস ইবনে নযর (রা.) যাচ্ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, বেশ কয়েকজন সাহাবী চুপচাপ বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কার প্রতীক্ষায় রয়েছ? তারা জবাব দিলেন, রসূলুল্লাহকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করা হয়েছে। হযরত আনাস ইবনে নযর বললেন, তাহলে তোমরা বেঁচে থেকে কি করবে? ওঠো, যে কারণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবন দিয়েছেন, সেই একই কারণে তোমরাও জীবন দাও। এরপর বললেন, হে আল্লাহ রব্বুল আলামীন, ওরা অর্থাৎ এই মুসলমানরা যা কিছু করেছে, তা থেকে আমি তোমার দরবারে পানাহ চাই। একথা বলে তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হলেন। সামনে যাওয়ার পর হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) এর সাথে দেখা হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু ওমর কোথায় যাচ্ছেন? হযরত আনাস (রা.) বললেন, জান্নাতের সুবাসের কথা কি আর বলবো। হে সা'দ, ওহুদ পাহাড়ের ওপার থেকে জান্নাতের সুবাস অনুভব করছি। একথা বলার পর হযরত আনাস (রা.) আরো সামনে এগিয়ে গেলেন এবং কাফেরদের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। যুদ্ধশেষে তাঁকে সনাক্ত করাই সম্ভব হচ্ছিলো না। তাঁর বোন তাঁর আঙ্গুলের ফাঁক দেখে তাঁকে সনাক্ত করেছিলো। বর্শা, তীর ও তলোয়ার দিয়ে তাঁর পবিত্র দেহে আশিটি আঘাত করা হয়েছিলো।

হ হযরত ছাবেত ইবনে দাহদাহ (রা.) মুসলমানদের সম্বোধন করে বললেন, মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যদি হত্যা করা হয়েই থাকে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তো যিন্দা রয়েছেন। তিনি তো চিরঞ্জীব। তোমারা নিজেদের দ্বীনের জন্যে লড়ো। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তোমাদেরকে বিজয় ও সাহায্য দান করবেন।

এই আহবান জানানোর পর একদল আনসার জেহাদের জন্যে পুনরায় প্রস্তুত হলেন। হযরত ছাবেত (রা.) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে খালেদ ইবনে ওলীদের বাহিনীর ওপর হামলা করে লড়াই করতে করতে এক সময় খালেদ ইবনে ওলীদের হাতে নিহত হলেন। তাঁকে বর্শার আঘাতে হত্যা করা হয়। তাঁর মতোই তাঁর সঙ্গী আনসাররাও লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন।

একজন মোহাজের সাহাবী রক্তাক্ত একজন আনসার সাহাবীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মোহাজের সাহাবী বললেন, ও ভাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিহত হয়েছেন? আনসারী বললেন, মোহাম্মদ যদি নিহত হয়েই থাকেন, তবে তিনি তো আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন। এখন সেই দ্বীনের হেফাযতের জন্যে লড়াই করা তোমাদের দায়িত্ব।

এ ধরনের সাহস প্রদান এবং উদ্দীপনাময় কথায় ইসলামী বাহিনী চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। তারা অস্ত্র ফেলে দেয়া এবং মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মধ্যস্থতায় কাফের আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাওয়ার পরিবর্তে অস্ত্র তুলে নিলেন। এরপর কাফেরদের দুর্ভেদ্য ঘেরাও ভেদ করে নিজেদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পৌঁছে যাওয়ার পথ তৈরীর চেষ্টা করতে লাগলেন। এমন সময় শোনা গেলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হত্যাকান্ডের খবর একটি ভিত্তিহীন গুজব। এতে মুসলমানদের সাহস ও মনোবল বহুগুণ বেড়ে যায় এবং তারা দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের মাধ্যমে কাফেরদের বেষ্টনী ভেদ করে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের কাছে পৌছে যেতে সক্ষম হয়।

কাফেরদের ঘেরাও-এর মধ্যে পড়ে যাওয়ার পর একদল মুসলমান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। নিজের জীবন রক্ষার চিন্তাও তাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিলো। ফলে তারা রণক্ষেত্র থেকে পলায়নের পথ ধরলো। পেছনে কি হচ্ছে, সে সম্পর্কে তারা কিছু জানতো না। এদের মধ্যেকার কয়েকজন মদীনায় গিয়ে উঠলেন, কয়েকজন পাহাড়ের ওপরে আশ্রয় নিলেন। অন্য একদল পেছনের দিকে গিয়ে কাফেরদের সাথে মিশে গেলেন। কে যে কাফের আর কে যে মুসলমান সেটা চিহ্নিত করা যাচ্ছিলো না। এর ফলে মুসলমানদের হাতে মুসলমানরা নিহত হতে লাগলো। সহীহ বোখারীতে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, ওহুদের দিনে মোশরেকদের পরাজয় হয়েছিলো। এরপর ইবলিস এসে আওয়ায দিলো যে, ওহে আল্লাহর বান্দারা, পেছনে যাও। এতে সামনের কাতারের লোকেরা পেছনের দিকে গেলো এবং পরস্পর সম্পৃক্ত হয়ে পড়লো। হযরত হোযায়ফা (রা.) লক্ষ্য করলেন যে, তাঁর পিতা ইয়ামানের ওপর হামলা করছে। তিনি বললেন, ওহে আল্লাহর বান্দারা, এ হচ্ছে আমার পিতা। কিন্তু আল্লাহর শপথ, লোকেরা তার ওপর থেকে হাত নামিয়ে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত তাকে মেরেই ফেললো। হযরত হোযায়ফা (রা.) তখন বললেন, আল্লাহ রব্বুল আলামীন আপনাদের মাগফেরাত করুন। হযরত ওরওয়া (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, হযরত হোযায়ফা (রা.) সব সময় কল্যাণের ওপর অবিচল ছিলেন। এই অবস্থায় তিনি আল্লাহর সাথে গিয়ে মিলিত হন।।

মোটকথা এই দলের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থা দেখা দেয়। অনেকে ছিলেন বিস্ময়াভিভূত। তারা বুঝতে পারছিলেন না যে, কোনদিকে যাবেন। সেই সময় এক ব্যক্তি উচ্চস্বরে ঘোষণা করলো যে, মোহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে। এতে মুসলমানদের অবশিষ্ট মনোবলও নষ্ট হয়ে গেলো। কোন কোন মুসলমান এ ঘোষণা শোনার পর যুদ্ধ করা বন্ধ করে হতোদ্যম হয়ে হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেললেন। কিছুসংখ্যক মুসলমান এতোটুকু পর্যন্ত ভাবলো যে, মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে বলা হোক যে, আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে আমাদের জন্যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করো।

এই লোকদের কাছ দিয়ে কিছুক্ষণ পর হযরত আনাস ইবনে নযর (রা.) যাচ্ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, বেশ কয়েকজন সাহাবী চুপচাপ বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কার প্রতীক্ষায় রয়েছ? তারা জবাব দিলেন, রসূলুল্লাহকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করা হয়েছে। হযরত আনাস ইবনে নযর বললেন, তাহলে তোমরা বেঁচে থেকে কি করবে? ওঠো, যে কারণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবন দিয়েছেন, সেই একই কারণে তোমরাও জীবন দাও। এরপর বললেন, হে আল্লাহ রব্বুল আলামীন, ওরা অর্থাৎ এই মুসলমানরা যা কিছু করেছে, তা থেকে আমি তোমার দরবারে পানাহ চাই। একথা বলে তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হলেন। সামনে যাওয়ার পর হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) এর সাথে দেখা হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু ওমর কোথায় যাচ্ছেন? হযরত আনাস (রা.) বললেন, জান্নাতের সুবাসের কথা কি আর বলবো। হে সা'দ, ওহুদ পাহাড়ের ওপার থেকে জান্নাতের সুবাস অনুভব করছি। একথা বলার পর হযরত আনাস (রা.) আরো সামনে এগিয়ে গেলেন এবং কাফেরদের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। যুদ্ধশেষে তাঁকে সনাক্ত করাই সম্ভব হচ্ছিলো না। তাঁর বোন তাঁর আঙ্গুলের ফাঁক দেখে তাঁকে সনাক্ত করেছিলো। বর্শা, তীর ও তলোয়ার দিয়ে তাঁর পবিত্র দেহে আশিটি আঘাত করা হয়েছিলো।

হ হযরত ছাবেত ইবনে দাহদাহ (রা.) মুসলমানদের সম্বোধন করে বললেন, মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যদি হত্যা করা হয়েই থাকে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তো যিন্দা রয়েছেন। তিনি তো চিরঞ্জীব। তোমারা নিজেদের দ্বীনের জন্যে লড়ো। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তোমাদেরকে বিজয় ও সাহায্য দান করবেন।

এই আহবান জানানোর পর একদল আনসার জেহাদের জন্যে পুনরায় প্রস্তুত হলেন। হযরত ছাবেত (রা.) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে খালেদ ইবনে ওলীদের বাহিনীর ওপর হামলা করে লড়াই করতে করতে এক সময় খালেদ ইবনে ওলীদের হাতে নিহত হলেন। তাঁকে বর্শার আঘাতে হত্যা করা হয়। তাঁর মতোই তাঁর সঙ্গী আনসাররাও লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন।

একজন মোহাজের সাহাবী রক্তাক্ত একজন আনসার সাহাবীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মোহাজের সাহাবী বললেন, ও ভাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিহত হয়েছেন? আনসারী বললেন, মোহাম্মদ যদি নিহত হয়েই থাকেন, তবে তিনি তো আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন। এখন সেই দ্বীনের হেফাযতের জন্যে লড়াই করা তোমাদের দায়িত্ব।

এ ধরনের সাহস প্রদান এবং উদ্দীপনাময় কথায় ইসলামী বাহিনী চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। তারা অস্ত্র ফেলে দেয়া এবং মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মধ্যস্থতায় কাফের আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাওয়ার পরিবর্তে অস্ত্র তুলে নিলেন। এরপর কাফেরদের দুর্ভেদ্য ঘেরাও ভেদ করে নিজেদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পৌঁছে যাওয়ার পথ তৈরীর চেষ্টা করতে লাগলেন। এমন সময় শোনা গেলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হত্যাকান্ডের খবর একটি ভিত্তিহীন গুজব। এতে মুসলমানদের সাহস ও মনোবল বহুগুণ বেড়ে যায় এবং তারা দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের মাধ্যমে কাফেরদের বেষ্টনী ভেদ করে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের কাছে পৌছে যেতে সক্ষম হয়।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 রসূলুল্লাহ (স.)-এর চারপাশে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ

📄 রসূলুল্লাহ (স.)-এর চারপাশে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ


সাহাবায়ে কেরাম কাফেরদের যাঁতাকলের মত বেষ্টনীতে এসে যখন পিষ্ট হচ্ছিলেন, সেই একই সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আশেপাশেও চলছিলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কাফেরদের বেষ্টনীর শুরুতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চারপাশে মাত্র নয়জন সাহাবী ছিলেন। তিনি যখন মুসলমানদের উদ্দেশ্যে এই আহ্বান জানালেন যে, আমার দিকে এসো, আমি আল্লাহর রসূল। সেই আহ্বান মুসলমানদের আগেই কাফেরদের কানে পৌঁছেছিলো। এতে তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিনে ফেলেছিলো। কেননা সে সময় কাফেররা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছেই ছিলো। ফলে তারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর হামলা করে বসলো। মুসলমানদের সমবেত হওয়ার আগেই তারা প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করলো। সে সময় সেই হামলা প্রতিরোধে নবী করিমের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চারিপাশে বিদ্যমান নয়জন সাহাবার সাথে কাফেরদের সংঘর্ষ হচ্ছিলো, সাহাবাদের সেই সংঘর্ষে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অসামান্য ভালোবাসা বীরত্ব ও সাহসিকতার দুর্লভ পরিচয় ফুটে উঠে।

সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, ওহুদের দিনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক পর্যায়ে ঐ নয়জন সাহাবীর সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন সাতজন আনসার এবং দুইজন ছিলেন মোহাজের। আততায়ীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খুব কাছে পৌছে যাওয়ার পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, কে আছো, ওদেরকে আমার কাছে থেকে প্রতিরোধ করতে পারো? তার জন্যে জান্নাত রয়েছে। অথবা তিনি বলেছিলেন, সে ব্যক্তি জান্নাতে আমার সাথী হবে। এরপর একজন আনসার সাহাবী সামনে অগ্রসর হলেন এবং লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। মোশরেকরা এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আরো কাছে পৌছে গেলো। প্রতিরোধ যুদ্ধে একে একে সাতজন আনসার সাহাবা শাহাদাত বরণ করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সঙ্গের দুইজন মোহাজের কোরায়শী সাহাবাকে বললেন, আমরা আমাদের সঙ্গীদের সাথে সুবিচার করিনি।

উল্লিখিত সাতজন আনসার সাহাবার মধ্যে সর্বশেষ ছিলেন হযরত আম্মারা ইবনে ইয়াযিদ ইবনে সাকান (রা.)। লড়াই করতে করতে তিনিও ক্ষতবিক্ষত হয়ে এক সময় ঢলে পড়লেন। পরক্ষণে রসূলে করিম (স.)-এর কাছে একদল সাহাবা এসে পৌঁছে গেলেন। তারা কাফেরদের হযরত আম্মারার (রা) পেছনে সরিয়ে দিলেন এবং হযরত আম্মারা (রা.)-কে রসূলে করিম (স.)-এর কাছে নিয়ে এলেন। নবী করিম (স.) তাঁকে নিজের উরুর উপর শুইয়ে দিলেন। সেই অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। প্রিয় নবীর (স.) চরণ ছোঁয়া অবস্থায় তার শাহাদাতকে কবির ভাষায় বলা যায় 'তোমার পায়ের ওপর যেন আমার মরণ হয়, এইতো আমার মনের আরযু, আর তো কিছুই নয়।

সেই সময় ছিলো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের চরম সঙ্কটময় মুহূর্ত। আর কাফেরদের জন্যে সেটা ছিলো একটা সুবর্ণ সুযোগ। প্রকৃতপক্ষে কাফেররা সেই সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে কোন অলসতাও করেনি। তারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর সর্বাত্মক হামলা চালিয়ে তাঁকে শেষ করেই দিতে চেয়েছিলো। সেই সময়ে ওতবা ইবনে আবু ওয়াক্কাস রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাথর নিক্ষেপ করেছিলো। সেই আঘাতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর নীচের মাড়ির ডানদিকের 'রোবায়ী দাঁত' ভেঙ্গে গিয়েছিলো। তাঁর নীচের ঠোঁট কেটে গিয়েছিলো। আবদুল্লাহ ইবনে শেহাব যুহরী সামনে অগ্রসর হয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কপালে আঘাত করলো। আবদুল্লাহ ইবনে কামআহ নামের এক দুর্বৃত্ত দুরাচার সামনে এসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাঁধে তলোয়ারের এমন জোরে আঘাত করলো যে পরবর্তীকালে এক মাস পর্যন্ত তিনি সেই আঘাতের যন্ত্রণা অনুভব করেছিলেন। তবে আঘাত তাঁর দেহের লৌহবর্ম কাটতে পারেনি। দুর্বৃত্ত ইবনে কামআহ তরবারি তুলে প্রিয় নবীকে দ্বিতীয়বার আঘাত করলো। এ আঘাত ডান চোখের নীচের হাড়ে লাগলো এবং দু'টি কড়া চেহারায় বিঁধে গেলো। সাথে সাথে সে দুর্বৃত্ত বললো, এই নাও, আমি কামআহ অর্থাৎ ভাঙ্গনকারীর পুত্র। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পবিত্র মুখমন্ডলের রক্ত মুছতে মুছতে বললেন, আল্লাহ তায়ালা তোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলুন।

সহীহ বোখারীতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রোবায়ী দাঁত ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং মাথায় আঘাত করা হয়। সেই সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মুখমন্ডলে প্রবাহিত রক্ত মুছছিলেন আর বলছিলেন, সেই কওম কি করে সফল হতে পারবে, যারা নিজেদের নবীর চেহারা যখমী করে দিয়েছে। তাঁর দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছে। অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের পথে দাওয়াত দিচ্ছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একথা বলার পর আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই আয়াত নাযিল করেন, 'তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদের শাস্তি দেবেন, এ বিষয়ে তোমার করণীয় কিছু নেই, কারণ তারা যালেম।' (আলে ইমরান, আয়াত ১২৮)

তিবরানীর বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিন বলেছিলেন, সেই কওমের পর আল্লাহর কঠিন আযাব হোক, যারা নিজেদের নবীর চেহারা রক্তাক্ত করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, হে আল্লাহ রব্বুল আলামীন, আমার কওমকে ক্ষমা করো, কেননা ওরা জানে না। সহীহ মুসলিম শরীফেও এ বর্ণনা রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারবার বলেছিলেন, হে পরওয়ারদেগার, আমার কওমকে ক্ষমা করে দাও, ওরা জানে না। কাজী আয়াযের আশ শাফা গ্রন্থেও একথা উল্লেখ রয়েছে, হে আল্লাহ তায়ালা, আমার কওমকে হেদায়াত দাও, ওরা জানে না।

নিসন্দেহে কাফেররা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রাণে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো। কিন্তু হযরত তালহা (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) তুলনাবিহীন আত্মত্যাগ, অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার মাধ্যমে কাফেরদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। এরা উভয়ে ছিলেন আরবের সুদক্ষ তীরন্দাজ। তারা তীর নিক্ষেপ করে করে কাফেরদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। হযরত সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাসের (রা.) দক্ষতা ও নৈপুণ্য এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য কোন সাহাবীর ক্ষেত্রে কোন ব্যাপারেই পিতা মাতা উৎসর্গিত অর্থাৎ নিবেদিত হওয়ার কথা বলেননি।

হযরত তালহা (রা.)-কে বীরত্বের বিবরণ নাসাঈ শরীফে বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়। সেই হাদীসে হযরত জাবের (রা.) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর কাফেরদের সেই সময়ের হামলার কথা উল্লেখ করেছেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে মুষ্টিমেয় সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। হযরত জাবের (রা.) বলেন, মোশরেকরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘেরাও করে ফেললে তিনি বলেছিলেন, এদের সাথে লড়াই করার মতো কে আছো? হযরত তালহা (রা.) তখন বললেন, আমি আছি। এরপর হযরত জাবের (রা.) আনসারদের সামনে অগ্রসর হওয়া এবং একে একে শহীদ হওয়ার বিবরণ উল্লেখ করেন। সহীহ মুসলিম শরীফের বরাত দিয়ে ইতিপূর্বে আমরা সেই বিবরণ উল্লেখ করেছি।

হযরত জাবের (রা.) বলেন, আনসাররা শহীদ হওয়ার পর হযরত তালহা (রা.) সামনে এগিয়ে একাই এগারজনের সমান বীরত্বের পরিচয় দেন। এক সময় তাঁর হাতে জনৈক কাফেরের তরবারির আঘাত লাগে। এতে তাঁর একটি আঙ্গুল কেটে যায়। সাথে সাথে তিনি ‘ইস সি’ শব্দ উচ্চারণ করলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি যদি এখন বিসমিল্লাহ শব্দ উচ্চারণ করতে, তাহলে আল্লাহর ফেরেশতা সকলের সামনে তোমাকে উর্ধে তুলে নিয়ে যেতেন। হযরত জাবের (রা.) বলেন, এরপর আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের অন্যদিকে ফিরিয়ে দেন। একাধিক গ্রন্থে হাকেমের বর্ণনায় রয়েছে, ওহুদের দিনে তালহার দেহে উনচল্লিশ বা পঁয়ত্রিশটি আঘাত লেগেছিলো। তাঁর শাহাদাত আঙ্গুলসহ দু’টি আঙ্গুল নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিলো।

ইমাম বোখারী কায়েস ইবনে আবু হাজেম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, আমি লক্ষ্য করলাম, তালহা (রা.)-এর হাত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলো। এই হাত দ্বারা ওহুদের দিনে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রক্ষা করেছিলেন। তিরমিযি শরীফে বর্ণনা করা হয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিন বলেছিলেন, যে ব্যক্তি কোন শহীদকে ভূপৃষ্ঠে চলাফেরা করা অবস্থায় দেখতে চায়, সে যেন তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহকে (রা.) দেখে।

আবু দাউদ তায়ালেসী হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ওহুদের যুদ্ধের প্রসঙ্গ আলোচনার সময়ে বলতেন, সেদিনের যুদ্ধের একক কৃতিত্ব ছিলো তালহার। অর্থাৎ সেই যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনিই সর্বাধিক পালন করেন। হযরত আবু বকর (রা.) হযরত তালহা (রা.) সম্পর্কে একথাও বলেছেন, ‘হে তালহা, তোমার জন্যে জান্নাতসমূহ ওয়াজেব হয়ে গেছে। সেখানে তোমার নিবাসে রয়েছে অগনন ডাগর চোখের হুর।’

সেই সঙ্কট সন্ধিক্ষণে আল্লাহ রব্বুল আলামীন গায়েব থেকে সাহায্য প্রেরণ করেন। হযরত সা’দ (রা.) বলেন, আমি ওহুদের দিনে লক্ষ্য করেছি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাদা পোশাক পরিহিত দু’জন লোক। এরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষে বীরত্বের সাথে লড়াই করছিলেন। এর আগে বা পরে সেই দুইজন লোককে আমি কখনো দেখিনি। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, ওরা দু’জন ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আ.) ও হযরত মিকাইল (আ.)।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 নবীর পাশে সাহাবাদের সমবেত হওয়া

📄 নবীর পাশে সাহাবাদের সমবেত হওয়া


উল্লিখিত দুর্ঘটনা আকস্মিকভাবে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটে গিয়েছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্বাচিত সাহাবারা, যাঁরা যুদ্ধের শুরু থেকেই প্রথম কাতারে গিয়ে যুদ্ধ করছিলেন তাঁরা পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহ্বান শোনার অল্পক্ষণের মধ্যেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছুটে এসেছিলেন। তাঁরা চেষ্টা করছিলেন যাতে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কিন্তু এসব সাহাবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে পৌছার আগেই তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। ততক্ষণে ছয়জন আনসার সাহাবা শহীদ হয়ে গেছেন, সপ্তম আনসার সাহাবা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে ঢলে পড়েছেন। হযরত সা'দ (রা.) এবং হযরত তালহা (রা.) প্রাণপণ প্রচেষ্টায় কাফেরদের হামলা থেকে প্রিয় নবীকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রক্ষার জন্যে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সাহাবারা এসেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে কাফেরদের সর্বাত্মক হামলার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিচ্ছিলেন। তাঁরা সেই সময় অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সেই সময় প্রথমে ছুটে এসেছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।

ইবনে হাব্বান তাঁর সহীহ গ্রন্থে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, ওহুদের দিনে সকল সাহাবা নবী সঃ)-এর কাছ থেকে চলে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ তাঁর দেহরক্ষীরা ছাড়া অন্য সবাই যুদ্ধ করতে সামনের কাতারে চলে গিয়েছিলেন। কাফেরদের ঘেরাও-এর দুর্ঘটনার পর সর্বপ্রথম আমিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে দেখি একজন লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রক্ষার জন্যে লড়াই করছেন। আমি মনে মনে বললাম, আপনার নাম তো তালহা (রা.)। আপনার ওপর আমার মা বাবা কোরবান হোক। এমন সময় হযরত আবু ওবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) দ্রুত ছুটে আমার কাছে এসে পৌঁছুলেন। আমরা উভয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে গেলাম। আমরা লক্ষ্য করলাম, হযরত তালহা (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে পড়ে আছেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের ভাইকে তোলো। সে নিজের জন্যে জান্নাত ওয়াজেব করে নিয়েছে। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমরা পৌছে আরো দেখলাম, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তীক্ষ্ণ কড়া তাঁর চোখের নীচে চেহারায় গেঁথে গেছে। আমি সেগুলো বের করতে চাইলাম। আবু ওবায়দা (রা.) বললেন, আল্লাহর নামে শপথ নিচ্ছি ওগুলো আমাকে বের করতে দিন। এরপর তিনি দাঁত দিয়ে একটি কড়া কামড়ে ধরে ধীরে ধীরে বের করতে লাগলেন যাতে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যথা কম পান। শেষ পর্যন্ত একটি কড়া বের করলেন। এতে হযরত আবু ওবায়দার নীচের মাড়ির একটি দাঁত পড়ে গেলো। দ্বিতীয় কড়াটি আমি বের করতে চাইলাম। কিন্তু আবু ওবায়দা (রা.) বললেন, আবু বকর (রা.) আপনাকে আল্লাহর শপথ দিচ্ছি, আমাকে বের করতে দিন। এরপর তিনি দ্বিতীয় কড়াটিও বের করলেন। এতে তাঁর নীচের মাড়ির আরেকটি দাঁত ভেঙ্গে গেলো। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের ভাই তালহাকে সামলাও। সে নিজের জন্যে জান্নাত ওয়াজেব করে নিয়েছে। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, এরপর আমরা হযরত তালহা (রা.)-এর প্রতি মনোনিবেশ করলাম। তার দেহে আশিটির বেশী আঘাত লেগেছিলো।

হযরত তালহা (রা.) সেদিন কি রূপ বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছিলেন তা এতেই বোঝা যায়।

সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিবেদিত প্রাণ সাহাবাদের একটি দল এসে পৌছুলেন। তাঁদের নাম হচ্ছে, হযরত আবু দোজানা, হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের, হযরত আলী ইবনে আবু তালেব, হযরত সহল ইবনে হুনাইফ, হযরত মালেক ইবনে সানান (হযরত আবু সাঈদ খুদরী (র.)-এর পিতা) হযরত উম্মে আম্মারা নুসাইবা বিনতে কা'ব মাজেনা, হযরত কাতাদা ইবনে নো'মান, হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব, হযরত হাতেব ইবনে আবু বলতাআ এবং হযরত আবু তালহা (রা.)।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মুসলমানদের ওপর শত্রুদের প্রচন্ড আঘাত

📄 মুসলমানদের ওপর শত্রুদের প্রচন্ড আঘাত


এদিকে শত্রুদের সংখ্যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চারদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। ফলে তাদের হামলাও বাড়ছিলো। এক পর্যায়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গর্তের ভেতর পড়ে গিয়ে হাঁটুতে আঘাত পেলেন। আবু আমের ফাসেক শয়তানী প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে মুসলমানদের ক্ষতি করতে এ ধরনের কয়েকটি গর্ত খনন করেছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গর্তে পড়ে যাওয়ার পর হযরত আলী (রা.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত ধরলেন এবং হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জড়িয়ে ধরে উপরে উঠিয়ে নিলেন।

নাফে ইবনে জাবির বলেন, আমি একজন মোহাজের সাহাবীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলছিলেন, ওহুদের যুদ্ধে আমি হাযির ছিলাম। আমি লক্ষ্য করলাম, চারদিক থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর তীর নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। তিনি তীরের মাঝখানে রয়েছেন। কিন্তু নিক্ষিপ্ত সেই সব তীর সাহাবারা গ্রহণ করছিলেন। আমি আরো লক্ষ্য করলাম যে, আবদুল্লাহ ইবনে শেহাব যুহরী বলছিলো, বলো, মোহাম্মদ কোথায়? এবার আমি থাকবো অথবা তিনি থাকবেন। অথচ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পাশেই ছিলেন। তাঁর কাছে সে সময় অন্য কেউ ছিলো না। ইবনে শেহাব এক সময় সামনে এগিয়ে গেলো। এতে সফওয়ান তাকে ধমক দিলো। জবাবে ইবনে শেহাব বললো, আল্লাহর শপথ, আমি তাকে দেখতে পাইনি। আমাদের দৃষ্টি থেকে তাকে হেফাযত করা হয়েছে। এরপর আমরা চারজন প্রতিজ্ঞা করে বেরুলাম যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করবো (নাউযুবিল্লাহ)। কিন্তু তাঁর ধারে কাছেও পৌছুতে পারলাম না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00