📄 তীরন্দাজদের আত্মঘাতী ভুল
স্বল্পসংখ্যক মুসলমান মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে যখন ইতিহাসের পাতায় এক বৈশিষ্টপূর্ণ বিজয় চিহ্নিত করছিলেন, ঠিক তখনই তীরন্দাজদের অধিকাংশ ব্যক্তি এক ভয়াবহ ভুল করে ফেললেন। অথচ মুসলমানদের সাফল্য এই যুদ্ধে বদরের যুদ্ধের চেয়ে কোন অংশে কম ছিলো না। কিন্তু তীরন্দাজদের এক ভয়াবহ ভুলে যুদ্ধের চিত্রই পরিবর্তিত হয়ে গেলো। মুসলমানরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হলেন। স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাহাদাত বরণ থেকে অল্পের জন্যে রক্ষা পেলেন। এই ভুলের কারণে বদরের যুদ্ধে অর্জিত মুসলমানদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়ে পড়েছিলো।
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজয় ও পরাজয় উভয় অবস্থাতেই তীরন্দাজদের স্বস্থানে অটল ও অবিচল থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কঠোর নির্দেশ সত্তেও অন্য মুসলমানদের গনীমতের মালামাল সংগ্রহ করতে দেখে তীরন্দাজরা লোভ সামলাতে পারল না। একে অন্যকে বললেন, গনীমত, গনীমত। তোমাদের সঙ্গীরা জয়ী হয়েছে, এখন আর কিসের প্রতীক্ষা।
তীরন্দাজদের মধ্যে থেকে এ ধরনের আওয়ায ওঠার পর তাদের কমান্ডার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) তাদেরকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, তোমরা কি ভুলে গেছো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের কি আদেশ দিয়েছেন? কিন্তু অধিকাংশ তীরন্দাজ হযরত আবদুল্লাহর (রা.) কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। তারা বললেন, আল্লাহর শপথ, আমরাও ওদের কাছে যাবো এবং কিছু গনীমতের কিছু মাল অবশ্যই সংগ্রহ করবো।
এরপর চল্লিশজন তীরন্দাজ নিজেদের দায়িত্ব উপেক্ষা করে গনীমতের মাল সংগ্রহ শুরু করলেন। আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাবের (রা.) এবং তাঁর নয় জন সঙ্গী পাহারায়ই নিযুক্ত রইলেন। তাঁরা দৃঢ় সংকল্পের সাথে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁরা বলছিলেন, এখান থেকে যাওয়ার জন্যে যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তখনই যাবো অথবা নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করবো।
টিকাঃ
১৬. সহীহ বোখারীতে একথা হযরত বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, পৃষ্ঠা ৪২৬ দেখুন,
📄 শত্রুদের নিয়ন্ত্রণে মুসলিম সেনাদল
খালেদ ইবনে ওলীদ এই গিরিপথে এসে তিনবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিলো। এবার এ সুবর্ণ সুযোগ সে হাতছাড়া করলো না। অল্পক্ষণের মধ্যে খালেদ আবদুল্লাহ ইবনে জাবের (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীদের নিহত করে মুসলমানদের ওপর পেছনের দিক থেকে হামলা করলো। খালেদ ইবনে ওলীদের সঙ্গীরা উচ্চস্বরে শ্লোগান দিলো। এতে পরাজিত কাফেররা যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হলো এবং মুসলমানদের ওপর পুনোরোদ্যামে হামলা চালালো। এদিকে বনু হারেস গোত্রের আসরাহ বিনতে আলকামা নামের এক মহিলা কাফেরদের ধুলি ধুসরিত পতাকা উচ্চে তুলে ধরলো। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাফেররা তার চারদিকে জড়ো হতে শুরু করলো। একে অন্যকে ডেকে সজাগ করলো। ফলে অল্পক্ষণের মধ্যেই কাফেররা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই শুরু করলো। মুসলমানরা তখন সামনে এবং পেছনে উভয় দিক থেকেই ঘেরাও-এর মধ্যে পড়ে গেলো। মনে হয় যেন, যাঁতাকলের মাঝখানে তাদের অবস্থান।
📄 আল্লাহর রসূলের কঠোর সিদ্ধান্ত ও সাহসী পদক্ষেপ
সেই সঙ্কট সন্ধিক্ষণে মাত্র নয় জন সাহাবী নবী হযরত রসূল শাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছিলেন। তারা সাহাবাদের শৌর্যবীর্য এবং শত্রুদের তৎপরতা লক্ষ্য করছিলেন। হঠাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খালেদ ইবনে ওলীদের সওয়ারী দেখতে পেলেন। এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দু'টি পথ খোলা ছিলো। নয়জন সঙ্গীসহ নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া এবং শত্রুদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সাহাবাদের তাদের ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়া। অথবা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিচ্ছিন্ন সাহাবাদের ডেকে একত্রিত করে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরী করে কাফেরদের ঘেরাও ছাড়িয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় যাওয়ার পথ করে নেয়া।
পরীক্ষার এহেন কঠিন সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তুলনাবিহীন বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। জীবন রক্ষার জন্যে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে সাহাবাদের প্রাণ রক্ষার সিদ্ধান্ত নিলেন।
খালেদ ইবনে ওলীদের সওয়ারী এবং তার সঙ্গীদের দেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের উচ্চস্বরে ডেকে বললেন, হে আল্লাহর বান্দারা, এদিকে আসো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন এই আওয়ায মুসলমানদের কানে যাওয়ার আগে কাফেরদের কানে গিয়ে পৌঁছুবে। হলোও তাই, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আওয়ায শুনে কাফেররা বুঝতে পারলো যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানেই রয়েছেন। এটা বোঝার পর একদল কাফের মুসলমানদের আগেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছে গেলো। অন্যান্য কাফেররা দ্রুত মুসলমানদের ঘেরাও করতে লাগলো। এবার আমরা উভয় বাহিনীর তৎপরতা সম্পর্কে পৃথক পৃথকভাবে আলোকপাত করবো।
📄 মুসলমানদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা
কাফেরদের ঘেরাও-এর মধ্যে পড়ে যাওয়ার পর একদল মুসলমান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। নিজের জীবন রক্ষার চিন্তাও তাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিলো। ফলে তারা রণক্ষেত্র থেকে পলায়নের পথ ধরলো। পেছনে কি হচ্ছে, সে সম্পর্কে তারা কিছু জানতো না। এদের মধ্যেকার কয়েকজন মদীনায় গিয়ে উঠলেন, কয়েকজন পাহাড়ের ওপরে আশ্রয় নিলেন। অন্য একদল পেছনের দিকে গিয়ে কাফেরদের সাথে মিশে গেলেন। কে যে কাফের আর কে যে মুসলমান সেটা চিহ্নিত করা যাচ্ছিলো না। এর ফলে মুসলমানদের হাতে মুসলমানরা নিহত হতে লাগলো। সহীহ বোখারীতে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, ওহুদের দিনে মোশরেকদের পরাজয় হয়েছিলো। এরপর ইবলিস এসে আওয়ায দিলো যে, ওহে আল্লাহর বান্দারা, পেছনে যাও। এতে সামনের কাতারের লোকেরা পেছনের দিকে গেলো এবং পরস্পর সম্পৃক্ত হয়ে পড়লো। হযরত হোযায়ফা (রা.) লক্ষ্য করলেন যে, তাঁর পিতা ইয়ামানের ওপর হামলা করছে। তিনি বললেন, ওহে আল্লাহর বান্দারা, এ হচ্ছে আমার পিতা। কিন্তু আল্লাহর শপথ, লোকেরা তার ওপর থেকে হাত নামিয়ে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত তাকে মেরেই ফেললো। হযরত হোযায়ফা (রা.) তখন বললেন, আল্লাহ রব্বুল আলামীন আপনাদের মাগফেরাত করুন। হযরত ওরওয়া (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, হযরত হোযায়ফা (রা.) সব সময় কল্যাণের ওপর অবিচল ছিলেন। এই অবস্থায় তিনি আল্লাহর সাথে গিয়ে মিলিত হন।।
মোটকথা এই দলের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থা দেখা দেয়। অনেকে ছিলেন বিস্ময়াভিভূত। তারা বুঝতে পারছিলেন না যে, কোনদিকে যাবেন। সেই সময় এক ব্যক্তি উচ্চস্বরে ঘোষণা করলো যে, মোহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে। এতে মুসলমানদের অবশিষ্ট মনোবলও নষ্ট হয়ে গেলো। কোন কোন মুসলমান এ ঘোষণা শোনার পর যুদ্ধ করা বন্ধ করে হতোদ্যম হয়ে হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেললেন। কিছুসংখ্যক মুসলমান এতোটুকু পর্যন্ত ভাবলো যে, মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে বলা হোক যে, আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে আমাদের জন্যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করো।
এই লোকদের কাছ দিয়ে কিছুক্ষণ পর হযরত আনাস ইবনে নযর (রা.) যাচ্ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, বেশ কয়েকজন সাহাবী চুপচাপ বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কার প্রতীক্ষায় রয়েছ? তারা জবাব দিলেন, রসূলুল্লাহকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করা হয়েছে। হযরত আনাস ইবনে নযর বললেন, তাহলে তোমরা বেঁচে থেকে কি করবে? ওঠো, যে কারণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবন দিয়েছেন, সেই একই কারণে তোমরাও জীবন দাও। এরপর বললেন, হে আল্লাহ রব্বুল আলামীন, ওরা অর্থাৎ এই মুসলমানরা যা কিছু করেছে, তা থেকে আমি তোমার দরবারে পানাহ চাই। একথা বলে তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হলেন। সামনে যাওয়ার পর হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) এর সাথে দেখা হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু ওমর কোথায় যাচ্ছেন? হযরত আনাস (রা.) বললেন, জান্নাতের সুবাসের কথা কি আর বলবো। হে সা'দ, ওহুদ পাহাড়ের ওপার থেকে জান্নাতের সুবাস অনুভব করছি। একথা বলার পর হযরত আনাস (রা.) আরো সামনে এগিয়ে গেলেন এবং কাফেরদের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। যুদ্ধশেষে তাঁকে সনাক্ত করাই সম্ভব হচ্ছিলো না। তাঁর বোন তাঁর আঙ্গুলের ফাঁক দেখে তাঁকে সনাক্ত করেছিলো। বর্শা, তীর ও তলোয়ার দিয়ে তাঁর পবিত্র দেহে আশিটি আঘাত করা হয়েছিলো।
হ হযরত ছাবেত ইবনে দাহদাহ (রা.) মুসলমানদের সম্বোধন করে বললেন, মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যদি হত্যা করা হয়েই থাকে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তো যিন্দা রয়েছেন। তিনি তো চিরঞ্জীব। তোমারা নিজেদের দ্বীনের জন্যে লড়ো। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তোমাদেরকে বিজয় ও সাহায্য দান করবেন।
এই আহবান জানানোর পর একদল আনসার জেহাদের জন্যে পুনরায় প্রস্তুত হলেন। হযরত ছাবেত (রা.) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে খালেদ ইবনে ওলীদের বাহিনীর ওপর হামলা করে লড়াই করতে করতে এক সময় খালেদ ইবনে ওলীদের হাতে নিহত হলেন। তাঁকে বর্শার আঘাতে হত্যা করা হয়। তাঁর মতোই তাঁর সঙ্গী আনসাররাও লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন।
একজন মোহাজের সাহাবী রক্তাক্ত একজন আনসার সাহাবীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মোহাজের সাহাবী বললেন, ও ভাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিহত হয়েছেন? আনসারী বললেন, মোহাম্মদ যদি নিহত হয়েই থাকেন, তবে তিনি তো আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন। এখন সেই দ্বীনের হেফাযতের জন্যে লড়াই করা তোমাদের দায়িত্ব।
এ ধরনের সাহস প্রদান এবং উদ্দীপনাময় কথায় ইসলামী বাহিনী চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। তারা অস্ত্র ফেলে দেয়া এবং মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মধ্যস্থতায় কাফের আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাওয়ার পরিবর্তে অস্ত্র তুলে নিলেন। এরপর কাফেরদের দুর্ভেদ্য ঘেরাও ভেদ করে নিজেদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পৌঁছে যাওয়ার পথ তৈরীর চেষ্টা করতে লাগলেন। এমন সময় শোনা গেলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হত্যাকান্ডের খবর একটি ভিত্তিহীন গুজব। এতে মুসলমানদের সাহস ও মনোবল বহুগুণ বেড়ে যায় এবং তারা দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের মাধ্যমে কাফেরদের বেষ্টনী ভেদ করে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের কাছে পৌছে যেতে সক্ষম হয়।
কাফেরদের ঘেরাও-এর মধ্যে পড়ে যাওয়ার পর একদল মুসলমান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। নিজের জীবন রক্ষার চিন্তাও তাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিলো। ফলে তারা রণক্ষেত্র থেকে পলায়নের পথ ধরলো। পেছনে কি হচ্ছে, সে সম্পর্কে তারা কিছু জানতো না। এদের মধ্যেকার কয়েকজন মদীনায় গিয়ে উঠলেন, কয়েকজন পাহাড়ের ওপরে আশ্রয় নিলেন। অন্য একদল পেছনের দিকে গিয়ে কাফেরদের সাথে মিশে গেলেন। কে যে কাফের আর কে যে মুসলমান সেটা চিহ্নিত করা যাচ্ছিলো না। এর ফলে মুসলমানদের হাতে মুসলমানরা নিহত হতে লাগলো। সহীহ বোখারীতে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, ওহুদের দিনে মোশরেকদের পরাজয় হয়েছিলো। এরপর ইবলিস এসে আওয়ায দিলো যে, ওহে আল্লাহর বান্দারা, পেছনে যাও। এতে সামনের কাতারের লোকেরা পেছনের দিকে গেলো এবং পরস্পর সম্পৃক্ত হয়ে পড়লো। হযরত হোযায়ফা (রা.) লক্ষ্য করলেন যে, তাঁর পিতা ইয়ামানের ওপর হামলা করছে। তিনি বললেন, ওহে আল্লাহর বান্দারা, এ হচ্ছে আমার পিতা। কিন্তু আল্লাহর শপথ, লোকেরা তার ওপর থেকে হাত নামিয়ে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত তাকে মেরেই ফেললো। হযরত হোযায়ফা (রা.) তখন বললেন, আল্লাহ রব্বুল আলামীন আপনাদের মাগফেরাত করুন। হযরত ওরওয়া (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, হযরত হোযায়ফা (রা.) সব সময় কল্যাণের ওপর অবিচল ছিলেন। এই অবস্থায় তিনি আল্লাহর সাথে গিয়ে মিলিত হন।।
মোটকথা এই দলের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থা দেখা দেয়। অনেকে ছিলেন বিস্ময়াভিভূত। তারা বুঝতে পারছিলেন না যে, কোনদিকে যাবেন। সেই সময় এক ব্যক্তি উচ্চস্বরে ঘোষণা করলো যে, মোহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে। এতে মুসলমানদের অবশিষ্ট মনোবলও নষ্ট হয়ে গেলো। কোন কোন মুসলমান এ ঘোষণা শোনার পর যুদ্ধ করা বন্ধ করে হতোদ্যম হয়ে হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেললেন। কিছুসংখ্যক মুসলমান এতোটুকু পর্যন্ত ভাবলো যে, মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে বলা হোক যে, আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে আমাদের জন্যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করো।
এই লোকদের কাছ দিয়ে কিছুক্ষণ পর হযরত আনাস ইবনে নযর (রা.) যাচ্ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, বেশ কয়েকজন সাহাবী চুপচাপ বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কার প্রতীক্ষায় রয়েছ? তারা জবাব দিলেন, রসূলুল্লাহকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করা হয়েছে। হযরত আনাস ইবনে নযর বললেন, তাহলে তোমরা বেঁচে থেকে কি করবে? ওঠো, যে কারণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবন দিয়েছেন, সেই একই কারণে তোমরাও জীবন দাও। এরপর বললেন, হে আল্লাহ রব্বুল আলামীন, ওরা অর্থাৎ এই মুসলমানরা যা কিছু করেছে, তা থেকে আমি তোমার দরবারে পানাহ চাই। একথা বলে তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হলেন। সামনে যাওয়ার পর হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) এর সাথে দেখা হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু ওমর কোথায় যাচ্ছেন? হযরত আনাস (রা.) বললেন, জান্নাতের সুবাসের কথা কি আর বলবো। হে সা'দ, ওহুদ পাহাড়ের ওপার থেকে জান্নাতের সুবাস অনুভব করছি। একথা বলার পর হযরত আনাস (রা.) আরো সামনে এগিয়ে গেলেন এবং কাফেরদের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। যুদ্ধশেষে তাঁকে সনাক্ত করাই সম্ভব হচ্ছিলো না। তাঁর বোন তাঁর আঙ্গুলের ফাঁক দেখে তাঁকে সনাক্ত করেছিলো। বর্শা, তীর ও তলোয়ার দিয়ে তাঁর পবিত্র দেহে আশিটি আঘাত করা হয়েছিলো।
হ হযরত ছাবেত ইবনে দাহদাহ (রা.) মুসলমানদের সম্বোধন করে বললেন, মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যদি হত্যা করা হয়েই থাকে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তো যিন্দা রয়েছেন। তিনি তো চিরঞ্জীব। তোমারা নিজেদের দ্বীনের জন্যে লড়ো। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তোমাদেরকে বিজয় ও সাহায্য দান করবেন।
এই আহবান জানানোর পর একদল আনসার জেহাদের জন্যে পুনরায় প্রস্তুত হলেন। হযরত ছাবেত (রা.) তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে খালেদ ইবনে ওলীদের বাহিনীর ওপর হামলা করে লড়াই করতে করতে এক সময় খালেদ ইবনে ওলীদের হাতে নিহত হলেন। তাঁকে বর্শার আঘাতে হত্যা করা হয়। তাঁর মতোই তাঁর সঙ্গী আনসাররাও লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন।
একজন মোহাজের সাহাবী রক্তাক্ত একজন আনসার সাহাবীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মোহাজের সাহাবী বললেন, ও ভাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিহত হয়েছেন? আনসারী বললেন, মোহাম্মদ যদি নিহত হয়েই থাকেন, তবে তিনি তো আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন। এখন সেই দ্বীনের হেফাযতের জন্যে লড়াই করা তোমাদের দায়িত্ব।
এ ধরনের সাহস প্রদান এবং উদ্দীপনাময় কথায় ইসলামী বাহিনী চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। তারা অস্ত্র ফেলে দেয়া এবং মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মধ্যস্থতায় কাফের আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাওয়ার পরিবর্তে অস্ত্র তুলে নিলেন। এরপর কাফেরদের দুর্ভেদ্য ঘেরাও ভেদ করে নিজেদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পৌঁছে যাওয়ার পথ তৈরীর চেষ্টা করতে লাগলেন। এমন সময় শোনা গেলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হত্যাকান্ডের খবর একটি ভিত্তিহীন গুজব। এতে মুসলমানদের সাহস ও মনোবল বহুগুণ বেড়ে যায় এবং তারা দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের মাধ্যমে কাফেরদের বেষ্টনী ভেদ করে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের কাছে পৌছে যেতে সক্ষম হয়।