📄 বাসর শয্যা থেকে জেহাদের ময়দানে
নিবেদিত প্রাণ মোজাহেদদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত হানযালা (রা.)। তিনি আজ এক অনন্য গৌরবের সাথে জেহাদের ময়দানে হাযির হয়েছেন। তিনি ছিলেন আবু আমের রাহেবের পুত্র। পরে আবু আমের ফাসেক উপাধি পায়। তার পরিচয় ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত হানযালা (রা.) নতুন বিয়ে করেছিলেন। জেহাদের জন্যে যখন আহ্বান জানানো হচ্ছিলো, তখন তিনি ছিলেন বাসর শয্যায়। জেহাদের আহ্বান পাওয়ার সাথে সাথে তিনি জেহাদের জন্যে রওয়ানা হয়ে যান। যুদ্ধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর হযরত হানযালা (রা.) কাফেরদের ব্যুহ ভেদ করে তীব্র বেগে আবু সুফিয়ানের কাছে হাযির হন। কাফের সেনাপতিকে তিনি আঘাত করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর শাহাদাত নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে তলোয়ার তোলার সাথে সাথে শাদ্দাদ ইবনে আওস দেখে ফেলে এবং হযরত হানযালা (রা.)-এর ওপর আকস্মিক হামলা চালায়। এতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
টিকাঃ
১৩. ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্টা, ৬৯-৭২। সহীহ বোখারী দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্টা ৫৮৩। তায়েফের যুদ্ধের পর ওয়াহশী ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত হামযা (রাঃ)-কে যে বর্শার আঘাতে হত্যা করেছিলেন, সেই বর্শা দিয়ে তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিকের (রাঃ) খেলাফতের সময়ে ইয়ামামার যুদ্ধে মোসায়লামা কাযযাবকে হত্যা করেন। রোমকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধেও তিনি অংশ গ্রহণ করেন।
📄 তীরন্দাজদের কৃতিত্ব ও মোশরেকদের পরাজয়
জাবালে রুমাতে যেসকল তীরন্দাজকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দিষ্ট দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন তারা যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় ও সাফল্য নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মক্কায় অমুসলিমরা খালেদ ইবনে ওলীদের নেতৃত্বে এবং আবু আমের ফাসেক এর সহায়তায় ইসলামী ফৌজের বাম বাহু ভেঙ্গে মুসলমানদের পরাজিত করতে পর্যায়ক্রমে তিনবার হামলা চালায়। কিন্তু মুসলমানরা তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। তীর বর্ষণ করে তারা কোরায়শদেরকে ঝাঁঝরা করে দেয়।
মোশরেকদের পরাজয়
কিছুক্ষণ যাবত তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। স্বল্পসংখ্যক মুসলমানের এ বাহিনী সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্রে ছেয়ে থাকে। অবশেষে পৌত্তলিকদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। তাদের মধ্যে পিছু হটার ভাবনা দেখা হয়। তারা ডানে বামে সামনে পেছনে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তিন হাজার সৈন্যের মোকাবিলায় মুসলমানরা যুদ্ধ করছিলো। তারা ঈমান, একিন, বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তলোয়ার চালনার জওহর প্রদর্শন করছিলেন।
মুসলমানদের অপ্রতিরোধ্য হামলার মুখে কাফেররা দিশেহারা হয়ে পড়লো। তারা কি করবে কিছুই স্থির করতে না পেরে পলায়ন শুরু করলো। যুদ্ধের পতাকাবাহীদের শোচনীয় পরিণতি দেখে কেউ আর সে পতাকা ধরে রাখতে সাহস পাচ্ছিলো না। তাদের মনোবল ভেঙ্গে গেলো। মুসলমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ, নিজেদের মর্যাদা ও সম্মান পুনদ্ধার ইত্যাদি যতো বড় বড় কথা তারা বলেছিলো, সব এলোমেলো হয়ে গেলো।
ইবনে ইসহাক লিখেছেন, আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের ওপর তাঁর সাহায্য নাযিল করেছেন এবং যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা পূর্ণ করেছেন। মুসলমানরা তলোয়ারের মাধ্যমে পৌত্তলিকদের এমনভাবে কচুকাটা করলো যে, ওরা শিবির ছেড়েও দূরে পালিয়ে গেলো। মোটকথা তারা শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের (রা.) বলেন, তাঁর পিতা বলেছেন, আল্লাহর শপথ, আমি লক্ষ্য করেছি যে, হেন্দ বিনতে ওতবা এবং তার সঙ্গিনী মহিলাদের হাঁটু দেখা যাচ্ছে। তারা কাপড় তুলে ছুটে পালাচ্ছিলো। তাদের গ্রেফতার করার ব্যাপারে ছোট বড় কোন অন্তরায়ই ছিল না।
সহীহ বোখারীতে হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, কাফেরদের সঙ্গে আমাদের মোকাবেলা হলে তাদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে যায়। মহিলাদের আমি দেখলাম, ওরা হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে দ্রুত পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের পায়ের অধিকাংশ দেখা যাচ্ছিলো। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা ও হট্টগোলের মধ্যে মুসলমানরা পৌত্তলিকদের ওপর তলোয়ার চালাচ্ছিলেন এবং মালামাল সংগ্রহ করে তাদের তাড়া করছিলেন।
টিকাঃ
১৩. দেখুন ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৬
১৪. ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা. ৭৭
১৫. সহীহ বোখারী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা. ৫৭৯
📄 তীরন্দাজদের আত্মঘাতী ভুল
স্বল্পসংখ্যক মুসলমান মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে যখন ইতিহাসের পাতায় এক বৈশিষ্টপূর্ণ বিজয় চিহ্নিত করছিলেন, ঠিক তখনই তীরন্দাজদের অধিকাংশ ব্যক্তি এক ভয়াবহ ভুল করে ফেললেন। অথচ মুসলমানদের সাফল্য এই যুদ্ধে বদরের যুদ্ধের চেয়ে কোন অংশে কম ছিলো না। কিন্তু তীরন্দাজদের এক ভয়াবহ ভুলে যুদ্ধের চিত্রই পরিবর্তিত হয়ে গেলো। মুসলমানরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হলেন। স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাহাদাত বরণ থেকে অল্পের জন্যে রক্ষা পেলেন। এই ভুলের কারণে বদরের যুদ্ধে অর্জিত মুসলমানদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়ে পড়েছিলো।
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজয় ও পরাজয় উভয় অবস্থাতেই তীরন্দাজদের স্বস্থানে অটল ও অবিচল থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কঠোর নির্দেশ সত্তেও অন্য মুসলমানদের গনীমতের মালামাল সংগ্রহ করতে দেখে তীরন্দাজরা লোভ সামলাতে পারল না। একে অন্যকে বললেন, গনীমত, গনীমত। তোমাদের সঙ্গীরা জয়ী হয়েছে, এখন আর কিসের প্রতীক্ষা।
তীরন্দাজদের মধ্যে থেকে এ ধরনের আওয়ায ওঠার পর তাদের কমান্ডার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) তাদেরকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, তোমরা কি ভুলে গেছো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের কি আদেশ দিয়েছেন? কিন্তু অধিকাংশ তীরন্দাজ হযরত আবদুল্লাহর (রা.) কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। তারা বললেন, আল্লাহর শপথ, আমরাও ওদের কাছে যাবো এবং কিছু গনীমতের কিছু মাল অবশ্যই সংগ্রহ করবো।
এরপর চল্লিশজন তীরন্দাজ নিজেদের দায়িত্ব উপেক্ষা করে গনীমতের মাল সংগ্রহ শুরু করলেন। আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাবের (রা.) এবং তাঁর নয় জন সঙ্গী পাহারায়ই নিযুক্ত রইলেন। তাঁরা দৃঢ় সংকল্পের সাথে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁরা বলছিলেন, এখান থেকে যাওয়ার জন্যে যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তখনই যাবো অথবা নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করবো।
টিকাঃ
১৬. সহীহ বোখারীতে একথা হযরত বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, পৃষ্ঠা ৪২৬ দেখুন,
📄 শত্রুদের নিয়ন্ত্রণে মুসলিম সেনাদল
খালেদ ইবনে ওলীদ এই গিরিপথে এসে তিনবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিলো। এবার এ সুবর্ণ সুযোগ সে হাতছাড়া করলো না। অল্পক্ষণের মধ্যে খালেদ আবদুল্লাহ ইবনে জাবের (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীদের নিহত করে মুসলমানদের ওপর পেছনের দিক থেকে হামলা করলো। খালেদ ইবনে ওলীদের সঙ্গীরা উচ্চস্বরে শ্লোগান দিলো। এতে পরাজিত কাফেররা যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হলো এবং মুসলমানদের ওপর পুনোরোদ্যামে হামলা চালালো। এদিকে বনু হারেস গোত্রের আসরাহ বিনতে আলকামা নামের এক মহিলা কাফেরদের ধুলি ধুসরিত পতাকা উচ্চে তুলে ধরলো। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাফেররা তার চারদিকে জড়ো হতে শুরু করলো। একে অন্যকে ডেকে সজাগ করলো। ফলে অল্পক্ষণের মধ্যেই কাফেররা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই শুরু করলো। মুসলমানরা তখন সামনে এবং পেছনে উভয় দিক থেকেই ঘেরাও-এর মধ্যে পড়ে গেলো। মনে হয় যেন, যাঁতাকলের মাঝখানে তাদের অবস্থান।