📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 শেরে খোদা হযরত হামযা (রা.)-এর শাহাদাত

📄 শেরে খোদা হযরত হামযা (রা.)-এর শাহাদাত


হযরত হামযা (রা.)-এর আততায়ীর নাম ছিলো ওয়াহশী ইবনে হারব। আমরা হযরত হামযা (রা.)-এর শাহাদাতের ঘটনা আততায়ীর ওয়াহশীর ভাষায়ই প্রকাশ করছি। মুসলমান হবার পর তিনি বলেন, আমি ছিলাম যোবায়ের ইবনে মোয়াত্তামের ক্রীতদাস। তার চাচা তুয়াইমা ইবনে আদী বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। কোরায়শরা ওহুদ যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে যোবায়ের ইবনে মোয়াত্তাম আমাকে বললেন, যদি তুমি মোহাম্মদের চাচা হামযাকে আমার চাচার হত্যার প্রতিশোধস্বরূপ হত্যা করতে পারো, তবে তুমি মুক্তি পাবে। এই প্রস্তাব পাওয়ার পর কোরায়শদের সাথে ওহুদের যুদ্ধের জন্যে আমি রওয়ানা হলাম। আমি ছিলাম আবিসিনিয়ার অধিবাসী। আবিসিনীয়দের মতো আমিও ছিলাম বর্শা নিক্ষেপে সুদক্ষ। আমার নিক্ষিপ্ত বর্শা কম সময়েই লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো। ব্যাপকভাবে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর আমি হযরত হামযা (রা.)-কে খুঁজতে শুরু করলাম। এক সময় তাঁকে দেখতেও পেলাম। তিনি জেদী উটের মতো সামনের লোকদের ছিন্নভিন্ন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর সামনে কোন বাধাই টিকতে পারছিলো না। কেউ তাঁর সামনে দাঁড়াতেই পারছিলো না।
আল্লাহর শপথ, আমি হযরত হামযা (রা.)-এর ওপর হামলার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলাম এবং একটি পাথর অথবা বৃক্ষের আড়ালে ছিলাম, এমন সময় সাবা ইবনে আবদুল ওযযা আমাকে ডিঙ্গিয়ে তাঁর কাছে পৌছে গেলো। হযরত হামযা (রা.) হুঙ্কার দিয়ে সাবাকে বললেন, ওরে লজ্জাস্থানের চামড়া কর্তনকারীর সন্তান এই নে। একথা বলে তিনি সাবার ঘাড়ে এমনভাবে তরবারির আঘাত করলেন এবং তার মাথা এমনভাবে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো যেন তার ঘাড়ে মাথা ছিলোই না। আমি তখন বর্শা তুলে হযরত হামযা (রা.)-এর প্রতি নিক্ষেপ করলাম। বর্শা নাভির নীচে বিদ্ধ হয়ে দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে পেছনে পৌছে গেলো। তিনি পড়ে গিয়ে উঠতে চাইলেন কিন্তু সক্ষম হননি। তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত আমি তাকে যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় রেখে দিলাম। এক সময় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। আমি তখন তাঁর কাছে গিয়ে বর্শা বের করে কোরায়শদের মধ্যে গিয়ে বসে রইলাম। হযরত হামযা (রা.) ছাড়া অন্য কাউকে আঘাত করার কোন ইচ্ছা ও প্রয়োজনই আমার ছিলো না। আমি মুক্তি পাওয়ার জন্যেই হযরত হামযা (রা.)-কে হত্যা করেছি। এরপর মক্কা ফিরে এসেই আমি মুক্তি লাভ করলাম।

টিকাঃ
১২. ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্টা, ৬৯-৭২। সহীহ বোখারী দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্টা ৫৮৩। তায়েফের যুদ্ধের পর ওয়াহশী ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত হামযা (রাঃ)-কে যে বর্শার আঘাতে হত্যা করেছিলেন, সেই বর্শা দিয়ে তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিকের (রাঃ) খেলাফতের সময়ে ইয়ামামার যুদ্ধে মোসায়লামা কাযযাবকে হত্যা করেন। রোমকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধেও তিনি অংশ গ্রহণ করেন।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মুসলমানদের সাফল্য

📄 মুসলমানদের সাফল্য


শেরে খোদা শেরে রসূল হযরত হামযা (রা.)-এর শাহাদাতে মুসলমানদের মারাত্মক ও অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। তা সত্তেও যুদ্ধে মুসলমানদের সাফল্যের লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত আলী, হযরত যোবায়ের, হযরত মসআব ইবনে ওমাইয়ের, হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লা, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ, হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য, হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা, হযরত সা'দ ইবনে রবি, হযরত নযর ইবনে আনাস (রা.) এমন বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে লড়াই করলেন যে, কাফেরদের পিলে চমকে গেলো, মনোবল ভেঙ্গে পড়লো, তাদের শক্তি সাহস শিথিল হয়ে গেলো।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 বাসর শয্যা থেকে জেহাদের ময়দানে

📄 বাসর শয্যা থেকে জেহাদের ময়দানে


নিবেদিত প্রাণ মোজাহেদদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত হানযালা (রা.)। তিনি আজ এক অনন্য গৌরবের সাথে জেহাদের ময়দানে হাযির হয়েছেন। তিনি ছিলেন আবু আমের রাহেবের পুত্র। পরে আবু আমের ফাসেক উপাধি পায়। তার পরিচয় ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত হানযালা (রা.) নতুন বিয়ে করেছিলেন। জেহাদের জন্যে যখন আহ্বান জানানো হচ্ছিলো, তখন তিনি ছিলেন বাসর শয্যায়। জেহাদের আহ্বান পাওয়ার সাথে সাথে তিনি জেহাদের জন্যে রওয়ানা হয়ে যান। যুদ্ধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর হযরত হানযালা (রা.) কাফেরদের ব্যুহ ভেদ করে তীব্র বেগে আবু সুফিয়ানের কাছে হাযির হন। কাফের সেনাপতিকে তিনি আঘাত করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর শাহাদাত নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে তলোয়ার তোলার সাথে সাথে শাদ্দাদ ইবনে আওস দেখে ফেলে এবং হযরত হানযালা (রা.)-এর ওপর আকস্মিক হামলা চালায়। এতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

টিকাঃ
১৩. ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্টা, ৬৯-৭২। সহীহ বোখারী দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্টা ৫৮৩। তায়েফের যুদ্ধের পর ওয়াহশী ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত হামযা (রাঃ)-কে যে বর্শার আঘাতে হত্যা করেছিলেন, সেই বর্শা দিয়ে তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিকের (রাঃ) খেলাফতের সময়ে ইয়ামামার যুদ্ধে মোসায়লামা কাযযাবকে হত্যা করেন। রোমকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধেও তিনি অংশ গ্রহণ করেন।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 তীরন্দাজদের কৃতিত্ব ও মোশরেকদের পরাজয়

📄 তীরন্দাজদের কৃতিত্ব ও মোশরেকদের পরাজয়


জাবালে রুমাতে যেসকল তীরন্দাজকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দিষ্ট দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন তারা যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় ও সাফল্য নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মক্কায় অমুসলিমরা খালেদ ইবনে ওলীদের নেতৃত্বে এবং আবু আমের ফাসেক এর সহায়তায় ইসলামী ফৌজের বাম বাহু ভেঙ্গে মুসলমানদের পরাজিত করতে পর্যায়ক্রমে তিনবার হামলা চালায়। কিন্তু মুসলমানরা তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। তীর বর্ষণ করে তারা কোরায়শদেরকে ঝাঁঝরা করে দেয়।
মোশরেকদের পরাজয়
কিছুক্ষণ যাবত তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। স্বল্পসংখ্যক মুসলমানের এ বাহিনী সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্রে ছেয়ে থাকে। অবশেষে পৌত্তলিকদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। তাদের মধ্যে পিছু হটার ভাবনা দেখা হয়। তারা ডানে বামে সামনে পেছনে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তিন হাজার সৈন্যের মোকাবিলায় মুসলমানরা যুদ্ধ করছিলো। তারা ঈমান, একিন, বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তলোয়ার চালনার জওহর প্রদর্শন করছিলেন।
মুসলমানদের অপ্রতিরোধ্য হামলার মুখে কাফেররা দিশেহারা হয়ে পড়লো। তারা কি করবে কিছুই স্থির করতে না পেরে পলায়ন শুরু করলো। যুদ্ধের পতাকাবাহীদের শোচনীয় পরিণতি দেখে কেউ আর সে পতাকা ধরে রাখতে সাহস পাচ্ছিলো না। তাদের মনোবল ভেঙ্গে গেলো। মুসলমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ, নিজেদের মর্যাদা ও সম্মান পুনদ্ধার ইত্যাদি যতো বড় বড় কথা তারা বলেছিলো, সব এলোমেলো হয়ে গেলো।
ইবনে ইসহাক লিখেছেন, আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের ওপর তাঁর সাহায্য নাযিল করেছেন এবং যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা পূর্ণ করেছেন। মুসলমানরা তলোয়ারের মাধ্যমে পৌত্তলিকদের এমনভাবে কচুকাটা করলো যে, ওরা শিবির ছেড়েও দূরে পালিয়ে গেলো। মোটকথা তারা শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের (রা.) বলেন, তাঁর পিতা বলেছেন, আল্লাহর শপথ, আমি লক্ষ্য করেছি যে, হেন্দ বিনতে ওতবা এবং তার সঙ্গিনী মহিলাদের হাঁটু দেখা যাচ্ছে। তারা কাপড় তুলে ছুটে পালাচ্ছিলো। তাদের গ্রেফতার করার ব্যাপারে ছোট বড় কোন অন্তরায়ই ছিল না।
সহীহ বোখারীতে হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, কাফেরদের সঙ্গে আমাদের মোকাবেলা হলে তাদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে যায়। মহিলাদের আমি দেখলাম, ওরা হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে দ্রুত পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের পায়ের অধিকাংশ দেখা যাচ্ছিলো। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা ও হট্টগোলের মধ্যে মুসলমানরা পৌত্তলিকদের ওপর তলোয়ার চালাচ্ছিলেন এবং মালামাল সংগ্রহ করে তাদের তাড়া করছিলেন।

টিকাঃ
১৩. দেখুন ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৬
১৪. ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা. ৭৭
১৫. সহীহ বোখারী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা. ৫৭৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00