📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 কোরায়েশদের রাজনৈতিক চালবাজি

📄 কোরায়েশদের রাজনৈতিক চালবাজি


যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষণ আগে কোরায়শরা মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে ভাঙ্গন এবং পারস্পরিক কলহ সৃষ্টির চেষ্টা করলো। আবু সুফিয়ান আনসারদের কাছে পয়গাম পাঠালো যে, আপনারা যদি আমাদের এবং আমাদের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝখান থেকে সরে যান, তবে আমরা আপনাদের প্রতি হামলা করবো না। কেননা আপনাদের সাথে লড়াই করার কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। কিন্তু যে ঈমানের সামনে পাহাড়ও টিকতে পারে না তার সামনে এ ধরনের কূটনৈতিক চাল কিভাবে সফল হতে পারে? আনসাররা আবু সুফিয়ানকে কঠোর ভাষায় জবাব পাঠিয়ে কিছু রূঢ় কথাও শুনিয়ে দিলেন।
পরস্পরের কাছাকাছি হওয়ার পর কোরায়শরা আরেকটি কূট চালের আশ্রয় নিলো। কাফেরদের ক্রীড়নক ফাসেক আবু আমের মুসলমানদের সামনে হাযির হলো। এই লোকটির নাম আবদে আমর ইবনে সাইফী। তাকে রাহেব বলা হতো। কিন্তু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম রেখেছিলেন ফাসেক। এই লোকটি আইয়ামে জাহেলিয়াতে আওস গোত্রের সরদার ছিলো। ইসলামের আবির্ভাবের পর ইসলাম তার গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিলো। সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুতা শুরু করলো। মদীনা থেকে বেরিয়ে সে মক্কায় কোরায়শদের কাছে পৌঁছুলো এবং তাদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্ররোচিত ও উদ্বুদ্ধ করলো। সে কাফেরদের এ মর্মেও নিশ্চয়তা প্রদান করলো যে, আমার কওমের যেসব গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা যুদ্ধক্ষেত্রে আমাকে দেখে আমার কাছে ছুটে আসবে।
মক্কাবাসীদের সাথে আবদে আমর নামের এই লোকটি প্রথমে মুসলমানদের সামনে এসে নিজের কওমের লোকদের আহ্বান জানালো। নিজের পরিচয় প্রকাশ করে সে বললো, হে আওস গোত্রের লোকেরা, আমি আবু আমের। এই পরিচয় শুনে আওস গোত্রের লোকেরা বললো, ওহে ফাসেক, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তোমার চোখকে যেন খুশী নসীব না করেন। একথা শুনে আবু আমের বললো, ওহে আমার কওম, আমি চলে যাওয়ার পর খারাপ হয়ে গেছো। পরে যুদ্ধ শুরু হলে এই লোকটি কাফেরদের পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করছিলো। সে মুসলিম মোজাহেদদের প্রতি প্রচুর পাথর নিক্ষেপ করেছিলো।
এমনিভাবে কোরায়শদের পক্ষ থেকে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হলো। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, সংখ্যাধিক্য এবং প্রচুর অস্ত্রবল থাকা সত্তেও পৌত্তলিকদের মনে মুসলমানদের ভয় কতো প্রবল ছিলো এবং মুসলমানদের ব্যক্তিত্বের সামনে তারা নিজেদের কতো ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ মনে করতো।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 অমুসলিম নারীদের ভূমিকা

📄 অমুসলিম নারীদের ভূমিকা


কোরায়শ মহিলারাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলো। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলো আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা। যুদ্ধরত সৈন্যদের মাঝে ঘুরে ঘুরে দফ বাজিয়ে বাজিয়ে এসব মহিলা সৈন্যদের উদ্দীপ্ত করে তুলছিলো। যুদ্ধের জন্যে অনুপ্রেরণা দেয়ার পাশাপাশি বর্শা নিক্ষেপ, তলোয়ার এবং তীর ব্যবহারে দক্ষতার পরিচয় দিতে বলছিলো। পতাকাবাহীদের লক্ষ্য করে তারা কবিতার ভাষায় বলছিলো, 'দেখো বনু আবদুদ দার দেখো তোমরাই উত্তর পুরুষের গৌরব তলোয়ারের ব্যবহারে দক্ষতা দেখাও।' নিজ কওমের লোকদের যুদ্ধের জন্যে উদ্বুদ্ধ করে কখনো বলছিলো, 'যদি এগিয়ে যাও, তবে কোলাকুলি করবো তোমাদের বুকে জড়িয়ে ধরবো। নরম বিছানা সাজিয়ে দেবো। যদি পেছনে সরে যাও অভিমান করবো দূরে চলে যাবো তোমাদের ছেড়ে।'

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন

📄 যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন


এ যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন ছিলো আসওয়াদ ইবনে আবদুল আছাদ মাখযুমি। এই লোকটি ছিলো নিতান্ত দুর্বৃত্ত ও অসচ্চরিত্রের। ময়দানে বেরোবার সময় বলছিলো, আমি আল্লাহর সাথে ওয়াদা করছি যে, ওদের হাউজের পানি পান করেই ছাড়ব। যদি তা না পারি, তবে সেই হাউজকে ধ্বংস বা তার জন্যে জীবন দিয়ে দেবো।
এ কথা বলে আসওয়াদ এগিয়ে এলো। অন্যদিকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে থেকে হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব এগিয়ে গেলেন। জলাশয়ের কাছেই উভয়ের মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো। হযরত হামযা (রা.) তলোয়ার দিয়ে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, কাফের আসওয়াদের পা হাঁটুর নীচে দিয়ে কেটে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। সে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলো। কর্তিত পা থেকে অবিরাম ধারায় রক্ত বেরোতে লাগলো। সেই রক্তধারা তার সঙ্গীদের দিকে প্রবাহিত হচ্ছিলো। আসওয়াদ হামাগুড়ি দিয়ে জলাশয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। জলাশয়ের কাছে পৌঁছে জলাশয়ের পানি পান করে তার কসম পূর্ণ করতে চাচ্ছিলো। এমন সময় হযরত হামযা (রা.) আসওয়াদের ওপর পুনরায় আঘাত করলেন। এই আঘাতের ফলে সে জলাশয়ের ভেতর পড়ে মরে গেলো।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 সাধারণ যুদ্ধ শুরু ও কাফেরদের বিপর্যয়

📄 সাধারণ যুদ্ধ শুরু ও কাফেরদের বিপর্যয়


আসওয়াদ ইবনে আবুল আছাদের হত্যাকান্ড ছিলো বদরের যুদ্ধের প্রথম ঘটনা। এই হত্যার পর যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়লো। কোরায়শ বাহিনীর মধ্য থেকে তিনজন বিশিষ্ট যোদ্ধা বেরিয়ে এলো। এরা ছিলো একই গোত্রের লোক; তন্মধ্যে রবিয়ার দুই পুত্র ওতবা ও শায়বা এবং ওতবার এক পুত্র ওলীদ। এরা কাতার থেকে বেরিয়ে এসেই প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার জন্যে আহ্বান জানালো। তিনজন আনসার যুবক অগ্রসর হলেন। এরা ছিলেন, আওফ, মোয়াওয়েয এবং আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা। প্রথমোক্ত দুইজন ছিলেন হারেসের পুত্র। তাদের মায়ের নাম ছিলো আফরা। কোরায়শরা জিজ্ঞাসা করলো, তোমাদের পরিচয় কি? তারা বললো, আমরা মদীনার আনসার। কোরায়শরা বললো, আপনারা অভিজাত প্রতিদ্বন্দ্বী সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনাদের সাথে আমাদের কোন বিরোধ নেই। আমরা চাই আমাদের চাচাতো ভাইদের। এরপর তিন কোরায়শ যুবক চিৎকার করে বললো, হে মোহাম্মদ, আমাদের কাছে আমাদের রক্তসম্পর্কীয়দের পাঠাও। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওবায়দা ইবনে হারেস, হামযা এবং আলী এগিয়ে যাও। এরা এগিয়ে যাওয়ার পর তিনজন কোরায়শ যুবক না চেনার ভান করে এদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলো। এরা নিজেদের পরিচয় দিলেন। কোরায়শ যুবকত্রয় বললো, হাঁ, আপনারা অভিজাত প্রতিদ্বন্দ্বী। এরপর শুরু হলো সাধারণ যুদ্ধ। হযরত ওবায়দা ইবনে হারেস (রা.) ওতবা ইবনে রবিয়ার সাথে, হযরত হামযা (রা.) শায়বার সাথে এবং হযরত আলী (রা.) ওলীদ ইবনে ওতবার সাথে মোকাবেলা করলেন।
হযরত হামযা (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) নিজ নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাবু করে ফেললেন কিন্তু হযরত ওবায়দা ইবনে হারেস (রা.) এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী ওতবার মধ্যে আঘাত বিনিময় হলো। তারা একে অন্যকে মারাত্মকভাবে আহত করে ফেললেন। ইতিমধ্যে হযরত হামযা এবং হযরত আলী তাদের প্রতিদ্বন্দীর কাজ শেষ করে হযরত ওবায়দার সাহায্যে এগিয়ে এলেন এবং ওতবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে শেষ করে ফেললেন। এরপর তারা হযরত ওবায়দাকে উঠিয়ে নিয়ে এলেন। হযরত ওবায়দা (রা.)-এর পা কেটে গিয়েছিলো এবং কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তার মুখে আর কথা ফুটেনি। চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে মুসলমানরা মদীনা ফিরে যাওয়ার পথে সফরা প্রান্তর অতিক্রম করার সময় হযরত ওবায়দা (রা.) ইন্তেকাল করেন। হযরত আলী (রা.) কসম খেয়ে বলতেন, এই আয়াত আমাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 'এরা দু'টি বিবদমান পক্ষ, তারা তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে।' (সূরা হজ্জ, আয়াত ১৯) পৌত্তলিকদের দুর্ভাগ্য সূচিত হয়ে গেলো। একত্রে তিনজন বিশিষ্ট যোদ্ধাকে তারা হারালো। ক্রোধে দিশাহারা হয়ে তারা সবাই একত্রে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।
অন্যদিকে মুসলমানরা তাদের মহান প্রতিপালকের কাছে সাহায্যের জন্যে দোয়া করে এবং দৃঢ়তার সাথে কাফেরদের হামলা মোকাবেলা করছিলেন। তারা 'আহাদ, আহাদ' শব্দ উচ্চারণ করে বিধর্মী কাফেরদের ওপর পাল্টা হামলায় তাদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছিলেন।

টিকাঃ
৫. ইবনে হিশাম, মোসনাদে আহমদ। আবু দাউদের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে। মেশকাত, ২য় খন্ড, পৃ. ৩৪৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00