📄 মক্কা থেকে আগত সৈন্যদের বিন্যস্তকরণ
মোশরেকরা কাতারবন্দী করে সৈন্য সমাবেশ করলো। তাদের প্রধান ছিলো আবু সুফিয়ান। সৈন্যদের মাঝামাঝি জায়গায় সে নিজের কেন্দ্র তৈরী করলো। ডানদিকে ছিলো খালেদ ইবনে ওলীদ। বাঁ দিকে ছিলো ইকরামা ইবনে আবু জেহেল। পদাতিক সৈন্যদের নেতৃত্বে ছিলো সফওয়ান ইবনে উমাইয়া। আর তীরন্দাজ সৈন্যদের মোকাবেলায় আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়াকে নিযুক্ত করা হলো।
যুদ্ধের পতাকা বহন করছিলো বনু আবদুদ দারের একটি ছোট দল। বনু আবদে মানাফ কুসাই এর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে মর্যাদা পরস্পরের মধ্যে বন্টনের সময় বনু আবদুদ দার এই মর্যাদা লাভ করে। গ্রন্থের প্রথমদিকে এ সম্পর্কিত বিবরণ বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। পূর্বপুরুষ থেকে শুরু করে প্রচলিত এ রীতি সম্পর্কে কেউ কোন প্রকার কলহ সৃষ্টিও করতে পারত না। কিন্তু আবু সুফিয়ান তাদের স্মরণ করিয়ে দিলো যে, বদরের যুদ্ধে নিশান বরদার নযর ইবনে হারেস গ্রেফতার হওয়ার পর কোরায়শদের কিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। সেকথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার সাথে সাথে আবু সুফিয়ান নিশান বরদারদের ক্রোধের উদ্রেক করার জন্যে বললো, হে বনু আবদুদ দার, বদরের যুদ্ধের দিনে আপনারাই আমাদের পতাকা বহন করছিলেন। কিন্তু সেই সময় আমাদেরকে কিরূপ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছিলো, সেটা আপনারা দেখেছেন। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের পতাকাই হচ্ছে যুদ্ধের প্রাণ। পতাকা পতিত হলে সাধারণ সৈন্যদের পদস্খলন ঘটে। এবার আপনারা হয় আমাদের পতাকা ভালোভাবে রক্ষা করবেন, অথবা একে বহন করা থেকে বিরত থাকবেন। আমরা নিজেরাই এটি বহনের ব্যবস্থা করবো। এই বক্তব্যের মধ্যে আবু সুফিয়ানের যে উদ্দেশ্য ছিলো, তা সফল হলো। তার জ্বালাময়ী কথা শুনে বনু আবদুদ দারের মনে প্রচন্ড ক্রোধের উদ্রেক হলো। আমরা পতাকা তোমাদের হাতে তুলে দেবো? আগামীকাল লড়াই শুরু হলে দেখে নিও, আমরা কি করি। পরদিন যুদ্ধ শুরু হলে বনু আবদুদ দারের প্রতিটি লোক দৃঢ়তা ও নিষ্ঠার সাথে পতাকা ধরে রাখলো। তবে শেষ পর্যন্ত একে একে সবাই জাহান্নামে পৌছে গেলো।
📄 কোরায়েশদের রাজনৈতিক চালবাজি
যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষণ আগে কোরায়শরা মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে ভাঙ্গন এবং পারস্পরিক কলহ সৃষ্টির চেষ্টা করলো। আবু সুফিয়ান আনসারদের কাছে পয়গাম পাঠালো যে, আপনারা যদি আমাদের এবং আমাদের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝখান থেকে সরে যান, তবে আমরা আপনাদের প্রতি হামলা করবো না। কেননা আপনাদের সাথে লড়াই করার কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। কিন্তু যে ঈমানের সামনে পাহাড়ও টিকতে পারে না তার সামনে এ ধরনের কূটনৈতিক চাল কিভাবে সফল হতে পারে? আনসাররা আবু সুফিয়ানকে কঠোর ভাষায় জবাব পাঠিয়ে কিছু রূঢ় কথাও শুনিয়ে দিলেন।
পরস্পরের কাছাকাছি হওয়ার পর কোরায়শরা আরেকটি কূট চালের আশ্রয় নিলো। কাফেরদের ক্রীড়নক ফাসেক আবু আমের মুসলমানদের সামনে হাযির হলো। এই লোকটির নাম আবদে আমর ইবনে সাইফী। তাকে রাহেব বলা হতো। কিন্তু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম রেখেছিলেন ফাসেক। এই লোকটি আইয়ামে জাহেলিয়াতে আওস গোত্রের সরদার ছিলো। ইসলামের আবির্ভাবের পর ইসলাম তার গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিলো। সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুতা শুরু করলো। মদীনা থেকে বেরিয়ে সে মক্কায় কোরায়শদের কাছে পৌঁছুলো এবং তাদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্ররোচিত ও উদ্বুদ্ধ করলো। সে কাফেরদের এ মর্মেও নিশ্চয়তা প্রদান করলো যে, আমার কওমের যেসব গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা যুদ্ধক্ষেত্রে আমাকে দেখে আমার কাছে ছুটে আসবে।
মক্কাবাসীদের সাথে আবদে আমর নামের এই লোকটি প্রথমে মুসলমানদের সামনে এসে নিজের কওমের লোকদের আহ্বান জানালো। নিজের পরিচয় প্রকাশ করে সে বললো, হে আওস গোত্রের লোকেরা, আমি আবু আমের। এই পরিচয় শুনে আওস গোত্রের লোকেরা বললো, ওহে ফাসেক, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তোমার চোখকে যেন খুশী নসীব না করেন। একথা শুনে আবু আমের বললো, ওহে আমার কওম, আমি চলে যাওয়ার পর খারাপ হয়ে গেছো। পরে যুদ্ধ শুরু হলে এই লোকটি কাফেরদের পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করছিলো। সে মুসলিম মোজাহেদদের প্রতি প্রচুর পাথর নিক্ষেপ করেছিলো।
এমনিভাবে কোরায়শদের পক্ষ থেকে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হলো। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, সংখ্যাধিক্য এবং প্রচুর অস্ত্রবল থাকা সত্তেও পৌত্তলিকদের মনে মুসলমানদের ভয় কতো প্রবল ছিলো এবং মুসলমানদের ব্যক্তিত্বের সামনে তারা নিজেদের কতো ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ মনে করতো।
📄 অমুসলিম নারীদের ভূমিকা
কোরায়শ মহিলারাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলো। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলো আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা। যুদ্ধরত সৈন্যদের মাঝে ঘুরে ঘুরে দফ বাজিয়ে বাজিয়ে এসব মহিলা সৈন্যদের উদ্দীপ্ত করে তুলছিলো। যুদ্ধের জন্যে অনুপ্রেরণা দেয়ার পাশাপাশি বর্শা নিক্ষেপ, তলোয়ার এবং তীর ব্যবহারে দক্ষতার পরিচয় দিতে বলছিলো। পতাকাবাহীদের লক্ষ্য করে তারা কবিতার ভাষায় বলছিলো, 'দেখো বনু আবদুদ দার দেখো তোমরাই উত্তর পুরুষের গৌরব তলোয়ারের ব্যবহারে দক্ষতা দেখাও।' নিজ কওমের লোকদের যুদ্ধের জন্যে উদ্বুদ্ধ করে কখনো বলছিলো, 'যদি এগিয়ে যাও, তবে কোলাকুলি করবো তোমাদের বুকে জড়িয়ে ধরবো। নরম বিছানা সাজিয়ে দেবো। যদি পেছনে সরে যাও অভিমান করবো দূরে চলে যাবো তোমাদের ছেড়ে।'
📄 যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন
এ যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন ছিলো আসওয়াদ ইবনে আবদুল আছাদ মাখযুমি। এই লোকটি ছিলো নিতান্ত দুর্বৃত্ত ও অসচ্চরিত্রের। ময়দানে বেরোবার সময় বলছিলো, আমি আল্লাহর সাথে ওয়াদা করছি যে, ওদের হাউজের পানি পান করেই ছাড়ব। যদি তা না পারি, তবে সেই হাউজকে ধ্বংস বা তার জন্যে জীবন দিয়ে দেবো।
এ কথা বলে আসওয়াদ এগিয়ে এলো। অন্যদিকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে থেকে হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব এগিয়ে গেলেন। জলাশয়ের কাছেই উভয়ের মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো। হযরত হামযা (রা.) তলোয়ার দিয়ে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, কাফের আসওয়াদের পা হাঁটুর নীচে দিয়ে কেটে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। সে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলো। কর্তিত পা থেকে অবিরাম ধারায় রক্ত বেরোতে লাগলো। সেই রক্তধারা তার সঙ্গীদের দিকে প্রবাহিত হচ্ছিলো। আসওয়াদ হামাগুড়ি দিয়ে জলাশয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। জলাশয়ের কাছে পৌঁছে জলাশয়ের পানি পান করে তার কসম পূর্ণ করতে চাচ্ছিলো। এমন সময় হযরত হামযা (রা.) আসওয়াদের ওপর পুনরায় আঘাত করলেন। এই আঘাতের ফলে সে জলাশয়ের ভেতর পড়ে মরে গেলো।