📄 ওহুদের পাদদেশে ও প্রতিরোধ পরিকল্পনা
মোনাফেকদের ফিরে যাওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশিষ্ট সাতশত মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হলেন। শত্রুদের অবস্থান ছিলো ওহুদ পর্বতের উল্টো দিকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের লক্ষ্য করে বললেন, বেশী ঘুরে গন্তব্যে যেতে হবে না, এমন পথের সন্ধান দিতে কেউ পারবে?
একথা শুনে হযরত আবু খায়ছুমা (রা.) এগিয়ে এসে বললেন, একাজের জন্যে আমি হাযির রয়েছি, হে আল্লাহর রসূল। এরপর তিনি একটি সংক্ষিপ্ত পথ ধরে এগিয়ে চললেন। শত্রুদের পশ্চিম পাশে রেখে সেই পথ ধরে বনু হারেসা গোত্রের জমির ওপর দিয়ে মুসলমানরা এগিয়ে যাচ্ছিলো। এই পথে যাওয়ার সময় মরবা ইবনে কায়জা নামক এক ব্যক্তির বাগানের ওপর দিয়ে যাচ্ছিলো। এ লোকটি একদিকে ছিলো অন্ধ, অন্যদিকে মোনাফেক। মুসলমানদের আগমন অনুভব করে সে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ধুলি নিক্ষেপ করতে শুরু করলো। এ সময়ে সে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলছিলো, আপনি যদি আল্লাহর রসূল হয়ে থাকেন, তবে মনে রাখবেন যে, আমার বাগানে আপনার আসার অনুমতি নেই। মুসলমানরা তাকে হত্যা করতে চাইলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওকে হত্যা করো না। সে মন এবং চোখ উভয় দিক থেকেই অন্ধ।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামনে অগ্রসর হয়ে প্রান্তরের সীমায় অবস্থিত ওহুদ পাহাড়ের ঘাঁটিতে পৌছে সেখানেই শিবির স্থাপন করলেন। সামনে ছিলো মদীনা আর পেছনে ছিলো ওহুদের উঁচু পাহাড়। শত্রু বাহিনী তখন মুসলমান এবং মদীনার মাঝামাঝি অবস্থান করছিলো।
প্রতিরোধ পরিকল্পনা
এখানে পৌঁছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৈন্যদের বিন্যস্ত ও সংগঠিত করলেন। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সৈন্যদের কয়েকটি সারিতে বিভক্ত করলেন। তীরন্দাজদের একটি বাহিনী গঠন করলেন। এদের সংখ্যা ছিলো পঞ্চাশ। এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাবের ইবনে নোমান আনসারী (রা.)-কে এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়া হলো। কানাত উপত্যকার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত একটি গিরিপথে তাদের নিযুক্ত করা হলো। এই গিরিপথ বর্তমানে জাবালে রুমাত নামে পরিচিত। এই গিরিপথ মুসলিম বাহিনীর অবস্থান থেকে দেড়শত মিটার দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই তীরন্দাজদের নেতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, 'তোমরা ঘোড় সওয়ার শত্রুদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে তাদেরকে আমাদের কাছ থেকে দূরে রাখবে। লক্ষ্য রাখবে তারা যেন পেছনের দিক থেকে আমাদের ওপর হামলা করতে না পারে। আমরা জয়লাভ করি অথবা পরাজিত হই, উভয় অবস্থায়ই তোমরা নিজেদের অবস্থানে অবিচল থাকবে। তোমরা যেখানে অবস্থান নিয়েছো সেদিক থেকে যেন আমাদের ওপর কোন হামলা আসতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে। এরপর সকল তীরন্দাজকে লক্ষ্য করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাদের পেছনের দিক তোমরা হেফাযত করবে। যদি দেখো যে, আমরা মারা পড়েছি তবুও আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসো না। যদি দেখো যে, আমরা গনীমতের মাল আহরণ করছি, তবুও আমাদের সাথে তোমরা অংশ নিও না।'
টিকাঃ
৬. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৬৫-৬৬।
৭. আহমদ তিবরানী হাকেম হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। ফতহুল বারী সপ্তম খন্ডের ৩৫০ পৃ. দ্রষ্টব্য।
📄 দায়িত্বশীলদের উদ্দেশ্যে রসূলুল্লাহর বাণী
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর ঘোষণা করলেন যে, আমি আদেশ না দেয়া পর্যন্ত তোমরা যুদ্ধ শুরু করবে না। তিনি সেদিন দুটি বর্ম পরিধান করেছিলেন। সাহাবাদের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, শত্রুর সাথে মোকাবেলার সময় বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের মধ্যে উদ্দীপনা ও জেহাদী জযবা, জো'শ সৃষ্টি প্রাক্কালে একটি ধারালো তলোয়ার খাপমুক্ত করে বললেন, এই তলোয়ার খাপমুক্ত করে এর হক আদায় করতে পারবে এমন কে আছে? একথা শুনে কয়েকজন সাহাবা তলোয়ার নেয়ার জন্যে অগ্রসর হলেন। এদের মধ্যে হযরত আলী ইবনে আবু তালেব, হযরত যোবায়ের ইবনে আওয়াম এবং ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-ও ছিলেন। হযরত আবু দোজানা সাম্মাক ইবনে খায়শা (রা.) সামনে অগ্রসর হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, এর হক কী? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই তরবারি দিয়ে শত্রুর চেহারায় এমনভাবে আঘাত করবে যেন, সে চেহারা বাঁকা হয়ে যায়। হযরত আবু দোজানা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমি এই তলোয়ার গ্রহণ করে এর হক আদায় করতে চাই। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তলোয়ার হযরত আবু দোজানা (রা.)-এর হাতে দিলেন।
হযরত আবু দোজানা (রা.) ছিলেন নিবেদিত প্রাণ সৈনিক। লড়াই-এর সময় বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করতেন। তাঁর কাছে একটি লাল পট্টি ছিলো। সেটি বেঁধে নিলে লোকে বুঝতো যে, এবার তিনি আমৃত্যু লড়াই করবেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেয়া তলোয়ার গ্রহণ করে তিনি মাথায় পট্টি বেঁধে মুসলমান ও কাফের সৈন্যদের মাঝখান দিয়ে বুক টান করে হাঁটতে লাগলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ ধরনের চলাচল আল্লাহ রব্বুল আলামীন পছন্দ করেন না, কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়।
📄 মক্কা থেকে আগত সৈন্যদের বিন্যস্তকরণ
মোশরেকরা কাতারবন্দী করে সৈন্য সমাবেশ করলো। তাদের প্রধান ছিলো আবু সুফিয়ান। সৈন্যদের মাঝামাঝি জায়গায় সে নিজের কেন্দ্র তৈরী করলো। ডানদিকে ছিলো খালেদ ইবনে ওলীদ। বাঁ দিকে ছিলো ইকরামা ইবনে আবু জেহেল। পদাতিক সৈন্যদের নেতৃত্বে ছিলো সফওয়ান ইবনে উমাইয়া। আর তীরন্দাজ সৈন্যদের মোকাবেলায় আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়াকে নিযুক্ত করা হলো।
যুদ্ধের পতাকা বহন করছিলো বনু আবদুদ দারের একটি ছোট দল। বনু আবদে মানাফ কুসাই এর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে মর্যাদা পরস্পরের মধ্যে বন্টনের সময় বনু আবদুদ দার এই মর্যাদা লাভ করে। গ্রন্থের প্রথমদিকে এ সম্পর্কিত বিবরণ বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। পূর্বপুরুষ থেকে শুরু করে প্রচলিত এ রীতি সম্পর্কে কেউ কোন প্রকার কলহ সৃষ্টিও করতে পারত না। কিন্তু আবু সুফিয়ান তাদের স্মরণ করিয়ে দিলো যে, বদরের যুদ্ধে নিশান বরদার নযর ইবনে হারেস গ্রেফতার হওয়ার পর কোরায়শদের কিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। সেকথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার সাথে সাথে আবু সুফিয়ান নিশান বরদারদের ক্রোধের উদ্রেক করার জন্যে বললো, হে বনু আবদুদ দার, বদরের যুদ্ধের দিনে আপনারাই আমাদের পতাকা বহন করছিলেন। কিন্তু সেই সময় আমাদেরকে কিরূপ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছিলো, সেটা আপনারা দেখেছেন। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের পতাকাই হচ্ছে যুদ্ধের প্রাণ। পতাকা পতিত হলে সাধারণ সৈন্যদের পদস্খলন ঘটে। এবার আপনারা হয় আমাদের পতাকা ভালোভাবে রক্ষা করবেন, অথবা একে বহন করা থেকে বিরত থাকবেন। আমরা নিজেরাই এটি বহনের ব্যবস্থা করবো। এই বক্তব্যের মধ্যে আবু সুফিয়ানের যে উদ্দেশ্য ছিলো, তা সফল হলো। তার জ্বালাময়ী কথা শুনে বনু আবদুদ দারের মনে প্রচন্ড ক্রোধের উদ্রেক হলো। আমরা পতাকা তোমাদের হাতে তুলে দেবো? আগামীকাল লড়াই শুরু হলে দেখে নিও, আমরা কি করি। পরদিন যুদ্ধ শুরু হলে বনু আবদুদ দারের প্রতিটি লোক দৃঢ়তা ও নিষ্ঠার সাথে পতাকা ধরে রাখলো। তবে শেষ পর্যন্ত একে একে সবাই জাহান্নামে পৌছে গেলো।
📄 কোরায়েশদের রাজনৈতিক চালবাজি
যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষণ আগে কোরায়শরা মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে ভাঙ্গন এবং পারস্পরিক কলহ সৃষ্টির চেষ্টা করলো। আবু সুফিয়ান আনসারদের কাছে পয়গাম পাঠালো যে, আপনারা যদি আমাদের এবং আমাদের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝখান থেকে সরে যান, তবে আমরা আপনাদের প্রতি হামলা করবো না। কেননা আপনাদের সাথে লড়াই করার কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। কিন্তু যে ঈমানের সামনে পাহাড়ও টিকতে পারে না তার সামনে এ ধরনের কূটনৈতিক চাল কিভাবে সফল হতে পারে? আনসাররা আবু সুফিয়ানকে কঠোর ভাষায় জবাব পাঠিয়ে কিছু রূঢ় কথাও শুনিয়ে দিলেন।
পরস্পরের কাছাকাছি হওয়ার পর কোরায়শরা আরেকটি কূট চালের আশ্রয় নিলো। কাফেরদের ক্রীড়নক ফাসেক আবু আমের মুসলমানদের সামনে হাযির হলো। এই লোকটির নাম আবদে আমর ইবনে সাইফী। তাকে রাহেব বলা হতো। কিন্তু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম রেখেছিলেন ফাসেক। এই লোকটি আইয়ামে জাহেলিয়াতে আওস গোত্রের সরদার ছিলো। ইসলামের আবির্ভাবের পর ইসলাম তার গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিলো। সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুতা শুরু করলো। মদীনা থেকে বেরিয়ে সে মক্কায় কোরায়শদের কাছে পৌঁছুলো এবং তাদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্ররোচিত ও উদ্বুদ্ধ করলো। সে কাফেরদের এ মর্মেও নিশ্চয়তা প্রদান করলো যে, আমার কওমের যেসব গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা যুদ্ধক্ষেত্রে আমাকে দেখে আমার কাছে ছুটে আসবে।
মক্কাবাসীদের সাথে আবদে আমর নামের এই লোকটি প্রথমে মুসলমানদের সামনে এসে নিজের কওমের লোকদের আহ্বান জানালো। নিজের পরিচয় প্রকাশ করে সে বললো, হে আওস গোত্রের লোকেরা, আমি আবু আমের। এই পরিচয় শুনে আওস গোত্রের লোকেরা বললো, ওহে ফাসেক, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তোমার চোখকে যেন খুশী নসীব না করেন। একথা শুনে আবু আমের বললো, ওহে আমার কওম, আমি চলে যাওয়ার পর খারাপ হয়ে গেছো। পরে যুদ্ধ শুরু হলে এই লোকটি কাফেরদের পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করছিলো। সে মুসলিম মোজাহেদদের প্রতি প্রচুর পাথর নিক্ষেপ করেছিলো।
এমনিভাবে কোরায়শদের পক্ষ থেকে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হলো। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, সংখ্যাধিক্য এবং প্রচুর অস্ত্রবল থাকা সত্তেও পৌত্তলিকদের মনে মুসলমানদের ভয় কতো প্রবল ছিলো এবং মুসলমানদের ব্যক্তিত্বের সামনে তারা নিজেদের কতো ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ মনে করতো।