📄 সৈন্যদল পরিদর্শন
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাইখান নামক জায়গায় পৌঁছে মুসলিম সৈন্যদের পরিদর্শন করলেন। এই জায়গায় পরিদর্শন শেষে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং যুদ্ধের জন্যে অনুপযোগিদের ফেরত পাঠানো হলো। যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছিলো তাঁরা হলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), হযরত ওসামা ইবনে যায়েদ (রা.), হযরত ওসায়েদ ইবনে যহির (রা.), যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.), হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.), হযরত ওসামা ইবনে আওস (রা.), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.), হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা আনসারী (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে হিব্বাহ (রা.)। এই তালিকায় হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.)-এর নামও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কিন্তু সহীহ বোখারীর মতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি ওহুদের যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন।
কম বয়স্ক হওয়া সত্তেও হযরত রাফে ইবনে খাদিজ (রা.) এবং হযরত সামুরা ইবনে জুন্দব (রা.)-কে জেহাদে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। এর কারণ ছিলো এই যে, হযরত রাফে ইবনে খাদিজ (রা.) তীরন্দাজ হিসাবে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তাঁকে অনুমতি দেয়ার পর হযরত সামুরা ইবনে জুন্দব (রা.) বললেন, আমি তো রাফের চেয়ে অধিক শক্তিশালী। কুস্তিতে তাকে আমি আছড়ে দিতে পারি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একথা জানানো হলে তিনি উভয়কে কুস্তি লড়ার আদেশ দিলেন। সেই কুস্তিতে হযরত সামুরা ইবনে জুন্দব (রা.) সত্যিই হযরত রাফেকে আছড়ে দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সামুরা (রা.)-কেও অংশগ্রহণের অনুমতি দিলেন।
📄 ওহুদ ও মদীনার মাঝামাঝি স্থানে রাত্রিযাপন
শাইখান নামক জায়গাতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে মাগরেব এবং এশার নামায আদায় করে রাত্রি যাপনের সিদ্ধান্ত করলেন। মুসলমানদের তাঁবুর চারদিকে পাহারাদারদের নেতা ছিলেন হযরত মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা আনসারী (রা.)। তিনিই ইহুদী কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যাকান্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর সাফওয়ান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে কয়েস (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাহারায় নিযুক্ত ছিলেন।
📄 মোনাফেকদের বিশ্বাসঘাতকতা
মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর দুরভিসন্ধি সফল হওয়ার কাছাকাছি ছিলো। তার ও তার সঙ্গীদের পিছুটান দেখে আওস গোত্রের বনু হারেসা এবং খাযরাজ গোত্রের বনু সালমার দলও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলো। তারা ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলো। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই দুই গোত্রের লোকদের মনে ঈমানী চেতনা জাগ্রত করে দেয়ায় তারা যুদ্ধের জন্যে সঙ্কল্পে অটল হয়ে রইলেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'যখন তোমাদের মধ্যেকার দু'টি দল ভীরুতার পরিচয় দেয়ার ইচ্ছা করেছিলো এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের বন্ধু। মোমেনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত।'
মোনাফেকরা মদীনায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে এমনি নাযুক পরিস্থিতিতে তাদের কর্তব্য সম্পর্কে হযরত জাবের (রা.)-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারাম (রা.) সচেতন করতে চাইলেন। তিনি প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশী মোনাফেকদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে তাদের পেছনে কিছুদুর গিয়ে বললেন, এখনো ফিরে চলো, আল্লাহর পথে লড়াই করো। কিন্তু তারা জবাব দিলো যে, যদি আমরা জানতাম যে, আপনারা যুদ্ধ করবেন তাহলে আমরা ফিরে যেতাম না। একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারাম (রা.) বললেন, ওহে আল্লাহর শত্রুরা, তোমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নাযিল হবে। স্মরণ রেখো, আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে তোমাদের মুখাপেক্ষি রাখবেন না।
সেই মোনাফেকদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করলেন, 'এবং মোনাফেকদের জানবার জন্যে তাদেরকে বলা হয়েছিলো', এসো, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো অথবা প্রতিরোধ করো। তারা বললো, যদি যুদ্ধ জানতাম, তবে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করতাম। সেদিন তারা ঈমান অপেক্ষা কুফুরীর নিকটতর ছিলো। যা তাদের অন্তরে নেই, তা তারা মুখে বলে। যা তারা গোপন রাখে, আল্লাহ তায়ালা তা বিশেষভাবে অবহিত। (আলে ইমরান, আয়াত ১৬৭)
📄 ওহুদের পাদদেশে ও প্রতিরোধ পরিকল্পনা
মোনাফেকদের ফিরে যাওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশিষ্ট সাতশত মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হলেন। শত্রুদের অবস্থান ছিলো ওহুদ পর্বতের উল্টো দিকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের লক্ষ্য করে বললেন, বেশী ঘুরে গন্তব্যে যেতে হবে না, এমন পথের সন্ধান দিতে কেউ পারবে?
একথা শুনে হযরত আবু খায়ছুমা (রা.) এগিয়ে এসে বললেন, একাজের জন্যে আমি হাযির রয়েছি, হে আল্লাহর রসূল। এরপর তিনি একটি সংক্ষিপ্ত পথ ধরে এগিয়ে চললেন। শত্রুদের পশ্চিম পাশে রেখে সেই পথ ধরে বনু হারেসা গোত্রের জমির ওপর দিয়ে মুসলমানরা এগিয়ে যাচ্ছিলো। এই পথে যাওয়ার সময় মরবা ইবনে কায়জা নামক এক ব্যক্তির বাগানের ওপর দিয়ে যাচ্ছিলো। এ লোকটি একদিকে ছিলো অন্ধ, অন্যদিকে মোনাফেক। মুসলমানদের আগমন অনুভব করে সে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ধুলি নিক্ষেপ করতে শুরু করলো। এ সময়ে সে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলছিলো, আপনি যদি আল্লাহর রসূল হয়ে থাকেন, তবে মনে রাখবেন যে, আমার বাগানে আপনার আসার অনুমতি নেই। মুসলমানরা তাকে হত্যা করতে চাইলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওকে হত্যা করো না। সে মন এবং চোখ উভয় দিক থেকেই অন্ধ।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামনে অগ্রসর হয়ে প্রান্তরের সীমায় অবস্থিত ওহুদ পাহাড়ের ঘাঁটিতে পৌছে সেখানেই শিবির স্থাপন করলেন। সামনে ছিলো মদীনা আর পেছনে ছিলো ওহুদের উঁচু পাহাড়। শত্রু বাহিনী তখন মুসলমান এবং মদীনার মাঝামাঝি অবস্থান করছিলো।
প্রতিরোধ পরিকল্পনা
এখানে পৌঁছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৈন্যদের বিন্যস্ত ও সংগঠিত করলেন। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সৈন্যদের কয়েকটি সারিতে বিভক্ত করলেন। তীরন্দাজদের একটি বাহিনী গঠন করলেন। এদের সংখ্যা ছিলো পঞ্চাশ। এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাবের ইবনে নোমান আনসারী (রা.)-কে এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়া হলো। কানাত উপত্যকার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত একটি গিরিপথে তাদের নিযুক্ত করা হলো। এই গিরিপথ বর্তমানে জাবালে রুমাত নামে পরিচিত। এই গিরিপথ মুসলিম বাহিনীর অবস্থান থেকে দেড়শত মিটার দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই তীরন্দাজদের নেতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, 'তোমরা ঘোড় সওয়ার শত্রুদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে তাদেরকে আমাদের কাছ থেকে দূরে রাখবে। লক্ষ্য রাখবে তারা যেন পেছনের দিক থেকে আমাদের ওপর হামলা করতে না পারে। আমরা জয়লাভ করি অথবা পরাজিত হই, উভয় অবস্থায়ই তোমরা নিজেদের অবস্থানে অবিচল থাকবে। তোমরা যেখানে অবস্থান নিয়েছো সেদিক থেকে যেন আমাদের ওপর কোন হামলা আসতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে। এরপর সকল তীরন্দাজকে লক্ষ্য করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাদের পেছনের দিক তোমরা হেফাযত করবে। যদি দেখো যে, আমরা মারা পড়েছি তবুও আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসো না। যদি দেখো যে, আমরা গনীমতের মাল আহরণ করছি, তবুও আমাদের সাথে তোমরা অংশ নিও না।'
টিকাঃ
৬. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৬৫-৬৬।
৭. আহমদ তিবরানী হাকেম হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। ফতহুল বারী সপ্তম খন্ডের ৩৫০ পৃ. দ্রষ্টব্য।