📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মদীনা অভিমুখে অমুসলিমদের যাত্রা

📄 মদীনা অভিমুখে অমুসলিমদের যাত্রা


মক্কার বাহিনী মদীনা অভিমুখে এগিয়ে চললো। আবওয়ার নামক জায়গায় পৌঁছার পর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা প্রস্তাব দিলো যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মা বিবি আমেনার কবর খুঁজে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করা হোক। কিন্তু এ নারীর ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে কোরায়শ নেতারা রাযি হলো না। তারা ভেবে দেখলো যে, এ কাজের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ।

আবওয়া থেকে কাফেররা সফর অব্যাহত রাখলো। মদীনার কাছে পৌঁছে আকিক প্রান্তর অতিক্রম করলো। এরপর কিছুটা ডানে গিয়ে ওহুদ পর্বতের নিকটবর্তী আইনাইন নামক জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করলো। আইনাইন মদীনার উত্তরে কানাত প্রান্তরের কাছে একটি উর্বর ভূমি। এটা তৃতীয় হিজরীর ৬ই শাওয়াল রোজ শুক্রবারের ঘটনা।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরী ব্যবস্থা

📄 পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরী ব্যবস্থা


যে কোন অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যে এরপর মদীনার মুসলমানরা অস্ত্র সঙ্গে রাখতে শুরু করলেন। এমনকি নামাযের সময়েও অস্ত্র দূরে সরিয়ে রাখা হতো না।
কয়েকজন আনসারকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিরাপত্তা রক্ষায় নিযুক্ত করা হলো। এদের মধ্যে ছিলেন হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.), উসায়েদ ইবনে খোযায়ের (রা.) এবং সা'দ ইবনে ওবাদা (রা.)। এরা সশস্ত্র অবস্থায় সারা রাত প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গৃহে পাহারায় থাকতেন।
মদীনার বিভিন্ন প্রবেশ পথেও বেশ কয়েকজন মুসলমানকে নিয়োগ করা হলো। যে কোন ধরনের আকস্মিক হামলা মোকাবেলায় এরা প্রস্তুত ছিলেন। ছোট ছোট কয়েকটি বাহিনীকে শত্রুদের গতিবিধির ওপর নযর রাখতে মদীনার বাইরের রাস্তায়ও নিযুক্ত করা হলো।
মদীনার সন্নিকটে কাফেরদের উপস্থিতি মক্কার বাহিনী মদীনা অভিমুখে এগিয়ে চললো। আবওয়ার নামক জায়গায় পৌঁছার পর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা প্রস্তাব দিলো যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মা বিবি আমেনার কবর খুঁজে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করা হোক। কিন্তু এ নারীর ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে কোরায়শ নেতারা রাযি হলো না। তারা ভেবে দেখলো যে, এ কাজের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ।
আবওয়া থেকে কাফেররা সফর অব্যাহত রাখলো। মদীনার কাছে পৌঁছে আকিক প্রান্তর অতিক্রম করলো। এরপর কিছুটা ডানে গিয়ে ওহুদ পর্বতের নিকটবর্তী আইনাইন নামক জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করলো। আইনাইন মদীনার উত্তরে কানাত প্রান্তরের কাছে একটি উর্বর ভূমি। এটা তৃতীয় হিজরীর ৬ই শাওয়াল রোজ শুক্রবারের ঘটনা।
মজলিসে শূরার বৈঠক অমুসলিমদের গতিবিধির পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর মুসলিম সংবাদ বাহকরা মদীনায় পৌছে দিচ্ছিলেন। তাদের অবস্থান গ্রহণের খবরও মদীনায় পৌঁছে গেলো। সেই সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজলিসে শূরার বৈঠক আহ্বান করলেন। সেই বৈঠকে মদীনার প্রতিরক্ষা সম্পর্কে জরুরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার চিন্তা করা হচ্ছিলো। শুরুতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দেখা একটি স্বপ্নের কথা সাহাবাদের জানালেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর শপথ আমি একটা ভালো জিনিস দেখেছি। আমি দেখলাম কিছুসংখ্যক গাভীকে যবাই করা হচ্ছে। আমি দেখলাম আমার তরবারির ওপর পরাজয়ের কিছু চিহ্ন। আমি আরো দেখলাম যে, আমি আমার হাত একটি নিরাপদ বর্মের ভেতর প্রবেশ করিয়েছি। অতপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাভী যবাই করা হচ্ছে এ কথার ব্যাখ্যা করে বললেন, কয়েকজন সাহাবা শহীদ হবেন। তলোয়ারে পরাজয়ের চিহ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বললেন যে, আমার পরিবারের কোন একজন শহীদ হবেন। নিরাপদ বর্মের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বললেন, এর অর্থ হচ্ছে মদীনা শহর।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতপর আভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা কৌশল সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করলেন যে, মুসলমানরা শহর থেকে বের হবে না। তারা মদীনার ভেতরেই অবস্থান করবে। কাফেররা তাদের তাঁবুতে অবস্থান করতে থাকুক। যদি তারা মদীনায় প্রবেশ করে তাহলে মুসলমানরা মদীনার অলিগলিতে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। মহিলারা ছাদের ওপর থেকে তাদের ওপর আঘাত হানবে। এই অভিমতই ছিলো সঠিক। মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইও এই অভিমতের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করলো। মজলিসে শূরায় এই মোনাফেক খাযরাজ গোত্রের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেছিলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিমতের সাথে এই মোনাফেক ঐকমত্য প্রকাশের কারণ এটা নয় যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিমত ও প্রতিরক্ষা কৌশল তার পছন্দ হয়েছিলো, বরং সে এ কারণেই পছন্দ করেছিলো যে, এতে একদিকে সে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে, অথচ কেউ সেটা বুঝতেও পারবে না। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ইচ্ছা ছিলো অন্যরকম। তিনি চেয়েছিলেন, প্রথমবারের মতো সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে চিহ্নিত ও অপমানিত এবং মুসলমানিত্বের আবরণে তার কুফুরীর পর্দা উন্মোচিত হোক। এছাড়া মুসলমানরা নিজেদের সঙ্কটকালীন সময়ে জেনে নিক যে, তাদের আস্তিনে কতো বিষাক্ত সাপ লুকিয়ে আছে।
বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি- এমন কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবা ময়দানে গিয়ে কাফেরদের সাথে মোকাবেলা করার জন্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরামর্শ দিলেন। তাঁরা জেহাদে অংশগ্রহণের জন্যে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলেন। কোন কোন সাহাবা বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমরা তো এই দিনের জন্যে আকাঙ্খা করছিলাম এবং আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছে মোনাজাতও করছিলাম। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আজ আমাদের সেই সুযোগ প্রদান করেছেন। আজ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ এসেছে। কাজেই হে আল্লাহর রসূল, আপনি শত্রুদের সামনে এগিয়ে চলুন, একথা মনে করবেন না যে, আমরা ভয় পাচ্ছি।
এ ধরনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা প্রকাশকারীদের মধ্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেবও ছিলেন। বদরের যুদ্ধে তিনি বিশেষ বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, সেই পবিত্র সত্ত্বার শপথ, যিনি আপনার ওপর কোরআন নাযিল করেছেন, মদীনার বাইরে কাফেরদের সাথে খোলা ময়দানে যুদ্ধ করার আগে আমি কোন আহার মুখে তুলবো না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকাংশ সাহাবার মতামতের প্রেক্ষিতে নিজ মতামত প্রত্যাহার করায়। শেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, মদীনার বাইরে খোলা ময়দানেই কাফেরদের মোকাবেলা করা হবে।
ইসলামী বাহিনীর বিন্যাস এবং যুদ্ধ যাত্রা এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার নামায পড়ালেন। নামায শেষে ওয়ায নসিহত করলেন। তিনি বললেন, ধৈর্য এবং দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমেই জয়লাভ করা সম্ভব হবে। সাথে সাথে মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন তারা যেন শত্রুর মোকাবেলার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যায়। একথা শোনার পর মুসলমানদের মনে আনন্দের স্রোত বয়ে যায়।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আসরের নামায আদায় করলেন তখন দেখলেন যে, বেশ কিছু সংখ্যক লোক সমবেত হয়েছে। মদীনার উপকণ্ঠ থেকেও কিছু লোক এসেছে। নামাযের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভেতরে প্রবেশ করলেন। হযরত আবু বকর এবং হযরত ওমর (রা.) তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথায় পাগড়ি বাঁধলেন এবং পোশাক পরিধান করালেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিচে এবং ওপরে বর্ম পরিধান করলেন, তলোয়ার সঙ্গে নিয়ে অন্যান্য অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সকলের সামনে হাযির হলেন।
সকলেই ছিলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের প্রতীক্ষায়। হঠাৎ করে হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা) এবং হযরত উসায়েদ ইবনে খুযায়ের (রা.) সাহাবাদের বললেন, আপনারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জোর করে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যাচ্ছেন। আপনারা তাঁকে বাধ্য করছেন। কাজেই বিষয়টি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ছেড়ে দিন। একথা শুনে সকলেই শরমিন্দা হলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইরে এলে তাঁর কাছে সবাই আরয করলেন যে, হে আল্লাহর রসূল, আমরা আপনার বিরোধিতা করেছি, এটা ঠিক হয়নি। আপনি যা ভালো মনে করেন, তাই করুন। আপনি যদি আমাদের মদীনায় থাকাই সমীচীন মনে করেন তবে আমরা ওতেই রাযি। আপনি তাই করুন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কোন নবী যখন অস্ত্র পরিধান করে নেন, তখন তা খুলে ফেলা তাঁর জন্যে সমীচীন নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর এবং তাঁর শত্রুদের মধ্যে ফয়সালা না করে দেন।
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৈন্যদের এভাবে তিনভাগে ভাগ করলেন: এক) মোহাজের বাহিনী। এই বাহিনীর পতাকা হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.)-কে প্রদান করা হয়। দুই) আনসারদের আওস গোত্রের বাহিনী। হযরত উসায়েদ ইবনে খুযায়ের (রা.)-কে এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। তিন) খাযরাজ গোত্রের বাহিনী। হযরত হাব্বাব ইবনে মুনযের (রা.) এই বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেন।
মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিলো সর্বসাকুল্যে এক হাজার। এদের মধ্যে একশত জন বর্ম পরিহিত এবং পঞ্চাশজন ঘোড় সওয়ার ছিলেন।
অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, ঘোড় সওয়ার সৈন্য একজনও ছিলো না। যুদ্ধ চলাকালে মদীনায় অবস্থানরত সাহাবীদের নামায পড়ানোর দায়িত্ব হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর ওপর দিয়ে পরে মুসলিম সৈন্যদের রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। মুসলিম সৈন্যরা উত্তর দিকে রওয়ানা হন। হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা (রা.) বর্ম পরিহিত অবস্থায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে থাকা অবস্থায় এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
'ছানিয়াতুল বিদা' নামক স্থানে পৌঁছার পর একটি সৈন্যদল দেখা গেলো। এরা উৎকৃষ্ট অস্ত্রে সজ্জিত এবং পুরো সেনাবাহিনী থেকে পৃথক ছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তারা বললো, তারা খাযরাজ গোত্রের মিত্র এবং ইহুদী। কিন্তু তারা মক্কার কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে লড়াই করতে চায়। তাদের মুসলমান হওয়ার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানো হলো যে, তারা মুসলমান হয়নি এবং হওয়ার ইচ্ছাও নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেরদের বিরুদ্ধে ইহুদীদের সাহায্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন।
সৈন্যদল পরিদর্শন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাইখান নামক জায়গায় পৌঁছে মুসলিম সৈন্যদের পরিদর্শন করলেন। এই জায়গায় পরিদর্শন শেষে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং যুদ্ধের জন্যে অনুপযোগিদের ফেরত পাঠানো হলো। যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছিলো তাঁরা হলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), হযরত ওসামা ইবনে যায়েদ (রা.), হযরত ওসায়েদ ইবনে যহির (রা.), যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.), হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.), হযরত ওসামা ইবনে আওস (রা.), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.), হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা আনসারী (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে হিব্বাহ (রা.)। এই তালিকায় হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.)-এর নামও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কিন্তু সহীহ বোখারীর মতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি ওহুদের যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন।
কম বয়স্ক হওয়া সত্তেও হযরত রাফে ইবনে খাদিজ (রা.) এবং হযরত সামুরা ইবনে জুন্দব (রা.)-কে জেহাদে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। এর কারণ ছিলো এই যে, হযরত রাফে ইবনে খাদিজ (রা.) তীরন্দাজ হিসাবে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তাঁকে অনুমতি দেয়ার পর হযরত সামুরা ইবনে জুন্দব (রা.) বললেন, আমি তো রাফের চেয়ে অধিক শক্তিশালী। কুস্তিতে তাকে আমি আছড়ে দিতে পারি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একথা জানানো হলে তিনি উভয়কে কুস্তি লড়ার আদেশ দিলেন। সেই কুস্তিতে হযরত সামুরা ইবনে জুন্দব (রা.) সত্যিই হযরত রাফেকে আছড়ে দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সামুরা (রা.)-কেও অংশগ্রহণের অনুমতি দিলেন।
ওহুদ ও মদীনার মাঝামাঝি স্থানে রাত্রিযাপন শাইখান নামক জায়গাতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে মাগরেব এবং এশার নামায আদায় করে রাত্রি যাপনের সিদ্ধান্ত করলেন। মুসলমানদের তাঁবুর চারদিকে পাহারাদারদের নেতা ছিলেন হযরত মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা আনসারী (রা.)। তিনিই ইহুদী কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যাকান্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর সাফওয়ান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে কয়েস (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাহারায় নিযুক্ত ছিলেন।
মোনাফেকদের বিশ্বাসঘাতকতা মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর দুরভিসন্ধি সফল হওয়ার কাছাকাছি ছিলো। তার ও তার সঙ্গীদের পিছুটান দেখে আওস গোত্রের বনু হারেসা এবং খাযরাজ গোত্রের বনু সালমার দলও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলো। তারা ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলো। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই দুই গোত্রের লোকদের মনে ঈমানী চেতনা জাগ্রত করে দেয়ায় তারা যুদ্ধের জন্যে সঙ্কল্পে অটল হয়ে রইলেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'যখন তোমাদের মধ্যেকার দু'টি দল ভীরুতার পরিচয় দেয়ার ইচ্ছা করেছিলো এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের বন্ধু। মোমেনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত।'
মোনাফেকরা মদীনায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে এমনি নাযুক পরিস্থিতিতে তাদের কর্তব্য সম্পর্কে হযরত জাবের (রা.)-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারাম (রা.) সচেতন করতে চাইলেন। তিনি প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশী মোনাফেকদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে তাদের পেছনে কিছুদুর গিয়ে বললেন, এখনো ফিরে চলো, আল্লাহর পথে লড়াই করো। কিন্তু তারা জবাব দিলো যে, যদি আমরা জানতাম যে, আপনারা যুদ্ধ করবেন তাহলে আমরা ফিরে যেতাম না। একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারাম (রা.) বললেন, ওহে আল্লাহর শত্রুরা, তোমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নাযিল হবে। স্মরণ রেখো, আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে তোমাদের মুখাপেক্ষি রাখবেন না।
সেই মোনাফেকদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করলেন, 'এবং মোনাফেকদের জানবার জন্যে তাদেরকে বলা হয়েছিলো', এসো, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো অথবা প্রতিরোধ করো। তারা বললো, যদি যুদ্ধ জানতাম, তবে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করতাম। সেদিন তারা ঈমান অপেক্ষা কুফুরীর নিকটতর ছিলো। যা তাদের অন্তরে নেই, তা তারা মুখে বলে। যা তারা গোপন রাখে, আল্লাহ তায়ালা তা বিশেষভাবে অবহিত। (আলে ইমরান, আয়াত ১৬৭)

টিকাঃ
১. অবশ্য ফাতহুল বারী গ্রন্থে ঘোড়ার সংখ্যা বলা হয়েছে একশত (৭তম খন্ড, ৩৪৬ পৃ)
২. সীরাতে হালবিয়াহ দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ১৪
৩. মোসনাদে আহমদ, নাসাঈ, ইবনে ইসহাক।
৪. ইবনে কাইয়েম যাদুল মায়াদ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডের ৯২ পৃষ্ঠায় একথা লিখেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, এটা ভুল। মূসা ইবনে ওকবা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, ওহুদের যুদ্ধে কোন ঘোড়া ব্যবহার করা হয়নি। ওয়াকেদী লিখেছেন, মাত্র ২টি ঘোড়া ছিলো। একটি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এবং অন্যটি আবু যোবদা (রা)-এর কাছে ছিলো। ফতহুল বারী সপ্তম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৫০।
৫. এই ঘটনা ইবনে সা'দ বর্ণনা করেছেন। এই বর্ণনায় একথাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওরা ছিলো বনি কায়নুকা গোত্রের ইহুদী। কিন্তু এ তথ্য সঠিক নয়। কেননা বনি কায়নুকা গোত্রের লোকদের বদর যুদ্ধের কিছুদিন পরই মদীনা থেকে বের করে দেয়া হয়।
৬. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৬৫-৬৬।
৭. আহমদ তিবরানী হাকেম হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। ফতহুল বারী সপ্তম খন্ডের ৩৫০ পৃ. দ্রষ্টব্য।
৮. সহীহ বোখারী, কিতাবুল জেহাদ, প্রথম খন্ড, পৃ. ৪২৬।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মদীনার সন্নিকটে কাফেরদের উপস্থিতি ও মজলিসে শুরার বৈঠক

📄 মদীনার সন্নিকটে কাফেরদের উপস্থিতি ও মজলিসে শুরার বৈঠক


মক্কার বাহিনী মদীনা অভিমুখে এগিয়ে চললো। আবওয়ার নামক জায়গায় পৌঁছার পর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা প্রস্তাব দিলো যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মা বিবি আমেনার কবর খুঁজে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করা হোক। কিন্তু এ নারীর ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে কোরায়শ নেতারা রাযি হলো না। তারা ভেবে দেখলো যে, এ কাজের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ।
আবওয়া থেকে কাফেররা সফর অব্যাহত রাখলো। মদীনার কাছে পৌঁছে আকিক প্রান্তর অতিক্রম করলো। এরপর কিছুটা ডানে গিয়ে ওহুদ পর্বতের নিকটবর্তী আইনাইন নামক জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করলো। আইনাইন মদীনার উত্তরে কানাত প্রান্তরের কাছে একটি উর্বর ভূমি। এটা তৃতীয় হিজরীর ৬ই শাওয়াল রোজ শুক্রবারের ঘটনা।
মজলিসে শূরার বৈঠক
অমুসলিমদের গতিবিধির পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর মুসলিম সংবাদ বাহকরা মদীনায় পৌছে দিচ্ছিলেন। তাদের অবস্থান গ্রহণের খবরও মদীনায় পৌঁছে গেলো। সেই সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজলিসে শূরার বৈঠক আহ্বান করলেন। সেই বৈঠকে মদীনার প্রতিরক্ষা সম্পর্কে জরুরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার চিন্তা করা হচ্ছিলো। শুরুতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দেখা একটি স্বপ্নের কথা সাহাবাদের জানালেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর শপথ আমি একটা ভালো জিনিস দেখেছি। আমি দেখলাম কিছুসংখ্যক গাভীকে যবাই করা হচ্ছে। আমি দেখলাম আমার তরবারির ওপর পরাজয়ের কিছু চিহ্ন। আমি আরো দেখলাম যে, আমি আমার হাত একটি নিরাপদ বর্মের ভেতর প্রবেশ করিয়েছি। অতপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাভী যবাই করা হচ্ছে এ কথার ব্যাখ্যা করে বললেন, কয়েকজন সাহাবা শহীদ হবেন। তলোয়ারে পরাজয়ের চিহ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বললেন যে, আমার পরিবারের কোন একজন শহীদ হবেন। নিরাপদ বর্মের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বললেন, এর অর্থ হচ্ছে মদীনা শহর।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতপর আভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা কৌশল সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করলেন যে, মুসলমানরা শহর থেকে বের হবে না। তারা মদীনার ভেতরেই অবস্থান করবে। কাফেররা তাদের তাঁবুতে অবস্থান করতে থাকুক। যদি তারা মদীনায় প্রবেশ করে তাহলে মুসলমানরা মদীনার অলিগলিতে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। মহিলারা ছাদের ওপর থেকে তাদের ওপর আঘাত হানবে। এই অভিমতই ছিলো সঠিক। মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইও এই অভিমতের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করলো। মজলিসে শূরায় এই মোনাফেক খাযরাজ গোত্রের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেছিলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিমতের সাথে এই মোনাফেক ঐকমত্য প্রকাশের কারণ এটা নয় যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিমত ও প্রতিরক্ষা কৌশল তার পছন্দ হয়েছিলো, বরং সে এ কারণেই পছন্দ করেছিলো যে, এতে একদিকে সে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে, অথচ কেউ সেটা বুঝতেও পারবে না। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ইচ্ছা ছিলো অন্যরকম। তিনি চেয়েছিলেন, প্রথমবারের মতো সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে চিহ্নিত ও অপমানিত এবং মুসলমানিত্বের আবরণে তার কুফুরীর পর্দা উন্মোচিত হোক। এছাড়া মুসলমানরা নিজেদের সঙ্কটকালীন সময়ে জেনে নিক যে, তাদের আস্তিনে কতো বিষাক্ত সাপ লুকিয়ে আছে।
বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি- এমন কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবা ময়দানে গিয়ে কাফেরদের সাথে মোকাবেলা করার জন্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরামর্শ দিলেন। তাঁরা জেহাদে অংশগ্রহণের জন্যে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলেন। কোন কোন সাহাবা বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমরা তো এই দিনের জন্যে আকাঙ্খা করছিলাম এবং আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছে মোনাজাতও করছিলাম। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আজ আমাদের সেই সুযোগ প্রদান করেছেন। আজ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ এসেছে। কাজেই হে আল্লাহর রসূল, আপনি শত্রুদের সামনে এগিয়ে চলুন, একথা মনে করবেন না যে, আমরা ভয় পাচ্ছি।
এ ধরনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা প্রকাশকারীদের মধ্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেবও ছিলেন। বদরের যুদ্ধে তিনি বিশেষ বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, সেই পবিত্র সত্ত্বার শপথ, যিনি আপনার ওপর কোরআন নাযিল করেছেন, মদীনার বাইরে কাফেরদের সাথে খোলা ময়দানে যুদ্ধ করার আগে আমি কোন আহার মুখে তুলবো না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকাংশ সাহাবার মতামতের প্রেক্ষিতে নিজ মতামত প্রত্যাহার করায়। শেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, মদীনার বাইরে খোলা ময়দানেই কাফেরদের মোকাবেলা করা হবে।

টিকাঃ
২. সীরাতে হালবিয়াহ দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ১৪

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ইসলামী বাহিনীর বিন্যাস এবং যুদ্ধ যাত্রা

📄 ইসলামী বাহিনীর বিন্যাস এবং যুদ্ধ যাত্রা


রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর সেনা বিন্যাস করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে রওয়ানা হয়ে যান। সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতের ইশারা করে দেখিয়ে বলছিলেন যে, আগামীকাল ইনশাল্লাহ এই জায়গা হবে অমুকের বধ্যভূমি এবং এই জায়গা হবে অমুকের বধ্যভূমি।
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে একটি গাছের শেকড়ের কাছে রাত্রিযাপন করেন। সাহাবারাও নিরুদ্বেগ প্রশান্তির সাথে রাত কাটান। তাদের অন্তর ছিলো আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ শান্তি ও নিশ্চিন্ততার সাথে সময় অতিবাহিত করেন। তাদের মনে প্রত্যাশা ছিলো যে, সকালে নিজ চোখে মহান প্রতিপালকের সুসংবাদের প্রমাণ দেখতে পাবেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'স্মরণ কর, তিনি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন করেন এবং আকাশ থেকে তোমাদের ওপর বারি বর্ষণ করেন, তা দ্বারা তোমাদের তিনি পবিত্র করবেন, তোমাদের থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা অপসারণ করবেন, তোমাদের হৃদয় দৃঢ় করবেন এবং তোমাদের পা স্থির রাখবেন।' (সূরা আনফাল, আয়াত ১১)
এটি ছিলো দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ই রমযানের রাত। এই মাসের ৮ বা ১২ তারিখ তিনি মদীনা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন।
শত্রুদের পারস্পরিক মতবিরোধ কোরায়শরা বদরের শেষ প্রান্তে টিলার ওপাশে নিজেদের তাঁবুতে রাত্রিযাপন করে। সকালে টিলার এ পাশে বদর প্রান্তরে এসে সমবেত হয়। একদল লোক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাউযের দিকে অগ্রসর হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন ওদের বাধা দিও না। পরে দেখা গেছে যে, লোকদের মধ্যে যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাউয থেকে পানি পান করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলো, তারা সবাই নিহত হয়েছিলো। একমাত্র হাকিম ইবনে হিযাম বেঁচে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে হাকিম ইসলাম গ্রহণ করে একজন ভালো মুসলমান হয়েছিলেন। তার নিয়ম ছিলো যে, তিনি যখনই কসম খেতেন, তখনই বলতেন, 'লায়াল্লাযি নাজ্জানি মিন ইয়াওমে বাদরিন।' অথাৎ সেই সত্তার শপথ, যিনি আমাকে বদরের দিন মুক্তি দিয়েছেন।
কোরায়শরা মুসলমানদের সৈন্য সমাবেশ লক্ষ্য করার পর এদের শক্তি পরিমাপ করার জন্যে ওমায়ের ইবনে ওয়াহাব জাহামীকে প্রেরণ করলো। ওমায়ের এক চক্কর দিয়ে ফিরে গিয়ে বললো, মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা তিনশত বা কিছু কম বেশী হবে। আমি একটু দেখে আসি তাদের কোন সহায়ক বাহিনী আছে কিনা। বেশ কিছুদূরে ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে এসে ওমায়ের বললো সহায়ক কোন সৈন্য মুসলমানরা পশ্চাতে রেখে আসেনি। তবে একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি যে, ইয়াসরেবের উটগুলো নির্ভেজাল মৃত্যু বহন করে নিয়ে এসেছে। ওদের সমুদয় শক্তি তলোয়ারের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহর শপথ, আমি যা বুঝেছি, এতে মনে হয়েছে যে, ওরা কেউ তোমাদের না মেরে মরবে না। যদি তোমাদের বিশিষ্ট লোকদের ওরা মেরেই ফেলে, তবে তোমরা বিশিষ্ট সঙ্গীহারা হয়ে যাবে। কাজেই যা কিছু করবে, ভেবে চিন্তে করাই সমীচীন।
এ সময় আরো একদল যুদ্ধবিরোধী লোক আবু জেহেলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠলো। কিন্তু আবু জেহেল যুদ্ধ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যুদ্ধবিরোধী লোকেরা চাচ্ছিলো যে, যুদ্ধ না করেই মক্কায় ফিরে যাবে। যেমন হাকিম ইবনে হিযাম যুদ্ধ চাচ্ছিলেন না। তিনি এখানে ওখানে ছুটোছুটি করতে লাগলেন। প্রথমে ওতবা ইবনে রবিয়ার কাছে গেলেন। বললেন, হে আবুল ওলীদ, আপনি কোরায়শদের বিশিষ্ট ব্যক্তি। আপনার আনুগত্য সবাই বিনাবাক্যে মেনে নেয়। আপনি একটি ভালো কাজ করুন। এর ফলে সব সময় আপনার আলোচনা মানুষের মুখে মুখে থাকবে। ওতবা বললেন, সেটা কি কাজ হাকিম? হাকিম বললেন, আপনি সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। নাখলার ছারিয়াঁয় নিহত আপনার মিত্র আমর ইবনে হাদরামির হত্যার ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব আপনি নিজের ওপর নিয়ে নিন। ওতবা বললো, আমি রাযি আছি। তুমি আমার পক্ষ থেকে যামানত লও। আমর ইবনে হাদরামি আমার মিত্র, তার মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের দায়িত্বও আমার ওপরই বর্তায়। তার যে সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে, আমি তা পুষিয়ে দেবো।
এরপর ওতবা হাকিম ইবনে হিযামকে বললো, তুমি হানজালিয়ার ছেলে (আবু জেহেলের মায়ের নাম ছিলো হানজালিয়া) অর্থাৎ আবু জেহেলের কাছে যাও। সেই সব কিছু বিগড়াচ্ছে, লোকদের উস্কানি দেয়ার মূলে তার হাতই সক্রিয় রয়েছে।
এরপর ওতবা ইবনে রবিয়া দাঁড়িয়ে বক্তৃতার ভঙ্গিতে বললো, হে কোরায়শরা, তোমরা মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের সাথে লড়াই করে বিশেষ কোন কৃতিত্ব দেখাতে পারবে না। খোদার কসম, যদি তারা তোমাদের মেরে ফেলে, তবে এমন সব চেহারাই দেখতে পাবে, যাদের নিহত অবস্থায় তোমরা দেখতে চাইবে না। কারণ তোমরা তো চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই অথবা নিজের গোত্রের অন্য কাউকেই হত্যা করবে। আরবের অন্য লোকেরা যদি মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের মেরে ফেলে তবে তোমাদের ইচ্ছাই পূরণ হবে। আর যদি অন্য কোন পরিস্থিতি দেখা দেয়, তবে মনে রেখো, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের হাতে তোমরা এমন অবস্থায় পড়বে যে, তাদের সাথে অতীতে যা করেছে, সবই তারা মনে রেখেছে। কাজেই চলো আমরা ফিরে যাই, আমরা নিরপেক্ষ থাকবো।
হাকিম ইবনে হিযাম আবু জেহেলের কাছে গিয়ে লক্ষ্য করলো যে, সে নিজের বর্ম পরিষ্কার করছে। হাকিম বললো, হে আবুল হাকাম, ওতবা আমাকে আপনার কাছে এই পয়গাম নিয়ে পাঠিয়েছেন। আবু জেহেল বললো, খোদার কসম, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের দেখে ওতবার বুক শুকিয়ে গেছে। কিন্তু আমি কিছুতেই মক্কায় ফিরে যাবো না। খোদাতায়া'লা মোহাম্মদ এবং আমাদের মধ্যে একটা ফয়সালা না করা পর্যন্ত আমরা মক্কায় ফিরে যাবো না। ওতবা যা কিছু বলেছে, সেটা এ জন্যেই বলেছে যে, সে মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছে। ওতবার পুত্রও ওদের সঙ্গে রয়েছে এ কারণে সে ওদের ব্যাপারে তোমাদের ভয় দেখাচ্ছে। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ওতবার পুত্র হোযায়ফা অনেক আগেই ইসলাম গ্রহণ হিজরত করে মদীনায় চলে যান।) ওতবা যখন খবর পেলো যে, আবু জেহেল তার সম্পর্কে বলেছে যে, খোদার কসম, ওতবার বুক শুকিয়ে গেছে, তখন সে বললো, আবু জেহেল শীঘ্রই জানতে পারবে যে, কার বুক শুকিয়ে গেছে, আমার না তার। আবু জেহেল ওতবার এই প্রতিক্রিয়ার খবরে ভয় পেয়ে গেলো।
এটা যেন দীর্ঘায়িত না হয়, এজন্যে সে নাখলার ছারিয়্যায় নিহত আমর ইবনে হাদরামীর ভাই আমের ইবনে হাদরামিকে ডেকে পাঠালো। আমের আসার পর আবু জেহেল বললো, তোমাদের মিত্র ওতবা লোকদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তোমরা নিজেদের ওপর যুলুম নিজেদের চোখে দেখেছ। কাজেই ওঠো, তোমাদের প্রতি যে যুলুম করা হয়েছে, তোমরা যে মযলুম একথা জোর গলায় বলো, তোমার ভাইয়ের নিহত হওয়ার ঘটনা সবাইকে নতুন করে জানাও। একথা শুনে আমের উঠে দাঁড়ালো এবং নিজের পাছার কাপড় খুলে চিৎকার করতে লাগলো। সে বললো, হায় আমর, আয় আমর, হায় আমর। এই চিৎকার শুনে সবাই জড়ো হলো, যুদ্ধ করার ইচ্ছা সবার মনে প্রবল হয়ে দেখা দিলো। মুসলমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। ওতবা যে আহ্বান জানিয়েছিলো, সেটা ব্যর্থ হলো। এমনি করে হুশের ওপর জোশ জয়ী হলো, যুদ্ধ না করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলো।
উভয় বাহিনী একে অপরের মুখোমুখি অমুসলিমরা দলে দলে বেরিয়ে এলো এবং উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হতে শুরু করলো। এ সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে আল্লাহ তায়ালা, কোরায়শরা পরিপূর্ণ অহংকারের সাথে তোমার বিরোধিতায় এবং তোমার রসূলকে মিথ্যা প্রমাণ করতে এগিয়ে এসেছে। হে আল্লাহ তায়ালা, আজ তোমার প্রতিশ্রুত সাহায্য বড় বেশী প্রয়োজন। হে আল্লাহ তায়ালা, তুমি আজ ওদের ছিন্ন ভিন্ন করে দাও।'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওতবাকে তার লাল উটের ওপর দেখে বললেন, কওমের কারো কাছে যদি কল্যাণ থাকে তবে লাল উটের আরোহীর কাছে রয়েছে। অন্যরা যদি তার কথা মেনে নিতো, তবে সঠিক পথ প্রাপ্ত হতো।'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সময় মুসলমানদের কাতারবন্দী করলেন। তখন একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলো।
নবী (সাঃ)-এর হাতে ছিলো একটি তীর। সেটির সাহায্যে তিনি কাতার সোজা করছিলেন। এ সময় তীরের ফলা ছাওয়াদ ইবনে গাযিয়ার পেটে একটু খানি লাগলো। তিনি কাতার থেকে একটুখানি সামনে এগিয়ে এসেছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তীরের ফলা ছাওয়াদের পেটে লাগিয়ে বলেছিলেন, ছাওয়াদ, সোজা হয়ে যাও। ছাওয়াদ তৎক্ষণাৎ বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনি আমাকে কষ্ট দিয়েছেন, বদলা নিতে দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পেটের ওপর থেকে জামা সরিয়ে বললেন, নাও প্রতিশোধ নাও। ছাওয়াদ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জড়িয়ে ধরে তাঁর পবিত্র পেটে চুম্বন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ছাওয়াদ তুমি এমন কাজ করতে কিভাবে উদ্বুদ্ধ হলে? ছাওয়াদ বললেন, হে আল্লাহর রসূল, যা কিছু ঘটতে চলেছে, আপনি তো সবই দেখছেন। আমার একান্ত ইচ্ছা হলো যে, আপনার ঘনিষ্ঠতা যেন আমার জীবনের শেষ স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকে। আপনার পবিত্র দেহের সাথে আমার দেহের সংস্পর্শ যেন জীবনের শেষ ঘটনা হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা শুনে ছাওয়াদকে দোয়া করলেন।
কাতার সোজা করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের বললেন, তাঁর পক্ষ থেকে নির্দেশ না পেয়ে কেউ যেন যুদ্ধ শুরু না করে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর যুদ্ধ পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষ পথনির্দেশ প্রদান করলেন। তিনি বললেন, পৌত্তলিকরা যখন দলবদ্ধভাবে তোমাদের কাছে আসবে, তখন তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করবে। তীরের অপচয় যেন না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে। ওরা তোমাদের ঘিরে না ফেলা পর্যন্ত তরবারি চালনা করবে না। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে অবস্থান কেন্দ্রে চলে গেলেন। হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) পাহারাদার সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাহারায় নিযুক্ত হলেন।
অন্যদিকে পৌত্তলিকদের অবস্থা ছিলো এই যে, আবু জেহেল আল্লাহর কাছে ফয়সালার জন্যে দোয়া করলো। সে বললো, হে আল্লাহ, আমাদের মধ্যে যে দল আত্মীয়তার সম্পর্ক অধিক ছিন্ন করেছে এবং ভুল কাজ করেছে, আজ তুমি তাদের ধ্বংস করে দাও। হে আল্লাহ, আমাদের মধ্যে যে দল তোমার কাছে অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয়, আজ তুমি তাদের সাহায্য করো। পরবর্তী সময়ে আবু জেহেলের এই কথার প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'তোমরা মীমাংসা চেয়েছিলে, তা-তো তোমাদের কাছে এসেছে। যদি তোমরা বিরত হও, তবে সেটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর, যদি তোমরা পুনরায় তা করো, তবে আমিও পুনরায় শাস্তি দেবো এবং তোমাদের দল সংখ্যায় অধিক হলেও তোমাদের কোন কাজে আসবে না এবং আল্লাহ তায়ালা মোমেনদের সঙ্গে রয়েছেন।' (সূরা আনফাল, আয়াত ১৯)

টিকাঃ
১. জামে তিরমিযি, আবওয়াবুল জেহাদ, ১ম খন্ড, পৃ. ২০১
২. মেশকাত ২য় খন্ড, পৃ. ৫৪৩
৩. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৬৮
৪. সুনানে আবু দাউদ, ২য় খন্ড পৃ. ১৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00