📄 প্রতিশোধের জন্যে কোরায়শদের প্রস্তুতি
বদরের যুদ্ধে মক্কাবাসীদের পরাজয় ও অবমাননা এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকের নিহত হওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিলো। এ কারণে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রোধে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু নিহতদের জন্যে শোক প্রকাশ ও আহাযারি করতে কোরায়শ নেতারা নিহতদের আত্মীয়স্বজনকে নিষেধ করে দিয়েছিলো। যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ পরিশোধেও তাড়াহুড়ো করতে নিষেধ করা হয়। তাদের শোকের গভীরতা এবং মানসযন্ত্রণা তারা মুসলমানদের জানতে দিতে চাচ্ছিলো না। বদরের যুদ্ধের পর কাফেররা সম্মিলিতভাবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধ করে তারা নিজেদের মনের জ্বালা জুড়াবে। এই যুদ্ধে তাদের ক্রোধও প্রশমিত হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরপরই তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলো। কোরায়শ নেতাদের মধ্যে এ যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ইকরামা ইবনে আবি জেহেল, সফওয়ান ইবনে উমাইয়া, আবু সুফিয়ান ইবনে হরব এবং আবদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ ছিলো অগ্রগণ্য।
আবু সুফিয়ানের যে কাফেলা বদর যুদ্ধের কারণ হয়েছিলো, সেই কাফেলা মালামালসহ আবু সুফিয়ান সরিয়ে নিতে সফল হয়েছিলো। সেই কাফেলার সমুদয় মালামাল যুদ্ধের জন্যে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। মালামালের মালিকদের বলা হয় যে, কোরায়শ বংশের লোকেরা, শোনো, মোহাম্মদ তোমাদেরকে কঠিন আঘাত হেনেছে। কাজেই তার সাথে যুদ্ধ করতে তোমরা তোমাদের এই মালামাল দিয়ে সহায়তা করো। তোমাদের নির্বাচিত সর্দারদের ওরা হত্যা করেছে। পুনরায় যুদ্ধ করলে আমরা হয়তো প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হবো। কোরায়শরা এ আবেদনে সাড়া দিয়ে নিজেদের সমুদয় মাল যুদ্ধের জন্যে দান করতে রাযি হয়। সেই মালামালের পরিমাণ ছিলো এক হাজার উট, এবং পঞ্চাশ হাজার দীনার। যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে উটগুলো বিক্রি করে দেয়া হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা রব্বুল আলামীন এ আয়াত নাযিল করেন। 'আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত্ত করার জন্যে কাফেররা তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তারা ধন-সম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে। অতপর সেটা তাদের মনস্তাপের কারণ হবে। এরপর তারা পরাভূত হবে এবং যারা কুফুরী করে, তাদেরকে জাহান্নামে একত্র করা হবে।' (সূরা আনফাল, আয়াত ৩, ৬)
এরপর কোরায়শরা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের জন্যে উদাত্ত আহ্বান জানালো। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বিভিন্ন গোত্রের লোকদের উদ্বুদ্ধ করা হলো। সবাইকে কোরায়শদের পতাকাতলে সমবেত হতে বললো। নানা প্রকার লোভও দেখানো হলো। আবু ওযযা নামের একজন কবি বদরের যুদ্ধে বন্দী হয়েছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বিনা মুক্তিপণেই মুক্তি দিয়েছিলেন। তার কাছ থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়েছিলো যে, সে ভবিষ্যতে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন কাজ করবে না। কিন্তু মক্কায় ফিরে আসার পর সফওয়ান ইবনে উমাইয়া তাকে বুঝালো যে, তুমি বিভিন্ন গোত্রের লোকদের কাছে যাও, তাদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষার কবিতার মাধ্যমে ক্ষেপিয়ে তোলো। আমি যদি যুদ্ধ থেকে ভালোভাবে ফিরে আসতে পারি তবে তোমাকে প্রচুর অর্থ-সম্পদ দেবো অথবা তোমার কন্যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করবো। এ প্রলোভনে গলে গিয়ে আবু ওযযা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কৃত অঙ্গীকার ভেঙ্গে ফেললো। বিভিন্ন গোত্রে গিয়ে সে লোকদের উদ্দীপনাময় কবিতার মাধ্যমে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপাতে লাগলো। কোরায়শ নেতারা একইভাবে অন্য একজন কবি মোসাফা ইবনে আবদে মন্নাফ জুহামিকেও দলে টেনে এনেছিলো। এমনিভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কাফেরদের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা বেড়ে চললো।
বছর পূর্ণ হতেই কোরায়শদের যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হলো। নিজেদের ঘনিষ্ঠ লোক ছাড়াও কোরায়শদের মিত্র মিলে সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ালো তিন হাজার। কোরায়শ নেতারা কিছুসংখ্যক সুন্দরী মহিলাকেও যুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করলো। সে অনুযায়ী পনের জন সুন্দরীকেও যুদ্ধক্ষেত্রে নেয়া হলো। এদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে নেয়ার যুক্তি দেখানো হলো, এদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষার প্রেরণায় যুদ্ধে বীরত্ব ও আত্মত্যাগের মানসিকতা বেশী কাজ করবে। যুদ্ধে তিন হাজার উট এবং দু'শো ঘোড়া নেয়ার জন্যে প্রস্তুত করা হলো।¹ ঘোড়াগুলোকে অধিকতর সক্রিয় রাখতে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত পুরো পথ তাদের পিঠে কাউকে আরোহণ করানো হয়নি। এছাড়া নিরাপত্তামূলক অস্ত্রের মধ্যে তিন হাজার বর্মও অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
আবু সুফিয়ান ছিলো সৈন্যদের সিপাহসালার। খালেদ ইবনে ওলীদকে সাহায্যকারী ঘোড় সওয়ার বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়া হলো। ইকরামা ইবনে আবু জেহেলকে তার সহকারী নিযুক্ত করা হলো। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বনি আবদুদ দার গোত্রের কাছে যুদ্ধে পতাকা দেয়া হলো।
টিকাঃ
১. অবশ্য ফাতহুল বারী গ্রন্থে ঘোড়ার সংখ্যা বলা হয়েছে একশত (৭তম খন্ড, ৩৪৬ পৃ)
📄 মদীনা অভিমুখে অমুসলিমদের যাত্রা
মক্কার বাহিনী মদীনা অভিমুখে এগিয়ে চললো। আবওয়ার নামক জায়গায় পৌঁছার পর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা প্রস্তাব দিলো যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মা বিবি আমেনার কবর খুঁজে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করা হোক। কিন্তু এ নারীর ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে কোরায়শ নেতারা রাযি হলো না। তারা ভেবে দেখলো যে, এ কাজের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ।
আবওয়া থেকে কাফেররা সফর অব্যাহত রাখলো। মদীনার কাছে পৌঁছে আকিক প্রান্তর অতিক্রম করলো। এরপর কিছুটা ডানে গিয়ে ওহুদ পর্বতের নিকটবর্তী আইনাইন নামক জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করলো। আইনাইন মদীনার উত্তরে কানাত প্রান্তরের কাছে একটি উর্বর ভূমি। এটা তৃতীয় হিজরীর ৬ই শাওয়াল রোজ শুক্রবারের ঘটনা।
📄 পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরী ব্যবস্থা
যে কোন অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যে এরপর মদীনার মুসলমানরা অস্ত্র সঙ্গে রাখতে শুরু করলেন। এমনকি নামাযের সময়েও অস্ত্র দূরে সরিয়ে রাখা হতো না।
কয়েকজন আনসারকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিরাপত্তা রক্ষায় নিযুক্ত করা হলো। এদের মধ্যে ছিলেন হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.), উসায়েদ ইবনে খোযায়ের (রা.) এবং সা'দ ইবনে ওবাদা (রা.)। এরা সশস্ত্র অবস্থায় সারা রাত প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গৃহে পাহারায় থাকতেন।
মদীনার বিভিন্ন প্রবেশ পথেও বেশ কয়েকজন মুসলমানকে নিয়োগ করা হলো। যে কোন ধরনের আকস্মিক হামলা মোকাবেলায় এরা প্রস্তুত ছিলেন। ছোট ছোট কয়েকটি বাহিনীকে শত্রুদের গতিবিধির ওপর নযর রাখতে মদীনার বাইরের রাস্তায়ও নিযুক্ত করা হলো।
মদীনার সন্নিকটে কাফেরদের উপস্থিতি মক্কার বাহিনী মদীনা অভিমুখে এগিয়ে চললো। আবওয়ার নামক জায়গায় পৌঁছার পর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা প্রস্তাব দিলো যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মা বিবি আমেনার কবর খুঁজে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করা হোক। কিন্তু এ নারীর ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে কোরায়শ নেতারা রাযি হলো না। তারা ভেবে দেখলো যে, এ কাজের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ।
আবওয়া থেকে কাফেররা সফর অব্যাহত রাখলো। মদীনার কাছে পৌঁছে আকিক প্রান্তর অতিক্রম করলো। এরপর কিছুটা ডানে গিয়ে ওহুদ পর্বতের নিকটবর্তী আইনাইন নামক জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করলো। আইনাইন মদীনার উত্তরে কানাত প্রান্তরের কাছে একটি উর্বর ভূমি। এটা তৃতীয় হিজরীর ৬ই শাওয়াল রোজ শুক্রবারের ঘটনা।
মজলিসে শূরার বৈঠক অমুসলিমদের গতিবিধির পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর মুসলিম সংবাদ বাহকরা মদীনায় পৌছে দিচ্ছিলেন। তাদের অবস্থান গ্রহণের খবরও মদীনায় পৌঁছে গেলো। সেই সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজলিসে শূরার বৈঠক আহ্বান করলেন। সেই বৈঠকে মদীনার প্রতিরক্ষা সম্পর্কে জরুরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার চিন্তা করা হচ্ছিলো। শুরুতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দেখা একটি স্বপ্নের কথা সাহাবাদের জানালেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর শপথ আমি একটা ভালো জিনিস দেখেছি। আমি দেখলাম কিছুসংখ্যক গাভীকে যবাই করা হচ্ছে। আমি দেখলাম আমার তরবারির ওপর পরাজয়ের কিছু চিহ্ন। আমি আরো দেখলাম যে, আমি আমার হাত একটি নিরাপদ বর্মের ভেতর প্রবেশ করিয়েছি। অতপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাভী যবাই করা হচ্ছে এ কথার ব্যাখ্যা করে বললেন, কয়েকজন সাহাবা শহীদ হবেন। তলোয়ারে পরাজয়ের চিহ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বললেন যে, আমার পরিবারের কোন একজন শহীদ হবেন। নিরাপদ বর্মের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বললেন, এর অর্থ হচ্ছে মদীনা শহর।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতপর আভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা কৌশল সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করলেন যে, মুসলমানরা শহর থেকে বের হবে না। তারা মদীনার ভেতরেই অবস্থান করবে। কাফেররা তাদের তাঁবুতে অবস্থান করতে থাকুক। যদি তারা মদীনায় প্রবেশ করে তাহলে মুসলমানরা মদীনার অলিগলিতে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। মহিলারা ছাদের ওপর থেকে তাদের ওপর আঘাত হানবে। এই অভিমতই ছিলো সঠিক। মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইও এই অভিমতের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করলো। মজলিসে শূরায় এই মোনাফেক খাযরাজ গোত্রের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেছিলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিমতের সাথে এই মোনাফেক ঐকমত্য প্রকাশের কারণ এটা নয় যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিমত ও প্রতিরক্ষা কৌশল তার পছন্দ হয়েছিলো, বরং সে এ কারণেই পছন্দ করেছিলো যে, এতে একদিকে সে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে, অথচ কেউ সেটা বুঝতেও পারবে না। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ইচ্ছা ছিলো অন্যরকম। তিনি চেয়েছিলেন, প্রথমবারের মতো সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে চিহ্নিত ও অপমানিত এবং মুসলমানিত্বের আবরণে তার কুফুরীর পর্দা উন্মোচিত হোক। এছাড়া মুসলমানরা নিজেদের সঙ্কটকালীন সময়ে জেনে নিক যে, তাদের আস্তিনে কতো বিষাক্ত সাপ লুকিয়ে আছে।
বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি- এমন কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবা ময়দানে গিয়ে কাফেরদের সাথে মোকাবেলা করার জন্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরামর্শ দিলেন। তাঁরা জেহাদে অংশগ্রহণের জন্যে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলেন। কোন কোন সাহাবা বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমরা তো এই দিনের জন্যে আকাঙ্খা করছিলাম এবং আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছে মোনাজাতও করছিলাম। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আজ আমাদের সেই সুযোগ প্রদান করেছেন। আজ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ এসেছে। কাজেই হে আল্লাহর রসূল, আপনি শত্রুদের সামনে এগিয়ে চলুন, একথা মনে করবেন না যে, আমরা ভয় পাচ্ছি।
এ ধরনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা প্রকাশকারীদের মধ্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেবও ছিলেন। বদরের যুদ্ধে তিনি বিশেষ বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, সেই পবিত্র সত্ত্বার শপথ, যিনি আপনার ওপর কোরআন নাযিল করেছেন, মদীনার বাইরে কাফেরদের সাথে খোলা ময়দানে যুদ্ধ করার আগে আমি কোন আহার মুখে তুলবো না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকাংশ সাহাবার মতামতের প্রেক্ষিতে নিজ মতামত প্রত্যাহার করায়। শেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, মদীনার বাইরে খোলা ময়দানেই কাফেরদের মোকাবেলা করা হবে।
ইসলামী বাহিনীর বিন্যাস এবং যুদ্ধ যাত্রা এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার নামায পড়ালেন। নামায শেষে ওয়ায নসিহত করলেন। তিনি বললেন, ধৈর্য এবং দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমেই জয়লাভ করা সম্ভব হবে। সাথে সাথে মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন তারা যেন শত্রুর মোকাবেলার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যায়। একথা শোনার পর মুসলমানদের মনে আনন্দের স্রোত বয়ে যায়।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আসরের নামায আদায় করলেন তখন দেখলেন যে, বেশ কিছু সংখ্যক লোক সমবেত হয়েছে। মদীনার উপকণ্ঠ থেকেও কিছু লোক এসেছে। নামাযের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভেতরে প্রবেশ করলেন। হযরত আবু বকর এবং হযরত ওমর (রা.) তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথায় পাগড়ি বাঁধলেন এবং পোশাক পরিধান করালেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিচে এবং ওপরে বর্ম পরিধান করলেন, তলোয়ার সঙ্গে নিয়ে অন্যান্য অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সকলের সামনে হাযির হলেন।
সকলেই ছিলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের প্রতীক্ষায়। হঠাৎ করে হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা) এবং হযরত উসায়েদ ইবনে খুযায়ের (রা.) সাহাবাদের বললেন, আপনারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জোর করে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যাচ্ছেন। আপনারা তাঁকে বাধ্য করছেন। কাজেই বিষয়টি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ছেড়ে দিন। একথা শুনে সকলেই শরমিন্দা হলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইরে এলে তাঁর কাছে সবাই আরয করলেন যে, হে আল্লাহর রসূল, আমরা আপনার বিরোধিতা করেছি, এটা ঠিক হয়নি। আপনি যা ভালো মনে করেন, তাই করুন। আপনি যদি আমাদের মদীনায় থাকাই সমীচীন মনে করেন তবে আমরা ওতেই রাযি। আপনি তাই করুন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কোন নবী যখন অস্ত্র পরিধান করে নেন, তখন তা খুলে ফেলা তাঁর জন্যে সমীচীন নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর এবং তাঁর শত্রুদের মধ্যে ফয়সালা না করে দেন।
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৈন্যদের এভাবে তিনভাগে ভাগ করলেন: এক) মোহাজের বাহিনী। এই বাহিনীর পতাকা হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.)-কে প্রদান করা হয়। দুই) আনসারদের আওস গোত্রের বাহিনী। হযরত উসায়েদ ইবনে খুযায়ের (রা.)-কে এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। তিন) খাযরাজ গোত্রের বাহিনী। হযরত হাব্বাব ইবনে মুনযের (রা.) এই বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেন।
মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিলো সর্বসাকুল্যে এক হাজার। এদের মধ্যে একশত জন বর্ম পরিহিত এবং পঞ্চাশজন ঘোড় সওয়ার ছিলেন।
অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, ঘোড় সওয়ার সৈন্য একজনও ছিলো না। যুদ্ধ চলাকালে মদীনায় অবস্থানরত সাহাবীদের নামায পড়ানোর দায়িত্ব হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর ওপর দিয়ে পরে মুসলিম সৈন্যদের রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। মুসলিম সৈন্যরা উত্তর দিকে রওয়ানা হন। হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা (রা.) বর্ম পরিহিত অবস্থায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে থাকা অবস্থায় এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
'ছানিয়াতুল বিদা' নামক স্থানে পৌঁছার পর একটি সৈন্যদল দেখা গেলো। এরা উৎকৃষ্ট অস্ত্রে সজ্জিত এবং পুরো সেনাবাহিনী থেকে পৃথক ছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তারা বললো, তারা খাযরাজ গোত্রের মিত্র এবং ইহুদী। কিন্তু তারা মক্কার কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে লড়াই করতে চায়। তাদের মুসলমান হওয়ার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানো হলো যে, তারা মুসলমান হয়নি এবং হওয়ার ইচ্ছাও নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেরদের বিরুদ্ধে ইহুদীদের সাহায্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন।
সৈন্যদল পরিদর্শন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাইখান নামক জায়গায় পৌঁছে মুসলিম সৈন্যদের পরিদর্শন করলেন। এই জায়গায় পরিদর্শন শেষে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং যুদ্ধের জন্যে অনুপযোগিদের ফেরত পাঠানো হলো। যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছিলো তাঁরা হলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), হযরত ওসামা ইবনে যায়েদ (রা.), হযরত ওসায়েদ ইবনে যহির (রা.), যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.), হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.), হযরত ওসামা ইবনে আওস (রা.), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.), হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা আনসারী (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে হিব্বাহ (রা.)। এই তালিকায় হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.)-এর নামও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কিন্তু সহীহ বোখারীর মতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি ওহুদের যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন।
কম বয়স্ক হওয়া সত্তেও হযরত রাফে ইবনে খাদিজ (রা.) এবং হযরত সামুরা ইবনে জুন্দব (রা.)-কে জেহাদে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। এর কারণ ছিলো এই যে, হযরত রাফে ইবনে খাদিজ (রা.) তীরন্দাজ হিসাবে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তাঁকে অনুমতি দেয়ার পর হযরত সামুরা ইবনে জুন্দব (রা.) বললেন, আমি তো রাফের চেয়ে অধিক শক্তিশালী। কুস্তিতে তাকে আমি আছড়ে দিতে পারি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একথা জানানো হলে তিনি উভয়কে কুস্তি লড়ার আদেশ দিলেন। সেই কুস্তিতে হযরত সামুরা ইবনে জুন্দব (রা.) সত্যিই হযরত রাফেকে আছড়ে দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সামুরা (রা.)-কেও অংশগ্রহণের অনুমতি দিলেন।
ওহুদ ও মদীনার মাঝামাঝি স্থানে রাত্রিযাপন শাইখান নামক জায়গাতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে মাগরেব এবং এশার নামায আদায় করে রাত্রি যাপনের সিদ্ধান্ত করলেন। মুসলমানদের তাঁবুর চারদিকে পাহারাদারদের নেতা ছিলেন হযরত মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা আনসারী (রা.)। তিনিই ইহুদী কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যাকান্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর সাফওয়ান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে কয়েস (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাহারায় নিযুক্ত ছিলেন।
মোনাফেকদের বিশ্বাসঘাতকতা মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর দুরভিসন্ধি সফল হওয়ার কাছাকাছি ছিলো। তার ও তার সঙ্গীদের পিছুটান দেখে আওস গোত্রের বনু হারেসা এবং খাযরাজ গোত্রের বনু সালমার দলও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলো। তারা ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলো। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই দুই গোত্রের লোকদের মনে ঈমানী চেতনা জাগ্রত করে দেয়ায় তারা যুদ্ধের জন্যে সঙ্কল্পে অটল হয়ে রইলেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'যখন তোমাদের মধ্যেকার দু'টি দল ভীরুতার পরিচয় দেয়ার ইচ্ছা করেছিলো এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের বন্ধু। মোমেনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত।'
মোনাফেকরা মদীনায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে এমনি নাযুক পরিস্থিতিতে তাদের কর্তব্য সম্পর্কে হযরত জাবের (রা.)-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারাম (রা.) সচেতন করতে চাইলেন। তিনি প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশী মোনাফেকদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে তাদের পেছনে কিছুদুর গিয়ে বললেন, এখনো ফিরে চলো, আল্লাহর পথে লড়াই করো। কিন্তু তারা জবাব দিলো যে, যদি আমরা জানতাম যে, আপনারা যুদ্ধ করবেন তাহলে আমরা ফিরে যেতাম না। একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারাম (রা.) বললেন, ওহে আল্লাহর শত্রুরা, তোমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নাযিল হবে। স্মরণ রেখো, আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে তোমাদের মুখাপেক্ষি রাখবেন না।
সেই মোনাফেকদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করলেন, 'এবং মোনাফেকদের জানবার জন্যে তাদেরকে বলা হয়েছিলো', এসো, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো অথবা প্রতিরোধ করো। তারা বললো, যদি যুদ্ধ জানতাম, তবে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করতাম। সেদিন তারা ঈমান অপেক্ষা কুফুরীর নিকটতর ছিলো। যা তাদের অন্তরে নেই, তা তারা মুখে বলে। যা তারা গোপন রাখে, আল্লাহ তায়ালা তা বিশেষভাবে অবহিত। (আলে ইমরান, আয়াত ১৬৭)
টিকাঃ
১. অবশ্য ফাতহুল বারী গ্রন্থে ঘোড়ার সংখ্যা বলা হয়েছে একশত (৭তম খন্ড, ৩৪৬ পৃ)
২. সীরাতে হালবিয়াহ দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ১৪
৩. মোসনাদে আহমদ, নাসাঈ, ইবনে ইসহাক।
৪. ইবনে কাইয়েম যাদুল মায়াদ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডের ৯২ পৃষ্ঠায় একথা লিখেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, এটা ভুল। মূসা ইবনে ওকবা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, ওহুদের যুদ্ধে কোন ঘোড়া ব্যবহার করা হয়নি। ওয়াকেদী লিখেছেন, মাত্র ২টি ঘোড়া ছিলো। একটি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এবং অন্যটি আবু যোবদা (রা)-এর কাছে ছিলো। ফতহুল বারী সপ্তম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৫০।
৫. এই ঘটনা ইবনে সা'দ বর্ণনা করেছেন। এই বর্ণনায় একথাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওরা ছিলো বনি কায়নুকা গোত্রের ইহুদী। কিন্তু এ তথ্য সঠিক নয়। কেননা বনি কায়নুকা গোত্রের লোকদের বদর যুদ্ধের কিছুদিন পরই মদীনা থেকে বের করে দেয়া হয়।
৬. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৬৫-৬৬।
৭. আহমদ তিবরানী হাকেম হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। ফতহুল বারী সপ্তম খন্ডের ৩৫০ পৃ. দ্রষ্টব্য।
৮. সহীহ বোখারী, কিতাবুল জেহাদ, প্রথম খন্ড, পৃ. ৪২৬।
📄 মদীনার সন্নিকটে কাফেরদের উপস্থিতি ও মজলিসে শুরার বৈঠক
মক্কার বাহিনী মদীনা অভিমুখে এগিয়ে চললো। আবওয়ার নামক জায়গায় পৌঁছার পর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা প্রস্তাব দিলো যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মা বিবি আমেনার কবর খুঁজে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করা হোক। কিন্তু এ নারীর ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে কোরায়শ নেতারা রাযি হলো না। তারা ভেবে দেখলো যে, এ কাজের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ।
আবওয়া থেকে কাফেররা সফর অব্যাহত রাখলো। মদীনার কাছে পৌঁছে আকিক প্রান্তর অতিক্রম করলো। এরপর কিছুটা ডানে গিয়ে ওহুদ পর্বতের নিকটবর্তী আইনাইন নামক জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করলো। আইনাইন মদীনার উত্তরে কানাত প্রান্তরের কাছে একটি উর্বর ভূমি। এটা তৃতীয় হিজরীর ৬ই শাওয়াল রোজ শুক্রবারের ঘটনা।
মজলিসে শূরার বৈঠক
অমুসলিমদের গতিবিধির পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর মুসলিম সংবাদ বাহকরা মদীনায় পৌছে দিচ্ছিলেন। তাদের অবস্থান গ্রহণের খবরও মদীনায় পৌঁছে গেলো। সেই সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজলিসে শূরার বৈঠক আহ্বান করলেন। সেই বৈঠকে মদীনার প্রতিরক্ষা সম্পর্কে জরুরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার চিন্তা করা হচ্ছিলো। শুরুতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দেখা একটি স্বপ্নের কথা সাহাবাদের জানালেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর শপথ আমি একটা ভালো জিনিস দেখেছি। আমি দেখলাম কিছুসংখ্যক গাভীকে যবাই করা হচ্ছে। আমি দেখলাম আমার তরবারির ওপর পরাজয়ের কিছু চিহ্ন। আমি আরো দেখলাম যে, আমি আমার হাত একটি নিরাপদ বর্মের ভেতর প্রবেশ করিয়েছি। অতপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাভী যবাই করা হচ্ছে এ কথার ব্যাখ্যা করে বললেন, কয়েকজন সাহাবা শহীদ হবেন। তলোয়ারে পরাজয়ের চিহ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বললেন যে, আমার পরিবারের কোন একজন শহীদ হবেন। নিরাপদ বর্মের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বললেন, এর অর্থ হচ্ছে মদীনা শহর।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতপর আভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা কৌশল সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করলেন যে, মুসলমানরা শহর থেকে বের হবে না। তারা মদীনার ভেতরেই অবস্থান করবে। কাফেররা তাদের তাঁবুতে অবস্থান করতে থাকুক। যদি তারা মদীনায় প্রবেশ করে তাহলে মুসলমানরা মদীনার অলিগলিতে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। মহিলারা ছাদের ওপর থেকে তাদের ওপর আঘাত হানবে। এই অভিমতই ছিলো সঠিক। মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইও এই অভিমতের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করলো। মজলিসে শূরায় এই মোনাফেক খাযরাজ গোত্রের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেছিলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিমতের সাথে এই মোনাফেক ঐকমত্য প্রকাশের কারণ এটা নয় যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিমত ও প্রতিরক্ষা কৌশল তার পছন্দ হয়েছিলো, বরং সে এ কারণেই পছন্দ করেছিলো যে, এতে একদিকে সে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে, অথচ কেউ সেটা বুঝতেও পারবে না। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ইচ্ছা ছিলো অন্যরকম। তিনি চেয়েছিলেন, প্রথমবারের মতো সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে চিহ্নিত ও অপমানিত এবং মুসলমানিত্বের আবরণে তার কুফুরীর পর্দা উন্মোচিত হোক। এছাড়া মুসলমানরা নিজেদের সঙ্কটকালীন সময়ে জেনে নিক যে, তাদের আস্তিনে কতো বিষাক্ত সাপ লুকিয়ে আছে।
বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি- এমন কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবা ময়দানে গিয়ে কাফেরদের সাথে মোকাবেলা করার জন্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরামর্শ দিলেন। তাঁরা জেহাদে অংশগ্রহণের জন্যে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলেন। কোন কোন সাহাবা বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমরা তো এই দিনের জন্যে আকাঙ্খা করছিলাম এবং আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছে মোনাজাতও করছিলাম। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আজ আমাদের সেই সুযোগ প্রদান করেছেন। আজ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ এসেছে। কাজেই হে আল্লাহর রসূল, আপনি শত্রুদের সামনে এগিয়ে চলুন, একথা মনে করবেন না যে, আমরা ভয় পাচ্ছি।
এ ধরনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা প্রকাশকারীদের মধ্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেবও ছিলেন। বদরের যুদ্ধে তিনি বিশেষ বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, সেই পবিত্র সত্ত্বার শপথ, যিনি আপনার ওপর কোরআন নাযিল করেছেন, মদীনার বাইরে কাফেরদের সাথে খোলা ময়দানে যুদ্ধ করার আগে আমি কোন আহার মুখে তুলবো না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকাংশ সাহাবার মতামতের প্রেক্ষিতে নিজ মতামত প্রত্যাহার করায়। শেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, মদীনার বাইরে খোলা ময়দানেই কাফেরদের মোকাবেলা করা হবে।
টিকাঃ
২. সীরাতে হালবিয়াহ দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ১৪