📄 বাহরানের যুদ্ধ ও ছারিয়্যা যায়েদ ইবনে হারেছা
সাত) বাহরানের যুদ্ধ এটা ছিলো বড় ধরনের এক সামরিক অভিযান। এই অভিযানে তিনশত মোজাহেদ অংশগ্রহণ করেন। এই বাহিনী নিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তৃতীয় হিজরীর রবিউল আওয়াল মাসে বাহরান নামক এলাকা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যান। এটি হেজাযের অন্তর্ভুক্ত ফারাহ অঞ্চলের একটি জায়গা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সঙ্গী মোজাহেদরা রবিউস সানি এবং জমাদিউল আউয়াল এই দুই মাস সেখানেই অবস্থান করেন। এরপর তিনি মদীনা ফিরে আসেন। তাকে কোন প্রকার লড়াই-এর সম্মুখীন হতে হয়নি।
আট) ছারিয়্যা যায়েদ ইবনে হারেছা ওহুদের যুদ্ধের আগে এটি ছিলো মুসলমানদের শেষ সফল অভিযান। তৃতীয় হিজরীর জমাদিউস সানিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিলো। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এরূপ,
বদরের যুদ্ধের পর কোরায়শদের মনে শান্তি ছিলো না। এরপর গ্রীষ্মকাল এসে পড়লো। এসময়ই সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলা পাঠানো হয়। বাণিজ্য কাফেলার নিরাপত্তার চিন্তাও তাদের মাথা ব্যথার কারণ হলো। সেই বছর সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলার নেতা সফওয়ান ইবনে উমাইয়া কোরায়শদের বললো, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীরা আমাদের বাণিজ্য অভিযানে ব্যবহৃত পথ বিপজ্জনক করে তুলেছে। বুঝতে পারছি না, তাদের সাথে কিভাবে মোকাবেলা করবো। ওরা সমুদ্র উপকূল ভিন্ন অন্য কোথাও যায় না। উপকূলবাসীরাও তাদের সাথে ভাব জমিয়ে নিয়েছে। সাধারণ লোকেরাও তাদের পক্ষে রয়েছে। বুঝতে পারছি না, আমরা কোন পথ অবলম্বন করবো।
এদিকে, আমরা যদি ঘরে বসে থাকি, তবে তো পুঁজি শেষ হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত কিছুই বাকি থাকবে না। কেননা মক্কায় আমাদের জীবিকার ব্যবস্থাই হচ্ছে দুই মৌসুমের ব্যবসার ওপর- গ্রীষ্মকালে সিরিয়া আর শীতকালে আবিসিনিয়ার সাথে।
সফওয়ানের এ প্রশ্নের পর বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হলো। আসওয়াদ ইবনে আবদুল মোত্তালেব সফওয়ানকে বললো, তুমি সমুদ্র উপকূলের পথ ছেড়ে ইরাকগামী পথ ধরে যেয়ো। এ পথ অনেক ঘোরা। নজদ হয়ে সিরিয়ায় যেতে হবে। মদীনার পূর্ব দিকের এই পথ সম্পর্কে কোরায়শরা ছিলো অনবহিত। আসওয়াদ ইবনে আবদুল মোত্তালেব সফওয়ানকে পরামর্শ দিলো যে, তুমি বকর ইবনে ওবায়েল গোত্রের সাথে সম্পর্কিত ফোরাত ইবনে হাইয়ানের সাথে যোগাযোগ করো। তাকে প্রস্তাবিত সফরে পথ প্রদর্শক হিসাবে রাখবে।
এই ব্যবস্থার পর কোরায়শদের বাণিজ্য কাফেলা সফওয়ান ইবনে উমাইয়ার নেতৃত্বে নতুন পথ ধরে অগ্রসর হলো। কিন্তু এই সফর পরিকল্পনার বিস্তারিত খবর মদীনায় পৌঁছে গেলো। কিভাবে পৌঁছুল এই খবর? ঘটনা ছিলো এই- সালিত ইবনে নোমান নঈম ইবনে মাসুদের সাথে মদের একটি আড্ডায় মিলিত হয়েছিলো। এদের মধ্যে প্রথমোক্ত ব্যক্তি অর্থাৎ ছালিত সেই সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তি অর্থাৎ নঈম তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তখনো পর্যন্ত মদ পান নিষিদ্ধ হয়নি। মদের আড্ডায় নঈম ছালিতের কাছে নেশার ঘোরে কোরায়শদের বাণিজ্য যাত্রার সব কথা প্রকাশ করে দেয়। ছালিত সাথে সাথে মদীনা রওয়ানা হয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সব কথা প্রকাশ করে দেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ খবর পাওয়ার পর কোরায়শী কাফেলার ওপর অবিলম্বে হামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। একশত সওয়ারের একটি বাহিনী হযরত যায়েদ ইবনে হারেছা (রা.)-এর নেতৃত্বে প্রেরণ করা হয়। হযরত যায়েদ (রা.) দ্রুত গিয়ে কারদাহ নামক জায়গায় কাফেলার দেখা পেয়ে যান। তারা তখনই কেবল সেখানে পৌছেছিলো। একটি জলাশয়ের তীরে তাদের অবতরণের প্রাক্কালে আকস্মিক হামলায় তারা হতবুদ্ধি হয়ে যায়। সফওয়ান ইবনে উমাইয়া এবং তার সঙ্গীরা পলায়ন ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারেনি।
মুসলমানরা ফোরাত ইবনে হাইয়ানকে কাফেলার পথ প্রদর্শক নিযুক্ত করেন। অন্য দুইজন লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবসায়ের বিভিন্ন মালামাল মুসলমানদের হস্তগত হয়। সেসব দ্রব্যের মূল্য ছিলো এক লাখ দেরহামের কাছাকাছি।
মদীনায় পৌঁছার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক পঞ্চমাংশ সম্পদ বের করে নেন। সম্পদ সমাগ্রী মোজাহেদদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। আর ফোরাত ইবনে হাইয়ান রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন।
টিকাঃ
১২. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৫০, ৫১, যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯১। এই অভিযানের কারণ সম্পর্কে নানা কথা উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, মদীনায় এ খবর পৌছে যে, বনু সালিম গোত্র মদীনা ও তার আশে পাশে হামলার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এটাও বলা হয়ে থাকে যে, আল্লাহর রসূল কোরায়েশদের একটি কাফেলার খোঁজে বেরিয়েছিলেন। ইবনে হিশাম এই কারণ উল্লেখ করেছেন। ইবনে কাইয়েমও এই অভিমত প্রকাশ করেন। প্রথম কারণ আলোচিত হয়নি। অন্য কারণটিই বিশ্বাসযোগ্য। কেননা বnu সালিম গোত্র ফারা এলাকায় বসবাস করতো না বাস করতো নজদে। এই এলাকা ফারা থেকে বহু দূরে অবস্থিত।
১৩. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৫০, ৫১, রহমতুল লিল আলামীন, ২য় খন্ড, পৃ. ২১৯