📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আত্মসমর্পণ ও বহিষ্কার

📄 আত্মসমর্পণ ও বহিষ্কার


এই ঘটনার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। তিনি মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আবু লোবাবা ইবনে আবদুল মানযারকে অর্পণ করলেন। হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেবের হাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পবিত্র হাতে মুসলমানদের পতাকা তুলে দিয়ে একদল মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে বনু কাইনুকা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। ইহুদীরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে দুর্গের প্রধান ফটক বন্ধ করে দিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুর্গের চারিদিক অবরোধ করে রাখলেন। সেদিন ছিলো জুমার দিন। দোসরা হিজরীর শওয়াল মাসের ১৫ তারিখ। পনের দিন পর্যন্ত অর্থাৎ জিলকদ মাসের প্রথম দিন পর্যন্ত ১৫ দিন অবরোধ অব্যাহত রাখা হলো। এরপর আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের মনে মুসলমানদের প্রভাব বসিয়ে দিলেন। আল্লাহর নিয়ম এই যে, তিনি কোন কওমকে পরাজিত করতে চাইলে তাদের মনে প্রতিপক্ষের প্রভাব বসিয়ে দেন। বনু কাইনুকা গোত্র এই শর্তে আত্মসমর্পণ করলো যে, তারা আল্লাহর রসূলের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। তাদের জানমাল, মহিলা ও শিশুদের ব্যাপারে আল্লাহর রসূলের দেয়া ফয়সালাই হবে চূড়ান্ত। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে এরপর ইহুদীদের বেঁধে ফেলা হলো।
মাত্র একমাস আগে ইসলামের ছদ্মবেশ ধারণকারী মোনাফেক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এ সময় ইহুদী প্রীতির নযীর স্থাপন করলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কপট অনুনয়ে সে ইহুদীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করলো। সে বললো, হে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমার মিত্রদের ব্যাপারে অনুগ্রহ করুন। উল্লেখ্য, বনু কাইনুকা ছিলো খাযরাজ গোত্রের মিত্র। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন সিদ্ধান্ত তখনো দেননি। মোনাফেক নেতা তার কথার পুনরাবৃত্তি করলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। দুর্বৃত্ত মোনাফেক তখন আল্লাহর রসূলের জামার আস্তিনে হাত দিলো। তিনি এতে বিরক্ত হলেন, বললেন, আমাকে ছেড়ে দাও। তিনি এত ক্রুদ্ধ হলেন যে, তার চেহারায় ক্রোধের ঝলক ফুটে উঠলো। তিনি বললেন, তোমার জন্যে আমার আফসোস হচ্ছে, তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। কিন্তু মোনাফেক তার অনুরোধ অব্যাহত রাখলো। সে বললো, আপনি আমার মিত্রদের ব্যাপারে অনুগ্রহ ঘোষণা না করা পর্যন্ত আপনাকে ছাড়ব না। চারশত খালি দেহের যুবক এবং তিনশত বর্ম পরিহিত যুবক, যারা আমাকে নানা বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে, আপনি তাদেরকে এক সকালেই মেরে ফেলবেন? আল্লাহর কসম, সময়ের আবর্তনের ভয়ে আমি অত্যন্ত ভীত।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশেষে দৃশ্যত আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর কথা রাখলেন। তিনি ইহুদীদের প্রাণ রক্ষার ব্যবস্থা করলেন। তবে নির্দেশ দিলেন যে, তারা মদীনা বা মদীনার আশেপাশে থাকতে পারবে না। ইহুদীরা তখন যতোটা জিনিস সঙ্গে নেয়া সম্ভব ততোটা নিয়ে সিরিয়ার দিকে চলে গেলো। সেখানে কিছুদিনের মধ্যে বহু ইহুদী মৃত্যু বরণ করলো।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদীদের পরিত্যক্ত ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করলেন। এর মধ্যে তিনটি কামান, দু'টি বর্ম, তিনটি তলোয়ার এবং তিনটি বর্শা নিজের জন্যে রাখলেন। অবশিষ্ট ধন-সম্পদ থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিলেন। গণিমতের মাল সংগ্রহের দায়িত্ব মোহাম্মদ ইবনে মাসলামার ওপর ন্যস্ত করা হয়।

টিকাঃ
৮. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৭১, ৯১ ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড পৃ. ৪৭, ৪৮, ৪৯

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ছাভিকের যুদ্ধ

📄 ছাভিকের যুদ্ধ


একদিকে সফওয়ান ইবনে উমাইয়া ইহুদী এবং মোনাফেকরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। অন্যদিকে আবু সুফিয়ানও তার চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছিলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে এমন কিছু করতে চাচ্ছিলো যাতে নিজ কওমের ইযযত আবরু রক্ষা হতে পারে এবং নিজেদের শক্তির প্রকাশ ঘটানো যায়। আবু সুফিয়ান এ মর্মে প্রতিজ্ঞা করেছিলো যে, মোহাম্মদের সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত সে ফরয গোসল করবে না। এই প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্যে আবু সুফিয়ান দুইশত সওয়ারী নিয়ে রওয়ানা হয়ে কানাত প্রান্তরে অবস্থিত নাইব নামক পাহাড়ের পাদদেশে তাঁবু স্থাপন করলো। মদীনা থেকে এর দূরত্ব বারো মাইল। আবু সুফিয়ান মদীনায় সরাসরি হামলার সাহস করলো না। তবে সে এমন একটা কাজ করলো, যাকে খোলাখুলি ডাকাতি রাহাজানি বলে অবিহিত করা যায়।
ঘটনার বিবরণ এই যে, রাতের অন্ধকারে আবু সুফিয়ান মদীনার উপকণ্ঠে এসে হুয়াই ইবনে আখতারের কাছে গিয়ে তাকে দরজা খোলার অনুরোধ জানায়। হুয়াই পরিণাম আশঙ্কায় দরজা খুলতে অস্বীকার করে। আবু সুফিয়ান তখন বনু নাযিরের অন্য একজন সর্দার সালাম ইবনে মাশকামের কাছে গমন করে। এ লোকটি ছিলো বনু নাযির গোত্রের কোষাধ্যক্ষ। আবু সুফিয়ান ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চায়। সালাম ইবনে মাশকাম ভেতরে আসা অনুমতি প্রদান করে এবং আতিথেয়তা করে। আহার করায়, মদ পরিবেশন করে এবং মদীনার বিশদ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে। আবু সুফিয়ান এরপর দ্রুত তার সঙ্গীদের কাছে যায় এবং একদল সশস্ত্র লোক পাঠিয়ে মদীনার উপকণ্ঠে আরিয নামক জায়গায় হামলা করায়। কোরায়শ গোত্রের এই দুর্বৃত্তরা সেখানে কয়েকটি খেজুর গাছ কেটে ফেলে এবং কয়েকটি গাছে আগুন ধরিয়েও দেয়। এরপর একজন আনসারী এবং তার মিত্রকে ফসলের ক্ষেতে পেয়ে হত্যা করে উর্ধশ্বাসে মক্কামুখে পালিয়ে যায়।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ খবর পাওয়ার পর আবু সুফিয়ান এবং তার সঙ্গীদের দ্রুত ধাওয়া করেন। কিন্তু দুর্বৃত্তরা এর চেয়ে দ্রুত মক্ক্যার পথে উর্ধশ্বাসে ছুটে পালিয়ে যায়। তারা বোঝা হালকা করার জন্যে বহু জিনিস পথে ফেলে রেখে যায়। এসব জিনিস মুসলমানদের হস্তগত হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সঙ্গীরা আবু সুফিয়ানকে কারকারাতুল কুদার পর্যন্ত ধাওয়া করে ফিরে আসেন। মুসলমানরা ফেলে যাওয়া ছাতুসহ বিভিন্ন জিনিস তুলে নিয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। এ অভিযানের নামকরণ করা হয় ছাভিকের যুদ্ধ। আরবী ভাষায় ছাভিক মানে ছাতু। বদরের যুদ্ধের মাত্র দুই মাস পরে দ্বিতীয় হিজরীর জিলহজ্জ মাসে এই ঘটনা ঘটে। এই অভিযানের সময় মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আবু লোবাবা ইবনে আবদুল মানযারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলো।

টিকাঃ
৯. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯০, ৯১, ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৪৪, ৪৫

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 যি-আমরের যুদ্ধ

📄 যি-আমরের যুদ্ধ


বদরের যুদ্ধের পর এই অভিযান ছিলো সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তৃতীয় হিজরীর মহররম মাসে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিলো। এর কারণ, মদীনার তথ্য বিভাগ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানায় যে, বনু ছালাবা এবং মোহারেব গোত্রের এক বিরাট দল মদীনায় হামলা করতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। এ খবর পাওয়ার পরপরই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। সওয়ারী এবং পায়ে হেটে লোকজনসহ সাড়ে চারশত মোজাহেদ সমন্বয়ে এক অভিযান পরিচালিত হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই সময় হযরত ওসমান (রা.)-কে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন।
পথে মোজাহেদরা বনু ছালাম গোত্রের জাব্বার নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আল্লাহর রসূলের সামনে হাযির করেন। লোকটিকে তিনি ইসলামের দাওয়াত দেন। সে ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর লোকটি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবাদের শত্রু এলাকা পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়।
এদিকে শত্রুরা মুসলমানদের সামরিক অভিযানের খবর পেয়ে আশেপাশের পাহাড়ী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখেন এবং মোজাহেদদের নিয়ে শত্রুদের অবস্থান স্থল পর্যন্ত গিয়ে পৌছেন। সেখানে একটি জায়গা ছিলো, এই জায়গা 'যি-আমর' নামে পরিচিত। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে বেদুইনদের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং মুসলমানদের শক্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা দেয়ার জন্যে তৃতীয় হিজরীর সফর মাসের পরেও কিছু দিন সেখানে অতিবাহিত করে পরে মদীনায় ফিরে আসেন।

টিকাঃ
৯. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯০, ৯১, ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৪৪, ৪৫
১০. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৪৬, যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯১। বলা হয়ে থাকে যে, গাওয়াছ মাহারেবী নামে এক ব্যক্তি এই অভিয়ানের সময় আল্লাহর রসূলকে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই অভিযানের সময় নয়, অন্য আভিযানের সময় এই চেষ্টা করা হয়েছিলো। দেখুন বোখারী ২য় খন্ড পৃ. ৫৯৩

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 কা'ব ইবনে আশরাফের পরিণাম

📄 কা'ব ইবনে আশরাফের পরিণাম


ইহুদীদের মধ্যে এই লোকটি মুসলমানদের প্রচন্ড ঘৃণা করতো। মুসলমানদের প্রতি তার শত্রুতা এবং মুসলমানদের কাজকর্মে তার মনে যন্ত্রণা হতো সব সময়। এই লোকটি আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দিতো এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধের দাওয়াত দিয়ে বেড়াতো।
তাঈ গোত্রের বনু নাবহান শাখার সাথে তার সম্পর্ক ছিলো। তার মায়ের গোত্রের নাম ছিলো বনু নাযির। এই লোকটি ছিলো ধনী এবং প্রভাবশালী। আরবে তার দৈহিক সৌন্দর্যেরও সুনাম ছিলো। বিখ্যাত কবি হিসাবেও তার পরিচিতি ছিলো। এই লোকটির দুর্গ ছিলো মদীনার দক্ষিণাংশে বনু নাযিরের গোত্রের জনপদের পেছনে।
বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় এবং কোরায়শ নেতাদের হত্যাকান্ডের খবর শোনার সাথে সাথে সে বলে উঠেছিলো, আসলেই কি এ রকম ঘটেছে? ওরা ছিলো আরবদের মধ্যে অভিজাত এবং লোকদের বাদশাহ। মোহাম্মদ যদি ওদের মেরেই থাকে, তাহলে পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ এর উপরিভাগ থেকে উত্তম হবে। অর্থাৎ বেঁচে থাকার চেয়ে আমাদের মরে যাওয়াই উত্তম।
নিশ্চিতভাবে মুসলমানদের বিজয়ের খবর পাওয়ার পর আল্লাহর শত্রু কা'ব ইবনে আশরাফ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুসলমানদের কুৎসা এবং ইসলামের শত্রুদের প্রশংসা শুরু করলো। এতেও তৃপ্ত হতে না পেরে সে মক্কায় কোরায়শদের কাছে পৌছে এবং মোত্তালেব ইবনে আবু অদাআ সাহমীর মেহমান হয়ে পৌত্তলিকদের মনে উত্তেজনার আগুন প্রজ্বলিত করার চেষ্টা করলো! আল্লাহর রসূলের বিরুদ্ধে কোরায়শদের যুদ্ধে প্ররোচিত করতে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করলো। নিহত কোরায়শদের প্রশংসামূলক কবিতা আবৃত্তি করলো। মক্কায় কা'ব এর অবস্থানকালে আবু সুফিয়ান তাকে জিজ্ঞাসা করলো যে, তোমার কাছে আমাদের মধ্যেকার কোন্ দ্বীন অধিক পছন্দীয়? এই উভয় দলের মধ্যে কারা হেদায়াত প্রাপ্ত? কা'ব ইবনে আশরাফ বললো, তোমরা মুসলমানদের চেয়ে অধিক হেদায়াতপ্রাপ্ত এবং উত্তম। আল্লাহ তায়ালা এই সময় এই আয়াত নাযিল করেন।
'তুমি কি তাদের দেখোনি, যাদেরকে কেতাবের এক অংশ দেয়া হয়েছিলো তারা 'জিত' এবং 'তাগুতে'র উপর ঈমান রাখে। তারা কাফেরদের সম্পর্কে বলে যে, এদেরই পথ মোমেনদের চেয়ে উৎকৃষ্টতর।' (সূরা নেসা, আয়াত ৫১)
কা'ব ইবনে আশরাফ মক্কায় এসব কাজ করার পর মদীনায় ফিরে আসে। মদীনায় এসে সাহাবায়ে কেরামদের স্ত্রীদের সম্পর্কে ঘৃণ্য ধরনের কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করে। এছাড়া যা মুখে আসছিলো, তাই বলছিলো এমনি করে সে মুসলমানদের কষ্ট দিচ্ছিলো।
এমতাবস্থায় অতিষ্ঠ হয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা বললেন, কা'ব ইবনে আশরাফের সাথে বোঝাপড়ার মতো কে আছো? এই লোকটি আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসূলকে কষ্ট দিয়েছে।
আল্লাহর রসূলের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মোহাম্মদ ইবনে মোহম্মদ ইবনে মাযলামা, ওব্বাদ ইবনে বশর, আবু নায়েলা ওরফে সালকান ইবনে সালামা, হারেস ইবনে আওস, আবু আব্বাস ইবনে জাবার (রা.) উঠে দাঁড়ালেন। আবু নায়েলা ওরফে সালকান ইবনে সালামা (রা.) ছিলেন কা'ব ইবনে আশরাফের দুধভাই। মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা এই দলের নেতা মনোনীত হলেন।
কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যাকান্ড সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনার মূল কথা এই যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বললেন, রসূলকে সে কষ্ট দিয়েছে। কা'ব ইবনে আশরাফের সাথে কে বোঝাপড়া করতে পারবে? এই লোকটি আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর আহ্বান শোনার সাথে সাথে মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা উঠে দাঁড়িয়ে আরয করলেন, আমি হাযির রয়েছি, হে আল্লাহর রসূল। আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হাঁ। তিনি বললেন, তবে আপনি আমাকে কিছু কথা বলার অনুমতি দিন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ বলতে পারো।
পরে মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) কা'ব ইবনে আশরাফকে গিয়ে বললেন, ওই লোকটি আমাদের কাছে সদকা চায়। প্রকৃতপক্ষে এই চাওয়া আমাদেরকে কষ্টে ফেলে দিয়েছে।
কা'ব বললো, আল্লাহর শপথ, তোমরা আরো অতিষ্ঠ হবে।
মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বললেন, আমরা তার অনুসরণ যখন করেই ফেলেছি, এমতাবস্থায় তাকে পরিত্যাগ করা সমীচীন মনে হয় না। এই অনুসরণের পরিণাম কি, সেটা দেখা আবশ্যক। সে যাই হোক, আমি আপনার কাছে এক দুই ওয়াসক খাদ্যদ্রব্য ধার চাই।
কা'ব বললো, আমার কাছে কিছু জিনিস বন্ধক রাখো।
মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বললেন, আপনি কি জিনিস পছন্দ করবেন? কা'ব বললো, তোমার নারীদের আমার কাছে বন্ধক রাখো।
মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বললেন, সেটা কি করে সম্ভব, আপনি হলেন আরবের সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ।
কা'ব বললো, তবে তোমার কন্যাদের বন্ধক রাখো।
মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বললেন, সেটাই বা কি করে সম্ভব? এটা তো আমার জন্যে লজ্জার কারণ হবে। লোক বলাবলি করবে যে, অমুকে সামান্য কিছু খাদ্যের জন্যে নিজ কন্যাদের অমুকের কাছে বন্ধক রেখেছে। তবে হাঁ, আপনার কাছে আমি আমার অস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি।
এরপর উভয়ের মধ্যে কথা হলো যে, মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা তার অস্ত্র নিয়ে কা'ব ইবনে আশরাফের কাছে আসবেন।
আবু নায়েলাও একই ধরনের কাজ করলেন। তিনি ছিলেন কা'ব এর দুধভাই। তিনি কা'ব এর কাছে এসে কিছুক্ষণ কবিতা নিয়ে আলোচনা করলেন। কিছু কবিতা শুনলেন কিছু শোনালেন। এরপর বললেন, ভাই একটা প্রয়োজনে আপনার কাছে এসেছিলাম। প্রয়োজনের কথা আপনাকে বলতে চাই, তবে বিষয়টি গোপনীয়। আপনাকে বলার পর আপনি সে কথা গোপন রাখবেন।
কা'ব বললো, হাঁ, তাই করবো।
আবু নায়েলা আল্লাহর রসূলের প্রতি ইঙ্গিত করে বললো এই লোকটির আগমন আমাদের জন্যে পরীক্ষা হয়ে দেখা দিয়েছে। সমগ্র আরব আমাদের শত্রু হয়ে পড়েছে। আমাদের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবার-পরিজন ধ্বংস হতে চলেছে। জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। ছেলে-মেয়েরা দারুণ দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আবু নায়েলা এরপর মোহাম্মদ ইবনে মাসলমার কন্ঠস্বরের মতোই কিছু কথা বললেন। কথা বলার সময় আবু নায়েলা একথাও বললেন, যে, আমার কিছু বন্ধু রয়েছে, তারাও আমার মতো ধারণাই পোষণ করে। ওদেরকেও আমি আপনার কাছে নিয়ে আসতে চাই। আপনি ওদের কাছেও কিছু জিনিস বিক্রি করে ওদের প্রতি দয়া করুন।
মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা এবং আবু নায়েলা কথার মাধ্যমে লক্ষ্যপথে সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কেননা এরূপ আলোচনার পর কা'ব এর বাড়ীতে তাদের অস্ত্রসহ আসার কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণের পর তৃতীয় হিজরীর ১৪ই রবিউল আউয়াল চাঁদনী রাতে এই ছোট দল আল্লাহর রসূলের সামনে অভিন্ন উদ্দেশ্যে হাযির হলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাকিঈ গারকাদ পর্যন্ত তাদের সঙ্গ দিলেন। এরপর বললেন, যাও, বিসমিল্লাহ। হে আল্লাহ তায়ালা, ওদের সাহায্য করুন। রসূল এরপর গৃহে ফিরে এসে নামায ও মোনাজাতে মশগুল হলেন।

টিকাঃ
১১. এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ যেসব গ্রন্থাবলী থেকে গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে, ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৫১, ৫৭, সহীহ বোখারী ১ম খন্ড পৃ. ৩৪১, ৪২৫, ২য় খন্ড, ৫৭৭, সুনানে আবুদাউদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৪২, ৪৩ যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ৯১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00