📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 বনু কাইনুকার অঙ্গীকার ভঙ্গ

📄 বনু কাইনুকার অঙ্গীকার ভঙ্গ


'ইহুদীরা যখন লক্ষ্য করলো যে, বদরের প্রান্তরে আল্লাহ রব্বুল আলামীন মুসলমানদের বিরাট সাহায্য করেছেন এবং তাদের মর্যাদা ও প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, তখন তারা ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুতা শুরু করলো। প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করলো এবং মুসলমানদের কষ্ট দেয়ার জন্যে উঠে পড়ে লাগলো।
এদের মধ্যে সবচেয়ে হিংসুটে এবং দুর্বৃত্ত ছিলো কা'ব ইবনে আশরাফ। তার সম্পর্কে পরে আলোচনা করা হবে। তিনটি ইহুদী গোত্রের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ছিলো বনু কাইনুকা। এরা মদীনার ভেতরে থাকতো এবং তাদের মহল্লা তাদের নামেই পরিচিত ছিলো। এরা পেশায় ছিলো কর্মকার, স্বর্ণকার এবং থালাবাটি নির্মাতা। এ কারণে এদের কাছে সব সময় প্রচুর সমর সরঞ্জাম বিদ্যমান থাকতো। যুদ্ধ করার মতো বলদর্পী লোকের সংখ্যা তাদের মধ্যে ছিলো সাতশত। তারা ছিলো মদীনায় সবচেয়ে বাহাদুর ইহুদী গোত্র। এরাই সর্বপ্রথম মুসলমানদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে। ঘটনার বিবরণ এই,
আল্লাহ রব্বুল আলামীন যখন বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের সফলতা দান করলেন তখন ইহুদীদের শত্রুতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তারা তাদের দুর্বৃত্তপনা, ঘৃণ্য কার্যকলাপ এবং উস্কানিমূলক কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখে। মুসলমানরা বাজারে গেলে তারা তাদের প্রতি উপহাসমূলক মন্তব্য করতো এবং ঠাট্টা-বিদ্রূপ চালাতো সব সময়। এমনি করে মুসলমানদের মানসিকভাবে কষ্ট দিতো। তাদের ঔদ্ধত্য এমন সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো যে, তারা মুসলিম মহিলাদেরও উত্যক্ত করতো।
ক্রমে অবস্থা নাজুক হয়ে উঠলো। ইহুদীদের ঔদ্ধত্য ও হঠকারিতা সীমা ছাড়িয়ে গেলো। এ সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদীদের সমবেত করে একদিন ওয়ায নসিহত করে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। এছাড়া তাদের নিপীড়নমূলক কাজের মন্দ পরিণাম সম্পর্কেও সতর্ক করে দিলেন। কিন্তু এতে তাদের হীন ও ঘৃণ্য কার্যকলাপ আরো বেড়ে গেলো।
আবু দাউদ প্রমুখ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদরের দিনে কোরায়শদের পরাজিত করেন। এরপর মদীনায় ফিরে এসে বনু কাইনুকার বাজারে ইহুদীদের এক সমাবেশ আহ্বান করেন। এই সমাবেশে তিনি বলেন, হে ইহুদী সম্প্রদায়, কোরায়শদের ওপর যে রকম আঘাত পড়েছে, সে রকম আঘাত তোমাদের ওপর আসার আগেই তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। তারা বললো, হে মোহাম্মদ, তুমি আমাদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করেছো। কোরায়শ গোত্রের আনাড়ি ও অনভিজ্ঞ লোকদের সাথে তোমাদের মোকাবেলা হয়েছে। এতেই তোমরা ধরাকে সরা জ্ঞান করেছো। তোমরা ওদের মেরেছো, সেটা পেরেছো ওরা আনাড়ি বলেই। আমাদের সাথে যদি তোমাদের যুদ্ধ হয়, তবে তোমরা বুঝতে পারবে যে, পুরুষ কাকে বলে। আমরা হচ্ছি বাহাদূর। তোমরা তো আমাদের কবলে পড়োনি। তাই আমাদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করে বসে আছ। তাদের এ উক্তির জবাবে আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই আয়াত নাযিল করেন।
'যারা কুফুরী করে, তাদের বলো, তোমরা শীঘ্রই পরাভূত হবে এবং তোমাদেরকে জাহান্নামে একত্র করা হবে। আর সেটা কতোই না নিকৃষ্ট আবাসস্থল। দু'টি দলের পরস্পর সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে তোমাদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। একদল আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছিলো আর অন্য দল ছিলো কাফের। ওরা তাদেরকে চোখের দেখায় দ্বিগুণ দেখছিলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নিজ সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। নিশ্চয় এতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের জন্যে শিক্ষা রয়েছে। ' (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১২-১৩)
মোটকথা, বনু কাইনুকা যে জবাব দিয়েছিলো তার অর্থ হচ্ছে সুস্পষ্ট যুদ্ধ ঘোষণা। কিন্তু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্রোধ সম্বরণ এবং ধৈর্য ধারণ করেন। মুসলমানরাও ধৈর্য ধারণ করে ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদীদের ইসলামের দাওয়াত প্রদান এবং তাদের পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করার পর তাদের ঔদ্ধত্য আরো বেড়ে যায়। কয়েকদিন পরেই মদীনায় তারা সন্ত্রাসমূলক তৎপরতা শুরু করে। এর ফলে তারা নিজেরাই নিজেদের কবর খনন করে নেয়। জীবনের সকল পথ নিজেদের জন্যে বন্ধ করে ফেলে।
ইবনে হিশাম আবু আওন থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একজন আরব মহিলা কাইনুকার বাজারে দুধ বিক্রি করতে আসে। দুধ বিক্রির পর সেই মহিলা কি এক প্রয়োজনে এক ইহুদী স্বর্ণকারের দোকানে বসে। ইহুদী তার চেহারা অনাবৃত করতে বলে কিন্তু মহিলা রাযি হননি। এতে স্বর্ণকার চুপিসারে সেই মহিলার কাপড়ের একাংশ তার পিঠের সাথে গিঁট বেঁধে দেয়। মহিলা কিছুই বুঝতে পারেননি। মহিলা উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে তার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে গেলো। এতে ইহুদীরা খিল খিল করে হেসে উঠলো। মহিলা এভাবে অপমানিত হয়ে চিৎকার ও কান্নাকাটি শুরু করলেন। তার কান্না শুনে একজন মুসলমান কারণ জানতে চাইলেন। সব শুনে ক্রোধে অস্থির হয়ে তিনি সেই ইহুদীর ওপর হামলা করে তাকে মেরে ফেললেন। ইহুদীরা যখন দেখলো যে, তাদের একজন লোককে মেরে ফেলা হয়েছে এবং মেরেছে তাদের শত্রু মুসলমান, তখন তারা সম্মিলিত হামলা চালিয়ে সেই মুসলমানকেও মেরে ফেললো। নিহত মুসলমানের পরিবারবর্গ চিৎকার কান্নাকাটি শুরু করে ইহুদীদের বিরুদ্ধে সকল মুসলমানদের কাছে অভিযোগ করলেন। এর ফলে মুসলমান এবং বনু কাইনুকা গোত্রের ইহুদীদের মধ্যে যুদ্ধের সাজ সাজ রব পড়ে গেলো।

টিকাঃ
৬. সুনানে আবু দাউদ, ৩য় খন্ড, পৃ. ১১২, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫২
৭. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৪৭, ৪৮

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 অবরোধ

📄 অবরোধ


এই ঘটনার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। তিনি মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আবু লোবাবা ইবনে আবদুল মানযারকে অর্পণ করলেন। হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেবের হাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পবিত্র হাতে মুসলমানদের পতাকা তুলে দিয়ে একদল মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে বনু কাইনুকা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। ইহুদীরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে দুর্গের প্রধান ফটক বন্ধ করে দিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুর্গের চারিদিক অবরোধ করে রাখলেন। সেদিন ছিলো জুমার দিন। দোসরা হিজরীর শওয়াল মাসের ১৫ তারিখ। পনের দিন পর্যন্ত অর্থাৎ জিলকদ মাসের প্রথম দিন পর্যন্ত ১৫ দিন অবরোধ অব্যাহত রাখা হলো। এরপর আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের মনে মুসলমানদের প্রভাব বসিয়ে দিলেন। আল্লাহর নিয়ম এই যে, তিনি কোন কওমকে পরাজিত করতে চাইলে তাদের মনে প্রতিপক্ষের প্রভাব বসিয়ে দেন। বনু কাইনুকা গোত্র এই শর্তে আত্মসমর্পণ করলো যে, তারা আল্লাহর রসূলের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। তাদের জানমাল, মহিলা ও শিশুদের ব্যাপারে আল্লাহর রসূলের দেয়া ফয়সালাই হবে চূড়ান্ত। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে এরপর ইহুদীদের বেঁধে ফেলা হলো।
মাত্র একমাস আগে ইসলামের ছদ্মবেশ ধারণকারী মোনাফেক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এ সময় ইহুদী প্রীতির নযীর স্থাপন করলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কপট অনুনয়ে সে ইহুদীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করলো। সে বললো, হে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমার মিত্রদের ব্যাপারে অনুগ্রহ করুন। উল্লেখ্য, বনু কাইনুকা ছিলো খাযরাজ গোত্রের মিত্র। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন সিদ্ধান্ত তখনো দেননি। মোনাফেক নেতা তার কথার পুনরাবৃত্তি করলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। দুর্বৃত্ত মোনাফেক তখন আল্লাহর রসূলের জামার আস্তিনে হাত দিলো। তিনি এতে বিরক্ত হলেন, বললেন, আমাকে ছেড়ে দাও। তিনি এত ক্রুদ্ধ হলেন যে, তার চেহারায় ক্রোধের ঝলক ফুটে উঠলো। তিনি বললেন, তোমার জন্যে আমার আফসোস হচ্ছে, তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। কিন্তু মোনাফেক তার অনুরোধ অব্যাহত রাখলো। সে বললো, আপনি আমার মিত্রদের ব্যাপারে অনুগ্রহ ঘোষণা না করা পর্যন্ত আপনাকে ছাড়ব না। চারশত খালি দেহের যুবক এবং তিনশত বর্ম পরিহিত যুবক, যারা আমাকে নানা বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে, আপনি তাদেরকে এক সকালেই মেরে ফেলবেন? আল্লাহর কসম, সময়ের আবর্তনের ভয়ে আমি অত্যন্ত ভীত।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশেষে দৃশ্যত আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর কথা রাখলেন। তিনি ইহুদীদের প্রাণ রক্ষার ব্যবস্থা করলেন। তবে নির্দেশ দিলেন যে, তারা মদীনা বা মদীনার আশেপাশে থাকতে পারবে না। ইহুদীরা তখন যতোটা জিনিস সঙ্গে নেয়া সম্ভব ততোটা নিয়ে সিরিয়ার দিকে চলে গেলো। সেখানে কিছুদিনের মধ্যে বহু ইহুদী মৃত্যু বরণ করলো।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদীদের পরিত্যক্ত ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করলেন। এর মধ্যে তিনটি কামান, দু'টি বর্ম, তিনটি তলোয়ার এবং তিনটি বর্শা নিজের জন্যে রাখলেন। অবশিষ্ট ধন-সম্পদ থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিলেন। গণিমতের মাল সংগ্রহের দায়িত্ব মোহাম্মদ ইবনে মাসলামার ওপর ন্যস্ত করা হয়।

টিকাঃ
৮. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৭১, ৯১ ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড পৃ. ৪৭, ৪৮, ৪৯

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আত্মসমর্পণ ও বহিষ্কার

📄 আত্মসমর্পণ ও বহিষ্কার


এই ঘটনার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। তিনি মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আবু লোবাবা ইবনে আবদুল মানযারকে অর্পণ করলেন। হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেবের হাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পবিত্র হাতে মুসলমানদের পতাকা তুলে দিয়ে একদল মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে বনু কাইনুকা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। ইহুদীরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে দুর্গের প্রধান ফটক বন্ধ করে দিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুর্গের চারিদিক অবরোধ করে রাখলেন। সেদিন ছিলো জুমার দিন। দোসরা হিজরীর শওয়াল মাসের ১৫ তারিখ। পনের দিন পর্যন্ত অর্থাৎ জিলকদ মাসের প্রথম দিন পর্যন্ত ১৫ দিন অবরোধ অব্যাহত রাখা হলো। এরপর আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের মনে মুসলমানদের প্রভাব বসিয়ে দিলেন। আল্লাহর নিয়ম এই যে, তিনি কোন কওমকে পরাজিত করতে চাইলে তাদের মনে প্রতিপক্ষের প্রভাব বসিয়ে দেন। বনু কাইনুকা গোত্র এই শর্তে আত্মসমর্পণ করলো যে, তারা আল্লাহর রসূলের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। তাদের জানমাল, মহিলা ও শিশুদের ব্যাপারে আল্লাহর রসূলের দেয়া ফয়সালাই হবে চূড়ান্ত। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে এরপর ইহুদীদের বেঁধে ফেলা হলো।
মাত্র একমাস আগে ইসলামের ছদ্মবেশ ধারণকারী মোনাফেক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এ সময় ইহুদী প্রীতির নযীর স্থাপন করলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কপট অনুনয়ে সে ইহুদীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করলো। সে বললো, হে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমার মিত্রদের ব্যাপারে অনুগ্রহ করুন। উল্লেখ্য, বনু কাইনুকা ছিলো খাযরাজ গোত্রের মিত্র। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন সিদ্ধান্ত তখনো দেননি। মোনাফেক নেতা তার কথার পুনরাবৃত্তি করলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। দুর্বৃত্ত মোনাফেক তখন আল্লাহর রসূলের জামার আস্তিনে হাত দিলো। তিনি এতে বিরক্ত হলেন, বললেন, আমাকে ছেড়ে দাও। তিনি এত ক্রুদ্ধ হলেন যে, তার চেহারায় ক্রোধের ঝলক ফুটে উঠলো। তিনি বললেন, তোমার জন্যে আমার আফসোস হচ্ছে, তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। কিন্তু মোনাফেক তার অনুরোধ অব্যাহত রাখলো। সে বললো, আপনি আমার মিত্রদের ব্যাপারে অনুগ্রহ ঘোষণা না করা পর্যন্ত আপনাকে ছাড়ব না। চারশত খালি দেহের যুবক এবং তিনশত বর্ম পরিহিত যুবক, যারা আমাকে নানা বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে, আপনি তাদেরকে এক সকালেই মেরে ফেলবেন? আল্লাহর কসম, সময়ের আবর্তনের ভয়ে আমি অত্যন্ত ভীত।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশেষে দৃশ্যত আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর কথা রাখলেন। তিনি ইহুদীদের প্রাণ রক্ষার ব্যবস্থা করলেন। তবে নির্দেশ দিলেন যে, তারা মদীনা বা মদীনার আশেপাশে থাকতে পারবে না। ইহুদীরা তখন যতোটা জিনিস সঙ্গে নেয়া সম্ভব ততোটা নিয়ে সিরিয়ার দিকে চলে গেলো। সেখানে কিছুদিনের মধ্যে বহু ইহুদী মৃত্যু বরণ করলো।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদীদের পরিত্যক্ত ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করলেন। এর মধ্যে তিনটি কামান, দু'টি বর্ম, তিনটি তলোয়ার এবং তিনটি বর্শা নিজের জন্যে রাখলেন। অবশিষ্ট ধন-সম্পদ থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিলেন। গণিমতের মাল সংগ্রহের দায়িত্ব মোহাম্মদ ইবনে মাসলামার ওপর ন্যস্ত করা হয়।

টিকাঃ
৮. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৭১, ৯১ ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড পৃ. ৪৭, ৪৮, ৪৯

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ছাভিকের যুদ্ধ

📄 ছাভিকের যুদ্ধ


একদিকে সফওয়ান ইবনে উমাইয়া ইহুদী এবং মোনাফেকরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। অন্যদিকে আবু সুফিয়ানও তার চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছিলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে এমন কিছু করতে চাচ্ছিলো যাতে নিজ কওমের ইযযত আবরু রক্ষা হতে পারে এবং নিজেদের শক্তির প্রকাশ ঘটানো যায়। আবু সুফিয়ান এ মর্মে প্রতিজ্ঞা করেছিলো যে, মোহাম্মদের সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত সে ফরয গোসল করবে না। এই প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্যে আবু সুফিয়ান দুইশত সওয়ারী নিয়ে রওয়ানা হয়ে কানাত প্রান্তরে অবস্থিত নাইব নামক পাহাড়ের পাদদেশে তাঁবু স্থাপন করলো। মদীনা থেকে এর দূরত্ব বারো মাইল। আবু সুফিয়ান মদীনায় সরাসরি হামলার সাহস করলো না। তবে সে এমন একটা কাজ করলো, যাকে খোলাখুলি ডাকাতি রাহাজানি বলে অবিহিত করা যায়।
ঘটনার বিবরণ এই যে, রাতের অন্ধকারে আবু সুফিয়ান মদীনার উপকণ্ঠে এসে হুয়াই ইবনে আখতারের কাছে গিয়ে তাকে দরজা খোলার অনুরোধ জানায়। হুয়াই পরিণাম আশঙ্কায় দরজা খুলতে অস্বীকার করে। আবু সুফিয়ান তখন বনু নাযিরের অন্য একজন সর্দার সালাম ইবনে মাশকামের কাছে গমন করে। এ লোকটি ছিলো বনু নাযির গোত্রের কোষাধ্যক্ষ। আবু সুফিয়ান ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চায়। সালাম ইবনে মাশকাম ভেতরে আসা অনুমতি প্রদান করে এবং আতিথেয়তা করে। আহার করায়, মদ পরিবেশন করে এবং মদীনার বিশদ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে। আবু সুফিয়ান এরপর দ্রুত তার সঙ্গীদের কাছে যায় এবং একদল সশস্ত্র লোক পাঠিয়ে মদীনার উপকণ্ঠে আরিয নামক জায়গায় হামলা করায়। কোরায়শ গোত্রের এই দুর্বৃত্তরা সেখানে কয়েকটি খেজুর গাছ কেটে ফেলে এবং কয়েকটি গাছে আগুন ধরিয়েও দেয়। এরপর একজন আনসারী এবং তার মিত্রকে ফসলের ক্ষেতে পেয়ে হত্যা করে উর্ধশ্বাসে মক্কামুখে পালিয়ে যায়।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ খবর পাওয়ার পর আবু সুফিয়ান এবং তার সঙ্গীদের দ্রুত ধাওয়া করেন। কিন্তু দুর্বৃত্তরা এর চেয়ে দ্রুত মক্ক্যার পথে উর্ধশ্বাসে ছুটে পালিয়ে যায়। তারা বোঝা হালকা করার জন্যে বহু জিনিস পথে ফেলে রেখে যায়। এসব জিনিস মুসলমানদের হস্তগত হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সঙ্গীরা আবু সুফিয়ানকে কারকারাতুল কুদার পর্যন্ত ধাওয়া করে ফিরে আসেন। মুসলমানরা ফেলে যাওয়া ছাতুসহ বিভিন্ন জিনিস তুলে নিয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। এ অভিযানের নামকরণ করা হয় ছাভিকের যুদ্ধ। আরবী ভাষায় ছাভিক মানে ছাতু। বদরের যুদ্ধের মাত্র দুই মাস পরে দ্বিতীয় হিজরীর জিলহজ্জ মাসে এই ঘটনা ঘটে। এই অভিযানের সময় মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আবু লোবাবা ইবনে আবদুল মানযারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলো।

টিকাঃ
৯. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯০, ৯১, ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৪৪, ৪৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00