📄 অভ্যর্থনাকারী প্রতিনিধিদল ও যুদ্ধবন্দী প্রসঙ্গ
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রওয়াহা নামক জায়গায় পৌঁছুলে অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে আসা মুসলমানদের সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। এরা দূতদের মুখে মুসলমানদের বিজয় সংবাদ শুনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভিনন্দন এবং অভ্যর্থনা জানাতে মদীনা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা মোবারকবাদ জানালে হযরত সালমা ইবনে সালমা (রা.) বলেন, আপনারা আমাদের কিসের মোবারকবাদ জানাতে এসেছেন, আমাদের তো মোকাবেলা হয়েছে মাথা নুয়ে পড়া বৃদ্ধদের সাথে যারা ছিলো উটের মতো। একথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে বললেন, ভাতিজা, এসব লোকইতো ছিলো কওমের নেতা।
এরপর উসায়েদ ইবনে খোযায়ের (রা.) আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আপনাকে কামিয়াবী দান করেছেন এবং আপনার চক্ষু শীতল করেছেন। আল্লাহর শপথ, আমি জানতাম না যে, শত্রুদের সাথে আপনার মোকাবেলা হবে, আমি তো মনে করেছিলাম, আপনি একটি কাফেলার সন্ধানে বেরিয়েছেন। যদি জানতাম যে, শত্রুদের সাথে মোকাবেলা হবে, তবে কিছুতেই পেছনে থাকতাম না। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি সত্য বলেছো।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলেন। শহরের আশে পাশের সকল শত্রুরা প্রভাবিত হয়ে পড়লো। মুসলমানদের জয়লাভের প্রেক্ষিতে মদীনায় বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করলো। সেই সময়ই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার সঙ্গীরাও লোক দেখানো ইসলাম গ্রহণ করলো।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আসার একদিন পর যুদ্ধবন্দীরা এসে পৌছুলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে সাহাবাদেরকে ভালো ব্যবহার করার উপদেশ দিলেন। এই উপদেশের ফলে সাহাবায়ে কেরাম নিজেরা খেজুর খেয়ে থাকতেন, কিন্তু কয়েদীদের রুটি খেতে দিতেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মদীনায় খেজুরের চেয়ে রুটির মূল্য ও গুরুত্ব ছিলো অধিক।
যুদ্ধবন্দী প্রসঙ্গ
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় পৌঁছার পর সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে অবশিষ্ট যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে পরামর্শ করলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রসূল, ওরাতো চাচাতো ভাই এবং আমাদের আত্মীয়স্বজন। আমার মতে আপনি ওদের কাছ থেকে ফিদিয়া অর্থাৎ মুক্তিপণ নিয়ে ওদের ছেড়ে দিন। এতে করে যা কিছু নেয়া হবে, সেসব কাফেরদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তি হিসাবে কাজে আসবে। এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের হেদায়াত দেবেন এবং তারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ওমর ইবনে খাত্তাবের মতামত জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, আমি হযরত আবু বকরের মতের ভিন্ন মত পোষণ করি। আমি মনে করি যে, আপনি আমার আত্মীয় অমুককে আমার হাতে তুলে দিন, আমি তার শিরশ্ছেদ করবো। একইভাবে আকীল ইবনে আবু তালেবকে হযরত আলীর হাতে তুলে দিন, আলী তার শিরশ্ছেদ করবেন। একইভাবে হামযার ভাই অমুককে হামযার হাতে তুলে দিন, হামযা তার শিরশ্ছেদ করবেন। এতে আল্লাহ তায়ালা বুঝতে পারবেন যে, কাফেরদের জন্যে আমাদের মনে সমবেদনা নেই। এ সকল যুদ্ধবন্দী হচ্ছে কাফেরদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ।
হযরত ওমর (রা.) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়ের কথা শোনার পর হযরত আবু বকরের পরামর্শ গ্রহণ করেন, আমার পরামর্শ গ্রহণ করেননি। ফলে কয়েদীদের কাছ থেকে ফিদিয়া গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। পরদিন খুব সকালে আমি আল্লাহর রসূলের কাছে গিয়ে দেখি, তিনি এবং হযরত আবু বকর উভয়ে কাঁদছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল, আপনারা কেন কাঁদছেন, আমাকে বলুন। যদি কান্নার কারণ ঘটে থাকে, তবে আমিও কাঁদবো। যদি কারণ না ঘটে, তবে আপনাদের কান্নার কারণে আমিও কাঁদবো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ফিদিয়া দেয়ার শর্ত গ্রহণ করার কারণে তোমার সঙ্গীদের ওপর যে জিনিস পেশ করা হয়েছে, সেই কারণে কাঁদছি। একথা বলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকটবর্তী একটি গাছের প্রতি ইশারা করে বললেন, আমার কাছে ওদের আযাব এই গাছের চেয়ে নিকটতর করে পেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করেছেন, দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্যে সঙ্গত নয়। 'তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ তায়ালা চান পরকালের কল্যাণ। আল্লাহ তায়ালা পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ব বিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছো, সে জন্যে তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হতো।' (সূরা আনফাল, আয়াত ৭৬-৬৮)
আল্লাহ তায়ালা উপরোক্ত আয়াতে পূর্ব বিধানের যে উল্লেখ করেছেন, সেটা হচ্ছে সূরা মোহাম্মদের চতুর্থ আয়াতের একটি নির্দেশ। তাতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'অতপর হয় অনুকম্পা না হয় মুক্তিপণ।'
এই আয়াতে যুদ্ধবন্দীদের কাছ থেকে ফিদিয়া নেয়ার অনুমতি থাকায় বন্দীদের ব্যাপারে ফিদিয়ার সিদ্ধান্ত দেয়ায় সাহাবায়ে কেরামকে আযাব দেয়া হয়নি, বরং ধমক দেয়া হয়েছে। ধমকও আবার এ কারণে দেয়া হয়েছে যে, তারা কাফেরদের ভালোভাবে নিশ্চিহ্ন না করেই বন্দী করেছে। এ কারণেও ধমক দেয়া হয়েছে যে তারা এমন সব কাফের থেকে ফিদিয়া বা মুক্তিপণ নেয়ার ব্যবস্থা করেছেন, যারা শুধু যুদ্ধবন্দীই ছিলো না বরং গুরুতর অপরাধীও ছিলো। আধুনিক আইনও তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের না করে ছাড়ে না। এ ধরনের অপরাধীদের ব্যাপারে দায়েরকৃত মামলার শাস্তি হয়তো মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড।
হযরত আবু বকর (রা.)-এর মতামত অনুযায়ী যেহেতু সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে, এ কারণে মোশরেকদের কাছ থেকে ফিদিয়া নেয়া হয়েছে। ফিদিয়ার পরিমাণ ছিলো এক হাজার দিরহাম তিন হাজার এবং চার হাজার দিরহাম পর্যন্ত। মক্কাবাসীরা লেখাপড়া জানতো। পক্ষান্তরে মদীনাবাসীরা পড়ালেখার সাথে তেমনি পরিচিত ছিলো না। এ কারণে এরূপ সিদ্ধান্তও রাখা হয়েছিলো যে, যাদের মুক্তিপণ প্রদানের সামর্থ নেই, তারা মদীনায় দশটি করে শিশুকে লেখাপড়া শেখাবে। শিশুরা ভালোভাবে লেখাপড়া শিক্ষা করলে শিক্ষক কয়েদীদের জন্যে সেটাই হবে মুক্তিপণ।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন বন্দীকে বিশেষ দয়া করায় তাদের কাছ থেকে ফিদিয়া গ্রহণ করা হয়নি, এমনিতেই মুক্তি দেয়া হয়। এরা ছিলো মোত্তালেব ইবনে হানতাব, সাঈফি ইবনে আবু রেফায়া এবং আবু আযযা জুমাহী। শেষোক্ত ব্যক্তিকে ওহুদের যুদ্ধে পূনরায় কয়েদ এবং পরে হত্যা করা হয়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পরে আছে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জামাতা আবুল আসকে এই শর্তের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি নবী নন্দিনী হযরত যয়নব (রা.)-এর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না। এর কারণ ছিলো যে, হযরত যয়নব আবুল আস এর ফিদিয়া হিসাবে কিছু সম্পদ পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি হারও ছিলো। হারটির মালিকানা ছিলো প্রকৃতপক্ষে হযরত খাদিজা (রা.)-এর। হযরত যয়নব (রা.)-কে আবুল আস-এর ঘরে পাঠানোর বিদায়কালীন সময়ে তিনি আপন কন্যাকে উপহার স্বরূপ সেটি দিয়েছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা দেখামাত্র তাঁর দুইচোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে, আবেগে কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসে। তিনি আবুল আসকে ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে সাহাবাদের মতামত চান। সাহাবারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই প্রস্তাব সশ্রদ্ধভাবে অনুমোদন করেন। অতপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জামাতা আবুল আসকে এই শর্তে ছেড়ে দেন যে, আস হযরত যয়নব (রা.)-কে মুক্তি দেবেন। মুক্তি পেয়ে যয়নব (রা.) হিজরত করে মদীনায় চলে আসেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা এবং অন্য একজন আনসারী সাহাবীকে মক্কায় প্রেরণ করেন। তাদের বলা হয় যে, তোমরা মক্কার উপকণ্ঠ অথবা জায নামক জায়গায় থাকবে। হযরত যয়নব (রা.) তোমাদের কাছে দিয়ে যখন যেতে থাকবেন, তখন তাকে সঙ্গে নিয়ে আসবে। এই দুইজন সাহাবী মক্কায় গিয়ে হযরত যয়নব (রা.)-কে মদীনায় নিয়ে আসেন। হযরত যয়নব (রা.)-এর হিজরতের ঘটনা অনেক দীর্ঘ এবং মর্মস্পর্শী।
যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে সোহায়েল ইবনে আমরও ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান বক্তা। হযরত ওমর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রসূল, সোহায়েল ইবনে আমরের সামনের দু'টি দাঁত ভেঙ্গে ফেলার ব্যবস্থা করুন, এতে তার কথা মুখে জড়িয়ে যাবে। এতে সে সুবক্তা হিসাবে আপনার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে সুবিধা করতে পারবে না। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন। কেননা মানুষের অঙ্গহানি করা ইসলামী পরিভাষায় 'মোছলা' করার শামিল। কেয়ামতের কঠিন দিনে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে। হযরত সা'দ ইবনে নো'মান (রা.) ওমরাহ পালনের জন্যে বেরিয়েছিলেন। এ সময় আবু সুফিয়ান তাকে গ্রেফতার করে। আবু সুফিয়ানের পুত্র আমর যুদ্ধবন্দী ছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমরকে আবু সুফিয়ানের হাতে ন্যস্ত করায় বিনিময়ে তিনি হযরত সা'দকে মুক্তি দিলেন।
📄 পবিত্র কোরআনের পর্যালোচনা
আল্লাহ তায়ালা বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে সূরা আনফাল নাযিল করেন। প্রকৃতপক্ষে, এটি হচ্ছে বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহর পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন। দুনিয়ার অন্যান্য বাদশাহ, সেনানায়ক বা অন্য যে কারো মূল্যায়নের চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহর পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা যাচ্ছে।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন সর্বপ্রথম মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা এবং চারিত্রিক দুর্বলতার প্রতি আলোকপাত করেন। এই সংকীর্ণতা ও দুর্বলতা তাদের মধ্যে ছিলো, যা যুদ্ধশেষে অনেকটা প্রকাশ হয়ে পড়ে। আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে আলোকপাত করেন এজন্যে যে, মুসলমানদের তা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। এতে করে তারা ঈমানের পূর্ণতা লাভে সক্ষম হবে।
অতপর এই যুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য এবং গায়েবী সাহায্য সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিলো এই যে, মুসলমানরা যেন নিজেদের বীরত্ব ও বাহাদুরির ধোকায় না পড়ে। কেননা এর ফলে তাদের মনে অহংকার দেখা দেবে কিন্তু আল্লাহ তায়ালা চান যে, মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার ওপর নির্ভরতা এবং রসূলের প্রতি আনুগত্যের গুণই যেন দেখা দেয়।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে মহান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সামনে নিয়ে এ ভয়াবহ ও রক্তাক্ত অভিযানের পথে পা রেখেছিলেন, এরপর সে বিষয়ে অপরিহার্য চারিত্রিক গুণাবলী ও বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতপর মোশরেক, মোনাফেক, ইহুদী ও যুদ্ধবন্দীদের উদ্দেশ্যে এমন উচ্চাঙ্গের উপদেশ দেয়া হয়েছে যাতে করে, তারা সত্যের সামনে মাথা নত করে সত্যের অনুসারীতেই পরিণত হয়।
এরপর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে মৌলিক নীতিমালা ব্যাখ্যা করা হয়।
যুদ্ধ ও সন্ধির বিধানও এখানে ব্যাখ্যা করা হয়। ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে এর অপরিহার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই ব্যাখ্যা ও নীতিমালা এ কারণেই দেয়া হয়েছে যাতে, মুসলমানরা ইসলাম পূর্ব যুদ্ধ এবং ইসলাম পরবর্তীকালের যুদ্ধের পার্থক্য করতে পারে। এছাড়া নৈতিক ও চারিত্রিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে যেন তারা উচ্চতর মর্যাদা লাভেও সক্ষম হয়। বিশ্ববাসী যেন এর মাধ্যমে জানতে পারে যে, ইসলাম শুধু একটি আদর্শ মাত্র নয়, বরং ইসলাম যে নীতিমালা ও বিধি বিধানের দাওয়াত দেয়, সেই অনুযায়ী অনুসারীদের বাস্তব প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে।
এরপর ইসলামী রাষ্ট্রের নীতিমালা সম্পর্কে কয়েকটি ধারার উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ মুসলমান এবং এর বাইরের সীমারেখার মুসলমানদের মধ্যকার পার্থক্য বোঝা যায়।
আল্লাহ তায়ালা বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে সূরা আনফাল নাযিল করেন। প্রকৃতপক্ষে, এটি হচ্ছে বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহর পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন। দুনিয়ার অন্যান্য বাদশাহ, সেনানায়ক বা অন্য যে কারো মূল্যায়নের চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহর পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা যাচ্ছে।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন সর্বপ্রথম মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা এবং চারিত্রিক দুর্বলতার প্রতি আলোকপাত করেন। এই সংকীর্ণতা ও দুর্বলতা তাদের মধ্যে ছিলো, যা যুদ্ধশেষে অনেকটা প্রকাশ হয়ে পড়ে। আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে আলোকপাত করেন এজন্যে যে, মুসলমানদের তা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। এতে করে তারা ঈমানের পূর্ণতা লাভে সক্ষম হবে।
অতপর এই যুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য এবং গায়েবী সাহায্য সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিলো এই যে, মুসলমানরা যেন নিজেদের বীরত্ব ও বাহাদুরির ধোকায় না পড়ে। কেননা এর ফলে তাদের মনে অহংকার দেখা দেবে কিন্তু আল্লাহ তায়ালা চান যে, মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার ওপর নির্ভরতা এবং রসূলের প্রতি আনুগত্যের গুণই যেন দেখা দেয়।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে মহান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সামনে নিয়ে এ ভয়াবহ ও রক্তাক্ত অভিযানের পথে পা রেখেছিলেন, এরপর সে বিষয়ে অপরিহার্য চারিত্রিক গুণাবলী ও বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতপর মোশরেক, মোনাফেক, ইহুদী ও যুদ্ধবন্দীদের উদ্দেশ্যে এমন উচ্চাঙ্গের উপদেশ দেয়া হয়েছে যাতে করে, তারা সত্যের সামনে মাথা নত করে সত্যের অনুসারীতেই পরিণত হয়।
এরপর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে মৌলিক নীতিমালা ব্যাখ্যা করা হয়।
যুদ্ধ ও সন্ধির বিধানও এখানে ব্যাখ্যা করা হয়। ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে এর অপরিহার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই ব্যাখ্যা ও নীতিমালা এ কারণেই দেয়া হয়েছে যাতে, মুসলমানরা ইসলাম পূর্ব যুদ্ধ এবং ইসলাম পরবর্তীকালের যুদ্ধের পার্থক্য করতে পারে। এছাড়া নৈতিক ও চারিত্রিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে যেন তারা উচ্চতর মর্যাদা লাভেও সক্ষম হয়। বিশ্ববাসী যেন এর মাধ্যমে জানতে পারে যে, ইসলাম শুধু একটি আদর্শ মাত্র নয়, বরং ইসলাম যে নীতিমালা ও বিধি বিধানের দাওয়াত দেয়, সেই অনুযায়ী অনুসারীদের বাস্তব প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে।
এরপর ইসলামী রাষ্ট্রের নীতিমালা সম্পর্কে কয়েকটি ধারার উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ মুসলমান এবং এর বাইরের সীমারেখার মুসলমানদের মধ্যকার পার্থক্য বোঝা যায়।
📄 আরো ঘটনা
দ্বিতীয় হিজরীর রমযান মাসে রোযা এবং সদকাতুল ফেতের ফরয করা হয়। যাকাতের পরিমাণ অর্থাৎ নেছাবও এই সময়ে নির্ধারণ করা হয়। মোহাজেরদের মধ্যে কিছুসংখ্যক ছিলেন খুবই গরীব। তাদের রুটি রুজির সমস্যা ছিলো প্রকট। পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্যে বিভিন্ন স্থানে ছুটোছুটি করা তাদের জন্যে ছিলো কষ্টকর। সদকায়ে ফেতের এবং যাকাত সম্পর্কিত বিধান তাদেরকে অন্ন-বস্ত্রের কষ্ট থেকে মুক্তি দেয়।
মুসলমানরা প্রথমবারের মতো ঈদ উদযাপন করেছিলো দ্বিতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে। বদরের যুদ্ধের সুস্পষ্ট বিজয়ের পর এই ঈদ উদযাপিত হয়েছিলো। মুসলমানদের মাথায় বিজয় ও সম্মানের মুকুট রাখার পর আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাদেরকে এই ঈদ উদযাপনের সুযোগ দেন। ঈদ মুসলমানদের জন্যে অসামান্য সম্মান ও সৌভাগ্য বয়ে এনেছিলো। সেই ঈদের নামায আদায়ের দৃশ্য ছিলো খুবই মনোমুগ্ধকর। আল্লাহর হামদ, তাকবীর, তাসবীহ ও তাওহীদের ঘোষণা উচ্চস্বরে করতে করতে মুসলমানরা ময়দানে বেরিয়ে আসেন। সেই সময় মুসলমানদের মন আল্লাহর দেয়া নেয়ামত এবং সাহায্যের কারণে পরিপূর্ণ ছিলো।
তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি আরো বেশী পরিমাণে লাভ করার জন্যে আগ্রহী ছিলেন। তাদের মাথা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে ছিলো অবনত। আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনের এই আয়াতে সেই নেয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, 'স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে স্বল্পসংখ্যক। পৃথিবীতে তোমরা দুর্বলরূপে পরিগণিত হতে, তোমরা আশঙ্কা করতে যে, লোকেরা তোমাদের আকস্মিকভাবে ধরে নিয়ে যাবে। অতপর তিনি তোমাদের আশ্রয় দেন, স্বীয় সাহায্য দ্বারা তোমাদের শক্তিশালী করেন এবং তোমাদের উত্তম বস্তুসমূহ জীবিকারূপে দান করেন যাতে, তোমরা কৃতজ্ঞ হও।' (সূরা আনফাল, আয়াত ২৬)
দ্বিতীয় হিজরীর রমযান মাসে রোযা এবং সদকাতুল ফেতের ফরয করা হয়। যাকাতের পরিমাণ অর্থাৎ নেছাবও এই সময়ে নির্ধারণ করা হয়। মোহাজেরদের মধ্যে কিছুসংখ্যক ছিলেন খুবই গরীব। তাদের রুটি রুজির সমস্যা ছিলো প্রকট। পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্যে বিভিন্ন স্থানে ছুটোছুটি করা তাদের জন্যে ছিলো কষ্টকর। সদকায়ে ফেতের এবং যাকাত সম্পর্কিত বিধান তাদেরকে অন্ন-বস্ত্রের কষ্ট থেকে মুক্তি দেয়।
মুসলমানরা প্রথমবারের মতো ঈদ উদযাপন করেছিলো দ্বিতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে। বদরের যুদ্ধের সুস্পষ্ট বিজয়ের পর এই ঈদ উদযাপিত হয়েছিলো। মুসলমানদের মাথায় বিজয় ও সম্মানের মুকুট রাখার পর আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাদেরকে এই ঈদ উদযাপনের সুযোগ দেন। ঈদ মুসলমানদের জন্যে অসামান্য সম্মান ও সৌভাগ্য বয়ে এনেছিলো। সেই ঈদের নামায আদায়ের দৃশ্য ছিলো খুবই মনোমুগ্ধকর। আল্লাহর হামদ, তাকবীর, তাসবীহ ও তাওহীদের ঘোষণা উচ্চস্বরে করতে করতে মুসলমানরা ময়দানে বেরিয়ে আসেন। সেই সময় মুসলমানদের মন আল্লাহর দেয়া নেয়ামত এবং সাহায্যের কারণে পরিপূর্ণ ছিলো।
তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি আরো বেশী পরিমাণে লাভ করার জন্যে আগ্রহী ছিলেন। তাদের মাথা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে ছিলো অবনত। আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনের এই আয়াতে সেই নেয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, 'স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে স্বল্পসংখ্যক। পৃথিবীতে তোমরা দুর্বলরূপে পরিগণিত হতে, তোমরা আশঙ্কা করতে যে, লোকেরা তোমাদের আকস্মিকভাবে ধরে নিয়ে যাবে। অতপর তিনি তোমাদের আশ্রয় দেন, স্বীয় সাহায্য দ্বারা তোমাদের শক্তিশালী করেন এবং তোমাদের উত্তম বস্তুসমূহ জীবিকারূপে দান করেন যাতে, তোমরা কৃতজ্ঞ হও।' (সূরা আনফাল, আয়াত ২৬)