📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ঈমানের কিছু বিস্ময়কর নিদর্শন

📄 ঈমানের কিছু বিস্ময়কর নিদর্শন


হযরত ওমায়ের ইবনে আল হাম্মাম এবং হযরত আওফ ইবনে হারেস ইবনে আফরার ঈমান সজীব করার মতো কার্যাবলীর উল্লেখ ইতিপূর্বে করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই অভিযানে পদে পদে এমন সব দৃশ্য চোখে পড়েছে, যার মধ্যে ঈমানের শক্তি এবং নীতির পরিপক্কতা প্রসারিত হয়েছে। এই অভিযানে পিতা-পুত্রের মুখোমুখি এবং ভাই ভাইয়ের মুখোমুখি হয়েছে। নীতির প্রশ্নে তলোয়ারসমূহ কোষমুক্ত হয়েছে এবং মযলুম ও অত্যাচারিতরা যালেম ও অত্যাচারির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে ক্রোধের আগুন নির্বাপিত করেছে। যেমন-

এক) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের বললেন, আমি জানি বনু হাশেমসহ কয়েকটি গোত্রের লোককে জোর করে যুদ্ধের ময়দানে নেয়া হয়েছে। আমাদের যুদ্ধের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। কাজেই হাশেম গোত্রের কোন লোক যদি কারো সামনে পড়ে যায়, তাকে যেন হত্যা না করা হয়। আবুল বাখতারি ইবনে হিশাম যদি কারো সামনে পড়ে যায়, তাকে যেন হত্যা না করা হয়। আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেব যদি কারো নিয়ন্ত্রণে এসে যায়, তবে তাঁকেও যেন হত্যা না করা হয়। কেননা তাঁকে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে। একথা শুনে ওতবার পুত্র হযরত আবু হোযায়ফা (রা.) বললেন, আমরা নিজেদের পিতা পুত্র ভাই এবং গোত্রের অন্যান্য লোকদের হত্যা করবো আর আব্বাসকে ছেড়ে দেবো? আল্লাহর শপথ, যদি আব্বাসের সাথে আমার মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়, তবে আমি তাকে তলোয়ারের লাগাম পরিধান করাবো। এ খবর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌছুলে তিনি ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-কে বললেন, আল্লাহর রসূলের চাচার চেহারায়ও কি তলোয়ার মারা হবে? হযরত ওমর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি এ লোকটির গর্দান উড়িয়ে দেবো। কেননা সে মোনোফেক হয়ে গেছে।

পরবর্তী সময়ে হযরত হোযায়ফা (রা.) বলতেন, সেদিন আমি যেকথা বলেছিলাম, সে কারণে কখনোই আমি স্বস্তি পাইনি, নিশ্চিন্ত হতে পারিনি। সব সময় ভয় হতো। শুধু মনে হতো যে, একমাত্র আমার শাহাদাতই সেদিনের বেফাঁস মন্তব্যের কাফফারা হতে পারে। অবশেষে ইয়ামামার যুদ্ধে হযরত হোযায়ফা (রা.) শহীদ হন।

দুই) আবুল বাখতারিকে হত্যা না করার জন্যে এ কারণেই বলা হয়েছে যে, মক্কায় এই লোকটিই কখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিছুমাত্র কষ্ট দেননি। তার পক্ষ থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে বা আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে অপ্রীতিকর কোন কথাও কখনো শোনা যায়নি। এছাড়া বনি হাশেম এবং বনি মোত্তালেবের বয়কট প্রত্যাহারকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যতম।

কিন্তু এতোসব গুণ সত্তেও বদরের দিনে মুজযির ইবনে যিয়াদ বালভীর সাথে তার মুখোমুখি হয়। আবুল বাখতারির সাথে তাঁর একজন সঙ্গীও ছিলেন। উভয়ে পাশাপাশি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আবুল বাখতারিকে দেখে হযরত মুজযির বললেন, হে আবুল বাখতারি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে হত্যা করতে আমাদের নিষেধ করেছেন। আবুল বাখতারি বললেন, খোদার শপথ, তাহলে আমরা দু'জনেই মরবো। এরপর উভয়ে হযরত মুজযির এর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলেন। হযরত মুজযির (রা.) বাধ্য হয়ে উভয়কেই হত্যা করলেন।

তিন) মক্কায় জাহেলিয়াতের সময় থেকেই হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) এবং উমাইয়া ইবনে খালফের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিলো। বদর যুদ্ধের দিনে উমাইয়া তার সন্তান আলীর হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলো। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) তার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি শত্রুদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া কয়েকটি বর্ম নিয়ে যাচ্ছিলেন। উমাইয়া তাকে দেখে বললো, আমি কি তোমার প্রয়োজনে লাগতে পারি? আমি তোমার বর্মগুলোর চেয়ে উত্তম। আজকের মতো দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। তোমাদের কি দুধের প্রয়োজন নেই? অর্থাৎ যে ব্যক্তি আমাকে বন্দী করবে মুক্তিপণ বা ফিদিয়া হিসাবে আমি তাকে অনেক দুধেল উটনী দেবো। একথা শুনে হযরত আবদুর রহমান বর্মগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং উমাইয়া ও তার পুত্র আলীকে গ্রেফতার করে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন।

হযরত আবদুর রহমান (রা.) বলেন, আমি উমাইয়া এবং তার সন্তানের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় উমাইয়া বললো, আপনাদের মধ্যে ওই লোকটি কে ছিলেন যিনি বুকে উট পাখীর পালক লাগিয়ে রেখেছিলেন? আমি বললাম, তিনি হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব। উমাইয়া ইবনে খালফ বললো, এই লোকটিই আমাদের ধ্বংসলীলা ঘটিয়েছে।

হযরত আবদুর রহমান (রা.) বলেন, আমি উভয়কে নিয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় হযরত বেলাল (রা.) উমাইয়াকে আমার সঙ্গে দেখে ফেললেন। স্মরণ করা যেতে পারে যে, উমাইয়া হযরত বেলাল (রা.)-কে মক্কায় ব্যাপকভাবে নির্যাতন করেছিলো। হযরত বেলাল (রা.) উমাইয়াকে দেখে বললেন, ওহে কাফেরদের সর্দার উমাইয়া ইবনে খালফ, হয়তো আমি বাঁচবো অথবা সে বাঁচবে। এরপর উচ্চকণ্ঠে বললেন, ওহে আল্লাহর আনসাররা, এই দেখো কুফরের সর্দার উমাইয়া ইবনে খালফ, এবার হয়তো আমি থাকবো অথবা সে থাকবে। হযরত আবদুর রহমান (রা.) বলেন, ততক্ষণে লোকেরা আমাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। আমি তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু একজন সাহাবী তলোয়ার তুলে উমাইয়ার পুত্র আলীর পায়ে আঘাত করলেন। সাথে সাথে সে ঢলে পড়লো। এদিকে উমাইয়া এমন জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো যে, আমি অতো জোরে চিৎকার কখনো শুনিনি। আমি বললাম, পালাও, পালাও! কিন্তু আজ তো পালানোর পথ নেই। খোদার শপথ, আমি আজ তোমার কোন উপকারে আসতে পারবো না।

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বলেন, উত্তেজিত সাহাবারা উমাইয়া এবং তার পুত্র আলীকে ঘিরে ফেলে আঘাতে আঘাতে হত্যা করে ফেললো। এরপর আবদুর রহমান (রা.) বললেন, আল্লাহ তায়ালা হযরত বেলালের ওপর রহমত করুন। আমার বর্মগুলোও গেলো, আমার গ্রেফতার করা বন্দীদের ব্যাপারেও তিনি আমাকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করে দিলেন।

যাদুল মায়া'দে আল্লামা ইবনে কাইয়েম লিখেছেন, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) উমাইয়া ইবনে খালফকে বললেন, হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়ুন। সে বসে পড়লো। হযরত আবদুর রহমান উমাইয়ার দেহের উপর ঝুঁকে পড়ে তাকে আড়াল করে রাখলেন। কিন্তু সাহাবারা নীচে থেকে তরবারি চালিয়ে উমাইয়াকে হত্যা করলেন। একজন সাহাবীর তরবারির আঘাতে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফেরও পা কেটে গিয়েছিলো।

চার) হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) তাঁর মামা আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগিরাকে হত্যা করেন।

পাঁচ) হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর পুত্র তদানীন্তন মোশরেক আবদুর রহমানকে ডেকে বললেন, ওরে খবিস, আমার অস্ত্রশস্ত্র কোথায়? আবদুর রহমান বললো, হাতিয়ার, দ্রুতগামী ঘোড়া আর সেই তলোয়ার ছাড়া কিছু বাকি নেই, যা বার্ধক্যের বিভ্রান্তি শেষ করে দেয়।

ছয়) মুসলমানরা যে সময় মোশরেকদের গ্রেফতার করছিলেন, সে সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্যে তৈরী হুজরায় অবস্থান করছিলেন। হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) তলোয়ার উঠিয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লক্ষ্য করলেন যে, হযরত সা'দ (রা.) এর চেহারা বিমর্ষ। তিনি বললেন, সা'দ মুসলমানদের কাজ মনে হয় তোমার পছন্দ নয়। তিনি বললেন, হাঁ; হে আল্লাহর রসূল। অমুসলিমদের সাথে এটি আমাদের প্রথম যুদ্ধ। এই যুদ্ধের সুযোগ আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন। কাজেই আমি মনে করি মোশরেকদের ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে তাদের হত্যা করাই সমীচীন, তাদের নির্মূল করা দরকার।

সাত) এই যুদ্ধে হযরত উকাশা ইবনে মোহসেন আসাদীর তলোয়ার ভেঙ্গে যায়। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এক টুকরো কাষ্ঠখন্ড দিয়ে বললেন, আকাশা, এটি দিয়ে লড়াই করো। আকাশা সেই কাষ্ঠখন্ড হাত দিয়ে সোজা করতেই সেটি একটি ধারালো চকচকে তলোয়ারে পরিণত হলো। এরপর তিনি সেই তলোয়ার দিয়ে লড়াই করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে মুসলমানরা জয়লাভ করলেন। সেই তলোয়ারের নাম রাখা হলো 'আওন' অর্থাৎ সাহায্য। সেটি হযরত আকাশার কাছেই ছিলো। তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে এই তলোয়ার ব্যবহার করতেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খেলাফতের সময় ধর্মান্তরিত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। সেই সময়েও ওই তলোয়ার তাঁর কাছে ছিলো।

আট) যুদ্ধ শেষে হযরত মসয়াব ইবনে ওমাইর আবদারি (রা.) তাঁর ভাই আবু উজাইর ইবনে ওমাইর আবদারির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবু উযায়ের মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। সেই সময় একজন আনসারি সাহাবীর হাতে তার হাত কেটে গেলো। হযরত মসয়াব সেই সাহাবীকে বললেন, এই লোকটির মাধ্যমে হাত মযবুত করো। তার মা বড় ধনী। তিনি সম্ভবত তোমাকে ভালো মুক্তিপণ দেবেন। এতে আবু উযায়ের তাঁর ভাই মসআবকে বললেন, আমার ব্যাপারে কি তোমার এটাই অসিয়ত? হযরত মসআব (রা.) বললেন, হাঁ, তুমি নও, বরং এই আনসারী হচ্ছে আমার ভাই।

নয়) মোশরেকদের লাশ যখন কূয়োর ভেতর ছুঁড়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হলো, তখন ওতবা ইবনে রবিয়ার লাশ কূয়োর দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। সেই সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওতবার পুত্র হোযায়ফার মুখের দিকে তাকালেন। লক্ষ্য করলেন, আবু হোযায়ফা বিমর্ষ গম্ভীর। তাকে কেমন যেন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হোযায়ফা, সম্ভবত তোমার পিতার ব্যাপারে তোমার মনে খুব কষ্ট হচ্ছে? তিনি বললেন, জ্বীনা, হে আল্লাহর রসূল। আমার মনের মধ্যে আমার পিতা এবং তার হত্যাকান্ড সম্পর্কে কোন শিহরণ নেই। তবে আমি ধারণা করেছিলাম যে, আমার পিতার মাথায় বুদ্ধি-শুদ্ধি আছে, দূরদর্শিতা আছে। এ কারণে আশা করেছিলাম যে, তাঁর বুদ্ধি-বিবেক এবং দূরদর্শিতার কারণে তিনি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেবেন। কিন্তু এখন তাঁর পরিণাম দেখে, কুফুরীর ওপর তার জীবন শেষ হতে দেখে খুব খারাপ লাগছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হোযায়ফা (রা.)-এর জন্যে দোয়া করলেন এবং তাঁর সম্পর্কে উত্তম মন্তব্য করলেন।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 উভয় পক্ষের হতাহতের সংখ্যা

📄 উভয় পক্ষের হতাহতের সংখ্যা


বদরের যুদ্ধ মুসলমানদের বিজয় এবং কাফেরদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো। এই যুদ্ধে ১৪ জন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন ৬ জন মোহাজের আর ৮ জন আনসার। যুদ্ধে কাফেরদের প্রভূত ক্ষতি হয়েছিলো। তাদের ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দী হয়েছিলো। এরা ছিলো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং গোত্রের সর্দার।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিহতদের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, 'তোমরা তো সবাই ছিলে নেতৃস্থানীয় লোক। তোমরা আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করোনি অথচ অনেকেই আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে। তোমরা আমাকে নিঃসঙ্গ সহায়হীন অবস্থায় ফেলেছিলে, অথচ অনেকে আমাকে সাহায্য করেছে। তোমরা আমাকে বের করে দিয়েছিলে, অথচ অনেকে আশ্রয় দিয়েছে।' এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিহতদের মৃতদেহ টেনে বদরের একটি কূয়োর ভেতর ছুঁড়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন।

হযরত আবু তালহা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে বদরের দিন কোরায়শদের ২৪ জন বড় বড় সর্দারের লাশ বদরের একটি নোংরা কুয়োয় নিক্ষেপ করা হয়। তখন নিয়ম ছিলো যে, কোন কওমের ওপর জয়ী হলে তিনদিন যুদ্ধক্ষেত্রে কাটানো হতো। বদরের মাঠে তিনদিন কাটানোর পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সওয়ারীর পিঠে আসন সাঁটা হলো। এরপর তিনি পদব্রজে চললেন, সাহাবারা তাঁকে অনুসরণ করলেন। হঠাৎ কূয়োর তীরে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। এরপর তিনি বিভিন্ন ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন, 'হে অমুকের পুত্র অমুক, হে অমুকের পুত্র অমুক, তোমরা যদি আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করতে, তবে সেটা কি তোমাদের জন্যে ভালো হতো না? আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছেন, আমরা তার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছি, তোমরা কি তোমাদের প্রতিপালকের কৃত ওয়াদার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছো?' হযরত ওমর (রা.) আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনি এমনসব দেহের সাথে কি কথা বলছেন, যাদের রূহ নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেই সত্তার শপথ যার হাতে মোহাম্মদের প্রাণ আমি যা কিছু বলছি, তোমরা ওদের চেয়ে বেশী শুনতে পাও না। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে যে, তোমরা ওদের চেয়ে বেশী শ্রবণকারী নও। কিন্তু ওরা জবাব দিতে পারে না।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মক্কায় পরাজয়ের খবর

📄 মক্কায় পরাজয়ের খবর


পরাজয়ের পর মক্কার মোশরেকরা বিশৃঙ্খল অবস্থায় ভীতবিহ্বল হয়ে মক্কার পথে পালালো। লজ্জায় তারা এমন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে যে, বুঝতে পারছিলো না, কিভাবে মক্কায় প্রবেশ করবে।

ইবনে ইসহাক বলেন, সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি কোরায়শদের পরাজয়ের খবর নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করে, তার নাম ছিলো হায়ছুমান ইবনে আবদুল্লাহ খোযাঈ। লোকজন তাকে পেছনের খবর জিজ্ঞাসা করলো। তিনি বললেন, ওতবা ইবনে রবিয়া, শায়বা ইবনে রবিয়া, আবুল হাকাম ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালফ এবং আরো অমুক অমুক সর্দার নিহত হয়েছে। নিহতদের তালিকায় নেতৃস্থানীয় কোরায়শদের নাম শুনে কাবার হাতীমে উপবিষ্ট সফওয়ান ইবনে উমাইয়া বললেন, খোদার কসম, এই লোকটির যদি হুশ থেকে থাকে, তবে ওকে আমার কথা জিজ্ঞাসা করো। উপস্থিত লোকেরা হায়ছুমানকে বললো, সফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কি সংবাদ? তিনি বললেন, ঐ দেখো, তিনি কাবার হাতীমে বসে আছেন। খোদার কসম, তার বাপ এবং তার ভাইকে নিহত হতে আমি নিজে দেখেছি।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্রীতদাস আবু রাফে বর্ণনা করেন যে, সেই সময় আমি হযরত আব্বাসের ক্রীতদাস ছিলাম। আমাদের পরিবারে ইসলাম প্রবেশ করেছিলো। হযরত আব্বাস (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আমিও মুসলমান হয়েছিলাম। হযরত আব্বাস (রা.) তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখেছিলেন। আবু লাহাব বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের জয়ের খবর শুনে আবু লাহাব মুষড়ে পড়লো। আমরা নবতর শক্তি ও সম্মান অনুভব করলাম। আমি ছিলাম দুর্বল প্রকৃতির লোক। আমি তীর তৈরী করতাম। যমযম এর হুজরায় বসে তীরের ফলা সরু করতাম। সেই সময় আমি এক মনে তীর তৈরী করছিলাম। উম্মুল ফযল আমার কাছে বসেছিলেন। যুদ্ধজয়ের খবর পেয়ে আমরা বেশ আনন্দিত ছিলাম। এমন সময় আবু লাহাব পা টেনে টেনে অনেকটা খোঁড়ানোর ভঙ্গিতে এসে হুজরার কাছে বসলো। তার পিঠ ছিলো আমার পিঠের দিকে। এমন সময় আবু সুফিয়ান ইবনে হারব ইবনে আবদুল মোত্তালেব এসে পৌছুলো। আবু লাহাব তাকে বললো, আমার কাছে এসো, আমার জীবনের শপথ, তোমার কাছে খবর আছে। আবু সুফিয়ান আবু লাহাবের সামনে বসলো। বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে রইলো। আবু লাহাব বললো, বলো ভাতিজা, লোকদের কি খবর? আবু সুফিয়ান বললো, কিছুই না। লোকদের সাথে আমাদের মোকাবেলা হলো, আমরা নিজেদের কাঁধ তাদের হাতে ছেড়ে দিলাম। তারা যেভাবে ইচ্ছা আমাদের হত্যা করছিলো, যেভাবে ইচ্ছা আমাদের বন্দী করছিলো। খোদার কসম, এসব সত্তেও আমি আমাদের লোকদের দোষ দেই না। প্রকৃতপক্ষে এমন সব লোকদের সাথে আমাদের মোকাবেলা হয়েছিলো, যারা আকাশ যমিনের মাঝামাঝি চিত্রল ঘোড়ায় সওয়ার ছিলো। খোদার কসম, তারা কোন কিছু ছাড়ছিলো না এবং কোন জিনিস তাদের মোকাবেলায় টিকতেও পারছিলো না।

আবু রাফে বলেন, আমি নিজ হাতে তাঁবুর কিনারা তুললাম। এরপর বললাম, খোদার কসম, তারা ছিলেন ফেরেশতা। একথা শুনে আবু লাহাব আমার মুখে সজোরে চড় দিলো। আমি তার সাথে লেগে গেলাম। সে আমাকে তুলে আছাড় দিলো। এরপর আমাকে প্রহার করতে লাগলো। আমি ছিলাম দুর্বল। ইতিমধ্যে উম্মুল ফযল উঠে তাঁবুর একট কঞ্চি দিয়ে আবু লাহাবকে প্রহার করতে লাগলেন। আবু লাহাব আঘাত পেলো। উম্মুল ফযল তাকে প্রহার করতে করতে বলছিলেন, ওর কোন মালিক নেই, এজন্যে ওকে দুর্বল মনে করছো? আবু লাহাব অপমানিত হয়ে উঠে চলে গেলো। এই ঘটনার মাত্র সাতদিন পর আবু লাহাব প্লেগে আক্রান্ত হয়ে সে রোগেই প্রাণ ত্যাগ করলো। প্লেগের গুটিকে আরবে খুব অপয়া মনে করা হতো। মৃত্যুর পর তিনদিন পর্যন্ত আবু লাহাবের লাশ পড়ে রইলো। তার সন্তানরাও কাছে গেলো না। কেউ তার দাফনের ব্যবস্থা করেনি। তার সন্তানরা তিনদিন পর ভেবে দেখলো যে, এভাবে লাশ ফেলে রাখলে অন্য লোকেরা তাদের নিন্দা সমালোচনা করবে। তখন তারা একটি গর্ত খুঁড়ে সেই গর্তে কাঠের মাধ্যমে ধাক্কা দিয়ে লাশ ফেলে দিলো। তারপর দূর থেকে পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে গর্তের মুখ বন্ধ করে দিলো।

মক্কায় বদর যুদ্ধের পরাজয়ের খবর পৌছার পরে কোরায়শদের মেজায খারাপ হয়ে গেলো। মৃতদের স্মরণে তারা কোন শোক প্রকাশমূলক কোনো অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেনি। তারা ভেবেছিলো যে, এতে করে মুসলমানরা সমালোচনা করবে। আর মুসলমানদের কোন প্রকার সমালোচনার সুযোগ দিতে তারা রাযি নয়।

একটি মজার ঘটনা উল্লেখ করা হচ্ছে। বদরের যুদ্ধে আসওয়াদ ইবনে আবদুল মোত্তালেবের তিন পুত্র নিহত হয়েছিলো। এ কারণে পুত্রদের স্মরণে সে কান্নাকাটি করতে চাচ্ছিলো। আসওয়াদ ছিলো অন্ধ। একরাতে সে একজন বিলাপকারিনী মহিলার কান্নার আওয়ায শুনলো। এই আওয়ায শুনে আসওয়াদ দ্রুত নিজের ক্রীতদাসকে সেই মহিলার কাছে খবর আনতে পাঠালো যে, শোক প্রকাশের অনুমতি পাওয়া গেছে কিনা জেনে এসো। কোরায়শরা কি তাদের নিহতদের স্মরণে কান্নাকাটি করছে? তাহলে আমি আমার তিন পুত্রের মধ্যে অন্তত আবু হাকিমার জন্যে একটু কাঁদতাম। কেননা আমার বুক জ্বলে যাচ্ছে। ক্রীতদাস ফিরে এসে বললো, সে তার হারিয়ে যাওয়া উটের শোকে বিলাপ করছে। আসওয়াদ একথা শুনে আত্মসম্বরণ করতে পারলো না। নীচে উল্লিখিত কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলো।

সে মহিলা কাঁদছে হায় উট হারালো তাই, উটের শোকে তার বুঝি চোখে ঘুম নাই। উটের জন্যে কাঁদিসনে যদিও তা হারিয়েছে, বদরের কথা ভেবে কাঁদ, ওরে কপাল পুড়েছে। হাসীস, মাখযুম আর আবু ওলিদ ছিলো গোত্রের প্রাণ, আকীলের জন্যে হারেসের জন্যে ফেলো চোখের নীর। ওরা ছিলো ব্যাঘ্রের ব্যাঘ্র ওরা ছিলো বীর। সবার নাম নিওনা তবু কাঁদো ওদের তরে, কেউ হাকিমা হায় আমি বোঝাই কেমন করে আবু হাকিমার শোক কোনভাবেই সমকক্ষ তার, অজ্ঞাত লোক বদরের কারণে আজ হলো সর্দার।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মদীনায় বিজয়ের সুসংবাদ

📄 মদীনায় বিজয়ের সুসংবাদ


মুসলমানদের বিজয় পরিপূর্ণ হওয়ার পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনাবাসীদের তাড়াতাড়ি সুসংবাদ দেয়ার জন্যে দূত পাঠালেন। মদীনা দু'টি এলাকায় খবর দেয়ার জন্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা এবং হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)-কে প্রেরণ করা হলো।

এর আগে ইহুদী এবং মোনোফেকরা মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে মদীনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে রেখেছিলো। এমনকি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিহত হওয়ার খবর পর্যন্ত প্রচার করা হয়েছিলো। হযরত যায়েদ ইবনে হারেসাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাসাওয়া নামক উটনীর পিঠে সওয়ার হয়ে আসতে দেখে একজন মোনাফেক বলেই ফেলল যে, সত্যি সত্যি মোহাম্মদ নিহত হয়েছেন। ওই দেখো তার উটনী। আমরা এ উটনী চিনি। ওই দেখো যায়েদ ইবনে হারেস। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে এসেছে। এমন হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছে যে, কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। উভয় দূত পৌছার পর মুসলমানরা তাদের ঘিরে ধরে এবং বিস্তারিত বিবরণ শুনতে লাগলেন। সব শোনার পর বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে মুসলমানরা আনন্দে অধীর হয়ে উঠলেন। 'নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর' ধ্বনিতে মদীনার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠলো। যে সকল মুসলমান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বদর প্রান্তরে যাননি তারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভ্যর্থনা জানানোর উদ্দেশ্যে বদরের পথে বেরিয়ে পড়লেন।

হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন, হযরত ওসমান (রা.)-এর সহধর্মিনী নবী নন্দিনী হযরত রোকাইয়া (রা.)-কে দাফন করে যখন আমরা কবরের উপরের মাটি সমান করে দিচ্ছিলাম, সেই সময় আমাদের কাছে বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের খবর এসে পৌছুলো। হযরত রোকাইয়া (রা.) অসুস্থ ছিলেন। তাঁর দেখাশোনার জন্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ওসমান (রা.)-এর সঙ্গে আমাকেও মদীনায় রেখে গিয়েছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00