📄 রণক্ষেত্র ইবলিসের পলায়ন ও কাফেরদের পরাজয়
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছিলো যে, অভিশপ্ত ইবলিস ছোরাকা ইবনে মালেক ইবনে জাশআম মুদলিজীর আকৃতি ধারণ করে এসেছিলো। মোশরেকদের কাছ থেকে সে তখনো পৃথক হয়নি। কিন্তু পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে ফেরেশতাদের ব্যবস্থা গ্রহণ দেখে সে ছুটে পালাতে লাগলো। কিন্তু হারেস ইবনে হিশাম তাকে ধরে ফেললেন। তিনি ভেবেছিলেন, লোকটি প্রকৃতই ছোরাকা ইবনে মালেক। কিন্তু ইবলিস হযরত হারেসের বুকে প্রচন্ড ঘুষি মারলো। তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। ইত্যবসরে ইবলিস পালিয়ে গেলো। মোশরেকরা বলতে লাগল, ছোরাকা কোথায় যাচ্ছ? তুমি কি বলো নাই যে, আমাদের সাহায্য করবে, আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকবে না? ছোরাকা বললো, আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি, যা তোমরা দেখতে পাওনা। আল্লাহকে আমার ভয় হচ্ছে, তিনি কঠোর শাস্তিদাতা। এরপর ইবলিস সমুদ্রে গিয়ে আত্মগোপন করলো।
কাফেরদের পরাজয়
কিছুক্ষণের মধ্যেই অমুসলিমদের বাহিনীতে ব্যর্থতা ও হতাশার সুস্পষ্ট লক্ষণ ফুটে উঠলো। মুসলমানদের প্রবল আক্রমণের মুখে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লো। যুদ্ধের পরিণাম হয়ে উঠলো সুস্পষ্ট। কাফের কোরায়শরা পশ্চাদপসারণ করতে লাগলো এবং তাদের মনে হতাশা ছেয়ে গেলো। মুসলমানরা কাউকে হত্যা করছিলেন, কাউকে যখম করছিলেন, কাউকে ধরে নিয়ে আসছিলেন। ফলে কাফেররা সুস্পষ্ট পরাজয় বরণ করলো।
দুর্বৃত্তদের নেতা আবু জেহেল কোরায়শ কাফেরদের ছত্রভঙ্গ হতে দেখে সেই সয়লাব প্রতিরোধের চেষ্টা করলো। নিজের অনুসারীদের উদ্দীপিত করার জন্যে চিৎকার করে সে বলতে লাগলো, ছোরাকার পলায়নে তোমরা সাহস হারিও না। মোহাম্মদের সাথে ছোরাকার যোগসাজস ছিলো। ওতবা, শায়বা ওলীদ নিহত হয়েছে দেখে তোমরা হিম্মত হারিও না। ওরা তাড়াহুড়ো করেছে। লাত এবং ওযযার শপথ, ততক্ষণ আমরা ফিরে যাব না, যতক্ষণ না ওদের দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলব। দেখো, তোমরা ওদের কাউকে হত্যা করবে না, বরং পাকড়াও করো। পরে আমরা ওদের অশুভ তৎপরতার মজা টের পাইয়ে দেবো।
আবু জেহেল তার এ অহংকারের মজা শিগগির টের পেয়ে গেলো। কেননা অল্পক্ষণের মধ্যেই মুসলমানদের জবাবী হামলার মুখে তাদের মধ্যে ছত্রভঙ্গ অবস্থা দেখা দিলো। আবু জেহেল তার কিছুসংখ্যক অনুসারীকে নিয়ে তখনো ঘেরাও অবস্থায় ছিলো। দুর্বৃত্ত নেতা আবু জেহেলের চারিদিকে ছিলো তীর আর তলোয়ারের পাহারা। মুসলিম মোজাহেদের প্রচন্ড হামলায় সেই পাহারা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো। মুসলমানরা লক্ষ্য করলেন যে, আবু জেহেল একটি ঘোড়ার পিঠে রয়েছে। তার মৃত্যু তখন পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছিলো।
📄 আবু জেহেলের হত্যাকান্ড
হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বলেন, বদর যুদ্ধের দিনে আমি মুসলমানদের কাতারের মধ্যে ছিলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করে দেখি যে, ডানে বাঁয়ে দু'জন আনসার কিশোর। তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে আমি চিন্তা করছিলাম, হঠাৎ একজন চুপিসারে আমাকে বললো, চাচাজান, আবু জেহেল কে তা আমাকে দেখিয়ে দিন। আমি বললাম, ভাতিজা, তুমি তার কি করবে? সে বললো, আমি শুনেছি, আবু জেহেল প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেয়। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, যদি আমরা আবু জেহেলকে দেখতে পাই তবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার কাছ থেকে আলাদা হব না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার এবং আমাদের মৃত্যু যার আগে লেখা রয়েছে, তার মৃত্যু না হয়। হযরত আবদুর রহমান (রা.) বলেন, একথা শুনে আমি অবাক হলাম। অন্য একজন আনসার কিশোরও আমাকে চুপিসারে একই কথা বললো। কয়েক মুহূর্ত পরে আমি আবু জেহেলকে লোকদের মধ্যে বিচরণ করতে দেখছিলাম। আমি উভয় আনসার কিশোরকে বললাম, ওই দেখো তোমাদের শিকার। যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছো। একথা শোনামাত্র উভয় আনসার কিশোর আবু জেহেলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করে ফেলল। এরপর উভয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন তোমাদের মধ্যে কে আবু জেহেলকে হত্যা করেছ? উভয়ে বললো, আমি করেছি, আমি করেছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা কি তালোয়ারের রক্ত মুছেছো? তারা বললো, না মুছিনি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়ের তালোয়ার দেখে বললেন, তোমরা দু'জনেই হত্যা করেছ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশ্য আবু জেহেলের পরিত্যাক্ত জিনিসপত্র মায়া'য ইবনে আমর ইবনে জামুহকে প্রদান করলেন। উভয় কিশোরের নাম ছিলো মা'য ইবনে আমর জামুহ এবং মা'উয ইবনে আফরা।
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, মায়া'য ইবনে আমর ইবনে জামুহ বলেছেন, আবু জেহেল কাফেরদের তীর তলোয়ারের দুর্ভেদ্য পাহারার ভেতর ছিলো। কাফেররা বলছিলো আবু জেহেলের কাছে কেউ যেন পৌছুতে না পারে। মায়া'য ইবনে আমর বলেন, একথা শুনে আবু জেহেলকে চিনে রাখলাম এবং তার কাছাকাছি থাকতে লাগলাম। সুযোগ পাওয়া মাত্র আমি তার ওপর হামলা করলাম। তাকে এমন আঘাত করলাম যে, তার পা হাঁটুর নীচে দিয়ে কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। ঝরে পড়া খেজুরের মতো তার পা উড়ে গেলো। এদিকে আবু জেহেলকে আমি আঘাত করলাম আর ওদিকে তার পুত্র একরামা আমার কাঁধ বরাবর তরবারি দিয়ে আঘাত করলো। এতে লড়াই করতে অসুবিধা হচ্ছিলো। কর্তিত হাত পেছনে রেখে অপর হাতে তরবারি চালাচ্ছিলাম। এতেও বেশ অসুবিধা হচ্ছিলো। আমি তখন হাতের কর্তিত অংশ পায়ের নীচে রেখে এক ঝটকায় হাত থেকে পৃথক করে ফেললাম। এরপর আবু জেহেলের কাছে মাউয ইবনে আফরা পৌছুলেন। তিনি ছিলেন আহত। তিনি আবু জেহেলের ওপর এমন আঘাত করলেন যে, আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ দুশমন সেখানেই ঢলে পড়লো। আবু জেহেলের শেষ নিঃশ্বাস তখনো বের হয়নি। শ্বাস-প্রশ্বাস চলাচল করছিলো। এরপর হযরত মাউয ইবনে আফরা লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু জেহেলের পরিণাম কে দেখবে, দেখে আসো। সাহাবারা তখন আবু জেহেলের সন্ধান করতে লাগলেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) আবু জেহেলকে এমতাবস্থায় পেলেন যে, তার নিঃশ্বাস চলাচল করছিলো। তিনি আবু জেহেলের ধড়ে পা রেখে মাথা কাটার জন্যে দাড়ি ধরে বললেন, ওরে আল্লাহর দুশমন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা তোকে অপমান অসম্মান করলেন তো? আবু জেহেল বললো, কিভাবে আমাকে অসম্মান করলেন? তোমরা যাকে হত্যা করেছো তার চেয়ে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন কোন মানুষ আছে নাকি? তার চেয়ে বড় আর কে? আহা, আমাকে যদি কিশোর ছাড়া অন্য কেউ হত্যা করতো। এরপর বলতে লাগলো, বলো তো আজ জয়ী হয়েছে কারা? হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বললেন, আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসূল। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) আবু জেহেলের কাঁধে পা চাপা দিয়ে রেখেছিলেন। আবু জেহেল তাঁকে বললো, ওরে বকরির রাখাল, তুই অনেক উঁচু জায়গায় পৌঁছে গেছিস। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মক্কায় বকরি চরাতেন।
এ কথোপকথনের পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) আবু জেহেলের মাথা কেটে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে হাযির করে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, এই হচ্ছে আল্লাহর দুশমন আবু জেহেলের মাথা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হাঁ সত্যই, সেই আল্লাহর শপথ, যিনি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই, হাঁ, সত্য, তিনি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই, হাঁ, সত্য, তিনি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তায়ালা সুমহান। সকল প্রশংসা তাঁরই জন্যে নিবেদিত, তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি সত্য করে দেখিয়েছেন, নিজের বান্দাদের সাহায্য করেছেন এবং একাকীই সকল দলকে পরাজিত করেছেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর বললেন, চলো। আমাকে তার লাশ দেখাও। আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবু জেহেলের লাশের কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি বললেন, ও হচ্ছে এই উম্মতের ফেরাউন।
টিকাঃ
৮. সহীহ বোখারী ১ম খন্ড, পৃ. ৪৪৪, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৬৮, মেশকাত ২য় খন্ড, ৩৫২। অন্যান্য বর্ণনায় দ্বিতীয় কিশোরের নাম মাউয ইবনে আফরা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৬৩৫। আবু জেহেলের পরিত্যক্ত জিনিসপত্র একজনকে এ কারণেই দেয়া হয়েছিলো, যেহেতু মা'য অথবা মাউয ইবনে আফরা সেই যুদ্ধে পরবর্তী সময়ে শহীদ হন। আবু জেহেলের তরবারি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে দেয়া হয়েছিলো। কেননা তিনি আবু জেহেলের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। দ্রষ্টব্য, সুনানে আবু দাউদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৩৭৩
৯. হযরত মা'য ইবনে আমর জামুহ (রাঃ) হযরত ওসমানের (রাঃ) খেলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
📄 ঈমানের কিছু বিস্ময়কর নিদর্শন
হযরত ওমায়ের ইবনে আল হাম্মাম এবং হযরত আওফ ইবনে হারেস ইবনে আফরার ঈমান সজীব করার মতো কার্যাবলীর উল্লেখ ইতিপূর্বে করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই অভিযানে পদে পদে এমন সব দৃশ্য চোখে পড়েছে, যার মধ্যে ঈমানের শক্তি এবং নীতির পরিপক্কতা প্রসারিত হয়েছে। এই অভিযানে পিতা-পুত্রের মুখোমুখি এবং ভাই ভাইয়ের মুখোমুখি হয়েছে। নীতির প্রশ্নে তলোয়ারসমূহ কোষমুক্ত হয়েছে এবং মযলুম ও অত্যাচারিতরা যালেম ও অত্যাচারির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে ক্রোধের আগুন নির্বাপিত করেছে। যেমন-
এক) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের বললেন, আমি জানি বনু হাশেমসহ কয়েকটি গোত্রের লোককে জোর করে যুদ্ধের ময়দানে নেয়া হয়েছে। আমাদের যুদ্ধের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। কাজেই হাশেম গোত্রের কোন লোক যদি কারো সামনে পড়ে যায়, তাকে যেন হত্যা না করা হয়। আবুল বাখতারি ইবনে হিশাম যদি কারো সামনে পড়ে যায়, তাকে যেন হত্যা না করা হয়। আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেব যদি কারো নিয়ন্ত্রণে এসে যায়, তবে তাঁকেও যেন হত্যা না করা হয়। কেননা তাঁকে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে। একথা শুনে ওতবার পুত্র হযরত আবু হোযায়ফা (রা.) বললেন, আমরা নিজেদের পিতা পুত্র ভাই এবং গোত্রের অন্যান্য লোকদের হত্যা করবো আর আব্বাসকে ছেড়ে দেবো? আল্লাহর শপথ, যদি আব্বাসের সাথে আমার মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়, তবে আমি তাকে তলোয়ারের লাগাম পরিধান করাবো। এ খবর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌছুলে তিনি ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-কে বললেন, আল্লাহর রসূলের চাচার চেহারায়ও কি তলোয়ার মারা হবে? হযরত ওমর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি এ লোকটির গর্দান উড়িয়ে দেবো। কেননা সে মোনোফেক হয়ে গেছে।
পরবর্তী সময়ে হযরত হোযায়ফা (রা.) বলতেন, সেদিন আমি যেকথা বলেছিলাম, সে কারণে কখনোই আমি স্বস্তি পাইনি, নিশ্চিন্ত হতে পারিনি। সব সময় ভয় হতো। শুধু মনে হতো যে, একমাত্র আমার শাহাদাতই সেদিনের বেফাঁস মন্তব্যের কাফফারা হতে পারে। অবশেষে ইয়ামামার যুদ্ধে হযরত হোযায়ফা (রা.) শহীদ হন।
দুই) আবুল বাখতারিকে হত্যা না করার জন্যে এ কারণেই বলা হয়েছে যে, মক্কায় এই লোকটিই কখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিছুমাত্র কষ্ট দেননি। তার পক্ষ থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে বা আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে অপ্রীতিকর কোন কথাও কখনো শোনা যায়নি। এছাড়া বনি হাশেম এবং বনি মোত্তালেবের বয়কট প্রত্যাহারকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যতম।
কিন্তু এতোসব গুণ সত্তেও বদরের দিনে মুজযির ইবনে যিয়াদ বালভীর সাথে তার মুখোমুখি হয়। আবুল বাখতারির সাথে তাঁর একজন সঙ্গীও ছিলেন। উভয়ে পাশাপাশি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আবুল বাখতারিকে দেখে হযরত মুজযির বললেন, হে আবুল বাখতারি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে হত্যা করতে আমাদের নিষেধ করেছেন। আবুল বাখতারি বললেন, খোদার শপথ, তাহলে আমরা দু'জনেই মরবো। এরপর উভয়ে হযরত মুজযির এর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলেন। হযরত মুজযির (রা.) বাধ্য হয়ে উভয়কেই হত্যা করলেন।
তিন) মক্কায় জাহেলিয়াতের সময় থেকেই হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) এবং উমাইয়া ইবনে খালফের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিলো। বদর যুদ্ধের দিনে উমাইয়া তার সন্তান আলীর হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলো। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) তার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি শত্রুদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া কয়েকটি বর্ম নিয়ে যাচ্ছিলেন। উমাইয়া তাকে দেখে বললো, আমি কি তোমার প্রয়োজনে লাগতে পারি? আমি তোমার বর্মগুলোর চেয়ে উত্তম। আজকের মতো দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। তোমাদের কি দুধের প্রয়োজন নেই? অর্থাৎ যে ব্যক্তি আমাকে বন্দী করবে মুক্তিপণ বা ফিদিয়া হিসাবে আমি তাকে অনেক দুধেল উটনী দেবো। একথা শুনে হযরত আবদুর রহমান বর্মগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং উমাইয়া ও তার পুত্র আলীকে গ্রেফতার করে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন।
হযরত আবদুর রহমান (রা.) বলেন, আমি উমাইয়া এবং তার সন্তানের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় উমাইয়া বললো, আপনাদের মধ্যে ওই লোকটি কে ছিলেন যিনি বুকে উট পাখীর পালক লাগিয়ে রেখেছিলেন? আমি বললাম, তিনি হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব। উমাইয়া ইবনে খালফ বললো, এই লোকটিই আমাদের ধ্বংসলীলা ঘটিয়েছে।
হযরত আবদুর রহমান (রা.) বলেন, আমি উভয়কে নিয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় হযরত বেলাল (রা.) উমাইয়াকে আমার সঙ্গে দেখে ফেললেন। স্মরণ করা যেতে পারে যে, উমাইয়া হযরত বেলাল (রা.)-কে মক্কায় ব্যাপকভাবে নির্যাতন করেছিলো। হযরত বেলাল (রা.) উমাইয়াকে দেখে বললেন, ওহে কাফেরদের সর্দার উমাইয়া ইবনে খালফ, হয়তো আমি বাঁচবো অথবা সে বাঁচবে। এরপর উচ্চকণ্ঠে বললেন, ওহে আল্লাহর আনসাররা, এই দেখো কুফরের সর্দার উমাইয়া ইবনে খালফ, এবার হয়তো আমি থাকবো অথবা সে থাকবে। হযরত আবদুর রহমান (রা.) বলেন, ততক্ষণে লোকেরা আমাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। আমি তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু একজন সাহাবী তলোয়ার তুলে উমাইয়ার পুত্র আলীর পায়ে আঘাত করলেন। সাথে সাথে সে ঢলে পড়লো। এদিকে উমাইয়া এমন জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো যে, আমি অতো জোরে চিৎকার কখনো শুনিনি। আমি বললাম, পালাও, পালাও! কিন্তু আজ তো পালানোর পথ নেই। খোদার শপথ, আমি আজ তোমার কোন উপকারে আসতে পারবো না।
হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বলেন, উত্তেজিত সাহাবারা উমাইয়া এবং তার পুত্র আলীকে ঘিরে ফেলে আঘাতে আঘাতে হত্যা করে ফেললো। এরপর আবদুর রহমান (রা.) বললেন, আল্লাহ তায়ালা হযরত বেলালের ওপর রহমত করুন। আমার বর্মগুলোও গেলো, আমার গ্রেফতার করা বন্দীদের ব্যাপারেও তিনি আমাকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করে দিলেন।
যাদুল মায়া'দে আল্লামা ইবনে কাইয়েম লিখেছেন, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) উমাইয়া ইবনে খালফকে বললেন, হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়ুন। সে বসে পড়লো। হযরত আবদুর রহমান উমাইয়ার দেহের উপর ঝুঁকে পড়ে তাকে আড়াল করে রাখলেন। কিন্তু সাহাবারা নীচে থেকে তরবারি চালিয়ে উমাইয়াকে হত্যা করলেন। একজন সাহাবীর তরবারির আঘাতে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফেরও পা কেটে গিয়েছিলো।
চার) হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) তাঁর মামা আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগিরাকে হত্যা করেন।
পাঁচ) হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর পুত্র তদানীন্তন মোশরেক আবদুর রহমানকে ডেকে বললেন, ওরে খবিস, আমার অস্ত্রশস্ত্র কোথায়? আবদুর রহমান বললো, হাতিয়ার, দ্রুতগামী ঘোড়া আর সেই তলোয়ার ছাড়া কিছু বাকি নেই, যা বার্ধক্যের বিভ্রান্তি শেষ করে দেয়।
ছয়) মুসলমানরা যে সময় মোশরেকদের গ্রেফতার করছিলেন, সে সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্যে তৈরী হুজরায় অবস্থান করছিলেন। হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) তলোয়ার উঠিয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লক্ষ্য করলেন যে, হযরত সা'দ (রা.) এর চেহারা বিমর্ষ। তিনি বললেন, সা'দ মুসলমানদের কাজ মনে হয় তোমার পছন্দ নয়। তিনি বললেন, হাঁ; হে আল্লাহর রসূল। অমুসলিমদের সাথে এটি আমাদের প্রথম যুদ্ধ। এই যুদ্ধের সুযোগ আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন। কাজেই আমি মনে করি মোশরেকদের ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে তাদের হত্যা করাই সমীচীন, তাদের নির্মূল করা দরকার।
সাত) এই যুদ্ধে হযরত উকাশা ইবনে মোহসেন আসাদীর তলোয়ার ভেঙ্গে যায়। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এক টুকরো কাষ্ঠখন্ড দিয়ে বললেন, আকাশা, এটি দিয়ে লড়াই করো। আকাশা সেই কাষ্ঠখন্ড হাত দিয়ে সোজা করতেই সেটি একটি ধারালো চকচকে তলোয়ারে পরিণত হলো। এরপর তিনি সেই তলোয়ার দিয়ে লড়াই করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে মুসলমানরা জয়লাভ করলেন। সেই তলোয়ারের নাম রাখা হলো 'আওন' অর্থাৎ সাহায্য। সেটি হযরত আকাশার কাছেই ছিলো। তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে এই তলোয়ার ব্যবহার করতেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খেলাফতের সময় ধর্মান্তরিত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। সেই সময়েও ওই তলোয়ার তাঁর কাছে ছিলো।
আট) যুদ্ধ শেষে হযরত মসয়াব ইবনে ওমাইর আবদারি (রা.) তাঁর ভাই আবু উজাইর ইবনে ওমাইর আবদারির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবু উযায়ের মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। সেই সময় একজন আনসারি সাহাবীর হাতে তার হাত কেটে গেলো। হযরত মসয়াব সেই সাহাবীকে বললেন, এই লোকটির মাধ্যমে হাত মযবুত করো। তার মা বড় ধনী। তিনি সম্ভবত তোমাকে ভালো মুক্তিপণ দেবেন। এতে আবু উযায়ের তাঁর ভাই মসআবকে বললেন, আমার ব্যাপারে কি তোমার এটাই অসিয়ত? হযরত মসআব (রা.) বললেন, হাঁ, তুমি নও, বরং এই আনসারী হচ্ছে আমার ভাই।
নয়) মোশরেকদের লাশ যখন কূয়োর ভেতর ছুঁড়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হলো, তখন ওতবা ইবনে রবিয়ার লাশ কূয়োর দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। সেই সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওতবার পুত্র হোযায়ফার মুখের দিকে তাকালেন। লক্ষ্য করলেন, আবু হোযায়ফা বিমর্ষ গম্ভীর। তাকে কেমন যেন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হোযায়ফা, সম্ভবত তোমার পিতার ব্যাপারে তোমার মনে খুব কষ্ট হচ্ছে? তিনি বললেন, জ্বীনা, হে আল্লাহর রসূল। আমার মনের মধ্যে আমার পিতা এবং তার হত্যাকান্ড সম্পর্কে কোন শিহরণ নেই। তবে আমি ধারণা করেছিলাম যে, আমার পিতার মাথায় বুদ্ধি-শুদ্ধি আছে, দূরদর্শিতা আছে। এ কারণে আশা করেছিলাম যে, তাঁর বুদ্ধি-বিবেক এবং দূরদর্শিতার কারণে তিনি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেবেন। কিন্তু এখন তাঁর পরিণাম দেখে, কুফুরীর ওপর তার জীবন শেষ হতে দেখে খুব খারাপ লাগছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হোযায়ফা (রা.)-এর জন্যে দোয়া করলেন এবং তাঁর সম্পর্কে উত্তম মন্তব্য করলেন।
📄 উভয় পক্ষের হতাহতের সংখ্যা
বদরের যুদ্ধ মুসলমানদের বিজয় এবং কাফেরদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো। এই যুদ্ধে ১৪ জন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন ৬ জন মোহাজের আর ৮ জন আনসার। যুদ্ধে কাফেরদের প্রভূত ক্ষতি হয়েছিলো। তাদের ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দী হয়েছিলো। এরা ছিলো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং গোত্রের সর্দার।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিহতদের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, 'তোমরা তো সবাই ছিলে নেতৃস্থানীয় লোক। তোমরা আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করোনি অথচ অনেকেই আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে। তোমরা আমাকে নিঃসঙ্গ সহায়হীন অবস্থায় ফেলেছিলে, অথচ অনেকে আমাকে সাহায্য করেছে। তোমরা আমাকে বের করে দিয়েছিলে, অথচ অনেকে আশ্রয় দিয়েছে।' এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিহতদের মৃতদেহ টেনে বদরের একটি কূয়োর ভেতর ছুঁড়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন।
হযরত আবু তালহা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে বদরের দিন কোরায়শদের ২৪ জন বড় বড় সর্দারের লাশ বদরের একটি নোংরা কুয়োয় নিক্ষেপ করা হয়। তখন নিয়ম ছিলো যে, কোন কওমের ওপর জয়ী হলে তিনদিন যুদ্ধক্ষেত্রে কাটানো হতো। বদরের মাঠে তিনদিন কাটানোর পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সওয়ারীর পিঠে আসন সাঁটা হলো। এরপর তিনি পদব্রজে চললেন, সাহাবারা তাঁকে অনুসরণ করলেন। হঠাৎ কূয়োর তীরে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। এরপর তিনি বিভিন্ন ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন, 'হে অমুকের পুত্র অমুক, হে অমুকের পুত্র অমুক, তোমরা যদি আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করতে, তবে সেটা কি তোমাদের জন্যে ভালো হতো না? আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছেন, আমরা তার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছি, তোমরা কি তোমাদের প্রতিপালকের কৃত ওয়াদার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছো?' হযরত ওমর (রা.) আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনি এমনসব দেহের সাথে কি কথা বলছেন, যাদের রূহ নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেই সত্তার শপথ যার হাতে মোহাম্মদের প্রাণ আমি যা কিছু বলছি, তোমরা ওদের চেয়ে বেশী শুনতে পাও না। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে যে, তোমরা ওদের চেয়ে বেশী শ্রবণকারী নও। কিন্তু ওরা জবাব দিতে পারে না।