📄 বদর প্রান্তরে নবী (স.)-এর দোয়া
এদিকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোজাহেদদের কাতার সোজা করার পর সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা পরওয়ারদেগারের কাছে সাহায্যের জন্যে কাতর কণ্ঠে আবেদন জানাচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, হে আল্লাহ তায়ালা, তুমি আমার সাথে যে ওয়াদা করেছো তা পূরণ করো। হে আল্লাহ তায়ালা, আমি তোমার কাছে তোমার প্রতিশ্রুত সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি।
উভয় পক্ষে প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দরবারে এই দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ রব্বুল আলামীন, যদি আজ মুসলমানদের এই দল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তবে দুনিয়ায় এবাদাত করার মতো কেউ থাকবে না। হে আল্লাহ তায়ালা, তুমি কি এটা চাও যে, আজকের পরে কখনোই তোমার এবাদাত করা না হোক?'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় বিনয় ও নম্রতার সাথে সকাতর কণ্ঠে এই মোনাজাত করছিলেন। তাঁর কাতরোক্তির একপর্যায়ে উভয় স্কন্ধ থেকে চাদর পড়ে গেলো। হযরত আবু বকর (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাদর ঠিক করে দিলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল, এবার থামুন। আপনি তো আপনার প্রতিপালকের কাছে অতিশয় কাতরতার সাথে মোনাজাত করেছেন। এদিকে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের প্রতি আদেশ পাঠালেন যে, 'স্মরণ করো, তোমাদের প্রতিপালক ফেরেশতাদের প্রতি প্রত্যাদেশ করেন যে, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। সুতরাং তোমরা মোমেনদেরকে অবিচলিত রাখো, যারা কুফুরী করে, আমি তাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করবো সুতরাং, তাদের স্কন্ধ ও সর্বাঙ্গে আঘাত করো।' (সূরা আনফাল, আয়াত ১২) এদিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ মর্মে ওহী পাঠালেন, 'আমি তোমাদের সাহায্য করবো, এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা, যারা একের পর এক আসবে।' (সূরা আনফাল, আয়াত ৯)
📄 ফেরেশতাদের অবতরণ
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ সময় হযরত জিবরাঈল (আ.) এলেন। তিনি চকিতে মাথা তুলে বললেন, আবু বকর, খুশী হও, জিবরাঈল এসেছেন, ধুলোবালির মধ্যে এসেছেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আবু বকর, খুশী হও, তোমাদের কাছে আল্লাহর সাহায্য এসে পৌঁছেছে। জিবরাঈল ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়ার আগে আগে আসছেন। ধুলোবালি উড়ছে।
এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কামরার বাইরে এলেন। তিনি বর্ম পরিহিত ছিলেন। তিনি উদ্দীপনাময় ভঙ্গিতে সামনে অগ্রসর হতে হতে বলছিলেন, 'এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে।' (সূরা কামার, আয়াত ৪৫)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর এক মুঠো ধূলি কাফেরদের প্রতি নিক্ষেপের সময় বললেন, 'শাহাতিল উজুহ' অর্থাৎ ওদের চেহারা আচ্ছন্ন হোক। একথা বলেই ধুলো কাফেরদের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। এই নিক্ষিপ্ত ধূলি প্রত্যেক কাফেরের চোখ, মুখ, নাক ও গলায় প্রবেশ করলো। একজনও বাদ গেলো না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'এবং তখন তুমি নিক্ষেপ করোনি, বরং আল্লাহ তায়ালাই নিক্ষেপ করেছিলেন।' (সূরা আনফাল, আয়াত ১৭)
📄 জবাবী হামলা
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবী হামলার নির্দেশ এবং যুদ্ধের তাকিদ দিয়ে বলেন, তোমরা এগিয়ে যাও। সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে মোহাম্মদের প্রাণ এবং ওদের সঙ্গে তোমাদের যে কেউ দৃঢ়তার সাথে পুণ্যের কাজ মনে করে অগ্রগামী হয়ে পেছনে সরে না এসে যুদ্ধ করবে এবং মারা যাবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে অবশ্যই জান্নাত দান করবেন।
কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, 'সেই জান্নাতের প্রতি যে ওঠো যে যার দিগন্ত ও বিস্তৃতি আকাশ ও মাটির সমপরিমাণ।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একথা শুনে ওমায়ের ইবনে হাম্মাম বললেন, চমৎকার, চমৎকার! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে একথা বলার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল অন্য কোন কারণে নয়, আমি আশা করছিলাম যে, আমিও সেই জান্নাতের অধিবাসীদের মধ্যে যদি হতে পারতাম। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেই জান্নাতীদের মধ্যে তুমিও রয়েছো। এরপর ওমায়ের ইবনে হাম্মাম কয়েকটি খেজুর বের করে খেতে লাগলেন। হঠাৎ উচ্ছ্বসিতকণ্ঠে বললেন, এই খেজুরগুলো খেতে অনেক সময় প্রয়োজন। জীবনকে এতো দীর্ঘায়িত করবো কেন। এ কথা বলে তিনি খেজুর ছুঁড়ে ফেলে বিধর্মীদের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জবাবী হামলার নির্দেশ দেন তখন শত্রুদের হামলার তীব্রতা কমে আসে। তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনাতেও ভাটা পড়ে। এটা মুসলমানদের অবস্থান দৃঢ় করার ক্ষেত্রে সহায়ক প্রমাণিত হয়। কেননা সাহাবায়ে কেরাম যখন জবাবী হামলার আদেশ লাভ করেন এবং তাঁদের জোশ যখন তুঙ্গে তখন তাঁরা প্রচন্ডবেগে হামলা করেন। এ সময় তাঁরা কাফেরদের কাতার এলোমেলো করে তাদের শিরশ্ছেদ করতে করতে এগিয়ে যান। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে বর্ম পরিধান করে রণক্ষেত্রে এসেছেন দেখে সাহাবাদের উদ্দীপনা আরো বেড়ে গেলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বলছিলেন, 'শীঘ্রই ওরা পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করবে।'
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উদ্দীপনায় সাহাবারা বিপুল বিক্রমে লড়াই করেন। এ সময়ে ফেরেশতারাও মুসলমানদের সাহায্য করেন।
ইবনে সা'দ এর বর্ণনায় হযরত ইকরামা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, সেইদিন মানুষের মাথা কর্তিত হয়ে পড়ছিলো। অথচ বোঝা যাচ্ছিলো না যে, কে তাকে মেরেছে। মানুষের কর্তিত হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যেতো অথচ কে কেটেছে তা বোঝা যেত না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, একজন আনসারী মুসলমান একজন মোশরেককে দৌড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ সেই মোশরেকের ওপর চাবুকের আঘাতের শব্দ শোনা গেলো কে যেন বলছিলো, যাও, সামনে এগোও। সাহাবী লক্ষ্য করলেন যে, পৌত্তলিক চিৎকাত হয়ে পড়ে গেছে। তার নাকে মুখে আঘাতের চিহ্ন। চেহারা রক্তাক্ত। দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো যে, তাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করা হয়েছে অথচ আঘাতকারীকে দেখা যাচ্ছিলো না, সেই আনসারী সাহাবী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ ঘটনা বর্ণনা করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি সত্য বলেছো। এটা ছিলো তৃতীয় আসমানের সাহায্য।
আবু দাউদ মাজানি বলেন, আমি একজন মোশরেককে মারার জন্যে দৌড়াচ্ছিলাম। তার গলায় আমার তলোয়ার পৌঁছার আগেই কর্তিত মস্তক মাটিতে গড়িয়ে পড়লো। আমি বুঝতে পারলাম যে, এই কাফেরকে অন্য কেউ হত্যা করেছে।
একজন আনসারী হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেবকে গ্রেফতার করে নিয়ে এলেন। হযরত আব্বাস তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, আমাকে তো এই লোকটি কয়েদ করে নিয়ে আসেনি। আমাকে মুন্ডিত মস্তকের একজন লোক কয়েদ করে নিয়ে এসেছে। সুদর্শন সেই লোকটি একটি চিত্রল ঘোড়ার পিঠে আসীন ছিলো। এখন তো সেই লোকটিকে এইসব লোকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। আনসারী বললেন, হে আল্লাহর রসূল, তাকে তো আমি গ্রেফতার করেছি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, চুপ করো। আল্লাহ তায়ালা একজন সম্মানিত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করেছেন।
টিকাঃ
৬. মুসলিম, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩৯, মেশকাত, ২য় খন্ড, পৃ. ৩৩১
৭. ইবনে সা'দ এর বর্ণনা। দেখুন ফতহুল বারী, ৭ম খন্ড, পৃ. ৩৪৯।
📄 রণক্ষেত্র ইবলিসের পলায়ন ও কাফেরদের পরাজয়
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছিলো যে, অভিশপ্ত ইবলিস ছোরাকা ইবনে মালেক ইবনে জাশআম মুদলিজীর আকৃতি ধারণ করে এসেছিলো। মোশরেকদের কাছ থেকে সে তখনো পৃথক হয়নি। কিন্তু পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে ফেরেশতাদের ব্যবস্থা গ্রহণ দেখে সে ছুটে পালাতে লাগলো। কিন্তু হারেস ইবনে হিশাম তাকে ধরে ফেললেন। তিনি ভেবেছিলেন, লোকটি প্রকৃতই ছোরাকা ইবনে মালেক। কিন্তু ইবলিস হযরত হারেসের বুকে প্রচন্ড ঘুষি মারলো। তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। ইত্যবসরে ইবলিস পালিয়ে গেলো। মোশরেকরা বলতে লাগল, ছোরাকা কোথায় যাচ্ছ? তুমি কি বলো নাই যে, আমাদের সাহায্য করবে, আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকবে না? ছোরাকা বললো, আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি, যা তোমরা দেখতে পাওনা। আল্লাহকে আমার ভয় হচ্ছে, তিনি কঠোর শাস্তিদাতা। এরপর ইবলিস সমুদ্রে গিয়ে আত্মগোপন করলো।
কাফেরদের পরাজয়
কিছুক্ষণের মধ্যেই অমুসলিমদের বাহিনীতে ব্যর্থতা ও হতাশার সুস্পষ্ট লক্ষণ ফুটে উঠলো। মুসলমানদের প্রবল আক্রমণের মুখে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লো। যুদ্ধের পরিণাম হয়ে উঠলো সুস্পষ্ট। কাফের কোরায়শরা পশ্চাদপসারণ করতে লাগলো এবং তাদের মনে হতাশা ছেয়ে গেলো। মুসলমানরা কাউকে হত্যা করছিলেন, কাউকে যখম করছিলেন, কাউকে ধরে নিয়ে আসছিলেন। ফলে কাফেররা সুস্পষ্ট পরাজয় বরণ করলো।
দুর্বৃত্তদের নেতা আবু জেহেল কোরায়শ কাফেরদের ছত্রভঙ্গ হতে দেখে সেই সয়লাব প্রতিরোধের চেষ্টা করলো। নিজের অনুসারীদের উদ্দীপিত করার জন্যে চিৎকার করে সে বলতে লাগলো, ছোরাকার পলায়নে তোমরা সাহস হারিও না। মোহাম্মদের সাথে ছোরাকার যোগসাজস ছিলো। ওতবা, শায়বা ওলীদ নিহত হয়েছে দেখে তোমরা হিম্মত হারিও না। ওরা তাড়াহুড়ো করেছে। লাত এবং ওযযার শপথ, ততক্ষণ আমরা ফিরে যাব না, যতক্ষণ না ওদের দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলব। দেখো, তোমরা ওদের কাউকে হত্যা করবে না, বরং পাকড়াও করো। পরে আমরা ওদের অশুভ তৎপরতার মজা টের পাইয়ে দেবো।
আবু জেহেল তার এ অহংকারের মজা শিগগির টের পেয়ে গেলো। কেননা অল্পক্ষণের মধ্যেই মুসলমানদের জবাবী হামলার মুখে তাদের মধ্যে ছত্রভঙ্গ অবস্থা দেখা দিলো। আবু জেহেল তার কিছুসংখ্যক অনুসারীকে নিয়ে তখনো ঘেরাও অবস্থায় ছিলো। দুর্বৃত্ত নেতা আবু জেহেলের চারিদিকে ছিলো তীর আর তলোয়ারের পাহারা। মুসলিম মোজাহেদের প্রচন্ড হামলায় সেই পাহারা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো। মুসলমানরা লক্ষ্য করলেন যে, আবু জেহেল একটি ঘোড়ার পিঠে রয়েছে। তার মৃত্যু তখন পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছিলো।