📄 যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন ও সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু
আসওয়াদ ইবনে আবুল আছাদের হত্যাকান্ড ছিলো বদরের যুদ্ধের প্রথম ঘটনা। এই হত্যার পর যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়লো। কোরায়শ বাহিনীর মধ্য থেকে তিনজন বিশিষ্ট যোদ্ধা বেরিয়ে এলো। এরা ছিলো একই গোত্রের লোক; তন্মধ্যে রবিয়ার দুই পুত্র ওতবা ও শায়বা এবং ওতবার এক পুত্র ওলীদ। এরা কাতার থেকে বেরিয়ে এসেই প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার জন্যে আহ্বান জানালো। তিনজন আনসার যুবক অগ্রসর হলেন। এরা ছিলেন, আওফ, মোয়াওয়েয এবং আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা। প্রথমোক্ত দুইজন ছিলেন হারেসের পুত্র। তাদের মায়ের নাম ছিলো আফরা। কোরায়শরা জিজ্ঞাসা করলো, তোমাদের পরিচয় কি? তারা বললো, আমরা মদীনার আনসার। কোরায়শরা বললো, আপনারা অভিজাত প্রতিদ্বন্দ্বী সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনাদের সাথে আমাদের কোন বিরোধ নেই। আমরা চাই আমাদের চাচাতো ভাইদের। এরপর তিন কোরায়শ যুবক চিৎকার করে বললো, হে মোহাম্মদ, আমাদের কাছে আমাদের রক্তসম্পর্কীয়দের পাঠাও। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওবায়দা ইবনে হারেস, হামযা এবং আলী এগিয়ে যাও। এরা এগিয়ে যাওয়ার পর তিনজন কোরায়শ যুবক না চেনার ভান করে এদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলো। এরা নিজেদের পরিচয় দিলেন। কোরায়শ যুবকত্রয় বললো, হাঁ, আপনারা অভিজাত প্রতিদ্বন্দ্বী। এরপর শুরু হলো সাধারণ যুদ্ধ। হযরত ওবায়দা ইবনে হারেস (রা.) ওতবা ইবনে রবিয়ার সাথে, হযরত হামযা (রা.) শায়বার সাথে এবং হযরত আলী (রা.) ওলীদ ইবনে ওতবার সাথে মোকাবেলা করলেন।
হযরত হামযা (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) নিজ নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাবু করে ফেললেন কিন্তু হযরত ওবায়দা ইবনে হারেস (রা.) এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী ওতবার মধ্যে আঘাত বিনিময় হলো। তারা একে অন্যকে মারাত্মকভাবে আহত করে ফেললেন। ইতিমধ্যে হযরত হামযা এবং হযরত আলী তাদের প্রতিদ্বন্দীর কাজ শেষ করে হযরত ওবায়দার সাহায্যে এগিয়ে এলেন এবং ওতবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে শেষ করে ফেললেন। এরপর তারা হযরত ওবায়দাকে উঠিয়ে নিয়ে এলেন। হযরত ওবায়দা (রা.)-এর পা কেটে গিয়েছিলো এবং কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তার মুখে আর কথা ফুটেনি। চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে মুসলমানরা মদীনা ফিরে যাওয়ার পথে সফরা প্রান্তর অতিক্রম করার সময় হযরত ওবায়দা (রা.) ইন্তেকাল করেন। হযরত আলী (রা.) কসম খেয়ে বলতেন, এই আয়াত আমাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 'এরা দু'টি বিবদমান পক্ষ, তারা তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে।' (সূরা হজ্জ, আয়াত ১৯) পৌত্তলিকদের দুর্ভাগ্য সূচিত হয়ে গেলো। একত্রে তিনজন বিশিষ্ট যোদ্ধাকে তারা হারালো। ক্রোধে দিশেহারা হয়ে তারা সবাই একত্রে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।
অন্যদিকে মুসলমানরা তাদের মহান প্রতিপালকের কাছে সাহায্যের জন্যে দোয়া করে এবং দৃঢ়তার সাথে কাফেরদের হামলা মোকাবেলা করছিলেন। তারা 'আহad, আহাদ' শব্দ উচ্চারণ করে বিধর্মী কাফেরদের ওপর পাল্টা হামলায় তাদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছিলেন।
টিকাঃ
৫. ইবনে হিশাম, মোসনাদে আহমদ। আবু দাউদের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে। মেশকাত, ২য় খন্ড, পৃ. ৩৪৩
📄 বদর প্রান্তরে নবী (স.)-এর দোয়া
এদিকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোজাহেদদের কাতার সোজা করার পর সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা পরওয়ারদেগারের কাছে সাহায্যের জন্যে কাতর কণ্ঠে আবেদন জানাচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, হে আল্লাহ তায়ালা, তুমি আমার সাথে যে ওয়াদা করেছো তা পূরণ করো। হে আল্লাহ তায়ালা, আমি তোমার কাছে তোমার প্রতিশ্রুত সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি।
উভয় পক্ষে প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দরবারে এই দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ রব্বুল আলামীন, যদি আজ মুসলমানদের এই দল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তবে দুনিয়ায় এবাদাত করার মতো কেউ থাকবে না। হে আল্লাহ তায়ালা, তুমি কি এটা চাও যে, আজকের পরে কখনোই তোমার এবাদাত করা না হোক?'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় বিনয় ও নম্রতার সাথে সকাতর কণ্ঠে এই মোনাজাত করছিলেন। তাঁর কাতরোক্তির একপর্যায়ে উভয় স্কন্ধ থেকে চাদর পড়ে গেলো। হযরত আবু বকর (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাদর ঠিক করে দিলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল, এবার থামুন। আপনি তো আপনার প্রতিপালকের কাছে অতিশয় কাতরতার সাথে মোনাজাত করেছেন। এদিকে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের প্রতি আদেশ পাঠালেন যে, 'স্মরণ করো, তোমাদের প্রতিপালক ফেরেশতাদের প্রতি প্রত্যাদেশ করেন যে, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। সুতরাং তোমরা মোমেনদেরকে অবিচলিত রাখো, যারা কুফুরী করে, আমি তাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করবো সুতরাং, তাদের স্কন্ধ ও সর্বাঙ্গে আঘাত করো।' (সূরা আনফাল, আয়াত ১২) এদিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ মর্মে ওহী পাঠালেন, 'আমি তোমাদের সাহায্য করবো, এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা, যারা একের পর এক আসবে।' (সূরা আনফাল, আয়াত ৯)
📄 ফেরেশতাদের অবতরণ
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ সময় হযরত জিবরাঈল (আ.) এলেন। তিনি চকিতে মাথা তুলে বললেন, আবু বকর, খুশী হও, জিবরাঈল এসেছেন, ধুলোবালির মধ্যে এসেছেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আবু বকর, খুশী হও, তোমাদের কাছে আল্লাহর সাহায্য এসে পৌঁছেছে। জিবরাঈল ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়ার আগে আগে আসছেন। ধুলোবালি উড়ছে।
এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কামরার বাইরে এলেন। তিনি বর্ম পরিহিত ছিলেন। তিনি উদ্দীপনাময় ভঙ্গিতে সামনে অগ্রসর হতে হতে বলছিলেন, 'এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে।' (সূরা কামার, আয়াত ৪৫)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর এক মুঠো ধূলি কাফেরদের প্রতি নিক্ষেপের সময় বললেন, 'শাহাতিল উজুহ' অর্থাৎ ওদের চেহারা আচ্ছন্ন হোক। একথা বলেই ধুলো কাফেরদের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। এই নিক্ষিপ্ত ধূলি প্রত্যেক কাফেরের চোখ, মুখ, নাক ও গলায় প্রবেশ করলো। একজনও বাদ গেলো না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'এবং তখন তুমি নিক্ষেপ করোনি, বরং আল্লাহ তায়ালাই নিক্ষেপ করেছিলেন।' (সূরা আনফাল, আয়াত ১৭)
📄 জবাবী হামলা
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবী হামলার নির্দেশ এবং যুদ্ধের তাকিদ দিয়ে বলেন, তোমরা এগিয়ে যাও। সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে মোহাম্মদের প্রাণ এবং ওদের সঙ্গে তোমাদের যে কেউ দৃঢ়তার সাথে পুণ্যের কাজ মনে করে অগ্রগামী হয়ে পেছনে সরে না এসে যুদ্ধ করবে এবং মারা যাবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে অবশ্যই জান্নাত দান করবেন।
কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, 'সেই জান্নাতের প্রতি যে ওঠো যে যার দিগন্ত ও বিস্তৃতি আকাশ ও মাটির সমপরিমাণ।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একথা শুনে ওমায়ের ইবনে হাম্মাম বললেন, চমৎকার, চমৎকার! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে একথা বলার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল অন্য কোন কারণে নয়, আমি আশা করছিলাম যে, আমিও সেই জান্নাতের অধিবাসীদের মধ্যে যদি হতে পারতাম। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেই জান্নাতীদের মধ্যে তুমিও রয়েছো। এরপর ওমায়ের ইবনে হাম্মাম কয়েকটি খেজুর বের করে খেতে লাগলেন। হঠাৎ উচ্ছ্বসিতকণ্ঠে বললেন, এই খেজুরগুলো খেতে অনেক সময় প্রয়োজন। জীবনকে এতো দীর্ঘায়িত করবো কেন। এ কথা বলে তিনি খেজুর ছুঁড়ে ফেলে বিধর্মীদের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জবাবী হামলার নির্দেশ দেন তখন শত্রুদের হামলার তীব্রতা কমে আসে। তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনাতেও ভাটা পড়ে। এটা মুসলমানদের অবস্থান দৃঢ় করার ক্ষেত্রে সহায়ক প্রমাণিত হয়। কেননা সাহাবায়ে কেরাম যখন জবাবী হামলার আদেশ লাভ করেন এবং তাঁদের জোশ যখন তুঙ্গে তখন তাঁরা প্রচন্ডবেগে হামলা করেন। এ সময় তাঁরা কাফেরদের কাতার এলোমেলো করে তাদের শিরশ্ছেদ করতে করতে এগিয়ে যান। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে বর্ম পরিধান করে রণক্ষেত্রে এসেছেন দেখে সাহাবাদের উদ্দীপনা আরো বেড়ে গেলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বলছিলেন, 'শীঘ্রই ওরা পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করবে।'
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উদ্দীপনায় সাহাবারা বিপুল বিক্রমে লড়াই করেন। এ সময়ে ফেরেশতারাও মুসলমানদের সাহায্য করেন।
ইবনে সা'দ এর বর্ণনায় হযরত ইকরামা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, সেইদিন মানুষের মাথা কর্তিত হয়ে পড়ছিলো। অথচ বোঝা যাচ্ছিলো না যে, কে তাকে মেরেছে। মানুষের কর্তিত হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যেতো অথচ কে কেটেছে তা বোঝা যেত না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, একজন আনসারী মুসলমান একজন মোশরেককে দৌড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ সেই মোশরেকের ওপর চাবুকের আঘাতের শব্দ শোনা গেলো কে যেন বলছিলো, যাও, সামনে এগোও। সাহাবী লক্ষ্য করলেন যে, পৌত্তলিক চিৎকাত হয়ে পড়ে গেছে। তার নাকে মুখে আঘাতের চিহ্ন। চেহারা রক্তাক্ত। দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো যে, তাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করা হয়েছে অথচ আঘাতকারীকে দেখা যাচ্ছিলো না, সেই আনসারী সাহাবী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ ঘটনা বর্ণনা করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি সত্য বলেছো। এটা ছিলো তৃতীয় আসমানের সাহায্য।
আবু দাউদ মাজানি বলেন, আমি একজন মোশরেককে মারার জন্যে দৌড়াচ্ছিলাম। তার গলায় আমার তলোয়ার পৌঁছার আগেই কর্তিত মস্তক মাটিতে গড়িয়ে পড়লো। আমি বুঝতে পারলাম যে, এই কাফেরকে অন্য কেউ হত্যা করেছে।
একজন আনসারী হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেবকে গ্রেফতার করে নিয়ে এলেন। হযরত আব্বাস তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, আমাকে তো এই লোকটি কয়েদ করে নিয়ে আসেনি। আমাকে মুন্ডিত মস্তকের একজন লোক কয়েদ করে নিয়ে এসেছে। সুদর্শন সেই লোকটি একটি চিত্রল ঘোড়ার পিঠে আসীন ছিলো। এখন তো সেই লোকটিকে এইসব লোকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। আনসারী বললেন, হে আল্লাহর রসূল, তাকে তো আমি গ্রেফতার করেছি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, চুপ করো। আল্লাহ তায়ালা একজন সম্মানিত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করেছেন।
টিকাঃ
৬. মুসলিম, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩৯, মেশকাত, ২য় খন্ড, পৃ. ৩৩১
৭. ইবনে সা'দ এর বর্ণনা। দেখুন ফতহুল বারী, ৭ম খন্ড, পৃ. ৩৪৯।