📄 নেতৃত্বের কেন্দ্রস্থল ও যুদ্ধের জন্যে সেনাবিন্যাস
সাহাবারা জলাশয়ের কাছে অবস্থান নেয়ার পর হযরত সা'দ ইবনে মা'য (রা.) একটি প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি বলেন যে, মুসলমানরা নিজেদের নেতার জন্যে একটি অবস্থান কেন্দ্র তৈরী করতে পারে। এর ফলে আল্লাহ না করুন জয়ের বদলে মুসলমানদের পরাজয় অথবা অন্য কোন ধরনের জরুরী পরিস্থিতি দেখা দিলে আমরা আগে থেকেই সতর্ক থাকতে পারব। এরূপ আলোচনার পর হযরত সা'দ (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনার জন্যে আমরা একটা বিশেষ খাট তৈরী করতে চাই। আপনি সেখানে অবস্থান করবেন। আপনার পাশেই আমরা আপনার সওয়ারীও রেখে দেবো। এরপর শত্রুদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হবো। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সম্মান দিলে এবং শত্রুদের ওপর বিজয়ী করলে আপনার এরূপ অবস্থানস্থল আমাদের জন্যে পছন্দনীয় হবে। আমরা পরাজিত হলে আপনি সওয়ারীতে আরোহন করে সেইসব লোকের কাছ যেতে পারবেন, যারা পেছনে রয়েছেন। হে আল্লাহর নবী, আপনার পেছনে এমন লোকেরাই রয়েছে, যারা আপনাকে আমাদের চেয়ে বেশী ভালোবাসে। আপনার প্রতি আমাদের ভালোবাসা তাদের মতো বেশী ও গভীর নয়। তারা যদি জানতেন যে, আপনি যুদ্ধের মুখোমুখি হবেন, তাহলে তারা কিছুতেই পেছনে থাকতেন না। আল্লাহ তায়ালা তাদের মাধ্যমে আপনার হেফাযত করবেন, ওরা আপনার কল্যাণকারী হবেন এবং আপনার সঙ্গে জেহাদ করবেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা শুনে হযরত সা'দ (রা.) এর প্রশংসা করে তাঁর জন্যে দোয়া করলেন। মুসলমানরা যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তর পূর্ব দিকে একটি উঁচু টিলায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্যে একটি খাট তৈরী করেন। সেখানে বসে পুরো রণাঙ্গন চোখে পড়ে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্যে হযরত সা'দ ইবনে মা'য (রা.)-এর নেতৃত্বে একদল আনসার যুবককে দায়িত্ব দেয়া হয়।
যুদ্ধের জন্যে সেনা বিন্যাস
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর সেনা বিন্যাস করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে রওয়ানা হয়ে যান। সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতের ইশারা করে দেখিয়ে বলছিলেন যে, আগামীকাল ইনশাল্লাহ এই জায়গা হবে অমুকের বধ্যভূমি এবং এই জায়গা হবে অমুকের বধ্যভূমি।
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে একটি গাছের শেকড়ের কাছে রাত্রিযাপন করেন। সাহাবারাও নিরুদ্বেগ প্রশান্তির সাথে রাত কাটান। তাদের অন্তর ছিলো আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ শান্তি ও নিশ্চিন্ততার সাথে সময় অতিবাহিত করেন। তাদের মনে প্রত্যাশা ছিলো যে, সকালে নিজ চোখে মহান প্রতিপালকের সুসংবাদের প্রমাণ দেখতে পাবেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'স্মরণ কর, তিনি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন করেন এবং আকাশ থেকে তোমাদের ওপর বারি বর্ষণ করেন, তা দ্বারা তোমাদের তিনি পবিত্র করবেন, তোমাদের থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা অপসারণ করবেন, তোমাদের হৃদয় দৃঢ় করবেন এবং তোমাদের পা স্থির রাখবেন।' (সূরা আনফাল, আয়াত ১১)
এটি ছিলো দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ই রমযানের রাত। এই মাসের ৮ বা ১২ তারিখ তিনি মদীনা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন।
টিকাঃ
১. জামে তিরমিযি, আবওয়াবুল জেহাদ, ১ম খন্ড, পৃ. ২০১
২. মেশকাত ২য় খন্ড, পৃ. ৫৪৩
📄 শত্রুদের পারস্পরিক মতবিরোধ
কোরায়শরা বদরের শেষ প্রান্তে টিলার ওপাশে নিজেদের তাঁবুতে রাত্রিযাপন করে। সকালে টিলার এ পাশে বদর প্রান্তরে এসে সমবেত হয়। একদল লোক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাউযের দিকে অগ্রসর হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন ওদের বাধা দিও না। পরে দেখা গেছে যে, লোকদের মধ্যে যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাউয থেকে পানি পান করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলো, তারা সবাই নিহত হয়েছিলো। একমাত্র হাকিম ইবনে হিযাম বেঁচে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে হাকিম ইসলাম গ্রহণ করে একজন ভালো মুসলমান হয়েছিলেন। তার নিয়ম ছিলো যে, তিনি যখনই কসম খেতেন, তখনই বলতেন, 'লায়াল্লাযি নাজ্জানি মিন ইয়াওমে বাদরিন।' অথাৎ সেই সত্তার শপথ, যিনি আমাকে বদরের দিন মুক্তি দিয়েছেন।
কোরায়শরা মুসলমানদের সৈন্য সমাবেশ লক্ষ্য করার পর এদের শক্তি পরিমাপ করার জন্যে ওমায়ের ইবনে ওয়াহাব জাহামীকে প্রেরণ করলো। ওমায়ের এক চক্কর দিয়ে ফিরে গিয়ে বললো, মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা তিনশত বা কিছু কম বেশী হবে। আমি একটু দেখে আসি তাদের কোন সহায়ক বাহিনী আছে কিনা। বেশ কিছুদূরে ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে এসে ওমায়ের বললো সহায়ক কোন সৈন্য মুসলমানরা পশ্চাতে রেখে আসেনি। তবে একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি যে, ইয়াসরেবের উটগুলো নির্ভেজাল মৃত্যু বহন করে নিয়ে এসেছে। ওদের সমুদয় শক্তি তলোয়ারের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহর শপথ, আমি যা বুঝেছি, এতে মনে হয়েছে যে, ওরা কেউ তোমাদের না মেরে মরবে না। যদি তোমাদের বিশিষ্ট লোকদের ওরা মেরেই ফেলে, তবে তোমরা বিশিষ্ট সঙ্গীহারা হয়ে যাবে। কাজেই যা কিছু করবে, ভেবে চিন্তে করাই সমীচীন।
এ সময় আরো একদল যুদ্ধবিরোধী লোক আবু জেহেলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠলো। কিন্তু আবু জেহেল যুদ্ধ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যুদ্ধবিরোধী লোকেরা চাচ্ছিলো যে, যুদ্ধ না করেই মক্কায় ফিরে যাবে। যেমন হাকিম ইবনে হিযাম যুদ্ধ চাচ্ছিলেন না। তিনি এখানে ওখানে ছুটোছুটি করতে লাগলেন। প্রথমে ওতবা ইবনে রবিয়ার কাছে গেলেন। বললেন, হে আবুল ওলীদ, আপনি কোরায়শদের বিশিষ্ট ব্যক্তি। আপনার আনুগত্য সবাই বিনাবাক্যে মেনে নেয়। আপনি একটি ভালো কাজ করুন। এর ফলে সব সময় আপনার আলোচনা মানুষের মুখে মুখে থাকবে। ওতবা বললেন, সেটা কি কাজ হাকিম? হাকিম বললেন, আপনি সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। নাখলার ছারিয়াঁয় নিহত আপনার মিত্র আমর ইবনে হাদরামির হত্যার ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব আপনি নিজের ওপর নিয়ে নিন। ওতবা বললো, আমি রাযি আছি। তুমি আমার পক্ষ থেকে যামানত লও। আমর ইবনে হাদরামি আমার মিত্র, তার মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের দায়িত্বও আমার ওপরই বর্তায়। তার যে সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে, আমি তা পুষিয়ে দেবো।
এরপর ওতবা হাকিম ইবনে হিযামকে বললো, তুমি হানজালিয়ার ছেলে (আবু জেহেলের মায়ের নাম ছিলো হানজালিয়া) অর্থাৎ আবু জেহেলের কাছে যাও। সেই সব কিছু বিগড়াচ্ছে, লোকদের উস্কানি দেয়ার মূলে তার হাতই সক্রিয় রয়েছে।
এরপর ওতবা ইবনে রবিয়া দাঁড়িয়ে বক্তৃতার ভঙ্গিতে বললো, হে কোরায়শরা, তোমরা মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের সাথে লড়াই করে বিশেষ কোন কৃতিত্ব দেখাতে পারবে না। খোদার কসম, যদি তারা তোমাদের মেরে ফেলে, তবে এমন সব চেহারাই দেখতে পাবে, যাদের নিহত অবস্থায় তোমরা দেখতে চাইবে না। কারণ তোমরা তো চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই অথবা নিজের গোত্রের অন্য কাউকেই হত্যা করবে। আরবের অন্য লোকেরা যদি মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের মেরে ফেলে তবে তোমাদের ইচ্ছাই পূরণ হবে। আর যদি অন্য কোন পরিস্থিতি দেখা দেয়, তবে মনে রেখো, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের হাতে তোমরা এমন অবস্থায় পড়বে যে, তাদের সাথে অতীতে যা করেছে, সবই তারা মনে রেখেছে। কাজেই চলো আমরা ফিরে যাই, আমরা নিরপেক্ষ থাকবো।
হাকিম ইবনে হিযাম আবু জেহেলের কাছে গিয়ে লক্ষ্য করলো যে, সে নিজের বর্ম পরিষ্কার করছে। হাকিম বললো, হে আবুল হাকাম, ওতবা আমাকে আপনার কাছে এই পয়গাম নিয়ে পাঠিয়েছেন। আবু জেহেল বললো, খোদার কসম, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের দেখে ওতবার বুক শুকিয়ে গেছে। কিন্তু আমি কিছুতেই মক্কায় ফিরে যাবো না। খোদাতায়া'লা মোহাম্মদ এবং আমাদের মধ্যে একটা ফয়সালা না করা পর্যন্ত আমরা মক্কায় ফিরে যাবো না। ওতবা যা কিছু বলেছে, সেটা এ জন্যেই বলেছে যে, সে মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছে। ওতবার পুত্রও ওদের সঙ্গে রয়েছে এ কারণে সে ওদের ব্যাপারে তোমাদের ভয় দেখাচ্ছে। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ওতবার পুত্র হোযায়ফা অনেক আগেই ইসলাম গ্রহণ হিজরত করে মদীনায় চলে যান।) ওতবা যখন খবর পেলো যে, আবু জেহেল তার সম্পর্কে বলেছে যে, খোদার কসম, ওতবার বুক শুকিয়ে গেছে, তখন সে বললো, আবু জেহেল শীঘ্রই জানতে পারবে যে, কার বুক শুকিয়ে গেছে, আমার না তার। আবু জেহেল ওতবার এই প্রতিক্রিয়ার খবরে ভয় পেয়ে গেলো।
এটা যেন দীর্ঘায়িত না হয়, এজন্যে সে নাখলার ছারিয়্যায় নিহত আমর ইবনে হাদরামীর ভাই আমের ইবনে হাদরামিকে ডেকে পাঠালো। আমের আসার পর আবু জেহেল বললো, তোমাদের মিত্র ওতবা লোকদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তোমরা নিজেদের ওপর যুলুম নিজেদের চোখে দেখেছ। কাজেই ওঠো, তোমাদের প্রতি যে যুলুম করা হয়েছে, তোমরা যে মযলুম একথা জোর গলায় বলো, তোমার ভাইয়ের নিহত হওয়ার ঘটনা সবাইকে নতুন করে জানাও। একথা শুনে আমের উঠে দাঁড়ালো এবং নিজের পাছার কাপড় খুলে চিৎকার করতে লাগলো। সে বললো, হায় আমর, আয় আমর, হায় আমর। এই চিৎকার শুনে সবাই জড়ো হলো, যুদ্ধ করার ইচ্ছা সবার মনে প্রবল হয়ে দেখা দিলো। মুসলমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। ওতবা যে আহ্বান জানিয়েছিলো, সেটা ব্যর্থ হলো। এমনি করে হুশের ওপর জোশ জয়ী হলো, যুদ্ধ না করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলো।
📄 উভয় বাহিনী একে অপরের মুখোমুখি
অমুসলিমরা দলে দলে বেরিয়ে এলো এবং উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হতে শুরু করলো। এ সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে আল্লাহ তায়ালা, কোরায়শরা পরিপূর্ণ অহংকারের সাথে তোমার বিরোধিতায় এবং তোমার রসূলকে মিথ্যা প্রমাণ করতে এগিয়ে এসেছে। হে আল্লাহ তায়ালা, আজ তোমার প্রতিশ্রুত সাহায্য বড় বেশী প্রয়োজন। হে আল্লাহ তায়ালা, তুমি আজ ওদের ছিন্ন ভিন্ন করে দাও।'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওতবাকে তার লাল উটের ওপর দেখে বললেন, কওমের কারো কাছে যদি কল্যাণ থাকে তবে লাল উটের আরোহীর কাছে রয়েছে। অন্যরা যদি তার কথা মেনে নিতো, তবে সঠিক পথ প্রাপ্ত হতো।'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সময় মুসলমানদের কাতারবন্দী করলেন। তখন একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলো।
নবী (সাঃ)-এর হাতে ছিলো একটি তীর। সেটির সাহায্যে তিনি কাতার সোজা করছিলেন। এ সময় তীরের ফলা ছাওয়াদ ইবনে গাযিয়ার পেটে একটু খানি লাগলো। তিনি কাতার থেকে একটুখানি সামনে এগিয়ে এসেছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তীরের ফলা ছাওয়াদের পেটে লাগিয়ে বলেছিলেন, ছাওয়াদ, সোজা হয়ে যাও। ছাওয়াদ তৎক্ষণাৎ বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনি আমাকে কষ্ট দিয়েছেন, বদলা নিতে দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পেটের ওপর থেকে জামা সরিয়ে বললেন, নাও প্রতিশোধ নাও। ছাওয়াদ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জড়িয়ে ধরে তাঁর পবিত্র পেটে চুম্বন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ছাওয়াদ তুমি এমন কাজ করতে কিভাবে উদ্বুদ্ধ হলে? ছাওয়াদ বললেন, হে আল্লাহর রসূল, যা কিছু ঘটতে চলেছে, আপনি তো সবই দেখছেন। আমার একান্ত ইচ্ছা হলো যে, আপনার ঘনিষ্ঠতা যেন আমার জীবনের শেষ স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকে। আপনার পবিত্র দেহের সাথে আমার দেহের সংস্পর্শ যেন জীবনের শেষ ঘটনা হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা শুনে ছাওয়াদকে দোয়া করলেন।
কাতার সোজা করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের বললেন, তাঁর পক্ষ থেকে নির্দেশ না পেয়ে কেউ যেন যুদ্ধ শুরু না করে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর যুদ্ধ পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষ পথনির্দেশ প্রদান করলেন। তিনি বললেন, পৌত্তলিকরা যখন দলবদ্ধভাবে তোমাদের কাছে আসবে, তখন তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করবে। তীরের অপচয় যেন না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে। ওরা তোমাদের ঘিরে না ফেলা পর্যন্ত তরবারি চালনা করবে না। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে অবস্থান কেন্দ্রে চলে গেলেন। হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) পাহারাদার সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাহারায় নিযুক্ত হলেন।
অন্যদিকে পৌত্তলিকদের অবস্থা ছিলো এই যে, আবু জেহেল আল্লাহর কাছে ফয়সালার জন্যে দোয়া করলো। সে বললো, হে আল্লাহ, আমাদের মধ্যে যে দল আত্মীয়তার সম্পর্ক অধিক ছিন্ন করেছে এবং ভুল কাজ করেছে, আজ তুমি তাদের ধ্বংস করে দাও। হে আল্লাহ, আমাদের মধ্যে যে দল তোমার কাছে অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয়, আজ তুমি তাদের সাহায্য করো। পরবর্তী সময়ে আবু জেহেলের এই কথার প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'তোমরা মীমাংসা চেয়েছিলে, তা-তো তোমাদের কাছে এসেছে। যদি তোমরা বিরত হও, তবে সেটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর, যদি তোমরা পুনরায় তা করো, তবে আমিও পুনরায় শাস্তি দেবো এবং তোমাদের দল সংখ্যায় অধিক হলেও তোমাদের কোন কাজে আসবে না এবং আল্লাহ তায়ালা মোমেনদের সঙ্গে রয়েছেন।' (সূরা আনফাল, আয়াত ১৯)
টিকাঃ
৩. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৬৮
৪. সুনানে আবু দাউদ, ২য় খন্ড পৃ. ১৩
📄 যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন ও সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু
আসওয়াদ ইবনে আবুল আছাদের হত্যাকান্ড ছিলো বদরের যুদ্ধের প্রথম ঘটনা। এই হত্যার পর যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়লো। কোরায়শ বাহিনীর মধ্য থেকে তিনজন বিশিষ্ট যোদ্ধা বেরিয়ে এলো। এরা ছিলো একই গোত্রের লোক; তন্মধ্যে রবিয়ার দুই পুত্র ওতবা ও শায়বা এবং ওতবার এক পুত্র ওলীদ। এরা কাতার থেকে বেরিয়ে এসেই প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার জন্যে আহ্বান জানালো। তিনজন আনসার যুবক অগ্রসর হলেন। এরা ছিলেন, আওফ, মোয়াওয়েয এবং আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা। প্রথমোক্ত দুইজন ছিলেন হারেসের পুত্র। তাদের মায়ের নাম ছিলো আফরা। কোরায়শরা জিজ্ঞাসা করলো, তোমাদের পরিচয় কি? তারা বললো, আমরা মদীনার আনসার। কোরায়শরা বললো, আপনারা অভিজাত প্রতিদ্বন্দ্বী সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনাদের সাথে আমাদের কোন বিরোধ নেই। আমরা চাই আমাদের চাচাতো ভাইদের। এরপর তিন কোরায়শ যুবক চিৎকার করে বললো, হে মোহাম্মদ, আমাদের কাছে আমাদের রক্তসম্পর্কীয়দের পাঠাও। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওবায়দা ইবনে হারেস, হামযা এবং আলী এগিয়ে যাও। এরা এগিয়ে যাওয়ার পর তিনজন কোরায়শ যুবক না চেনার ভান করে এদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলো। এরা নিজেদের পরিচয় দিলেন। কোরায়শ যুবকত্রয় বললো, হাঁ, আপনারা অভিজাত প্রতিদ্বন্দ্বী। এরপর শুরু হলো সাধারণ যুদ্ধ। হযরত ওবায়দা ইবনে হারেস (রা.) ওতবা ইবনে রবিয়ার সাথে, হযরত হামযা (রা.) শায়বার সাথে এবং হযরত আলী (রা.) ওলীদ ইবনে ওতবার সাথে মোকাবেলা করলেন।
হযরত হামযা (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) নিজ নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাবু করে ফেললেন কিন্তু হযরত ওবায়দা ইবনে হারেস (রা.) এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী ওতবার মধ্যে আঘাত বিনিময় হলো। তারা একে অন্যকে মারাত্মকভাবে আহত করে ফেললেন। ইতিমধ্যে হযরত হামযা এবং হযরত আলী তাদের প্রতিদ্বন্দীর কাজ শেষ করে হযরত ওবায়দার সাহায্যে এগিয়ে এলেন এবং ওতবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে শেষ করে ফেললেন। এরপর তারা হযরত ওবায়দাকে উঠিয়ে নিয়ে এলেন। হযরত ওবায়দা (রা.)-এর পা কেটে গিয়েছিলো এবং কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তার মুখে আর কথা ফুটেনি। চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে মুসলমানরা মদীনা ফিরে যাওয়ার পথে সফরা প্রান্তর অতিক্রম করার সময় হযরত ওবায়দা (রা.) ইন্তেকাল করেন। হযরত আলী (রা.) কসম খেয়ে বলতেন, এই আয়াত আমাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 'এরা দু'টি বিবদমান পক্ষ, তারা তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে।' (সূরা হজ্জ, আয়াত ১৯) পৌত্তলিকদের দুর্ভাগ্য সূচিত হয়ে গেলো। একত্রে তিনজন বিশিষ্ট যোদ্ধাকে তারা হারালো। ক্রোধে দিশেহারা হয়ে তারা সবাই একত্রে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।
অন্যদিকে মুসলমানরা তাদের মহান প্রতিপালকের কাছে সাহায্যের জন্যে দোয়া করে এবং দৃঢ়তার সাথে কাফেরদের হামলা মোকাবেলা করছিলেন। তারা 'আহad, আহাদ' শব্দ উচ্চারণ করে বিধর্মী কাফেরদের ওপর পাল্টা হামলায় তাদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছিলেন।
টিকাঃ
৫. ইবনে হিশাম, মোসনাদে আহমদ। আবু দাউদের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে। মেশকাত, ২য় খন্ড, পৃ. ৩৪৩