📄 মক্কার বাহিনী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
সেইদিন শেষ বিকেলে শত্রুদের অবস্থান ও অন্যান্য খবর সংগ্রহের জন্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদল গুপ্তচর প্রেরণ করলেন। এই দলে ছিলেন মোহাজেরদের তিনজন নেতা। এরা হলেন, হযরত আলী (রা.), হযরত যোবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)। এই তিনজন বিশিষ্ট সাহাবী অন্য কয়েকজন সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে কোরায়শ বাহিনীর খবর সংগ্রহ করতে বেরোলেন। প্রথমে তারা বদরের জলাশয়ের কাছে গেলেন। সেখানে দুইজন ক্রীতদাস কোরায়শ বাহিনীর জন্যে পানি তুলছিলো। সাহাবীরা তাদেরকে পাকড়াও করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন নামায আদায় করছিলেন। সাহাবারা গ্রেফতারকৃত ক্রীতদাসদের কাছে কোরায়শদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বললো, আমরা কোরায়শদের লোক। তারা আমাদের পানি তুলে নেয়ার জন্যে পাঠিয়েছে। সাহাবাদের এই জবাব পছন্দ হলো না। তারা ধারণা করেছিলেন যে, এরা আবু সুফিয়ানের লোক হবে। কেননা তাদের মনে এখনো একটা ক্ষীণ আশা ছিলো যে, বাণিজ্য কাফেলা হয়তো অধিকার করা যাবে। সাহাবারা উভয় ক্রীতদাসকে মারাত্মভাবে প্রহার করলেন। প্রহারের চোটে ওরা বাধ্য হয়ে বললো, হাঁ আমরা আবু সুফিয়ানের লোক। একথা শোনার পর প্রহারকারীরা প্রহার বন্ধ করলো।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায শেষে সাহাবাদের রুক্ষভাবে বললেন, ওরা যখন সত্য কথা বলেছিলো তখন তোমরা তাদের প্রহার করেছো আর যখন মিথ্যা কথা বলেছে তখন ছেড়ে দিয়েছো। আল্লাহর শপথ, ওরা উভয়েই সত্য কথা বলেছে। ওরা কোরায়শদেরই লোক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর ক্রীতদাসদের বললেন, আচ্ছা তোমরা এবার আমাকে কোরায়শদের সম্পর্কে কিছু বলো। তারা বললো, প্রান্তরের শেষ সীমায় যে টীলা দেখা যাচ্ছে, কোরায়শরা তার পেছনে রয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে চাইলেন লোক কতো? ওরা বললো, আমরা জানি না। দৈনিক কয়টি উট যবাই করে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন। ওরা বললো, একদিন নয়টি এবং একদিন দশটি। একথা শুনে তিনি বললেন, লোকসংখ্যা নয়শত থেকে এক হাজারের মধ্যে হবে। নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর জিজ্ঞাসা করলেন, ওদের মধ্যে কোরায়শদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কারা রয়েছে? তারা বললো, রবিয়ার উভয় ছেলে ওতবা এবং শায়বা আবুল বাখতারি ইবনে হিশাম, হাকেম, ইবনে হাজাম, নওফেল ইবনে খুয়াইলাহ, হারেস ইবনে আমর, তুয়াইমা ইবনে আদী, নযর ইবনে হারেস, জামআ ইবনে আসওয়াদ, আবু জেহেল ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালফ। এরা ছাড়াও উভয় ক্রীতদাস আরো কয়েকজনের নাম বললো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, মক্কা তাদের বড় বড় টুকরাগুলোকে তোমাদের পাশে এনে ফেলেছে।
📄 রহমতের বৃষ্টিপাত ও মুসলমানদের অগ্রাভিযান
সেই রাতেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন বৃষ্টি বর্ষণ করেন। সেই বৃষ্টি কাফেরদের ওপর মুষলধারে বর্ষিত হয়, এতে তাদের অগ্রাভিযানে বাধার সৃষ্টি হয়। মুসলমানদের জন্যে তা ছিলো রহমতের ঝর্ণাধারা। এতে শয়তান সৃষ্ট নোংরামী থেকে মুসলমানরা পাকছাফ হওয়ার সুযোগ পান, পায়ের নীচের বালুকা শক্ত হয় এবং পা রাখার মতো চমৎকার অবস্থার সৃষ্টি হয়, মন মযবুত হয়ে যায়।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর মুসলিম নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সামনে অগ্রসর হন। মোশরেকদের আগেই বদরের জলাশয়ের কাছে পৌঁছার জন্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সচেষ্ট ছিলেন। এ সময় হযরত হাকাব ইবনু মুনযির (রা.) একজন বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সেনা নায়কের মতো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একটি পরামর্শ দেন। প্রথমে তিনি জানতে চান যে, হে আল্লাহর রসূল, আপনি কি এখানে আল্লাহর এমন আদেশে সমবেত হয়েছেন যে, সামনে পেছনে যাওয়ার কোন অবকাশ নেই? নাকি রণকৌশল হিসাবে আপনি এই জায়গা পছন্দ করেছেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা স্রেফ রণকৌশলগত কারণ। একথা শোনার পর হযরত খাব্বাব (রা.) বললেন, এই জায়গায় অবস্থান আমি সমীচীন মনে করি না। আমাদের আরো এগিয়ে যেতে হবে এবং কোরায়শদের অবস্থানের সবচেয়ে নিকটবর্তী জলাশয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অন্যান্য জলাশয়ের ওপরও আমরা নযর রাখবো। যুদ্ধ শুরু হলে আমরা পানি পান করবো, কিন্তু কোরায়শরা পানির অভাবে ছটফট করবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি যথার্থ পরামর্শই দিয়েছো। এরপর তিনি সৈন্যদের নিয়ে এগিয়ে চললেন। রাতের মাঝামাঝি সময়ে শত্রুদের কাছাকাছি জলাশয়ের কাছে পৌঁছে তাঁবু ফেললেন। এরপর সাহাবারা হাউজ বানালেন এবং বাকি সব জলাশয় বন্ধ করে দিলেন।
📄 নেতৃত্বের কেন্দ্রস্থল ও যুদ্ধের জন্যে সেনাবিন্যাস
সাহাবারা জলাশয়ের কাছে অবস্থান নেয়ার পর হযরত সা'দ ইবনে মা'য (রা.) একটি প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি বলেন যে, মুসলমানরা নিজেদের নেতার জন্যে একটি অবস্থান কেন্দ্র তৈরী করতে পারে। এর ফলে আল্লাহ না করুন জয়ের বদলে মুসলমানদের পরাজয় অথবা অন্য কোন ধরনের জরুরী পরিস্থিতি দেখা দিলে আমরা আগে থেকেই সতর্ক থাকতে পারব। এরূপ আলোচনার পর হযরত সা'দ (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনার জন্যে আমরা একটা বিশেষ খাট তৈরী করতে চাই। আপনি সেখানে অবস্থান করবেন। আপনার পাশেই আমরা আপনার সওয়ারীও রেখে দেবো। এরপর শত্রুদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হবো। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সম্মান দিলে এবং শত্রুদের ওপর বিজয়ী করলে আপনার এরূপ অবস্থানস্থল আমাদের জন্যে পছন্দনীয় হবে। আমরা পরাজিত হলে আপনি সওয়ারীতে আরোহন করে সেইসব লোকের কাছ যেতে পারবেন, যারা পেছনে রয়েছেন। হে আল্লাহর নবী, আপনার পেছনে এমন লোকেরাই রয়েছে, যারা আপনাকে আমাদের চেয়ে বেশী ভালোবাসে। আপনার প্রতি আমাদের ভালোবাসা তাদের মতো বেশী ও গভীর নয়। তারা যদি জানতেন যে, আপনি যুদ্ধের মুখোমুখি হবেন, তাহলে তারা কিছুতেই পেছনে থাকতেন না। আল্লাহ তায়ালা তাদের মাধ্যমে আপনার হেফাযত করবেন, ওরা আপনার কল্যাণকারী হবেন এবং আপনার সঙ্গে জেহাদ করবেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা শুনে হযরত সা'দ (রা.) এর প্রশংসা করে তাঁর জন্যে দোয়া করলেন। মুসলমানরা যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তর পূর্ব দিকে একটি উঁচু টিলায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্যে একটি খাট তৈরী করেন। সেখানে বসে পুরো রণাঙ্গন চোখে পড়ে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্যে হযরত সা'দ ইবনে মা'য (রা.)-এর নেতৃত্বে একদল আনসার যুবককে দায়িত্ব দেয়া হয়।
যুদ্ধের জন্যে সেনা বিন্যাস
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর সেনা বিন্যাস করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে রওয়ানা হয়ে যান। সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতের ইশারা করে দেখিয়ে বলছিলেন যে, আগামীকাল ইনশাল্লাহ এই জায়গা হবে অমুকের বধ্যভূমি এবং এই জায়গা হবে অমুকের বধ্যভূমি।
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে একটি গাছের শেকড়ের কাছে রাত্রিযাপন করেন। সাহাবারাও নিরুদ্বেগ প্রশান্তির সাথে রাত কাটান। তাদের অন্তর ছিলো আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ শান্তি ও নিশ্চিন্ততার সাথে সময় অতিবাহিত করেন। তাদের মনে প্রত্যাশা ছিলো যে, সকালে নিজ চোখে মহান প্রতিপালকের সুসংবাদের প্রমাণ দেখতে পাবেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'স্মরণ কর, তিনি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন করেন এবং আকাশ থেকে তোমাদের ওপর বারি বর্ষণ করেন, তা দ্বারা তোমাদের তিনি পবিত্র করবেন, তোমাদের থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা অপসারণ করবেন, তোমাদের হৃদয় দৃঢ় করবেন এবং তোমাদের পা স্থির রাখবেন।' (সূরা আনফাল, আয়াত ১১)
এটি ছিলো দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ই রমযানের রাত। এই মাসের ৮ বা ১২ তারিখ তিনি মদীনা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন।
টিকাঃ
১. জামে তিরমিযি, আবওয়াবুল জেহাদ, ১ম খন্ড, পৃ. ২০১
২. মেশকাত ২য় খন্ড, পৃ. ৫৪৩
📄 শত্রুদের পারস্পরিক মতবিরোধ
কোরায়শরা বদরের শেষ প্রান্তে টিলার ওপাশে নিজেদের তাঁবুতে রাত্রিযাপন করে। সকালে টিলার এ পাশে বদর প্রান্তরে এসে সমবেত হয়। একদল লোক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাউযের দিকে অগ্রসর হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন ওদের বাধা দিও না। পরে দেখা গেছে যে, লোকদের মধ্যে যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাউয থেকে পানি পান করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলো, তারা সবাই নিহত হয়েছিলো। একমাত্র হাকিম ইবনে হিযাম বেঁচে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে হাকিম ইসলাম গ্রহণ করে একজন ভালো মুসলমান হয়েছিলেন। তার নিয়ম ছিলো যে, তিনি যখনই কসম খেতেন, তখনই বলতেন, 'লায়াল্লাযি নাজ্জানি মিন ইয়াওমে বাদরিন।' অথাৎ সেই সত্তার শপথ, যিনি আমাকে বদরের দিন মুক্তি দিয়েছেন।
কোরায়শরা মুসলমানদের সৈন্য সমাবেশ লক্ষ্য করার পর এদের শক্তি পরিমাপ করার জন্যে ওমায়ের ইবনে ওয়াহাব জাহামীকে প্রেরণ করলো। ওমায়ের এক চক্কর দিয়ে ফিরে গিয়ে বললো, মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা তিনশত বা কিছু কম বেশী হবে। আমি একটু দেখে আসি তাদের কোন সহায়ক বাহিনী আছে কিনা। বেশ কিছুদূরে ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে এসে ওমায়ের বললো সহায়ক কোন সৈন্য মুসলমানরা পশ্চাতে রেখে আসেনি। তবে একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি যে, ইয়াসরেবের উটগুলো নির্ভেজাল মৃত্যু বহন করে নিয়ে এসেছে। ওদের সমুদয় শক্তি তলোয়ারের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহর শপথ, আমি যা বুঝেছি, এতে মনে হয়েছে যে, ওরা কেউ তোমাদের না মেরে মরবে না। যদি তোমাদের বিশিষ্ট লোকদের ওরা মেরেই ফেলে, তবে তোমরা বিশিষ্ট সঙ্গীহারা হয়ে যাবে। কাজেই যা কিছু করবে, ভেবে চিন্তে করাই সমীচীন।
এ সময় আরো একদল যুদ্ধবিরোধী লোক আবু জেহেলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠলো। কিন্তু আবু জেহেল যুদ্ধ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যুদ্ধবিরোধী লোকেরা চাচ্ছিলো যে, যুদ্ধ না করেই মক্কায় ফিরে যাবে। যেমন হাকিম ইবনে হিযাম যুদ্ধ চাচ্ছিলেন না। তিনি এখানে ওখানে ছুটোছুটি করতে লাগলেন। প্রথমে ওতবা ইবনে রবিয়ার কাছে গেলেন। বললেন, হে আবুল ওলীদ, আপনি কোরায়শদের বিশিষ্ট ব্যক্তি। আপনার আনুগত্য সবাই বিনাবাক্যে মেনে নেয়। আপনি একটি ভালো কাজ করুন। এর ফলে সব সময় আপনার আলোচনা মানুষের মুখে মুখে থাকবে। ওতবা বললেন, সেটা কি কাজ হাকিম? হাকিম বললেন, আপনি সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। নাখলার ছারিয়াঁয় নিহত আপনার মিত্র আমর ইবনে হাদরামির হত্যার ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব আপনি নিজের ওপর নিয়ে নিন। ওতবা বললো, আমি রাযি আছি। তুমি আমার পক্ষ থেকে যামানত লও। আমর ইবনে হাদরামি আমার মিত্র, তার মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের দায়িত্বও আমার ওপরই বর্তায়। তার যে সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে, আমি তা পুষিয়ে দেবো।
এরপর ওতবা হাকিম ইবনে হিযামকে বললো, তুমি হানজালিয়ার ছেলে (আবু জেহেলের মায়ের নাম ছিলো হানজালিয়া) অর্থাৎ আবু জেহেলের কাছে যাও। সেই সব কিছু বিগড়াচ্ছে, লোকদের উস্কানি দেয়ার মূলে তার হাতই সক্রিয় রয়েছে।
এরপর ওতবা ইবনে রবিয়া দাঁড়িয়ে বক্তৃতার ভঙ্গিতে বললো, হে কোরায়শরা, তোমরা মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের সাথে লড়াই করে বিশেষ কোন কৃতিত্ব দেখাতে পারবে না। খোদার কসম, যদি তারা তোমাদের মেরে ফেলে, তবে এমন সব চেহারাই দেখতে পাবে, যাদের নিহত অবস্থায় তোমরা দেখতে চাইবে না। কারণ তোমরা তো চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই অথবা নিজের গোত্রের অন্য কাউকেই হত্যা করবে। আরবের অন্য লোকেরা যদি মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের মেরে ফেলে তবে তোমাদের ইচ্ছাই পূরণ হবে। আর যদি অন্য কোন পরিস্থিতি দেখা দেয়, তবে মনে রেখো, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের হাতে তোমরা এমন অবস্থায় পড়বে যে, তাদের সাথে অতীতে যা করেছে, সবই তারা মনে রেখেছে। কাজেই চলো আমরা ফিরে যাই, আমরা নিরপেক্ষ থাকবো।
হাকিম ইবনে হিযাম আবু জেহেলের কাছে গিয়ে লক্ষ্য করলো যে, সে নিজের বর্ম পরিষ্কার করছে। হাকিম বললো, হে আবুল হাকাম, ওতবা আমাকে আপনার কাছে এই পয়গাম নিয়ে পাঠিয়েছেন। আবু জেহেল বললো, খোদার কসম, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের দেখে ওতবার বুক শুকিয়ে গেছে। কিন্তু আমি কিছুতেই মক্কায় ফিরে যাবো না। খোদাতায়া'লা মোহাম্মদ এবং আমাদের মধ্যে একটা ফয়সালা না করা পর্যন্ত আমরা মক্কায় ফিরে যাবো না। ওতবা যা কিছু বলেছে, সেটা এ জন্যেই বলেছে যে, সে মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছে। ওতবার পুত্রও ওদের সঙ্গে রয়েছে এ কারণে সে ওদের ব্যাপারে তোমাদের ভয় দেখাচ্ছে। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ওতবার পুত্র হোযায়ফা অনেক আগেই ইসলাম গ্রহণ হিজরত করে মদীনায় চলে যান।) ওতবা যখন খবর পেলো যে, আবু জেহেল তার সম্পর্কে বলেছে যে, খোদার কসম, ওতবার বুক শুকিয়ে গেছে, তখন সে বললো, আবু জেহেল শীঘ্রই জানতে পারবে যে, কার বুক শুকিয়ে গেছে, আমার না তার। আবু জেহেল ওতবার এই প্রতিক্রিয়ার খবরে ভয় পেয়ে গেলো।
এটা যেন দীর্ঘায়িত না হয়, এজন্যে সে নাখলার ছারিয়্যায় নিহত আমর ইবনে হাদরামীর ভাই আমের ইবনে হাদরামিকে ডেকে পাঠালো। আমের আসার পর আবু জেহেল বললো, তোমাদের মিত্র ওতবা লোকদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তোমরা নিজেদের ওপর যুলুম নিজেদের চোখে দেখেছ। কাজেই ওঠো, তোমাদের প্রতি যে যুলুম করা হয়েছে, তোমরা যে মযলুম একথা জোর গলায় বলো, তোমার ভাইয়ের নিহত হওয়ার ঘটনা সবাইকে নতুন করে জানাও। একথা শুনে আমের উঠে দাঁড়ালো এবং নিজের পাছার কাপড় খুলে চিৎকার করতে লাগলো। সে বললো, হায় আমর, আয় আমর, হায় আমর। এই চিৎকার শুনে সবাই জড়ো হলো, যুদ্ধ করার ইচ্ছা সবার মনে প্রবল হয়ে দেখা দিলো। মুসলমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। ওতবা যে আহ্বান জানিয়েছিলো, সেটা ব্যর্থ হলো। এমনি করে হুশের ওপর জোশ জয়ী হলো, যুদ্ধ না করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলো।