📄 ইসলামী বাহিনীর সংখ্যা ও দায়িত্বভার
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদরের উদ্দেশ্যে রওয়ানাকালে তাঁর সঙ্গে তিনশতের কিছু বেশী সংখ্যক সাহাবী ছিলেন। এ সংখ্যা কারো মতে ৩১৩, কারো মতে ৩১৪ এবং কারো মতে ৩১৭। এদের মধ্যে ৮২, মতান্তরে ৮৩, মতান্তরে ৮৬ জন ছিলেন মোহাজের, বাকি সকলেই আনসার। আনসারদের মধ্যে ৬১ জন আওস আর ৭০ জন খাযরাজ গোত্রের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। এরা যুদ্ধের জন্যে তেমন কোন প্রস্তুতিও নেননি। সমগ্র সেনাদলে ঘোড়া ছিলো মাত্র ২টি। একটি হযরত যোবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)-এর অন্যটি হযরত মেকদাদ ইবনে আসওয়াদ কিন্দি (রা.)-এর। ৭০টি উট ছিলো, প্রতিটি উটে দুই বা তিনজন পর্যায়ক্রমে আরোহণ করছিলেন। একটি উটে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আলী (রা.) এবং হযরত মারশাদ ইবনে আবু মারশাদ গানাভির পালাক্রমে অরোহন করছিলেন।
মদীনার ব্যবস্থাপনা এবং নামাযে ইমামতির দায়িত্ব প্রথমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাওহা নামক জায়গায় পৌঁছে হযরত আবু লোবাবা ইবনে আবদুল মানযার (রা.)-কে মদীনার ব্যবস্থাপক হিসাবে প্রেরণ করেন। সেনাবিন্যাস এভাবে করা হয়েছিলো যে, একদল ছিলো মোহাজের এবং অন্য দল আনসারদের। মোহাজেরদের পতাকা হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) এবং আনসারদের পতাকা হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য (রা.) বহন করছিলেন। উভয় দলের সম্মিলিত পতাকা ছিলো সাদা। এই পতাকা বহনের দায়িত্ব হযরত মোসয়াব ইবনে ওমায়ের আবদীর ওপর ন্যস্ত করা হয়। অধিনায়ক ছিলেন ডান দিকের হযরত যোবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.), আর বাম দিকে হযরত মেকদাদ ইবনে আমর (রা.)। সমগ্র বাহিনীতে এই দু'জন ছিলেন সর্বাধিক রণনিপুণ। হযরত কয়েস ইবনে আবি সাআ (রা.)-কেও অন্যতম অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। প্রধান সিপাহসালারের দায়িত্ব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে গ্রহণ করেন।
📄 বদর অভিমুখে অগ্রযাত্রা
রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অসম্পূর্ণ সেনাদলকে সঙ্গে নিয়ে মদীনা থেকে মক্কাভিমুখী প্রধান সড়ক ধরে 'বিরে রাওহা' (রাওহা কূপ)-তে গিয়ে উপনীত হন। সেখান থেকে আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে মক্কার রাস্তা বাম দিকে রেখে ডানদিকের পথে অগ্রসর হতে থাকেন। এই পথে তিনি প্রথমে নাযিয়াহ এবং পরে রাহকান উপত্যকা অতিক্রম করেন। পরে সাফরার মেঠোপথ ধরে এক সময় দাররাহ প্রান্তরে উপনীত হন। সাফর-এ উপনীত হওয়ার পর স্থানীয় জুহাইনা গোত্রের দু'জন লোককে কোরায়শদের কাফেলার খবর সংগ্রহে বদর প্রান্তরে প্রেরণ করেন। এরা ছিলো বাশিশ ইবনে ওমর এবং আদী ইবনে আবু যাগবা।
মক্কায় বিপজ্জনক অবস্থার খবর প্রেরণ কোরায়শদের বাণিজ্য কাফেলার নেতৃত্বে ছিলো আবু সুফিয়ান। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সে অগ্রসর হচ্ছিলো। সে জানতো যে, মক্কার রাস্তা ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে প্রতিটি কাফেলার কাছে পথের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতো। আবু সুফিয়ান চলতি পথেই খবর পেলো যে, মদীনায় মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরায়শদের কাফেলার ওপর হামলা করার জন্যে দাওয়াত দিয়েছেন। এ খবর পাওয়ার সাথে সাথে আবু সুফিয়ান জামজাম ইবনে আমর গেফারীকে মোটা অর্থের বিনিময়ে মক্কায় প্রেরণ করলে সে মক্কা পৌঁছে বাণিজ্য কাফেলার হেফাযতে মক্কাবাসীদের উদ্বুদ্ধ করে। জামজাম অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মক্কায় পৌছে আরবদের রীতি অনুযায়ী উটের পিঠে দাঁড়িয়ে নিজের পোশাক ছিঁড়ে চিৎকার করে জরুরী সংবাদ জানালো। সে বললো, কোরায়শরা শোনো, কাফেলা, কাফেলা। তোমাদের যেসব ব্যবসায়িক জিনিস আবু সুফিয়ানের কাছে রয়েছে, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীরা সেই জিনিসের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমার বিশ্বাস, তোমরা ওদের পেয়ে যাবে। সাহায্য- সাহায্য-সাহায্য।
যুদ্ধের জন্যে মক্কাবাসীদের প্রস্তুতি বিপদের খবর শুনে মক্কার বিশিষ্ট লোকেরা চারিদিক থেকে ছুটে আসলো। তারা বলছিলো, মোহাম্মদ বুঝি মনে করেছেন যে, আবু সুফিয়ানের কাফেলাও ইবনে হাদরামির কাফেলার মতো। না মোটেই তা নয়। আমাদের ব্যাপারটা যে অন্যরকম, এটা তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। মক্কায় সক্ষম লোকদের মধ্যে প্রত্যেকেই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। কেউ নিজে প্রস্তুত হলো, কেউ বা নিজের পরিবর্তে অন্য কাউকে প্রেরণ করলো। মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আবু লাহাব ব্যতীত অন্য কেউই এ যুদ্ধে যোগদানের প্রস্তুতি থেকে বাদ পড়েনি। আবু লাহাব নিজের পরিবর্তে তার কাছ থেকে ঋণ গ্রহীতা একজন লোককে প্রেরণ করলো। আশেপাশের বিভিন্ন গোত্রের যুবকদেরও কোরায়শরা সেনাদলে ভর্তি করলো। কোরায়শী গোত্রসমূহের মধ্যে একমাত্র বনু আদী ব্যতীত অন্য কোন গোত্র পেছনে থাকেনি। বনু আদী গোত্রের কেউ এ যুদ্ধে অংশ নেয়নি।
শত্রু বাহিনীর সংখ্যা প্রথমদিকে মক্কার বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিলো তেরোশ। এদের কাছে একশত ঘোড়া এবং ছয়শত বর্ম ছিলো। উটের সংখ্যা ছিলো অনেক, সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি।
সেনাবাহিনীর অধিনায়ক ছিলো আবু জেহেল ইবনে হিশাম। কোরায়শদের নয়জন বিশিষ্ট ব্যক্তি খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একদিন নয়টি, অন্যদিন দশটি এভাবে উট যবাই করা হতো।
মক্কায় সেনাদল রওয়ানা হওয়ার সময় হঠাৎ কোরায়শদের মনে পড়লো যে, বনু বকর গোত্রের সাথে তাদের শত্রুতা ও যুদ্ধ চলছে। ওরা তো পেছন থেকে তাদের ওপর হামলা করতে পারে। এতে তারা তো দুই আগুনের মাঝখানে পড়ে যাবে! এ প্রসঙ্গে আলোচনা পর্যালোচনার ফলে কোরায়শদের সামরিক অভিযান স্থগিত হওয়ার উপক্রম হলো। ঠিক সেই সময় অভিশপ্ত ইবলিস বনু কেনানা গোত্রের সর্দার ছোরাকা ইবনে মালেক ইবনে জাশাম মাদলাজির চেহারা ধারণ করে আবির্ভূত হয়ে কোরায়শ নেতাদের বললো, আমি তো তোমাদের বন্ধু। বনু কেনানা তোমাদের অনুপস্থিতিতে আপত্তিকর কোন কাজই করবে না, তোমাদের এ নিশ্চয়তা দিচ্ছি।
শত্রুদের অগ্রযাত্রা মক্কার সৈন্যবাহিনী অতপর পথে বেরিয়ে পড়লো। কিভাবে বেরোলো? আল্লাহ তায়ালা বলেন, লোকদের নিজেদের শান দেখিয়ে আল্লাহর পথ থেকে বিরত করে করে গর্বভরে এগিয়ে চললো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ওরা বেরোলো নিজেদের অস্ত্র শস্ত্র, আল্লাহর প্রতি বিরক্তি এবং তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অসন্তুষ্টি নিয়ে। তারা প্রতিশোধ গ্রহণের ক্রোধে অধীর হয়ে উঠেছিলো। তারা দাঁত কিড়মিড় করে বলছিলো, মোহাম্মদ এবং তাঁর সাহাবাদের মক্কার বাণিজ্য কাফেলার প্রতি চোখ তুলে তাকানোর সাহস হলো কি করে?
মোটকথা খুবই দ্রুতগতিতে তারা উত্তর দিকে অর্থাৎ বদর প্রান্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। উসফান এবং কুদাইদ প্রান্তর অতিক্রম করে তারা যোহফা নামক জায়গায় পৌঁছুলো। সেখানে আবু সুফিয়ানের প্রেরিত নতুন এক খবর পাওয়া গেলো যে, আপনারা কাফেলা এবং নিজেদের সম্পদ রক্ষার জন্যে বেরিয়ে ছিলেন, আল্লাহ যেহেতু সব কিছু হেফাযত করেছেন, কাজেই আপনাদের আর প্রয়োজন নেই, আপনারা এবার ফিরে যান।
বাণিজ্য কাফেলার অন্তর্ধান আবু সুফিয়ান বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যাওয়ার সময় খুবই সতর্কতার সাথে পথ চলছিলো। চারিদিকের খোঁজ খবর সংগ্রহ করে পরিস্থিতির ওপর নযর রাখছিলো। বদর প্রান্তরের কাছাকাছি পৌঁছার পর কিছুটা সামনে এগিয়ে মাজদি ইবনে আমরের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তার কাছ মদীনার বাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো। মাজদি বললো, তেমন কিছু তো চোখে পড়েনি, তবে দুইজন লোক দেখেছি। তারা পাহাড়ী টিলার কাছে উট বসিয়েছে, এরপর কুয়া থেকে পানি তুলে চলে গেছে। আবু সুফিয়ান এগিয়ে যেয়ে উটের পরিত্যক্ত মল পরীক্ষা করে খেজুরের বীচি পরীক্ষা করে বললো, নিসন্দেহে এই খেজুর ইয়াসরেবের। একথা বলার পরপরই সে নিজের কাফেলার কাছে ছুটে গেলো এবং পশ্চিম দিকে নিয়ে সমুদ্র সৈকত ধরে চলতে শুরু করলো। বদর প্রান্তরে যাওয়ার প্রধান সড়ক বাঁ দিকে পড়ে রইল। এমনি করে আবু সুফিয়ান তার বাণিজ্য কাফেলা মদীনার বাহিনীর কবলে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করলো। নিরাপদ পথে মক্কাভিমুখে যাওয়ার সময়ে আবু সুফিয়ান মক্কা থেকে আগত সৈন্যদের খবর পাঠালো যে, তোমরা ফিরে যাও। বাণিজ্য কাফেলার আক্রান্ত হওয়ার আর কোন আশঙ্কা নেই, আমি নিরাপদে মক্কা ফিরে যাচ্ছি।
রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অসম্পূর্ণ সেনাদলকে সঙ্গে নিয়ে মদীনা থেকে মক্কাভিমুখী প্রধান সড়ক ধরে 'বিরে রাওহা' (রাওহা কূপ)-তে গিয়ে উপনীত হন। সেখান থেকে আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে মক্কার রাস্তা বাম দিকে রেখে ডানদিকের পথে অগ্রসর হতে থাকেন। এই পথে তিনি প্রথমে নাযিয়াহ এবং পরে রাহকান উপত্যকা অতিক্রম করেন। পরে সাফরার মেঠোপথ ধরে এক সময় দাররাহ প্রান্তরে উপনীত হন। সাফর-এ উপনীত হওয়ার পর স্থানীয় জুহাইনা গোত্রের দু'জন লোককে কোরায়শদের কাফেলার খবর সংগ্রহে বদর প্রান্তরে প্রেরণ করেন। এরা ছিলো বাশিশ ইবনে ওমর এবং আদী ইবনে আবু যাগবা।
📄 মক্কায় বিপজ্জনক অবস্থার খবর প্রেরণ
কোরায়শদের বাণিজ্য কাফেলার নেতৃত্বে ছিলো আবু সুফিয়ান। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সে অগ্রসর হচ্ছিলো। সে জানতো যে, মক্কার রাস্তা ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে প্রতিটি কাফেলার কাছে পথের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতো। আবু সুফিয়ান চলতি পথেই খবর পেলো যে, মদীনায় মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরায়শদের কাফেলার ওপর হামলা করার জন্যে দাওয়াত দিয়েছেন। এ খবর পাওয়ার সাথে সাথে আবু সুফিয়ান জামজাম ইবনে আমর গেফারীকে মোটা অর্থের বিনিময়ে মক্কায় প্রেরণ করলে সে মক্কা পৌঁছে বাণিজ্য কাফেলার হেফাযতে মক্কাবাসীদের উদ্বুদ্ধ করে। জামজাম অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মক্কায় পৌছে আরবদের রীতি অনুযায়ী উটের পিঠে দাঁড়িয়ে নিজের পোশাক ছিঁড়ে চিৎকার করে জরুরী সংবাদ জানালো। সে বললো, কোরায়শরা শোনো, কাফেলা, কাফেলা। তোমাদের যেসব ব্যবসায়িক জিনিস আবু সুফিয়ানের কাছে রয়েছে, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীরা সেই জিনিসের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমার বিশ্বাস, তোমরা ওদের পেয়ে যাবে। সাহায্য- সাহায্য-সাহায্য।
📄 যুদ্ধের জন্যে মক্কাবাসীদের প্রস্তুতি
বিপদের খবর শুনে মক্কার বিশিষ্ট লোকেরা চারিদিক থেকে ছুটে আসলো। তারা বলছিলো, মোহাম্মদ বুঝি মনে করেছেন যে, আবু সুফিয়ানের কাফেলাও ইবনে হাদরামির কাফেলার মতো। না মোটেই তা নয়। আমাদের ব্যাপারটা যে অন্যরকম, এটা তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। মক্কায় সক্ষম লোকদের মধ্যে প্রত্যেকেই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। কেউ নিজে প্রস্তুত হলো, কেউ বা নিজের পরিবর্তে অন্য কাউকে প্রেরণ করলো। মক্কায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আবু লাহাব ব্যতীত অন্য কেউই এ যুদ্ধে যোগদানের প্রস্তুতি থেকে বাদ পড়েনি। আবু লাহাব নিজের পরিবর্তে তার কাছ থেকে ঋণ গ্রহীতা একজন লোককে প্রেরণ করলো। আশেপাশের বিভিন্ন গোত্রের যুবকদেরও কোরায়শরা সেনাদলে ভর্তি করলো। কোরায়শী গোত্রসমূহের মধ্যে একমাত্র বনু আদী ব্যতীত অন্য কোন গোত্র পেছনে থাকেনি। বনু আদী গোত্রের কেউ এ যুদ্ধে অংশ নেয়নি।
শত্রু বাহিনীর সংখ্যা প্রথমদিকে মক্কায় বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিলো তেরোশ। এদের কাছে একশত ঘোড়া এবং ছয়শত বর্ম ছিলো। উটের সংখ্যা ছিলো অনেক, সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি।
সেনাবাহিনীর অধিনায়ক ছিলো আবু জেহেল ইবনে হিশাম। কোরায়শদের নয়জন বিশিষ্ট ব্যক্তি খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একদিন নয়টি, অন্যদিন দশটি এভাবে উট যবাই করা হতো।
মক্কায় সেনাদল রওয়ানা হওয়ার সময় হঠাৎ কোরায়শদের মনে পড়লো যে, বনু বকর গোত্রের সাথে তাদের শত্রুতা ও যুদ্ধ চলছে। ওরা তো পেছন থেকে তাদের ওপর হামলা করতে পারে। এতে তারা তো দুই আগুনের মাঝখানে পড়ে যাবে! এ প্রসঙ্গে আলোচনা পর্যালোচনার ফলে কোরায়শদের সামরিক অভিযান স্থগিত হওয়ার উপক্রম হলো। ঠিক সেই সময় অভিশপ্ত ইবলিস বনু কেনানা গোত্রের সর্দার ছোরাকা ইবনে মালেক ইবনে জাশাম মাদলাজির চেহারা ধারণ করে আবির্ভূত হয়ে কোরায়শ নেতাদের বললো, আমি তো তোমাদের বন্ধু। বনু কেনানা তোমাদের অনুপস্থিতিতে আপত্তিকর কোন কাজই করবে না, তোমাদের এ নিশ্চয়তা দিচ্ছি।
শত্রুদের অগ্রযাত্রা মক্কার সৈন্যবাহিনী অতপর পথে বেরিয়ে পড়লো। কিভাবে বেরোলো? আল্লাহ তায়ালা বলেন, লোকদের নিজেদের শান দেখিয়ে আল্লাহর পথ থেকে বিরত করে করে গর্বভরে এগিয়ে চললো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ওরা বেরোলো নিজেদের অস্ত্র শস্ত্র, আল্লাহর প্রতি বিরক্তি এবং তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অসন্তুষ্টি নিয়ে। তারা প্রতিশোধ গ্রহণের ক্রোধে অধীর হয়ে উঠেছিলো। তারা দাঁত কিড়মিড় করে বলছিলো, মোহাম্মদ এবং তাঁর সাহাবাদের মক্কার বাণিজ্য কাফেলার প্রতি চোখ তুলে তাকানোর সাহস হলো কি করে?
মোটকথা খুবই দ্রুতগতিতে তারা উত্তর দিকে অর্থাৎ বদর প্রান্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। উসফান এবং কুদাইদ প্রান্তর অতিক্রম করে তারা যোহফা নামক জায়গায় পৌঁছুলো। সেখানে আবু সুফিয়ানের প্রেরিত নতুন এক খবর পাওয়া গেলো যে, আপনারা কাফেলা এবং নিজেদের সম্পদ রক্ষার জন্যে বেরিয়ে ছিলেন, আল্লাহ যেহেতু সব কিছু হেফাযত করেছেন, কাজেই আপনাদের আর প্রয়োজন নেই, আপনারা এবার ফিরে যান।
বাণিজ্য কাফেলার অন্তর্ধান আবু সুফিয়ান বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যাওয়ার সময় খুবই সতর্কতার সাথে পথ চলছিলো। চারিদিকের খোঁজ খবর সংগ্রহ করে পরিস্থিতির ওপর নযর রাখছিলো। বদর প্রান্তরের কাছাকাছি পৌঁছার পর কিছুটা সামনে এগিয়ে মাজদি ইবনে আমরের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তার কাছ মদীনার বাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো। মাজদি বললো, তেমন কিছু তো চোখে পড়েনি, তবে দুইজন লোক দেখেছি। তারা পাহাড়ী টিলার কাছে উট বসিয়েছে, এরপর কুয়া থেকে পানি তুলে চলে গেছে। আবু সুফিয়ান এগিয়ে যেয়ে উটের পরিত্যক্ত মল পরীক্ষা করে খেজুরের বীচি পরীক্ষা করে বললো, নিসন্দেহে এই খেজুর ইয়াসরেবের। একথা বলার পরপরই সে নিজের কাফেলার কাছে ছুটে গেলো এবং পশ্চিম দিকে নিয়ে সমুদ্র সৈকত ধরে চলতে শুরু করলো। বদর প্রান্তরে যাওয়ার প্রধান সড়ক বাঁ দিকে পড়ে রইল। এমনি করে আবু সুফিয়ান তার বাণিজ্য কাফেলা মদীনার বাহিনীর কবলে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করলো। নিরাপদ পথে মক্কাভিমুখে যাওয়ার সময়ে আবু সুফিয়ান মক্কা থেকে আগত সৈন্যদের খবর পাঠালো যে, তোমরা ফিরে যাও। বাণিজ্য কাফেলার আক্রান্ত হওয়ার আর কোন আশঙ্কা নেই, আমি নিরাপদে মক্কা ফিরে যাচ্ছি।