📄 আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর সাথে পত্র বিনিময়
এই চিঠি পাওয়ার পরই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মক্কার পৌত্তলিকদের নির্দেশ পালনের জন্যে প্রস্তুত হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মনে আগে থেকেই প্রবল ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছিলো। কেননা তার মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিলো যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই মদীনার রাজমুকুট তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন। মক্কার পৌত্তলিকদের চিঠি পাওয়ার পর পরই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং মদীনার সহযোগিরা রসূলে মাকবুলের সাথে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ খবর পেয়ে আবদুল্লাহর কাছে গিয়ে তাকে বললেন, কোরায়শদের হুমকিতে তোমরা যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছো মনে হচ্ছে। শোনো, তোমরা নিজেরা নিজেদের যতো ক্ষতি করতে উদ্যত হয়েছো মক্কার কোরায়শরা তার চেয়ে তোমাদের বেশী ক্ষতি করতে পারবে না। তোমরা কি নিজেদের সন্তান এবং ভাইয়ের সাথে নিজেরাই যুদ্ধ করতে চাও? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথা শোনার পর যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত আবদুল্লাহর সাহযোগিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো।² সমর্থক ও সহযোগিরা ছত্রভঙ্গ হওয়ায় আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তখনকার মতো যুদ্ধ থেকে বিরত হলো। কিন্তু কোরায়শদের সাথে তার গোপন যোগাযোগ অব্যাহত ছিলো। কেননা এই দূর্বৃত্ত মুসলমান ও কাফেরদের সাথে সংঘাতে কোন ক্ষেত্রেই নিজের জড়িত হওয়ার সুযোগকে হাতছাড়া করেনি। উপরন্তু মুসলমানদের বিরোধীতায় শক্তি অর্জনের জন্যে ইহুদীদের সাথেও সে যোগাযোগ রক্ষা করতো যেন, প্রয়োজনের সময় ইহুদীরা তাকে সাহায্য করে। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার আগুন বার বার খোদাপ্রদত্ত কৌশলে নির্বাপিত করতেন।
টিকাঃ
২. আবু দাউদ, খবরুন নাযির অধ্যায়
📄 মুসলমানদের জন্য মসজিদে হারাম বন্ধ ঘোষণা
এরপর হযরত সা'দ ইবনে মা'য (রা.) ওমরাহ পালনের জন্য মক্কায় গিয়ে উমাইয়া ইবনে খালফের মেহমান হন। হযরত সা'দ (রা.) তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি উমাইয়াকে বললেন, আমি একটু নিরিবিলি কাবাঘর তওয়াফ করতে চাই। উমাইয়া দুপুরে হযরত সা'দ'কে নিয়ে বেরোলেন। তওয়াফের সময় আবু জেহেলের সাথে দেখা। নিবিষ্ট চিত্তে হযরত সা'দ'কে তওয়াফ করতে দেখে আবু জেহেল উমাইয়াকে বললো, আবু সফওয়ান, তোমার সঙ্গে আসা এই লোকটির পরিচয় কি? উমাইয়া বললো, এ হচ্ছে সা'দ ইবনে মা'য। আবু জেহেল হযরত সা'দ'কে সরাসরি সম্বোধন করে বললো, আপনি বড় নিবিষ্ট মনে তওয়াফ করছেন দেখছি। অথচ আপনারা বেদ্বীনকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছেন। আপনারা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। খোদার কসম, আপনি যদি আবু সফওয়ানের মেহমান না হতেন, তবে আপনাকে নিরাপদে মদীনায় ফিরে যেতে দেয়া হতো না। একথা শুনে হযরত সা'দ (রা.) উচ্চস্বরে বললেন, শোনো, তুমি যদি আমাকে তওয়াফ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করো, তবে আমি তোমার বাণিজ্য কাফেলা মদীনার কাছে দিয়ে যেতে দেবো না। সেটা কিন্তু তোমার জন্যে গুরুতর ব্যাপার হবে।
মোহাজেরদের প্রতি কোরায়শদের হুমকি কোরায়শরা মুসলমানদের খবর পাঠালো যে, তোমরা মনে করো না যে, মক্কা থেকে গিয়ে নিরাপদে থাকবে। বরং মদীনায় পৌঁছে আমরা তোমাদের সর্বনাশ করে ছাড়বো।
এটা শুধু হুমকি ছিলো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নানা সূত্রে কোরায়শদের ষড়যন্ত্র এবং অসদুদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হন। ফলে তিনি কখনো সারা রাত জেগে কাটাতেন, আবার কখনো সাহাবায়ে কেরামের প্রহরাধীনে রাত্রি যাপন করতেন। সহীহ বোখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, মদীনা আসার পর এক সন্ধ্যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কি যে ভালো হতো, যদি আমার সাহাবাদের মধ্যে কোন নেককার সাহাবী আমার এখানে পাহারা দিতো। একথা বলার সাথে সাথে অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা গেল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন কে ওখানে? জবাব এলো সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস। বললেন, কি জন্য এসেছো? আগন্তুক বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার নিরাপত্তা প্রশ্নে আমার মনে হঠাৎ একটা সংশয়ের উদ্রেক হওয়ায় আমি আপনাকে পাহারা দিতে এসেছি। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দোয়া করে শুয়ে পড়লেন। মনে রাখতে হবে যে, পাহারার ব্যবস্থা বিশেষ কয়েকটি রাতের জন্য নির্দিষ্ট ছিলো না। বরং অব্যাহতভাবে তা রাখা হয়েছিল। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাত্রিকালে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্যে পাহারার ব্যবস্থা করা হতো। অতপর পবিত্র কোরআনের এই আয়াত নাযিল হলো- 'আল্লাহ তায়ালা তোমাকে মানুষদের থেকে হেফাযত রাখবেন।' এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর প্রিয় নবী জানালায় মাথা বের করে বললেন, 'হে লোকেরা, তোমরা ফিরে যাও, আল্লাহ তায়ালা আমাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।'
নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা শুধুমাত্র রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো না। সকল মুসলমানের ক্ষেত্রেই ছিলো এটা প্রযোজ্য। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবারা মদীনায় আসার পর আনসাররা তাদের আশ্রয় প্রদান করেন। এতে সমগ্র আরব তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যায়। ফলে মদীনার আনসাররা অস্ত্র ছাড়া রাত্রি যাপন করতেন না এবং খুব সকালেও তাদের কাছে অস্ত্র থাকতো।
যুদ্ধের অনুমতি মদীনার মুসলমানদের অস্তিত্বের জন্যে অমুসলিমদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাহীনতা ছিলো বিশেষ হুমকি। অন্যকথায় বলা যায় যে, এটা ছিলো তাদের টিকে থাকা না থাকার জন্যে বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর ফলে মুসলমানরা স্পষ্টভাবে বুঝে ফেলেছিলেন যে, কোরায়শরা মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্যে সংকল্প থেকে বিরত হবে না। এমনি সময়ে আল্লাহ রব্বুল আলামীন মুসলমানদের যুদ্ধ করার অনুমতি দিলেন। তবে এ যুদ্ধকে ফরয বলে আখ্যায়িত করা হয়নি। এই সময় আল্লাহ তায়ালা কোরআনের এই আয়াত নাযিল করেন, 'যাদের সাথে যুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদেরকেও যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করা যাচ্ছে। কেননা তারা মযলুম। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাদের সাহায্য করতে সক্ষম।'
এই আয়াতের প্রেক্ষিতে এরপর আরো কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়েছিলো। এ সকল আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছিলো যে, যুদ্ধ করার এই অনুমতি নিছক যুদ্ধের জন্যে যুদ্ধ নয় বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাতিল বা মিথ্যার মূল উৎপাটন এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, 'আমি ওদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, সকল কাজের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারে। (সূরা হজ্জ, আয়াত ৪১)
এই অনুমতি হিজরতের পর মদীনায় নাযিল হয়েছিলো, মক্কায় নয়। তবে নাযিলের সঠিক সময় নির্ধারণ করা মুশকিল।
যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতি ছিলো পৌত্তলিক কোরায়শদের অনুকূলে। এ কারণে মুসলমানদের কিছু কৌশলের প্রয়োজন দেখা দেয়। মুসলমানরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণের সীমানা কোরায়শদের বাণিজ্য কাফেলা পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। মক্কা থেকে সিরিয়ার মধ্যবর্তী পথ ছিলো এই সীমানা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ সীমানা বিস্তৃত করার জন্যে দু'টি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এক) মক্কা থেকে সিরিয়া ও মদীনার যাতায়াতকারী বাণিজ্য কাফেলার পথের পাশে যেসব গোত্রের বাস, তাদের সাথে অনাক্রমণ চুক্তি। দুই) সেই পথে টহলদানকারী কাফেলা প্রেরণ।
প্রথম পরিকল্পনার আলোকে একথা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইতিপূর্বে ইহুদীদের সাথে সম্পাদিত যে সকল চুক্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে যে, অনুরূপ একটি অনাক্রমণ চুক্তি জুহাইনা গোত্রের সাথেও সম্পাদিত হয়। এ গোত্র মদীনা থেকে তিন মনযিল অর্থাৎ ৫০ মাইল দূরে বাস করতো। এছাড়া আরো কয়েকটি গোত্রের সাথেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। সেসব চুক্তির বিষয়ে যথাসময়ে উল্লেখ করা হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্থাপিত দ্বিতীয় পরিকল্পনা যুদ্ধ সম্পর্কিত, যেসব বিষয়ে আলোচনাও যথাস্থানে করা হবে।
ছারিয়্যা ও গোযওয়াহ পবিত্র কোরআনের আয়াতে যুদ্ধের অনুমতি প্রদানের পর উল্লিখিত উভয় পরিকল্পনার বাস্তবায়নের জন্যে মুসলমানদের পর্যায়ক্রমিক অভিযান শুরু হয়। অস্ত্র সজ্জিত কাফেলা টহল দিতে থাকে। এর উদ্দেশ্য ছিলো মদীনার আশেপাশের রাস্তায় সাধারণভাবে এবং মক্কার আশেপাশের রাস্তায় বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সাথে সেসব রাস্তার আশেপাশে বসতি স্থাপনকারী গোত্রসমূহের সাথে অনাক্রমণ চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। এর ফলে মদীনার পৌত্তলিক, ইহুদী এবং আশেপাশের বেদুইনদের মনে এ বিশ্বাস স্থাপন করা সম্ভব হবে যে, বর্তমানে মুসলমানরা যথেষ্ট শক্তিশালী। অতীতের দুর্বলতা ও শক্তিহীনতা তারা কাটিয়ে উঠেছে। উপরন্তু এর মাধ্যমে কোরায়শদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ সাহসিকতা সম্পর্কে তাদের ভীত করে দেয়া সম্ভব হবে। তাদের বুঝিয়ে দেয়া যাবে যে, তারা যেসব চিন্তা এবং ক্রোধ প্রকাশ করছে, তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। নির্বুদ্ধিতার যে পাঁক কাদায় তারা গড়াগড়ি খাচ্ছে, তাতে তাদের অর্থনীতিকে হুমকির সম্মুখীন দেখে সন্ধি-সমঝোতার প্রতি তারা ঝুঁকে পড়বে। মুসলমানদের ঘরে প্রবেশ করে তাদের নিশেষ করা, আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করা এবং দুর্বল মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করার যেসব সঙ্কল্প তারা মনে মনে পোষণ করছে, সেসব থেকে বিরত থাকবে। এর ফলে জাযিরাতুল আরবে তওহীদের দাওয়াতের কাজ মুসলমানরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারবে। এসব ছারিয়্যা ও গোযওয়াহ সম্পর্কে নীচে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হচ্ছে
এক) ছারিয়া সিফুল বাহার প্রথম হিজরীর রমযান মোতাবেক ৬২৩ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাস। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব (রা.)-কে এর সেনানায়ক মনোনীত করেন। রাবেগ প্রান্তরে এই কাফেলা আবু সুফিয়ানের মুখোমুখি হয়। আবু সুফিয়ানের সঙ্গীদের সংখ্যা ছিলো দু'শো। উভয় পক্ষ পরস্পরের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে: কিন্তু এ ঘটনা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়নি। এই ছারিয়্যায় মক্কার লোকদের মধ্য থেকে দুই ব্যক্তি মুসলমানদের সাথে এসে মিলিত হয়। এদের একজন হযরত মিকদাদ ইবনে আমর আলবাহরানী এবং অন্যজন ওতবা ইবনে গোজওয়ান আলমাজানি (রা.)। এই দুইজন গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা পৌত্তলিকদের সাথে যোগ দেন এই উদ্দেশ্যে যে পথিমধ্যে মুসলমানদের সাথে সাক্ষাৎ হলে তাদের কাছে চলে যাবেন।
টিকাঃ
১. সহীহ বোখারী ২য় খণ্ড, পৃ. ৬২৫, ৬২৬, ৬২৪
২. বোখারী, কিতাবুল মাগাযী ২য় খণ্ড, পৃ. ৬৩০
৩. রহমতুল্লিল আলামীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৬
৪. মুসলিম, ২য় খণ্ড, সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস-এর বৈশিষ্ট্য শীর্ষক অধ্যায় এবং বোখারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮০৪
৭. জামে তিরমিযি, আবওয়াবুত তাফসীর, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩০।
৮. সীরাত রচয়িতাদের পরিভাষা অনুযায়ী ছারিয়্যা বলা হয় সেইসব সামরিক অভিযানকে, যাতে নবী করিম (সঃ) স্বয়ং অংশ গ্রহণ করেননি। যুদ্ধ হোক বা না হোক। পক্ষান্তরে গোযওয়া বলা হয় সেই সব সামরিক অভিযানকে যেখানে নবী (সাঃ) নিজে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধ হোক বা না হোক * সিফুল বাহার অর্থাৎ সমুদ্র সৈকত
১০. রহমতুল্লিল আলামীন
📄 মোহাজেরদের প্রতি কোরায়েশদের হুমকি
কোরায়শরা মুসলমানদের খবর পাঠালো যে, তোমরা মনে করো না যে, মক্কা থেকে গিয়ে নিরাপদে থাকবে। বরং মদীনায় পৌঁছে আমরা তোমাদের সর্বনাশ করে ছাড়বো।
এটা শুধু হুমকি ছিলো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নানা সূত্রে কোরায়শদের ষড়যন্ত্র এবং অসদুদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হন। ফলে তিনি কখনো সারা রাত জেগে কাটাতেন, আবার কখনো সাহাবায়ে কেরামের প্রহরাধীনে রাত্রি যাপন করতেন। সহীহ বোখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, মদীনা আসার পর এক সন্ধ্যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কি যে ভালো হতো, যদি আমার সাহাবাদের মধ্যে কোন নেককার সাহাবী আমার এখানে পাহারা দিতো। একথা বলার সাথে সাথে অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা গেল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন কে ওখানে? জবাব এলো সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস। বললেন, কি জন্য এসেছো? আগন্তুক বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার নিরাপত্তা প্রশ্নে আমার মনে হঠাৎ একটা সংশয়ের উদ্রেক হওয়ায় আমি আপনাকে পাহারা দিতে এসেছি। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দোয়া করে শুয়ে পড়লেন। মনে রাখতে হবে যে, পাহারার ব্যবস্থা বিশেষ কয়েকটি রাতের জন্য নির্দিষ্ট ছিলো না। বরং অব্যাহতভাবে তা রাখা হয়েছিল। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাত্রিকালে... রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্যে পাহারার ব্যবস্থা করা হতো। অতপর পবিত্র কোরআনের এই আয়াত নাযিল হলো- 'আল্লাহ তায়ালা তোমাকে মানুষদের থেকে হেফাযত রাখবেন।' এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর প্রিয় নবী জানালায় মাথা বের করে বললেন, 'হে লোকেরা, তোমরা ফিরে যাও, আল্লাহ তায়ালা আমাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।'
নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা শুধুমাত্র রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো না। সকল মুসলমানের ক্ষেত্রেই ছিলো এটা প্রযোজ্য। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবারা মদীনায় আসার পর আনসাররা তাদের আশ্রয় প্রদান করেন। এতে সমগ্র আরব তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যায়। ফলে মদীনার আনসাররা অস্ত্র ছাড়া রাত্রি যাপন করতেন না এবং খুব সকালেও তাদের কাছে অস্ত্র থাকতো।
টিকাঃ
১. সহীহ বোখারী ২য় খণ্ড, পৃ. ৬২৫, ৬২৬, ৬২৪
২. বোখারী, কিতাবুল মাগাযী ২য় খণ্ড, পৃ. ৬৩০
৩. রহমতুল্লিল আলামীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৬
৪. মুসলিম, ২য় খণ্ড, সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস-এর বৈশিষ্ট্য শীর্ষক অধ্যায় এবং বোখারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮০৪
৭. জামে তিরমিযি, আবওয়াবুত তাফসীর, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩০।
📄 যুদ্ধের অনুমতি
মদীনার মুসলমানদের অস্তিত্বের জন্যে অমুসলিমদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাহীনতা ছিলো বিশেষ হুমকি। অন্যকথায় বলা যায় যে, এটা ছিলো তাদের টিকে থাকা না থাকার জন্যে বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর ফলে মুসলমানরা স্পষ্টভাবে বুঝে ফেলেছিলেন যে, কোরায়শরা মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্যে সংকল্প থেকে বিরত হবে না। এমনি সময়ে আল্লাহ রব্বুল আলামীন মুসলমানদের যুদ্ধ করার অনুমতি দিলেন। তবে এ যুদ্ধকে ফরয বলে আখ্যায়িত করা হয়নি। এই সময় আল্লাহ তায়ালা কোরআনের এই আয়াত নাযিল করেন, 'যাদের সাথে যুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদেরকেও যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করা যাচ্ছে। কেননা তারা মযলুম। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাদের সাহায্য করতে সক্ষম।'
এই আয়াতের প্রেক্ষিতে এরপর আরো কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়েছিলো। এ সকল আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছিলো যে, যুদ্ধ করার এই অনুমতি নিছক যুদ্ধের জন্যে যুদ্ধ নয় বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাতিল বা মিথ্যার মূল উৎপাটন এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, 'আমি ওদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, সকল কাজের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারে। (সূরা হজ্জ, আয়াত ৪১)
এই অনুমতি হিজরতের পর মদীনায় নাযিল হয়েছিলো, মক্কায় নয়। তবে নাযিলের সঠিক সময় নির্ধারণ করা মুশকিল।
যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতি ছিলো পৌত্তলিক কোরায়শদের অনুকূলে। এ কারণে মুসলমানদের কিছু কৌশলের প্রয়োজন দেখা দেয়। মুসলমানরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণের সীমানা কোরায়শদের বাণিজ্য কাফেলা পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। মক্কা থেকে সিরিয়ার মধ্যবর্তী পথ ছিলো এই সীমানা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ সীমানা বিস্তৃত করার জন্যে দু'টি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এক) মক্কা থেকে সিরিয়া ও মদীনার যাতায়াতকারী বাণিজ্য কাফেলার পথের পাশে যেসব গোত্রের বাস, তাদের সাথে অনাক্রমণ চুক্তি। দুই) সেই পথে টহলদানকারী কাফেলা প্রেরণ।
প্রথম পরিকল্পনার আলোকে একথা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইতিপূর্বে ইহুদীদের সাথে সম্পাদিত যে সকল চুক্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে যে, অনুরূপ একটি অনাক্রমণ চুক্তি জুহাইনা গোত্রের সাথেও সম্পাদিত হয়। এ গোত্র মদীনা থেকে তিন মনযিল অর্থাৎ ৫০ মাইল দূরে বাস করতো। এছাড়া আরো কয়েকটি গোত্রের সাথেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। সেসব চুক্তির বিষয়ে যথাসময়ে উল্লেখ করা হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্থাপিত দ্বিতীয় পরিকল্পনা যুদ্ধ সম্পর্কিত, যেসব বিষয়ে আলোচনাও যথাস্থানে করা হবে।
ছারিয়্যা ও গোযওয়াহ পবিত্র কোরআনের আয়াতে যুদ্ধের অনুমতি প্রদানের পর উল্লিখিত উভয় পরিকল্পনার বাস্তবায়নের জন্যে মুসলমানদের পর্যায়ক্রমিক অভিযান শুরু হয়। অস্ত্র সজ্জিত কাফেলা টহল দিতে থাকে। এর উদ্দেশ্য ছিলো মদীনার আশেপাশের রাস্তায় সাধারণভাবে এবং মক্কায় আশেপাশের রাস্তায় বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সাথে সেসব রাস্তার আশেপাশে বসতি স্থাপনকারী গোত্রসমূহের সাথে অনাক্রমণ চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। এর ফলে মদীনার পৌত্তলিক, ইহুদী এবং আশেপাশের বেদুইনদের মনে এ বিশ্বাস স্থাপন করা সম্ভব হবে যে, বর্তমানে মুসলমানরা যথেষ্ট শক্তিশালী। অতীতের দুর্বলতা ও শক্তিহীনতা তারা কাটিয়ে উঠেছে। উপরন্তু এর মাধ্যমে কোরায়শদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ সাহসিকতা সম্পর্কে তাদের ভীত করে দেয়া সম্ভব হবে। তাদের বুঝিয়ে দেয়া যাবে যে, তারা যেসব চিন্তা এবং ক্রোধ প্রকাশ করছে, তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। নির্বুদ্ধিতার যে পাঁক কাদায় তারা গড়াগড়ি খাচ্ছে, তাতে তাদের অর্থনীতিকে হুমকির সম্মুখীন দেখে সন্ধি-সমঝোতার প্রতি তারা ঝুঁকে পড়বে। মুসলমানদের ঘরে প্রবেশ করে তাদের নিশেষ করা, আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করা এবং দুর্বল মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করার যেসব সঙ্কল্প তারা মনে মনে পোষণ করছে, সেসব থেকে বিরত থাকবে। এর ফলে জাযিরাতুল আরবে তওহীদের দাওয়াতের কাজ মুসলমানরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারবে। এসব ছারিয়্যা ও গোযওয়াহ সম্পর্কে নীচে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হচ্ছে
এক) ছারিয়া সিফুল বাহার প্রথম হিজরীর রমযান মোতাবেক ৬২৩ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাস। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব (রা.)-কে এর সেনানায়ক মনোনীত করেন। রাবেগ প্রান্তরে এই কাফেলা আবু সুফিয়ানের মুখোমুখি হয়। আবু সুফিয়ানের সঙ্গীদের সংখ্যা ছিলো দু'শো। উভয় পক্ষ পরস্পরের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে: কিন্তু এ ঘটনা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়নি। এই ছারিয়্যায় মক্কার লোকদের মধ্য থেকে দুই ব্যক্তি মুসলমানদের সাথে এসে মিলিত হয়। এদের একজন হযরত মিকদাদ ইবনে আমর আলবাহরানী এবং অন্যজন ওতবা ইবনে গোজওয়ান আলমাজানি (রা.)। এই দুইজন গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা পৌত্তলিকদের সাথে যোগ দেন এই উদ্দেশ্যে যে পথিমধ্যে মুসলমানদের সাথে সাক্ষাৎ হলে তাদের কাছে চলে যাবেন।
টিকাঃ
১. আবু দাউদ, খবরুন নাযির অধ্যায়
২. আবু দাউদ, খবরুন নাযির অধ্যায়
৩. রহমতুল্লিল আলামীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৬
৪. মুসলিম, ২য় খণ্ড, সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস-এর বৈশিষ্ট্য শীর্ষক অধ্যায় এবং বোখারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮০৪
৭. জামে তিরমিযি, আবওয়াবুত তাফসীর, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩০।
৮. সীরাত রচয়িতাদের পরিভাষা অনুযায়ী ছারিয়্যা বলা হয় সেইসব সামরিক অভিযানকে, যাতে নবী করিম (সঃ) স্বয়ং অংশ গ্রহণ করেননি। যুদ্ধ হোক বা না হোক। পক্ষান্তরে গোযওয়া বলা হয় সেই সব সামরিক অভিযানকে যেখানে নবী (সাঃ) নিজে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধ হোক বা না হোক * সিফুল বাহার অর্থাৎ সমুদ্র সৈকত
৯. সিফুল বাহার অর্থাৎ সমুদ্র সৈকত
১০. রহমতুল্লিল আলামীন