📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মদীনার প্রধান তিনটি ইহুদী গোত্র

📄 মদীনার প্রধান তিনটি ইহুদী গোত্র


এক) বনু কাইনুকা। এরা ছিলো খাযরাজ গোত্রের মিত্র। এরা মদীনার ভেতরেই বসবাস করতো। দুই) বnu নাযির। তিন) বনু কোরাইযা। এ দুটি গোত্র ছিলো আওস গোত্রের মিত্র। মদীনার শহরতলী এলাকায় এরা বসবাস করতো।

দীর্ঘকাল যাবত আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলছিলো। বুআস-এর যুদ্ধে এরা নিজ নিজ মিত্র গোত্রের সমর্থনে নিজেরাও যুদ্ধে শরীক হতো। ইহুদীরা ইসলামের প্রতি শত্রুতা পোষণ করছিলো, এটাই ছিলো স্বাভাবিক। এই ধরনের শত্রুতার স্বভাব তাদের চরিত্রে বহুকাল থেকেই বিদ্যমান ছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বংশোদ্ভূত ছিলেন না, কাজেই তাদের আভিজাত্যের গৌরব কোন গুরুত্ব পাচ্ছিলো না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি তাদের মধ্যে থেকে আবির্ভূত হতেন তাহলে তারা মনে শান্তি পেতো। তাছাড়া ইসলামের দাওয়াত ছিলো একটি বলিষ্ঠ দাওয়াত। এতে মানুষ শত্রুতা ভুলে পরস্পর ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়। ন্যায়নীতি, আমানতদারী এবং হালাল হারামের বিচার-বিবেচনা করা হয়। এর অর্থ হলো, এবার ইয়াসরেবের বিবদমান গোত্রসমূহের মধ্যে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি সৃষ্টি হবে। এর ফলে ইহুদীদের বাণিজ্যিক তৎপরতা হ্রাস পাবে। তাদের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি সুদভিত্তিক সম্পদ থেকে তারা বঞ্চিত হবে। এমনকি এ ধরনের আশঙ্কা ছিলো যে, এসব গোত্র আত্মসচেতন হবে এবং ইহুদীরা কোন কিছুর বিনিময় ছাড়াই যেসব অর্থ-সম্পদ গ্রহণ করেছে ওরা সেসব ফিরিয়ে নেবে। অর্থাৎ সুদের ব্যবসায় বিভিন্ন গোত্রের যেসব বাগান ও জমি, ইহুদীরা দখল করেছে, সেসব ফিরিয়ে নেবে।

ইয়াসরেবে ইসলাম প্রচারের সূচনাতেই ইহুদীরা এসব কিছুই নিজেদের চিন্তার মধ্যে এনেছিলো। এ কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আসার সময় থেকেই মদীনার ইহুদীরা ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি প্রবল শত্রুতা পোষণ করতো। তবে সেই শত্রুতার প্রকাশ তারা তখনই নয়, একটু দেরীতে করেছে। ইবনে ইসহাক বর্ণিত একটি ঘটনায় এ অবস্থার সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।

ইবনে ইসহাক লিখেছেন যে, উম্মুল মোমেনীন হযরত সফিয়্যা বিনতে হুয়াই ইবনে আখতার (রা.) থেকে একটি বর্ণনা আমি পেয়েছি। তিনি বলেন, আমি ছিলাম আমার পিতা ও আমার চাচার সন্তানদের মধ্যে তাদের কাছে সর্বাধিক প্রিয়। অন্যসব সন্তানদের মধ্যে তারা আমাকে বেশী ভালোবাসতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আসার পর কোবা পল্লীতে বনু আমর ইবনে আওফের কাছে অবস্থান করলেন। এই খবর পাওয়ার পর আমার পিতা হুয়াই ইবনে আখতার এবং চাচা আবু ইয়াসের খুব সকালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেলেন এবং সূর্যাস্তের সময় ফিরে এলেন। তারা দু'জনই ছিলেন ভীষণ ক্লান্ত।

আমি অভ্যাসবশত তাদের দিকে ছুটে গেলাম। কিন্তু তারা চিন্তায় এমন বিভোর ছিলেন যে, আমার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। আমি শুনলাম, চাচা আবু ইয়াসের এবং আমার পিতার সাথে এভাবে কথোপথন হচ্ছে- এই কি তিনি? -হাঁ, আল্লাহর শপথ। -আপনি তাকে ভালোভাবে চিনেছেন তো? -হাঁ। -এখন আপনি তার সম্পর্কে কি মনোভাব পোষণ করছেন? -শত্রুতা। আল্লাহর শপথ, যতদিন বেঁচে থাকি।¹

সহীহ বোখারীতে উল্লিখিত একটি বর্ণনায়ও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই বর্ণনায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.)-এর মুসলমান হওয়ার বিবরণ রয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ছিলেন এক উঁচুস্তরের ইহুদী পন্ডিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় আগমনের খবর পাওয়ার পরই তিনি তাঁর কাছে হাযির হলেন এবং এমন কিছু প্রশ্ন করলেন, যেসব প্রশ্নের উত্তর একজন নবী ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই দেয়া সম্ভব নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সাথে সাথে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন ইহুদীরা অন্যের নামে অপবাদ দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত। যদি তাদের কারো কাছে আপনি আমার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে তারা যা বলবে, আমার ইসলাম গ্রহণের খবর শোনার পর পরই বিপরীত রকমের কথা বলবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে সাথে কয়েকজন ইহুদীকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম তোমাদের মধ্যে কেমন লোক? তারা বললো, তিনি আমাদের মধ্যেকার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানীর পুত্র। অন্য এক বর্ণনায় এরূপ রয়েছে যে, তিনি আমাদের সর্দার এবং আমাদের সর্দারের সন্তান। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, আচ্ছা বলতো, যদি শোনো আবদুল্লাহ ইবনে সালাম মুসলমান হয়েছে? ইহুদীরা দু'বার অথবা তিনবার বললো, আল্লাহ তায়ালা তার হেফাযত করুন। এরপরই হযরত আবদুল্লাহ বেরিয়ে এলেন এবং উচ্চস্বরে বললেন, আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাছুলুল্লাহ। অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রসূল। একথা শোনার সাথে সাথে ইহুদীরা বললো, এ হচ্ছে আমাদের মধ্যেকার সবচেয়ে মন্দ ব্যক্তি এবং মন্দ ব্যক্তির সন্তান। এছাড়া তাঁর নামে আরো নানা খারাপ কথা বলতে লাগলো। হযরত আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, হে ইহুদী সম্প্রদায়, আল্লাহকে ভয় করো। সেই আল্লাহর শপথ, যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তোমরা ভালো করেই জানো যে, এই হচ্ছেন আল্লাহর রসূল। তিনি সত্যসহ আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু ইহুদীরা বললো, আপনি মিথ্যা কথা বলছেন।²

মদীনায় আগমনের প্রথমদিকেই ইহুদীদের সম্পর্কে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এরূপ অভিজ্ঞতা হয়েছিলো।

এ যাবত যা কিছু উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো মদীনার আভ্যন্তরীণ অবস্থা। মদীনার বাইরে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলো কোরায়শরা। তারা মক্কায় মুসলমানদের দশ বছর সীমাহীন কষ্ট দিয়েছিলো। চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, নির্যাতন ও অত্যাচারে মুসলমানদের জর্জরিত করে তুলেছিলো। মুসলমানদের কষ্ট দেয়ার কোন সুযোগই তারা হাতছাড়া করেনি। মুসলমানরা মদীনায় হিজরত করার পর কাফেররা তাদের বাড়ীঘর, জায়গা জমি, ধন-সম্পদ সব অধিকার করে নিলো। মুসলমান এবং তাদের পরিবার পরিজনের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ালো এমন কাউকে কাছে পেলে তাকে নানাভাবে কষ্ট দিচ্ছিলো। শুধু তাই নয়, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করে ইসলামের দাওয়াত সমূলে উৎপাটিত করার ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। এ উদ্দেশ্যে তারা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করলো। মুসলমানরা পাঁচশত কিলোমিটার দূরবর্তী মদীনায় গিয়ে পৌঁছার পরেও কাফেররা তাদের ষড়যন্ত্র বাদ দেয়নি। কোরায়শরা বায়তুল্লাহর প্রতিবেশী ছিলো এবং আরবদের মধ্যে ধর্মীয় নেতৃত্বের আসন ছিলো তাদের দখলে। এ কারণে তারা সে প্রভাব বিস্তার করে মক্কার বিভিন্ন গোত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং তাদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে মদীনাকে রাজনৈতিকভাবে বয়কট করলো। এর ফলে মদীনায় জিনিসপত্রের আমদানী কমে গেলো। এদিকে মদীনায় মোহাজেরদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছিলো। প্রকৃতপক্ষে মক্কায় কাফেরদের সাথে মদীনার অধিবাসী মুসলমানদের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। এ পরিস্থিতির জন্যে মুসলমানদের দায়ী করা হলে সেটা হবে চরম নির্বুদ্ধিতা।

মুসলমানদের বাড়ীঘর ও ধন-সম্পদ যেভাবে মক্কার কাফেররা জবর দখল করে নিয়েছিলো এবং যেভাবে মুসলমানদের উপর অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়েছিলো, মুসলমানরাও সঙ্গতভাবে সেরূপ কিছু করার অধিকার রাখে। মুসলমানদের স্বাভাবিক জীবনের পথে অমুসলিমরা যেভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলো, মুসলমানরাও সঙ্গতভাবেই সেরূপ বাধা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অধিকার রাখে। অমুসলিমদের কাজ অনুযায়ী কাজের উপযুক্ত জবাবই তারা পাওয়ার যোগ্য। এতে করে তাদের মুসলমানদের সমূলে উৎখাত করার চক্রান্ত সফল হবে না।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আগমনের পর এসব সমস্যার সম্মুখীন হন। তিনি এসব সমস্যার প্রেক্ষিতে পয়গাম্বর ও নেতাসূলভ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। যারা অনুগ্রহ পাওয়ার উপযুক্ত ছিলো, তাদের অনুগ্রহ করেন আর যারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য ছিলো, তাদের জন্যে শাস্তির ব্যবস্থা করেন। তবে এটা ঠিক যে, দয়া ও অনুগ্রহের পরিমাণ শাস্তি ও কঠোরতার চাইতে অনেক বেশী ছিলো। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মুসলমানদের হাতে এসে পড়ে। পরবর্তী পর্যায়ে সে বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে।

টিকাঃ
১ ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫১৮-৫১৯
২. সহীহ বোখারী, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা, ৪৫৯, ৫৫৬, ৫৬১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00