📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হিজরতের সময় মদীনার সার্বিক অবস্থা

📄 হিজরতের সময় মদীনার সার্বিক অবস্থা


এক) প্রথমত, মুসলমানদের ফেতনা ও বিশৃঙ্খলা এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। একই সাথে বহিশত্রুরা মদীনাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে মদীনার ওপর হামলা চালিয়েছিলো। ষষ্ঠ হিজরীর জিলকদ মাসে হোদায়বিয়ার সন্ধি পর্যন্ত এ পর্যায় অব্যাহত ছিলো।

দুই) দ্বিতীয়ত, পৌত্তলিকদের সাথে তাদের সন্ধি হয়েছিলো। অষ্টম হিজরীর রমযান মাসে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে এ পর্যায়ের সমাপ্তি হয়। এ পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের শাসনকর্তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করা হয়।

তিন) তৃতীয়ত, আল্লাহর দ্বীনে মানুষ দলে দলে প্রবেশ করতে থাকে। এ পর্যায়ে মদীনায় বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং গোত্রের প্রতিনিধিরা এসেছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর জীবনের শেষ অর্থাৎ একাদশ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে এ পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন তিনটি গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়েছিলো, যাদের ক্ষেত্রে ভিন্নতার প্রাধান্যই ছিলো বেশী। এরা হচ্ছে,

এক) আল্লাহর মনোনীত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে উত্তম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও আল্লাহর পথে ধন প্রাণ উৎসর্গ করতে সদাপ্রস্তুত সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জামাত।

দুই) মদীনার প্রাচীন এবং প্রকৃত অধিবাসীদের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী পৌত্তলিকরা, যারা তখনও ঈমান আনেনি।

তিন) ইহুদী সম্প্রদায় ও সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো, তা ছিলো এই যে, মদীনার অবস্থা ছিলো মক্কার অবস্থার চেয়ে সম্পূর্ণ পৃথক। মক্কায় যদিও ছিলেন একই কালেমার অনুসারী এবং তাদের উদ্দেশ্যও ছিলো অভিন্ন। কিন্তু তারা বিভিন্ন পরিবারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। তারা ছিলেন শঙ্কিত, দুর্বল ও অবমাননার সম্মুখীন। তাদের হাতে কোন ক্ষমতা ছিলো না। সকল ক্ষমতা ছিলো শত্রুদের হাতে। যেসব উপাদানের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীতে একটি সমাজ গঠন করা হয়, মক্কায় মুসলমানদের হাতে তার কিছুই ছিলো না। কিসের ভিত্তিতে মুসলমানরা সমাজ গঠনে সক্ষম হবে? এ কারণে দেখা যায় যে, মক্কায় অবতীর্ণ কোরআনের সূরাসমূহে শুধু ইসলামী দাওয়াতের বিবরণ দেয়া হয়েছে। এ সময়ে এমন সব আহকাম অবতীর্ণ হয়েছে, যার ওপর প্রতিটি মানুষই পৃথক পৃথক আমল করতে পারে।

পক্ষান্তরে মদীনায় যাওয়ার পর প্রথম দিন থেকেই ক্ষমতার বাগডোর ছিলো মুসলমানদের হাতে। মুসলমানদের ওপর অন্য কারো আধিপত্য ছিলো না। সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, যুদ্ধ, সন্ধিসহ তাদের অনেক আইন কানুনের মুখোমুখি হতে হচ্ছিলো। সেটা ছিলো হালাল-হারাম মেনে চলা ও উন্নত চরিত্রের প্রতিফলনের মাধ্যমে উন্নত জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের সময় মুসলমানদের একটি নয়া সমাজ অর্থাৎ ইসলামী সমাজ গঠনের প্রত্যক্ষ আদর্শ গড়ে তোলা। সেই সমাজ হবে একটি আদর্শ সমাজ। মূর্খতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত সেই সমাজে জাহেলী সমাজের কোন চিহ্ন থাকবে না। সেই সমাজ হবে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। ইসলামের দাওয়াতের জন্যে মুসলমানরা যে দশ বছর যাবত নানা ধরনের দুঃখকষ্ট নির্যাতন-নিষ্পেষণ সহ্য করেছিলো তার বাস্তবতা প্রমাণের সময় তখন এসে পড়েছিলো।

এ ধরনের কোন সমাজ একদিন একমাস বা এক বছরে গঠন করা সম্ভব নয় বরং এর জন্যে প্রয়োজন দীর্ঘ সময় যাতে করে, ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রম নির্দেশ প্রদান করা যায় এবং আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। নির্দেশ ও আইন কানুন বাস্তবায়ন মুসলমানদের প্রশিক্ষণ ও পথনির্দেশের দায়িত্ব ছিলো সরাসরি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তিনিই উম্মীদের মধ্য থেকে তাদের একজনকে রসূলরূপে পাঠিয়েছেন। যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াত তেলাওয়াত করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদের কেতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন, অথচ ইতিপূর্বে এরাই ছিলো ঘোর বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। (সূরা জুমুয়া', আয়াত-২)

এদিকে সাহabaয়ে কেরামের অবস্থা এরূপ ছিলো যে, তাঁরা সব সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি মনোযোগী থাকতেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে আদেশ প্রদান করতেন, সেই আদেশ যথাযথভাবে পালন করে সন্তুষ্টি লাভ করতেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'যখন তাঁর আয়াত নিদর্শন তাদের কাছে পাঠ করা হয় তখন সেটা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে।'

এসব বিষয় আমাদের এখানে আলোচনার পর্যায়ভুক্ত নয়, এ কারণে আমরা সেসব বিষয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী যথাস্থানে আলোচনা করবো।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের ফলে সৃষ্ট বিষয়গুলো, ইসলামের দাওয়াত এবং রেসালাতে মোহাম্মদীই হচ্ছে এখানে মুখ্য বিষয়। কিন্তু এটাও কোন হুজুগপূর্ণ বিষয় নয়। বরং এটা একটা পৃথক এবং স্থায়ী বিষয়। এছাড়া অন্য কিছু বিষয়ও ছিলো, যেসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন ছিলো। সংক্ষেপে তা নিম্নরূপ,

মুসলমানদের মধ্যে দুই প্রকারের লোক ছিলো। এক প্রকারের লোক যারা ছিলেন নিজেদের জমি, বাড়ী-ঘর এবং অর্থ-সম্পদের মধ্যে নিশ্চিন্তেই জীবন যাপন করছিলেন। এরা ছিলো আনসার গোত্রের লোক। এদের পরস্পরের মধ্যে বংশানুক্রমিকভাবে শত্রুতা চলে আসছিলো। এদের পাশাপাশি আরেকটি দলে ছিলেন মোহাজের। তারা উল্লিখিত সুবিধা থেকে ছিলেন বঞ্চিত। তারা কোন না কোন উপায়ে খালি হাতে মদীনা পৌঁছেছিলেন। তাদের থাকার কোন ঠিকানা ছিলো না, ক্ষুধা নিবারণের জন্যে কোন কাজও ছিলো না। সঙ্গে টাকা-পয়সা বা অন্য কোন জিনিসও ছিলো না, যা দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মত ব্যবস্থা করা যায়। পরাশ্রয়ী এসকল মোহাজেরের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছিলো। কেননা কোরআনের ঘোষণা প্রচার করা হয়েছিলো যে, আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যারা ঈমান রাখে, তারা যেন হিজরত করে মদীনায় চলে আসে। এটা তো জানাই ছিলো যে, মদীনায় তেমন কোন সম্পদও নেই এবং আয়-উপার্জনের উল্লেখযোগ্য উপায়-উপকরণও নেই। ফলে মদীনার অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং সেই সঙ্কটময় সময়ে ইসলামের শত্রুরা মদীনাকে অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করে। এতে আমদানীর পরিমাণ কমে যায় এবং পরিস্থিতি আরো গুরুতর হয়ে পড়ে।

অন্য একটি দলে ছিলো মদীনার অমুসলিম অধিবাসী। তাদের অবস্থা মুসলমানদের চেয়ে ভালো ছিলো না। কিছু অমুসলিম পৌত্তলিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সন্দেহের মধ্যে ছিলো এবং নিজেদের পৈতৃক ধর্ম-বিশ্বাস পরিবর্তনে দ্বিধান্বিত ছিলো। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের মনে কোন প্রকার শত্রুতা বা বিদ্বেষ ছিলো না। এ ধরনের লোকেরা অল্পকালের মধ্যেই ইসলাম গ্রহণ করে সত্যিকার মুসলমানে পরিণত হলো।

পক্ষান্তরে কিছু পৌত্তলিক এমন ছিলো, যারা মনে মনে নিজেদের বুকের ভেতর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করতো। কিন্তু মুখোমুখি এসে দাঁড়াবার বা মোকাবেলা করার সাহস তাদের ছিলো না। বরং পরিস্থিতির কারণে তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসার ভাব দেখাতো এবং সরলতার অভিনয় করতো। এদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিলো আবদুল্লাহ ইবনে উবাই। এখানে উল্লেখ যে, বুআসের যুদ্ধের পর আওস ও খাযরাজ গোত্র তাকে নিজেদের নেতা করার ব্যাপারে একমত হয়েছিলো।

এর আগে অন্য কোন ব্যাপারে এ দু'টি গোত্র ঐকমত্যে উপনীত হয়নি। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে বাদশাহ ঘোষণার প্রস্তুতি নিয়ে আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা বর্ণাঢ্য মুকুট তৈরী করছিলো। এমনি সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় এসে পৌঁছুলেন। জনগণের দৃষ্টি তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের পরিবর্তে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি নিবদ্ধ হলো। এ কারণে আবদুল্লাহ মনে করলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই তার বাদশাহী কেড়ে নিয়েছেন। ফলে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সে মনে মনে প্রচন্ড ঘৃণা পোষণ করতো। তা সত্তেও বদরের যুদ্ধের পর আবদুল্লাহ লক্ষ্য করলো যে, পরিস্থিতি তার অনুকূলে নয়, এ অবস্থায় শেরেকের উপর অটল থাকলে সে পার্থিব সুযোগ- সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হবে। এ কারণে সে দৃশ্যত ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করলো। কিন্তু মনে মনে সে ছিলো কাফের। ফলে মুসলমানদের ক্ষতি করার কোন সুযোগই সে হাতছাড়া করেনি। তার সাথী ছিলো ওই সকল লোক, যারা এই মোনাফেকের নেতৃত্বে বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলো। কিন্তু সেসব সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হলো। ফলে এরাও মুসলমানদের ক্ষতি করতে সব সময় প্রস্তুত থাকতো। মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহর পরিকল্পনা এরা বাস্তবায়িত করতো। এই উদ্দেশ্যে তারা মদীনার কিছুসংখ্যক সরলপ্রাণ যুবক মুসলমানকেও নিজেদের দলে এনে ক্রীড়নক হিসাবে ব্যবহার করতো।

তৃতীয় শ্রেণীর লোক ছিলো এখানকার ইহুদী। এরা অশোরী এবং রোমীয়দের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে হেজাযে আশ্রয় নিয়েছিলো। প্রকৃতপক্ষে এরা ছিলো হিব্রু। হেজাযে আশ্রয় নেয়ার পর চালচলন, কথাবার্তা ও পোশাক পরিচ্ছদে তাদেরও আরব বলে মনে হতো। এমনকি তাদের গোত্র এবং মানুষের নামকরণও ছিলো আরবদের মতো। আরবদের সাথে তাদের বৈবাহিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছিলো। কিন্তু এতোসব সত্তেও তারা তাদের বংশ-গৌরব ভুলতে পারেনি। তারা নিজেদের ইসরাঈলী অর্থাৎ ইহুদী হওয়ার মধ্যেই গৌরব বোধ করতো। আরবদের তারা মনে করতো খুবই নিকৃষ্ট। ওদেরকে উম্মী বলে গালি দিতো। এই উম্মী বলতে তারা বোঝাতো নির্বোধ, মুর্খ, জংলী, নীচু এবং অদ্যুৎ। তারা বিশ্বাস করতো যে, আরবদের ধন-সম্পদ তাদের জন্যে বৈধ। যেভাবে ইচ্ছা তারা ভোগ ব্যবহার করতে পারবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তারা বলে, নিরক্ষরদের প্রতি আমাদের কোন বাধ্য-বাধকতা নেই।' (আলে ইমরান, আয়াত ৭৫) অর্থাৎ উম্মীদের অর্থ-সম্পদ ভোগ ব্যবহার আমাদের জন্যে দোষণীয় নয়। এসব ইহুদীর মধ্যে তাদের দ্বীনের প্রচার প্রসারের ব্যাপারে কোন প্রকার তৎপরতা লক্ষ্য করা যেতো না। ভাগ্য গণনা, যাদু, ঝাড়ফুঁক এ সবই ছিলো তাদের ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ। এ সব কিছুর মাধ্যমেই তারা নিজেদেরকে জ্ঞানী, পন্ডিত এবং আধ্যাত্মিক নেতা মনে করতো।

ইহুদীরা ধন-সম্পদ উপার্জনের ব্যাপারে ছিলো দক্ষ। তারা খাদ্য-সামগ্রী, খেজুর, মদ এবং পোশাকের ব্যবসা করতো। তারা খাদ্য সামগ্রী পোশাক এবং মদ আমদানি করতো এবং খেজুর রফতানী করতো। এছাড়াও আরো নানা ধরনের কাজ-কর্মে তারা নিজেদের ব্যস্ত রাখতো। ব্যবসা বাণিজ্যের মালামালের মধ্যে তারা আরবদের কাছ থেকে দ্বিগুণ তিনগুণ মুনাফা করতো। শুধু তাই নয় তারা সুদও খেতো। তারা আরবের শেখ সর্দারদের সুদের ওপর টাকা ধার দিতো। ধার নেয়া অর্থ আরব শেখ ও সর্দাররা খ্যাতি লাভের জন্যে তাদের প্রশংসাকারী কবিদের জন্যে উদারভাবে ব্যয় করতো। এদিকে ইহুদীরা সুদের ওপর অর্থ ধার দেয়ার বিনিময়ে বিভিন্ন জিনিস বন্ধক রাখতো। এতে কয়েক বছরেই ইহুদীরা সেসব সম্পত্তির মালিক হয়ে যেতো।

ইহুদীরা ষড়যন্ত্র এবং যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার ব্যাপারে ছিলো তুখোড়। তারা প্রতিবেশী গোত্রসমূহের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে শত্রুতার বীজ বপন করতো। একটি গোত্রকে অন্য গোত্রের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে এবং লেলিয়ে দেয়ার ব্যাপারে তারা ছিলো সদা-তৎপর। অথচ যারা পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হতো তারা ঘৃণাক্ষরেও এসব বুঝতে পারত না। পরবর্তী সময়ে বিবদমান গোত্রগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগে থাকতো। যুদ্ধের আগুন নিভু নিভু হয়ে আসছে লক্ষ্য করলে ইহুদীরা পুনরায় তৎপর হয়ে উঠতো। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, পরস্পরকে লেলিয়ে দিয়ে ইহুদীরা চুপচাপ বসে থাকতো। তারা আরবদের ধ্বংসের দৃশ্য দেখতো। সে সময়েও মোটা সুদে অর্থ ধার দিতো। মূলধনের অভাবে যুদ্ধ বন্ধ হোক সেটা তারা চাইত না। এতে ইহুদীরা দুই প্রকারে লাভবান হতো। একদিকে নিজেদের সম্প্রদায়কে নিরাপদ রাখতো, অন্যদিকে সুদের ব্যবসা জমজমাট রাখতো। সুদের ওপর সুদ হিসাব করেই তারা অর্থ উপার্জন করতো।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মদীনার প্রধান তিনটি ইহুদী গোত্র

📄 মদীনার প্রধান তিনটি ইহুদী গোত্র


এক) বনু কাইনুকা। এরা ছিলো খাযরাজ গোত্রের মিত্র। এরা মদীনার ভেতরেই বসবাস করতো। দুই) বnu নাযির। তিন) বনু কোরাইযা। এ দুটি গোত্র ছিলো আওস গোত্রের মিত্র। মদীনার শহরতলী এলাকায় এরা বসবাস করতো।

দীর্ঘকাল যাবত আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলছিলো। বুআস-এর যুদ্ধে এরা নিজ নিজ মিত্র গোত্রের সমর্থনে নিজেরাও যুদ্ধে শরীক হতো। ইহুদীরা ইসলামের প্রতি শত্রুতা পোষণ করছিলো, এটাই ছিলো স্বাভাবিক। এই ধরনের শত্রুতার স্বভাব তাদের চরিত্রে বহুকাল থেকেই বিদ্যমান ছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বংশোদ্ভূত ছিলেন না, কাজেই তাদের আভিজাত্যের গৌরব কোন গুরুত্ব পাচ্ছিলো না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি তাদের মধ্যে থেকে আবির্ভূত হতেন তাহলে তারা মনে শান্তি পেতো। তাছাড়া ইসলামের দাওয়াত ছিলো একটি বলিষ্ঠ দাওয়াত। এতে মানুষ শত্রুতা ভুলে পরস্পর ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়। ন্যায়নীতি, আমানতদারী এবং হালাল হারামের বিচার-বিবেচনা করা হয়। এর অর্থ হলো, এবার ইয়াসরেবের বিবদমান গোত্রসমূহের মধ্যে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি সৃষ্টি হবে। এর ফলে ইহুদীদের বাণিজ্যিক তৎপরতা হ্রাস পাবে। তাদের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি সুদভিত্তিক সম্পদ থেকে তারা বঞ্চিত হবে। এমনকি এ ধরনের আশঙ্কা ছিলো যে, এসব গোত্র আত্মসচেতন হবে এবং ইহুদীরা কোন কিছুর বিনিময় ছাড়াই যেসব অর্থ-সম্পদ গ্রহণ করেছে ওরা সেসব ফিরিয়ে নেবে। অর্থাৎ সুদের ব্যবসায় বিভিন্ন গোত্রের যেসব বাগান ও জমি, ইহুদীরা দখল করেছে, সেসব ফিরিয়ে নেবে।

ইয়াসরেবে ইসলাম প্রচারের সূচনাতেই ইহুদীরা এসব কিছুই নিজেদের চিন্তার মধ্যে এনেছিলো। এ কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আসার সময় থেকেই মদীনার ইহুদীরা ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি প্রবল শত্রুতা পোষণ করতো। তবে সেই শত্রুতার প্রকাশ তারা তখনই নয়, একটু দেরীতে করেছে। ইবনে ইসহাক বর্ণিত একটি ঘটনায় এ অবস্থার সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।

ইবনে ইসহাক লিখেছেন যে, উম্মুল মোমেনীন হযরত সফিয়্যা বিনতে হুয়াই ইবনে আখতার (রা.) থেকে একটি বর্ণনা আমি পেয়েছি। তিনি বলেন, আমি ছিলাম আমার পিতা ও আমার চাচার সন্তানদের মধ্যে তাদের কাছে সর্বাধিক প্রিয়। অন্যসব সন্তানদের মধ্যে তারা আমাকে বেশী ভালোবাসতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আসার পর কোবা পল্লীতে বনু আমর ইবনে আওফের কাছে অবস্থান করলেন। এই খবর পাওয়ার পর আমার পিতা হুয়াই ইবনে আখতার এবং চাচা আবু ইয়াসের খুব সকালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেলেন এবং সূর্যাস্তের সময় ফিরে এলেন। তারা দু'জনই ছিলেন ভীষণ ক্লান্ত।

আমি অভ্যাসবশত তাদের দিকে ছুটে গেলাম। কিন্তু তারা চিন্তায় এমন বিভোর ছিলেন যে, আমার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। আমি শুনলাম, চাচা আবু ইয়াসের এবং আমার পিতার সাথে এভাবে কথোপথন হচ্ছে- এই কি তিনি? -হাঁ, আল্লাহর শপথ। -আপনি তাকে ভালোভাবে চিনেছেন তো? -হাঁ। -এখন আপনি তার সম্পর্কে কি মনোভাব পোষণ করছেন? -শত্রুতা। আল্লাহর শপথ, যতদিন বেঁচে থাকি।¹

সহীহ বোখারীতে উল্লিখিত একটি বর্ণনায়ও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই বর্ণনায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.)-এর মুসলমান হওয়ার বিবরণ রয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ছিলেন এক উঁচুস্তরের ইহুদী পন্ডিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় আগমনের খবর পাওয়ার পরই তিনি তাঁর কাছে হাযির হলেন এবং এমন কিছু প্রশ্ন করলেন, যেসব প্রশ্নের উত্তর একজন নবী ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই দেয়া সম্ভব নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সাথে সাথে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন ইহুদীরা অন্যের নামে অপবাদ দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত। যদি তাদের কারো কাছে আপনি আমার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে তারা যা বলবে, আমার ইসলাম গ্রহণের খবর শোনার পর পরই বিপরীত রকমের কথা বলবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে সাথে কয়েকজন ইহুদীকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম তোমাদের মধ্যে কেমন লোক? তারা বললো, তিনি আমাদের মধ্যেকার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানীর পুত্র। অন্য এক বর্ণনায় এরূপ রয়েছে যে, তিনি আমাদের সর্দার এবং আমাদের সর্দারের সন্তান। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, আচ্ছা বলতো, যদি শোনো আবদুল্লাহ ইবনে সালাম মুসলমান হয়েছে? ইহুদীরা দু'বার অথবা তিনবার বললো, আল্লাহ তায়ালা তার হেফাযত করুন। এরপরই হযরত আবদুল্লাহ বেরিয়ে এলেন এবং উচ্চস্বরে বললেন, আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাছুলুল্লাহ। অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রসূল। একথা শোনার সাথে সাথে ইহুদীরা বললো, এ হচ্ছে আমাদের মধ্যেকার সবচেয়ে মন্দ ব্যক্তি এবং মন্দ ব্যক্তির সন্তান। এছাড়া তাঁর নামে আরো নানা খারাপ কথা বলতে লাগলো। হযরত আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, হে ইহুদী সম্প্রদায়, আল্লাহকে ভয় করো। সেই আল্লাহর শপথ, যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তোমরা ভালো করেই জানো যে, এই হচ্ছেন আল্লাহর রসূল। তিনি সত্যসহ আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু ইহুদীরা বললো, আপনি মিথ্যা কথা বলছেন।²

মদীনায় আগমনের প্রথমদিকেই ইহুদীদের সম্পর্কে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এরূপ অভিজ্ঞতা হয়েছিলো।

এ যাবত যা কিছু উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো মদীনার আভ্যন্তরীণ অবস্থা। মদীনার বাইরে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলো কোরায়শরা। তারা মক্কায় মুসলমানদের দশ বছর সীমাহীন কষ্ট দিয়েছিলো। চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, নির্যাতন ও অত্যাচারে মুসলমানদের জর্জরিত করে তুলেছিলো। মুসলমানদের কষ্ট দেয়ার কোন সুযোগই তারা হাতছাড়া করেনি। মুসলমানরা মদীনায় হিজরত করার পর কাফেররা তাদের বাড়ীঘর, জায়গা জমি, ধন-সম্পদ সব অধিকার করে নিলো। মুসলমান এবং তাদের পরিবার পরিজনের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ালো এমন কাউকে কাছে পেলে তাকে নানাভাবে কষ্ট দিচ্ছিলো। শুধু তাই নয়, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করে ইসলামের দাওয়াত সমূলে উৎপাটিত করার ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। এ উদ্দেশ্যে তারা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করলো। মুসলমানরা পাঁচশত কিলোমিটার দূরবর্তী মদীনায় গিয়ে পৌঁছার পরেও কাফেররা তাদের ষড়যন্ত্র বাদ দেয়নি। কোরায়শরা বায়তুল্লাহর প্রতিবেশী ছিলো এবং আরবদের মধ্যে ধর্মীয় নেতৃত্বের আসন ছিলো তাদের দখলে। এ কারণে তারা সে প্রভাব বিস্তার করে মক্কার বিভিন্ন গোত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং তাদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে মদীনাকে রাজনৈতিকভাবে বয়কট করলো। এর ফলে মদীনায় জিনিসপত্রের আমদানী কমে গেলো। এদিকে মদীনায় মোহাজেরদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছিলো। প্রকৃতপক্ষে মক্কায় কাফেরদের সাথে মদীনার অধিবাসী মুসলমানদের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। এ পরিস্থিতির জন্যে মুসলমানদের দায়ী করা হলে সেটা হবে চরম নির্বুদ্ধিতা।

মুসলমানদের বাড়ীঘর ও ধন-সম্পদ যেভাবে মক্কার কাফেররা জবর দখল করে নিয়েছিলো এবং যেভাবে মুসলমানদের উপর অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়েছিলো, মুসলমানরাও সঙ্গতভাবে সেরূপ কিছু করার অধিকার রাখে। মুসলমানদের স্বাভাবিক জীবনের পথে অমুসলিমরা যেভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলো, মুসলমানরাও সঙ্গতভাবেই সেরূপ বাধা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অধিকার রাখে। অমুসলিমদের কাজ অনুযায়ী কাজের উপযুক্ত জবাবই তারা পাওয়ার যোগ্য। এতে করে তাদের মুসলমানদের সমূলে উৎখাত করার চক্রান্ত সফল হবে না।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আগমনের পর এসব সমস্যার সম্মুখীন হন। তিনি এসব সমস্যার প্রেক্ষিতে পয়গাম্বর ও নেতাসূলভ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। যারা অনুগ্রহ পাওয়ার উপযুক্ত ছিলো, তাদের অনুগ্রহ করেন আর যারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য ছিলো, তাদের জন্যে শাস্তির ব্যবস্থা করেন। তবে এটা ঠিক যে, দয়া ও অনুগ্রহের পরিমাণ শাস্তি ও কঠোরতার চাইতে অনেক বেশী ছিলো। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মুসলমানদের হাতে এসে পড়ে। পরবর্তী পর্যায়ে সে বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে।

টিকাঃ
১ ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫১৮-৫১৯
২. সহীহ বোখারী, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা, ৪৫৯, ৫৫৬, ৫৬১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00