📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 রসূলুল্লাহর মদিনায় প্রবেশ

📄 রসূলুল্লাহর মদিনায় প্রবেশ


জুমার নামায আদায়ের পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা গমন করেন। সেদিন থেকে ইয়াসরেবের নাম হয়েছে 'মদীনাতুর রসূল' বা শহরে রসূল। সংক্ষেপে মদীনা। এই দিন ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় দিন। চারদিকে আল্লাহর প্রশংসা ধ্বনি শোনা যাচ্ছিলো। আনসার শিশুরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে এ গান গাইছিলো। 'দক্ষিণের সেই পাহাড় থেকে উদয় হলো মোদের ওপর চতুর্দশীর চাঁদ। শোকরিয়া আদায় করা আল্লাহর, কর্তব্য মোদের সকলের। তোমার আদেশ পালন আর আনুগত্য কর্তব্য মোদের সকলের, পাঠিয়েছেন তোমায় আল্লাহ সর্ব শক্তিমান।'
আনসাররা ধনী বা বিত্তশালী ছিলেন না কিন্তু সবাই চাচ্ছিলেন যে, নবী তার বাড়ীতেই অবস্থান করবেন। যে এলাকা দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন, সেখানের লোকেরাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উটের রশি ধরে তাঁর বাড়ীতে আসার আবেদন জানাতেন। কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দিলেন যে, উটনীর পথ ছেড়ে দাও, সে আল্লাহর তরফ থেকে আদেশ পেয়েছে। এরপর উটনী ইচ্ছামতো চলতে লাগলো এবং বর্তমানে যেখানে মসজিদে নববী রয়েছে সেখানে গিয়ে থামলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটনী থেকে নামলেন না। উটনী সামনে কিছুদূরে এগিয়ে গেলো এরপর পুনরায় ঘুরে আগের জায়গায় ফিরে এসে বসে পড়লো। এটা ছিলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নানাদের মহল্লা অর্থাৎ বনু নাজ্জারদের মহল্লা। উটনীকে আল্লাহর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়ায় সে বনু নাজ্জার এলাকায় থেমে নানাদের প্রতি সম্মান দেখিয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও মনে মনে এটাই চাচ্ছিলেন। এবার বনু নাজ্জার গোত্রের লোকেরা নিজ নিজ বাড়ীতে নিয়ে তাকে যাওয়ার জন্যে আবেদন নিবেদন শুরু করলো। আবু আইয়ুব আনসারী এগিয়ে এসে উটের লাগাম ধরলেন এবং তাঁর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মানুষ তার উটের পালানের সঙ্গে রয়েছে। এরপর হযরত আসআদ ইবনে যোরারাহ এসে উটনীর লাগাম ধরলেন, উটনী তখন থেকে তাঁর নিয়ন্ত্রণেই থাকলো।
সহীহ বোখারী শরীফে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাদের মধ্যে কার ঘর সবচেয়ে কাছে? হযরত আবু আইউব আনসারী বললেন, আমার ঘর, হে আল্লাহর রসূল। এই হচ্ছে আমার ঘর, আর এই হচ্ছে আমার দরজা। আল্লাহর রসূল বললেন, যাও আমাদের জন্যে কাইলুলা অর্থাৎ মধ্যাহ্নের বিশ্রামের ব্যবস্থা করো। আবু আইউব বললেন, আপনারা উভয়ে আসুন, আল্লাহ তায়ালা বরকত দেবেন।
কয়েকদিন পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিনী উম্মুল মোমেনীন হযরত সাওদা, দুই কন্যা ফাতেমা এবং উম্মে কুলসুম, ওসামা ইবনে যায়েদ এবং উম্মে আরমানও এসে পড়লেন। এদের সবাইকে হযরত আবু বকরের পরিবারের সাথে আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর মদীনায় নিয়ে আসেন। হযরত আয়েশা (রা.)-ও এদের সঙ্গে ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক কন্যা হযরত যয়নব হযরত আবুল আস-এর কাছে রয়ে গেলেন। তিনি তখন আসতে দেননি। তিনি বদরের যুদ্ধের পর আগমন করেন।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, প্রিয় রসূল (রা.) মদীনায় আসার পর হযরত আবু বকর এবং হযরত বেলাল (রা.) জ্বরে আক্রান্ত হলেন। আমি তাদের কাছে গিয়ে বললাম, আব্বাজান, আপনি কেমন আছেন? বেলাল (রা.), আপনি কেমন আছেন? হযরত আবু বকরের জ্বর এলে তিনি এ কবিতা আবৃতি করতেন, 'পরিবারের সদস্যদের সবাই বলে সুপ্রভাত কেউ ভাবে না জুতোর ফিতার চেয়েও তার মরণ কাছে।'
হযরত বেলাল (রা.) কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তাঁর সুরেলা কণ্ঠে আবৃত্তি করলেন, 'জানতাম যদি রাত্রি যাপন করবো আমি মক্কার প্রান্তরে চারিপাশে রবে ইযখিরও জালিল (ঘাস)। মার্জিন্নার ঝর্ণার ধারে যেতে পারব কিনা জানি না। সামা আর তোফায়েল পাহাড় দেখতে কি পাবো?'
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছাকাছি গিয়ে এ খবর দিলাম, তিনি বললেন, হে আল্লাহ তায়ালা, মক্কা যেমন আমাদের কাছে প্রিয় ছিলো, মদীনাকেও তেমন প্রিয় করে দাও, বরঞ্চ মদীনার পরিবেশ ও আবহাওয়া তার চেয়ে বেশী স্বাস্থ্যকর করে দাও। এখানে শস্যের মধ্যে বরকত দাও। এখান থেকে অসুখ জাহফায় সরিয়ে নাও। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবীর দোয়া কবুল করলেন, পরিস্থিতির পরিবর্তন হলো।
এ পর্যন্ত প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের এক অংশ এবং ইসলামী দাওয়াতের মক্কী যুগ পূর্ণ হয়ে গেলো।

টিকাঃ
৩৭. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৫, ৫৬০ যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৫, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড পৃ. ৪৯৪ রহমাতুললিল আলামীন ১ম খন্ড পৃ. ১০২
৩৮. কবিতার এ তরজমা আল্লামা মনসুরপুরী করেছেন। আল্লামা ইবনে কাইয়েম লিখেছেন, এই কবিতা তবুক থেকে রসূলের ফেরার সময় আবৃত্তি করা হয়েছিলো। যিনি বলেন যে, মদীনায় নবী (সাঃ)-এর প্রবেশের সময়েই শুধু এ কবিতা পড়া হয়েছে একথাকে তিনি ভুল বলেছেন। যাদুল মায়াদ, ৩য় খন্ড, পৃ ১০। তবে আল্লামা ইবনে কাইয়েম ভুল বললেও নির্ভরযোগ্য যুক্তি প্রমাণ দিতে পারেননি। পক্ষান্তরে আল্লামা মনসুরপুরী একথাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন যে, এ কবিতা মদীনায় প্রবেশের সময় পড়া হয়েছিলো। তিনি বলেছেন, এ ব্যাপারে তাঁর কাছে বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি প্রমাণও রয়েছে। দেখুন রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃ. ১০৬
৩৯. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. রহমাতুল লিল আলামীন ১ম খন্ড পৃ. ১০৬
৪০. সহীহ বোখারী ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৬
৪১. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৫
৪২. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৮৮-৫৮৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00