📄 কোরায়শদের অভিযান
কোরায়শদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা যখন পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছেন, তখন তারা যেন উন্মাদ হয়ে গেলো। প্রথমে তারা হযরত আলীর ওপর তাদের ক্রোধ প্রকাশ করলো। তাকে টেনে হিঁচড়ে কাবাঘরে নিয়ে গেলো এবং কথা আদায়ের চেষ্টা করলো। কিন্তু এতে কোন লাভ হলো না। এরপর তারা হযরত আবু বকরের বাড়ীতে গেলো। দরজা খুললেন হযরত আসমা বিনতে আবু বকর। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, তোমার আব্বা কোথায়? তিনি বললেন, আমি তো জানি না। এ জবাব শুনে দুর্বৃত্ত আবু জেহেল আসমাকে এতো জোরে চড় দিলো যে, তার কানের বালি খুলে পড়ে গেলো।
এরপর কোরায়শ নেতারা এক জরুরী বৈঠকে মিলিত হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আবু বকর (রা.)-কে গ্রেফতার করার জন্যে সর্বাত্মক অভিযান চালাতে হবে। মক্কা থেকে বাইরের দিকে যাওয়ার সকল পথে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করলো। সেই সাথে ঘোষণা করা হলো যে, যদি কেউ হযরত মোহাম্মদ এবং আবু বকর (রা.)-কে বা দু'জনের একজনকে জীবিত বা মৃত হাযির করতে পারে, তাকে একশত উট পুরস্কার দেয়া হবে। এ ঘোষণা সর্বসাধারণ্যে প্রচারিত হবার পর চারিদিকে বহু লোক বেরিয়ে পড়লো। পায়ের চিহ্ন বিশারদরাও উভয়কে তালাশ করতে লাগলো। পাহাড়ে প্রান্তরে ও উঁচু নীচু এলাকায় সর্বত্র চষে বেড়াতে লাগলো। কিন্তু এতো কিছু করেও কোন লাভ হলো না।
অনুসন্ধানকারীরা 'ছুর' পাহাড়ের গুহার কাছেও পৌঁছুলো। কিন্তু সারা দুনিয়ার বাদশাহ আল্লাহ তায়ালা নিজের ইচ্ছাকেই পূর্ণতা দান করেন। সহীহ বোখারীতে হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গুহায় ছিলাম, মাথা তুলতেই দেখি, লোকদের পা দেখা যাচ্ছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল, ওরা কেউ যদি একটুখানি নিচু হয়ে এদিকে তাকায়, তবেই আমাদের দেখতে পাবে। প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু বকর চুপ করো, আমরা এখানে দু'জন নই বরং আমাদের সাথে তৃতীয় হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আবু বকর এমন দুঃজন সম্পর্কে তোমার কি ধারণা, যাদের তৃতীয় হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা।
মোটকথা অনুসন্ধানকারীরা তখনই চলে গেলো, যখন আল্লাহর রসূল এবং দুর্বৃত্তদের মধে ব্যবধান ছিলো খুব কম— মাত্র কয়েক কদম।
টিকাঃ
১৬. রহমতুল লিল আলামীন ১ম খন্ড, পৃ. ৯৯
১৭. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৭
১৮. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৪
১৯. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫১৬-৫৫৮। এখানে স্মরণ রাখতে হবে যে, হযরত আবু বকরের অস্থিরতা নিজের জীবন রক্ষার জন্য ছিলো না। তিনি প্রিয় নবী (সঃ)-এর জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি দুর্বত্তদের পা দেখতে পাচ্ছিলেন, সে সময় তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন এবং বললেন, যদি আমি মারা যাই তবে একজন আবু বকর মারা যাবে। কিন্তু আপনি মারা গেলে সমগ্র উম্মত বরবাদ হয়ে যাবে। এ সময়ে রসূল বলেছিলেন, ভয় পেয়ো না, আবু বকর, আল্লাহ পাক আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।
২০. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৩-৫৫৫ ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৬
📄 মদীনার পথে
মক্কার কোরায়শদের নেতৃত্বে পুরস্কারলোভী লোকদের অনুসন্ধান তৎপরতা নিষ্ফল প্রমাণিত হলো। ক্রমাগত তিনদিন অনুসন্ধান করে তারা ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে পড়লো। তাদের অনুসন্ধান উৎসাহ স্তিমিত হয়ে এলো। এ অবস্থা লক্ষ্য করে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আবু বকর (রা.) মদীনার পথে রওয়ানা হলেন। বিভিন্ন পথ সম্পর্কে অভিজ্ঞ আবদুল্লাহ ইবনে আরিকত লাইছির সাথে আগেই চুক্তি হয়েছিলো যে, তিনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এই দুইজনকে মদীনায় পৌঁছে দেবেন। কোরায়শদের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর থাকলেও এ লোকটি ছিলো বিশ্বস্ত। এ কারণে তাকে সওয়ারীও দেয়া হয়েছিলো। তাকে বলা হয়েছিলো যে, তিনদিন পর সে দু'টি সওয়ারীসহ ছুর গুহার সামনে যাবে। সোমবার রাতে ১লা রবিউল আউয়াল মোতাবেক ১৬ই সেপ্টেম্বর ৬২২ ঈসায়ী সালের সোমবার রাতে আবদুল্লাহ ইবনে আরিকত সওয়ারী নিয়ে এলেন। হযরত আবু বকর (রা.) এ সময় তাঁর দুটি উটনী দেখিয়ে বললেন, হে রসূল, আপনি এ দুটির মধ্যে একটি গ্রহণ করুন। রসূল বললেন, হাঁ, তবে মূল্যের বিনিময়ে।
এদিকে আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) উটের ওপর বিছানোর বিছানা নিয়ে এলেন। কিন্তু বাঁধার দড়ি আনতে ভুলে গিয়েছিলেন। রওয়ানা হওয়ার সময় হযরত আসমা উটের পিঠে বিছানা রাখার পর দেখা গেলো বাঁধার দড়ি রেখে এসেছেন। তিনি তখন নিজের কোমরবন্দ খুলে সেটি দু'ভাগ করে ছিঁড়ে বিছানা উটের পিঠের সাথে বেঁধে দিলেন, অন্য অংশ নিজের কোমরে বাঁধলেন। এ কারণে তাঁর উপাধি হয়েছিলো 'যাতুন নেতাকাইন'।
এরপর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আবু বকর (রা.) রওয়ানা হলেন। আমের ইবনে যোহায়রাও সঙ্গে ছিলেন। রাহবার আবদুল্লাহ ইবনে আরিকত উপকূলীয় পথে মদীনা রওয়ানা হলেন।
গারে ছুর থেকে বেরোবার পর আবদুল্লাহ প্রথমে ইয়েমেনের দিকে অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে বহুদূর অগ্রসর হলেন। এরপর পশ্চিমাভিমুখী হয়ে সমুদ্রোপকূল ধরে চলতে শুরু করলেন। পরে এমন এক পথে চলতে লাগলেন, যে পথ সম্পর্কে সাধারণ লোকেরা কেউ অবহিত ছিলো না। সে পথে উত্তর দিকে অগ্রসর হলেন। লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী এ পথে খুব কম সময়েই লোক চলাচল করতো।
আল্লাহর রসূল এ পথে যেসব স্থান অতিক্রম করেছেন, ইবনে ইসহাক তার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, পথ প্রদর্শক যখন তাদের নিয়ে বের হলেন, তখন মক্কার নিম্ন ভূমি এলাকা দিয়ে অতিক্রম করলেন। উপকূল দিয়ে চলার পর আসফানের নীচু এলাকায় বাঁক ঘুরলেন। সানিয়াতুল মুররা দিয়ে তারপর লকফ হয়ে লকফের বিস্তীর্ণ ভূমি অতিক্রম করলেন। এরপর হেজাযের বিস্তীর্ণ ভূমিতে পৌছে এবং সেখান থেকে মুজাহের মোড় দিয়ে শস্যশ্যামল ভূমিতে গমন করেন। তারপর যি কেশরার মাঠে প্রবেশ করে জুদাজাদের দিকে যান এবং সেখান থেকে আজার্দে পৌঁছেছেন। এরপর তাহানের বিস্তীর্ণ এলাকার পাশ দিয়ে যু যালাম অতিক্রম করেন। সেখানে থেকে আবাদি, তারপর ফাজা অভিমুখে রওয়ানা হন। তারপর অবতরণ করেন আজরে। পরে রকুবার ডান পাশ দিয়ে পানিয়াতুল আযেরে গেলেন এবং রিম উপত্যকায় অবতরণ করেন। সবশেষে কোবায় গিয়ে পৌছুলেন।
টিকাঃ
২০. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৩-৫৫৫ ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৬
২১. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৯১, ৪৯২
📄 পথের কয়েকটি ঘটনা
এক) সহীহ বোখারী শরীফে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, গারে ছুর থেকে বেরিয়ে আমরা সারারাত ধরে পথ চলেছি, পরদিন দুপুর পর্যন্তও চলেছি। ঠিক দুপুরে রাস্তায় কোন পথচারী ছিলো না। আমরা এ সময় একটা লম্বালম্বি প্রান্তর দেখতে পেলাম। এখানে রোদ নেই। আমরা সেখানে অবতরণ করলাম। নিজের হাতে আমি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শয়নের জন্যে একটি জায়গা সমতল করলাম, এরপর সেখানে চাদর বিছালাম। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এরপর বললাম, হে আল্লাহর রসূল, আপনি শয়ন করুন, বিশ্রাম নিন, আমি আশপাশে খেয়াল রাখছি। নবীজী শুয়ে পড়লেন। আমি চারিদিকে নযর রাখলাম। হঠাৎ দেখি একজন রাখাল কিছু সংখ্যক বকরি নিয়ে এদিকেই আসছে। সে প্রান্তরের ছায়ায় আসছিলো। আমি তাকে বললাম, তুমি কার লোক? সে মক্কা বা মদীনার একজন লোকের নাম বললো। আমি তাকে বললাম, তোমার বকরির কি কিছু দুধ হবে? সে বললো, হাঁ। আমি বললাম, দোহন করতে পারি? সে বললো, হাঁ। এ কথা বলে সে একটি বকরি ধরে আনলো। আমি বললাম, মাটি খড়কুটো এবং লোম থেকে ওলান একটু পরিষ্কার করে দাও। পরিষ্কার করার পর একটি পেয়ালায় কিছু দুধ দোহন করে দিলো। আমার কাছে ছিলো একটি চামড়ার পাত্র। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওযু এবং পানি পান করার জন্যে সেটি রেখেছিলাম। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে দেখি তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাঁকে জাগানো সমীচীন মনে করলাম না, কিছুক্ষণ পর তিনি ঘুম থেকে জাগলেন। দুধের সাথে কিছু পানি মেশালাম, এতে পাত্রের নীচের অংশ ঠান্ডা হয়ে গেলো। তাকে বললাম, আপনি এ দুধটুকু পান করুন। তিনি পান করে খুশী হলেন। এরপর বললেন, এখনো কি রওয়ানা হওয়ার সময় আসেনি? আমি বললাম, কেন নয়? এরপর আমরা আবার রওয়ানা হলাম।
দুই) এ সফরের সময় হযরত আবু বকর (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেছনে বসতেন। পথচারীদের দৃষ্টি তার দিকেই প্রথমে যেতো, কারণ তাঁর চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ ছিলো। তাঁর তুলনায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কমবয়সী মনে হচ্ছিলো। পথচারীদের কেউ যখন জিজ্ঞাসা করতো যে, আপনার সামনে উনি কে? হযরত আবু বকর (রা.) জবাব দিতেন যে, উনি আমাকে পথ দেখান। প্রশ্নকারী বুঝতো যে মরুভূমিতে পথ দেখাচ্ছেন, প্রকৃতপক্ষে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নেকী ও কল্যাণের পথের কথাই বোঝাতেন।
তিন) এই সফরের সময় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে মা'বাদ খোযায়ার তাঁবুতে কিছুক্ষণের জন্যে যাত্রা বিরতি করেন। এই মহিলা খুব বুদ্ধিমতী। নিজের বাড়ীতে আঙ্গিনায় তিনি বসেছিলেন। যাতায়াতকারী পথচারীদের সাধ্যমতো পানাহার করাতেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কাছে কিছু আছে? মহিলা বললেন, যদি কিছু থাকতো, তবে আপনাদের মেহমানদারিতে ত্রুটি করতাম না। কয়েকটি বকরি আছে, যেগুলো দূরে চারণভূমিতে রয়েছে। এখন দুর্ভিক্ষের সময় চলছে।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লক্ষ্য করলেন যে, বাড়ীর এক পাশে একটি বকরি বাঁধা আছে। তিনি বললেন, উম্মে মা'বাদ, এ বকরি এখানে কেন? উম্মে মা'বাদ বললেন, এ বকরি খুব দুর্বল, হাঁটতে পারে না। প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অনুমতি যদি দাও, তবে ওর দুধ দোহন করি? মহিলা বললেন, হাঁ, যদি দুধ দেখতে পান, অবশ্যই দোহন করুন। এ কথার পর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বকরির ওলানে হাত লাগালেন। আল্লাহর নাম নিলেন এবং দোয়া করলেন। বকরি সাথে সাথে পা প্রসারিত করে দাঁড়ালো। তার ওলানে ভরা দুধ। প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বড় পাত্র নিয়ে সেই পাত্রে দুধ দোহন করলেন। সেই পাত্র ভর্তি দুধ এক দল লোক তৃপ্তির সাথে পান করতে পারতো। দুধ দোহনের পর পাত্রে ফেনা ভরে গেলো। সঙ্গীদের পান করালেন উম্মে মা'বাদ নিজে পান করলেন। এরপর সেই পাত্রে পুনরায় দুধ দোহন করলেন। সেই পাত্র ভর্তি দুধ উম্মে মা'বাদের ঘরে রেখে আল্লাহর রসূল গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হলেন।
কিছুক্ষণ পর মহিলার স্বামী বকরির পাল নিয়ে বাড়ী ফিরলো। সেসব বকরিও দুর্বল, পথ চলতে ক্লান্তিতে হাঁপিয়ে ওঠে। উম্মে মা'বাদের স্বামী আবু মা'বাদ দুধ দেখে তো অবাক! জিজ্ঞাসা করলেন, দুধ পেলে কোথায়? সব দুগ্ধবতী বকরি তো আমি চারণ ভূমিতে নিয়ে গেছি, ঘরে তো দুধ দেয়ার মতো বকরি ছিলো না। উম্মে মা'বাদ বললেন, আমাদের কাছে একজন বরকত সম্পন্ন মানুষ এসেছিলেন। তাঁর কথা ছিলো এমন এবং তাঁর অবস্থা ছিলো এমন। সব শুনে আবু মা'বাদ বললেন, এই তো মনে হয় সেই ব্যক্তি, যাকে কোরায়শরা খুঁজে বেড়াচ্ছে। আচ্ছা তুমি তার আকৃতি প্রকৃতি একটু বলো। উম্মে মা'বাদ অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিচয় বর্ণনা করলেন। সে বর্ণনা ভঙ্গি শুনে মনে হয় শ্রোতা যেন তাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। গ্রন্থের শেষ দিকে এইসব বিবরণ উল্লেখ করা হবে। আগন্তুকের ভূয়সী প্রশংসা শুনে সে বললো, আল্লাহর শপথ, এই হচ্ছে কোরায়শদের সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে লোকেরা নানা কথা বর্ণনা করেছে। আমার ইচ্ছা হচ্ছে তাঁর প্রিয় সঙ্গীদের একজন হবো। যদি কোন পথ পাই, তবে অবশ্যই এটা করবো।
এদিকে মক্কার বাতাসে কবিতার ছন্দে কিছু কথা ভেসে আসছিলো। যিনি কবিতা আবৃত্তি করছিলেন, তাকে দেখা যাচ্ছিলো না। কবিতার অর্থ নিম্নরূপঃ আল্লাহর পুরস্কার লাভ করুন সেই দু'জন, উম্মে মা'বাদের বাড়ীতে যারা করলেন পদার্পণ। ভালোয় ভালোয় থেমেছিলেন, যাত্রা করলেন, ফের সফলকাম হয়েছেন তিনি সঙ্গী, যিনি মোহাম্মদের। হায় কুসাই তোমাদের থেকে নযিরবিহীন সাফল্য এবং নেতৃত্ব নিলেন আল্লাহ কেড়ে। বনু কা'ব-এর সেই মহিলা, আহা কী যে ভাগ্যবান মোবারক হোক মোমেনীনের জন্যে সেই বাসস্থান। বকরির কথা পাত্রের কথা মহিলার কাছে জানতে চাও সেই বকরিও সাক্ষী দেবে, তোমরা বকরির কাছে যাও।
হযরত আসমা (রা.) বলেন আমাদের জানা ছিলো না যে, আল্লাহর রসূল কোনদিকে গেছেন। হঠাৎ একটি জিন মক্কায় এসে এসব কবিতা শোনালো। উৎসাহী জনতা সেই জিনকে পাচ্ছিলো না। তারা শব্দের পেছনে ছুটে যাচ্ছিলো। শব্দ শুনছিলো। এক সময় সেই শব্দ মক্কার উঁচু এলাকায় মিলিয়ে গেলো। সেই কবিতা শুনে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনদিকে গেছেন। স্পষ্টই বোঝা গেলো যে, তিনি মদীনার পথে রয়েছেন।
টিকাঃ
২২. সহীহ বোখারী ১ম খন্ড ৫৫৬
২৩. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৬
২৪. যাদুল মা'য়াদ, ২য় খন্ড পৃ. ৫৩-৫৪ বনু খোজাআ গোত্রের অবস্থানের কথা চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, এ ঘটনা প্রিয় নবী (সঃ)-এর মদীনা রওয়ানা হওয়ার দ্বিতীয় দিনে ঘটেছিলো।
📄 কোবায় অবস্থান
নবুয়তের চূর্তদশ বছরের ৮ই রবিউল আউয়াল অর্থাৎ ২৩শে সেপ্টেম্বর ৬২২ ঈসায়ী সালের সোমবার প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোবায় অবতরণ করেন।
হযরত ওরওয়া ইবনে যোবায়ের (রা.) বলেন, মদীনার মুসলমানরা মক্কা থেকে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওয়ানা হওয়ার খবর জেনেছিলেন এ কারণে মদীনার বাইরে হাররার নামক স্থানে এসে প্রতিদিন তারা অপেক্ষা করতেন। দুপুরের রোদ অসহ্য হয়ে উঠলে ফিরে যেতেন। একদিন এমনি করে দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর সবাই ঘরে ফিরে গেছেন। এ সময় একজন ইহুদী ব্যক্তিগত কাজে একটি টিলার উপর উঠেছিলো। হঠাৎ সে সাদা কাপড়ের তৈরী চাঁদোয়া লক্ষ্য করলো। আনন্দের আতিশয্যে সে চিৎকার করে বলতে লাগলো, শোনো মুসলমানরা, শোনো, তোমরা যার জন্যে প্রতিদিন অপেক্ষা করছিলে, তিনি আসছেন। একথা শোনা মাত্রই মুসলমানরা ছুটে এলো এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে বেরিয়ে পড়লো।
ইবনে কাইয়েম বলেন, ঘোষণার সাথে সাথে বনি আমর ইবনে আওফের মধ্যে শোরগোল পড়ে গেলো এবং তকবির ধ্বনি শোনা গেলো। মুসলমানরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের সম্বর্ধনার জন্যে বেরিয়ে পড়লো। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভ্যর্থনা জানালো এবং তাঁর চারপাশে ভিড় করতে লাগলো। সে সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন নীরব। তাঁর ওপর তখন কোরআনের এই আয়াত নাযিল হচ্ছিলো, 'কিন্তু তোমরা যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে একে অপরের পৃষ্ঠপোষকতা করো, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ তায়ালাই তার বন্ধু, জিবরাঈল ও সৎকর্মপরায়ন মোমেনরা, উপরন্তু অন্যান্য ফেরেশতারাও তাঁর সাহায্যকারী।' (সূরা তাহরীম, আয়াত ৪)
হযরত ওরওয়া ইবনে যোবায়ের (রা.) বলেন, লোকদের সাথে মিলিত হওয়ার পর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামতাদের সাথে ডানদিকে অগ্রসর হলেন এবং বনি আমর ইবনে আওফের বাড়ী অভিমুখে রওয়ানা হলেন। এ দিন ছিলো সোমবার, মাস ছিলো রবিউল আউয়াল। হযরত আবু বকর (রা.) আগন্তুকদের অভ্যর্থনার জন্যে দাঁড়িয়েছিলেন, আর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপচাপ বসেছিলেন।
আনসারদের মধ্যে যারা ইতিপূর্বে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেননি, তারা হযরত আবু বকর (রা.)-কে সালাম করছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গায়ের ওপর ঢলে পড়া সূর্যের কিরণ এসে পড়লে হযরত আবু বকর (রা.) একখানি চাদর দিয়ে তাঁকে ছায়া করে দাঁড়ালেন। এতে সবাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিনতে পারলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভ্যর্থনার জন্যে মদীনায় জনতার ঢল নামলো। এটি ছিলো এক ঐতিহাসিক দিন। মদীনার মাটি এ ধরনের দৃশ্য অতীতে কোনোদিন দেখেনি। ইহুদীরাও প্রতিশ্রুত নবীর আগমন প্রত্যক্ষ করলো। বাইবেলে উল্লেখ রয়েছে, আল্লাহ দক্ষিণ দিক থেকে তার আগমন ঘটাবেন এবং যিনি পবিত্র, তিনি 'ফারান' পর্বত থেকে আগমন করবেন। রসূল মদীনায় কুলসুম ইবনে হাদাম, মতান্তরে সায়াদ ইবনে খায়ছামার ঘরে অবস্থান করেন। তবে প্রথম তথ্যটি অধিক নির্ভরযোগ্য।
ইতিমধ্যে হযরত আলী (রা.) মক্কায় তিনদিন অবস্থান করে মানুষের আমানতসমূহ বুঝিয়ে দিয়ে মদীনায় আসেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোবায় মোট চারদিন। সোম, মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার অবস্থান করেন। কারো কারো মতে ১০ দিন, কারো কারো মতে রওয়ানা ও পথের কয়েকদিন ছাড়া কোবায় মোট ২৪ দিন অবস্থান করেন। এ সময়ে তিনি মসজিদে কোবার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন এবং সেই মসজিদে নামায আদায় করেন। নবুয়ত প্রাপ্তির পর এটি ছিলো প্রথম মসজিদ। তাকওয়ার ওপর এই মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিলো। পঞ্চম, দ্বাদশ বা ২৬তম দিনের শুক্রবারে তিনি আল্লাহর নির্দেশে সওয়ারীর ওপর আরোহন করেন। রওয়ানা হওয়ার আগে তিনি তাঁর মামার গোত্র বনু নাজ্জাহকে খবর পাঠালে তারা তলোয়ার সজ্জিত করে হাযির হলো। তিনি তাদের সাথে নিয়ে মদীনার পথে রওয়ানা হলেন। বনু সালেম ইবনে আওফের জনপদে পৌঁছার পর জুমার নামাযের সময় হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকালয়ে জুমার নামায আদায় করলেন। জুমার জামাতে একশ মুসল্লী হাযির হয়েছিলেন। এখনো সেখানে এ মসজিদ রয়েছে।
টিকাঃ
৩১. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৫
৩৩. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৫
৩৪ বাইবেল, হাবকুক অধ্যায়, পৃ. ৩
৩৫. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৪, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৯৩ রহমাতুল লিল আলামিন।
৩৬. এটা ইবনে ইসহাকের বর্ণনা। ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৯৪ দেখুন। এই বর্ণনাই আল্লামা মনসুরপুরী গ্রহণ করেছেন। রহমাতুল লিল আলামীন ১ম খন্ড, পৃ. ১০২ দেখুন। কিন্তু সহীহ বোখারীর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, প্রিয় রসূল সেখানে ২৪ রাত অবস্থান করেন। ১ম খন্ড পৃ. ৬১। অন্য এক বর্ণনায় ১০ রাতের চেয়ে কিছু বেশীর কথা রয়েছে। ১ম খন্ড পৃ. ৫৫৫। তৃতীয় এক বর্ণনায় ১৪ রাতের কথা রয়েছে। ১ম খন্ড পৃ. ৫৬০। ইবনে কাইয়েম শেষোক্ত বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ইবনে কাইয়েম ব্যাখ্যা করেছেন যে, প্রিয় নবী সোমবার কোবায় পৌছেছেন এবং শুক্রবার সেখান থেকে রওয়ানা হয়েছেন। যাদুল মা'য়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ৫৪-৫৫। সোমবার ও শুক্রবার যদি পৃথক দুই সপ্তাহের নেয়া হয় তবে পথের দিনগুলো ছাড়া মোট ১০ দিন হয়। পথের সময়সহ ১২