📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আল্লাহর রসূলের গৃহত্যাগ

📄 আল্লাহর রসূলের গৃহত্যাগ


কোরায়শ কাফেররা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতি এবং সর্বাত্মক চেষ্টা সত্তেও সফল হতে পারেনি। এমনি এক নাযুক পরিস্থিতিতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রা.)-কে বললেন, তুমি আমার এই সবুজ হাদরামি চাদর গায়ে দিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে থাকো। ওদের হাতে তোমার কোন ক্ষতি হবে না। প্রিয় নবী এই চাদর গায়ে দিয়ে রাতে ঘুমোতেন।
আল্লাহর রসূল এরপর বাইরে এলেন একমুঠো ধুলো নিয়ে কাফেরদের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। এতেই আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্ধ করে দিলেন। তারা আল্লাহর রসূলকে দেখতে পেলো না। সে সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাক কোরআনের এই আয়াত তেলওয়াত করছিলেন, 'আমি ওদের সামনে প্রাচীর ও পশ্চাতে প্রাচীর স্থাপন করছি এবং ওদেরকে আবৃত করেছি। ফলে ওরা দেখতে পায় না।' (সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৯)
প্রতিটি পৌত্তলিকের মাথায় নিক্ষিপ্ত ধুলি গিয়ে পড়লো। এরপর তিনি হযরত আবু বকরের বাড়ীতে গেলেন। সেই ঘরের একটি জানালা পথে বেরিয়ে উভয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে ইয়েমেনের পথে যাত্রা করলেন। রওয়ানা হওয়ার পর কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছুর পাহাড়ের একটি গুহায় তাঁরা যাত্রা বিরতি করলেন।

টিকাঃ
৬. দক্ষিণ ইয়েমেনের হাদরামাউতে নির্মিত চাদরকে হাদরামি চাদর বলা হয়।।
৭. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮২, ৪৮৩
৮. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৩, যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ৫২

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ঘর থেকে গারে ছুরে

📄 ঘর থেকে গারে ছুরে


প্রিয় রসূল ২৭ শে সফর মোতাবেক ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর ৬২২ ঈসায়ী সালের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ ১২ই সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে হিজরত করেন। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাথী হযরত আবু বকর (রা.)। তাঁরা সূর্যোদয়ের আগেই মক্কার সীমানা অতিক্রম করার উদ্দেশ্যে দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে চললেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন যে, কোরায়শ দুর্বৃত্তরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় তাঁকে খুঁজবে এবং স্বাভাবিকভাবে মদীনা অভিমুখী পথের দিকেই অগ্রসর হবে। এ কারণে প্রিয় নবী উল্টো দিকে ইয়েমেনের পথে অগ্রসর হলেন। মদীনার পথ হচ্ছে মক্কা থেকে উত্তর দিকে। আর ইয়েমেনের পথ দক্ষিণ দিকে। পাঁচ মাইল অতিক্রমের পর প্রিয় নবী একটি পাহাড়ের পাদদেশে পৌছুলেন, সেই পাহাড় 'ছুর পাহাড়' নামে পরিচিতি। একটি সুউচ্চ পাহাড়। এই পাহাড়ে ওঠা খুব কষ্টকর। এখানে বহু পাথর রয়েছে। সেই পাথর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরণযুগল রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিলো। বলা হয়ে থাকে যে, পায়ের ছাপ গোপন রাখার উদ্দেশ্যে তিনি পায়ের গোড়ালী দিয়ে হাঁটছিলেন। এ কারণে তাঁর পা জখম হয়ে যায়।
হযরত আবু বকর (রা.) প্রথমে পাহাড়ের কিছু অংশে উঠে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওপরে উঠতে সহায়তা করেন। এরপর উভয়ে পাহাড় চূড়ার একটি গুহায় আশ্রয় নেন। এই গুহা ইতিহাসে 'গারে ছুর' নামে বিখ্যাত।

টিকাঃ
১১. রহমতুল লিল আলমিন, ১ম খন্ড, পৃ. ৯৫, মুখতাছারুছ সিরাহ্ শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১৬৭৭, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮২

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ছুর পর্বতের গুহায়

📄 ছুর পর্বতের গুহায়


গুহার কাছে পৌঁছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবু বকর (রা.) বললেন, একটু অপেক্ষা করুন। গুহায় কোন কিছু থাকলে তার মোকাবেলা আমার সাথেই যা হবার হবে। এরপর তিনি গুহায় প্রবেশ করে তারা পরিষ্কার করলেন। কয়েকটি গর্ত ছিলো, যেগুলো তহবন্ধ ছিঁড়ে বন্ধ করলেন। দু'টি গর্ত বাকি ছিলো, সেগুলোতে পা চাপা দিয়ে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভেতরে আসার আহ্বান জানালেন। প্রিয় নবী ভেতরে গেলেন এবং আবু বকরের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। ইতিমধ্যে হযরত আবু বকর (রা.)-কে কিসে যেন দংশন করলো। কিন্তু প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে এ আশঙ্কায় তিনি নড়াচড়া করলেন না। বিষের কষ্টে তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠলো, বেখেয়ালে এক ফোটা অশ্রু প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারায় পড়তেই তিনি জেগে গেলেন। আবু বকর (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি হয়েছে? তিনি বললেন, কিসে যেন আমাকে দংশন করেছে।
এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খানিকটা থুথু নিয়ে দংশিত স্থলে লাগিয়ে দিলেন। সাথে সাথে বিষের যাতনা দূর হয়ে গেলো।
এখানে উভয়ে শুক্র, শনি ও রবিবার এ তিনদিন অবস্থান করেন। এ সময়ে হযরত আবু বকরের পুত্র আবদুল্লাহও একই সঙ্গে রাত্রি যাপন করেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আবদুল্লাহ ছিলো খুব বুদ্ধিমান যুবক। সে শেষ রাতে উভয়ের কাছ থেকে চলে আসতো কিন্তু মক্কায় তাকে সকাল বেলাই দেখা যেতো। যে কেউ দেখে ভাবতো, রাতে সে মক্কাতেই ছিলো। সারাদিন উভয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের যেসব কথা শুনতো, সন্ধ্যায় অন্ধকার ঘনিয়ে এলে সেসব খবর নিয়ে 'গারে ছুরে' চলে যেতো।
এদিকে হযরত আবু বকরের ক্রীতদাস আমের ইবনে যোহায়রা বকরি চরাতেন। রাতের আঁধার গভীর হলে তিনি বকরি নিয়ে তাদের কাছে যেতেন এবং দুধ দোহন করে দিতেন। উভয়ে তৃপ্তির সাথে দুধ পান করতেন। খুব ভোরে আমের বকরি নিয়ে রওয়ানা হতেন। তিন রাতেই তিনি এরূপ করেছিলেন। এছাড়া আমের ইবনে যোহায়রা আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকরের মক্কা যাওয়ার চিহ্ন সেই পথে বকরী তাড়িয়ে মুছে দিতেন।

টিকাঃ
১২. এই বক্তব্য ওমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করা হযেছে। এ বর্ণনায়, একথাও রয়েছে যে, পরবর্তী সময়ের সেই বিষের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং সেই বিষের প্রভাবেই তিনি ইন্তেকাল করেন। দেখুন, মেশকাত, ২য় খন্ড, পৃ, ৫৫৬, মানাকেরে আবু বকর শীর্ষক অধ্যায়।
১৩. ফতহুল বারী, ৭ম খন্ড, পৃ. ৩৩৬
১৪. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৩-৫৫৪
১৫. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৬

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 কোরায়শদের অভিযান

📄 কোরায়শদের অভিযান


কোরায়শদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা যখন পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছেন, তখন তারা যেন উন্মাদ হয়ে গেলো। প্রথমে তারা হযরত আলীর ওপর তাদের ক্রোধ প্রকাশ করলো। তাকে টেনে হিঁচড়ে কাবাঘরে নিয়ে গেলো এবং কথা আদায়ের চেষ্টা করলো। কিন্তু এতে কোন লাভ হলো না। এরপর তারা হযরত আবু বকরের বাড়ীতে গেলো। দরজা খুললেন হযরত আসমা বিনতে আবু বকর। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, তোমার আব্বা কোথায়? তিনি বললেন, আমি তো জানি না। এ জবাব শুনে দুর্বৃত্ত আবু জেহেল আসমাকে এতো জোরে চড় দিলো যে, তার কানের বালি খুলে পড়ে গেলো।
এরপর কোরায়শ নেতারা এক জরুরী বৈঠকে মিলিত হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আবু বকর (রা.)-কে গ্রেফতার করার জন্যে সর্বাত্মক অভিযান চালাতে হবে। মক্কা থেকে বাইরের দিকে যাওয়ার সকল পথে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করলো। সেই সাথে ঘোষণা করা হলো যে, যদি কেউ হযরত মোহাম্মদ এবং আবু বকর (রা.)-কে বা দু'জনের একজনকে জীবিত বা মৃত হাযির করতে পারে, তাকে একশত উট পুরস্কার দেয়া হবে। এ ঘোষণা সর্বসাধারণ্যে প্রচারিত হবার পর চারিদিকে বহু লোক বেরিয়ে পড়লো। পায়ের চিহ্ন বিশারদরাও উভয়কে তালাশ করতে লাগলো। পাহাড়ে প্রান্তরে ও উঁচু নীচু এলাকায় সর্বত্র চষে বেড়াতে লাগলো। কিন্তু এতো কিছু করেও কোন লাভ হলো না।
অনুসন্ধানকারীরা 'ছুর' পাহাড়ের গুহার কাছেও পৌঁছুলো। কিন্তু সারা দুনিয়ার বাদশাহ আল্লাহ তায়ালা নিজের ইচ্ছাকেই পূর্ণতা দান করেন। সহীহ বোখারীতে হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গুহায় ছিলাম, মাথা তুলতেই দেখি, লোকদের পা দেখা যাচ্ছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল, ওরা কেউ যদি একটুখানি নিচু হয়ে এদিকে তাকায়, তবেই আমাদের দেখতে পাবে। প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু বকর চুপ করো, আমরা এখানে দু'জন নই বরং আমাদের সাথে তৃতীয় হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আবু বকর এমন দুঃজন সম্পর্কে তোমার কি ধারণা, যাদের তৃতীয় হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা।
মোটকথা অনুসন্ধানকারীরা তখনই চলে গেলো, যখন আল্লাহর রসূল এবং দুর্বৃত্তদের মধে ব্যবধান ছিলো খুব কম— মাত্র কয়েক কদম।

টিকাঃ
১৬. রহমতুল লিল আলামীন ১ম খন্ড, পৃ. ৯৯
১৭. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৭
১৮. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৪
১৯. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫১৬-৫৫৮। এখানে স্মরণ রাখতে হবে যে, হযরত আবু বকরের অস্থিরতা নিজের জীবন রক্ষার জন্য ছিলো না। তিনি প্রিয় নবী (সঃ)-এর জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি দুর্বত্তদের পা দেখতে পাচ্ছিলেন, সে সময় তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন এবং বললেন, যদি আমি মারা যাই তবে একজন আবু বকর মারা যাবে। কিন্তু আপনি মারা গেলে সমগ্র উম্মত বরবাদ হয়ে যাবে। এ সময়ে রসূল বলেছিলেন, ভয় পেয়ো না, আবু বকর, আল্লাহ পাক আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।
২০. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৩-৫৫৫ ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00