📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আল্লাহর রসূলের বাসভবন ঘেরাও

📄 আল্লাহর রসূলের বাসভবন ঘেরাও


এদিকে কোরায়শদের নেতৃস্থানীয় অপরাধীরা মক্কার পার্লামেন্ট দারুন নোদওয়ায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী সারা দিনব্যাপী প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। জঘন্য অপরাধীদের মধ্যে থেকে এগারোজন সর্দারকে বাছাই করা হলো। এদের নাম হচ্ছে, ১) আবু জেহেল ইবনে হিশাম, ২) হাকাম ইবনে আস, ৩) ওকবা ইবনে আবি মুয়াইত, ৪) নযর ইবনে হারেছ, ৫) উমাইয়া ইবনে খালফ, ৬) জামআ ইবনে আসওয়াদ, ৭) তুয়াইমা ইবনে আদী, ৮) আবু লাহাব ৯) উবাই ইবনে খালফ, ১০) নুবাইহ ইবনে হাজ্জাজ, ১১) মুনাব্বাহ ইবনে হাজ্জাজ।
ইবনে ইসহাক বলেন, রাতের আঁধার ঘন হয়ে এলে এগারোজন দুর্বৃত্ত নবী (সাঃ)-এর বাসভবনের চারিদিকে ওঁৎ পেতে রইলো। তারা অপেক্ষা করছিলো যে, তিনি শুয়ে পড়লে একযোগে হামলা করবে।
দুর্বৃত্তরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেছিলো যে, তাদের এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র অবশ্যই সফল হবে। আবু জেহেল তার সঙ্গীদের সঙ্গে ঠাট্টা মস্কারা করে বলছিলো, মোহাম্মদ বলে যে, তোমরা যদি তার ধর্ম মতে দীক্ষা নিয়ে তার অনুসরণ করো, তবে আরব অনারবের বাদশাহ হবে। এরপর মৃত্যুশেষে পুনরুজ্জীবিত হলে তোমাদের জন্যে জর্দানের বাগানের মতো জান্নাত থাকবে। যদি তোমরা তাকে না মারো, তবে তারা তোমাদের যবাই করবে এবং মত্যুর পর পুরুজ্জীবিত হলে তোমাদের আগুনে পোড়ানো হবে।
ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছিলো রাত বারোটার পর। এ কারণে নির্ঘুম চোখে নির্ধারিত সময়ের প্রতীক্ষায় তারা অপেক্ষা করছিলো। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইচ্ছাই সফল করে থাকেন। তিনি আসমান যমীনের বাদশাহ। তিনি যা চান তাই করেন। তিনি যাকে বাঁচাতে চান, কেউ তার ক্ষতি করতে পারে না। যাকে পাকড়াও করতে চান কেউ তাকে বাঁচাতে পারে না। এই সময়েও আল্লাহ তায়ালা যা ইচ্ছা করেছিলেন, তা-ই করলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে তিনি বলেন, 'স্মরণ কর, কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বন্দী করার জন্যে, হত্যা করার জন্যে, নির্বাসিত করার জন্যে তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল করেন। আর আল্লাহই কৌশলীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। (সূরা আনফাল, আয়াত ৩০)

টিকাঃ
৩. যাদুল মায়াদ, ১ম খন্ড, পৃ. ৫২
৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮২
৫. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৩

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আল্লাহর রসূলের গৃহত্যাগ

📄 আল্লাহর রসূলের গৃহত্যাগ


কোরায়শ কাফেররা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতি এবং সর্বাত্মক চেষ্টা সত্তেও সফল হতে পারেনি। এমনি এক নাযুক পরিস্থিতিতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রা.)-কে বললেন, তুমি আমার এই সবুজ হাদরামি চাদর গায়ে দিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে থাকো। ওদের হাতে তোমার কোন ক্ষতি হবে না। প্রিয় নবী এই চাদর গায়ে দিয়ে রাতে ঘুমোতেন।
আল্লাহর রসূল এরপর বাইরে এলেন একমুঠো ধুলো নিয়ে কাফেরদের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। এতেই আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্ধ করে দিলেন। তারা আল্লাহর রসূলকে দেখতে পেলো না। সে সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাক কোরআনের এই আয়াত তেলওয়াত করছিলেন, 'আমি ওদের সামনে প্রাচীর ও পশ্চাতে প্রাচীর স্থাপন করছি এবং ওদেরকে আবৃত করেছি। ফলে ওরা দেখতে পায় না।' (সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৯)
প্রতিটি পৌত্তলিকের মাথায় নিক্ষিপ্ত ধুলি গিয়ে পড়লো। এরপর তিনি হযরত আবু বকরের বাড়ীতে গেলেন। সেই ঘরের একটি জানালা পথে বেরিয়ে উভয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে ইয়েমেনের পথে যাত্রা করলেন। রওয়ানা হওয়ার পর কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছুর পাহাড়ের একটি গুহায় তাঁরা যাত্রা বিরতি করলেন।

টিকাঃ
৬. দক্ষিণ ইয়েমেনের হাদরামাউতে নির্মিত চাদরকে হাদরামি চাদর বলা হয়।।
৭. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮২, ৪৮৩
৮. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৩, যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ৫২

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ঘর থেকে গারে ছুরে

📄 ঘর থেকে গারে ছুরে


প্রিয় রসূল ২৭ শে সফর মোতাবেক ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর ৬২২ ঈসায়ী সালের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ ১২ই সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে হিজরত করেন। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাথী হযরত আবু বকর (রা.)। তাঁরা সূর্যোদয়ের আগেই মক্কার সীমানা অতিক্রম করার উদ্দেশ্যে দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে চললেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন যে, কোরায়শ দুর্বৃত্তরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় তাঁকে খুঁজবে এবং স্বাভাবিকভাবে মদীনা অভিমুখী পথের দিকেই অগ্রসর হবে। এ কারণে প্রিয় নবী উল্টো দিকে ইয়েমেনের পথে অগ্রসর হলেন। মদীনার পথ হচ্ছে মক্কা থেকে উত্তর দিকে। আর ইয়েমেনের পথ দক্ষিণ দিকে। পাঁচ মাইল অতিক্রমের পর প্রিয় নবী একটি পাহাড়ের পাদদেশে পৌছুলেন, সেই পাহাড় 'ছুর পাহাড়' নামে পরিচিতি। একটি সুউচ্চ পাহাড়। এই পাহাড়ে ওঠা খুব কষ্টকর। এখানে বহু পাথর রয়েছে। সেই পাথর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরণযুগল রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিলো। বলা হয়ে থাকে যে, পায়ের ছাপ গোপন রাখার উদ্দেশ্যে তিনি পায়ের গোড়ালী দিয়ে হাঁটছিলেন। এ কারণে তাঁর পা জখম হয়ে যায়।
হযরত আবু বকর (রা.) প্রথমে পাহাড়ের কিছু অংশে উঠে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওপরে উঠতে সহায়তা করেন। এরপর উভয়ে পাহাড় চূড়ার একটি গুহায় আশ্রয় নেন। এই গুহা ইতিহাসে 'গারে ছুর' নামে বিখ্যাত।

টিকাঃ
১১. রহমতুল লিল আলমিন, ১ম খন্ড, পৃ. ৯৫, মুখতাছারুছ সিরাহ্ শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১৬৭৭, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮২

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ছুর পর্বতের গুহায়

📄 ছুর পর্বতের গুহায়


গুহার কাছে পৌঁছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবু বকর (রা.) বললেন, একটু অপেক্ষা করুন। গুহায় কোন কিছু থাকলে তার মোকাবেলা আমার সাথেই যা হবার হবে। এরপর তিনি গুহায় প্রবেশ করে তারা পরিষ্কার করলেন। কয়েকটি গর্ত ছিলো, যেগুলো তহবন্ধ ছিঁড়ে বন্ধ করলেন। দু'টি গর্ত বাকি ছিলো, সেগুলোতে পা চাপা দিয়ে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভেতরে আসার আহ্বান জানালেন। প্রিয় নবী ভেতরে গেলেন এবং আবু বকরের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। ইতিমধ্যে হযরত আবু বকর (রা.)-কে কিসে যেন দংশন করলো। কিন্তু প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে এ আশঙ্কায় তিনি নড়াচড়া করলেন না। বিষের কষ্টে তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠলো, বেখেয়ালে এক ফোটা অশ্রু প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারায় পড়তেই তিনি জেগে গেলেন। আবু বকর (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি হয়েছে? তিনি বললেন, কিসে যেন আমাকে দংশন করেছে।
এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খানিকটা থুথু নিয়ে দংশিত স্থলে লাগিয়ে দিলেন। সাথে সাথে বিষের যাতনা দূর হয়ে গেলো।
এখানে উভয়ে শুক্র, শনি ও রবিবার এ তিনদিন অবস্থান করেন। এ সময়ে হযরত আবু বকরের পুত্র আবদুল্লাহও একই সঙ্গে রাত্রি যাপন করেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আবদুল্লাহ ছিলো খুব বুদ্ধিমান যুবক। সে শেষ রাতে উভয়ের কাছ থেকে চলে আসতো কিন্তু মক্কায় তাকে সকাল বেলাই দেখা যেতো। যে কেউ দেখে ভাবতো, রাতে সে মক্কাতেই ছিলো। সারাদিন উভয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের যেসব কথা শুনতো, সন্ধ্যায় অন্ধকার ঘনিয়ে এলে সেসব খবর নিয়ে 'গারে ছুরে' চলে যেতো।
এদিকে হযরত আবু বকরের ক্রীতদাস আমের ইবনে যোহায়রা বকরি চরাতেন। রাতের আঁধার গভীর হলে তিনি বকরি নিয়ে তাদের কাছে যেতেন এবং দুধ দোহন করে দিতেন। উভয়ে তৃপ্তির সাথে দুধ পান করতেন। খুব ভোরে আমের বকরি নিয়ে রওয়ানা হতেন। তিন রাতেই তিনি এরূপ করেছিলেন। এছাড়া আমের ইবনে যোহায়রা আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকরের মক্কা যাওয়ার চিহ্ন সেই পথে বকরী তাড়িয়ে মুছে দিতেন।

টিকাঃ
১২. এই বক্তব্য ওমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করা হযেছে। এ বর্ণনায়, একথাও রয়েছে যে, পরবর্তী সময়ের সেই বিষের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং সেই বিষের প্রভাবেই তিনি ইন্তেকাল করেন। দেখুন, মেশকাত, ২য় খন্ড, পৃ, ৫৫৬, মানাকেরে আবু বকর শীর্ষক অধ্যায়।
১৩. ফতহুল বারী, ৭ম খন্ড, পৃ. ৩৩৬
১৪. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৩-৫৫৪
১৫. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00