📄 আল্লাহর রসূলকে হত্যা করার নীল-নকশা
কোরায়শ নেতাদের উল্লিখিত উভয় আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের আক্রোশ বেড়ে গেলো। অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়লো। সে সময় কোরায়শ নেতাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের মধ্যে আরো নতুন মাত্রা যোগ হলো। তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার প্রস্তাব করলো। কিন্তু সেই সময়ে দুই বিশিষ্ট কোরায়শ নেতা হযরত হামযা (রা.) এবং হযরত ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ ইসলামের শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিবর্তে বরং এই দুই বীর কেশরী আল্লাহর রসূলের কাছে আত্মসমর্পণ করে ইসলামেরই শক্তি বাড়িয়ে দেন।
আল্লাহর রসূলের প্রতি পৌত্তলিকদের অত্যাচার নির্যাতনের দুটি উদাহরণ পেশ করছি।
একদিন আবু লাহাবের পুত্র ওতাইবা রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললো, 'ওয়াননাজমে ইযা হাওয়া এবং ছুম্মা দানা ফাতাদাল্লার' সাথে আমি কুফর করছি। সূরা নাজম-এর এ দুটি আয়াতের অর্থ হচ্ছে, 'শপথ নক্ষত্রের, যখন তা অস্তমিত হয়। অতপর, সে তার নিকটবর্তী হলো অতি নিকটবর্তী।' এরপর ওতাইবা আল্লাহর রসূলের ওপর অত্যাচার শুরু করলো। তাঁর জামা ছিঁড়ে দিলো এবং পবিত্র চেহারা লক্ষ্য করে থুথু নিক্ষেপ করলো। কিন্তু থুথু তাঁর চেহারায় পড়েনি। সে সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বদদোয়া দিলেন। তিনি বলেছিলেন,' হে আল্লাহ তায়ালা, ওর ওপর তোমার কুকুরসমূহের মধ্যে থেকে একটি কুকুর লেলিয়ে দাও।' রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বদদোয়া কবুল হয়েছিলো। ওতবা একবার কোরায়শ বংশের কয়েকজন লোকের সাথে এক সফরে সিরিয়া যাচ্ছিলো। যারকা নামক জায়গায় তারা একদা রাত্রি যাপনের জন্যে তাঁবু স্থাপন করলো। সে সময় একটি বাঘকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলো। ওতাইবা বাঘ দেখে বললো, হায়রে, আমার ধ্বংস অনিবার্য খোদার কসম, এই বাঘ আমাকে খাবে। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ওপর বদদোয়া করেছেন। দেখো আমি সিরিয়ায় রয়েছি, অথচ তিনি মক্কায় বসে আমাকে মেরে ফেলছেন। সতর্কতা হিসাবে সফরসঙ্গীরা তখন ওতাইবাকে নিজেদের মাঝখানে রেখে শয়ন করলো। রাত্রিকালে বাঘ এলো, সবাইকে ডিঙ্গিয়ে ওতাইবার কাছে গেলো এবং তার ঘাড় মটকালো।
ওকবা ইবনে আবু মুঈত ছিলো একজন প্রখ্যাত পৌত্তলিক। একবার এই দুর্বৃত্ত নামাযে সেজদা দেয়ার সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘাড় এতো জোরে পেঁচিয়ে ধরলো, মনে হচ্ছিলো যেন, তাঁর চোখ বেরিয়ে যাবে।
ইবনে ইসহাকের একটি দীর্ঘ বর্ণনায় কোরায়শদের চক্রান্ত সম্পর্কে জানা যায়। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যে ক্রমাগত চক্রান্ত করছিলো। উক্ত বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, একবার আবু জেহেল বলেছিলো, হে কোরায়শ ভাইয়েরা, আপনারা লক্ষ্য করছেন যে, মোহাম্মদ আমাদের ধর্মের সমালোচনা এবং আমাদের উপাস্যদের নিন্দা থেকে বিরত হচ্ছে না। আমাদের পিতা পিতামহকে অবিরাম গালমন্দ দিয়েই চলেছে। এ কারণে আমি আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করছি যে, আমি একটি ভারি পাথর নিয়ে বসে থাকবো, মোহাম্মদ যখন সেজদায় যাবে, তখন সেই পাথর দিয়ে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবো। এরপর যে কোন পরিস্থিতির জন্যে আমি প্রস্তুত। ইচ্ছে হলে আপনারা আমাকে বান্ধবহীন অবস্থায় রাখবেন অথবা আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন। এরপর বনু আবদে মান্নাফ আমার সাথে যেরূপ ইচ্ছা ব্যবহার করবে, এতে আমার কোন পরোয়া নেই। কোরায়শরা এ প্রস্তাব শোনার পর বললো, কোন অবস্থায়ই আমরা তোমাকে বান্ধবহীন অবস্থায় ফেলে রাখবো না। তুমি যা করতে চাও, করতে পারো।
সকালে আবু জেহেল একটি ভারি পাথর নিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অপেক্ষায় বসে থাকলো। কোরায়শরা একে একে সমবেত হয়ে আবু জেহেলের কর্মতৎপরতা দেখতে উৎকণ্ঠিত হয়ে রইলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যথারীতি হাযির হয়ে নামায আদায় করতে শুরু করলেন। তিনি যখন সেজদায় গেলেন তখন আবু জেহেল পাথর নিয়ে অগ্রসর হলো। কিন্তু পরক্ষণে ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় ফিরে এলো, এবং তার হাত পাথরের সাথে যেন আটকেই রইলো। কোরায়শের কয়েকজন লোক তার কাছে এসে বললো, আবুল হাকাম তোমার কী হয়েছে? সে বললো, আমি যে কথা রাতে বলেছিলাম, সেটা করতে যাচ্ছিলাম কিন্তু কাছাকাছি পৌছুতেই দেখতে পেলাম, মোহাম্মদ এবং আমার মাঝখানে একট উট এসে দাঁড়িয়েছে। খোদার কসম আমি কখনো অতো বড়, অতো লম্বা ঘাড় ও দাঁত বিশিষ্ট উট দেখিনি। উটটি আমার ওপর হামলা করতে চাচ্ছিলো।
ইবনে ইসহাক বলেন, আমাকে জানানো হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, উটের ছদ্মবেশে তিনি ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আ.)। আবু জেহেল যদি কাছে আসতো তবে তাকে পাকড়াও করা হতো।
এরপর আবু জেহেল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এমন ব্যবহার করছিলো যে, সেটা দেখে হযরত হামযা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। সে সম্পর্কে কিছুক্ষণ পরে আলোচনা করা হবে।
কোরায়শের অন্যান্য দুর্বৃত্তরাও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছিলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, একবার পৌত্তলিকরা কা'বার সামনে বসেছিলো। আমিও সেখানে ছিলাম। তারা আল্লাহর রসূলের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বললো, এই লোকটি সম্পর্কে আমরা যেরূপ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি তার উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে তার ব্যাপারে আমরা অতুলনীয় ধৈর্যধারণ করেছি। এ আলোচনা চলার সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত হলেন। তিনি প্রথমে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন এরপর কাবাঘর তওয়াফ করার সময়ে পৌত্তলিকদের পাশ দিয়ে গেলেন। তারা খারাপ কথা বলে তাঁকে অপমান করলো, আল্লাহর রসূলের চেহারায় সে অপমানের ছাপ ফুটে উঠলো। তওয়াফের মধ্যে পুনরায় তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে তারা পুনরায় একইভাবে অপমানজনক কথা বললো। সে অপমানের প্রভাব আমি তাঁর চেহারায় লক্ষ্য করলাম। তৃতীয়বারও একই রকম ঘটনা ঘটলো। এবার আল্লাহর রসূলের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, কোরায়শের লোকেরা শোনো, সেই আল্লাহর শপথ, তাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, আমি তোমাদের কাছে কোরবানীর পশু নিয়ে এসেছি।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একথায় কোরায়শরা দারুণ প্রভাবিত হলো। তারা সবাই নীরব হয়ে গেলো। কঠোর প্রাণের লোকেরাও তাঁর প্রতি নম্র নরম ভাষা ব্যবহার করতে লাগলো। তারা বলছিলো, আবুল কাসেম, আপনি ফিরে যান। আল্লাহর শপথ, আপনি তো কখনো নির্বোধ ছিলেন না।
পরদিনও কোরায়শরা একইভাবে সমবেত হয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রসঙ্গ আলোচনা করছিলো। এমন সময় তিনি এলেন, তিনি কাছে আসতেই তারা একযোগে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। একজন তাঁর চাদর গলায় জড়িয়ে শ্বাসরোধ করতে চাচ্ছিলো। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁকে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, তোমরা কি এমন একজন মানুষকে হত্যা করছো, যিনি বলেন যে, আমার প্রভু আল্লাহ? দুর্বৃত্তরা এরপর তাঁকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন, কোরায়শদের অত্যাচারের ঘটনাসমূহের মধ্যে আমার দেখা এ ঘটনাটি ছিলো সবচেয়ে মারাত্মক।
টিকাঃ
৫৫. মুখতাছারুছ সিয়ার, শেখ আবদুল্লাহ পৃ. ১৩৫, ১ম খন্ড, এস্তিয়ার, এছাবা দালায়েলুন নবুয়ত। আর ফওযুল আনফ
৫৬. ঐ, মুখতাছারুছ সিয়ার, পৃ. ১১৩
৫৭. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৯৮-২৯৯
৫৮. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৮৯-২৯০
৫৯. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪৪
৬০. মুখতাছারুস সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১১৩
📄 আল্লাহর রসূলের হিজরত
রসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার জঘন্য প্রস্তাব পাশ হওয়ার পর হযরত জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হন। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোরায়শদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত করে বলেন যে, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে মক্কা থেকে হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন। হিজরত করার সময় জানিয়ে হযরত জিবরাঈল (আ.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, আপনি আজ রাত আপনার বাসভবনের বিছানায় শয়ন করবেন না।
এ খবর পাওয়ার পর নবী ঠিক দুপুরের সময় হযরত আবু বকর (রা.)-এর বাড়ীতে গেলেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে হিজরতের পরিকল্পনা তৈরী করাই ছিলো তাঁর উদ্দেশ্য। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, ঠিক দুপুরের সময় আমরা আবু বকর (রা.)-এর ঘরে বসেছিলাম, এমন সময় একজন আবু বকরকে বললেন, আল্লাহর নবী মাথা ঢেকে এদিকে আসছেন। এই সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো আসতেন না। আবু বকর (রা.) এ খবর শুনে বললেন, আমার মা- বাবা তাঁর জন্যে কোরবান হউন। নিশ্চয়ই তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজে এসেছেন।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, প্রিয় নবী এলে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। অনুমতি দেয়া হলে তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন। এরপর আবু বকর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, তোমার কাছে যারা রয়েছে, তাদের সরিয়ে দাও। আবু বকর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, শুধু আপনার স্ত্রী রয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাকে রওয়ানা হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আবু বকর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, সঙ্গে আমি? হে রসূল, আপনার ওপর আমার মা-বাবা কোরবান হউন, হে আল্লাহর রসূল। প্রিয় রসূল বললেন, হাঁ।
এরপর হিজরতের কর্মসূচী তৈরী করে তিনি নিজের ঘরে ফিরে রাত্রির অপেক্ষা করতে লাগলেন।
টিকাঃ
৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮০-৪৮২
৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, ৪৮২, যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ৫২
১. যাদুল মায়াদ, ১ম খন্ড,
২. সহীহ বোখারী হিযরতে নবী অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৩
📄 আল্লাহর রসূলের বাসভবন ঘেরাও
এদিকে কোরায়শদের নেতৃস্থানীয় অপরাধীরা মক্কার পার্লামেন্ট দারুন নোদওয়ায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী সারা দিনব্যাপী প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। জঘন্য অপরাধীদের মধ্যে থেকে এগারোজন সর্দারকে বাছাই করা হলো। এদের নাম হচ্ছে, ১) আবু জেহেল ইবনে হিশাম, ২) হাকাম ইবনে আস, ৩) ওকবা ইবনে আবি মুয়াইত, ৪) নযর ইবনে হারেছ, ৫) উমাইয়া ইবনে খালফ, ৬) জামআ ইবনে আসওয়াদ, ৭) তুয়াইমা ইবনে আদী, ৮) আবু লাহাব ৯) উবাই ইবনে খালফ, ১০) নুবাইহ ইবনে হাজ্জাজ, ১১) মুনাব্বাহ ইবনে হাজ্জাজ।
ইবনে ইসহাক বলেন, রাতের আঁধার ঘন হয়ে এলে এগারোজন দুর্বৃত্ত নবী (সাঃ)-এর বাসভবনের চারিদিকে ওঁৎ পেতে রইলো। তারা অপেক্ষা করছিলো যে, তিনি শুয়ে পড়লে একযোগে হামলা করবে।
দুর্বৃত্তরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেছিলো যে, তাদের এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র অবশ্যই সফল হবে। আবু জেহেল তার সঙ্গীদের সঙ্গে ঠাট্টা মস্কারা করে বলছিলো, মোহাম্মদ বলে যে, তোমরা যদি তার ধর্ম মতে দীক্ষা নিয়ে তার অনুসরণ করো, তবে আরব অনারবের বাদশাহ হবে। এরপর মৃত্যুশেষে পুনরুজ্জীবিত হলে তোমাদের জন্যে জর্দানের বাগানের মতো জান্নাত থাকবে। যদি তোমরা তাকে না মারো, তবে তারা তোমাদের যবাই করবে এবং মত্যুর পর পুরুজ্জীবিত হলে তোমাদের আগুনে পোড়ানো হবে।
ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছিলো রাত বারোটার পর। এ কারণে নির্ঘুম চোখে নির্ধারিত সময়ের প্রতীক্ষায় তারা অপেক্ষা করছিলো। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইচ্ছাই সফল করে থাকেন। তিনি আসমান যমীনের বাদশাহ। তিনি যা চান তাই করেন। তিনি যাকে বাঁচাতে চান, কেউ তার ক্ষতি করতে পারে না। যাকে পাকড়াও করতে চান কেউ তাকে বাঁচাতে পারে না। এই সময়েও আল্লাহ তায়ালা যা ইচ্ছা করেছিলেন, তা-ই করলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে তিনি বলেন, 'স্মরণ কর, কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বন্দী করার জন্যে, হত্যা করার জন্যে, নির্বাসিত করার জন্যে তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল করেন। আর আল্লাহই কৌশলীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। (সূরা আনফাল, আয়াত ৩০)
টিকাঃ
৩. যাদুল মায়াদ, ১ম খন্ড, পৃ. ৫২
৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮২
৫. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৩
📄 আল্লাহর রসূলের গৃহত্যাগ
কোরায়শ কাফেররা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতি এবং সর্বাত্মক চেষ্টা সত্তেও সফল হতে পারেনি। এমনি এক নাযুক পরিস্থিতিতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রা.)-কে বললেন, তুমি আমার এই সবুজ হাদরামি চাদর গায়ে দিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে থাকো। ওদের হাতে তোমার কোন ক্ষতি হবে না। প্রিয় নবী এই চাদর গায়ে দিয়ে রাতে ঘুমোতেন।
আল্লাহর রসূল এরপর বাইরে এলেন একমুঠো ধুলো নিয়ে কাফেরদের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। এতেই আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্ধ করে দিলেন। তারা আল্লাহর রসূলকে দেখতে পেলো না। সে সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাক কোরআনের এই আয়াত তেলওয়াত করছিলেন, 'আমি ওদের সামনে প্রাচীর ও পশ্চাতে প্রাচীর স্থাপন করছি এবং ওদেরকে আবৃত করেছি। ফলে ওরা দেখতে পায় না।' (সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৯)
প্রতিটি পৌত্তলিকের মাথায় নিক্ষিপ্ত ধুলি গিয়ে পড়লো। এরপর তিনি হযরত আবু বকরের বাড়ীতে গেলেন। সেই ঘরের একটি জানালা পথে বেরিয়ে উভয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে ইয়েমেনের পথে যাত্রা করলেন। রওয়ানা হওয়ার পর কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছুর পাহাড়ের একটি গুহায় তাঁরা যাত্রা বিরতি করলেন।
টিকাঃ
৬. দক্ষিণ ইয়েমেনের হাদরামাউতে নির্মিত চাদরকে হাদরামি চাদর বলা হয়।।
৭. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮২, ৪৮৩
৮. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮৩, যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ৫২