📄 হিজরতকারী মুসলমানদের শংকিত প্রতিনিধি দল
দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে ইসলাম, কুফুরী ও মূর্খতার অন্ধকারের মধ্যে নিজের জন্যে একটি আবাসভূমির বুনিয়াদ রাখতে সক্ষম হলো। দাওয়াতের শুরু থেকে এটা ছিলো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের অনুমতি দিলেন, তারা যেন নিজেদের নতুন দেশে হিজরত করে চলে যায়।
হিজরত অর্থ হচ্ছে সব কিছু পরিত্যাগ করে শুধু প্রাণ রক্ষার জন্যে কোথাও চলে যাওয়া। তবে এই প্রাণও শঙ্কামুক্ত নয়। যাত্রা শুরু থেকে গন্তব্যে পৌঁছা পর্যন্ত যে কোন জায়গায় এই প্রাণ সংহার হয়ে যেতে পারে। যাত্রা শুরু হচ্ছে এক অস্পষ্ট ও অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে। ভবিষ্যতে কি ধরনের বিপদ মুসবিতের সম্মুখীন হতে হবে, সে সম্পর্কে আগে ভাগে কিছুই বলা যায় না।
এসব কিছু জেনে বুঝেই মুসলমানরা হিজরত শুরু করেন। এদিকে পৌত্তলিকরা মুসলমানদের যাত্রা পথে বাধা সৃষ্টি করতে লাগলো। কারণ পৌত্তলিকরা বুঝতে পেরেছিলো যে, মুসলমানদের হিজরতের পর ভবিষ্যতে তাদের জন্যে অনেক আশঙ্কা ও বিপদ দেখা দেবে। নীচে হিজরতের কায়েকটি নমুনা উল্লেখ করা যাচ্ছে।
এক) প্রথম মোহাজের ছিলেন হযরত আবু সালমা (রা.)। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবার এক বছর আগে তিনি হিজরত করেন। স্ত্রী এবং সন্তানরাও তার সাথে ছিলেন। তিনি রওয়ানা হতে শুরু করলে তাঁর শ্বশুরালয়ের লোকেরা বললো, আপনার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আমাদের চেয়ে আপনার বেশী রয়েছে। কিন্তু আমাদের মেয়ের কি হবে? আপনি তাকে শহরে শহরে ঘোরাবেন এটা জানার পরও কিভাবে তাকে আপনার সাথে যেতে দিতে পারি? সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়। আবু সালমার স্ত্রীকে তার মা-বাবা রেখে দিলেন। এ খবর পাওয়ার পর আবু সালমার মা-বাবা ক্ষেপে গেলেন। তারা নিজেদের পৌত্রকে কেড়ে নিয়ে এলেন। দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এক ধাত্রীর কাছে প্রতিপালনের জন্যে দেয়া হলো। এর আগে এক জায়গায় শিশুকে উভয় পক্ষ টানাটানি করায় শিশুর হাতে ব্যথা পেলো। মোটকথা হযরত আবু সালমা (রা.) একা মদীনায় চলে গেলেন। এদিকে স্বামী সন্তান ছেড়ে উম্মে সালমা পাগলিনীর মত হয়ে গেলেন। যেখানে তাঁর স্বামী বিদায় নিয়েছিলেন এবং তাঁর সন্তানকে কেড়ে নেয়া হয়েছিলো, সেই জায়গার নাম ছিলো আবত্তাহ। প্রতিদিন সকালে তিনি আবত্তাহ যেতেন এবং সারাদিন বিলাপ করতেন। এভাবে এক বছর কেটে গেলো। অবশেষে উম্মে সালমার একজন আত্মীয় উম্মে সালমার মা-বাবাকে বললো, বেচারীকে কেন আপনারা স্বামীর কাছে যেতে দিচ্ছেন না? এরপর তার মা-বাবা তাকে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে স্বামীর কাছে যেতে পারো। উম্মে সালমা তখন শ্বশুরালয়ে গিয়ে সন্তানকে ধাত্রীর কাছ থেকে নিয়ে নিলেন এবং একাকী সন্তানসহ মদীনা রওয়ানা হলেন। মক্কা থেকে মদীনাব দূরত্ব প্রায় পাঁচশত কিলোমিটার। তানঈম নামক জায়গায় পৌঁছার পর ওসমান ইবনে আবু তালহার সাথে দেখা হলো। উম্মে সালমা তাকে সব কথা খুলে বললেন। সব শুনে ওসমান তাকে সঙ্গে নিয়ে মদীনায় রওয়ানা হলেন। কোবার জনপদ দূর থেকে দেখে বললেন, এ জনপদে তোমার স্বামী রয়েছে, তুমি সেখানে চলে যাও। আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন। এরপর ওসমান মক্কায় ফিরে এলেন।
দুই) হযরত সোহায়ব (রা.) মদীনায় হিজরত করার ইচ্ছা করলে কোরায়শ পৌত্তলিকরা বললো, তুমি আমাদের কাছে যখন এসেছিলে, তখন তুমি ছিলে নিসঙ্গ কাঙ্গাল। এখানে আসার পর তোমার অনেক ধন-সম্পদ হয়েছে। তুমি অনেক উন্নতি করেছ। এখন তুমি সেসব নিয়ে এখান থেকে কেটে পড়তে চাও? সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়। হযরত সোহায়েব বললেন, আমি যদি ধন-সম্পদ সব ছেড়ে যাই তবে কি তোমরা আমাকে যেতে দেবে? তারা বললো, হাঁ, দেবো। হযরত সোহায়েব বললেন, ঠিক আছে, তাই হোক। সব কিছু তোমাদের কাছে রেখে গেলাম। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ খবর পাওয়ার পর মন্তব্য করলেন, সোহায়েব লাভবান হয়েছে, সোহায়ের লাভবান হয়েছে।
তিন) হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব, আইয়াশ ইবনে আবি রবিয়া এবং হিশাম ইবনে আস ইবনে ওয়ায়েল পরস্পর আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, অমুক জায়গায় সকাল বেলা একত্রিত হয়ে সেখান থেকে মদীনায় হিজরত করবেন। এরপর হযরত ওমর এবং আইয়াশ নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছুতে সক্ষম হলেন কিন্তু হিশাম পৌঁছুতে পারলেন না, তাকে বন্দী করে রাখা হলো।
উল্লিখিত দু'জন হিজরত করে কোবায় পৌছার পর আইয়াশের কাছে আবু জেহেল এবং তার ভাই হারেস পৌঁছুলো। তিনজন ছিলেন এক মায়ের সন্তান। উভয় ভাই আইয়াশকে বললো, মা প্রতিজ্ঞা করেছে যে, তোমাকে না দেখা পর্যন্ত মাথার চুল আঁচড়াবে না, রোদ থেকে ছায়ায় যাবে না। একথা শুনে মায়ের জন্যে আইয়াশের মন কেঁদে উঠলো। হযরত ওমর (রা.) এ অবস্থা দেখে আইয়াশকে বললেন, শোনো আইয়াশ, ওরা তোমাকে তোমার দ্বীনের ব্যাপারে একটা ফেতনায় ফেলতে চায়, কাজেই তুমি সাবধান হও। খোদার কসম, তোমার মায়ের মাথায় যখন উকুন কামড়াবে, তখন তিনি নিশ্চয়ই মাথায় চিরুনি দেবেন, মক্কার কড়া রোদ অসহ্য হলে তিনি ঠিকই ছায়ায় যাবেন। কিন্তু আইয়াশ সেকথা কানে তুললেন না। তিনি মায়ের কসম পুরো করার জন্যে ভাইদের সাথে মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। হযরত ওমর (রা.) বললেন, যেতেই যখন চাও, আমার এ উটনী নিয়ে যাও। এর পিঠ থেকে নামবে না। মায়ের সাথে দেখা দিয়েই চলে আসবে। যদি সন্দেহজনক কোন আচরণ দেখো দ্রুত মদীনায় ফিরে আসবে।
আইয়াশ উটনীর পিঠে চড়ে দুই ভাইয়ের সাথে মক্কা অভিমুখে ফিরে চললেন। কিছুদূর যাওয়ার পর আবু জেহেল আইয়াশকে বললো, ভাই, আমার উট খুব ধীরে চলে, তোমার উটনীটা কিছুক্ষণের জন্যে বদল করবো। আইয়াশ উটনী বসানোর সাথে সাথে দুই ভাই মিলে আইয়াশকে রশি দিয়ে বেঁধে বাঁধা অবস্থায় দিনের বেলায় মক্কায় নিয়ে গেলো। মক্কায় নেয়ার পর সবাইকে শুনিয়ে বললো, ওহে মক্কার অধিবাসীরা, তোমরা তোমাদের বেকুবদের সাথে ঠিক এরূপ ব্যবহার করো, আমরা আমাদের এই বেকুবের সাথে যেমন ব্যবহার করেছি।
হিজরত করার জন্যে কেউ উদ্যোগ নিচ্ছে এ খবর পাওয়ার পর পৌত্তলিকরা তাদের সাথে যেরূপ ব্যবহার করতো, এখানে তার তিনটি নমুনা তুলে ধরা হলো। কিন্তু এতো বাধা সত্তেও ঈমানের সম্বল বুকে নিয়ে মুসলমানরা হিজরত করতে থাকেন। দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবার দুই মাস কয়েক দিন পর মক্কায় প্রিয় নবী হযরত আবু বকর এবং হযরত আলী (রা.) ছাড়া অন্য কোন মুসলমান ছিলেন না। এরা দু'জন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ অনুযায়ী মক্কায় রয়ে গেলেন। কয়েকজন মুসলমান এমন ছিলেন যে, তাদেরকে পৌত্তলিকরা জোর করে আটকে রেখেছিলো। রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের প্রস্তুতি নিয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন। আর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সফরের সাজ-সরঞ্জাম বেঁধে রেখে দিয়েছিলেন।
সহীহ বোখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের বললেন, আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান দেখানো হয়েছে। এটি হচ্ছে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী একটি এলাকা। এরপর মুসলমানরা মদীনায় হিজরত শুরু করেন। হাবশায় যারা হিজরত করেছিলেন তারাও মদীনায় আসতে শুরু করেন। হযরত আবু বকর (রা.)-ও মদীনায় সফরের প্রস্তুতি নেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, অপেক্ষা করো, আমি ধারণা করছি যে, আমাকেও হিজরতের নির্দেশ দেয়া হবে। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, আমার মা-বাবা আপনার জন্যে কোরবান হোক, আপনি কি হিজরতের আশা করছেন? প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হাঁ। এরপর হযরত আবু বকর (রা.) অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিনি প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সফরসঙ্গী হবেন-এ আশায় ছিলেন। তাঁর কাছে দু'টি উটনী ছিলো। তাদেরকে চার মাস যাবত ভালো করে বাচলা গাছের পাতা খাওয়ানো হলো।
টিকাঃ
১. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৬৯, ৪৭০
২. ইবনে হিশাম, ১ম খনড, পৃ. ৪৭৭
৩. হিশাম এবং আইয়াশ কাফেরদের হাতে বন্দী ছিলো। রসূল হিযরত করার পর একদিন বললেন, কে আছো, যে আমার জন্য হিশাম এবং আইয়াশকে ছাড়িয়ে আনতে পারো? ওলীদ ইবনে ওলীদ এ দায়িত্ব নিলেন। গোপনে তিনি মক্কায় গেলেন। ওদের জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া এক মহিলাকে অনুসরণ করে তাদের ঠিকানা জেনে নিলেন। ছাদ বিহীন একটি ঘরে উভয়কে আটকে রাখা হয়েছিলো। গভীর রাতে ওলীদ দেয়াল বেয়ে উঠে ঘরের ভেতরে গেলেন। তারপর বাঁধন কেটে দিয়ে বের করে নিজের উটে বসিয়ে উভয়কে মদীনায় নিয়ে এলেন। ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৭৪-৪৭৬। হযরত ওমর (রাঃ) ২০ জন সাহাবার একটি দলসহ মদীনায় হিযরত করেন। সহীহ বোখারী ১ম খন্ড।
৪. যাদুল আয়অদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৫২
৫. সহীহ বোখারী, হিযরতে নবী অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৩
📄 দারুন নোদওয়ায় কোরায়েশদের বৈঠক
মক্কার পৌত্তলিকরা যখন দেখলো যে, সাহাবায়ে কেরামরা পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ ফেলে রেখে আওস এবং খাযরাজদের এলাকায় গিয়ে পৌঁছেছে, তখন তারা দিশেহারা হয়ে পড়লো। ক্রোধে তারা অস্থির হয়ে উঠলো। ইতিপূর্বে তারা এ ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন কখনোও হয়নি। এ পরিস্থিতি ছিলো তাদের মূর্তি পূজা এবং অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর মারাত্মক আঘাত এবং চ্যালেঞ্জ স্বরূপ।
পৌত্তলিকরা ভালো করেই জানতো যে, হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর মধ্যে নেতৃত্ব ও পথ-নির্দেশের যোগ্যতা এবং তাঁর প্রভাব সৃষ্টিকারী শক্তি বিদ্যমান রয়েছে। একই সাথে তাঁর সাহাবাদের মধ্যে আত্মত্যাগ এবং সাহসিকতার যে প্রেরণা রয়েছে সেটাও তাদের অজানা ছিলো না। আওস এবং খাযরাজ গোত্রের রণ কৌশল, যোদ্ধা বা লড়াকু হিসাবে সুনাম সুখ্যাতিও ছিলো সর্বজনবিদিত। উভয় গোত্রের মধ্যে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন যেসব নেতা রয়েছেন, তাদের অসাধারণ প্রজ্ঞাও সকলের জানা ছিলো। তাঁরা পরিস্থিতি অনুযায়ী যেমন লড়াই করতে জানেন, তেমনি প্রয়োজনে সন্ধি সমঝোতাও করতে জানেন। বহু বছর গৃহযুদ্ধের তিক্ততার পর আওস এবং খাযরাজ গোত্র বর্তমানে প্রয়োজনে সন্ধি এবং মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্যে এগিয়ে এসেছে। এ খবরও কোরায়শদের অজানা ছিলো না।
পৌত্তলিক কোরায়শরা এটা জানতো যে, ইয়েমেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত লোহিত সাগরের উপকূল দিয়ে যে পথ রয়েছে, সেই পথেই চলাচল করে কোরায়শদের বাণিজ্য কাফেলা। সে পথ মদীনা থেকে বেশী দূরে নয়। কাজেই অর্থনৈতিক এবং সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে মদীনার অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিয়া থেকে মক্কাবাসীদের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিলো (সেই সময়ের হিসাব অনুযায়ী) আড়াই লক্ষ স্বর্ণমুদ্রার সমপরিমাণ। তাবেরা এবং অন্যান্য এলাকার বাণিজ্যিক হিসাব ছিলো এর অতিরিক্ত। কাজেই বাণিজ্যিক পথ নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তার মাধ্যমেই যে এ বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা হতে পারে এটা তারা ভালো করেই বুঝতো।
এ আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, মদীনায় ইসলামী দাওয়াতের বুনিয়াদ দৃঢ় হওয়া এবং মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে মদীনাবাসীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরিণাম কতো মারাত্মক। পৌত্তলিকরা এসব আশঙ্কা সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত ছিলো এবং তারা বুঝতে পারছিলো যে, সামনে কঠিন সময় ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ কারণে তারা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কার্যকর প্রতিষেধক সম্পর্কে চিন্তা করতে শুরু করলো। তারা জানতো যে, এসব বিশৃঙ্খলা এবং অশান্তির মূলে রয়েছেন ইসলামের পতাকাবাহী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজে।
দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবার প্রায় আড়াই মাস পর ২৬ শে সফর, ১২ই সেপ্টেম্বর ৬২২ ঈসায়ী সালের শুক্রবার সকালে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মক্কার পার্লামেন্ট দারুন নোদওয়ায় ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে মক্কার কোরায়শদের সকল গোত্রের প্রতিনিধি যোগদান করে। আলোচ্য বিষয় ছিলো এমন একটি পরিকল্পনা উদ্ভাবন করা যাতে ইসলামী দাওয়াতের নিশানবরদারকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ইসলামের আলো চির দিনের জন্যে নিভিয়ে দেয়া যায়।
এ জঘন্য বৈঠকে যেসব গোত্রের প্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলো তাদের পরিচয়
ক্রমিক ব্যক্তি গোত্র ১ আবু জেহেল ইবনে হিশাম বনি মাখযুম গোত্র ২ যোবায়ের ইবনে মুতয়েম তুয়াইমা ইবনে বনি নওফেল ইবনে আবদে মান্নাফ আদী এবং হারেস ইবনে আমের ৩ শায়বা ইবনে রবিয়া, ওতবা ইবনে রবিয়া বনি আবদে শামস ইবনে আবদে মান্নাফ এবং আবু সুফিয়ান ইবনে হারব ৪ নযর ইবনে হারেস বনি আবদুদ দার ৫ আবুল বুখতারি ইবনে হিশাম জামআ ইবনে আসোয়াদ এবং বনি আসাদ ইবনে আবদুল ওজ্জা হাকিম ইবনে হেযাম ৬ নবীহ ইবনে হাজ্জাজ এবং বনি ছাহাম মুনাব্বাহ ইবনে হাজ্জাজ ৭ উমাইয়া ইবনে খালফ জুমাহ
পূর্ব নির্ধারিত সময়ে প্রতিনিধিরা দারুন নোদওয়ায় পৌঁছে গেলো। এ সময় ইবলিস শয়তান একজন বৃদ্ধের রূপ ধারণ করে সভাস্থলে গিয়ে উপস্থিত হলো। তার পরিধানে ছিলো জোব্বা। প্রবেশদ্বারে তাকে দেখে লোকেরা বললো, আপনি কে, আপনাকে তো চিনতে পারলাম না। শয়তান বললো, আমি নজদের অধিবাসী, একজন গেলো। আপনাদের কর্মসূচী শুনে হাযির হয়েছি। কথা শুনতে চাই, কিছু কার্যকর পরামর্শ দিতে পারব আশা করি। পৌত্তলিক নেতারা শয়তানকে যত্ন করে সসম্মানে নিজেদের মধ্যে বসালো।
আল্লাহর রসূলকে হত্যা করার নীলনকশা সবাই হাযির হওয়ার পর আলোচনা শুরু হলো। দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর নানা প্রকার প্রস্তাব পেশ করা হলো। প্রথমে আবুল আসওয়াদ প্রস্তাব করলো যে, তাঁকে আমরা আমাদের মধ্য থেকে বের করে দেবো। তাকে মক্কায় থাকতে দেবো না। আমরা তার ব্যাপারে কোন খবরও রাখব না যে, তিনি কোথায় যান, কি করেন। এতেই আমরা নিরাপদে থাকতে পারব এবং আমাদের মধ্যে আগের মতো সহমর্মিতা ফিরে আসবে।
শেখ নজদী রূপী শয়তান বললো, এটা কোন কাজের কথা নয়। তোমরা কি লক্ষ্য করোনি যে, তার কথা কতো উত্তম, কতো মিষ্টি। তিনি সহজেই মানুষের মন জয় করেন। যদি তোমরা তার ব্যাপারে নির্বিকার থাকো, তবে তিনি কোন আরব গোত্রে গিয়ে হাযির হবেন এবং তাদেরকে নিজের অনুসারী করার পর তোমাদের ওপর হামলা করবেন। এরপর তোমাদের শহরেই তোমাদেরকে নাস্তানাবুদ করে তোমাদের সাথে যেমন খুশী আচরণ করবেন। কাজেই তোমরা অন্য কোন প্রস্তাব চিন্তা করো।
আবুল বুখতারী বললো, তাকে লোহার শেকলে বেঁধে আটক করে রাখা হোক। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে একটা বন্ধ ঘরে রাখা হোক। এতে করে সেই ঘরে তার মৃত্যু হবে। কবি যোহাইর এবং নাবেগার এভাবেই মৃত্যু হয়েছিলো।
শেখ নজদী রূপী শয়তান বললো, এ প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য নয়। তোমরা যদি তাকে আটক করে ঘরের ভেতরে রাখো, তবে যেভাবে হোক, তার খবর তার সঙ্গীদের কাছে পৌঁছে যাবে। এরপর তারা মিলিতভাবে তোমাদের ওপর হামলা করে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। এরপর তার সহায়তার সংখ্যা বৃদ্ধি করে তোমাদের ওপর হামলা করবে। সেই হামলায় তোমাদের পরাজয় আনবার্য। কাজেই অন্য কোন প্রস্তাব নিয়ে চিন্তা করো।
উল্লিখিত দু'টি প্রস্তাব বাতিল হওয়ার পর তৃতীয় একটি প্রস্তাব পেশ করা হলো। মক্কার সবচেয়ে জঘন্য অপরাধী আবু জেহেল এ প্রস্তাব উত্থাপন করলো। সে বললো, তার সম্পর্কে আমার একটিই প্রস্তাব রয়েছে। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, এখনো কেউ সেই প্রস্তাবের ধারে কাছে পৌছেনি। সবাই বললো, বলো আবুল হাকাম, কি সেই প্রস্তাব? আবু জেহেল বললো, প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন যুবককে বাছাই করে তাদের হাতে একটি করে ধারালো তলোয়ার দেয়া হবে। এরপর সশস্ত্র শক্তিশালী যুবকরা একযোগে তাকে হত্যা করবে এমনভাবে মিলিত হামলা করতে হবে, দেখে যেন মনে হয় একজন আঘাত করেছে। এতে করে আমরা এই লোকটির হাত থেকে রেহাই পাব। এমনিভাবে হত্যা করা হলে তাকে হত্যার দায়িত্ব সকল গোত্রের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে। বনু আবদে মান্নাফ সকল গেত্রের সাথে তো যুদ্ধ করতে পারবে না। ফলে তারা হত্যার ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে রাযি হবে। আমরা তখন তাকে হত্যার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেবো।
শেখ নজদী রূপী শয়তান এ প্রস্তাব সমর্থন করলো। মক্কার পার্লামেন্ট এ প্রস্তাবের ওপর ঐক্যমত্যে উপনীত হলো। সবাই এ সঙ্কল্পের সাথে ঘরে ফিরলো যে, অবিলম্বে এ প্রস্তাব কার্যকর করতে হবে।
টিকাঃ
১. আল্লামা মনসুরপুরীর সংযোজিত তথ্যের আলোকে এ ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। রহমতুল লিল আলামিন ১ম খন্ড, পৃ. ৯৫, ৯৭, ১০২ ২য় খন্ড, পৃ. ৪৭১
২. প্রথম প্রহরে অর্থাৎ সকাল বেলায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় রয়েছে। এতে তিনি বলেছেন, হযরত জিবরাঈল (আঃ) প্রিয় রসূল (সঃ)-এর কাছে এ বৈঠকের খবর নিয়ে আসেন এবং তাঁকে হিজরতের অনুমতি প্রদান করেন। সহীহ বোখারীতে হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা উল্লেখ রয়েছে যে, প্রিয় রসূল (সঃ) দুপুর বেলায় হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর কাছে এসে বলেন, আমাকে মদীনা রওয়ানা হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। বিস্তারিত বিবরণ পরবর্তী পর্যায়ে উল্লেখ করা হবে।
৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮০-৪৮২
📄 আল্লাহর রসূলকে হত্যা করার নীল-নকশা
কোরায়শ নেতাদের উল্লিখিত উভয় আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের আক্রোশ বেড়ে গেলো। অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়লো। সে সময় কোরায়শ নেতাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের মধ্যে আরো নতুন মাত্রা যোগ হলো। তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার প্রস্তাব করলো। কিন্তু সেই সময়ে দুই বিশিষ্ট কোরায়শ নেতা হযরত হামযা (রা.) এবং হযরত ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ ইসলামের শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিবর্তে বরং এই দুই বীর কেশরী আল্লাহর রসূলের কাছে আত্মসমর্পণ করে ইসলামেরই শক্তি বাড়িয়ে দেন।
আল্লাহর রসূলের প্রতি পৌত্তলিকদের অত্যাচার নির্যাতনের দুটি উদাহরণ পেশ করছি।
একদিন আবু লাহাবের পুত্র ওতাইবা রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললো, 'ওয়াননাজমে ইযা হাওয়া এবং ছুম্মা দানা ফাতাদাল্লার' সাথে আমি কুফর করছি। সূরা নাজম-এর এ দুটি আয়াতের অর্থ হচ্ছে, 'শপথ নক্ষত্রের, যখন তা অস্তমিত হয়। অতপর, সে তার নিকটবর্তী হলো অতি নিকটবর্তী।' এরপর ওতাইবা আল্লাহর রসূলের ওপর অত্যাচার শুরু করলো। তাঁর জামা ছিঁড়ে দিলো এবং পবিত্র চেহারা লক্ষ্য করে থুথু নিক্ষেপ করলো। কিন্তু থুথু তাঁর চেহারায় পড়েনি। সে সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বদদোয়া দিলেন। তিনি বলেছিলেন,' হে আল্লাহ তায়ালা, ওর ওপর তোমার কুকুরসমূহের মধ্যে থেকে একটি কুকুর লেলিয়ে দাও।' রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বদদোয়া কবুল হয়েছিলো। ওতবা একবার কোরায়শ বংশের কয়েকজন লোকের সাথে এক সফরে সিরিয়া যাচ্ছিলো। যারকা নামক জায়গায় তারা একদা রাত্রি যাপনের জন্যে তাঁবু স্থাপন করলো। সে সময় একটি বাঘকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলো। ওতাইবা বাঘ দেখে বললো, হায়রে, আমার ধ্বংস অনিবার্য খোদার কসম, এই বাঘ আমাকে খাবে। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ওপর বদদোয়া করেছেন। দেখো আমি সিরিয়ায় রয়েছি, অথচ তিনি মক্কায় বসে আমাকে মেরে ফেলছেন। সতর্কতা হিসাবে সফরসঙ্গীরা তখন ওতাইবাকে নিজেদের মাঝখানে রেখে শয়ন করলো। রাত্রিকালে বাঘ এলো, সবাইকে ডিঙ্গিয়ে ওতাইবার কাছে গেলো এবং তার ঘাড় মটকালো।
ওকবা ইবনে আবু মুঈত ছিলো একজন প্রখ্যাত পৌত্তলিক। একবার এই দুর্বৃত্ত নামাযে সেজদা দেয়ার সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘাড় এতো জোরে পেঁচিয়ে ধরলো, মনে হচ্ছিলো যেন, তাঁর চোখ বেরিয়ে যাবে।
ইবনে ইসহাকের একটি দীর্ঘ বর্ণনায় কোরায়শদের চক্রান্ত সম্পর্কে জানা যায়। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যে ক্রমাগত চক্রান্ত করছিলো। উক্ত বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, একবার আবু জেহেল বলেছিলো, হে কোরায়শ ভাইয়েরা, আপনারা লক্ষ্য করছেন যে, মোহাম্মদ আমাদের ধর্মের সমালোচনা এবং আমাদের উপাস্যদের নিন্দা থেকে বিরত হচ্ছে না। আমাদের পিতা পিতামহকে অবিরাম গালমন্দ দিয়েই চলেছে। এ কারণে আমি আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করছি যে, আমি একটি ভারি পাথর নিয়ে বসে থাকবো, মোহাম্মদ যখন সেজদায় যাবে, তখন সেই পাথর দিয়ে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবো। এরপর যে কোন পরিস্থিতির জন্যে আমি প্রস্তুত। ইচ্ছে হলে আপনারা আমাকে বান্ধবহীন অবস্থায় রাখবেন অথবা আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন। এরপর বনু আবদে মান্নাফ আমার সাথে যেরূপ ইচ্ছা ব্যবহার করবে, এতে আমার কোন পরোয়া নেই। কোরায়শরা এ প্রস্তাব শোনার পর বললো, কোন অবস্থায়ই আমরা তোমাকে বান্ধবহীন অবস্থায় ফেলে রাখবো না। তুমি যা করতে চাও, করতে পারো।
সকালে আবু জেহেল একটি ভারি পাথর নিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অপেক্ষায় বসে থাকলো। কোরায়শরা একে একে সমবেত হয়ে আবু জেহেলের কর্মতৎপরতা দেখতে উৎকণ্ঠিত হয়ে রইলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যথারীতি হাযির হয়ে নামায আদায় করতে শুরু করলেন। তিনি যখন সেজদায় গেলেন তখন আবু জেহেল পাথর নিয়ে অগ্রসর হলো। কিন্তু পরক্ষণে ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় ফিরে এলো, এবং তার হাত পাথরের সাথে যেন আটকেই রইলো। কোরায়শের কয়েকজন লোক তার কাছে এসে বললো, আবুল হাকাম তোমার কী হয়েছে? সে বললো, আমি যে কথা রাতে বলেছিলাম, সেটা করতে যাচ্ছিলাম কিন্তু কাছাকাছি পৌছুতেই দেখতে পেলাম, মোহাম্মদ এবং আমার মাঝখানে একট উট এসে দাঁড়িয়েছে। খোদার কসম আমি কখনো অতো বড়, অতো লম্বা ঘাড় ও দাঁত বিশিষ্ট উট দেখিনি। উটটি আমার ওপর হামলা করতে চাচ্ছিলো।
ইবনে ইসহাক বলেন, আমাকে জানানো হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, উটের ছদ্মবেশে তিনি ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আ.)। আবু জেহেল যদি কাছে আসতো তবে তাকে পাকড়াও করা হতো।
এরপর আবু জেহেল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এমন ব্যবহার করছিলো যে, সেটা দেখে হযরত হামযা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। সে সম্পর্কে কিছুক্ষণ পরে আলোচনা করা হবে।
কোরায়শের অন্যান্য দুর্বৃত্তরাও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছিলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, একবার পৌত্তলিকরা কা'বার সামনে বসেছিলো। আমিও সেখানে ছিলাম। তারা আল্লাহর রসূলের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বললো, এই লোকটি সম্পর্কে আমরা যেরূপ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি তার উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে তার ব্যাপারে আমরা অতুলনীয় ধৈর্যধারণ করেছি। এ আলোচনা চলার সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত হলেন। তিনি প্রথমে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন এরপর কাবাঘর তওয়াফ করার সময়ে পৌত্তলিকদের পাশ দিয়ে গেলেন। তারা খারাপ কথা বলে তাঁকে অপমান করলো, আল্লাহর রসূলের চেহারায় সে অপমানের ছাপ ফুটে উঠলো। তওয়াফের মধ্যে পুনরায় তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে তারা পুনরায় একইভাবে অপমানজনক কথা বললো। সে অপমানের প্রভাব আমি তাঁর চেহারায় লক্ষ্য করলাম। তৃতীয়বারও একই রকম ঘটনা ঘটলো। এবার আল্লাহর রসূলের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, কোরায়শের লোকেরা শোনো, সেই আল্লাহর শপথ, তাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, আমি তোমাদের কাছে কোরবানীর পশু নিয়ে এসেছি।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একথায় কোরায়শরা দারুণ প্রভাবিত হলো। তারা সবাই নীরব হয়ে গেলো। কঠোর প্রাণের লোকেরাও তাঁর প্রতি নম্র নরম ভাষা ব্যবহার করতে লাগলো। তারা বলছিলো, আবুল কাসেম, আপনি ফিরে যান। আল্লাহর শপথ, আপনি তো কখনো নির্বোধ ছিলেন না।
পরদিনও কোরায়শরা একইভাবে সমবেত হয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রসঙ্গ আলোচনা করছিলো। এমন সময় তিনি এলেন, তিনি কাছে আসতেই তারা একযোগে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। একজন তাঁর চাদর গলায় জড়িয়ে শ্বাসরোধ করতে চাচ্ছিলো। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁকে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, তোমরা কি এমন একজন মানুষকে হত্যা করছো, যিনি বলেন যে, আমার প্রভু আল্লাহ? দুর্বৃত্তরা এরপর তাঁকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন, কোরায়শদের অত্যাচারের ঘটনাসমূহের মধ্যে আমার দেখা এ ঘটনাটি ছিলো সবচেয়ে মারাত্মক।
টিকাঃ
৫৫. মুখতাছারুছ সিয়ার, শেখ আবদুল্লাহ পৃ. ১৩৫, ১ম খন্ড, এস্তিয়ার, এছাবা দালায়েলুন নবুয়ত। আর ফওযুল আনফ
৫৬. ঐ, মুখতাছারুছ সিয়ার, পৃ. ১১৩
৫৭. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৯৮-২৯৯
৫৮. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৮৯-২৯০
৫৯. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪৪
৬০. মুখতাছারুস সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১১৩
📄 আল্লাহর রসূলের হিজরত
রসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার জঘন্য প্রস্তাব পাশ হওয়ার পর হযরত জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হন। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোরায়শদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত করে বলেন যে, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে মক্কা থেকে হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন। হিজরত করার সময় জানিয়ে হযরত জিবরাঈল (আ.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, আপনি আজ রাত আপনার বাসভবনের বিছানায় শয়ন করবেন না।
এ খবর পাওয়ার পর নবী ঠিক দুপুরের সময় হযরত আবু বকর (রা.)-এর বাড়ীতে গেলেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে হিজরতের পরিকল্পনা তৈরী করাই ছিলো তাঁর উদ্দেশ্য। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, ঠিক দুপুরের সময় আমরা আবু বকর (রা.)-এর ঘরে বসেছিলাম, এমন সময় একজন আবু বকরকে বললেন, আল্লাহর নবী মাথা ঢেকে এদিকে আসছেন। এই সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো আসতেন না। আবু বকর (রা.) এ খবর শুনে বললেন, আমার মা- বাবা তাঁর জন্যে কোরবান হউন। নিশ্চয়ই তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজে এসেছেন।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, প্রিয় নবী এলে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। অনুমতি দেয়া হলে তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন। এরপর আবু বকর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, তোমার কাছে যারা রয়েছে, তাদের সরিয়ে দাও। আবু বকর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, শুধু আপনার স্ত্রী রয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাকে রওয়ানা হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আবু বকর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, সঙ্গে আমি? হে রসূল, আপনার ওপর আমার মা-বাবা কোরবান হউন, হে আল্লাহর রসূল। প্রিয় রসূল বললেন, হাঁ।
এরপর হিজরতের কর্মসূচী তৈরী করে তিনি নিজের ঘরে ফিরে রাত্রির অপেক্ষা করতে লাগলেন।
টিকাঃ
৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৮০-৪৮২
৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, ৪৮২, যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ৫২
১. যাদুল মায়াদ, ১ম খন্ড,
২. সহীহ বোখারী হিযরতে নবী অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৩