📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা

📄 দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা


নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে ৬২২ ঈসায়ী সালের জুন মাসে মদীনা থেকে ৭০ জন মুসলমান হজ্জ পালনের জন্যে মক্কায় আগমন করেন। এরা নিজ কওমের পৌত্তলিক হাজীদের সঙ্গে মক্কায় আসছিলেন। মদীনায় থাকার সময়েই অথবা মক্কায় আসার পথে তারা পরস্পরকে বললেন, কতোদিন পর্যন্ত প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমরা মক্কায় এভাবে কষ্টকর অবস্থায় ফেলে রাখবো? তিনি মক্কায় যেভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, সে সম্পর্কেও তারা আলোচনা করলেন।
মক্কায় পৌছার পর গোপনে তারা প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোপনে যোগাযোগ করলেন এবং সিদ্ধান্ত হলো যে, উভয় দল আইয়ামে তাশরিকের মাঝামাঝি ১২ই জিলহজ্জ তারিখে মিনার জামারায়ে উলায় অর্থাৎ জামরায়ে আকাবার ঘাঁটিতে একত্রিত হয়ে রাতের অন্ধকারে গোপন আলোচনা করবেন।
এই সম্মেলন ইসলাম ও মূর্তিপূজার সংঘাতের মধ্যে সময়ের গতিধারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। একজন আনসার নেতার মুখে সেই সম্মেলনের বিবরণী উল্লেখ করা যাচ্ছে।
হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.) বলেন, আমরা হজ্জ এর জন্যে বেরিয়েছিলাম। প্রিয় নবী আইয়ামে তাশরিকের মাঝে আকাবায় আমাদের সাথে কথা বলার সময় নির্ধারণ করলেন। অবশেষে, সেই রাত এলো, যে রাতে কথা বলার তারিখ ছিলো। আমাদের সাথে আমাদের সম্মানিত নেতা আবদুল্লাহ ইবনে হারামও ছিলেন। তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। আমরা তাকে সঙ্গে নিলাম। আমাদের সঙ্গী অমুসলিমদের কাছে এই সম্মেলনের বিষয় গোপন রাখা হয়েছিলো। আবদুল্লাহ ইবনে হারামের সাথে আমরা আলোচনা করে তাকে বললাম, হে আবু জাবের আপনি আমাদের একজন সম্মানিত নেতা। আপনার বর্তমান অবস্থা থেকে আমরা আপনাকে বের করতে চাই। অনন্তকাল দোযখের আগুন থেকে আপনি মুক্তি লাভ করবেন এটাই আমরা চাই। এরপর আমরা তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমাদের আলোচনার বিষয় তাঁকে জানালাম। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। এবং আমাদের সাথে আকাবায় গেলেন। তাঁকে নকিব মনোনীত করা হলো।

টিকাঃ
১. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪৪০

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 পরিস্থিতির নাজুকতার ব্যাখ্যা ও বাইয়াতের দফাসমূহ

📄 পরিস্থিতির নাজুকতার ব্যাখ্যা ও বাইয়াতের দফাসমূহ


সম্মেলন শুরু হলো। দ্বীনী এবং সামরিক সহায়তাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে আলোচনা শুরু হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আব্বাস প্রথমে কথা বললেন। তিনি চাচ্ছিলেন যে, পরিস্থিতির আলোকে দায়িত্বের গুরুত্বের প্রতি আলোকপাত করবেন। সেই গুরুদায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত হতে যাচ্ছিলো, তাদের সম্বোধন করে তিনি বললেন, মোহাম্মদ মোস্তফার যে মূল্য ও মর্যাদা রয়েছে, সেটা তোমরা জানো। আমাদের কওমের মধ্যে মোহাম্মদ প্রবর্তিত ধর্ম বিশ্বাস যারা সমর্থন করে না, মোহাম্মদকে তাদের কাছ থেকে আমরা দূরে রেখেছি। নিজ শহরে স্বজাতীয়দের মধ্যে তিনি নিরাপদে রয়েছেন। তিনি বর্তমানে তোমাদের কাছে যেতে চান। তোমাদের সাথে মিশতে চান, যদি তোমরা তাঁর নিরাপত্তা দিতে এবং বিরোধী পক্ষের হামলা থেকে তাঁকে হেফাযত করতে পারো তবে কিছু বলার নেই। তোমরা যে দায়িত্ব নিয়েছো, সে সম্পর্কে তোমরাই ভালো জানো। কিন্তু যদি তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করে থাকো, তবে এখনই চলে যাও। কেননা তিনি স্বজাতীয়দের মধ্যে নিজ শহরে নিরাপদেই রয়েছেন। তাঁর সম্মানও এখানে রয়েছে।
হযরত কা'ব (রা.) বলেন, আমরা হযরত আব্বাসকে বললাম যে, আপনার কথা আমরা শুনেছি। 'হে আল্লাহর রসূল, এবার আপনি কথা বলুন। আপনি নিজের এবং আপনার প্রতিপালকের জন্যে আমাদের কাছ থেকে যে অঙ্গীকার নিতে চান, তাই নিন।'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা শুরু করলেন। তিনি প্রথমে কোরআন তেলাওয়াত করলেন। আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিলেন। এরপর বাইয়াত হলো।
বাইয়াতের দফাসমূহ
বাইয়াতের ঘটনা ইমাম আহমদ হযরত জাবের (রা.) থেকে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। হযরত জাবের (রা.) বলেন, আমরা বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল, আমরা আপনার কাছে কি কি বিষয়ের ওপর বাইয়াত করবো? তিনি বললেন, নিম্নোক্ত বিষয়াবলীর ওপর।
১. ভালোমন্দ সকল অবস্থায় আমার কথা শুনবে এবং মানবে।
২. স্বচ্ছলতা অস্বচ্ছলতা উভয় অবস্থায়ই ধন-সম্পদ ব্যয় করবে।
৩. সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে।
৪. আল্লাহর পথে উঠে দাঁড়াবে এবং আল্লাহর ব্যাপারে কারো ভয়ভীতি প্রদর্শনে পিছিয়ে যাবে না।
৫. তোমাদের কাছে যাওয়ার পর আমাকে সাহায্য করবে এবং নিজেদের প্রাণ ও সন্তানদের হেফাযতের মতোই আমার হেফাযত করবে এতে তোমাদের জন্যে জান্নাত রয়েছে।
ইবনে ইসহাক উল্লেখিত হযরত কা'ব এর বর্ণনা শুধু পঞ্চম দফায় উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরআন তেলাওয়াত দ্বারা আল্লাহর প্রতি দাওয়াত এবং ইসলামের প্রতি তাকিদ দিয়ে বললেন, আমি তোমাদের কাছে এ মর্মে বাইয়াত নিচ্ছি যে, তোমরা যে জিনিস দ্বারা নিজেদের সন্তানদের হেফাযত করে থাকো, সেই জিনিস দিয়ে আমারও হেফাযত করবে। এ কথা শুনে হযরত কাব ইবনে মা'রুর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত ধরে বললেন, হাঁ, সেই জাতের শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন, আমরা অবশ্যই সেই জিনিস দ্বারা আপনার হেফাযত করবো, যা দ্বারা নিজেদের সন্তানদের হেফাযত করি। কাজেই হে আল্লাহর রসূল, আপনি আমাদের কাছে বাইয়াত নিন। খোদার কসম, আমরা যুদ্ধের পুত্র, (অর্থাৎ যুদ্ধের ছায়ায় আমরা জন্ম লাভ করেছি), হাতিয়ার হচ্ছে আমাদের খেলনা এবং পূর্বপুরুষের সময় থেকেই এ অবস্থা চলে আসছে।
হযরত কা'ব বলেন, তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলছিলেন, এমন সময় আবুল তায়াহাল ইবনে তাইহান বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ইহুদীদের সাথে চুক্তি রয়েছে, আমরা তার রজ্জু কেটে ফেলবো। আমরা ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম, এরপর আল্লাহ তায়ালা আপনাকে জয়যুক্ত করলে আপনি আমাদের ছেড়ে স্বজাতীয়দের কাছে ফিরে আসবেন না তো?
এ কথা শুনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হেসে বললেন না, তা হবে না তোমাদের রক্ত আমার রক্ত এবং তোমাদের ধ্বংস আমার ধ্বংস হিসাবে গণ্য হবে। আমি তোমাদের অন্তর্ভুক্ত, আর তোমরা আমার অন্তর্ভুক্ত। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করবো, তোমরা যাদের সাথে সন্ধি করবে, আমিও তাদের সাথে সন্ধি করবো।

টিকাঃ
২ ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৪০-৪৪১
৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৪২
৪. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল 'হাছান সনদের' সাথে এ বর্ণনা করেছেন। ইমাম হাকেম ও ইবনে হাব্বান বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন। ইবনে হিশাম ১ম খন্ড দেখুন

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 বাইয়াতেবিপদজ্জনক অবস্থার বিবরণ

📄 বাইয়াতেবিপদজ্জনক অবস্থার বিবরণ


বাইয়াতের শর্তাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার পর উপস্থিত লোকেরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বাইয়াতের ইচ্ছা করলেন। এ সময় দু'জন মুসলমান উঠে দাঁড়ালেন। এরা নবুয়তের একাদশ ও দ্বাদশ বছরের মাঝামাঝির হজ্জের মৌসুমে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিত ভালোভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে চাইলেন। তারা চাচ্ছিলেন যে, বিষয়টির সব দিক যথাযথভাবে তুলে ধরে তারপর বাইয়াত করবেন। তারা এটাই জানতে এবং বুঝতে চাচ্ছিলেন যে, কওমের লোকেরা কতোটা আত্মত্যাগে প্রস্তুত রয়েছে।
ইবনে ইসহাক লিখেছেন, লোকেরা বাইয়াতের জন্যে সমবেত হওয়ার পর হযরত আব্বাস ইবনে ওবাদা ইবনে নায়লা বললেন, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, তাঁর সাথে কিসের ব্যাপারে বাইয়াত করছো? সবাই বললেন, হাঁ জানি। হযরত আব্বাস বললেন, তোমরা কালো এবং লাল লোকদের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারে তাঁর হাতে বাইয়াত করছো। যদি তোমরা এরূপ মনে করে থাকো যে, তোমাদের ধন-সম্পদ ব্যয়িত হলে এবং তোমাদের নেতৃস্থানীয় লোকেরা নিহত হলে তোমরা তাকে পরিত্যাগ করবে তবে এখনই তাঁকে পরিত্যাগ করো। কেননা তাঁকে নিয়ে যাওয়ার পর নিসঙ্গ অবস্থায় পরিত্যাগ করা দুনিয়া ও আখেরাতের জন্যে অবমাননাকর হবে। যদি তোমরা মনে করো যে, ধন-সম্পদ কোরবানী দেয়ার পর নেতৃস্থানীয় লোকদের নিহত হওয়ার পরও তাঁর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পালন করবে, যেদিকে তোমাদের ডাকা হচ্ছে সেদিকে যাবে, তবে তোমরা তাঁকে নিয়ে নাও। আল্লাহর শপথ, এতে দুনিয়া এবং আখেরাতের কল্যাণ ও মঙ্গল রয়েছে।
এসব কথা বলার পর সবাই সমস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ধন-সম্পদ কোরবানী করবো এবং নেতৃস্থানীয় লোকদের নিহত হওয়ার ঝুঁকি নেবো কিন্তু বিনিময়ে আমরা কী পাব? আমরা আমাদের অঙ্গীকার যথাযথ পালন করবো, কিন্তু আমাদের বিনিময় কী হবে? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, জান্নাত। সবাই তখন হাত বাড়ালেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও হাত বাড়ালেন। বাইয়াত হয়ে গেলো।
হযরত জাবের (রা.) বলেন, সমবেত লোকের মধ্যে আসআদ ইবনে যোরারা ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সের, আসআদ তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত ধরে বললেন, মদীনাবাসীরা একটু থামো। আমরা তাঁর কাছে উটের বুক শুকানো দূরত্ব অতিক্রম করে এ কারনেই হাযির হয়েছি, যেহেতু তিনি আল্লাহর রসূল। আজ তাঁকে মক্কা থেকে নিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে সমগ্র আরবের সাথে শত্রুতা, তোমাদের বিশিষ্ট নেতাদের নিহত হওয়া ও তলোয়ারের ঝনঝনানি। কাজেই এসব কিছু যদি সহ্য করতে পারো তবেই তাঁকে নিয়ে যাও। তোমাদের একাজের বিনিময় আল্লাহর কাছে রয়েছে। আর যদি নিজেদের প্রাণ তোমাদের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে, তবে তাঁকে এখনই ছেড়ে দাও। এটা হবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ওযর।

টিকাঃ
৫. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৪২
৬. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৪৬
৭. মোসনাদে আহমদ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00