📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 প্রথম বাইয়াতে আকাবা

📄 প্রথম বাইয়াতে আকাবা


ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবুয়তের দশম বর্ষে হজ্জ মওসুমে ইয়াসরেবের ছয়জন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা আল্লাহর রসূলের সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, নিজেদের কওমের কাছে ফিরে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতের তাবলীগ করবেন।
এর ফলে পরবর্তী হজ্জ মওসুমে ১৩ জন লোক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসেন। এদের মধ্যে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ ছাড়া অন্য ৫ জন ছিলেন, যারা গত বছরও এসেছিলেন। এরা ছাড়া বাকি সাত জনের নাম পরিচয় নিম্নরূপ।
ক্রমিক নাম গোত্র ১. মায়া'য ইবনে হারেস ইবনে আফরা বনি নাজ্জার, খাযরাজ ২. যাকওয়ান ইবনে আবদুল কয়েস বনি যুরাইক, খাযরাজ ৩. ওবাদা ইবনে সামেত বনি গানাম, খাযরাজ ৪. ইয়াযিদ ইবনে ছা'লাবা বনি গানামের মিত্র, খাযরাজ ৫. আব্বাস ইবনে ওবাদা ইবনে নাযলাহ বনি সালেম, খাযরাজ ৬. আবুল হায়ছাম ইবনে তাইহান বনি আবদে আশহাল, আওস ৭. ওযাইম ইবনে সায়েদাহ বনি আমর ইবনে আওফ, আওস।
এদের মধ্যে শেষোক্ত দু'জন ছিলেন আওস এবং বাকি সবাই খাযরাজ গোত্রের।
এরা সবাই মিনায় আকাবার কাছে আল্লাহর রসূলের কাছে কয়েকটি বিষয়ে বাইয়াত নেন। পরবর্তীতে হোদায়বিয়ার সন্ধির পর এবং মক্কা বিজয়ের সময়ে এইসব কথার ওপরেই মহিলাদের কাছ থেকেও বাইয়াত গ্রহণ করা হয়। আকাবার এই বাইয়াতের বিবরণ বোখারী শরীফে ওবাদা ইবনে সামেতের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'এসো, আমার কাছে এ মর্মে বাইয়াত করো যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যেনা করবে না, নিজের সন্তানকে হত্যা করবে না, মনগড়া কোন অপবাদ কারো ওপর দেবে না, ভালো কাজে আমার অনুসরণ করবে, কোন প্রকার অবাধ্যতা করবে না। যে ব্যক্তি এসব কিছু পালন করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এসব বিষয়ের কোন কিছু অমান্য করবে, যদি তাকে সেই অবাধ্যতার জন্যে শাস্তি দেয়া হয় তবে তার শাস্তি তার পাপের কাফফারা হবে। যদি কেউ অবাধ্যতা সত্তেও আল্লাহ যদি তার পাপ গোপন রাখেন তাহলে তার কাজের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি অথবা ক্ষমা করে দেবেন।'
হযরত ওবাদা বলেন, এসব বিষয়ে আমরা আল্লাহর রসূলের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলাম।
মদীনায় রসূলের দূত ও তার ঈর্ষণীয় সাফল্য বাইয়াত শেষ হয়ে গেলো এবং হজ্জ ও শেষ হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগত লোকদের সাথে মদীনায় তাঁর প্রথম দূত পাঠালেন। মুসলমানদের ইসলামের শিক্ষা প্রদান এবং যারা এখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত প্রদানই ছিলো এই দূত প্রেরণের উদ্দেশ্য। প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারী যুবক মসআব ইবনে ওয়ায়ের আবদারি (রা.)- কে আল্লাহর রসূল মদীনায় প্রেরণ করেন।
হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) মদীনায় পৌঁছে হযরত আসআদ ইবনে যুরারা (রা.)- এর ঘরে অবস্থান করেন। এরপর উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে উভয়ে মদীনাবাসীদের ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এ সময় হযরত মসআব 'মুকরিউন' উপাধি লাভ করেন। এর অর্থ শিক্ষক বা মোয়াল্লেম।
দ্বীনের তাবলীগ করার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যের একটি বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে। যোরারাকে সঙ্গে নিয়ে 'একদিন বনি আবদুল আশহাল এবং বনি যোফরের মহল্লায় যান। সেখানে বনি যোবায়ের একটি বাগানে মারক নামে একটি জলাশয়ের কিনারায় বসেন। তাদের কাছে কয়েকজন মুসলমানও সমবেত হন। বনি আশহাল গোত্রের সর্দার ছিলেন সা'দ ইবনে মায়া'য এবং উছায়েদ ইবনে খোযায়ের। তারা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তারা নবাগত মুসলমানদের আগমনের খবর পেলেন। হযরত সা'দ অপর সর্দার উছায়েদ ইবনে খোযায়েরকে বললেন, তুমি গিয়ে দেখে এসো, ব্যাপারটা কি। ওদের বলবে যে, তোমরা কি আমাদের দুর্বল লোকদের বেকুব বানাতে চাও। তাদের ধমক দেবে এবং আমাদের মহল্লায় আসতে নিষেধ করবে। আসয়া'দ ইবনে যোরারা আমার খালাতো ভাই, এ কারণেই তোমাকে পাঠাচ্ছি, না হলে আমি নিজেই যেতাম।
উছায়েদ নিজের বর্শা তুলে উভয়ের কাছে গেলেন। হযরত আসয়া'd তাকে আসতে দেখে হযরত মসআবকে বললেন, কওমের একজন সর্দার তোমার কাছে আসছে। তার ব্যাপারে আল্লাহর রহমত মনে মনে কামনা করো। হযরত মসআব বললেন, তিনি যদি বসেন তবে আমি তার সাথে কথা বলব। উছায়েদ পৌঁছেই ক্ষেপে গেলেন। বললেন, আপনারা কেন আমাদের এলাকায় এসেছেন? আপনারা কি আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে চান? প্রাণের মায়া থাকলে কেটে পড়ুন। হযরত মসআব বললেন, আপনি আমাদের কাছে বসুন। কিছু কথা শুনুন। পছন্দ হলে গ্রহণ করবেন, পছন্দ না হলে করবেন না। হযরত উছায়েদ বললেন, কথা তো ঠিকই। এরপর তিনি নিজের বর্শা মাটিতে পুঁতে বসে পড়লেন। হযরত মসআব (রা.) ইসলামের কথা বলতে শুরু করলেন। কোরআন তেলাওয়াত করলেন। পরে তিনি বলেছেন, উছায়েদ কিছু বলার আগেই আমি তার চেহারায় ইসলামের চমক লক্ষ্য করেছি। সব কথা শুনে উছায়েদ বললেন, কথা তো খুব ভালো। আপনারা কাউকে ইসলামে কিভাবে দীক্ষিত করেন? মসআব বললেন, আপনাকে গোসল করে পাক কাপড় পরতে হবে। এরপর কালেমা তাইয়্যেবার সাক্ষ্য দিতে হবে এবং দু'রাকাত নামায আদায় করতে হবে। উছায়েদ সবই করলেন এরপর বললেন, আমাদের গোত্রে আরো একজন সর্দার রয়েছেন। তিনি যদি ইসলামে দীক্ষা নেন, তবে আমাদের গোত্রের আর কেউই বাদ থাকবে না। আমি তাকে এখনই আপনাদের কাছে পাঠাচ্ছি।
এরপর হযরত উছায়েদ তার বর্শা নিয়ে সা'দ ইবনে ময়াা'য-এর কাছে গেলেন। সা'দ উছায়েদকে দেখে বললেন, এই লোকাট যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিলো, তার চেয়ে অন্য রকম চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে। উছায়েদকে সা'দ জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি করেছো? উছায়েদ বললেন, আমি তাদের সাথে আলাপ করেছি, কিন্তু আপত্তিকর কিছুই পাইনি। তবে আমি তাদের নিষেধ করেছি। তারা বলেছে, আপনারা যা চান, আমরা তাই করবো। আমি শুনেছি বনি হারেছা গোত্রের লোকেরা আসআদ ইবনে যোরারাকে হত্যা করতে চায়। এর কারণ হচ্ছে যে, তিনি আপনার খালাতো ভাই। ওরা আপনার সাথে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে চায়। এ কথা শোনামাত্র সা'দ ক্রোধে অধীর হয়ে বর্শা হাতে ওদের কাছে পৌঁছুলেন। গিয়ে দেখেন দু'জনেই নিশ্চিন্তে বসে আছেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, উছায়েদ চেয়েছে যে, আমি দু'জন আগন্তুকের সাথে কথা বলি। সা'দ তাদের সামনে গিয়ে রুক্ষ্ণ ভাষায় বললেন, তোমরা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে চাও? এরপর আসআদকে বললেন, খোদার কসম হে আবু আনাস, তোমার এবং আমার মধ্যে যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকতো, তবে তুমি এমন কাজ করতে পারতে না। আমাদের এলাকায় এসে তোমরা এমন কাজ করছো, যা আমাদের পছন্দনীয় নয়।
হযরত আসয়াদ হযরত মসআবকে আগেই বলেছিলেন যে, এমন একজন লোক আসছেন যিনি তার গোত্রের প্রভাবশালী নেতা। যদি তিনি তোমার কথা শোনেন, তবে তার পেছনে কেউ বাদ থাকবে না। এ কারণে হযরত মসআব হযরত সা'দকে বললেন, আপনি বসুন, কিছু কথা শুনুন। ভালো না লাগলে শুনবেন না। হযরত সা'দ বললেন, ঠিকই তো। একথা বলে তিনিও বর্শা মাটিতে পুঁতে বসে পড়লেন। হযরত মসআব তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন তেলাওয়াত করলেন। হযরত মসআব পরে বলেছেন, সা'দ বলার আগেই আমি তার চেহারায় ইসলামের চমক লক্ষ্য করেছি। সা'দ বললেন, তোমরা ইসলাম গ্রহণের পর কি করো? মসআব বললেন, আপনি গোসল করুন, এরপর পাক কাপড় পরুন, এরপর কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেবেন। তারপর দু'রাকাত নামায আদায় করবেন। তারপর সা'দ ইবনে ময়াা'য তাই করলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে হযরত সা'দ নিজের গোত্রের লোকদের কাছে ফিরে গেলেন। লোকেরা বললো, আপনি ভিন্ন চেহারায় ফিরে এসেছেন মনে হচ্ছে। হযরত সা'দ বললেন, তোমরা আমাকে কেমন লোক মনে করো, হে বনি আবদুল আশহাল? সবাই বললো আপনি হচ্ছেন আমাদের নেতা। বুদ্ধি-বিবেচনার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে বেশী। সা'দ ইবনে মায়া'য বললেন, আচ্ছা তবে শোনো, তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ রব্বুল আলামীন এবং তাঁর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ঈমান না আনবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের সাথে কথা বলা আমার জন্যে হারাম। বিকেল পর্যন্ত গোত্রের নারী পুরুষ সবাই ইসলাম গ্রহণ করলেন। উসাইরেম নামে একজন লোক সে সময় ঈমান আনেননি। তিনি ওহুদের যুদ্ধের দিনে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হন। তিনি কোন নামাযও আদায় করেননি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্পর্কে বলেছেন, অল্প আমল করে সে অনেক বেশী পুরস্কার পেয়েছে।
হযরত মসআব ও হযরত আসআদ ইবনে যোরারার ঘরে অবস্থান করেই ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন। এই দাওয়াতে আনসারদের প্রত্যেক পরিবারেই কয়েকজন করে নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করলেন। পরবর্তী হজ্জ মৌসুমে আসার আগে হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) সাফল্যের সুসংবাদ নিয়ে আল্লাহর রসূলের কাছে মক্কায় হাযির হন। তিনি প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ইয়াসরেবের গোত্রসমূহের অবস্থা, তাদের যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষার কৌশল এবং অন্যান্য যোগ্যতা সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য পেশ করেন।
দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে ৬২২ ঈসায়ী সালের জুন মাসে মদীনা থেকে ৭০ জন মুসলমান হজ্জ পালনের জন্যে মক্কায় আগমন করেন। এরা নিজ কওমের পৌত্তলিক হাজীদের সঙ্গে মক্কায় আসছিলেন। মদীনায় থাকার সময়েই অথবা মক্কায় আসার পথে তারা পরস্পরকে বললেন, কতোদিন পর্যন্ত প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমরা মক্কায় এভাবে কষ্টকর অবস্থায় ফেলে রাখবো? তিনি মক্কায় যেভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, সে সম্পর্কেও তারা আলোচনা করলেন।
মক্কায় পৌছার পর গোপনে তারা প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোপনে যোগাযোগ করলেন এবং সিদ্ধান্ত হলো যে, উভয় দল আইয়ামে তাশরিকের মাঝামাঝি ১২ই জিলহজ্জ তারিখে মিনার জামারায়ে উলায় অর্থাৎ জামরায়ে আকাবার ঘাঁটিতে একত্রিত হয়ে রাতের অন্ধকারে গোপন আলোচনা করবেন।
এই সম্মেলন ইসলাম ও মূর্তিপূজার সংঘাতের মধ্যে সময়ের গতিধারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। একজন আনসার নেতার মুখে সেই সম্মেলনের বিবরণী উল্লেখ করা যাচ্ছে।
হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.) বলেন, আমরা হজ্জ এর জন্যে বেরিয়েছিলাম। প্রিয় নবী আইয়ামে তাশরিকের মাঝে আকাবায় আমাদের সাথে কথা বলার সময় নির্ধারণ করলেন। অবশেষে, সেই রাত এলো, যে রাতে কথা বলার তারিখ ছিলো। আমাদের সাথে আমাদের সম্মানিত নেতা আবদুল্লাহ ইবনে হারামও ছিলেন। তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। আমরা তাকে সঙ্গে নিলাম। আমাদের সঙ্গী অমুসলিমদের কাছে এই সম্মেলনের বিষয় গোপন রাখা হয়েছিলো। আবদুল্লাহ ইবনে হারামের সাথে আমরা আলোচনা করে তাকে বললাম, হে আবু জাবের আপনি আমাদের একজন সম্মানিত নেতা। আপনার বর্তমান অবস্থা থেকে আমরা আপনাকে বের করতে চাই। অনন্তকাল দোযখের আগুন থেকে আপনি মুক্তি লাভ করবেন এটাই আমরা চাই। এরপর আমরা তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমাদের আলোচনার বিষয় তাঁকে জানালাম। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। এবং আমাদের সাথে আকাবায় গেলেন। তাঁকে নকিব মনোনীত করা হলো।

টিকাঃ
১৪. তালকিহুল হুকুম, পৃঃ ১০, সহীহ বোখারী ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৭
১. যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃঃ ৪৯
২. রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃঃ ৮৫, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪৩১-৪৩৩
৩. বোখারী, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫৫০, ৫৫১।

ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবুয়তের দশম বর্ষে হজ্জ মওসুমে ইয়াসরেবের ছয়জন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা আল্লাহর রসূলের সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, নিজেদের কওমের কাছে ফিরে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতের তাবলীগ করবেন।
এর ফলে পরবর্তী হজ্জ মওসুমে ১৩ জন লোক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসেন। এদের মধ্যে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ ছাড়া অন্য ৫ জন ছিলেন, যারা গত বছরও এসেছিলেন। এরা ছাড়া বাকি সাত জনের নাম পরিচয় নিম্নরূপ।

ক্রমিক নাম গোত্র
১. মায়া'য ইবনে হারেস ইবনে আফরা বনি নাজ্জার, খাযরাজ
২. যাকওয়ান ইবনে আবদুল কয়েস বনি যুরাইক, খাযরাজ
৩. ওবাদা ইবনে সামেত বনি গানাম, খাযরাজ
৪. ইয়াযিদ ইবনে ছা'লাবা বনি গানামের মিত্র, খাযরাজ
৫. আব্বাস ইবনে ওবাদা ইবনে নাযলাহ বনি সালেম, খাযরাজ
৬. আবুল হায়ছাম ইবনে তাইহান বনি আবদে আশহাল, আওস
৭. ওযাইম ইবনে সায়েদাহ বনি আমর ইবনে আওফ, আওস।

এদের মধ্যে শেষোক্ত দু'জন ছিলেন আওস এবং বাকি সবাই খাযরাজ গোত্রের।
এরা সবাই মিনায় আকাবার কাছে আল্লাহর রসূলের কাছে কয়েকটি বিষয়ে বাইয়াত নেন। পরবর্তীতে হোদায়বিয়ার সন্ধির পর এবং মক্কা বিজয়ের সময়ে এইসব কথার ওপরেই মহিলাদের কাছ থেকেও বাইয়াত গ্রহণ করা হয়। আকাবার এই বাইয়াতের বিবরণ বোখারী শরীফে ওবাদা ইবনে সামেতের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'এসো, আমার কাছে এ মর্মে বাইয়াত করো যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যেনা করবে না, নিজের সন্তানকে হত্যা করবে না, মনগড়া কোন অপবাদ কারো ওপর দেবে না, ভালো কাজে আমার অনুসরণ করবে, কোন প্রকার অবাধ্যতা করবে না। যে ব্যক্তি এসব কিছু পালন করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এসব বিষয়ের কোন কিছু অমান্য করবে, যদি তাকে সেই অবাধ্যতার জন্যে শাস্তি দেয়া হয় তবে তার শাস্তি তার পাপের কাফফারা হবে। যদি কেউ অবাধ্যতা সত্তেও আল্লাহ যদি তার পাপ গোপন রাখেন তাহলে তার কাজের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি অথবা ক্ষমা করে দেবেন।'
হযরত ওবাদা বলেন, এসব বিষয়ে আমরা আল্লাহর রসূলের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলাম।

টিকাঃ
১ সংকীর্ণ গিরিপথকে বলা হয় আকাবা। মক্কা থেকে মিনায় আসার পথে মিনায় পশ্চিম পাশে একটি সংকীর্ণ পাহাড়ী পথ অতিক্রম করতে হয়। এই গিরিপথ আকাবা নামে বিখ্যাত। দশই যিলহজ্জ তারিখে যে জামরাতে কংকর নিক্ষেপ করা হয় তা এ সুড়ঙ্গ পথের মাথায় অবস্থিত বলে একে জামরায়ে আকাবা বলা হয়। এর দ্বিতীয় নাম জামরায়ে কুবরা। অন্য দুটি জামরা এ স্থান থেকে কিছু পূর্ব দিকে। মিনা ময়দান এ তিনটি জামরার পূর্ব দিকে। এ কারণে জনসমাগম এদিকে লেগেই থাকে। পাথর নিক্ষেপের পর এদিকে আর লোক চলাচল থাকে না। তাই নবী করিম রসূলুল্লাহ (সঃ) যে বাইয়াত করেন, এ বলা হয় বাইয়াতে আকাবা। বর্তমানে এখানে পাহাড় কেটে প্রশস্ত রাস্তা তৈরী করা হয়েছে।
২. রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃঃ ৮৫, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪৩১-৪৩৩
৩. বোখারী, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫৫০, ৫৫১।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মদীনায় রসূলের দূত ও তাঁর কিছু ঈর্ষণীয় সাফল্য

📄 মদীনায় রসূলের দূত ও তাঁর কিছু ঈর্ষণীয় সাফল্য


বাইয়াত শেষ হয়ে গেলো এবং হজ্জ ও শেষ হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগত লোকদের সাথে মদীনায় তাঁর প্রথম দূত পাঠালেন। মুসলমানদের ইসলামের শিক্ষা প্রদান এবং যারা এখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত প্রদানই ছিলো এই দূত প্রেরণের উদ্দেশ্য। প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারী যুবক মসআব ইবনে ওয়ায়ের আবদারি (রা.)- কে আল্লাহর রসূল মদীনায় প্রেরণ করেন।
হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) মদীনায় পৌঁছে হযরত আসআদ ইবনে যুরারা (রা.)- এর ঘরে অবস্থান করেন। এরপর উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে উভয়ে মদীনাবাসীদের ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এ সময় হযরত মসআব 'মুকরিউন' উপাধি লাভ করেন। এর অর্থ শিক্ষক বা মোয়াল্লেম।
দ্বীনের তাবলীগ করার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যের একটি বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে। যোরারাকে সঙ্গে নিয়ে 'একদিন বনি আবদুল আশহাল এবং বনি যোফরের মহল্লায় যান। সেখানে বনি যোবায়ের একটি বাগানে মারক নামে একটি জলাশয়ের কিনারায় বসেন। তাদের কাছে কয়েকজন মুসলমানও সমবেত হন। বনি আশহাল গোত্রের সর্দার ছিলেন সা'দ ইবনে মায়া'য এবং উছায়েদ ইবনে খোযায়ের। তারা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তারা নবাগত মুসলমানদের আগমনের খবর পেলেন। হযরত সা'দ অপর সর্দার উছায়েদ ইবনে খোযায়েরকে বললেন, তুমি গিয়ে দেখে এসো, ব্যাপারটা কি। ওদের বলবে যে, তোমরা কি আমাদের দুর্বল লোকদের বেকুব বানাতে চাও। তাদের ধমক দেবে এবং আমাদের মহল্লায় আসতে নিষেধ করবে। আসয়া'দ ইবনে যোরারা আমার খালাতো ভাই, এ কারণেই তোমাকে পাঠাচ্ছি, না হলে আমি নিজেই যেতাম।
উছায়েদ নিজের বর্শা তুলে উভয়ের কাছে গেলেন। হযরত আসয়া'দ তাকে আসতে দেখে হযরত মসআবকে বললেন, কওমের একজন সর্দার তোমার কাছে আসছে। তার ব্যাপারে আল্লাহর রহমত মনে মনে কামনা করো। হযরত মসআব বললেন, তিনি যদি বসেন তবে আমি তার সাথে কথা বলব। উছায়েদ পৌঁছেই ক্ষেপে গেলেন। বললেন, আপনারা কেন আমাদের এলাকায় এসেছেন? আপনারা কি আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে চাও? প্রাণের মায়া থাকলে কেটে পড়ুন। হযরত মসআব বললেন, আপনি আমাদের কাছে বসুন। কিছু কথা শুনুন। পছন্দ হলে গ্রহণ করবেন, পছন্দ না হলে করবেন না। হযরত উছায়েদ বললেন, কথা তো ঠিকই। এরপর তিনি নিজের বর্শা মাটিতে পুঁতে বসে পড়লেন। হযরত মসআব (রা.) ইসলামের কথা বলতে শুরু করলেন। কোরআন তেলাওয়াত করলেন। পরে তিনি বলেছেন, উছায়েদ কিছু বলার আগেই আমি তার চেহারায় ইসলামের চমক লক্ষ্য করেছি। সব কথা শুনে উছায়েদ বললেন, কথা তো খুব ভালো। আপনারা কাউকে ইসলামে কিভাবে দীক্ষিত করেন? মসআব বললেন, আপনাকে গোসল করে পাক কাপড় পরতে হবে। এরপর কালেমা তাইয়্যেবার সাক্ষ্য দিতে হবে এবং দু'রাকাত নামায আদায় করতে হবে। উছায়েদ সবই করলেন এরপর বললেন, আমাদের গোত্রে আরো একজন সর্দার রয়েছেন। তিনি যদি ইসলামে দীক্ষা নেন, তবে আমাদের গোত্রের আর কেউই বাদ থাকবে না। আমি তাকে এখনই আপনাদের কাছে পাঠাচ্ছি।
এরপর হযরত উছায়েদ তার বর্শা নিয়ে সা'দ ইবনে ময়াা'য-এর কাছে গেলেন। সা'দ উছায়েদকে দেখে বললেন, এই লোকাট যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিলো, তার চেয়ে অন্য রকম চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে। উছায়েদকে সা'দ জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি করেছো? উছায়েদ বললেন, আমি তাদের সাথে আলাপ করেছি, কিন্তু আপত্তিকর কিছুই পাইনি। তবে আমি তাদের নিষেধ করেছি। তারা বলেছে, আপনারা যা চান, আমরা তাই করবো। আমি শুনেছি বনি হারেছা গোত্রের লোকেরা আসআদ ইবনে যোরারাকে হত্যা করতে চায়। এর কারণ হচ্ছে যে, তিনি আপনার খালাতো ভাই। ওরা আপনার সাথে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে চায়। এ কথা শোনামাত্র সা'দ ক্রোধে অধীর হয়ে বর্শা হাতে ওদের কাছে পৌঁছুলেন। গিয়ে দেখেন দু'জনেই নিশ্চিন্তে বসে আছেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, উছায়েদ চেয়েছে যে, আমি দু'জন আগন্তুকের সাথে কথা বলি। সা'দ তাদের সামনে গিয়ে রুক্ষ্ণ ভাষায় বললেন, তোমরা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে চাও? এরপর আসআদকে বললেন, খোদার কসম হে আবু আনাস, তোমার এবং আমার মধ্যে যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকতো, তবে তুমি এমন কাজ করতে পারতে না। আমাদের এলাকায় এসে তোমরা এমন কাজ করছো, যা আমাদের পছন্দনীয় নয়।
হযরত আসয়াদ হযরত মসআবকে আগেই বলেছিলেন যে, এমন একজন লোক আসছেন যিনি তার গোত্রের প্রভাবশালী নেতা। যদি তিনি তোমার কথা শোনেন, তবে তার পেছনে কেউ বাদ থাকবে না। এ কারণে হযরত মসআব হযরত সা'দকে বললেন, আপনি বসুন। কিছু কথা শুনুন। ভালো না লাগলে শুনবেন না। হযরত সা'দ বললেন, ঠিকই তো। একথা বলে তিনিও বর্শা মাটিতে পুঁতে বসে পড়লেন। হযরত মসআব তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন তেলাওয়াত করলেন। হযরত মসআব পরে বলেছেন, সা'দ বলার আগেই আমি তার চেহারায় ইসলামের চমক লক্ষ্য করেছি। সা'দ বললেন, তোমরা ইসলাম গ্রহণের পর কি করো? মসআব বললেন, আপনি গোসল করুন, এরপর পাক কাপড় পরুন, এরপর কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেবেন। তারপর দু' রাকাত নামায আদায় করবেন। তারপর সা'দ ইবনে ময়াা'য তাই করলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে হযরত সা'দ নিজের গোত্রের লোকদের কাছে ফিরে গেলেন। লোকেরা বললো, আপনি ভিন্ন চেহারায় ফিরে এসেছেন মনে হচ্ছে। হযরত সা'দ বললেন, তোমরা আমাকে কেমন লোক মনে করো, হে বনি আবদুল আশহাল? সবাই বললো আপনি হচ্ছেন আমাদের নেতা। বুদ্ধি-বিবেচনার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে বেশী। সা'দ ইবনে মায়া'য বললেন, আচ্ছা তবে শোনো, তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ রব্বুল আলামীন এবং তাঁর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ঈমান না আনবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের সাথে কথা বলা আমার জন্যে হারাম। বিকেল পর্যন্ত গোত্রের নারী পুরুষ সবাই ইসলাম গ্রহণ করলেন। উসাইরেম নামে একজন লোক সে সময় ঈমান আনেননি। তিনি ওহুদের যুদ্ধের দিনে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হন। তিনি কোন নামাযও আদায় করেননি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্পর্কে বলেছেন, অল্প আমল করে সে অনেক বেশী পুরস্কার পেয়েছে।
হযরত মসআব ও হযরত আসআদ ইবনে যোরারার ঘরে অবস্থান করেই ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন। এই দাওয়াতে আনসারদের প্রত্যেক পরিবারেই কয়েকজন করে নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করলেন। পরবর্তী হজ্জ মৌসুমে আসার আগে হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) সাফল্যের সুসংবাদ নিয়ে আল্লাহর রসূলের কাছে মক্কায় হাযির হন। তিনি প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ইয়াসরেবের গোত্রসমূহের অবস্থা, তাদের যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষার কৌশল এবং অন্যান্য যোগ্যতা সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য পেশ করেন।

টিকাঃ
৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৩৫ ২য় খন্ড পৃ. ৯০, যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৫১

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা

📄 দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা


নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে ৬২২ ঈসায়ী সালের জুন মাসে মদীনা থেকে ৭০ জন মুসলমান হজ্জ পালনের জন্যে মক্কায় আগমন করেন। এরা নিজ কওমের পৌত্তলিক হাজীদের সঙ্গে মক্কায় আসছিলেন। মদীনায় থাকার সময়েই অথবা মক্কায় আসার পথে তারা পরস্পরকে বললেন, কতোদিন পর্যন্ত প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমরা মক্কায় এভাবে কষ্টকর অবস্থায় ফেলে রাখবো? তিনি মক্কায় যেভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, সে সম্পর্কেও তারা আলোচনা করলেন।
মক্কায় পৌছার পর গোপনে তারা প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোপনে যোগাযোগ করলেন এবং সিদ্ধান্ত হলো যে, উভয় দল আইয়ামে তাশরিকের মাঝামাঝি ১২ই জিলহজ্জ তারিখে মিনার জামারায়ে উলায় অর্থাৎ জামরায়ে আকাবার ঘাঁটিতে একত্রিত হয়ে রাতের অন্ধকারে গোপন আলোচনা করবেন।
এই সম্মেলন ইসলাম ও মূর্তিপূজার সংঘাতের মধ্যে সময়ের গতিধারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। একজন আনসার নেতার মুখে সেই সম্মেলনের বিবরণী উল্লেখ করা যাচ্ছে।
হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.) বলেন, আমরা হজ্জ এর জন্যে বেরিয়েছিলাম। প্রিয় নবী আইয়ামে তাশরিকের মাঝে আকাবায় আমাদের সাথে কথা বলার সময় নির্ধারণ করলেন। অবশেষে, সেই রাত এলো, যে রাতে কথা বলার তারিখ ছিলো। আমাদের সাথে আমাদের সম্মানিত নেতা আবদুল্লাহ ইবনে হারামও ছিলেন। তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। আমরা তাকে সঙ্গে নিলাম। আমাদের সঙ্গী অমুসলিমদের কাছে এই সম্মেলনের বিষয় গোপন রাখা হয়েছিলো। আবদুল্লাহ ইবনে হারামের সাথে আমরা আলোচনা করে তাকে বললাম, হে আবু জাবের আপনি আমাদের একজন সম্মানিত নেতা। আপনার বর্তমান অবস্থা থেকে আমরা আপনাকে বের করতে চাই। অনন্তকাল দোযখের আগুন থেকে আপনি মুক্তি লাভ করবেন এটাই আমরা চাই। এরপর আমরা তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমাদের আলোচনার বিষয় তাঁকে জানালাম। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। এবং আমাদের সাথে আকাবায় গেলেন। তাঁকে নকিব মনোনীত করা হলো।

টিকাঃ
১. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪৪০

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 পরিস্থিতির নাজুকতার ব্যাখ্যা ও বাইয়াতের দফাসমূহ

📄 পরিস্থিতির নাজুকতার ব্যাখ্যা ও বাইয়াতের দফাসমূহ


সম্মেলন শুরু হলো। দ্বীনী এবং সামরিক সহায়তাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে আলোচনা শুরু হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আব্বাস প্রথমে কথা বললেন। তিনি চাচ্ছিলেন যে, পরিস্থিতির আলোকে দায়িত্বের গুরুত্বের প্রতি আলোকপাত করবেন। সেই গুরুদায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত হতে যাচ্ছিলো, তাদের সম্বোধন করে তিনি বললেন, মোহাম্মদ মোস্তফার যে মূল্য ও মর্যাদা রয়েছে, সেটা তোমরা জানো। আমাদের কওমের মধ্যে মোহাম্মদ প্রবর্তিত ধর্ম বিশ্বাস যারা সমর্থন করে না, মোহাম্মদকে তাদের কাছ থেকে আমরা দূরে রেখেছি। নিজ শহরে স্বজাতীয়দের মধ্যে তিনি নিরাপদে রয়েছেন। তিনি বর্তমানে তোমাদের কাছে যেতে চান। তোমাদের সাথে মিশতে চান, যদি তোমরা তাঁর নিরাপত্তা দিতে এবং বিরোধী পক্ষের হামলা থেকে তাঁকে হেফাযত করতে পারো তবে কিছু বলার নেই। তোমরা যে দায়িত্ব নিয়েছো, সে সম্পর্কে তোমরাই ভালো জানো। কিন্তু যদি তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করে থাকো, তবে এখনই চলে যাও। কেননা তিনি স্বজাতীয়দের মধ্যে নিজ শহরে নিরাপদেই রয়েছেন। তাঁর সম্মানও এখানে রয়েছে।
হযরত কা'ব (রা.) বলেন, আমরা হযরত আব্বাসকে বললাম যে, আপনার কথা আমরা শুনেছি। 'হে আল্লাহর রসূল, এবার আপনি কথা বলুন। আপনি নিজের এবং আপনার প্রতিপালকের জন্যে আমাদের কাছ থেকে যে অঙ্গীকার নিতে চান, তাই নিন।'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা শুরু করলেন। তিনি প্রথমে কোরআন তেলাওয়াত করলেন। আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিলেন। এরপর বাইয়াত হলো।
বাইয়াতের দফাসমূহ
বাইয়াতের ঘটনা ইমাম আহমদ হযরত জাবের (রা.) থেকে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। হযরত জাবের (রা.) বলেন, আমরা বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল, আমরা আপনার কাছে কি কি বিষয়ের ওপর বাইয়াত করবো? তিনি বললেন, নিম্নোক্ত বিষয়াবলীর ওপর।
১. ভালোমন্দ সকল অবস্থায় আমার কথা শুনবে এবং মানবে।
২. স্বচ্ছলতা অস্বচ্ছলতা উভয় অবস্থায়ই ধন-সম্পদ ব্যয় করবে।
৩. সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে।
৪. আল্লাহর পথে উঠে দাঁড়াবে এবং আল্লাহর ব্যাপারে কারো ভয়ভীতি প্রদর্শনে পিছিয়ে যাবে না।
৫. তোমাদের কাছে যাওয়ার পর আমাকে সাহায্য করবে এবং নিজেদের প্রাণ ও সন্তানদের হেফাযতের মতোই আমার হেফাযত করবে এতে তোমাদের জন্যে জান্নাত রয়েছে।
ইবনে ইসহাক উল্লেখিত হযরত কা'ব এর বর্ণনা শুধু পঞ্চম দফায় উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরআন তেলাওয়াত দ্বারা আল্লাহর প্রতি দাওয়াত এবং ইসলামের প্রতি তাকিদ দিয়ে বললেন, আমি তোমাদের কাছে এ মর্মে বাইয়াত নিচ্ছি যে, তোমরা যে জিনিস দ্বারা নিজেদের সন্তানদের হেফাযত করে থাকো, সেই জিনিস দিয়ে আমারও হেফাযত করবে। এ কথা শুনে হযরত কাব ইবনে মা'রুর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত ধরে বললেন, হাঁ, সেই জাতের শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন, আমরা অবশ্যই সেই জিনিস দ্বারা আপনার হেফাযত করবো, যা দ্বারা নিজেদের সন্তানদের হেফাযত করি। কাজেই হে আল্লাহর রসূল, আপনি আমাদের কাছে বাইয়াত নিন। খোদার কসম, আমরা যুদ্ধের পুত্র, (অর্থাৎ যুদ্ধের ছায়ায় আমরা জন্ম লাভ করেছি), হাতিয়ার হচ্ছে আমাদের খেলনা এবং পূর্বপুরুষের সময় থেকেই এ অবস্থা চলে আসছে।
হযরত কা'ব বলেন, তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলছিলেন, এমন সময় আবুল তায়াহাল ইবনে তাইহান বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ইহুদীদের সাথে চুক্তি রয়েছে, আমরা তার রজ্জু কেটে ফেলবো। আমরা ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম, এরপর আল্লাহ তায়ালা আপনাকে জয়যুক্ত করলে আপনি আমাদের ছেড়ে স্বজাতীয়দের কাছে ফিরে আসবেন না তো?
এ কথা শুনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হেসে বললেন না, তা হবে না তোমাদের রক্ত আমার রক্ত এবং তোমাদের ধ্বংস আমার ধ্বংস হিসাবে গণ্য হবে। আমি তোমাদের অন্তর্ভুক্ত, আর তোমরা আমার অন্তর্ভুক্ত। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করবো, তোমরা যাদের সাথে সন্ধি করবে, আমিও তাদের সাথে সন্ধি করবো।

টিকাঃ
২ ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৪০-৪৪১
৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৪২
৪. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল 'হাছান সনদের' সাথে এ বর্ণনা করেছেন। ইমাম হাকেম ও ইবনে হাব্বান বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন। ইবনে হিশাম ১ম খন্ড দেখুন

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00