📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মক্কার বাইরে ইসলামের আলো

📄 মক্কার বাইরে ইসলামের আলো


রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন গোত্র এবং প্রতিনিধিদলকেই শুধু নয়, বহু ব্যক্তিকেও ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। এদের অনেকে ভালো জবাবও দিয়েছিলেন। হজ্জ মৌসুমের অল্পকাল পর কিছুসংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। নীচে এ সম্পর্কিত একটি সংক্ষিপ্ত রোয়েদাদ পেশ করা হচ্ছে।
এক) সুয়াইদ ইবনে সামেত, এই লোক ছিলো কবি এবং যথেষ্ট বুদ্ধি বিবেচনাও রাখতো। সে ছিলো ইয়াসরেবের অধিবাসী। বুদ্ধিমত্তা, কাব্যচর্চা, আভিজাত্য এবং বংশ মর্যাদার কারণে তার কওমের লোকেরা তাকে কামেল উপাধিতে ভূষিত করেছিলো। এই লোকটি হজ্জ বা ওমরাহ করার জন্যে মক্কায় এসেছিলো। আল্লাহর রসূল তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়োছলেন। সে বললো, আমার কাছে যে জিনিস আছে, সম্ভবত আপনার কাছেও সেই জিনিসই রয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার কাছে কি রয়েছে? সে বললো, লোকমানের হেকমত। আল্লাহর রসূল বললেন, শোনাও তো। সুয়াইদ শোনালো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ বাণী উত্তম, কিন্তু আমার কাছে যা রয়েছে, সেটা এর চেয়েও উত্তম। আমার কাছে রয়েছে কোরআন। এই কোরআন আল্লাহ আমার ওপর নাযিল করেছেন। এটি হচ্ছে হেদায়াতের নূর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর লোকটিকে কোরআনের কিছু অংশ শোনালেন। এরপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করে বললেন, এটা তো চমৎকার কালাম। নবুয়তের একাদশ বর্ষের প্রথমদিকে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর সুয়াইদ মদীনায় ফিরে এলে বুআস' যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।
দুই) ইয়াশ ইবনে মায়া'য, এই ব্যক্তিও ছিলেন ইয়াসরেবের অধিবাসী। বয়সে ছিলেন যুবক। নবুয়তের একাদশ বর্ষে বুআস যুদ্ধের কিছুকাল আগে আওসের একটি প্রতিনিধিদল খাযরাজের বিরুদ্ধে কোরায়শদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশায় মক্কায় আসে। ইয়াশও তাদের সঙ্গে ছিলেন। সে সময় এ উভয় গোত্রের মধ্যে শত্রুতার আগুন জ্বলে উঠেছিলো। আওসের লোকসংখ্যা ছিলো খাযরাজের চেয়ে কম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ প্রতিনিধিদলের আগমন সংবাদ শোনার পর দেখা করতে গেলেন। তাদের মাঝখানে গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনারা যে উদ্দেশ্যে মক্কায় এসেছেন, এর চেয়ে ভালো কোন জিনিস গ্রহণে রাযি আছেন কি? তারা বললো, কি সেই জিনিস? আল্লাহর রসূল বললেন, আমি আল্লাহর রসূল। আল্লাহ তায়ালা আমাকে তাঁর বান্দাদের কাছে এ দাওয়াত দেয়ার জন্যে প্রেরণ করেছেন যে, তারা যেন আল্লাহর এবাদাত করে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করে। আল্লাহ তায়ালা আমার উপর কেতাবও নাযিল করেছেন। এরপর তিনি ইসলামের কথা উল্লেখ করে কোরআন তেলাওয়াত করেন।
ইয়াশ ইবনে মায়া'য বললেন, হে কওম, আপনারা যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন, এই দাওয়াত তার চেয়ে উত্তম। প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য আবুল হাছির আনাস ইবনে রাফে একমুঠো খড় ইয়াশের মুখে ছুঁড়ে দিয়ে বললো, এসব কথা ছাড়ো। আমার বয়সের শপথ, এখানে আমরা অন্য উদ্দেশ্যে এসেছি। এরপর ইয়াশ আর কোন কথা বলেননি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও উঠে চলে গেলেন। এদিকে প্রতিনিধিদল কোরায়শদের সাথে মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি করতেও সক্ষম হয়নি। তারা ব্যর্থ হয়ে মদীনায় ফিরে গেলো।
তিন) আবুযর গেফারী, এই ব্যক্তি শহর থেকে দূরের এক জায়গায় বসবাস করতেন। সুয়াইদ ইবনে সামেত এবং ইয়াশ ইবনে মায়া'য এর কাছ থেকে আবু যর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের খবর পেয়েছিলেন। এ খবরই ছিলো তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ।
তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বোখারী শরীফে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা মতে আবু যর বলেন, আমি ছিলাম গেফার গোত্রের লোক। আমি শুনলাম এমন একজন লোক আবির্ভূত হয়েছেন, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন। এ খবর শুনে আমার ভাইকে মক্কায় পাঠালাম। তাকে বলে দিলাম, তুমি সেই ব্যক্তির সাথে দেখা করবে এরপর আমার কাছে তার খবর নিয়ে আসবে। আমার ভাই মক্কায় থেকে ফিরে এলে জিজ্ঞাসা করলাম, কি খবর এনেছো? সে বললো, খোদার কসম, আমি এমন একজন মানুষ দেখেছি, যিনি সৎ কাজের আদেশ দিয়ে থাকেন এবং খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখেন। আমি বললাম, তুমি স্বস্তি পাওয়ার মতো খবর দিতে পারোনি। এরপর আমি কিছু পাথেয় সম্বল করে মক্কায় পথে রওয়ানা হয়ে সেখানে হাযির হলাম। কিন্তু সেখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিনতে পারলাম না। কারো কাছে জিজ্ঞাসা করতেও সাহস পেলাম না। যমযমের পানি পান করে মসজিদে হারামে পড়ে রইলাম। হযরত আলী (রা.) দেখে বললেন, আপনাকে অচেনা মনে হচ্ছে। আমি বললাম, জ্বী হাঁ। তিনি বললেন, আমার ঘরে চলুন। আমি তাঁর সাথে গেলাম। তিনি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না, আমিও কিছু বললাম না।
সকালে আবার মসজিদে হারামে গেলাম। আশা ছিলো যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবো। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে কেউ আমাকে কিছু বললো না। সন্ধ্যায় হযরত আলী (রা.) এসে আমাকে দেখে বললেন, এই লোকটি এখনো নিজের ঠিকানা জানতে পারেনি? আমি বললাম, হাঁ তাই, এখনো পারেনি। তিনি বললেন, চলুন, আমার সাথে চলুন। এরপর তিনি বললেন, কি ব্যাপার আপনার, বলুন তো? আপনি এ শহরে কেন এসেছেন? আমি বললাম, আপনি যদি কথাটা গোপন রাখেন, তবে বলতে পারি। তিনি বললেন, ঠিক আছে। আমি বললাম, এখানে একজন লোক নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন বলে আমি খবর পেয়েছি। খবর পাওয়ার পর আমি আমার ভাইকে পাঠিয়েছিলাম কিন্তু সে আমাকে বিস্তারিত কোন খবর জানাতে পারেনি এ কারণে নিজেই এসেছি। হযরত আলী (রা.) বললেন, আপনি ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। আমার সাথে চলুন। যেখানে আমি প্রবেশ করবো, আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন। যাওয়ার পথে যদি কোন লোকের কারণে আপনার আশঙ্কার কারণ দেখা দেয় তবে আমি দোকানের কাছে যাব এবং জুতো ঠিক করার ভান করবো। সে সময়ে আপনি পথ চলতে থাকবেন। এরপর হযরত আলী (রা.) রওয়ানা হলেন, আমিও তার সাথে রওয়ানা হলাম। অবশেষে তিনি ঘরে প্রবেশ করলে আমিও তার সাথে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম। তাঁকে বললাম, আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিন। আল্লাহর রসূল আমার কাছে ইসলাম পেশ করলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেলাম। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, হে আবু যর, তোমার ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখো এবং তোমার এলাকায় চলে যাও। আমরা প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করেছি, এ খবর শোনার পর আমাদের সাথে এসে দেখা করবে। আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি কাফেরদের সামনে প্রকাশ্যে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করবো। এ কথা বলার পর আমি কাবাঘরের সামনে এলাম। কোরায়শরা সেখানে উপস্থিত ছিলো। আমি তাদের বললাম, তোমরা শোনো, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই এবং মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রসূল।
এই ঘোষণার পর কোরায়শরা পরস্পর বলাবলি করলো যে, ওঠো, তোমরা এই বেদ্বীনের খবর নাও। এরপর তারা আমাকে এমনভাবে প্রহার করলো যে, ভেবেছিলাম মরেই যাবো। এ অবস্থায় হযরত আব্বাস (রা.) এসে আমাকে বাঁচালেন। তিনি একটুখানি ঝুঁকে আমাকে দেখলেন। এরপর কোরায়শদের বললেন, এই লোক তো গেফার গোত্রের। তোমরা এ গোত্রের এলাকার ওপর দিয়েই ব্যবসা করতে যাও। এ কথা শুনে পৌত্তলিক কোরায়শরা আমাকে ছেড়ে দিলো। পরদিনও আমি সেখানে গেলাম এবং একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। এবারও হযরত আব্বাস (রা.) এসে আমাকে উদ্ধার করলেন।
৪) তোফায়েল ইবনে আমর দাওসি, এই লোক ছিলেন কবি, বুদ্ধি বিবেচনায় বিশিষ্ট ব্যাক্ত এবং তাঁর গোত্রের সর্দার। এই গোত্র ইয়েমেনের কিছু এলাকায় শাসন ক্ষমতার অধিকারী ছিলো।
নবুয়তের একাদশ বর্ষে তিনি মক্কায় গেলে মক্কায় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে অভ্যর্থনা জানায় এবং তার কাছে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে নালিশ করে। তারা বলে যে, এই লোক আমাদের জটিল-অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে, তার কথায় রয়েছে যাদুর মতো প্রভাব। এতে ভাই ভাইয়ের মধ্যে এবং স্বামী স্ত্রীর মধ্যে, পিতা পুত্রের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি, যে বিপদে আমরা পড়েছি, আপনিও সেই বিপদে পড়েন কিনা। কাজেই আপনার কাছে আবেদন এ লোকের সাথে কোন কথাই বলবেন না।
হযরত তোফায়েল (রা.) বলেন, কোরায়শ পৌত্তলিকরা আমাকে নানাভাবে বোঝালো, এক সময় আমি সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম যে, আল্লাহর রসূলের সাথে কথাও বলবো না তাঁর কোন কথাও শুনবো না। সকালে মসজিদে হারামে যাওয়ার পর কানে তুলো গুঁজে দিয়েছিলাম যাতে আল্লাহর রসূলের কোন কথা আমার কানে না যায়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু কথা আমাকে শোনানোর ইচ্ছা করেছিলেন। এরপর আমি কিছু ভালো কথা শুনলাম। মনে মনে বললাম, আমি তো বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষ। খ্যাতনামা কবি। ভালমন্দ কোন কিছুই তো আমার কাছে গোপন থাকতে পারে না। কেন আমি ভালো কথা শুনবো না? যদি গ্রহণযোগ্য হয়, তবে গ্রহণ করবো। মন্দ হলে গ্রহণ করবো না। এ কথা ভেবে চুপচাপ থাকলাম। আল্লাহর রসূল ঘরে ফিরতে শুরু করলে তাঁর পিছু নিলাম। তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন, আমিও প্রবেশ করলাম। এরপর লোকেরা আমাকে তাঁর ব্যাপারে যে সতর্ক করেছিলো এবং সতর্কতা হিসেবে নিজের কানে যে তুলো গুঁজে দিয়েছিলাম, সেসব কথা তাঁকে শোনালাম। এরপর বললাম, আপনি সবাইকে যে কথা বলে থাকেন আমাকেও বলুন। আল্লাহর রসূল আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন পাঠ করে শোনালেন। আমি সাথে সাথেই ইসলাম গ্রহণ করলাম। আল্লাহর শপথ, আমি এর চেয়ে ভালো কথা আগে কখনো শুনিনি। আমি সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করে সত্যের সাক্ষ্য দিলাম। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, আমার কওমের কাছে আমার কথা গ্রহণযোগ্য, তারা আমাকে যথেষ্ট মান্য করে। আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদরেকে দ্বীনের দাওয়াত দেবো। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে কোন নিদর্শন দেখান। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করলেন।
হযরত তোফায়েল (রা.)-কে যে নিদর্শন দেয়া হয়েছিলো, সেটা এই যে, তিনি তাঁর কওমের কাছাকাছি পৌছার পর তাঁর চেহারা চেরাগের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিলো। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, অন্য কোথাও এ আলো স্থানান্তর করে দিন, অন্যথায় চেহারা বিকৃত হওয়ার অপবাদ দিয়ে ওরা আমার সমালোচনা করবে। এরপর সেই আলো আমার হাতের লাঠির মধ্যে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। হযরত তোফায়েল (রা.) তার পিতা এবং স্ত্রীর কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন, এতে তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে তাঁর কওমের লোকেরা ইসলাম গ্রহণে দেরী করে। কিন্তু হযরত তোফায়েল (রা.) ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যান। খন্দকের যুদ্ধের পর তিনি যখন হিজরত করেন সে সময় তাঁর কওমের সত্তর বা আশি পরিবার তাঁর সঙ্গে ছিলো। হযরত তোফায়েল (রা.) ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
পাঁচ) জেমাদ আযদি: এই ব্যক্তি ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী এবং আযদ শানওয়াহ গোত্রের মানুষ। ঝাঁড় ফুঁক এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর কাজ করতেন। মক্কায় এসে সেখানকার নির্বোধদের কাছে শুনতে পান যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাগল। আল্লাহর রসূলের কাছে তিনি এ উদ্দেশ্যে গেলেন যে, হয়তো আল্লাহর রসূল তার হাতে ভালো হয়ে যাবেন। আল্লাহর রসূলের সাথে দেখা করে তিনি বললেন, আমি ঝাড় ফুঁক জানি, আপনার কি এর প্রয়োজন আছে? জবাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, আমি তাঁর প্রশংসা করি এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। আল্লাহ তায়ালা যাকে হেদায়াত করেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন কেউ তাকে হেদায়াত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরিক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিতেছি যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রসূল।'
জেমাদ তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, আপনার কথাগুলো আমাকে পুনরায় শুনিয়ে দিন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথাগুলো তিনবার শোনালেন। জেমাদ বললেন, আমি যাদুকরদের জ্যোতিষীদের কথা শুনেছি, কিন্তু আপনি যেসব কথা বললেন, এ ধরনের কথা কোথাও শুনিনি। আপনার কথাতো সমুদ্রের অতলস্পর্শী গভীরতা থেকে উৎসারিত। দিন আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার হাতে ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ করবো। এরপর জেমাদ আयदि ইসলাম গ্রহণ করেন।
মদীনার ছয়জন পুণ্যশীল মানুষ নবুয়তের একাদশ বর্ষে অর্থাৎ ৬২০ ঈসায়ী সালে জুলাই মাসের হজ্জ মওসুমে ইসলামের দাওয়াতের ফলপ্রসূ বিস্তার ঘটে। এ সময়ে সে দাওয়াত একটি মহীরূহে পরিণত হয়। সেই গাছের ঘন পত্রপল্লবের ছায়ায় মুসলমানরা দীর্ঘদিনের অত্যাচার নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভ করেন। মক্কার অধিবাসীরা আল্লাহর রসূলকে অবিশ্বাস করা এবং লোকদের আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার যে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলো তা থেকে পরিত্রাণ পেতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৌশলের আশ্রয় নেন। এ সময়ে তিনি রাত্রিকালে বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তাই মক্কার পৌত্তলিকরা তাঁর পথে বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনি।
এ কৌশলের একপর্যায়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে একরাতে মক্কার বাইরে বনু যোহাল এবং বনু শায়বান ইবনে ছালাবা গোত্রের লোকদের বাড়ীতে গিয়ে তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন। জবাবে তারা আশাব্যঞ্জক কথা বলে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন সাড়া দেয়নি। এ সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক এবং বনু যোহাল গোত্রের একজন লোকের মধ্যে বংশধারা সম্পর্কে চিত্তাকর্ষক প্রশ্নোত্তর ঘটে। উভয়েই ছিলেন বংশধারা বিশেষজ্ঞ।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর মিনার পাহাড়ী এলাকা অতিক্রমের সময় কয়েকজন লোককে আলাপ করতে শোনেন। তিনি সোজা তাদের কাছে যান। এরা ছিলো মদীনার ছয়জন যুবক। এরা ছিলো খাযরাজ গোত্রের সাথে সম্পর্কিত। তাদের নাম ও পরিচয় এই,
ক্রঃ নম্বর নাম গোত্রের নাম ১ আসয়াদ ইবনে যোরারাহ বনু নাজ্জার ২ আউন ইবনে হারেস ইবনে রেফায়া' (ইবনে আফরা) বনু নাজ্জার ৩ রাফে ইবনে মালেক ইবনে আযলান বনু যোরায়েক ৪ কোতবা ইবনে আমের ইবনে হাদিদা বনু সালমা ৫ ওকবা ইবনে আমের ইবনে নাবি বনু হারাম ইবনে কা'ব ৬ হারেস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে রেআব বনু ওবায়েদ ইবনে গানাম
এসব যুবক তাদের প্রতিপক্ষ মদীনার ইহুদীদের কাছে শুনতো যে, সেই যুগে একজন নবী আসবেন। তারা একথাও শুনেছিলো যে, তিনি সহসা আবির্ভূত হবেন।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে গিয়ে তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বললো, আমরা খাযরাজ গোত্রের লোক। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইহুদীদের প্রতিপক্ষ? তারা বললো, হাঁ! আল্লাহর রসূল বললেন, তোমরা একটু বসো, আমি কিছু কথা বলি। তারা বসলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছে দ্বীন ইসলামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন, আল্লাহর পথে দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন পাঠ করে শোনালেন। সেই ছয়জন যুবক পরস্পরকে বললো, এই তো মনে হয় সেই নবী, যার কথা উল্লেখ করে ইহুদীরা আমাদের ধমক দিয়ে থাকে। ইহুদীরা যেন আমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে আমাদের সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর সেই ছয় ভাগ্যবান যুবক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত কবুল করে ইসলাম গ্রহণ করেন।
এই ছয়জন ছিলেন মদীনার বিবেকসম্পন্ন মানুষ। এর কিছুদিন আগে মদীনায় একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, সেই যুদ্ধের ধোঁয়া তখনো মিলিয়ে যায়নি। সেই যুদ্ধ এদেরকে তছনছ করে দিয়েছিলো। এ কারণে তারা সঙ্গত কারণেই আশা করেছিলো যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত যুদ্ধ সমাপ্তির হিসেবে প্রমাণিত হবে। তারা বললেন, আমরা আমাদের কওমকে এমন অবস্থায় রেখে এসেছি যে, তারা শত্রু পরিবেষ্টিত। অন্য কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ ধরনের শত্রুতা আছে বলে মনে হয় না। আমরা আশা করি যে, আপনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাদের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন সৃষ্টি করবেন। মদীনায় ফিরে গিয়ে আমরা তাদেরকে আপনার প্রচারিত দ্বীনের পথে আহ্বান জানাবো। আমরা আপনার কাছ থেকে যে দ্বীন গ্রহণ করেছি, এই দ্বীন গ্রহণ করার জন্যে তাদেরও দাওয়াত দেবো। যদি আল্লাহ তায়ালা আপনার মাধ্যমে তাদের ঐক্যবদ্ধ করেন, তবে আপনার চেয়ে সম্মানিত অন্য কেউই হবে না।
এই ছয়জন নও মুসলিম মদীনায় ফিরে যাওয়ার সময় ইসলামের দাওয়াত সাথে নিয়ে গেলেন। এদের মাধ্যমে মদীনার ঘরে ঘরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব ও দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়লো।

টিকাঃ
৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪২৫-৪২৭ রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃ. ৭৪
৫. একথা আকবর নদীরাবাদী লিখেছেন। তারীখুল ইসলাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১২৮ দেখুন
৬. সহীহ বোখারী, যমযমের কাহিনী অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৯৯ আবূ জরের ইসলাম গ্রহণ অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪৪-৫৪৫
৭. হোদায়বিয়ার সন্ধির পরে তিনি হিজরত করেন। তিনি যখন মদীনায় যান সে সময় আল্লাহর রসূল খয়বরে ছিলেন।
৮. মেশকাতুল মাসাবিহ
৯. সহীহ মুসলিম, মেশকাতুল মাসাবিহ, ২য় খন্ড পৃঃ ৫২৫
১০. মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃঃ ১৫০-১৫২
১১. রহমাতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড পৃঃ ৮৪
১২. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃঃ ৫০, ইবনে সালাম ১ম খন্ড, পৃঃ ৪২৯-৫৪১
১৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪২৮-৪৪৩

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মদীনার ছয়জন পুণ্যশীল মানুষ

📄 মদীনার ছয়জন পুণ্যশীল মানুষ


নবুয়তের একাদশ বর্ষে অর্থাৎ ৬২০ ঈসায়ী সালে জুলাই মাসের হজ্জ মওসুমে ইসলামের দাওয়াতের ফলপ্রসূ বিস্তার ঘটে। এ সময়ে সে দাওয়াত একটি মহীরূহে পরিণত হয়। সেই গাছের ঘন পত্রপল্লবের ছায়ায় মুসলমানরা দীর্ঘদিনের অত্যাচার নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভ করেন। মক্কার অধিবাসীরা আল্লাহর রসূলকে অবিশ্বাস করা এবং লোকদের আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার যে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলো তা থেকে পরিত্রাণ পেতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৌশলের আশ্রয় নেন। এ সময়ে তিনি রাত্রিকালে বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তাই মক্কার পৌত্তলিকরা তাঁর পথে বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনি।
এ কৌশলের একপর্যায়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে একরাতে মক্কার বাইরে বনু যোহাল এবং বনু শায়বান ইবনে ছালাবা গোত্রের লোকদের বাড়ীতে গিয়ে তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন। জবাবে তারা আশাব্যঞ্জক কথা বলে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন সাড়া দেয়নি। এ সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক এবং বনু যোহাল গোত্রের একজন লোকের মধ্যে বংশধারা সম্পর্কে চিত্তাকর্ষক প্রশ্নোত্তর ঘটে। উভয়েই ছিলেন বংশধারা বিশেষজ্ঞ।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর মিনার পাহাড়ী এলাকা অতিক্রমের সময় কয়েকজন লোককে আলাপ করতে শোনেন। তিনি সোজা তাদের কাছে যান। এরা ছিলো মদীনার ছয়জন যুবক। এরা ছিলো খাযরাজ গোত্রের সাথে সম্পর্কিত। তাদের নাম ও পরিচয় এই,

১. আসয়াদ ইবনে যোরারাহ বনু নাজ্জার
২. আউন ইবনে হারেস ইবনে রেফায়া' (ইবনে আফরা) বনু নাজ্জার
৩. রাফে ইবনে মালেক ইবনে আযলান বনু যোরায়েক
৪. কোতবা ইবনে আমের ইবনে হাদিদা বনু সালমা
৫. ওকবা ইবনে আমের ইবনে নাবি বনু হারাম ইবনে কা'ব
৬. হারেস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে রেআব বনু ওবায়েদ ইবনে গানাম

এসব যুবক তাদের প্রতিপক্ষ মদীনার ইহুদীদের কাছে শুনতো যে, সেই যুগে একজন নবী আসবেন। তারা একথাও শুনেছিলো যে, তিনি সহসা আবির্ভূত হবেন।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে গিয়ে তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বললো, আমরা খাযরাজ গোত্রের লোক। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইহুদীদের প্রতিপক্ষ? তারা বললো, হাঁ! আল্লাহর রসূল বললেন, তোমরা একটু বসো, আমি কিছু কথা বলি। তারা বসলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছে দ্বীন ইসলামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন, আল্লাহর পথে দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন পাঠ করে শোনালেন। সেই ছয়জন যুবক পরস্পরকে বললো, এই তো মনে হয় সেই নবী, যার কথা উল্লেখ করে ইহুদীরা আমাদের ধমক দিয়ে থাকে। ইহুদীরা যেন আমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে আমাদের সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর সেই ছয় ভাগ্যবান যুবক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত কবুল করে ইসলাম গ্রহণ করেন।
এই ছয়জন ছিলেন মদীনার বিবেকসম্পন্ন মানুষ। এর কিছুদিন আগে মদীনায় একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, সেই যুদ্ধের ধোঁয়া তখনো মিলিয়ে যায়নি। সেই যুদ্ধ এদেরকে তছনছ করে দিয়েছিলো। এ কারণে তারা সঙ্গত কারণেই আশা করেছিলো যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত যুদ্ধ সমাপ্তির হিসেবে প্রমাণিত হবে। তারা বললেন, আমরা আমাদের কওমকে এমন অবস্থায় রেখে এসেছি যে, তারা শত্রু পরিবেষ্টিত। অন্য কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ ধরনের শত্রুতা আছে বলে মনে হয় না। আমরা আশা করি যে, আপনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাদের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন সৃষ্টি করবেন। মদীনায় ফিরে গিয়ে আমরা তাদেরকে আপনার প্রচারিত দ্বীনের পথে আহ্বান জানাবো। আমরা আপনার কাছ থেকে যে দ্বীন গ্রহণ করেছি, এই দ্বীন গ্রহণ করার জন্যে তাদেরও দাওয়াত দেবো। যদি আল্লাহ তায়ালা আপনার মাধ্যমে তাদের ঐক্যবদ্ধ করেন, তবে আপনার চেয়ে সম্মানিত অন্য কেউই হবে না।
এই ছয়জন নও মুসলিম মদীনায় ফিরে যাওয়ার সময় ইসলামের দাওয়াত সাথে নিয়ে গেলেন। এদের মাধ্যমে মদীনার ঘরে ঘরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব ও দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়লো।

টিকাঃ
১০. মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃঃ ১৫০-১৫২
১১. রহমাতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড পৃঃ ৮৪
১২. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃঃ ৫০, ইবনে সালাম ১ম খন্ড, পৃঃ ৪২৯-৫৪১
১৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪২৮-৪৪৩

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে বিয়ে ও মে'রাজের ঘটনা

📄 হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে বিয়ে ও মে'রাজের ঘটনা


সেই বছরেই অর্থাৎ নবুয়তের একাদশ বর্ষের শাওয়াল মাসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত আয়েশার বয়স ছিলো তখন মাত্র ছয় বছর। হিজরতের আগের বছর শাওয়াল মাসে হযরত আয়েশা (রা.) স্বামী গৃহে গমন করেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিলো নয় বছর।
মেরাজ-এর ঘটনা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত ও তাবলীগের সাফল্য এবং তাঁর এবং ইসলামের অনুসারীদের প্রতি অত্যাচার নির্যাতন মাঝামাঝি পর্যায়ে চলছিলো, দূর দিগন্তে মিটিমিটি জ্বলছিলো তারার আলো, এমনি সময়ে মেরাজের রহস্যময় ঘটনা ঘটলো। এই মেরাজ কবে সংঘটিত হয়েছিলো? এ সম্পর্কে সীরাত রচয়িতাদের মতামতের বিভিন্নতা রয়েছে। যেমন- এক) তিবরানি বলেছেন, যে বছর নবী সাইয়েদুল মুরসালিনকে নবুয়ত দেয়া হয়, সে বছরই। দুই) ইমাম নববী এবং ইমাম কুরতুবী লিখেছেন, নবুয়তের পাঁচ বছর পর। তিন) হিজরতের ১৬ মাস আগে অর্থাৎ নবুয়তের দ্বাদশ বছরে রমযান মাসে। চার) নবুয়তের দশম বর্ষে ২৭শে রযবে। আল্লামা মনসুরপুরী এ অভিমত গ্রহণ করেছেন। পাঁচ) হিজরতের এক বছর দুই মাস আগে। অর্থাৎ নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষের মহররম মাসে। ছয়) হিজরতের এক বছর আগে অর্থাৎ নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসে।
উল্লিখিত বক্তব্যসমূহের মধ্যে তিনটি বক্তব্যকে সঠিক বলে মেনে নেয়া যায়। পাঞ্জেগানা নামায ফরয হওয়ার আগে হযরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল হয়েছিলো আর এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, পাঞ্জেগানা নামায মেরাজের রাতে ফরয করা হয়। এর অর্থ হচ্ছে যে, হযরত খাদিজার মৃত্যু মেরাজের আগেই হয়েছিলো। তাঁর মৃত্যু নবুয়তের দশম বর্ষের রমযান মাসে হয়েছিলো বলে জানা যায়। কাজেই মেরাজের ঘটনা এর পরেই ঘটেছে, আগে নয়। শেষোক্ত তিনটি বক্তব্যের কোনটিকে কোনটির ওপর প্রাধান্য দেয়ার মতো, তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোরআন হাদীসে বর্ণিত এ সম্পর্কিত বিবরণ উল্লেখ করবো।
ইবনে কাইয়েম লিখেছেন, সঠিক বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায় যে, নবী সাইয়েদুল মুরসালিনকে স্বশরীরে বোরাকে তুলে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সঙ্গে মসজিদে হারাম থেকে প্রথমে বায়তুল মাকদেস পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয়। প্রিয় নবী সেখানে মসজিদের দরজার খুঁটির সাথে বোরাক বেঁধে যাত্রা বিরতি করেন এবং সকল নবীর ইমাম হয়ে নামায আদায় করেন।
এরপর সেই রাতেই তাঁকে বায়তুল মাকদেস থেকে প্রথম আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। হযরত জিবরাঈল (আ.) দরজা খোলেন। প্রিয় নবী সেখানে হযরত আদম (আ.)-কে দেখে সালাম করেন। হযরত আদম (আ.) তাঁকে মারহাবা বলে সালামের জবাব দেন। তাঁর নবুয়তের স্বীকারোক্তি করেন। সে সময় আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-এর ডানদিকে নেককার এবং বামদিকে পাপীদের রূহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখান। এরপর তিনি দ্বিতীয় আসমানে যান। দরজা খুলে দেয়া হয়। প্রিয় নবী সেখানে হযরত ইয়াহিয়া ইবনে যাকারিয়া (আ.) এবং হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)-কে দেখে সালাম করেন। তাঁরা সালামের জবাব দিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের কথা স্বীকার করেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর যান চতুর্থ আসমানে। সেখানে তিনি হযরত ইদরিস (আ.)-কে দেখে সালাম করেন। তিনি সালামের জবাবে তাকে মোবারকবাদ দেন এবং তাঁর নবুয়তের কথা স্বীকার করেন।
এরপর তাঁকে পঞ্চম আসমানে নেয়া হয়। সেখানে তিনি হযরত হারুন (আ.)-কে দেখে সালাম দেন। তিনি সালামের জবাবে মোবারকবাদ দেন এবং তাঁর নবুয়তের কথা স্বীকার করেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এরপর নেয়া হয় ষষ্ঠ আসমানে। সেখানে হযরত মূসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি সালাম করেন। হযরত মূসা (আ.) মারহাবা বলেন এবং নবুয়তের কথা স্বীকার করেন। নবী মুরসালিন সামনে অগ্রসর হলেন, এ সময় হযরত মূসা (আ.) কাঁদতে লাগলেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, একজন নবী যিনি আমার পরে আবির্ভূত হয়েছেন তার উম্মতেরা আমার উম্মতদের চেয়ে সংখ্যায় বেশী বেহেশতে যাবে।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর নিয়ে যাওয়া হয় সপ্তম আসমানে। সেখানে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সাথে তাঁর দেখা হয়। তিনি তাঁকে সালাম করেন। তিনি জবাব দেন, মোবারকবাদ দেন এবং তাঁর নবুয়তের কথা স্বীকার করেন।
এবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সেদরাতুল মুনতাহা'য় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আল্লাহর এতো কাছাকাছি পৌঁছেন যে, উভয়ের মধ্যে দুটি ধনুক বা তারও কম ব্যবধান ছিলো। সেই সময় আল্লাহ তায়ালা তার যা কিছু দেয়ার দিয়ে দেন, যা ইচ্ছা ওহী নাযিল করেন এবং পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করেন। ফেরার পথে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে দেখা হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন আল্লাহ তায়ালা আপনাকে কি কাজের আদেশ দিয়েছেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায আদায়ের আদেশ দিয়েছেন। হযরত মূসা (আ.) বললেন, আপনার উম্মত এতো নামায আদায় করার শক্তি রাখে না। আপনি আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে নামায কমিয়ে দেয়ার আবেদন করুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর দিকে তাকালেন, তিনি ইশারা করলেন। এরপর ফিরে গিয়ে নামাযের সংখ্যা কমিয়ে দেয়ার আবেদন জানালেন। হযরত মূসা (আ.)-এর সাথে আবার ফেরার পথে দেখা। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর কাছ থেকে কি আদেশ নিয়ে যাচ্ছেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পঁয়তাল্লিশ ওয়াক্ত নামাযের কথা বললেন। হযরত মূসা (আ.) বললেন, আপনি ফিরে যান, এমনি করে বারবার ফিরে যাওয়ার এবং নামায কম করার হার একপর্যায়ে সংখ্যা দাঁড়ালো পাঁচ। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও হযরত মূসা (আ.) বেশী মনে করলেন এবং আরো কমিয়ে আনার আবেদন জানানোর জন্যে ফিরে যেতে বললেন। হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে, আমি আর যেতে চাই না। আমি আল্লাহর এই আদেশের ওপরই মাথা নত করলাম। ফেরার পথে কিছুদূর আসার পর আওয়ায হলো, আমি আমার ফরয নির্ধারণ করে দিয়েছি এবং আমার বান্দাদের জন্যে কমিয়ে দিয়েছি।
আল্লামা ইবনে কাইয়েম এ সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, নবী কি আল্লাহ তায়ালাকে দেখেছেন? ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, চোখে দেখার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কোন সাহাবী এ কথা বর্ণনাও করেননি। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে চোখ এবং অন্তর দ্বারা দেখার যে কথা উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে প্রথম বর্ণনা দ্বিতীয় বর্ণনার বিপরীত নয়। ইমাম ইবনে কাইয়েম যে নৈকট্য এবং নিকটতর হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, এটি মেরাজের সময়ের চেয়ে ভিন্ন সময়ের কথা। সূরা নাজম-এ হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর নৈকট্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। হযরত আয়েশা (রা.) সে কথাই বর্ণনা করেছেন। পক্ষান্তরে মে'রাজের হাদীসে যে নৈকট্যের কথা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে, এটা আল্লাহরই নৈকট্য। সূরা নাজম-এ এ সম্পর্কে কোন ব্যাপক আলোচনা নেই। বরং সেখানে বলা হয়েছে যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দ্বিতীয়বার 'সেদরাতুল মোনতাহা'র কাছে দেখেছেন। যাঁকে দেখেছেন তিনি জিবরাঈল (আ.)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জিবরাঈলকে তার আসল চেহারায় দু'বার দেখেছেন। একবার পৃথিবীতে এবং অন্যবার 'সেদরাতুল মুনতাহা'র কাছে।
এ সময়েও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'শাককুস সদর' বা সিনা চাক-এর ঘটনা ঘটেছিলো। এ সফরের সময় তাঁকে কয়েকটি জিনিস দেখানো হয়েছিলো। তাঁকে দুধ এবং মদ দেয়া হয়েছিলো। তিনি দুধ গ্রহণ করলেন। এটা দেখে হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনাকে ফেতরাত বা স্বভাবের ফল দেখানো হয়েছে। যদি আপনি মদ গ্রহণ করতেন তবে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো।
আল্লাহর রসূল ৪টি নহর দেখলেন। ৪টি যাহেরী, আর ৪টি বাতেনী। প্রকাশ্য নহর ছিলো নীল এবং ফোরাত। এর তাৎপর্য সম্ভবত এই যে, তার রেসালত নীল এবং ফোরাত সজীব এলাকা সমূহে বিস্তার লাভ করবে। অর্থাৎ এখানের অধিবাসীরা বংশ পরম্পরায় মুসলমান হবে। এমন নয় যে, এ দু'টি নহরের পানির উৎস জান্নাতে রয়েছে।
জাহান্নামের দারোগা মালেককে তিনি দেখলেন। তিনি হাসেন না, তাব চেহারায় হাসিখুশীর কোন ছাপও নেই। আল্লাহর রসূলকে বেহেশত এবং দোযখও দেখানো হলো।
এতিমের ধনসম্পদ যারা অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের অবস্থাও দেখানো হয়। তাদের ঠোঁট ছিলো উটের ঠোঁটের মতো। তারা নিজেদের মুখে পাথরের টুকরোর মতো অঙ্গার প্রবেশ করাচ্ছে আর সেই অঙ্গার তাদের গুহ্যদ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদখোরদেরও দেখেছিলেন। তাদের ঠোট এতো বড় ছিলো যে, তারা নড়াচড়া করতে পারছিলো না। ফেরাউনের অনুসারীদের জাহান্নামে নেয়ার সময় তারা এসব সুদখোরকে মাড়িয়ে যাচ্ছিলো।
যেনাকারীদেরও তিনি দেখেছিলেন। তাদের সামনে তাজা গোশত এবং দুর্গন্ধময় পচা গোশত ছিলো। অথচ তারা তাজা গোশত রেখে পচা গোশত খাচ্ছিলো।
যেসব নারী স্বামী থাকা সত্তেও নিজ গর্ভে অন্য পুরুষের সন্তান ধারণ করেছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরও দেখেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লক্ষ্য করলেন যে, ওসব মহিলার বুকে বড় বড় কাঁটা বিঁধিয়ে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
তিনি মক্কার একটি কাফেলাকে দেখেছিলেন। সেই কাফেলার একটি উট পালিয়ে গিয়েছিলো তিনি তাদেরকে সেই উটের সন্ধান বলে দিয়েছিলেন। ঢেকে রাখা পাত্রে পানি ছিলো, তিনি সেই পানি থেকে পান করেছিলেন। সে সময় কাফেররা সকলে ঘুমোচ্ছিলো। মেরাজের রাতের পরদিন সকালে এই বিবরণ তাঁর দাবীর সত্যতার একটি প্রমাণ হয়েছিলো। বলে দিলেন যে, অমুক সময়ে সেই কাফেলা ফিরে আসবে। কাফেলা থেকে পালিয়ে যে উটটি মক্কার দিকে আসছিলো তিনি সেই উটটির বিবরণও পেশ করলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বর্ণিত সব কথাই সত্য প্রমাণিত হলো। কিন্তু এতোকিছু সত্তেও কাফেরদের ঘৃণা আরো বেড়ে গেলো এবং তারা তার কথা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালো।
বলা হয়, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে নবীজী সেই সময়ই সিদ্দিক উপাধি দিয়েছিলেন। কেননা অন্য সবাই যখন অবিশ্বাস করেছিলো, তিনি তখন সব কিছুই বিশ্বাস করেছিলেন।
মেরাজের বিবরণ আল্লাহ তায়ালা কোরআনে করিমে উল্লেখ করেছেন।
নবীদের ব্যাপারে এটাই হচ্ছে আল্লাহর সুন্নত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'এবং এভাবেই আমি ইবরাহীমকে আসমান যমীনের রাজ্য ব্যবস্থাপনা দেখিয়েছি যাতে, সে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।'
আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা (আ.)-কে বলেছিলেন, 'তাহলে আমি তোমাকে আমার বড় কিছু নিদর্শন দেখাব।'
এসব দেখানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা যেন বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে। এ কথাও আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন। নবীরা আল্লাহর নিদর্শন সরাসরি প্রত্যক্ষ করায় তাদের বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়। ফলে তারা আল্লাহর পথে মানুষকে দাওয়াত দিতে গিয়ে এমন সব দুঃখ এবং কষ্ট নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করতে পারেন, যা অন্য কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তাদের দৃষ্টিতে পার্থিব জগতের যাবতীয় শক্তিই মনে হয় তুচ্ছ। এ কারণে তারা কোন শক্তিকেই পরোয়া করেন না। মেরাজের ঘটনায় ছোটখাট বিষয় এবং এ ঘটনার প্রকৃত রহস্য সম্পর্কে শরীয়তের বড় বড় কেতাবে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তন্মধ্যে প্রধান প্রধান কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা যাচ্ছে।
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, আল্লাহ তায়ালা কোরআনে মাত্র একটি আয়াতে মেরাজের ঘটনা উল্লেখ করেই ইহুদীদের দুষ্কৃতির কথা বর্ণনা করেছেন। এরপর তাদের জানিয়েছেন যে, এই কোরআন সেই পথেরই হেদায়াত দিয়ে থাকে, যে পথ সঠিক এবং সরল। কোরআন পাঠকারীদের মনে হতে পারে যে, উভয় কথা সম্পর্কহীন, কিন্তু আসলে তা নয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বর্ণনাভঙ্গিতে এই ইশারাই দিয়েছেন যে, এখন থেকে ইহুদীদের মানব জাতির নেতৃত্বের আসন থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। কেননা এইসব ইহুদী এমন ভয়াবহ অপরাধ করেছে যে, নেতৃত্বের যোগ্যতা তাদের আর নেই। কাজেই এই দায়িত্ব ও মর্যাদা এখন থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রদান করা হবে এবং দুঃসাহসী দাওয়াতের উভয় কেন্দ্রকে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন করা হবে। অন্য কথায় বলা যায় যে, রূহানী নেতৃত্ব এক উম্মত থেকে অন্য উম্মতের কাছে স্থানান্তর করা হবে। যুলুম, অত্যাচার এবং বিশ্বাসঘাতকতায় কলঙ্কিত ইতিহাসের অধিকারী একটি উম্মতের কাছ থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নিয়ে এমন একটি উম্মতকে দেয়া হবে, যাদের মাধ্যমে কল্যাণের ঝর্ণাধারা উৎসারিত হবে। এই উম্মতের পয়গাম্বর ওহীর মাধ্যমে কোরআনে করিম পেয়েছেন। এই কোরআন মানব জাতিকে সর্বাধিক হেদায়াত দান করেছে।
কিন্তু এই নেতৃত্বের পূর্ণতা কিভাবে সাধিত হবে? ইসলামের নবী তো মক্কার পাহাড়ে লোকদের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এটি একটি প্রশ্ন। এই প্রশ্ন অন্য একটি সত্যের পর্দা উন্মোচন করছে। ইসলামের দাওয়াত একটা পর্যায় অতিক্রম করার কাছে পৌছেছে, বর্তমানে অন্য একটি পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এই ধারা হবে অন্য ধারা থেকে ভিন্ন। এ কারণে দেখা যায় যে, কোন কোন আয়াতে পৌত্তলিকদের সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দেয়া হয়েছে এবং কঠোর হুমকি দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আমি যখন কোন জনপদ ধ্বংস করতে চাই, তখন তার সমৃদ্ধ ব্যক্তিদের সৎ কাজ করতে আদেশ করি, কিন্তু তারা সেখানে অসৎ কাজ করে। তারপর তাদের প্রতি দন্ড প্রদান ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং আমি সেটা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি।' (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ১৬)
আল্লাহ তায়ালা উক্ত সূরায় আরো বলেন, 'নূহের পর আমি কতো মানব গোষ্ঠী ধ্বংস করেছি। তোমার প্রতিপালকই তার বান্দাদের পাপাচারের সংবাদ রাখা এবং পর্যবেক্ষণের জন্যে যথেষ্ট।' (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ১৭)
এ সকল আয়াতের পাশাপাশি এমন কিছু আয়াতও রয়েছে, যাতে মুসলমানদের ভবিষ্যত ইসলামী সমাজের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তারা এমন এক ভূখন্ডে নিজেদের ঠিকানা তৈরী করেছে, যেখানে সবকিছু তাদের নিজের হাতে ন্যস্ত। উল্লিখিত আয়াতে এমন ইশারা রয়েছে যে, আল্লাহর রসূল শ্রীঘ্রই এমন নিরাপদ জায়গা পেয়ে যাবেন, যেখানে দ্বীন ইসলাম যথাযথভাবে প্রচার ও প্রসার লাভ করবে।
মেরাজের রহস্যময় ঘটনার এমন সব বিষয় রয়েছে, যার সাথে আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান। এ কারণে সেসব বর্ণনা করা দরকার। আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, মে'রাজের ঘটনা হয়তো বাইয়াতে আকাবার কিছুকাল আগে ঘটেছিলো অথবা প্রথম ও দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবার মাঝামাঝি সময়ে ঘটেছিলো। আল্লাহ তায়ালাকেই সব কিছু ভালো জানেন।
প্রথম বাইয়াতে আকাবা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবুয়তের দশম বর্ষে হজ্জ মওসুমে ইয়াসরেবের ছয়জন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা আল্লাহর রসূলের সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, নিজেদের কওমের কাছে ফিরে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতের তাবলীগ করবেন।
এর ফলে পরবর্তী হজ্জ মওসুমে ১৩ জন লোক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসেন। এদের মধ্যে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ ছাড়া অন্য ৫ জন ছিলেন, যারা গত বছরও এসেছিলেন। এরা ছাড়া বাকি সাত জনের নাম পরিচয় নিম্নরূপ।
ক্রমিক নাম গোত্র ১. মায়া'য ইবনে হারেস ইবনে আফরা বনি নাজ্জার, খাযরাজ ২. যাকওয়ান ইবনে আবদুল কয়েস বনি যুরাইক, খাযরাজ ৩. ওবাদা ইবনে সামেত বনি গানাম, খাযরাজ ৪. ইয়াযিদ ইবনে ছা'লাবা বনি গানামের মিত্র, খাযরাজ ৫. আব্বাস ইবনে ওবাদা ইবনে নাযলাহ বনি সালেম, খাযরাজ ৬. আবুল হায়ছাম ইবনে তাইহান বনি আবদে আশহাল, আওস ৭. ওযাইম ইবনে সায়েদাহ বনি আমর ইবনে আওফ, আওস।
এদের মধ্যে শেষোক্ত দু'জন ছিলেন আওস এবং বাকি সবাই খাযরাজ গোত্রের।
এরা সবাই মিনায় আকাবার কাছে আল্লাহর রসূলের কাছে কয়েকটি বিষয়ে বাইয়াত নেন। পরবর্তীতে হোদায়বিয়ার সন্ধির পর এবং মক্কা বিজয়ের সময়ে এইসব কথার ওপরেই মহিলাদের কাছ থেকেও বাইয়াত গ্রহণ করা হয়। আকাবার এই বাইয়াতের বিবরণ বোখারী শরীফে ওবাদা ইবনে সামেতের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'এসো, আমার কাছে এ মর্মে বাইয়াত করো যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যেনা করবে না, নিজের সন্তানকে হত্যা করবে না, মনগড়া কোন অপবাদ কারো ওপর দেবে না, ভালো কাজে আমার অনুসরণ করবে, কোন প্রকার অবাধ্যতা করবে না। যে ব্যক্তি এসব কিছু পালন করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এসব বিষয়ের কোন কিছু অমান্য করবে, যদি তাকে সেই অবাধ্যতার জন্যে শাস্তি দেয়া হয় তবে তার শাস্তি তার পাপের কাফফারা হবে। যদি কেউ অবাধ্যতা সত্তেও আল্লাহ যদি তার পাপ গোপন রাখেন তাহলে তার কাজের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি অথবা ক্ষমা করে দেবেন।'
হযরত ওবাদা বলেন, এসব বিষয়ে আমরা আল্লাহর রসূলের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলাম।
মদীনায় রসূলের দূত ও তার ঈর্ষণীয় সাফল্য বাইয়াত শেষ হয়ে গেলো এবং হজ্জ ও শেষ হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগত লোকদের সাথে মদীনায় তাঁর প্রথম দূত পাঠালেন। মুসলমানদের ইসলামের শিক্ষা প্রদান এবং যারা এখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত প্রদানই ছিলো এই দূত প্রেরণের উদ্দেশ্য। প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারী যুবক মসআব ইবনে ওয়ায়ের আবদারি (রা.)- কে আল্লাহর রসূল মদীনায় প্রেরণ করেন।
হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) মদীনায় পৌঁছে হযরত আসআদ ইবনে যুরারা (রা.)- এর ঘরে অবস্থান করেন। এরপর উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে উভয়ে মদীনাবাসীদের ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এ সময় হযরত মসআব 'মুকরিউন' উপাধি লাভ করেন। এর অর্থ শিক্ষক বা মোয়াল্লেম।
দ্বীনের তাবলীগ করার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যের একটি বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে। যোরারাকে সঙ্গে নিয়ে 'একদিন বনি আবদুল আশহাল এবং বনি যোফরের মহল্লায় যান। সেখানে বনি যোবায়ের একটি বাগানে মারক নামে একটি জলাশয়ের কিনারায় বসেন। তাদের কাছে কয়েকজন মুসলমানও সমবেত হন। বনি আশহাল গোত্রের সর্দার ছিলেন সা'দ ইবনে মায়া'য এবং উছায়েদ ইবনে খোযায়ের। তারা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তারা নবাগত মুসলমানদের আগমনের খবর পেলেন। হযরত সা'দ অপর সর্দার উছায়েদ ইবনে খোযায়েরকে বললেন, তুমি গিয়ে দেখে এসো, ব্যাপারটা কি। ওদের বলবে যে, তোমরা কি আমাদের দুর্বল লোকদের বেকুব বানাতে চাও। তাদের ধমক দেবে এবং আমাদের মহল্লায় আসতে নিষেধ করবে। আসয়া'দ ইবনে যোরারা আমার খালাতো ভাই, এ কারণেই তোমাকে পাঠাচ্ছি, না হলে আমি নিজেই যেতাম।
উছায়েদ নিজের বর্শা তুলে উভয়ের কাছে গেলেন। হযরত আসয়া'দ তাকে আসতে দেখে হযরত মসআবকে বললেন, কওমের একজন সর্দার তোমার কাছে আসছে। তার ব্যাপারে আল্লাহর রহমত মনে মনে কামনা করো। হযরত মসআব বললেন, তিনি যদি বসেন তবে আমি তার সাথে কথা বলব। উছায়েদ পৌঁছেই ক্ষেপে গেলেন। বললেন, আপনারা কেন আমাদের এলাকায় এসেছেন? আপনারা কি আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে চান? প্রাণের মায়া থাকলে কেটে পড়ুন। হযরত মসআব বললেন, আপনি আমাদের কাছে বসুন। কিছু কথা শুনুন। পছন্দ হলে গ্রহণ করবেন, পছন্দ না হলে করবেন না। হযরত উছায়েদ বললেন, কথা তো ঠিকই। এরপর তিনি নিজের বর্শা মাটিতে পুঁতে বসে পড়লেন। হযরত মসআব (রা.) ইসলামের কথা বলতে শুরু করলেন। কোরআন তেলাওয়াত করলেন। পরে তিনি বলেছেন, উছায়েদ কিছু বলার আগেই আমি তার চেহারায় ইসলামের চমক লক্ষ্য করেছি। সব কথা শুনে উছায়েদ বললেন, কথা তো খুব ভালো। আপনারা কাউকে ইসলামে কিভাবে দীক্ষিত করেন? মসআব বললেন, আপনাকে গোসল করে পাক কাপড় পরতে হবে। এরপর কালেমা তাইয়্যেবার সাক্ষ্য দিতে হবে এবং দু'রাকাত নামায আদায় করতে হবে। উছায়েদ সবই করলেন এরপর বললেন, আমাদের গোত্রে আরো একজন সর্দার রয়েছেন। তিনি যদি ইসলামে দীক্ষা নেন, তবে আমাদের গোত্রের আর কেউই বাদ থাকবে না। আমি তাকে এখনই আপনাদের কাছে পাঠাচ্ছি।
এরপর হযরত উছায়েদ তার বর্শা নিয়ে সা'দ ইবনে ময়াা'য-এর কাছে গেলেন। সা'দ উছায়েদকে দেখে বললেন, এই লোকাট যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিলো, তার চেয়ে অন্য রকম চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে। উছায়েদকে সা'দ জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি করেছো? উছায়েদ বললেন, আমি তাদের সাথে আলাপ করেছি, কিন্তু আপত্তিকর কিছুই পাইনি। তবে আমি তাদের নিষেধ করেছি। তারা বলেছে, আপনারা যা চান, আমরা তাই করবো। আমি শুনেছি বনি হারেছা গোত্রের লোকেরা আসআদ ইবনে যোরারাকে হত্যা করতে চায়। এর কারণ হচ্ছে যে, তিনি আপনার খালাতো ভাই। ওরা আপনার সাথে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে চায়। এ কথা শোনামাত্র সা'দ ক্রোধে অধীর হয়ে বর্শা হাতে ওদের কাছে পৌঁছুলেন। গিয়ে দেখেন দু'জনেই নিশ্চিন্তে বসে আছেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, উছায়েদ চেয়েছে যে, আমি দু'জন আগন্তুকের সাথে কথা বলি। সা'দ তাদের সামনে গিয়ে রুক্ষ্ণ ভাষায় বললেন, তোমরা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে চাও? এরপর আসআদকে বললেন, খোদার কসম হে আবু আনাস, তোমার এবং আমার মধ্যে যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকতো, তবে তুমি এমন কাজ করতে পারতে না। আমাদের এলাকায় এসে তোমরা এমন কাজ করছো, যা আমাদের পছন্দনীয় নয়।
হযরত আসয়াদ হযরত মসআবকে আগেই বলেছিলেন যে, এমন একজন লোক আসছেন যিনি তার গোত্রের প্রভাবশালী নেতা। যদি তিনি তোমার কথা শোনেন, তবে তার পেছনে কেউ বাদ থাকবে না। এ কারণে হযরত মসআব হযরত সা'দকে বললেন, আপনি বসুন, কিছু কথা শুনুন। ভালো না লাগলে শুনবেন না। হযরত সা'দ বললেন, ঠিকই তো। একথা বলে তিনিও বর্শা মাটিতে পুঁতে বসে পড়লেন। হযরত মসআব তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন তেলাওয়াত করলেন। হযরত মসআব পরে বলেছেন, সা'দ বলার আগেই আমি তার চেহারায় ইসলামের চমক লক্ষ্য করেছি। সা'দ বললেন, তোমরা ইসলাম গ্রহণের পর কি করো? মসআব বললেন, আপনি গোসল করুন, এরপর পাক কাপড় পরুন, এরপর কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেবেন। তারপর দু'রাকাত নামায আদায় করবেন। তারপর সা'দ ইবনে ময়াা'য তাই করলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে হযরত সা'দ নিজের গোত্রের লোকদের কাছে ফিরে গেলেন। লোকেরা বললো, আপনি ভিন্ন চেহারায় ফিরে এসেছেন মনে হচ্ছে। হযরত সা'দ বললেন, তোমরা আমাকে কেমন লোক মনে করো, হে বনি আবদুল আশহাল? সবাই বললো আপনি হচ্ছেন আমাদের নেতা। বুদ্ধি-বিবেচনার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে বেশী। সা'দ ইবনে মায়া'য বললেন, আচ্ছা তবে শোনো, তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ রব্বুল আলামীন এবং তাঁর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ঈমান না আনবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের সাথে কথা বলা আমার জন্যে হারাম। বিকেল পর্যন্ত গোত্রের নারী পুরুষ সবাই ইসলাম গ্রহণ করলেন। উসাইরেম নামে একজন লোক সে সময় ঈমান আনেননি। তিনি ওহুদের যুদ্ধের দিনে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হন। তিনি কোন নামাযও আদায় করেননি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্পর্কে বলেছেন, অল্প আমল করে সে অনেক বেশী পুরস্কার পেয়েছে।
হযরত মসআব ও হযরত আসআদ ইবনে যোরারার ঘরে অবস্থান করেই ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন। এই দাওয়াতে আনসারদের প্রত্যেক পরিবারেই কয়েকজন করে নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করলেন। পরবর্তী হজ্জ মৌসুমে আসার আগে হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) সাফল্যের সুসংবাদ নিয়ে আল্লাহর রসূলের কাছে মক্কায় হাযির হন। তিনি প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ইয়াসরেবের গোত্রসমূহের অবস্থা, তাদের যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষার কৌশল এবং অন্যান্য যোগ্যতা সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য পেশ করেন।
দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে ৬২২ ঈসায়ী সালের জুন মাসে মদীনা থেকে ৭০ জন মুসলমান হজ্জ পালনের জন্যে মক্কায় আগমন করেন। এরা নিজ কওমের পৌত্তলিক হাজীদের সঙ্গে মক্কায় আসছিলেন। মদীনায় থাকার সময়েই অথবা মক্কায় আসার পথে তারা পরস্পরকে বললেন, কতোদিন পর্যন্ত প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমরা মক্কায় এভাবে কষ্টকর অবস্থায় ফেলে রাখবো? তিনি মক্কায় যেভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, সে সম্পর্কেও তারা আলোচনা করলেন।
মক্কায় পৌছার পর গোপনে তারা প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোপনে যোগাযোগ করলেন এবং সিদ্ধান্ত হলো যে, উভয় দল আইয়ামে তাশরিকের মাঝামাঝি ১২ই জিলহজ্জ তারিখে মিনার জামারায়ে উলায় অর্থাৎ জামরায়ে আকাবার ঘাঁটিতে একত্রিত হয়ে রাতের অন্ধকারে গোপন আলোচনা করবেন।
এই সম্মেলন ইসলাম ও মূর্তিপূজার সংঘাতের মধ্যে সময়ের গতিধারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। একজন আনসার নেতার মুখে সেই সম্মেলনের বিবরণী উল্লেখ করা যাচ্ছে।
হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.) বলেন, আমরা হজ্জ এর জন্যে বেরিয়েছিলাম। প্রিয় নবী আইয়ামে তাশরিকের মাঝে আকাবায় আমাদের সাথে কথা বলার সময় নির্ধারণ করলেন। অবশেষে, সেই রাত এলো, যে রাতে কথা বলার তারিখ ছিলো। আমাদের সাথে আমাদের সম্মানিত নেতা আবদুল্লাহ ইবনে হারামও ছিলেন। তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। আমরা তাকে সঙ্গে নিলাম। আমাদের সঙ্গী অমুসলিমদের কাছে এই সম্মেলনের বিষয় গোপন রাখা হয়েছিলো। আবদুল্লাহ ইবনে হারামের সাথে আমরা আলোচনা করে তাকে বললাম, হে আবু জাবের আপনি আমাদের একজন সম্মানিত নেতা। আপনার বর্তমান অবস্থা থেকে আমরা আপনাকে বের করতে চাই। অনন্তকাল দোযখের আগুন থেকে আপনি মুক্তি লাভ করবেন এটাই আমরা চাই। এরপর আমরা তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমাদের আলোচনার বিষয় তাঁকে জানালাম। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। এবং আমাদের সাথে আকাবায় গেলেন। তাঁকে নকিব মনোনীত করা হলো।

টিকাঃ
১৪. তালকিহুল হুকুম, পৃঃ ১০, সহীহ বোখারী ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৭
১. যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃঃ ৪৯
২. রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃঃ ৮৫, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪৩১-৪৩৩
৩. বোখারী, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫৫০, ৫৫১।

সেই বছরেই অর্থাৎ নবুয়তের একাদশ বর্ষের শাওয়াল মাসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত আয়েশার বয়স ছিলো তখন মাত্র ছয় বছর। হিজরতের আগের বছর শাওয়াল মাসে হযরত আয়েশা (রা.) স্বামী গৃহে গমন করেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিলো নয় বছর।
মেরাজ-এর ঘটনা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত ও তাবলীগের সাফল্য এবং তাঁর এবং ইসলামের অনুসারীদের প্রতি অত্যাচার নির্যাতন মাঝামাঝি পর্যায়ে চলছিলো, দূর দিগন্তে মিটিমিটি জ্বলছিলো তারার আলো, এমনি সময়ে মেরাজের রহস্যময় ঘটনা ঘটলো। এই মেরাজ কবে সংঘটিত হয়েছিলো? এ সম্পর্কে সীরাত রচয়িতাদের মতামতের বিভিন্নতা রয়েছে। যেমন- এক) তিবরানি বলেছেন, যে বছর নবী সাইয়েদুল মুরসালিনকে নবুয়ত দেয়া হয়, সে বছরই। দুই) ইমাম নববী এবং ইমাম কুরতুবী লিখেছেন, নবুয়তের পাঁচ বছর পর। তিন) হিজরতের ১৬ মাস আগে অর্থাৎ নবুয়তের দ্বাদশ বছরে রমযান মাসে। চার) নবুয়তের দশম বর্ষে ২৭শে রযবে। আল্লামা মনসুরপুরী এ অভিমত গ্রহণ করেছেন। পাঁচ) হিজরতের এক বছর দুই মাস আগে। অর্থাৎ নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষের মহররম মাসে। ছয়) হিজরতের এক বছর আগে অর্থাৎ নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসে।
উল্লিখিত বক্তব্যসমূহের মধ্যে তিনটি বক্তব্যকে সঠিক বলে মেনে নেয়া যায়। পাঞ্জেগানা নামায ফরয হওয়ার আগে হযরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল হয়েছিলো আর এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, পাঞ্জেগানা নামায মেরাজের রাতে ফরয করা হয়। এর অর্থ হচ্ছে যে, হযরত খাদিজার মৃত্যু মেরাজের আগেই হয়েছিলো। তাঁর মৃত্যু নবুয়তের দশম বর্ষের রমযান মাসে হয়েছিলো বলে জানা যায়। কাজেই মেরাজের ঘটনা এর পরেই ঘটেছে, আগে নয়। শেষোক্ত তিনটি বক্তব্যের কোনটিকে কোনটির ওপর প্রাধান্য দেয়ার মতো, তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোরআন হাদীসে বর্ণিত এ সম্পর্কিত বিবরণ উল্লেখ করবো।
ইবনে কাইয়েম লিখেছেন, সঠিক বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায় যে, নবী সাইয়েদুল মুরসালিনকে স্বশরীরে বোরাকে তুলে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সঙ্গে মসজিদে হারাম থেকে প্রথমে বায়তুল মাকদেস পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয়। প্রিয় নবী সেখানে মসজিদের দরজার খুঁটির সাথে বোরাক বেঁধে যাত্রা বিরতি করেন এবং সকল নবীর ইমাম হয়ে নামায আদায় করেন।
এরপর সেই রাতেই তাঁকে বায়তুল মাকদেস থেকে প্রথম আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। হযরত জিবরাঈল (আ.) দরজা খোলেন। প্রিয় নবী সেখানে হযরত আদম (আ.)-কে দেখে সালাম করেন। হযরত আদম (আ.) তাঁকে মারহাবা বলে সালামের জবাব দেন। তাঁর নবুয়তের স্বীকারোক্তি করেন। সে সময় আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-এর ডানদিকে নেককার এবং বামদিকে পাপীদের রূহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখান। এরপর তিনি দ্বিতীয় আসমানে যান। দরজা খুলে দেয়া হয়। প্রিয় নবী সেখানে হযরত ইয়াহিয়া ইবনে যাকারিয়া (আ.) এবং হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)-কে দেখে সালাম করেন। তাঁরা সালামের জবাব দিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের কথা স্বীকার করেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর যান চতুর্থ আসমানে। সেখানে তিনি হযরত ইদরিস (আ.)-কে দেখে সালাম করেন। তিনি সালামের জবাবে তাকে মোবারকবাদ দেন এবং তাঁর নবুয়তের কথা স্বীকার করেন।
এরপর তাঁকে পঞ্চম আসমানে নেয়া হয়। সেখানে তিনি হযরত হারুন (আ.)-কে দেখে সালাম দেন। তিনি সালামের জবাবে মোবারকবাদ দেন এবং তাঁর নবুয়তের কথা স্বীকার করেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এরপর নেয়া হয় ষষ্ঠ আসমানে। সেখানে হযরত মূসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি সালাম করেন। হযরত মূসা (আ.) মারহাবা বলেন এবং নবুয়তের কথা স্বীকার করেন। নবী মুরসালিন সামনে অগ্রসর হলেন, এ সময় হযরত মূসা (আ.) কাঁদতে লাগলেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, একজন নবী যিনি আমার পরে আবির্ভূত হয়েছেন তার উম্মতেরা আমার উম্মতদের চেয়ে সংখ্যায় বেশী বেহেশতে যাবে।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর নিয়ে যাওয়া হয় সপ্তম আসমানে। সেখানে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সাথে তাঁর দেখা হয়। তিনি তাঁকে সালাম করেন। তিনি জবাব দেন, মোবারকবাদ দেন এবং তাঁর নবুয়তের কথা স্বীকার করেন।
এবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সেদরাতুল মুনতাহা'য় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আল্লাহর এতো কাছাকাছি পৌঁছেন যে, উভয়ের মধ্যে দুটি ধনুক বা তারও কম ব্যবধান ছিলো। সেই সময় আল্লাহ তায়ালা তার যা কিছু দেয়ার দিয়ে দেন, যা ইচ্ছা ওহী নাযিল করেন এবং পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করেন। ফেরার পথে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে দেখা হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন আল্লাহ তায়ালা আপনাকে কি কাজের আদেশ দিয়েছেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায আদায়ের আদেশ দিয়েছেন। হযরত মূসা (আ.) বললেন, আপনার উম্মত এতো নামায আদায় করার শক্তি রাখে না। আপনি আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে নামায কমিয়ে দেয়ার আবেদন করুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর দিকে তাকালেন, তিনি ইশারা করলেন। এরপর ফিরে গিয়ে নামাযের সংখ্যা কমিয়ে দেয়ার আবেদন জানালেন। হযরত মূসা (আ.)-এর সাথে আবার ফেরার পথে দেখা। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর কাছ থেকে কি আদেশ নিয়ে যাচ্ছেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পঁয়তাল্লিশ ওয়াক্ত নামাযের কথা বললেন। হযরত মূসা (আ.) বললেন, আপনি ফিরে যান, এমনি করে বারবার ফিরে যাওয়ার এবং নামায কম করার হার একপর্যায়ে সংখ্যা দাঁড়ালো পাঁচ। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও হযরত মূসা (আ.) বেশী মনে করলেন এবং আরো কমিয়ে আনার আবেদন জানানোর জন্যে ফিরে যেতে বললেন। হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে, আমি আর যেতে চাই না। আমি আল্লাহর এই আদেশের ওপরই মাথা নত করলাম। ফেরার পথে কিছুদূর আসার পর আওয়ায হলো, আমি আমার ফরয নির্ধারণ করে দিয়েছি এবং আমার বান্দাদের জন্যে কমিয়ে দিয়েছি।
আল্লামা ইবনে কাইয়েম এ সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, নবী কি আল্লাহ তায়ালাকে দেখেছেন? ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, চোখে দেখার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কোন সাহাবী এ কথা বর্ণনাও করেননি। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে চোখ এবং অন্তর দ্বারা দেখার যে কথা উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে প্রথম বর্ণনা দ্বিতীয় বর্ণনার বিপরীত নয়। ইমাম ইবনে কাইয়েম যে নৈকট্য এবং নিকটতর হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, এটি মেরাজের সময়ের চেয়ে ভিন্ন সময়ের কথা। সূরা নাজম-এ হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর নৈকট্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। হযরত আয়েশা (রা.) সে কথাই বর্ণনা করেছেন। পক্ষান্তরে মে'রাজের হাদীসে যে নৈকট্যের কথা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে, এটা আল্লাহরই নৈকট্য। সূরা নাজম-এ এ সম্পর্কে কোন ব্যাপক আলোচনা নেই। বরং সেখানে বলা হয়েছে যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দ্বিতীয়বার 'সেদরাতুল মোনতাহা'র কাছে দেখেছেন। যাঁকে দেখেছেন তিনি জিবরাঈল (আ.)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জিবরাঈলকে তার আসল চেহারায় দু'বার দেখেছেন। একবার পৃথিবীতে এবং অন্যবার 'সেদরাতুল মুনতাহা'র কাছে।
এ সময়েও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'শাককুস সদর' বা সিনা চাক-এর ঘটনা ঘটেছিলো। এ সফরের সময় তাঁকে কয়েকটি জিনিস দেখানো হয়েছিলো। তাঁকে দুধ এবং মদ দেয়া হয়েছিলো। তিনি দুধ গ্রহণ করলেন। এটা দেখে হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনাকে ফেতরাত বা স্বভাবের ফল দেখানো হয়েছে। যদি আপনি মদ গ্রহণ করতেন তবে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো।
আল্লাহর রসূল ৪টি নহর দেখলেন। ৪টি যাহেরী, আর ৪টি বাতেনী। প্রকাশ্য নহর ছিলো নীল এবং ফোরাত। এর তাৎপর্য সম্ভবত এই যে, তার রেসালত নীল এবং ফোরাত সজীব এলাকা সমূহে বিস্তার লাভ করবে। অর্থাৎ এখানের অধিবাসীরা বংশ পরম্পরায় মুসলমান হবে। এমন নয় যে, এ দু'টি নহরের পানির উৎস জান্নাতে রয়েছে।
জাহান্নামের দারোগা মালেককে তিনি দেখলেন। তিনি হাসেন না, তাব চেহারায় হাসিখুশীর কোন ছাপও নেই। আল্লাহর রসূলকে বেহেশত এবং দোযখও দেখানো হলো।
এতিমের ধনসম্পদ যারা অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের অবস্থাও দেখানো হয়। তাদের ঠোঁট ছিলো উটের ঠোঁটের মতো। তারা নিজেদের মুখে পাথরের টুকরোর মতো অঙ্গার প্রবেশ করাচ্ছে আর সেই অঙ্গার তাদের গুহ্যদ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদখোরদেরও দেখেছিলেন। তাদের ঠোট এতো বড় ছিলো যে, তারা নড়াচড়া করতে পারছিলো না। ফেরাউনের অনুসারীদের জাহান্নামে নেয়ার সময় তারা এসব সুদখোরকে মাড়িয়ে যাচ্ছিলো।
যেনাকারীদেরও তিনি দেখেছিলেন। তাদের সামনে তাজা গোশত এবং দুর্গন্ধময় পচা গোশত ছিলো। অথচ তারা তাজা গোশত রেখে পচা গোশত খাচ্ছিলো।
যেসব নারী স্বামী থাকা সত্তেও নিজ গর্ভে অন্য পুরুষের সন্তান ধারণ করেছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরও দেখেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লক্ষ্য করলেন যে, ওসব মহিলার বুকে বড় বড় কাঁটা বিঁধিয়ে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
তিনি মক্কার একটি কাফেলাকে দেখেছিলেন। সেই কাফেলার একটি উট পালিয়ে গিয়েছিলো তিনি তাদেরকে সেই উটের সন্ধান বলে দিয়েছিলেন। ঢেকে রাখা পাত্রে পানি ছিলো, তিনি সেই পানি থেকে পান করেছিলেন। সে সময় কাফেররা সকলে ঘুমোচ্ছিলো। মেরাজের রাতের পরদিন সকালে এই বিবরণ তাঁর দাবীর সত্যতার একটি প্রমাণ হয়েছিলো। বলে দিলেন যে, অমুক সময়ে সেই কাফেলা ফিরে আসবে। কাফেলা থেকে পালিয়ে যে উটটি মক্কার দিকে আসছিলো তিনি সেই উটটির বিবরণও পেশ করলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বর্ণিত সব কথাই সত্য প্রমাণিত হলো। কিন্তু এতোকিছু সত্তেও কাফেরদের ঘৃণা আরো বেড়ে গেলো এবং তারা তার কথা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালো।
বলা হয়, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে নবীজী সেই সময়ই সিদ্দিক উপাধি দিয়েছিলেন। কেননা অন্য সবাই যখন অবিশ্বাস করেছিলো, তিনি তখন সব কিছুই বিশ্বাস করেছিলেন।
মেরাজের বিবরণ আল্লাহ তায়ালা কোরআনে করিমে উল্লেখ করেছেন।
নবীদের ব্যাপারে এটাই হচ্ছে আল্লাহর সুন্নত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'এবং এভাবেই আমি ইবরাহীমকে আসমান যমীনের রাজ্য ব্যবস্থাপনা দেখিয়েছি যাতে, সে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।'
আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা (আ.)-কে বলেছিলেন, 'তাহলে আমি তোমাকে আমার বড় কিছু নিদর্শন দেখাব।'
এসব দেখানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা যেন বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে। এ কথাও আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন। নবীরা আল্লাহর নিদর্শন সরাসরি প্রত্যক্ষ করায় তাদের বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়। ফলে তারা আল্লাহর পথে মানুষকে দাওয়াত দিতে গিয়ে এমন সব দুঃখ এবং কষ্ট নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করতে পারেন, যা অন্য কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তাদের দৃষ্টিতে পার্থিব জগতের যাবতীয় শক্তিই মনে হয় তুচ্ছ। এ কারণে তারা কোন শক্তিকেই পরোয়া করেন না। মেরাজের ঘটনায় ছোটখাট বিষয় এবং এ ঘটনার প্রকৃত রহস্য সম্পর্কে শরীয়তের বড় বড় কেতাবে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তন্মধ্যে প্রধান প্রধান কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা যাচ্ছে।
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, আল্লাহ তায়ালা কোরআনে মাত্র একটি আয়াতে মেরাজের ঘটনা উল্লেখ করেই ইহুদীদের দুষ্কৃতির কথা বর্ণনা করেছেন। এরপর তাদের জানিয়েছেন যে, এই কোরআন সেই পথেরই হেদায়াত দিয়ে থাকে, যে পথ সঠিক এবং সরল। কোরআন পাঠকারীদের মনে হতে পারে যে, উভয় কথা সম্পর্কহীন, কিন্তু আসলে তা নয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বর্ণনাভঙ্গিতে এই ইশারাই দিয়েছেন যে, এখন থেকে ইহুদীদের মানব জাতির নেতৃত্বের আসন থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। কেননা এইসব ইহুদী এমন ভয়াবহ অপরাধ করেছে যে, নেতৃত্বের যোগ্যতা তাদের আর নেই। কাজেই এই দায়িত্ব ও মর্যাদা এখন থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রদান করা হবে এবং দুঃসাহসী দাওয়াতের উভয় কেন্দ্রকে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন করা হবে। অন্য কথায় বলা যায় যে, রূহানী নেতৃত্ব এক উম্মত থেকে অন্য উম্মতের কাছে স্থানান্তর করা হবে। যুলুম, অত্যাচার এবং বিশ্বাসঘাতকতায় কলঙ্কিত ইতিহাসের অধিকারী একটি উম্মতের কাছ থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নিয়ে এমন একটি উম্মতকে দেয়া হবে, যাদের মাধ্যমে কল্যাণের ঝর্ণাধারা উৎসারিত হবে। এই উম্মতের পয়গাম্বর ওহীর মাধ্যমে কোরআনে করিম পেয়েছেন। এই কোরআন মানব জাতিকে সর্বাধিক হেদায়াত দান করেছে।
কিন্তু এই নেতৃত্বের পূর্ণতা কিভাবে সাধিত হবে? ইসলামের নবী তো মক্কার পাহাড়ে লোকদের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এটি একটি প্রশ্ন। এই প্রশ্ন অন্য একটি সত্যের পর্দা উন্মোচন করছে। ইসলামের দাওয়াত একটা পর্যায় অতিক্রম করার কাছে পৌছেছে, বর্তমানে অন্য একটি পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এই ধারা হবে অন্য ধারা থেকে ভিন্ন। এ কারণে দেখা যায় যে, কোন কোন আয়াতে পৌত্তলিকদের সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দেয়া হয়েছে এবং কঠোর হুমকি দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আমি যখন কোন জনপদ ধ্বংস করতে চাই, তখন তার সমৃদ্ধ ব্যক্তিদের সৎ কাজ করতে আদেশ করি, কিন্তু তারা সেখানে অসৎ কাজ করে। তারপর তাদের প্রতি দন্ড প্রদান ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং আমি সেটা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি।' (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ১৬)
আল্লাহ তায়ালা উক্ত সূরায় আরো বলেন, 'নূহের পর আমি কতো মানব গোষ্ঠী ধ্বংস করেছি। তোমার প্রতিপালকই তার বান্দাদের পাপাচারের সংবাদ রাখা এবং পর্যবেক্ষণের জন্যে যথেষ্ট।' (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ১৭)
এ সকল আয়াতের পাশাপাশি এমন কিছু আয়াতও রয়েছে, যাতে মুসলমানদের ভবিষ্যত ইসলামী সমাজের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তারা এমন এক ভূখন্ডে নিজেদের ঠিকানা তৈরী করেছে, যেখানে সবকিছু তাদের নিজের হাতে ন্যস্ত। উল্লিখিত আয়াতে এমন ইশারা রয়েছে যে, আল্লাহর রসূল শ্রীঘ্রই এমন নিরাপদ জায়গা পেয়ে যাবেন, যেখানে দ্বীন ইসলাম যথাযথভাবে প্রচার ও প্রসার লাভ করবে।
মেরাজের রহস্যময় ঘটনার এমন সব বিষয় রয়েছে, যার সাথে আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান। এ কারণে সেসব বর্ণনা করা দরকার। আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, মে'রাজের ঘটনা হয়তো বাইয়াতে আকাবার কিছুকাল আগে ঘটেছিলো অথবা প্রথম ও দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবার মাঝামাঝি সময়ে ঘটেছিলো। আল্লাহ তায়ালাকেই সব কিছু ভালো জানেন।
প্রথম বাইয়াতে আকাবা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবুয়তের দশম বর্ষে হজ্জ মওসুমে ইয়াসরেবের ছয়জন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা আল্লাহর রসূলের সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, নিজেদের কওমের কাছে ফিরে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতের তাবলীগ করবেন।
এর ফলে পরবর্তী হজ্জ মওসুমে ১৩ জন লোক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসেন। এদের মধ্যে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ ছাড়া অন্য ৫ জন ছিলেন, যারা গত বছরও এসেছিলেন। এরা ছাড়া বাকি সাত জনের নাম পরিচয় নিম্নরূপ।
ক্রমিক নাম গোত্র ১. মায়া'য ইবনে হারেস ইবনে আফরা বনি নাজ্জার, খাযরাজ ২. যাকওয়ান ইবনে আবদুল কয়েস বনি যুরাইক, খাযরাজ ৩. ওবাদা ইবনে সামেত বনি গানাম, খাযরাজ ৪. ইয়াযিদ ইবনে ছা'লাবা বনি গানামের মিত্র, খাযরাজ ৫. আব্বাস ইবনে ওবাদা ইবনে নাযলাহ বনি সালেম, খাযরাজ ৬. আবুল হায়ছাম ইবনে তাইহান বনি আবদে আশহাল, আওস ৭. ওযাইম ইবনে সায়েদাহ বনি আমর ইবনে আওফ, আওস।
এদের মধ্যে শেষোক্ত দু'জন ছিলেন আওস এবং বাকি সবাই খাযরাজ গোত্রের।
এরা সবাই মিনায় আকাবার কাছে আল্লাহর রসূলের কাছে কয়েকটি বিষয়ে বাইয়াত নেন। পরবর্তীতে হোদায়বিয়ার সন্ধির পর এবং মক্কা বিজয়ের সময়ে এইসব কথার ওপরেই মহিলাদের কাছ থেকেও বাইয়াত গ্রহণ করা হয়। আকাবার এই বাইয়াতের বিবরণ বোখারী শরীফে ওবাদা ইবনে সামেতের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'এসো, আমার কাছে এ মর্মে বাইয়াত করো যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যেনা করবে না, নিজের সন্তানকে হত্যা করবে না, মনগড়া কোন অপবাদ কারো ওপর দেবে না, ভালো কাজে আমার অনুসরণ করবে, কোন প্রকার অবাধ্যতা করবে না। যে ব্যক্তি এসব কিছু পালন করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এসব বিষয়ের কোন কিছু অমান্য করবে, যদি তাকে সেই অবাধ্যতার জন্যে শাস্তি দেয়া হয় তবে তার শাস্তি তার পাপের কাফফারা হবে। যদি কেউ অবাধ্যতা সত্তেও আল্লাহ যদি তার পাপ গোপন রাখেন তাহলে তার কাজের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি অথবা ক্ষমা করে দেবেন।'
হযরত ওবাদা বলেন, এসব বিষয়ে আমরা আল্লাহর রসূলের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলাম।
মদীনায় রসূলের দূত ও তার ঈর্ষণীয় সাফল্য বাইয়াত শেষ হয়ে গেলো এবং হজ্জ ও শেষ হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগত লোকদের সাথে মদীনায় তাঁর প্রথম দূত পাঠালেন। মুসলমানদের ইসলামের শিক্ষা প্রদান এবং যারা এখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত প্রদানই ছিলো এই দূত প্রেরণের উদ্দেশ্য। প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারী যুবক মসআব ইবনে ওয়ায়ের আবদারি (রা.)- কে আল্লাহর রসূল মদীনায় প্রেরণ করেন।
হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) মদীনায় পৌঁছে হযরত আসআদ ইবনে যুরারা (রা.)- এর ঘরে অবস্থান করেন। এরপর উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে উভয়ে মদীনাবাসীদের ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এ সময় হযরত মসআব 'মুকরিউন' উপাধি লাভ করেন। এর অর্থ শিক্ষক বা মোয়াল্লেম।
দ্বীনের তাবলীগ করার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যের একটি বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে। যোরারাকে সঙ্গে নিয়ে 'একদিন বনি আবদুল আশহাল এবং বনি যোফরের মহল্লায় যান। সেখানে বনি যোবায়ের একটি বাগানে মারক নামে একটি জলাশয়ের কিনারায় বসেন। তাদের কাছে কয়েকজন মুসলমানও সমবেত হন। বনি আশহাল গোত্রের সর্দার ছিলেন সা'দ ইবনে মায়া'য এবং উছায়েদ ইবনে খোযায়ের। তারা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তারা নবাগত মুসলমানদের আগমনের খবর পেলেন। হযরত সা'দ অপর সর্দার উছায়েদ ইবনে খোযায়েরকে বললেন, তুমি গিয়ে দেখে এসো, ব্যাপারটা কি। ওদের বলবে যে, তোমরা কি আমাদের দুর্বল লোকদের বেকুব বানাতে চাও। তাদের ধমক দেবে এবং আমাদের মহল্লায় আসতে নিষেধ করবে। আসয়া'দ ইবনে যোরারা আমার খালাতো ভাই, এ কারণেই তোমাকে পাঠাচ্ছি, না হলে আমি নিজেই যেতাম।
উছায়েদ নিজের বর্শা তুলে উভয়ের কাছে গেলেন। হযরত আসয়া'দ তাকে আসতে দেখে হযরত মসআবকে বললেন, কওমের একজন সর্দার তোমার কাছে আসছে। তার ব্যাপারে আল্লাহর রহমত মনে মনে কামনা করো। হযরত মসআব বললেন, তিনি যদি বসেন তবে আমি তার সাথে কথা বলব। উছায়েদ পৌঁছেই ক্ষেপে গেলেন। বললেন, আপনারা কেন আমাদের এলাকায় এসেছেন? আপনারা কি আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে চান? প্রাণের মায়া থাকলে কেটে পড়ুন। হযরত মসআব বললেন, আপনি আমাদের কাছে বসুন। কিছু কথা শুনুন। পছন্দ হলে গ্রহণ করবেন, পছন্দ না হলে করবেন না। হযরত উছায়েদ বললেন, কথা তো ঠিকই। এরপর তিনি নিজের বর্শা মাটিতে পুঁতে বসে পড়লেন। হযরত মসআব (রা.) ইসলামের কথা বলতে শুরু করলেন। কোরআন তেলাওয়াত করলেন। পরে তিনি বলেছেন, উছায়েদ কিছু বলার আগেই আমি তার চেহারায় ইসলামের চমক লক্ষ্য করেছি। সব কথা শুনে উছায়েদ বললেন, কথা তো খুব ভালো। আপনারা কাউকে ইসলামে কিভাবে দীক্ষিত করেন? মসআব বললেন, আপনাকে গোসল করে পাক কাপড় পরতে হবে। এরপর কালেমা তাইয়্যেবার সাক্ষ্য দিতে হবে এবং দু'রাকাত নামায আদায় করতে হবে। উছায়েদ সবই করলেন এরপর বললেন, আমাদের গোত্রে আরো একজন সর্দার রয়েছেন। তিনি যদি ইসলামে দীক্ষা নেন, তবে আমাদের গোত্রের আর কেউই বাদ থাকবে না। আমি তাকে এখনই আপনাদের কাছে পাঠাচ্ছি।
এরপর হযরত উছায়েদ তার বর্শা নিয়ে সা'দ ইবনে ময়াা'য-এর কাছে গেলেন। সা'দ উছায়েদকে দেখে বললেন, এই লোকাট যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিলো, তার চেয়ে অন্য রকম চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে। উছায়েদকে সা'দ জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি করেছো? উছায়েদ বললেন, আমি তাদের সাথে আলাপ করেছি, কিন্তু আপত্তিকর কিছুই পাইনি। তবে আমি তাদের নিষেধ করেছি। তারা বলেছে, আপনারা যা চান, আমরা তাই করবো। আমি শুনেছি বনি হারেছা গোত্রের লোকেরা আসআদ ইবনে যোরারাকে হত্যা করতে চায়। এর কারণ হচ্ছে যে, তিনি আপনার খালাতো ভাই। ওরা আপনার সাথে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে চায়। এ কথা শোনামাত্র সা'দ ক্রোধে অধীর হয়ে বর্শা হাতে ওদের কাছে পৌঁছুলেন। গিয়ে দেখেন দু'জনেই নিশ্চিন্তে বসে আছেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, উছায়েদ চেয়েছে যে, আমি দু'জন আগন্তুকের সাথে কথা বলি। সা'দ তাদের সামনে গিয়ে রুক্ষ্ণ ভাষায় বললেন, তোমরা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে চাও? এরপর আসআদকে বললেন, খোদার কসম হে আবু আনাস, তোমার এবং আমার মধ্যে যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকতো, তবে তুমি এমন কাজ করতে পারতে না। আমাদের এলাকায় এসে তোমরা এমন কাজ করছো, যা আমাদের পছন্দনীয় নয়।
হযরত আসয়াদ হযরত মসআবকে আগেই বলেছিলেন যে, এমন একজন লোক আসছেন যিনি তার গোত্রের প্রভাবশালী নেতা। যদি তিনি তোমার কথা শোনেন, তবে তার পেছনে কেউ বাদ থাকবে না। এ কারণে হযরত মসআব হযরত সা'দকে বললেন, আপনি বসুন, কিছু কথা শুনুন। ভালো না লাগলে শুনবেন না। হযরত সা'দ বললেন, ঠিকই তো। একথা বলে তিনিও বর্শা মাটিতে পুঁতে বসে পড়লেন। হযরত মসআব তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন তেলাওয়াত করলেন। হযরত মসআব পরে বলেছেন, সা'দ বলার আগেই আমি তার চেহারায় ইসলামের চমক লক্ষ্য করেছি। সা'দ বললেন, তোমরা ইসলাম গ্রহণের পর কি করো? মসআব বললেন, আপনি গোসল করুন, এরপর পাক কাপড় পরুন, এরপর কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেবেন। তারপর দু'রাকাত নামায আদায় করবেন। তারপর সা'দ ইবনে ময়াা'য তাই করলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে হযরত সা'দ নিজের গোত্রের লোকদের কাছে ফিরে গেলেন। লোকেরা বললো, আপনি ভিন্ন চেহারায় ফিরে এসেছেন মনে হচ্ছে। হযরত সা'দ বললেন, তোমরা আমাকে কেমন লোক মনে করো, হে বনি আবদুল আশহাল? সবাই বললো আপনি হচ্ছেন আমাদের নেতা। বুদ্ধি-বিবেচনার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে বেশী। সা'দ ইবনে মায়া'য বললেন, আচ্ছা তবে শোনো, তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ রব্বুল আলামীন এবং তাঁর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ঈমান না আনবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের সাথে কথা বলা আমার জন্যে হারাম। বিকেল পর্যন্ত গোত্রের নারী পুরুষ সবাই ইসলাম গ্রহণ করলেন। উসাইরেম নামে একজন লোক সে সময় ঈমান আনেননি। তিনি ওহুদের যুদ্ধের দিনে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হন। তিনি কোন নামাযও আদায় করেননি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্পর্কে বলেছেন, অল্প আমল করে সে অনেক বেশী পুরস্কার পেয়েছে।
হযরত মসআব ও হযরত আসআদ ইবনে যোরারার ঘরে অবস্থান করেই ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন। এই দাওয়াতে আনসারদের প্রত্যেক পরিবারেই কয়েকজন করে নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করলেন। পরবর্তী হজ্জ মৌসুমে আসার আগে হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) সাফল্যের সুসংবাদ নিয়ে আল্লাহর রসূলের কাছে মক্কায় হাযির হন। তিনি প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ইয়াসরেবের গোত্রসমূহের অবস্থা, তাদের যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষার কৌশল এবং অন্যান্য যোগ্যতা সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য পেশ করেন。

টিকাঃ
১৪. তালকিহুল হুকুম, পৃঃ ১০, সহীহ বোখারী ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৭
১. যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃঃ ৪৯
২. রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃঃ ৮৫, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪৩১-৪৩৩
৩. বোখারী, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫৫০, ৫৫১।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 প্রথম বাইয়াতে আকাবা

📄 প্রথম বাইয়াতে আকাবা


ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবুয়তের দশম বর্ষে হজ্জ মওসুমে ইয়াসরেবের ছয়জন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা আল্লাহর রসূলের সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, নিজেদের কওমের কাছে ফিরে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতের তাবলীগ করবেন।
এর ফলে পরবর্তী হজ্জ মওসুমে ১৩ জন লোক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসেন। এদের মধ্যে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ ছাড়া অন্য ৫ জন ছিলেন, যারা গত বছরও এসেছিলেন। এরা ছাড়া বাকি সাত জনের নাম পরিচয় নিম্নরূপ।
ক্রমিক নাম গোত্র ১. মায়া'য ইবনে হারেস ইবনে আফরা বনি নাজ্জার, খাযরাজ ২. যাকওয়ান ইবনে আবদুল কয়েস বনি যুরাইক, খাযরাজ ৩. ওবাদা ইবনে সামেত বনি গানাম, খাযরাজ ৪. ইয়াযিদ ইবনে ছা'লাবা বনি গানামের মিত্র, খাযরাজ ৫. আব্বাস ইবনে ওবাদা ইবনে নাযলাহ বনি সালেম, খাযরাজ ৬. আবুল হায়ছাম ইবনে তাইহান বনি আবদে আশহাল, আওস ৭. ওযাইম ইবনে সায়েদাহ বনি আমর ইবনে আওফ, আওস।
এদের মধ্যে শেষোক্ত দু'জন ছিলেন আওস এবং বাকি সবাই খাযরাজ গোত্রের।
এরা সবাই মিনায় আকাবার কাছে আল্লাহর রসূলের কাছে কয়েকটি বিষয়ে বাইয়াত নেন। পরবর্তীতে হোদায়বিয়ার সন্ধির পর এবং মক্কা বিজয়ের সময়ে এইসব কথার ওপরেই মহিলাদের কাছ থেকেও বাইয়াত গ্রহণ করা হয়। আকাবার এই বাইয়াতের বিবরণ বোখারী শরীফে ওবাদা ইবনে সামেতের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'এসো, আমার কাছে এ মর্মে বাইয়াত করো যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যেনা করবে না, নিজের সন্তানকে হত্যা করবে না, মনগড়া কোন অপবাদ কারো ওপর দেবে না, ভালো কাজে আমার অনুসরণ করবে, কোন প্রকার অবাধ্যতা করবে না। যে ব্যক্তি এসব কিছু পালন করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এসব বিষয়ের কোন কিছু অমান্য করবে, যদি তাকে সেই অবাধ্যতার জন্যে শাস্তি দেয়া হয় তবে তার শাস্তি তার পাপের কাফফারা হবে। যদি কেউ অবাধ্যতা সত্তেও আল্লাহ যদি তার পাপ গোপন রাখেন তাহলে তার কাজের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি অথবা ক্ষমা করে দেবেন।'
হযরত ওবাদা বলেন, এসব বিষয়ে আমরা আল্লাহর রসূলের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলাম।
মদীনায় রসূলের দূত ও তার ঈর্ষণীয় সাফল্য বাইয়াত শেষ হয়ে গেলো এবং হজ্জ ও শেষ হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগত লোকদের সাথে মদীনায় তাঁর প্রথম দূত পাঠালেন। মুসলমানদের ইসলামের শিক্ষা প্রদান এবং যারা এখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত প্রদানই ছিলো এই দূত প্রেরণের উদ্দেশ্য। প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারী যুবক মসআব ইবনে ওয়ায়ের আবদারি (রা.)- কে আল্লাহর রসূল মদীনায় প্রেরণ করেন।
হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) মদীনায় পৌঁছে হযরত আসআদ ইবনে যুরারা (রা.)- এর ঘরে অবস্থান করেন। এরপর উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে উভয়ে মদীনাবাসীদের ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এ সময় হযরত মসআব 'মুকরিউন' উপাধি লাভ করেন। এর অর্থ শিক্ষক বা মোয়াল্লেম।
দ্বীনের তাবলীগ করার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যের একটি বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে। যোরারাকে সঙ্গে নিয়ে 'একদিন বনি আবদুল আশহাল এবং বনি যোফরের মহল্লায় যান। সেখানে বনি যোবায়ের একটি বাগানে মারক নামে একটি জলাশয়ের কিনারায় বসেন। তাদের কাছে কয়েকজন মুসলমানও সমবেত হন। বনি আশহাল গোত্রের সর্দার ছিলেন সা'দ ইবনে মায়া'য এবং উছায়েদ ইবনে খোযায়ের। তারা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তারা নবাগত মুসলমানদের আগমনের খবর পেলেন। হযরত সা'দ অপর সর্দার উছায়েদ ইবনে খোযায়েরকে বললেন, তুমি গিয়ে দেখে এসো, ব্যাপারটা কি। ওদের বলবে যে, তোমরা কি আমাদের দুর্বল লোকদের বেকুব বানাতে চাও। তাদের ধমক দেবে এবং আমাদের মহল্লায় আসতে নিষেধ করবে। আসয়া'দ ইবনে যোরারা আমার খালাতো ভাই, এ কারণেই তোমাকে পাঠাচ্ছি, না হলে আমি নিজেই যেতাম।
উছায়েদ নিজের বর্শা তুলে উভয়ের কাছে গেলেন। হযরত আসয়া'd তাকে আসতে দেখে হযরত মসআবকে বললেন, কওমের একজন সর্দার তোমার কাছে আসছে। তার ব্যাপারে আল্লাহর রহমত মনে মনে কামনা করো। হযরত মসআব বললেন, তিনি যদি বসেন তবে আমি তার সাথে কথা বলব। উছায়েদ পৌঁছেই ক্ষেপে গেলেন। বললেন, আপনারা কেন আমাদের এলাকায় এসেছেন? আপনারা কি আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে চান? প্রাণের মায়া থাকলে কেটে পড়ুন। হযরত মসআব বললেন, আপনি আমাদের কাছে বসুন। কিছু কথা শুনুন। পছন্দ হলে গ্রহণ করবেন, পছন্দ না হলে করবেন না। হযরত উছায়েদ বললেন, কথা তো ঠিকই। এরপর তিনি নিজের বর্শা মাটিতে পুঁতে বসে পড়লেন। হযরত মসআব (রা.) ইসলামের কথা বলতে শুরু করলেন। কোরআন তেলাওয়াত করলেন। পরে তিনি বলেছেন, উছায়েদ কিছু বলার আগেই আমি তার চেহারায় ইসলামের চমক লক্ষ্য করেছি। সব কথা শুনে উছায়েদ বললেন, কথা তো খুব ভালো। আপনারা কাউকে ইসলামে কিভাবে দীক্ষিত করেন? মসআব বললেন, আপনাকে গোসল করে পাক কাপড় পরতে হবে। এরপর কালেমা তাইয়্যেবার সাক্ষ্য দিতে হবে এবং দু'রাকাত নামায আদায় করতে হবে। উছায়েদ সবই করলেন এরপর বললেন, আমাদের গোত্রে আরো একজন সর্দার রয়েছেন। তিনি যদি ইসলামে দীক্ষা নেন, তবে আমাদের গোত্রের আর কেউই বাদ থাকবে না। আমি তাকে এখনই আপনাদের কাছে পাঠাচ্ছি।
এরপর হযরত উছায়েদ তার বর্শা নিয়ে সা'দ ইবনে ময়াা'য-এর কাছে গেলেন। সা'দ উছায়েদকে দেখে বললেন, এই লোকাট যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিলো, তার চেয়ে অন্য রকম চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে। উছায়েদকে সা'দ জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি করেছো? উছায়েদ বললেন, আমি তাদের সাথে আলাপ করেছি, কিন্তু আপত্তিকর কিছুই পাইনি। তবে আমি তাদের নিষেধ করেছি। তারা বলেছে, আপনারা যা চান, আমরা তাই করবো। আমি শুনেছি বনি হারেছা গোত্রের লোকেরা আসআদ ইবনে যোরারাকে হত্যা করতে চায়। এর কারণ হচ্ছে যে, তিনি আপনার খালাতো ভাই। ওরা আপনার সাথে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে চায়। এ কথা শোনামাত্র সা'দ ক্রোধে অধীর হয়ে বর্শা হাতে ওদের কাছে পৌঁছুলেন। গিয়ে দেখেন দু'জনেই নিশ্চিন্তে বসে আছেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, উছায়েদ চেয়েছে যে, আমি দু'জন আগন্তুকের সাথে কথা বলি। সা'দ তাদের সামনে গিয়ে রুক্ষ্ণ ভাষায় বললেন, তোমরা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে চাও? এরপর আসআদকে বললেন, খোদার কসম হে আবু আনাস, তোমার এবং আমার মধ্যে যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকতো, তবে তুমি এমন কাজ করতে পারতে না। আমাদের এলাকায় এসে তোমরা এমন কাজ করছো, যা আমাদের পছন্দনীয় নয়।
হযরত আসয়াদ হযরত মসআবকে আগেই বলেছিলেন যে, এমন একজন লোক আসছেন যিনি তার গোত্রের প্রভাবশালী নেতা। যদি তিনি তোমার কথা শোনেন, তবে তার পেছনে কেউ বাদ থাকবে না। এ কারণে হযরত মসআব হযরত সা'দকে বললেন, আপনি বসুন, কিছু কথা শুনুন। ভালো না লাগলে শুনবেন না। হযরত সা'দ বললেন, ঠিকই তো। একথা বলে তিনিও বর্শা মাটিতে পুঁতে বসে পড়লেন। হযরত মসআব তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন তেলাওয়াত করলেন। হযরত মসআব পরে বলেছেন, সা'দ বলার আগেই আমি তার চেহারায় ইসলামের চমক লক্ষ্য করেছি। সা'দ বললেন, তোমরা ইসলাম গ্রহণের পর কি করো? মসআব বললেন, আপনি গোসল করুন, এরপর পাক কাপড় পরুন, এরপর কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেবেন। তারপর দু'রাকাত নামায আদায় করবেন। তারপর সা'দ ইবনে ময়াা'য তাই করলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে হযরত সা'দ নিজের গোত্রের লোকদের কাছে ফিরে গেলেন। লোকেরা বললো, আপনি ভিন্ন চেহারায় ফিরে এসেছেন মনে হচ্ছে। হযরত সা'দ বললেন, তোমরা আমাকে কেমন লোক মনে করো, হে বনি আবদুল আশহাল? সবাই বললো আপনি হচ্ছেন আমাদের নেতা। বুদ্ধি-বিবেচনার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে বেশী। সা'দ ইবনে মায়া'য বললেন, আচ্ছা তবে শোনো, তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ রব্বুল আলামীন এবং তাঁর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ঈমান না আনবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের সাথে কথা বলা আমার জন্যে হারাম। বিকেল পর্যন্ত গোত্রের নারী পুরুষ সবাই ইসলাম গ্রহণ করলেন। উসাইরেম নামে একজন লোক সে সময় ঈমান আনেননি। তিনি ওহুদের যুদ্ধের দিনে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হন। তিনি কোন নামাযও আদায় করেননি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্পর্কে বলেছেন, অল্প আমল করে সে অনেক বেশী পুরস্কার পেয়েছে।
হযরত মসআব ও হযরত আসআদ ইবনে যোরারার ঘরে অবস্থান করেই ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন। এই দাওয়াতে আনসারদের প্রত্যেক পরিবারেই কয়েকজন করে নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করলেন। পরবর্তী হজ্জ মৌসুমে আসার আগে হযরত মসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) সাফল্যের সুসংবাদ নিয়ে আল্লাহর রসূলের কাছে মক্কায় হাযির হন। তিনি প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ইয়াসরেবের গোত্রসমূহের অবস্থা, তাদের যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষার কৌশল এবং অন্যান্য যোগ্যতা সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য পেশ করেন।
দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে ৬২২ ঈসায়ী সালের জুন মাসে মদীনা থেকে ৭০ জন মুসলমান হজ্জ পালনের জন্যে মক্কায় আগমন করেন। এরা নিজ কওমের পৌত্তলিক হাজীদের সঙ্গে মক্কায় আসছিলেন। মদীনায় থাকার সময়েই অথবা মক্কায় আসার পথে তারা পরস্পরকে বললেন, কতোদিন পর্যন্ত প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমরা মক্কায় এভাবে কষ্টকর অবস্থায় ফেলে রাখবো? তিনি মক্কায় যেভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, সে সম্পর্কেও তারা আলোচনা করলেন।
মক্কায় পৌছার পর গোপনে তারা প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোপনে যোগাযোগ করলেন এবং সিদ্ধান্ত হলো যে, উভয় দল আইয়ামে তাশরিকের মাঝামাঝি ১২ই জিলহজ্জ তারিখে মিনার জামারায়ে উলায় অর্থাৎ জামরায়ে আকাবার ঘাঁটিতে একত্রিত হয়ে রাতের অন্ধকারে গোপন আলোচনা করবেন।
এই সম্মেলন ইসলাম ও মূর্তিপূজার সংঘাতের মধ্যে সময়ের গতিধারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। একজন আনসার নেতার মুখে সেই সম্মেলনের বিবরণী উল্লেখ করা যাচ্ছে।
হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.) বলেন, আমরা হজ্জ এর জন্যে বেরিয়েছিলাম। প্রিয় নবী আইয়ামে তাশরিকের মাঝে আকাবায় আমাদের সাথে কথা বলার সময় নির্ধারণ করলেন। অবশেষে, সেই রাত এলো, যে রাতে কথা বলার তারিখ ছিলো। আমাদের সাথে আমাদের সম্মানিত নেতা আবদুল্লাহ ইবনে হারামও ছিলেন। তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। আমরা তাকে সঙ্গে নিলাম। আমাদের সঙ্গী অমুসলিমদের কাছে এই সম্মেলনের বিষয় গোপন রাখা হয়েছিলো। আবদুল্লাহ ইবনে হারামের সাথে আমরা আলোচনা করে তাকে বললাম, হে আবু জাবের আপনি আমাদের একজন সম্মানিত নেতা। আপনার বর্তমান অবস্থা থেকে আমরা আপনাকে বের করতে চাই। অনন্তকাল দোযখের আগুন থেকে আপনি মুক্তি লাভ করবেন এটাই আমরা চাই। এরপর আমরা তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমাদের আলোচনার বিষয় তাঁকে জানালাম। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। এবং আমাদের সাথে আকাবায় গেলেন। তাঁকে নকিব মনোনীত করা হলো।

টিকাঃ
১৪. তালকিহুল হুকুম, পৃঃ ১০, সহীহ বোখারী ১ম খন্ড, পৃ. ৫৫৭
১. যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃঃ ৪৯
২. রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃঃ ৮৫, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪৩১-৪৩৩
৩. বোখারী, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫৫০, ৫৫১।

ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবুয়তের দশম বর্ষে হজ্জ মওসুমে ইয়াসরেবের ছয়জন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা আল্লাহর রসূলের সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, নিজেদের কওমের কাছে ফিরে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতের তাবলীগ করবেন।
এর ফলে পরবর্তী হজ্জ মওসুমে ১৩ জন লোক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসেন। এদের মধ্যে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ ছাড়া অন্য ৫ জন ছিলেন, যারা গত বছরও এসেছিলেন। এরা ছাড়া বাকি সাত জনের নাম পরিচয় নিম্নরূপ।

ক্রমিক নাম গোত্র
১. মায়া'য ইবনে হারেস ইবনে আফরা বনি নাজ্জার, খাযরাজ
২. যাকওয়ান ইবনে আবদুল কয়েস বনি যুরাইক, খাযরাজ
৩. ওবাদা ইবনে সামেত বনি গানাম, খাযরাজ
৪. ইয়াযিদ ইবনে ছা'লাবা বনি গানামের মিত্র, খাযরাজ
৫. আব্বাস ইবনে ওবাদা ইবনে নাযলাহ বনি সালেম, খাযরাজ
৬. আবুল হায়ছাম ইবনে তাইহান বনি আবদে আশহাল, আওস
৭. ওযাইম ইবনে সায়েদাহ বনি আমর ইবনে আওফ, আওস।

এদের মধ্যে শেষোক্ত দু'জন ছিলেন আওস এবং বাকি সবাই খাযরাজ গোত্রের।
এরা সবাই মিনায় আকাবার কাছে আল্লাহর রসূলের কাছে কয়েকটি বিষয়ে বাইয়াত নেন। পরবর্তীতে হোদায়বিয়ার সন্ধির পর এবং মক্কা বিজয়ের সময়ে এইসব কথার ওপরেই মহিলাদের কাছ থেকেও বাইয়াত গ্রহণ করা হয়। আকাবার এই বাইয়াতের বিবরণ বোখারী শরীফে ওবাদা ইবনে সামেতের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'এসো, আমার কাছে এ মর্মে বাইয়াত করো যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যেনা করবে না, নিজের সন্তানকে হত্যা করবে না, মনগড়া কোন অপবাদ কারো ওপর দেবে না, ভালো কাজে আমার অনুসরণ করবে, কোন প্রকার অবাধ্যতা করবে না। যে ব্যক্তি এসব কিছু পালন করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এসব বিষয়ের কোন কিছু অমান্য করবে, যদি তাকে সেই অবাধ্যতার জন্যে শাস্তি দেয়া হয় তবে তার শাস্তি তার পাপের কাফফারা হবে। যদি কেউ অবাধ্যতা সত্তেও আল্লাহ যদি তার পাপ গোপন রাখেন তাহলে তার কাজের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি অথবা ক্ষমা করে দেবেন।'
হযরত ওবাদা বলেন, এসব বিষয়ে আমরা আল্লাহর রসূলের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলাম।

টিকাঃ
১ সংকীর্ণ গিরিপথকে বলা হয় আকাবা। মক্কা থেকে মিনায় আসার পথে মিনায় পশ্চিম পাশে একটি সংকীর্ণ পাহাড়ী পথ অতিক্রম করতে হয়। এই গিরিপথ আকাবা নামে বিখ্যাত। দশই যিলহজ্জ তারিখে যে জামরাতে কংকর নিক্ষেপ করা হয় তা এ সুড়ঙ্গ পথের মাথায় অবস্থিত বলে একে জামরায়ে আকাবা বলা হয়। এর দ্বিতীয় নাম জামরায়ে কুবরা। অন্য দুটি জামরা এ স্থান থেকে কিছু পূর্ব দিকে। মিনা ময়দান এ তিনটি জামরার পূর্ব দিকে। এ কারণে জনসমাগম এদিকে লেগেই থাকে। পাথর নিক্ষেপের পর এদিকে আর লোক চলাচল থাকে না। তাই নবী করিম রসূলুল্লাহ (সঃ) যে বাইয়াত করেন, এ বলা হয় বাইয়াতে আকাবা। বর্তমানে এখানে পাহাড় কেটে প্রশস্ত রাস্তা তৈরী করা হয়েছে।
২. রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃঃ ৮৫, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪৩১-৪৩৩
৩. বোখারী, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫৫০, ৫৫১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00