📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 তায়েফে আল্লাহর রসূল

📄 তায়েফে আল্লাহর রসূল


নবুয়তের দশম বর্ষের¹ শুরুর দিকে ৬১৯ ঈসায়ী সালের মে মাসের শেষ দিকে অথবা জুন মাসের প্রথম দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তায়েফ গমন করেন। তায়েফ মক্কা থেকে ষাট মাইল দূরে অবস্থিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাওয়া-আসার পথ একশত বিশ মাইল দূরত্ব পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেছিলেন। আল্লাহর রসূলের সাথে তার মুক্ত করা ক্রীতদাস যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) ছিলেন। তায়েফ যাওয়ার পথে পথে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতেন। কিন্তু কেউ তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করলো না। তায়েফ পৌঁছার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাকিফ গোত্রের তিনজন সর্দারের কাছে যান। এরা পরস্পর ভাই। এদের নাম ছিলো আবদে ইয়ালিল, মাসউদ এবং হাবিব। এদের পিতার নাম ছিলো আমর ইবনে ওমায়ের ছাকাফি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছে পৌঁছে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং ইসলামের সাহায্য করার আহ্বান জানান। জবাবে একজন টিপ্পনির দুরে বললো, কাবার পর্দা সে ফেঁড়ে দেখাক যদি আল্লাহ তাকে রসূল করে থাকেন।²

অন্য একজন বললো, আল্লাহ তায়ালা কি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে পেলেন না? তৃতীয়জন বললো আমি তোমার সাথে কোন কথাই বলতে চাই না। কেননা তুমি যদি নবী হয়ে থাকো, তাহলে তোমার কথা রদ করা আমার জন্যে বিপজ্জনক হবে। আর, তুমি যদি আল্লাহর নামে মিথ্যা কথা রটাও, তবে তো তোমার সাথে আমার কথা বলাই উচিত নয়। এসব শুনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, তোমরা যা করেছো করেছো, তবে বিষয়টা গোপন রেখো।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তায়েফে দশদিন অবস্থান করেন। এ সময়ে তিনি তায়েফের সকল নেতৃস্থানীয় লোক অর্থাৎ গোত্রীয় সর্দারদের কাছে যান এবং প্রত্যেককে দ্বীনের দাওয়াত দেন। কিন্তু সবাই এক কথা বললো যে, তুমি আমাদের শহর থেকে বেরিয়ে যাও। শুধু এ কথা বলেই তারা ক্ষান্ত হয়নি বরং উচ্ছৃঙ্খল বালকদের উস্কানি দিয়েছিলো। তিনি ফেরার সময় ওসব দুর্বৃত্ত বালক তাঁর পেছনে লেগে গেলো। তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালাগাল করছিলো, হাততালি দিচ্ছিলো ও হৈ চৈ করছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে এতো বালক এবং দুর্বৃত্ত লোক জড়ো হলো যে, পথের দু'ধারে লাইন লেগে গেলো। এরপর গালাগাল দিতে এবং ঢিল ছুঁড়তে লাগলো, এতে তাঁর দু'পা রক্তাক্ত হয়ে তাঁর জুতো রক্তে ভরে গেলো। এদিকে হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) ঢাল হিসাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আগলে রাখছিলেন। ফলে নিক্ষিপ্ত ঢিল তাঁর গায়ে পড়ছিলো। তাঁর মাথায় কয়েক জায়গায় কেটে গেলো। হৈ চৈ করতে করতে দুর্বৃত্তরা আল্লাহর রসূলের পিছু নিয়েছিলো। এক সময় তিনি মক্কার ওতবা, শায়বা এবং রবিয়াদের একটি বাগানে আশ্রয় নিলেন। এ বাগান ছিলো তারেফ থেকে তিন মাইল দূরে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বাগানে আশ্রয় নেয়ার পর দুর্বৃত্তদল ফিরে গেলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি দেয়ালে হেলান দিয়ে আঙ্গুর গাছের ছায়ায় বসে পড়লেন। কিছুটা শান্ত হওয়ার পর এই দোয়া করলেন যা 'দোয়ায়ে মোসতাদয়েফিন' নামে বিখ্যাত। এ দোয়ার প্রতিটি শব্দ দ্বারা বোঝা যায় যে, তায়েফবাসীদের খারাপ ব্যবহার এবং একজন লোকেরও ঈমান না আনার কারণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতোটা মনোকষ্ট পেয়েছিলেন। তাঁর দুঃখ ও মনোবেদনা ছিলো কতো গভীর। এই দোয়ায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে আল্লাহ তায়ালা, আমি তোমার কাছে আমার দুর্বলতা, অসহায়তা এবং মানুষের কাছে আমার মূল্যহীনতা সম্পর্কে অভিযোগ করছি। দয়ালু দাতা, তুমি দুর্বলদের প্রভু, তুমি আমারও প্রভু, তুমি আমাকে কার কাছে ন্যস্ত করছো? আমাকে কি এমন অচেনা কারো হাতে ন্যস্ত করছো, যে আমার সাথে রুক্ষ্ণ ব্যবহার করবে। নাকি কোন শত্রুর হাতে ন্যস্ত করছো যাকে তুমি আমার বিষয়ের মালিক করে দিয়েছো? যদি তুমি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না হও তবে আমার কোন দুঃখ নেই, আফসোসও নেই। তোমার ক্ষমাশীলতা আমার জন্যে প্রশস্ত ও প্রসারিত করো। আমি তোমার সত্তর সেই আলোর আশ্রয় চাই, যা দ্বারা অন্ধকার দূর হয়ে আলোয় চারিদিক ভরে যায়। দুনিয়া ও আখেরাতের সকল বিষয় তোমার হাতে ন্যস্ত। তুমি আমার ওপর অভিশাপ নাযিল করবে বা ধমকাবে, যে অবস্থায় তোমার সন্তুষ্টি কামনা করি। সকল ক্ষমতা ও শক্তি শুধু তোমারই। তোমার শক্তি ছাড়া কারো কোনো শক্তি নেই।'

রবিয়ার পুত্ররা আল্লাহর রসূলের অবস্থা দেখে তাঁর প্রতি দয়া পরবশ হলো। নিকটাত্মীয়তার কথা ভেবে তাদের মন নরম হয়ে গেলো। নিজেদের খৃস্টান ক্রীতদাস আদাসের হাতে এক থোকা আঙ্গুর দিয়ে বললো, লোকটিকে দিয়ে এসো। ক্রীতদাস আদাস আঙ্গুরের থোকা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেয়ার পর তিনি 'বিসমিল্লাহ' বলে খেতে শুরু করলেন।

আদাস বললো, খাওয়ার সময় এ ধরনের কথা তো এখানের লোকজনরা বলে না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কোথাকার অধিবাসী? তোমার ধর্ম কি? সে বললো, আমার বাড়ী নিনোভায়। ধর্ম ঈসায়ী। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি পুণ্যশীল বান্দা হযরত ইউসুফের এলাকার অধিবাসী। আদাস বললো, আপনি ইউসুফকে কি করে চেনেন? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তিনি ছিলেন আমার ভাই। তিনি ছিলেন নবী, আমিও নবী। একথা শুনে আদাস রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ঝুঁকে পড়লো এবং তাঁর মাথা, হাত ও পায়ে চুম্বন করলো।

এ অবস্থা দেখে রবিয়ার দুই পুত্র নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলো, এই লোক এবার আমাদের ক্রীতদাসের মাথা বিগড়ে দিয়েছে। মনিবদের কাছে ফিরে গেলে তারা আদাসকে জিজ্ঞাসা করলো, কিরে কি ব্যাপার? আদাস বললো, আমার বিবেচনায় পৃথিবীতে এই লোকের চেয়ে ভালো লোক আর নেই। তিনি আমাকে এমন একটি কথা বলেছেন, যে কথা নবী ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই জানা সম্ভব নয়। রবিয়ার পুত্ররা বললো, দেখো আদাস, এই লোক যেন তোমাকে তোমার ধর্ম বিশ্বাস থেকে সরাতে না পারে। তোমার ধর্ম এ লোকের ধর্মের চেয়ে ভালো।

কিছুক্ষণ অবস্থানের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাগান থেকে বেরিয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হলেন। মানসিকভাবে তিনি ছিলেন বিপর্যস্ত। কারণে মানায়েল নামক জায়গায় পৌঁছাঁর পর আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিবরাঈল (আ) এলেন, তাঁর সাথে পাহাড়ের ফেরেশতারাও ছিলেন। তারা আল্লাহর রসূলের কাছে অনুমতি চাইতে এসেছিলেন যে, যদি তিনি বলেন, তবে এর অধিবাসীদেরকে দু'টি পাহাড়ের মধ্যে পিষে দেবেন।

এ ঘটনার বিবরণ বোখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসূলকে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ওহুদের দিনের চেয়ে মারাত্মক কোন দিন আপনার জীবনে এসেছিলো কি? রসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার কওম থেকে আমি যে বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দিন ছিলো তায়েফের দিন। আমি আবদে ইয়ালিল ইবনে আবদে কুলাল সন্তানদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমার দাওয়াত গ্রহণ করেনি। আমি দুঃখ-কষ্ট ও মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় 'কারোন ছাআলেবে' পৌছে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। সেখানে মাথা তুলে দেখি মাথার ওপরে এক টুকরো মেঘ। ভালোভাবে তাকিয়ে দেখি সেখানে হযরত জিবরাঈল (আ.)। তিনি আমাকে বললেন, আপনার কওম আপনাকে যা যা বলেছে আল্লাহ তায়ালা সবই শুনেছেন। আপনার কাছে পাহাড়ের ফেরেশতাদের পাঠানো হয়েছে। এরপর পাহাড়ের ফেরেশতারা আমাকে আওয়ায দিলেন, সালাম জানালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল, হাঁ, এ কথা সত্যই। আপনি যদি চান তবে আমরা ওদেরকে দুই পাহাড়ের মধ্যে পিষে দেবো।³

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, না, আমি আশা করি আল্লাহ তায়ালা ওদের বংশধরদের মধ্যে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন, যারা শুধুমাত্র আল্লাহর এবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।⁴

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই জবাবে তাঁর দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, অনুপম ব্যক্তিত্ব ও উত্তম মানবিক চেতনার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। মোটকথা, আসমানের ওপর থেকে আসা গায়েবী সাহায্যে তাঁর মন শান্ত হয়ে গেলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কার পথে পা বাড়ালেন। ওয়াদীয়ে নাখলা নামক জায়গায় এসে তিনি থামলেন। এখানে তাঁর অবস্থানের মতো জায়গা ছিলো দু'টি। এক জায়গার নাম 'আসসাইলোল কাবির' অন্য জায়গা হলো 'জায়মা'। উভয় জায়গায় পানি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সজীবতা বিদ্যমান ছিলো। এ দু'টি জায়গার মধ্যে তিনি কোথায় অবস্থান করেছিলেন, সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায়নি।

নাখলায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকদিন কাটান। সেখানে আল্লাহ রব্বুল আলামিন জিনদের দু'টি দল তাঁর কাছে প্রেরণ করেন। পবিত্র কোরআনের দুই জায়গায়-সূরা আহকাফ এবং সূরা জিন-এ এদের কথা উল্লেখ রয়েছে।

সূরা আহকাফে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'স্মরণ কর, আমি তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম একদল জিনকে, যারা কোরআন পাঠ শুনছিলো। যখন ওরা তার কাছে উপস্থিত হলো, ওরা একে অপরকে বলতে লাগলো, চুপ করে শ্রবণ করো। যখন কোরআন পাঠ সমাপ্ত হলো ওরা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেলো এক একজন সতর্ককারীরূপে। এমন এক কেতাবের পাঠ শ্রবণ করেছি, যা অবতীর্ণ হয়েছে মূসা (আ.)-এর ওপর। এটি পূর্ববর্তী কিতাবকে সমর্থন করে এবং সত্য ও সরল পথের দিকে পরিচালিত করে। হে আমাদের সম্প্রদায়, আমাদের দিকে আহ্বাকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন এবং মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে তোমাদের রক্ষা করবেন।' (২৯-৩১, ৪৬)

সূরা জিন-এ আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'বল, আমার প্রতি ওহী প্রেরিত হয়েছে যে, জিনদের একটি দল মনযোগ সহকারে শ্রবণ করেছে এবং বলেছে, আমরা তো এক বিস্ময়কর কোরআন শ্রবণ করেছি, যা সঠিক পথ নির্দেশ করে, ফলে আমরা এতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমরা কখনো আমাদের প্রতিপালকের কোন শরীক স্থির করবো না।' সূরা জিন-এর পনেরটি আয়াত পর্যন্ত এর বর্ণনা রয়েছে।

উল্লিখিত আয়াতসমূহের বর্ণনাভঙ্গি থেকে বোঝা যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিনদের আসার কথা প্রথম দিকে জানতেন না। কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে জানানোর পর আল্লাহর রসূল এ সম্পর্কে অবহিত হন। কোরআনের আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, এটা ছিলো জিনদের প্রথম আগমন। বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় যে, পরবর্তী সময়ে তাদের যাতায়াত চলতে থাকে।

জিনদের আগমন এবং ইসলাম গ্রহণ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিলো দ্বিতীয় সাহায্য। আল্লাহর অদৃশ্য ভান্ডার থেকে তিনি এ সাহায্য লাভ করেন। এ ঘটনার বর্ণনা সম্পর্কিত অন্যান্য আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রসূলকে দ্বীনী দাওয়াতের সাফল্যের ব্যাপারে সুসংবাদ দিয়েছেন এবং একথা সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, পৃথিবীর কোন শক্তিই দ্বীন ইসলামের দাওয়াতের সাফল্য ও অগ্রগতির পথে অন্তরায় হয়ে টিকতে পারবে না। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'কেউ যদি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া না দেয়, তবে সে পৃথিবীতে আল্লাহর অভিপ্রায় ব্যর্থ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ছাড়া তাদের কোন সাহায্যকারীও থাকবে না। ওরাই সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।' (৩২, ৪৬)

আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের উক্তির কথা বলেন, 'আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা আল্লাহকে যমিনে অসহায় করতে পারবো না এবং আমরা পালিয়ে গিয়েও তাঁকে অসহায় করতে পারবো না।' (১২, ৭২)

এই সাহায্য এবং সুসংবাদের সামনে তায়েফের খারাপ ব্যবহারজনিত দুঃখ কষ্ট, মনের কালো মেঘ দূর হয়ে গিয়েছিলো। আল্লাহর রসূল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন যে, মক্কায় তাঁকে ফিরে যেতে হবে এবং নতুন উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে দ্বীনের দাওয়াত দিতে হবে। এ সময় হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রসূল আপনি কি করে মক্কায় যাবেন, মক্কার অধিবাসীরা তো আপনাকে মক্কা থেকে বের করে দিয়েছে। তিনি বললেন, 'হে যায়েদ, তুমি যে অবস্থা দেখছো, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোন উপায় আল্লাহ তায়ালা বের করে দেবেন। আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই তাঁর দ্বীনকে সাহায্য এবং তাঁর নবীকে জয়যুক্ত করবেন।' রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাখলা থেকে রওয়ানা হয়ে মক্কার অদূরে হেরা গুহায় অবস্থান করলেন। সেখান থেকে খাজায়া গোত্রের একজন লোকের মাধ্যমে আখনাস ইবনে শোরাইককে এ পয়গাম পাঠালেন যে, আখনাস যেন তাঁকে আশ্রয় দেয়। আখনাস একথা বলে অক্ষমতা, প্রকাশ করলো যে, আমি তো মিত্রপক্ষ, মিত্রপক্ষ তো কাউকে আশ্রয় দেয়ার মতো দায়িত্ব নিতে পারে না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর সোহায়েল ইবনে আমরের কাছেও একই পয়গাম পাঠালেন। কিন্তু সেই লোকও এই বলে অক্ষমতা প্রকাশ করলো যে, বনু আমরের দেয়া আশ্রয় বনু কা'ব এর ওপর প্রযোজ্য নয়। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোতয়া'ম ইবনে আদীর কাছে পয়গাম পাঠালেন। মোতয়া'ম বললেন, হাঁ, আমি রাযি আছি। এরপর তিনি অস্ত্র সজ্জিত হয়ে নিজের সন্তান এবং গোত্রের লোকদের ডেকে একত্রিত করলেন। সবাই একত্রিত হওয়ার পর বললেন, তোমরা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে কাবাঘরের সামনে যাও। কারণ আমি মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশ্রয় দিয়েছি। এরপর মোতয়া'ম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খবর পাঠালেন যে, আপনি মক্কায় ভেতরে আসুন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবর পাওয়ার পর যায়েদকে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন। মোয়া'ম ইবনে আদী তাঁর সওয়ারীর ওপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন যে, কোরায়শের লোকেরা শোনো, আমি মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশ্রয় দিয়েছি। কেউ যেন এরপর তাঁকে বিরক্ত না করে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাজরে আসওয়াদ চুম্বন এবং দু'রাকাত নামায আদায় করলেন। নামায আদায়ের পর তিনি নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। এ সময় মোতয়া'ম ইবনে আদী এবং তার সন্তানেরা অস্ত্র সজ্জিত হয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘিরে রাখলো। আল্লাহর রসূল ঘরে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত তারা তাঁর সঙ্গে ছিলো।

বলা হয়ে থাকে যে, এ সময় আবু জেহেল মোতয়া'মকে জিজ্ঞাসা করছিলো, তুমি শুধু তাকে আশ্রয় দিয়েছো, না তাঁর অনুসারী অর্থাৎ মুসলমান ও হয়ে গেছো? মোতয়া'ম বললেন, আমি শুধু আশ্রয় দিয়েছি। এতে আবু জেহেল বললো, তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছো, আমরাও তাকে দিলাম।⁵

টিকাঃ
১. মাওলানা নজীবাদী তারীখে ইসলাম ১ম খন্ডে ১২২ পৃষ্ঠায় এ সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। আমার মতে এ তারিখটিই নির্ভুল।
২. উর্দু ভাষায় এ পরিভাষার সাথে একথা মিলে যায় যে, যদি তুমি পয়গাম্বর হও, তবে আল্লাহ আমাকে ধ্বংস করুন। একথা দ্বারা এটাই বোঝানো হয় যে, তোমার মত লোকের পয়গাম্বর হওয়া অসম্ভব, যেমন কাবাঘরের ওপর হামলা করা অসম্ভব।
৩. এখানে সহীহ বোখারীতে আখশাবিন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। মক্কার দু'টি বিখ্যাত পাহাড় আবু কোবায়েস এবং কাযাইকাযান সম্পর্কে এ শব্দ ব্যবহার করা হয়। এ দু'টি পাহাড় কাবাঘরের উত্তর ও দক্ষিণে মুখোমুখি অবস্থানে অবস্থিত। সেই সময়ে মক্কার জন সাধারণ এই দুটি পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গায় বসবাস করতো।
৪. সহীহ বোখারী, কেতাবে বাদায়াল খালক', ১ম খন্ড, পৃ. ৪৫৮
৫. তায়েফ সফরের এ ঘটনার বিবরণসমূহ, ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ৪২৯-৪২২, যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৪৬- ৪৭, রহমাতুল লিল আলামিন ১ম খন্ড, পৃ. ৭১-৭৪, তারীখে ইসলাম, নযীরাবাদী, ১ম খন্ড, পৃ. ১২৩-১২৪।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 বিভিন্ন গোত্র ও ব্যক্তির কাছে ইসলামের দাওয়াত

📄 বিভিন্ন গোত্র ও ব্যক্তির কাছে ইসলামের দাওয়াত


নবুয়তের দশম বর্ষের যিলকদ মাসে অর্থাৎ ৬১৯ ঈসায়ী সালের মে মাসের শেষ বা জুনের প্রথম দিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তায়েফ থেকে মক্কায় আগমন করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি এবং গোত্রের কাছে নতুন উদ্যমে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এ সময় হজ্জের মৌসুম হওয়ায় দূরে কাছে সর্বত্র থেকে হজ্জ পালনের জন্যে পায়ে হেঁটে এবং সওয়ারীতে করে বহু লোক হজ্জ পালনের জন্যে আসেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সময় তাদের ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন। নবুয়তের চতুর্থ বছর থেকে তিনি এ ধরনের দাওয়াত দিয়ে আসছিলেন।

ইমাম যুহরী বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সকল গোত্রের কাছে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন, তারা হচ্ছে, বনু আমের ইবনে সায়া'সায়া', মোহারেব ইবনে খাছবা, ফাজারাহ, নাস্সান, মায়রা, হানিফা, ছালিম, আবাস, বনু নছর, বনু আলবাকা, কেলাব, হারেছ ইবনে কা'ব আযারাহ ও হাযারেমা। কিন্তু কেউই ইসলাম গ্রহণ করেনি।¹ ইমাম যুহরীর উল্লিখিত এ সকল গোত্রের কাছে একবার বা এক বছরের হজ্জ মৌসুমেই শুধু ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয়নি বরং নবুয়তের চতুর্থ বছর থেকে শুরু করে হিজরত পূর্ববর্তী শেষ হজ্জ মৌসুম অর্থাৎ দশ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয়েছিলো।²

ইবনে ইসহাক কয়েকটি গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত প্রদান এবং তাদের জবাবের প্রকৃতিও উল্লেখ করেছেন। নীচে এ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু উল্লেখ করা যাচ্ছে।

এক) বনু কেলাব, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই গোত্রের একটি শাখা বনু আবদুল্লাহর কাছে গমন করেন এবং তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি আহ্বান জানান। কথায় কথায় তিনি বলেছিলেন, হে বনু আবদুল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের পিতামহের চমৎকার নাম রেখেছিলেন। কিন্তু এই গোত্রের লোকেরা আল্লাহর রসূলের দেয়া দাওয়াত গ্রহণ করেনি।

দুই) বনু হানিফা, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদের বাড়ীতে গমন করেন তাদেরকে দাওয়াত দেন কিন্তু তারা যে জবাব দিয়েছিলো, সে রকম জবাব আরবের অন্য কেউই প্রদান করেনি।

তিন) আমের ইবনে সায়া'সায়া', রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদের কাছেও দাওয়াত দিয়েছিলেন। জবাবে এ গোত্রের বুহায়রাহ বিন ফারাস নামক এক ব্যক্তি বলেছিলো, আল্লাহর শপথ যদি আমি কোরায়শের এক যুবককে সঙ্গে রাখি, তবে সমগ্র আরবকে খেয়ে ফেলবো। এরপর সে বললো, একটা কথার জবাব দিন, যদি আমরা আপনার দ্বীন গ্রহণ করি এবং আপনি প্রতিপক্ষের ওপর জয় লাভ করেন, এরপর কি নেতৃত্ব আমাদের হাতে আসবে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নেতৃত্ব কর্তৃত্ব তো আল্লাহর হাতে, তিনি যেখানে ইচ্ছা করেন সেখানে রাখবেন। একথা শুনে সেই লোক, বললো চমৎকার কথা। আপনার নিরাপত্তার জন্যে আমরা নিজেদের বুককে আরবদের নিশানা করবো অথচ আল্লাহ যখন আপনাকে জয়যুক্ত করবেন, তখন নেতৃত্ব কর্তৃত্ব থাকবে অন্যদের হাতে, এটা হয় না। আপনার দ্বীন আমাদের প্রয়োজন নেই।

এরপর বনু আমের গোত্র তাদের এলাকায় চলে যাওয়ার পর একজন বৃদ্ধ এ ঘটনা শুনলেন। বার্ধক্যের কারণে তিনি হজ্জে যেতে পারেন নি। সব শোনার পর তিনি দু'হাতে মাথা চেপে ধরে বললেন, মারাত্মক ভুল করেছো তুমি। হে বনু আমের গোত্রের লোকেরা, সেই লোককে কি খুঁজে পাওয়ার কোন উপায় আছে? সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, হযরত ইসমাইলের কোন বংশধরই নবুয়তের মিথ্যা দাবী করতে পারে না, অতীতেও করেনি। তোমাদের বুদ্ধি চলে গিয়েছিলো?³

মক্কার বাইরে ইসলামের আলো
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন গোত্র এবং প্রতিনিধিদলকেই শুধু নয়, বহু ব্যক্তিকেও ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। এদের অনেকে ভালো জবাবও দিয়েছিলেন। হজ্জ মৌসুমের অল্পকাল পর কিছুসংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। নীচে এ সম্পর্কিত একটি সংক্ষিপ্ত রোয়েদাদ পেশ করা হচ্ছে।

এক) সুয়াইদ ইবনে সামেত, এই লোক ছিলো কবি এবং যথেষ্ট বুদ্ধি বিবেচনাও রাখতো। সে ছিলো ইয়াসরেবের অধিবাসী। বুদ্ধিমত্তা, কাব্যচর্চা, আভিজাত্য এবং বংশ মর্যাদার কারণে তার কওমের লোকেরা তাকে কামেল উপাধিতে ভূষিত করেছিলো। এই লোকটি হজ্জ বা ওমরাহ করার জন্যে মক্কায় এসেছিলো। আল্লাহর রসূল তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়োছলেন। সে বললো, আমার কাছে যে জিনিস আছে, সম্ভবত আপনার কাছেও সেই জিনিসই রয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার কাছে কি রয়েছে? সে বললো, লোকমানের হেকমত। আল্লাহর রসূল বললেন, শোনাও তো। সুয়াইদ শোনালো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ বাণী উত্তম, কিন্তু আমার কাছে যা রয়েছে, সেটা এর চেয়েও উত্তম। আমার কাছে রয়েছে কোরআন। এই কোরআন আল্লাহ আমার ওপর নাযিল করেছেন। এটি হচ্ছে হেদায়াতের নূর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর লোকটিকে কোরআনের কিছু অংশ শোনালেন। এরপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করে বললেন, এটা তো চমৎকার কালাম। নবুয়তের একাদশ বর্ষের প্রথমদিকে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর সুয়াইদ মদীনায় ফিরে এলে বুআস' যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।⁴

দুই) ইয়াশ ইবনে মায়া'য, এই ব্যক্তিও ছিলেন ইয়াসরেবের অধিবাসী। বয়সে ছিলেন যুবক। নবুয়তের একাদশ বর্ষে বুআস যুদ্ধের কিছুকাল আগে আওসের একটি প্রতিনিধিদল খাযরাজের বিরুদ্ধে কোরায়শদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশায় মক্কায় আসে। ইয়াশও তাদের সঙ্গে ছিলেন। সে সময় এ উভয় গোত্রের মধ্যে শত্রুতার আগুন জ্বলে উঠেছিলো। আওসের লোকসংখ্যা ছিলো খাযরাজের চেয়ে কম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ প্রতিনিধিদলের আগমন সংবাদ শোনার পর দেখা করতে গেলেন। তাদের মাঝখানে গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনারা যে উদ্দেশ্যে মক্কায় এসেছেন, এর চেয়ে ভালো কোন জিনিস গ্রহণে রাযি আছেন কি? তারা বললো, কি সেই জিনিস? আল্লাহর রসূল বললেন, আমি আল্লাহর রসূল। আল্লাহ তায়ালা আমাকে তাঁর বান্দাদের কাছে এ দাওয়াত দেয়ার জন্যে প্রেরণ করেছেন যে, তারা যেন আল্লাহর এবাদাত করে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করে। আল্লাহ তায়ালা আমার উপর কেতাবও নাযিল করেছেন। এরপর তিনি ইসলামের কথা উল্লেখ করে কোরআন তেলাওয়াত করেন।

ইয়াশ ইবনে মায়া'য বললেন, হে কওম, আপনারা যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন, এই দাওয়াত তার চেয়ে উত্তম। প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য আবুল হাছির আনাস ইবনে রাফে একমুঠো খড় ইয়াশের মুখে ছুঁড়ে দিয়ে বললো, এসব কথা ছাড়ো। আমার বয়সের শপথ, এখানে আমরা অন্য উদ্দেশ্যে এসেছি। এরপর ইয়াশ আর কোন কথা বলেননি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও উঠে চলে গেলেন। এদিকে প্রতিনিধিদল কোরায়শদের সাথে মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি করতেও সক্ষম হয়নি। তারা ব্যর্থ হয়ে মদীনায় ফিরে গেলো।

তিন) আবুযর গেফারী, এই ব্যক্তি শহর থেকে দূরের এক জায়গায় বসবাস করতেন। সুয়াইদ ইবনে সামেত এবং ইয়াশ ইবনে মায়া'য এর কাছ থেকে আবু যর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের খবর পেয়েছিলেন। এ খবরই ছিলো তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ।⁵

তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বোখারী শরীফে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা মতে আবু যর বলেন, আমি ছিলাম গেফার গোত্রের লোক। আমি শুনলাম এমন একজন লোক আবির্ভূত হয়েছেন, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন। এ খবর শুনে আমার ভাইকে মক্কায় পাঠালাম। তাকে বলে দিলাম, তুমি সেই ব্যক্তির সাথে দেখা করবে এরপর আমার কাছে তার খবর নিয়ে আসবে। আমার ভাই মক্কায় থেকে ফিরে এলে জিজ্ঞাসা করলাম, কি খবর এনেছো? সে বললো, খোদার কসম, আমি এমন একজন মানুষ দেখেছি, যিনি সৎ কাজের আদেশ দিয়ে থাকেন এবং খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখেন। আমি বললাম, তুমি স্বস্তি পাওয়ার মতো খবর দিতে পারোনি। এরপর আমি কিছু পাথেয় সম্বল করে মক্কায় পথে রওয়ানা হয়ে সেখানে হাযির হলাম। কিন্তু সেখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিনতে পারলাম না। কারো কাছে জিজ্ঞাসা করতেও সাহস পেলাম না। যমযমের পানি পান করে মসজিদে হারামে পড়ে রইলাম। হযরত আলী (রা.) দেখে বললেন, আপনাকে অচেনা মনে হচ্ছে। আমি বললাম, জ্বী হাঁ। তিনি বললেন, আমার ঘরে চলুন। আমি তাঁর সাথে গেলাম। তিনি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না, আমিও কিছু বললাম না।

সকালে আবার মসজিদে হারামে গেলাম। আশা ছিলো যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবো। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে কেউ আমাকে কিছু বললো না। সন্ধ্যায় হযরত আলী (রা.) এসে আমাকে দেখে বললেন, এই লোকটি এখনো নিজের ঠিকানা জানতে পারেনি? আমি বললাম, হাঁ তাই, এখনো পারেনি। তিনি বললেন, চলুন, আমার সাথে চলুন। এরপর তিনি বললেন, কি ব্যাপার আপনার, বলুন তো? আপনি এ শহরে কেন এসেছেন? আমি বললাম, আপনি যদি কথাটা গোপন রাখেন, তবে বলতে পারি। তিনি বললেন, ঠিক আছে। আমি বললাম, এখানে একজন লোক নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন বলে আমি খবর পেয়েছি। খবর পাওয়ার পর আমি আমার ভাইকে পাঠিয়েছিলাম কিন্তু সে আমাকে বিস্তারিত কোন খবর জানাতে পারেনি এ কারণে নিজেই এসেছি। হযরত আলী (রা.) বললেন, আপনি ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। আমার সাথে চলুন। যেখানে আমি প্রবেশ করবো, আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন। যাওয়ার পথে যদি কোন লোকের কারণে আপনার আশঙ্কার কারণ দেখা দেয় তবে আমি দোকানের কাছে যাব এবং জুতো ঠিক করার ভান করবো। সে সময়ে আপনি পথ চলতে থাকবেন। এরপর হযরত আলী (রা.) রওয়ানা হলেন, আমিও তার সাথে রওয়ানা হলাম। অবশেষে তিনি ঘরে প্রবেশ করলে আমিও তার সাথে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম। তাঁকে বললাম, আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিন। আল্লাহর রসূল আমার কাছে ইসলাম পেশ করলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেলাম। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, হে আবু যর, তোমার ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখো এবং তোমার এলাকায় চলে যাও। আমরা প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করেছি, এ খবর শোনার পর আমাদের সাথে এসে দেখা করবে। আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি কাফেরদের সামনে প্রকাশ্যে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করবো। এ কথা বলার পর আমি কাবাঘরের সামনে এলাম। কোরায়শরা সেখানে উপস্থিত ছিলো। আমি তাদের বললাম, তোমরা শোনো, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রসূল।

এই ঘোষণার পর কোরায়শরা পরস্পর বলাবলি করলো যে, ওঠো, তোমরা এই বেদ্বীনের খবর নাও। এরপর তারা আমাকে এমনভাবে প্রহার করলো যে, ভেবেছিলাম মরেই যাবো। এ অবস্থায় হযরত আব্বাস (রা.) এসে আমাকে বাঁচালেন। তিনি একটুখানি ঝুঁকে আমাকে দেখলেন। এরপর কোরায়শদের বললেন, এই লোক তো গেফার গোত্রের। তোমরা এ গোত্রের এলাকার ওপর দিয়েই ব্যবসা করতে যাও। এ কথা শুনে পৌত্তলিক কোরায়শরা আমাকে ছেড়ে দিলো। পরদিনও আমি সেখানে গেলাম এবং একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। এবারও হযরত আব্বাস (রা.) এসে আমাকে উদ্ধার করলেন।⁶

৪) তোফায়েল ইবনে আমর দাওসি, এই লোক ছিলেন কবি, বুদ্ধি বিবেচনায় বিশিষ্ট ব্যাক্ত এবং তাঁর গোত্রের সর্দার। এই গোত্র ইয়েমেনের কিছু এলাকায় শাসন ক্ষমতার অধিকারী ছিলো।

নবুয়তের একাদশ বর্ষে তিনি মক্কায় গেলে মক্কায় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে অভ্যর্থনা জানায় এবং তার কাছে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে নালিশ করে। তারা বলে যে, এই লোক আমাদের জটিল-অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে, তার কথায় রয়েছে যাদুর মতো প্রভাব। এতে ভাই ভাইয়ের মধ্যে এবং স্বামী স্ত্রীর মধ্যে, পিতা পুত্রের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি, যে বিপদে আমরা পড়েছি, আপনিও সেই বিপদে পড়েন কিনা। কাজেই আপনার কাছে আবেদন এ লোকের সাথে কোন কথাই বলবেন না।

হযরত তোফায়েল (রা.) বলেন, কোরায়শ পৌত্তলিকরা আমাকে নানাভাবে বোঝালো, এক সময় আমি সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম যে, আল্লাহর রসূলের সাথে কথাও বলবো না তাঁর কোন কথাও শুনবো না। সকালে মসজিদে হারামে যাওয়ার পর কানে তুলো গুঁজে দিয়েছিলাম যাতে আল্লাহর রসূলের কোন কথা আমার কানে না যায়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু কথা আমাকে শোনানোর ইচ্ছা করেছিলেন। এরপর আমি কিছু ভালো কথা শুনলাম। মনে মনে বললাম, আমি তো বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষ। খ্যাতনামা কবি। ভালমন্দ কোন কিছুই তো আমার কাছে গোপন থাকতে পারে না। কেন আমি ভালো কথা শুনবো না? যদি গ্রহণযোগ্য হয়, তবে গ্রহণ করবো। মন্দ হলে গ্রহণ করবো না। এ কথা ভেবে চুপচাপ থাকলাম। আল্লাহর রসূল ঘরে ফিরতে শুরু করলে তাঁর পিছু নিলাম। তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন, আমিও প্রবেশ করলাম। এরপর লোকেরা আমাকে তাঁর ব্যাপারে যে সতর্ক করেছিলো এবং সতর্কতা হিসেবে নিজের কানে যে তুলো গুঁজে দিয়েছিলাম, সেসব কথা তাঁকে শোনালাম। এরপর বললাম, আপনি সবাইকে যে কথা বলে থাকেন আমাকেও বলুন। আল্লাহর রসূল আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন পাঠ করে শোনালেন। আমি সাথে সাথেই ইসলাম গ্রহণ করলাম। আল্লাহর শপথ, আমি এর চেয়ে ভালো কথা আগে কখনো শুনিনি। আমি সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করে সত্যের সাক্ষ্য দিলাম। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, আমার কওমের কাছে আমার কথা গ্রহণযোগ্য, তারা আমাকে যথেষ্ট মান্য করে। আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদরেকে দ্বীনের দাওয়াত দেবো। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে কোন নিদর্শন দেখান। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করলেন।

হযরত তোফায়েল (রা.)-কে যে নিদর্শন দেয়া হয়েছিলো, সেটা এই যে, তিনি তাঁর কওমের কাছাকাছি পৌছার পর তাঁর চেহারা চেরাগের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিলো। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, অন্য কোথাও এ আলো স্থানান্তর করে দিন, অন্যথায় চেহারা বিকৃত হওয়ার অপবাদ দিয়ে ওরা আমার সমালোচনা করবে। এরপর সেই আলো আমার হাতের লাঠির মধ্যে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। হযরত তোফায়েল (রা.) তার পিতা এবং স্ত্রীর কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন, এতে তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে তাঁর কওমের লোকেরা ইসলাম গ্রহণে দেরী করে। কিন্তু হযরত তোফায়েল (রা.) ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যান। খন্দকের যুদ্ধের পর তিনি যখন হিজরত করেন সে সময় তাঁর কওমের সত্তর বা আশি পরিবার তাঁর সঙ্গে ছিলো। হযরত তোফায়েল (রা.) ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।⁸

পাঁচ) জেমাদ আযদি: এই ব্যক্তি ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী এবং আযদ শানওয়াহ গোত্রের মানুষ। ঝাঁড় ফুঁক এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর কাজ করতেন। মক্কায় এসে সেখানকার নির্বোধদের কাছে শুনতে পান যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাগল। আল্লাহর রসূলের কাছে তিনি এ উদ্দেশ্যে গেলেন যে, হয়তো আল্লাহর রসূল তার হাতে ভালো হয়ে যাবেন। আল্লাহর রসূলের সাথে দেখা করে তিনি বললেন, আমি ঝাড় ফুঁক জানি, আপনার কি এর প্রয়োজন আছে? জবাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, আমি তাঁর প্রশংসা করি এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। আল্লাহ তায়ালা যাকে হেদায়াত করেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন কেউ তাকে হেদায়াত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরিক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিতেছি যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রসূল।'

জেমাদ তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, আপনার কথাগুলো আমাকে পুনরায় শুনিয়ে দিন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথাগুলো তিনবার শোনালেন। জেমাদ বললেন, আমি যাদুকরদের জ্যোতিষীদের কথা শুনেছি, কিন্তু আপনি যেসব কথা বললেন, এ ধরনের কথা কোথাও শুনিনি। আপনার কথাতো সমুদ্রের অতলস্পর্শী গভীরতা থেকে উৎসারিত। দিন আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার হাতে ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ করবো। এরপর জেমাদ আयदि ইসলাম গ্রহণ করেন।⁹

টিকাঃ
১. তিরমিযি, মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১৪৯
২. রহমাতুললিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃ. ৭৪
৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৪৩-৪৪৮
৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪২৫-৪২৭ রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃ. ৭৪
৫. একথা আকবর নদীরাবাদী লিখেছেন। তারীখুল ইসলাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১২৮ দেখুন
৬. সহীহ বোখারী, যমযমের কাহিনী অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪৯৯ আবূ জরের ইসলাম গ্রহণ অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫৪৪-৫৪৫
৭. হোদায়বিয়ার সন্ধির পরে তিনি হিজরত করেন। তিনি যখন মদীনায় যান সে সময় আল্লাহর রসূল খয়বরে ছিলেন।
৮. মেশকাতুল মাসাবিহ
৯. সহীহ মুসলিম, মেশকাতুল মাসাবিহ, ২য় খন্ড পৃঃ ৫২৫

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মক্কার বাইরে ইসলামের আলো

📄 মক্কার বাইরে ইসলামের আলো


রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন গোত্র এবং প্রতিনিধিদলকেই শুধু নয়, বহু ব্যক্তিকেও ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। এদের অনেকে ভালো জবাবও দিয়েছিলেন। হজ্জ মৌসুমের অল্পকাল পর কিছুসংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। নীচে এ সম্পর্কিত একটি সংক্ষিপ্ত রোয়েদাদ পেশ করা হচ্ছে।
এক) সুয়াইদ ইবনে সামেত, এই লোক ছিলো কবি এবং যথেষ্ট বুদ্ধি বিবেচনাও রাখতো। সে ছিলো ইয়াসরেবের অধিবাসী। বুদ্ধিমত্তা, কাব্যচর্চা, আভিজাত্য এবং বংশ মর্যাদার কারণে তার কওমের লোকেরা তাকে কামেল উপাধিতে ভূষিত করেছিলো। এই লোকটি হজ্জ বা ওমরাহ করার জন্যে মক্কায় এসেছিলো। আল্লাহর রসূল তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়োছলেন। সে বললো, আমার কাছে যে জিনিস আছে, সম্ভবত আপনার কাছেও সেই জিনিসই রয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার কাছে কি রয়েছে? সে বললো, লোকমানের হেকমত। আল্লাহর রসূল বললেন, শোনাও তো। সুয়াইদ শোনালো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ বাণী উত্তম, কিন্তু আমার কাছে যা রয়েছে, সেটা এর চেয়েও উত্তম। আমার কাছে রয়েছে কোরআন। এই কোরআন আল্লাহ আমার ওপর নাযিল করেছেন। এটি হচ্ছে হেদায়াতের নূর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর লোকটিকে কোরআনের কিছু অংশ শোনালেন। এরপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করে বললেন, এটা তো চমৎকার কালাম। নবুয়তের একাদশ বর্ষের প্রথমদিকে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর সুয়াইদ মদীনায় ফিরে এলে বুআস' যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।
দুই) ইয়াশ ইবনে মায়া'য, এই ব্যক্তিও ছিলেন ইয়াসরেবের অধিবাসী। বয়সে ছিলেন যুবক। নবুয়তের একাদশ বর্ষে বুআস যুদ্ধের কিছুকাল আগে আওসের একটি প্রতিনিধিদল খাযরাজের বিরুদ্ধে কোরায়শদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশায় মক্কায় আসে। ইয়াশও তাদের সঙ্গে ছিলেন। সে সময় এ উভয় গোত্রের মধ্যে শত্রুতার আগুন জ্বলে উঠেছিলো। আওসের লোকসংখ্যা ছিলো খাযরাজের চেয়ে কম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ প্রতিনিধিদলের আগমন সংবাদ শোনার পর দেখা করতে গেলেন। তাদের মাঝখানে গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনারা যে উদ্দেশ্যে মক্কায় এসেছেন, এর চেয়ে ভালো কোন জিনিস গ্রহণে রাযি আছেন কি? তারা বললো, কি সেই জিনিস? আল্লাহর রসূল বললেন, আমি আল্লাহর রসূল। আল্লাহ তায়ালা আমাকে তাঁর বান্দাদের কাছে এ দাওয়াত দেয়ার জন্যে প্রেরণ করেছেন যে, তারা যেন আল্লাহর এবাদাত করে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করে। আল্লাহ তায়ালা আমার উপর কেতাবও নাযিল করেছেন। এরপর তিনি ইসলামের কথা উল্লেখ করে কোরআন তেলাওয়াত করেন।
ইয়াশ ইবনে মায়া'য বললেন, হে কওম, আপনারা যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন, এই দাওয়াত তার চেয়ে উত্তম। প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য আবুল হাছির আনাস ইবনে রাফে একমুঠো খড় ইয়াশের মুখে ছুঁড়ে দিয়ে বললো, এসব কথা ছাড়ো। আমার বয়সের শপথ, এখানে আমরা অন্য উদ্দেশ্যে এসেছি। এরপর ইয়াশ আর কোন কথা বলেননি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও উঠে চলে গেলেন। এদিকে প্রতিনিধিদল কোরায়শদের সাথে মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি করতেও সক্ষম হয়নি। তারা ব্যর্থ হয়ে মদীনায় ফিরে গেলো।
তিন) আবুযর গেফারী, এই ব্যক্তি শহর থেকে দূরের এক জায়গায় বসবাস করতেন। সুয়াইদ ইবনে সামেত এবং ইয়াশ ইবনে মায়া'য এর কাছ থেকে আবু যর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের খবর পেয়েছিলেন। এ খবরই ছিলো তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ।
তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বোখারী শরীফে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা মতে আবু যর বলেন, আমি ছিলাম গেফার গোত্রের লোক। আমি শুনলাম এমন একজন লোক আবির্ভূত হয়েছেন, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন। এ খবর শুনে আমার ভাইকে মক্কায় পাঠালাম। তাকে বলে দিলাম, তুমি সেই ব্যক্তির সাথে দেখা করবে এরপর আমার কাছে তার খবর নিয়ে আসবে। আমার ভাই মক্কায় থেকে ফিরে এলে জিজ্ঞাসা করলাম, কি খবর এনেছো? সে বললো, খোদার কসম, আমি এমন একজন মানুষ দেখেছি, যিনি সৎ কাজের আদেশ দিয়ে থাকেন এবং খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখেন। আমি বললাম, তুমি স্বস্তি পাওয়ার মতো খবর দিতে পারোনি। এরপর আমি কিছু পাথেয় সম্বল করে মক্কায় পথে রওয়ানা হয়ে সেখানে হাযির হলাম। কিন্তু সেখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিনতে পারলাম না। কারো কাছে জিজ্ঞাসা করতেও সাহস পেলাম না। যমযমের পানি পান করে মসজিদে হারামে পড়ে রইলাম। হযরত আলী (রা.) দেখে বললেন, আপনাকে অচেনা মনে হচ্ছে। আমি বললাম, জ্বী হাঁ। তিনি বললেন, আমার ঘরে চলুন। আমি তাঁর সাথে গেলাম। তিনি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না, আমিও কিছু বললাম না।
সকালে আবার মসজিদে হারামে গেলাম। আশা ছিলো যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবো। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে কেউ আমাকে কিছু বললো না। সন্ধ্যায় হযরত আলী (রা.) এসে আমাকে দেখে বললেন, এই লোকটি এখনো নিজের ঠিকানা জানতে পারেনি? আমি বললাম, হাঁ তাই, এখনো পারেনি। তিনি বললেন, চলুন, আমার সাথে চলুন। এরপর তিনি বললেন, কি ব্যাপার আপনার, বলুন তো? আপনি এ শহরে কেন এসেছেন? আমি বললাম, আপনি যদি কথাটা গোপন রাখেন, তবে বলতে পারি। তিনি বললেন, ঠিক আছে। আমি বললাম, এখানে একজন লোক নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন বলে আমি খবর পেয়েছি। খবর পাওয়ার পর আমি আমার ভাইকে পাঠিয়েছিলাম কিন্তু সে আমাকে বিস্তারিত কোন খবর জানাতে পারেনি এ কারণে নিজেই এসেছি। হযরত আলী (রা.) বললেন, আপনি ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। আমার সাথে চলুন। যেখানে আমি প্রবেশ করবো, আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন। যাওয়ার পথে যদি কোন লোকের কারণে আপনার আশঙ্কার কারণ দেখা দেয় তবে আমি দোকানের কাছে যাব এবং জুতো ঠিক করার ভান করবো। সে সময়ে আপনি পথ চলতে থাকবেন। এরপর হযরত আলী (রা.) রওয়ানা হলেন, আমিও তার সাথে রওয়ানা হলাম। অবশেষে তিনি ঘরে প্রবেশ করলে আমিও তার সাথে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম। তাঁকে বললাম, আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিন। আল্লাহর রসূল আমার কাছে ইসলাম পেশ করলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেলাম। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, হে আবু যর, তোমার ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখো এবং তোমার এলাকায় চলে যাও। আমরা প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করেছি, এ খবর শোনার পর আমাদের সাথে এসে দেখা করবে। আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি কাফেরদের সামনে প্রকাশ্যে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করবো। এ কথা বলার পর আমি কাবাঘরের সামনে এলাম। কোরায়শরা সেখানে উপস্থিত ছিলো। আমি তাদের বললাম, তোমরা শোনো, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই এবং মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রসূল।
এই ঘোষণার পর কোরায়শরা পরস্পর বলাবলি করলো যে, ওঠো, তোমরা এই বেদ্বীনের খবর নাও। এরপর তারা আমাকে এমনভাবে প্রহার করলো যে, ভেবেছিলাম মরেই যাবো। এ অবস্থায় হযরত আব্বাস (রা.) এসে আমাকে বাঁচালেন। তিনি একটুখানি ঝুঁকে আমাকে দেখলেন। এরপর কোরায়শদের বললেন, এই লোক তো গেফার গোত্রের। তোমরা এ গোত্রের এলাকার ওপর দিয়েই ব্যবসা করতে যাও। এ কথা শুনে পৌত্তলিক কোরায়শরা আমাকে ছেড়ে দিলো। পরদিনও আমি সেখানে গেলাম এবং একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। এবারও হযরত আব্বাস (রা.) এসে আমাকে উদ্ধার করলেন।
৪) তোফায়েল ইবনে আমর দাওসি, এই লোক ছিলেন কবি, বুদ্ধি বিবেচনায় বিশিষ্ট ব্যাক্ত এবং তাঁর গোত্রের সর্দার। এই গোত্র ইয়েমেনের কিছু এলাকায় শাসন ক্ষমতার অধিকারী ছিলো।
নবুয়তের একাদশ বর্ষে তিনি মক্কায় গেলে মক্কায় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে অভ্যর্থনা জানায় এবং তার কাছে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে নালিশ করে। তারা বলে যে, এই লোক আমাদের জটিল-অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে, তার কথায় রয়েছে যাদুর মতো প্রভাব। এতে ভাই ভাইয়ের মধ্যে এবং স্বামী স্ত্রীর মধ্যে, পিতা পুত্রের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি, যে বিপদে আমরা পড়েছি, আপনিও সেই বিপদে পড়েন কিনা। কাজেই আপনার কাছে আবেদন এ লোকের সাথে কোন কথাই বলবেন না।
হযরত তোফায়েল (রা.) বলেন, কোরায়শ পৌত্তলিকরা আমাকে নানাভাবে বোঝালো, এক সময় আমি সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম যে, আল্লাহর রসূলের সাথে কথাও বলবো না তাঁর কোন কথাও শুনবো না। সকালে মসজিদে হারামে যাওয়ার পর কানে তুলো গুঁজে দিয়েছিলাম যাতে আল্লাহর রসূলের কোন কথা আমার কানে না যায়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু কথা আমাকে শোনানোর ইচ্ছা করেছিলেন। এরপর আমি কিছু ভালো কথা শুনলাম। মনে মনে বললাম, আমি তো বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষ। খ্যাতনামা কবি। ভালমন্দ কোন কিছুই তো আমার কাছে গোপন থাকতে পারে না। কেন আমি ভালো কথা শুনবো না? যদি গ্রহণযোগ্য হয়, তবে গ্রহণ করবো। মন্দ হলে গ্রহণ করবো না। এ কথা ভেবে চুপচাপ থাকলাম। আল্লাহর রসূল ঘরে ফিরতে শুরু করলে তাঁর পিছু নিলাম। তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন, আমিও প্রবেশ করলাম। এরপর লোকেরা আমাকে তাঁর ব্যাপারে যে সতর্ক করেছিলো এবং সতর্কতা হিসেবে নিজের কানে যে তুলো গুঁজে দিয়েছিলাম, সেসব কথা তাঁকে শোনালাম। এরপর বললাম, আপনি সবাইকে যে কথা বলে থাকেন আমাকেও বলুন। আল্লাহর রসূল আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন পাঠ করে শোনালেন। আমি সাথে সাথেই ইসলাম গ্রহণ করলাম। আল্লাহর শপথ, আমি এর চেয়ে ভালো কথা আগে কখনো শুনিনি। আমি সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করে সত্যের সাক্ষ্য দিলাম। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, আমার কওমের কাছে আমার কথা গ্রহণযোগ্য, তারা আমাকে যথেষ্ট মান্য করে। আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদরেকে দ্বীনের দাওয়াত দেবো। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে কোন নিদর্শন দেখান। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করলেন।
হযরত তোফায়েল (রা.)-কে যে নিদর্শন দেয়া হয়েছিলো, সেটা এই যে, তিনি তাঁর কওমের কাছাকাছি পৌছার পর তাঁর চেহারা চেরাগের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিলো। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, অন্য কোথাও এ আলো স্থানান্তর করে দিন, অন্যথায় চেহারা বিকৃত হওয়ার অপবাদ দিয়ে ওরা আমার সমালোচনা করবে। এরপর সেই আলো আমার হাতের লাঠির মধ্যে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। হযরত তোফায়েল (রা.) তার পিতা এবং স্ত্রীর কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন, এতে তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে তাঁর কওমের লোকেরা ইসলাম গ্রহণে দেরী করে। কিন্তু হযরত তোফায়েল (রা.) ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যান। খন্দকের যুদ্ধের পর তিনি যখন হিজরত করেন সে সময় তাঁর কওমের সত্তর বা আশি পরিবার তাঁর সঙ্গে ছিলো। হযরত তোফায়েল (রা.) ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
পাঁচ) জেমাদ আযদি: এই ব্যক্তি ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী এবং আযদ শানওয়াহ গোত্রের মানুষ। ঝাঁড় ফুঁক এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর কাজ করতেন। মক্কায় এসে সেখানকার নির্বোধদের কাছে শুনতে পান যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাগল। আল্লাহর রসূলের কাছে তিনি এ উদ্দেশ্যে গেলেন যে, হয়তো আল্লাহর রসূল তার হাতে ভালো হয়ে যাবেন। আল্লাহর রসূলের সাথে দেখা করে তিনি বললেন, আমি ঝাড় ফুঁক জানি, আপনার কি এর প্রয়োজন আছে? জবাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, আমি তাঁর প্রশংসা করি এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। আল্লাহ তায়ালা যাকে হেদায়াত করেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন কেউ তাকে হেদায়াত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরিক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিতেছি যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রসূল।'
জেমাদ তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, আপনার কথাগুলো আমাকে পুনরায় শুনিয়ে দিন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথাগুলো তিনবার শোনালেন। জেমাদ বললেন, আমি যাদুকরদের জ্যোতিষীদের কথা শুনেছি, কিন্তু আপনি যেসব কথা বললেন, এ ধরনের কথা কোথাও শুনিনি। আপনার কথাতো সমুদ্রের অতলস্পর্শী গভীরতা থেকে উৎসারিত। দিন আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার হাতে ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ করবো। এরপর জেমাদ আयदि ইসলাম গ্রহণ করেন।
মদীনার ছয়জন পুণ্যশীল মানুষ নবুয়তের একাদশ বর্ষে অর্থাৎ ৬২০ ঈসায়ী সালে জুলাই মাসের হজ্জ মওসুমে ইসলামের দাওয়াতের ফলপ্রসূ বিস্তার ঘটে। এ সময়ে সে দাওয়াত একটি মহীরূহে পরিণত হয়। সেই গাছের ঘন পত্রপল্লবের ছায়ায় মুসলমানরা দীর্ঘদিনের অত্যাচার নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভ করেন। মক্কার অধিবাসীরা আল্লাহর রসূলকে অবিশ্বাস করা এবং লোকদের আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার যে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলো তা থেকে পরিত্রাণ পেতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৌশলের আশ্রয় নেন। এ সময়ে তিনি রাত্রিকালে বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তাই মক্কার পৌত্তলিকরা তাঁর পথে বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনি।
এ কৌশলের একপর্যায়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে একরাতে মক্কার বাইরে বনু যোহাল এবং বনু শায়বান ইবনে ছালাবা গোত্রের লোকদের বাড়ীতে গিয়ে তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন। জবাবে তারা আশাব্যঞ্জক কথা বলে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন সাড়া দেয়নি। এ সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক এবং বনু যোহাল গোত্রের একজন লোকের মধ্যে বংশধারা সম্পর্কে চিত্তাকর্ষক প্রশ্নোত্তর ঘটে। উভয়েই ছিলেন বংশধারা বিশেষজ্ঞ।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর মিনার পাহাড়ী এলাকা অতিক্রমের সময় কয়েকজন লোককে আলাপ করতে শোনেন। তিনি সোজা তাদের কাছে যান। এরা ছিলো মদীনার ছয়জন যুবক। এরা ছিলো খাযরাজ গোত্রের সাথে সম্পর্কিত। তাদের নাম ও পরিচয় এই,
ক্রঃ নম্বর নাম গোত্রের নাম ১ আসয়াদ ইবনে যোরারাহ বনু নাজ্জার ২ আউন ইবনে হারেস ইবনে রেফায়া' (ইবনে আফরা) বনু নাজ্জার ৩ রাফে ইবনে মালেক ইবনে আযলান বনু যোরায়েক ৪ কোতবা ইবনে আমের ইবনে হাদিদা বনু সালমা ৫ ওকবা ইবনে আমের ইবনে নাবি বনু হারাম ইবনে কা'ব ৬ হারেস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে রেআব বনু ওবায়েদ ইবনে গানাম
এসব যুবক তাদের প্রতিপক্ষ মদীনার ইহুদীদের কাছে শুনতো যে, সেই যুগে একজন নবী আসবেন। তারা একথাও শুনেছিলো যে, তিনি সহসা আবির্ভূত হবেন।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে গিয়ে তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বললো, আমরা খাযরাজ গোত্রের লোক। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইহুদীদের প্রতিপক্ষ? তারা বললো, হাঁ! আল্লাহর রসূল বললেন, তোমরা একটু বসো, আমি কিছু কথা বলি। তারা বসলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছে দ্বীন ইসলামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন, আল্লাহর পথে দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন পাঠ করে শোনালেন। সেই ছয়জন যুবক পরস্পরকে বললো, এই তো মনে হয় সেই নবী, যার কথা উল্লেখ করে ইহুদীরা আমাদের ধমক দিয়ে থাকে। ইহুদীরা যেন আমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে আমাদের সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর সেই ছয় ভাগ্যবান যুবক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত কবুল করে ইসলাম গ্রহণ করেন।
এই ছয়জন ছিলেন মদীনার বিবেকসম্পন্ন মানুষ। এর কিছুদিন আগে মদীনায় একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, সেই যুদ্ধের ধোঁয়া তখনো মিলিয়ে যায়নি। সেই যুদ্ধ এদেরকে তছনছ করে দিয়েছিলো। এ কারণে তারা সঙ্গত কারণেই আশা করেছিলো যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত যুদ্ধ সমাপ্তির হিসেবে প্রমাণিত হবে। তারা বললেন, আমরা আমাদের কওমকে এমন অবস্থায় রেখে এসেছি যে, তারা শত্রু পরিবেষ্টিত। অন্য কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ ধরনের শত্রুতা আছে বলে মনে হয় না। আমরা আশা করি যে, আপনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাদের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন সৃষ্টি করবেন। মদীনায় ফিরে গিয়ে আমরা তাদেরকে আপনার প্রচারিত দ্বীনের পথে আহ্বান জানাবো। আমরা আপনার কাছ থেকে যে দ্বীন গ্রহণ করেছি, এই দ্বীন গ্রহণ করার জন্যে তাদেরও দাওয়াত দেবো। যদি আল্লাহ তায়ালা আপনার মাধ্যমে তাদের ঐক্যবদ্ধ করেন, তবে আপনার চেয়ে সম্মানিত অন্য কেউই হবে না।
এই ছয়জন নও মুসলিম মদীনায় ফিরে যাওয়ার সময় ইসলামের দাওয়াত সাথে নিয়ে গেলেন। এদের মাধ্যমে মদীনার ঘরে ঘরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব ও দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়লো।

টিকাঃ
৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪২৫-৪২৭ রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃ. ৭৪
৫. একথা আকবর নদীরাবাদী লিখেছেন। তারীখুল ইসলাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১২৮ দেখুন
৬. সহীহ বোখারী, যমযমের কাহিনী অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৯৯ আবূ জরের ইসলাম গ্রহণ অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪৪-৫৪৫
৭. হোদায়বিয়ার সন্ধির পরে তিনি হিজরত করেন। তিনি যখন মদীনায় যান সে সময় আল্লাহর রসূল খয়বরে ছিলেন।
৮. মেশকাতুল মাসাবিহ
৯. সহীহ মুসলিম, মেশকাতুল মাসাবিহ, ২য় খন্ড পৃঃ ৫২৫
১০. মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃঃ ১৫০-১৫২
১১. রহমাতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড পৃঃ ৮৪
১২. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃঃ ৫০, ইবনে সালাম ১ম খন্ড, পৃঃ ৪২৯-৫৪১
১৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪২৮-৪৪৩

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মদীনার ছয়জন পুণ্যশীল মানুষ

📄 মদীনার ছয়জন পুণ্যশীল মানুষ


নবুয়তের একাদশ বর্ষে অর্থাৎ ৬২০ ঈসায়ী সালে জুলাই মাসের হজ্জ মওসুমে ইসলামের দাওয়াতের ফলপ্রসূ বিস্তার ঘটে। এ সময়ে সে দাওয়াত একটি মহীরূহে পরিণত হয়। সেই গাছের ঘন পত্রপল্লবের ছায়ায় মুসলমানরা দীর্ঘদিনের অত্যাচার নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভ করেন। মক্কার অধিবাসীরা আল্লাহর রসূলকে অবিশ্বাস করা এবং লোকদের আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার যে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলো তা থেকে পরিত্রাণ পেতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৌশলের আশ্রয় নেন। এ সময়ে তিনি রাত্রিকালে বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তাই মক্কার পৌত্তলিকরা তাঁর পথে বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনি।
এ কৌশলের একপর্যায়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে একরাতে মক্কার বাইরে বনু যোহাল এবং বনু শায়বান ইবনে ছালাবা গোত্রের লোকদের বাড়ীতে গিয়ে তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন। জবাবে তারা আশাব্যঞ্জক কথা বলে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন সাড়া দেয়নি। এ সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক এবং বনু যোহাল গোত্রের একজন লোকের মধ্যে বংশধারা সম্পর্কে চিত্তাকর্ষক প্রশ্নোত্তর ঘটে। উভয়েই ছিলেন বংশধারা বিশেষজ্ঞ।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর মিনার পাহাড়ী এলাকা অতিক্রমের সময় কয়েকজন লোককে আলাপ করতে শোনেন। তিনি সোজা তাদের কাছে যান। এরা ছিলো মদীনার ছয়জন যুবক। এরা ছিলো খাযরাজ গোত্রের সাথে সম্পর্কিত। তাদের নাম ও পরিচয় এই,

১. আসয়াদ ইবনে যোরারাহ বনু নাজ্জার
২. আউন ইবনে হারেস ইবনে রেফায়া' (ইবনে আফরা) বনু নাজ্জার
৩. রাফে ইবনে মালেক ইবনে আযলান বনু যোরায়েক
৪. কোতবা ইবনে আমের ইবনে হাদিদা বনু সালমা
৫. ওকবা ইবনে আমের ইবনে নাবি বনু হারাম ইবনে কা'ব
৬. হারেস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে রেআব বনু ওবায়েদ ইবনে গানাম

এসব যুবক তাদের প্রতিপক্ষ মদীনার ইহুদীদের কাছে শুনতো যে, সেই যুগে একজন নবী আসবেন। তারা একথাও শুনেছিলো যে, তিনি সহসা আবির্ভূত হবেন।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে গিয়ে তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বললো, আমরা খাযরাজ গোত্রের লোক। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইহুদীদের প্রতিপক্ষ? তারা বললো, হাঁ! আল্লাহর রসূল বললেন, তোমরা একটু বসো, আমি কিছু কথা বলি। তারা বসলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছে দ্বীন ইসলামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন, আল্লাহর পথে দাওয়াত দিলেন এবং কোরআন পাঠ করে শোনালেন। সেই ছয়জন যুবক পরস্পরকে বললো, এই তো মনে হয় সেই নবী, যার কথা উল্লেখ করে ইহুদীরা আমাদের ধমক দিয়ে থাকে। ইহুদীরা যেন আমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে আমাদের সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর সেই ছয় ভাগ্যবান যুবক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত কবুল করে ইসলাম গ্রহণ করেন।
এই ছয়জন ছিলেন মদীনার বিবেকসম্পন্ন মানুষ। এর কিছুদিন আগে মদীনায় একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, সেই যুদ্ধের ধোঁয়া তখনো মিলিয়ে যায়নি। সেই যুদ্ধ এদেরকে তছনছ করে দিয়েছিলো। এ কারণে তারা সঙ্গত কারণেই আশা করেছিলো যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত যুদ্ধ সমাপ্তির হিসেবে প্রমাণিত হবে। তারা বললেন, আমরা আমাদের কওমকে এমন অবস্থায় রেখে এসেছি যে, তারা শত্রু পরিবেষ্টিত। অন্য কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ ধরনের শত্রুতা আছে বলে মনে হয় না। আমরা আশা করি যে, আপনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাদের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন সৃষ্টি করবেন। মদীনায় ফিরে গিয়ে আমরা তাদেরকে আপনার প্রচারিত দ্বীনের পথে আহ্বান জানাবো। আমরা আপনার কাছ থেকে যে দ্বীন গ্রহণ করেছি, এই দ্বীন গ্রহণ করার জন্যে তাদেরও দাওয়াত দেবো। যদি আল্লাহ তায়ালা আপনার মাধ্যমে তাদের ঐক্যবদ্ধ করেন, তবে আপনার চেয়ে সম্মানিত অন্য কেউই হবে না।
এই ছয়জন নও মুসলিম মদীনায় ফিরে যাওয়ার সময় ইসলামের দাওয়াত সাথে নিয়ে গেলেন। এদের মাধ্যমে মদীনার ঘরে ঘরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব ও দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়লো।

টিকাঃ
১০. মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃঃ ১৫০-১৫২
১১. রহমাতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড পৃঃ ৮৪
১২. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃঃ ৫০, ইবনে সালাম ১ম খন্ড, পৃঃ ৪২৯-৫৪১
১৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪২৮-৪৪৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00