📄 দুশ্চিন্তা ও মনোবেদনা
হযরত সাওদার সাথে বিবাহ
সেই বছর অর্থাৎ নবুয়তের দশম বর্ষে শওয়াল মাসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সাওদা বিনতে জাম'য়া (রা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত সাওদা নবুয়তের প্রথম দিকেই মুসলমান হয়েছিলেন। দ্বিতীয় হিজরীতে তিনি হাবশায় হিজরতও করেছিলেন। তাঁর স্বামীর নাম ছিলো ছাকরান ইবনে আমর। তিনিও প্রথম দিকে মুসলমান হন। হযরত সাওদা তাঁর সঙ্গে হাবশায় হিজরত করেন। কিন্তু তিনি হাবশাতেই মতান্তরে মক্কায় ফেরার পথে ইন্তেকাল করেন। এরপর হযরত সাওদার ইদ্দত শেষ হওয়ার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত খাদিজা (রা.)-এর ওফাতের পর তিনিই ছিলেন আল্লাহর রসূলের স্ত্রী। কয়েক বছর পর তিনি নিজের পালা হযরত আয়েশাকে হেবা করে দেন।
📄 হযরত সাওদার সাথে বিয়ে
সেই বছর অর্থাৎ নবুয়তের দশম বর্ষে শওয়াল মাসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সাওদা বিনতে জাম'য়া (রা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত সাওদা নবুয়তের প্রথম দিকেই মুসলমান হয়েছিলেন। দ্বিতীয় হিজরীতে তিনি হাবশায় হিজরতও করেছিলেন। তাঁর স্বামীর নাম ছিলো ছাকরান ইবনে আমর। তিনিও প্রথম দিকে মুসলমান হন। হযরত সাওদা তাঁর সঙ্গে হাবশায় হিজরত করেন। কিন্তু তিনি হাবশাতেই মতান্তরে মক্কায় ফেরার পথে ইন্তেকাল করেন। এরপর হযরত সাওদার ইদ্দত শেষ হওয়ার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত খাদিজা (রা.)-এর ওফাতের পর তিনিই ছিলেন আল্লাহর রসূলের স্ত্রী। কয়েক বছর পর তিনি নিজের পালা হযরত আয়েশাকে হেবা করে দেন।
সেই বছর অর্থাৎ নবুয়তের দশম বর্ষে শওয়াল মাসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সাওদা বিনতে জাম'য়া (রা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত সাওদা নবুয়তের প্রথম দিকেই মুসলমান হয়েছিলেন। দ্বিতীয় হিজরীতে তিনি হাবশায় হিজরতও করেছিলেন। তাঁর স্বামীর নাম ছিলো ছাকরান ইবনে আমর। তিনিও প্রথম দিকে মুসলমান হন। হযরত সাওদা তাঁর সঙ্গে হাবশায় হিজরত করেন। কিন্তু তিনি হাবশাতেই মতান্তরে মক্কায় ফেরার পথে ইন্তেকাল করেন। এরপর হযরত সাওদার ইদ্দত শেষ হওয়ার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত খাদিজা (রা.)-এর ওফাতের পর তিনিই ছিলেন আল্লাহর রসূলের স্ত্রী। কয়েক বছর পর তিনি নিজের পালা হযরত আয়েশাকে হেবা করে দেন।
টিকাঃ
১০. রহমাতুল লিল আলামিন, ২য় খন্ড, পৃ. ১৬৫. তালকিহুল ফুহুম, পৃ. ৬
📄 প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবাদের ধৈর্য সহিষ্ণুতা
সেই নিদারুণ দুঃসময়েও মুসলমানরা কিভাবে অটল অবিচল থাকতে সক্ষম হলেন? একথা ভেবে শক্ত মনের মানুষও অবাক হয়ে যান। কি নির্মম নির্যাতনের মুখেও মুসলমানরা ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছিলেন। অত্যাচার নির্যাতনের বিবরণ পাঠ করে দেহ-মন শিউরে উঠে। কি সেই সম্মোহনী শক্তি, যার কারণে মুসলমানরা এতোটা অবিচলিত ছিলেন? এ সম্পর্কে নীচে সংক্ষেপে আলোকপাত করা যাচ্ছে।
এক. ঈমানের সৌন্দর্য
সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে আল্লাহর ওপর ঈমান এবং তাঁর সঠিক পরিচয় জানা। ঈমানের সৌন্দর্য ও মাধুর্য পাহাড়ের সাথে ধাক্কা খেয়েও অটল থাকে। যার ঈমান এ ধরনের মযবুত এবং শক্তিশালী, তিনি যে কোন অত্যাচার নির্যাতনকে সমুদ্রের ওপরে ভাসমান ফেনার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেন না। এ কারণেই মোমেন বান্দা ঈমানের মিষ্টতা এবং মাধুর্যের সামনে কোন বিপদ বাধাকেই পরোয়া করেন না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'যা আবর্জনা, তা ফেলে দেয়া হয় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিতে থেকে যায়।' (১৭, ১৩)
দুই. আকর্ষণীয় নেতৃত্ব
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন উম্মতে ইসলামিয়া বরং সমগ্র মানব জাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। তাঁর শারীরিক সৌন্দর্য, মানসিক পূর্ণতা, প্রশংসনীয় চরিত্র, চমৎকার ব্যক্তিত্ব, পরিশীলিত অভ্যাস ও কর্মতৎপরতা দেখে আপনা থেকেই তাঁকে ভালোবাসার ইচ্ছা জাগতো। তাঁর জন্যে মন উজাড় করে দিতে ইচ্ছা হতো। মানুষ যেমন গুণ বৈশিষ্ট মনে প্রাণে পছন্দ করে, সেসব তার মধ্যে এতো বেশী ছিলো যে, এতোগুলো গুণবৈশিষ্ট্য একত্রে অন্য কাউকেই দেয়া হয়নি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, আভিজাত্য, ও চারিত্রিক সৌন্দর্যে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ক্ষমাশীলতা, আমানতদারি, সততা সত্যবাদিতা, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি গুণ এতো বেশী ছিলো যে, তাঁর স্বাতন্ত্র্য ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে শত্রুরাও কখনো সন্দেহ পোষণ করেনি। তিনি যে কথা মুখে একবার উচ্চারণ করতেন তাঁর শত্রুরাও জানতো যে, সে কথা সত্য এবং তা বাস্তবায়িত হবেই হবে। বিভিন্ন ঘটনা থেকে একথার প্রমাণও পাওয়া যায়।
একবার কোরায়শদের তিনজন লোক একত্রিত হয়েছিলো, তারা প্রত্যেকেই গোপনে কোরআন তেলাওয়াত শুনেছিলো। কিন্তু কারো কাছে তারা সে কথা প্রকাশ করেনি। এদের মধ্যে' আবু জেহেলও ছিলো একজন। অন্য দু'জনের একজন আবু জেহেলেকে জিজ্ঞাসা করলো যে, মোহাম্মদের কাছে যা কিছু শুনেছো, বলতো, সে সম্পর্কে তোমার মতামত কি? আবু জেহেল বললো, আমি কি শুনেছি? আসলে কথা হচ্ছে যে, আমরা এবং বনু আবদে মান্নাফ আভিজাত্য ও মর্যাদার ব্যাপারে একে অন্যের সাথে মোকাবেলা করতাম। তারা গরীবদের পানাহার করালে আমরাও তা করতাম, তারা দান খয়রাত করলে আমরাও করতাম। ওরা এবং আমরা ছিলাম পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। আমরা ছিলাম রেসের ঘোড়ার দুই প্রতিযোগীর মতো। এমনি অবস্থায় আবদে মান্নাফ বলতে শুরু করলো যে, আমাদের মধ্যে একজন নবী আছেন, তার কাছে আকাশ থেকে ওহী আসে। বলতো আমরা কিভাবে ওরকম ওহী পেতে পারি? খোদার কসম, আমি ঐ ব্যক্তির ওপর কখনো বিশ্বাস স্থাপন করবো না এবং কখনো তাকে সত্যবাদী বলে স্বীকৃতি দেবো না। আবু জেহেল বলতো, হে মোহাম্মদ আমি তোমাকে মিথ্যাবাদী বলি না, কিন্তু তুমি যা কিছু নিয়ে এসেছ সেটাকে মিথ্যা বলি। একথার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেন, 'ওরা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে না। কিন্তু ওসব যালেম আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে।'
ইতিপূর্বে এ ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে যে, পৌত্তলিকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একদিন গালাগাল করছিলো। পরপর তিনবার এরূপ করলো। তৃতীয়বার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থমকে দাঁড়িায় বললেন, হে কোরায়শদল, আমি তোমাদের কাছে যবাইর পশু নিয়ে এসেছি। একথা শোনার সাথে সাথে কাফেররা আল্লাহর রসূলকে ভালো ভালো কথা বলে খুশী করার চেষ্টা করতে লাগলো। ইতিপূর্বে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেজদা দেয়ার সময় কয়েকজন কাফের তাঁর ঘাড়ের ওপর উটের নাড়িভুড়ি চাপিয়ে দিয়েছিলো। নামায শেষে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধরনের কাজ যারা করেছে, তাদেরকে বদ দোয়া দিলেন। সেই বদ দোয়া শুনে কাফেরদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো, তারা গভীর চিন্তায় পড়ে গেলো। কেননা তারা নিশ্চিতভাবে জানতো যে, এবার আর তারা রেহাই পাবে না।
এ ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু লাহাবের পুত্র ওতাইবাকে বদদোয়া করার পর সে বুঝেছিলো যে, এর পরিণাম থেকে সে রক্ষা পাবে না। সিরিয়া সফরের সময় বাঘ দেখেই সে বলেছিলো, আল্লাহর কসম, মোহাম্মদ মক্কায় থেকেই আমাকে হত্যা করছেন।
উবাই ইবনে খালফের ঘটনায় রয়েছে যে, এই লোকটি বারবার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার হুমকি দিতো। এ ধরনের হুমকির জবাবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার বলেছিলেন, তুমি নও বরং আমিই তোমাকে হত্যা করবো ইনশাল্লাহ্। এরপর ওহুদের যুদ্ধে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য একজন সাহাবীর হাত থেকে একটি বর্শা নিয়ে উবাইয়ের প্রতি নিক্ষেপ করেন। এতে তার ঘাড়ের কাছে সামান্য যখম হয়েছিলো। পরে উবাই বারবার বলছিলো, মোহাম্মদ মক্কায়ই বলেছিলেন, আমি তোমাকে হত্যা করবো। তিনি যদি আমাকে থুথুও নিক্ষেপ করতেন, তবুও আমার প্রাণ বেরিয়ে যেতো। এর বিস্তারিত বিবরণ পরে উল্লেখ করা হবে।
একবার হযরত সা'দ ইবনে মায়ায মক্কায় উমাইয়া ইবনে খালফকে বলেছিলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি যে, মুসলমানরা তোমাকে হত্যা করবে। একথা শুনে উমাইয়া ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো। এ ভয় সব সময়েই তার ছিলো। সে প্রতিজ্ঞা করেছিলো যে, মক্কার বাইরে কখনো যাবে না। বদরের যুদ্ধের সময় আবু জেহেলের পীড়াপীড়িতে উমাইয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সবচেয়ে দ্রুতগামী উট ক্রয় করলো, যাতে বিপদের আশঙ্কার সময় দ্রুত পালিয়ে আসতে পারে। যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার সময় তার স্ত্রী তাকে বলেছিলেন, আবু সফওয়ান, আপনার ইয়াসরেবী ভাই যে কথা বলেছেন, আপনি কি সে কথা ভুলে গেছেন? উমাইয়া বললো, না ভুলিনি, আমি তো ওদের সাথে অল্প কিছু দূরে যাব। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শত্রুদের অবস্থা ছিলো এ রকম। তাঁর সঙ্গী এবং সাহাবাদের অবস্থাতো এমন ছিলো যে, তারা মনে প্রাণে প্রিয় নবীর প্রতি নিবেদিত ছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সাহাবাদের ভালোবাসা এতো তীব্র ছিলো যেন তা পাহাড়ী ঝর্ণার পানির ধারা। লোহা যেমন চুম্বকের প্রতি আকৃষ্ট হয়, সাহাবারাও তেমনি আল্লাহর রসূল (স.)-এর প্রতি আকৃষ্ট হতেন।
কবি বলেন, 'তাঁর চোহারা সব মানব দেহের জন্যে অস্তিত্ব স্বরূপ, তাঁর অস্তিত্ব ছিলো প্রতিটি অন্তরের জন্যে চুম্বকের মতো।'
এ ধরনের ভালোবাসা এবং নিবেদিত চিত্ততার কারণেই সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর রসূলের ওপর কারো আঁচড় এবং তাঁর পায়ে কাঁটা বিদ্ধ হওয়াও সহ্য করতে পারতেন না। এর বিনিময়ে তারা নিজেদের মাথা কাটিয়ে দিতেও প্রস্তুত থাকতেন।
দুর্বৃত্ত ওতবা ইবনে রবিয়া একদা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে মারাত্মকভাবে প্রহার করলো। তাঁর চেহারা রক্তাক্ত করে দেয়া হলো। তীব্র প্রহারের এক পর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। খবর পেয়ে তাঁর গোত্র বনু তাইমের লোকেরা তাঁকে কাপড়ে জড়িয়ে বাড়িতে পৌছে দিল। তাঁর বাঁচার আশা সবাই ছেড়ে দিয়েছিলো। দিনের শেষে তাঁর জ্ঞান ফিরে এলো। তিনি প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেমন আছেন? একথা শুনে বনু তাইম গোত্রের যারা সেখানে উপস্থিত ছিলো, তারা বিরক্তি প্রকাশ করলো। তারা উঠে যাওয়ার সময় হযরত আবু বকরের মাকে বললো, ওকে কিছু খাওয়াতে পারেন কিনা দেখুন। আবু বকর (রা.) তাঁর মা উম্মুল খায়েরের কাছে আল্লাহর রসূলের খবর জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, আমি তো জানি না বাবা। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, মা, আপনি উম্মে জামিল বিনতে খাত্তাবের কাছে যান। তাঁর কাছ থেকে আমাকে আল্লাহর রসূলের খবর এনে দিন। উম্মুল খায়ের উম্মে জামিল বিনতে খাত্তাবের কাছে গেলেন, তাঁকে বললেন, আবু বকর তোমার কাছে মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সম্পর্কে জানতে চাইছেন। উম্মে জামিল বললেন, আমি আবু বকরকেও জানি না, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহকেও জানি না। তবে আপনি যদি চান, তাহলে আমি আবু বকরের কাছে যেতে পারি। উম্মুল খায়ের উম্মে জামিলকে তাঁর পুত্রের কাছে নিয়ে এলেন। হযরত আবু বকরের অবস্থা দেখে উম্মে জামিল চিৎকার দিয়ে উঠলেন। বললেন, যে কওমের লোকেরা আপনার এ দুরবস্থা করেছে, নিসন্দেহে তারা দুর্বৃত্ত এবং কাফের। আমি আশা করি, আল্লাহ তায়ালা আপনার পক্ষে ওদের ওপর প্রতিশোধ নেবেন। হযরত আবু বকর (রা.) আল্লাহর রসূলের খবর জানতে চাইলেন। উম্মে জামিল উম্মুল খায়েরের প্রতি ইশারা করলেন। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, অসুবিধা নেই। উম্মে জামিল বললেন, তিনি ভালো আছেন এবং ইবনে আরকামের ঘরে আছেন। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে, আমাকে আল্লাহর রসূলের কাছে না নেয়া পর্যন্ত আমি কোন কিছুই পানাহার করবো না। উম্মুল খায়ের এবং উম্মে জামিল অপেক্ষা করতে লাগলেন। সন্ধ্যার পর লোক চলাচল কমে গেলে এবং অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর মা উম্মুল খায়ের এবং উম্মে জামিলের কাঁধে ভর দিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হলেন। ভালোবাসা এবং নিবেদিতচিত্ততার আরো কিছু বিস্ময়কর ঘটনা এ বইয়ের বিভিন্ন স্থান, বিশেষত ওহুদের যুদ্ধের ঘটনায় এবং হযরত যোবায়ের (রা.)-এর ঘটনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন. দায়িত্ব সচেতনতা
সাহবায়ে কেরাম ভালোভাবেই জানতেন যে, মাটির মানুষের ওপর যেসব দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সে দায়িত্ব যতো কঠিনই হোক না কেন, উপেক্ষা করার কোন উপায় নেই। কেননা সে দায়িত্ব উপেক্ষার পরিণাম হবে আরো বেশী ভয়াবহ। এতে সমগ্র মানব জাতি ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সেই ক্ষতির তুলনায় এ যুলুম অত্যাচার বিপদ মুসিবতের কোন গুরুত্বই নেই।
চার. পরকালের ওপর বিশ্বাস
আখেরাত বা পরকালের জীবনের ওপর বিশ্বাস উল্লিখিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁদের কঠোর সংযমী ও সহিষ্ণু হতে অনুপ্রাণিত করেছে। সাহাবায়ে কেরাম এ ব্যাপারে সুদৃঢ় ও অবিচল আস্থা পোষণ করতেন যে, তাদেরকে একদিন রব্বুল আলামিন আল্লাহর দরবারে দাঁড়াতে হবে। সেখানে জীবনের ছোট বড় সকল কাজের হিসাব দিতে হবে। এরপর হয়তো নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত অথবা ভয়াবহ শাস্তিভরা জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে। এ বিশ্বাসের বলে সাহাবায়ে কেরাম আশা ও আশঙ্কায় পরিপূর্ণ জীবন যাপন করতেন। প্রিয় প্রভু আল্লাহর রহমতের আশা পোষণ করতেন এবং তার আযাবকে ভয় করতেন। তাঁদের অবস্থার কথা পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা এভাবে উল্লেখ করেন তারা যা কিছু সম্পাদন করে সেটা করে অন্তরে ভয়ভীতির সঙ্গে। একারণে করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে। তাঁরা একথাও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, এ পৃথিবীর সকল আরাম-আয়েশ সুখ-স্বাচ্ছন্দ এবং দুঃখষ্টসহ্য পরকালের তুলনায় একটি মশার একটি পাখার সমান মূল্যও রাখে না। এ বিশ্বাস তাঁদের এতো অবিচল এবং অটুট ছিলো যে, এর মোকাবেলায় দুনিয়ার সব বিপদ-আপদ তিক্ততা দুঃখকষ্ট ছিলো তুচ্ছ।
পাঁচ. কঠিন থেকে কঠিনতর সে অবস্থা
কোরআনের যেসব আয়াত পর্যায়ক্রমে নাযিল হচ্ছিলো, তাতে ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা ও আদর্শ আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হচ্ছিলো। কোরআনের সেসব আয়াতে মানব জাতির সামনে সবচেয়ে সম্মানজনক ও বৈশিষ্টমন্ডিত ইসলামী সমাজের ঈমানের সজীবতা এবং দৃঢ়তাকে আরো শক্তিমান করে তোলা হচ্ছিলো। আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন উদাহরণ পেশ করছিলেন এবং হেকমত বা কৌশল মুসলমানদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও এখনো তোমাদের কাছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা আসেনি এবং তারা ভীত ও কম্পিত হয়েছিলো। এমনকি রসূল ও তাঁর সাথে ঈমান আনয়নকারীরা বলে উঠেছিলো, আল্লাহর সাহায্য কবে আসবে? হাঁ আল্লাহর সাহায্য কাছেই।' (২১৪, ২) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, 'আলিফ লাম মীম। মানুষ কি মনে করে, আমরা ঈমান এনেছি, একথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে অব্যাহতি দেয়া হবে? আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছিলাম। আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী।' (১-৩, ২৯) পাশাপাশি এমন সব আয়াত নাযিল হচ্ছিলো যেসব আয়াতে কাফের মোশরেকদের বিভিন্ন প্রশ্নের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হচ্ছিলো। তাদের কোন অজুহাতই ধোপে টেকার মতো ছিলো না। সুস্পষ্ট ভাষায় তাদের বলে দেয়া হয়েছিলো যে, যদি তারা তাদের পথভ্রষ্টতা এবং হঠকারিতার ওপর অটল থাকে তবে পরিণাম হবে মারাত্মক। উদাহরণ হিসাবে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের এমন সব ঘটনা এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে যে, ওতে আল্লাহর রসূল এবং কাফেরদের সম্পর্কে আল্লাহর নীতি ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সাথে দয়া ও ক্ষমার কথাও বলা হয়েছে এবং পথনির্দেশ ব্যক্ত করা হয়েছে। এসব বলা হয়েছে এ জন্যে যে, অবিশ্বাসীরা যেন নিজেদের পথভ্রষ্টতা ও গোমরাহী থেকে বিরত থাকে।
প্রকৃতপক্ষে পবিত্র কোরআন মুসলমানদের এক ভিন্ন পৃথিবী ভ্রমণ করিয়ে এনেছে। তাদের সামনে বিস্ময়কর সব উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। যাতে তারা হতোদ্যম হয়ে না পড়ে কোন বাধা বা প্রতিকূলতাই যেন তাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ থেকে ফিরিয়ে রাখতে না পারে।
এ সকল আয়াতে মুসলমানদের এমন সব কথাও বলা হয়েছে, যার দ্বারা মুসলমানরা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতের সুসংবাদ পেতে পারে। আর অবিশ্বাসীদের চিত্র এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে যাতে, তারা আল্লাহর দরবারে ফয়সালার জন্যে হাযির করার কথা জানতে পারে। তাদের পার্থিব জীবনের পুণ্যের কোন স্থান পাবে না বরং তাদেরকে টেনে হিঁচড়ে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে এবং বলা হবে, এবার দোযখের স্বাদ গ্রহণ করো চিরদিন ধরে।
ছয়. কঠোর ধৈর্য
এসব কথা ছাড়াও মুসলমানরা অত্যাচারিত হওয়ার কেবল শুরু থেকেই নয়, বরং তার আগে থেকেই এটা জানতো যে, ইসলাম গ্রহণের অর্থ এই নয় যে, চিরস্থায়ীভাবে দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হবে। বরং ইসলামের দাওয়াতের মূল কথাই ছিলো জাহেলী যুগের অবসান, সকল প্রকার অত্যাচার ও নির্যাতন নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার মূলোৎপাটন। ইসলামের দাওয়াতের একটা লক্ষ্য এটাও ছিলো যে, মুসলমানরা পৃথিবীতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করবে এবং রাজনৈতিকভাবে এমন বিজয় অর্জন করবে, যাতে সকল মানুষকে আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করা যায়। মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে প্রবেশ করানো যায়।
কোরআনে করীমের এসব সুসংবাদ কখনো ইশারা এবং কখনো খোলাখুলিভাবে নাযিল হচ্ছিলো। একদিকে অবস্থা এমন ছিলো যে, প্রশস্ত হওয়া সত্তেও পৃথিবী মুসলমানদের জন্যে সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছিলো, তাদের টিকে থাকাই ছিলো কঠিন। তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করতে একদল লোক ছিলো সদা সক্রিয়। অন্যদিকে মুসলমানদের শক্তি সাহস ও মনোবল বাড়াতে এমন সব আয়াত নাযিল হচ্ছিলো যাতে পূর্বকালের ঘটনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে। পূর্ববর্তী সময়ের নবীদের অবিশ্বাস করা হয়েছে এবং তাদের ওপরও অত্যাচার নির্যাতন চালানো হয়েছে। সেসব আয়াতে যে চিত্র অঙ্কন করা হচ্ছিলো তার সঙ্গে মক্কার মুসলমান ও কাফেরদের অবস্থার হুবহু সাদৃশ্য ছিলো। পরিশেষে একথা উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইতিপূর্বে অবিশ্বাসীরা কিভাবে ধ্বংস এবং আল্লাহর পুণ্যশীল বান্দাদের তাঁর যমীনের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে। পরিণামে মক্কার অবিশ্বাসীরাই ব্যর্থ ও পরাজিত ও মুসলমান এবং ইসলামের দাওয়াতের সাফল্যই অর্জিত হবে। সেই সময়ে এমন সব আয়াতও নাযিল হয়েছে, যেসব আয়াতে ঈমানদারদের বিজয়ের সুসংবাদ স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন- আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন, 'আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এ বাক্য পূর্বেই স্থির হয়েছে যে, অবশ্যই তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে এবং আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী। অতএব কিছুকালের জন্যে তুমি ওদেরকে উপেক্ষা কর। তুমি ওদের পর্যবেক্ষণ কর, শীঘ্রই ওরা প্রত্যক্ষ করবে।'
ওরা কি আমার শাস্তি ত্বরান্বিত করতে চায়? তাদের আঙ্গিনায় যখন শান্তি নেমে আসবে তখন সতর্কীকৃতদের প্রতিফল ভয়াবহ ও জঘন্য হবে। (১৭১, ১৭৭, ৩৭)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, 'এই দলতো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে।' (৪৫, ৫৪)
'বহু দলের এই বাহিনীও সে ক্ষেত্রে অবশ্যই পরাজিত হবে।' (১১, ৩৮) হাবশায় হিজরতকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
'যারা অত্যাচারিত হওয়ার পরও আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, আমি অবশ্যই দুনিয়ায় তাদের উত্তম আবাস দেবো এবং আখেরাতের পুরষ্কারই তো শ্রেষ্ঠ। হায় ওরা যদি সেটা জানতো।' (৪২, ১৬) অবিশ্বাসীরা আল্লাহর রসূলকে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা জিজ্ঞাসা করার পর আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'জিজ্ঞাসুদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।' (৭, ১২) অর্থাৎ মক্কাবাসীরা আজ হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা জিজ্ঞাসা করছে এবং ঠিক সে রকমই ব্যর্থ হবে, যেমন ব্যর্থ হয়েছিলো হযরত ইউসুফের ভাইয়েরা। এদের পরিণাম হবে হযরত ইউসুফের ভাইয়ের পরিণামের মতোই। কাজেই হযরত ইউসুফ এবং তাঁর ভাইদের ঘটনা থেকে মক্কাবাসীদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। তাদের বোঝা উচিত যে, অত্যাচারীদের পরিণাম কি ধরনের হয়ে থাকে। এক জায়গায় পরগাম্বরদের প্রসঙ্গ আলোচনা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, কাফেররা তাদের রসূলদের বলেছিলো, 'আমরা তো তোমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে অবশ্যই বহিষ্কার করবো। অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আসতেই হবে। অতপর রসূলদের প্রতি তাদের প্রতিপালক ওহী প্রেরণ করলেন। যালেমদেরকে আমি অবশ্যই বিনাশ করবো।' (১৩-১৪, ১৪)
পারস্য এবং রোমে যখন যুদ্ধের দাবানল জ্বলছিলো, কাফেররা চাচ্ছিলো পারস্যবাসী যেন জয়লাভ করে, মুসলমানরা চাচ্ছিলো রোমকরা যেন জয়লাভ করে। কেননা রোমকরা আল্লাহ তায়ালা, পয়গাম্বর, ওহী, আসমানী কেতাবে বিশ্বাসী বলে দাবী করতো। পারস্যবাসীরা জয়যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে আল্লাহ এ সুসংবাদ প্রদান করেন যে, 'কয়েক বছর পর রোমকরা জয়লাভ করবে। শুধু এ সুসংবাদই দেয়া হয়নি, বরং আল্লাহ তায়ালা এই সুসংবাদও দিয়েছিলেন যে, রোমকদের বিজয়ের সময় আল্লাহ তায়ালা মোমেনদেরও বিশেষভাবে সাহায্য করবেন। এই সাহায্য পেয়ে তারা খুশী হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আর সেদিন মোমেনরা হর্ষোৎফুল্ল হবে আল্লাহর সাহায্যে। (৪৫, ৩০) পরবর্তী সময়ে বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় ও সাফল্যের দ্বারা আল্লাহর বাণীর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছিলো।
কোরআনের ঘোষণা ছাড়াও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদেরকে এ ধরনের সুসংবাদ শোনাতেন। হজ্জের সময় ওকায, মাযনা এবং যুলমাজাযের বাজারে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের কাছে তাঁর নবুয়তের কথা প্রচার করতেন। সে সময় তিনি শুধু বেহেশতের সুসংবাদই দিতেন না, বরং সুস্পষ্টভাবে একথাও ঘোষণা করতেন, হে লোক সকল, তোমরা বলো যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, এতে তোমরা সফলকাম হবে। এর বদৌলতে তোমরা হবে আরবের বাদশাহ এবং অন্যরাও তোমাদের পদানত হবে। আর মরণের পরও তোমরা জান্নাতের ভেতর বাদশাহ হয়ে থাকবে।
ইতিপূর্বে এ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওতবা ইবনে রবিয়া যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পার্থিব ভোগ বিলাস এবং ঐশ্বর্যের লোভ দেখাচ্ছিলো এবং জবাবে তিনি হা-মীম সেজদা সূরার কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনিয়েছিলেন, তখন ওতবা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলো যে, শেষ পর্যন্ত মুসলমানরাই জয় লাভ করবে।
আবু তালেবের কাছে কোরায়শদের সর্বশেষ প্রতিনিধিদল দেখা করতে এলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে জবাব দিয়েছিলেন, ইতিপূর্বে সেই জবাব উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানেও পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, তোমরা আল্লাহর তওহীদে বিশ্বাস স্থাপন করো, এর ফলে সমগ্র আরব তোমাদের অধীনস্থ হবে এবং অনারবের ওপরও তোমাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
হযরত খাব্বাব ইবনে আরত (রা.) বলেন, একবার আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হলাম। তিনি কাবাঘরের ছায়ায় একটি চাদরকে বালিশ বানিয়ে শায়িত ছিলেন। সে সময় আমরা পৌত্তলিকদের হাতে অত্যাচারিত ও লাঞ্ছিত হচ্ছিলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল, আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেই পারেন। এ কথা শুনে তিনি উঠে বসলেন, তাঁর চেহারা রক্তিম হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তী সময়ে ঈমানদারদের অবস্থা এমনও হয়েছিলো যে, লোহার চিরুনি দিয়ে তাদের গোস্ত খুলে নেয়া হতো, দেহে থাকতো শুধু হাড়। এরূপ অত্যাচারও তাদেরকে আল্লাহর দ্বীনের ওপর বিশ্বাস থেকে সরিয়ে নিতে পারেনি। এরপর বললেন, আল্লাহ তায়ালা দ্বীনকে পূর্ণতা প্রদান করবেন। একজন ঘোড় সওয়ার সান্যা থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত সফর করবে, এ সময়ে আল্লাহর ভয় ছাড়া তার অন্য কোন ভয় থাকবে না। তবে হাঁ বকরিদের ওপর বাঘের ভয় তখনো থাকবে। একটি বর্ণনায় একথাও উল্লেখ রয়েছে যে, কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়ো করছো।
স্মরণ রাখা দরকার যে, এসব সুসংবাদ কোন গোপনীয় বিষয় ছিলো না। এসব কথা ছিলো সর্বজনবিদিত। মুসলমানদের মতোই কাফের অবিশ্বাসীরাও এসব কথা জানতো। আসওয়াদ ইবনে মোত্তালেব এবং তার বন্ধুরা সাহাবায়ে কেরামকে দেখলেই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতো তোমাদের কাছে সারা দুনিয়ার বাদশাহ এসে পড়েছে। ওরা খুব শীঘ্রই কেসরা কায়সারকে পরাজিত করবে। এসব কথা বলে তারা শিশ মারতো এবং হাততালি দিতো।
মোটকথা সাহাবায়ে কেরামের ওপর সে সময় যেসব যুলুম অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হতো সেসব কিছু বেহেশত পাওয়ার নিশ্চিত বিশ্বাস এবং সুসংবাদের মোকাবেলায় ছিলো তুচ্ছ। এসব-অত্যাচারকে সাহাবায়ে কেরাম মনে করতেন এক খন্ড মেঘের মতো, যে মেঘ বাতাসের এক ঝাপটায় দূর হয়ে যাবে।
এছাড়া ঈমানদারদের ঈমানের পরিপক্কতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়ে নিয়মিতভাবে সাহাবারা রূহানী খাবার সরবরাহ করতেন। কোরআন শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে তাদের মানসিক পরি শুদ্ধতার ব্যবস্থা করতেন। ইসলাম সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ, রূহানী শক্তির ব্যবস্থা, মানসিক পরিচ্ছন্নতা চারিত্রিক সৌন্দর্যের শিক্ষা সাহাবাদের মনোবল বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের ঈমানের নিভু নিভু স্ফুলিঙ্গকে উজ্জ্বল শিখায় পরিণত করতেন। অন্ধকার থেকে বের করে তাদেরকে হেদায়াতের আলোকে পৌছে দিতেন। এর ফলে সাহাবাদের দ্বীনী শিক্ষা ও বিশ্বাস বহুগুণ উন্নত হয়ে গিয়েছিলো। প্রবৃত্তির দাসত্ব ছেড়ে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পথে অগ্রসর হতেন। জান্নাতের অধিবাসী হওয়ার আগ্রহ, জ্ঞান লাভের আকাঙ্খা এবং আত্ম সমালোচনায় তাঁরা উদ্যোগী হয়েছিলেন। এসব কারণে বিধর্মী পৌত্তলিকদের অত্যাচার নির্যাতন তাঁদেরকে লক্ষ্য পথ থেকে দূরে সরাতে পারেনি, ধৈর্য সহিষ্ণুতায় তাঁরা ছিলেন অটল অবিচল। বিশ্ব মানবের জন্যে তাঁরা প্রত্যেকেই হয়ে উঠেছিলেন এক একজন উজ্জ্বল আদর্শ।
সেই নিদারুণ দুঃসময়েও মুসলমানরা কিভাবে অটল অবিচল থাকতে সক্ষম হলেন? একথা ভেবে শক্ত মনের মানুষও অবাক হয়ে যান। কি নির্মম নির্যাতনের মুখেও মুসলমানরা ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছিলেন। অত্যাচার নির্যাতনের বিবরণ পাঠ করে দেহ-মন শিউরে উঠে। কি সেই সম্মোহনী শক্তি, যার কারণে মুসলমানরা এতোটা অবিচলিত ছিলেন? এ সম্পর্কে নীচে সংক্ষেপে আলোকপাত করা যাচ্ছে।
📄 ঈমানের সৌন্দর্য ও আকর্ষণীয় নেতৃত্ব
সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে আল্লাহর ওপর ঈমান এবং তাঁর সঠিক পরিচয় জানা। ঈমানের সৌন্দর্য ও মাধুর্য পাহাড়ের সাথে ধাক্কা খেয়েও অটল থাকে। যার ঈমান এ ধরনের মযবুত এবং শক্তিশালী, তিনি যে কোন অত্যাচার নির্যাতনকে সমুদ্রের ওপরে ভাসমান ফেনার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেন না। এ কারণেই মোমেন বান্দা ঈমানের মিষ্টতা এবং মাধুর্যের সামনে কোন বিপদ বাধাকেই পরোয়া করেন না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'যা আবর্জনা, তা ফেলে দেয়া হয় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিতে থেকে যায়।' (১৭, ১৩)
দুই. আকর্ষণীয় নেতৃত্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন উম্মতে ইসলামিয়া বরং সমগ্র মানব জাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। তাঁর শারীরিক সৌন্দর্য, মানসিক পূর্ণতা, প্রশংসনীয় চরিত্র, চমৎকার ব্যক্তিত্ব, পরিশীলিত অভ্যাস ও কর্মতৎপরতা দেখে আপনা থেকেই তাঁকে ভালোবাসার ইচ্ছা জাগতো। তাঁর জন্যে মন উজাড় করে দিতে ইচ্ছা হতো। মানুষ যেমন গুণ বৈশিষ্ট মনে প্রাণে পছন্দ করে, সেসব তার মধ্যে এতো বেশী ছিলো যে, এতোগুলো গুণবৈশিষ্ট্য একত্রে অন্য কাউকেই দেয়া হয়নি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, আভিজাত্য, ও চারিত্রিক সৌন্দর্যে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ক্ষমাশীলতা, আমানতদারি, সততা সত্যবাদিতা, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি গুণ এতো বেশী ছিলো যে, তাঁর স্বাতন্ত্র্য ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে শত্রুরাও কখনো সন্দেহ পোষণ করেনি। তিনি যে কথা মুখে একবার উচ্চারণ করতেন তাঁর শত্রুরাও জানতো যে, সে কথা সত্য এবং তা বাস্তবায়িত হবেই হবে। বিভিন্ন ঘটনা থেকে একথার প্রমাণও পাওয়া যায়।
একবার কোরায়শদের তিনজন লোক একত্রিত হয়েছিলো, তারা প্রত্যেকেই গোপনে কোরআন তেলাওয়াত শুনেছিলো। কিন্তু কারো কাছে তারা সে কথা প্রকাশ করেনি। এদের মধ্যে' আবু জেহেলও ছিলো একজন। অন্য দু'জনের একজন আবু জেহেলেকে জিজ্ঞাসা করলো যে, মোহাম্মদের কাছে যা কিছু শুনেছো, বলতো, সে সম্পর্কে তোমার মতামত কি? আবু জেহেল বললো, আমি কি শুনেছি? আসলে কথা হচ্ছে যে, আমরা এবং বনু আবদে মান্নাফ আভিজাত্য ও মর্যাদার ব্যাপারে একে অন্যের সাথে মোকাবেলা করতাম। তারা গরীবদের পানাহার করালে
টিকাঃ
১. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২১৬