📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আবু তালেবের ইন্তেকাল

📄 আবু তালেবের ইন্তেকাল


আবু তালেবের অসুখ বেড়ে গেলো এবং এক সময় তিনি ইন্তেকাল করলেন। আবু তালেব ঘাঁটিতে অবরোধ থেকে মুক্ত হওয়ার ছয়মাস পর নবুয়তের দশম বর্ষে রজব মাসে তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো। অন্য এক বর্ণনায় একথা উল্লেখ রয়েছে যে, বিবি খাদিজার ইন্তেকালের তিনদিন আগে রমযান মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন।
সহীহ বোখারীতে হযরত মোসায়েব থেকে বর্ণিত আছে যে, আবু তালেবের ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে এলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কাছে যান। সেখানে আবু জেহেলও উপস্থিত ছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, চাচাজান, আপনি শুধু লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলুন। এই স্বীকারোক্তি করলেই আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্যে সুপরিশ করতে পারব। আবু জেহেল এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া বললো, আবু তালেব, আপনি কি আবদুল মোত্তালেবের মিল্লাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন? এরপর এরা দু'জন আবু তালেবের সাথে কথা বলতে লাগলো। আবু তালেব শেষ কথা বলেছিলেন যে, আবদুল মোত্তালেবের মিল্লাতের উপর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাকে নিষেধ না করা পর্যন্ত আমি আপনার জন্যে মাগফেরাতের দোয়া করতে থাকব। এরপর আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করেন, 'আত্মীয়স্বজন হলেও মোশরেকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী এবং মোমেনদের জন্যে সঙ্গত নয়, যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ওরা জাহান্নামী।' (১১৩, ৯)
আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতও নাযিল করেন, 'তুমি যাকে ভালোবাসো, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবে না, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন এবং তিনিই ভালো জানেন সৎপথ অনুসারীদেরকে।' (৫৬, ২৮)
আবু তালেব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিরূপ সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রকৃতপক্ষে মক্কায় কোরায়শ নেতা এবং নির্বোধ লোকদের ইসলামের ওপর হামলার মুখে তিনি ছিলেন একটি দুর্গের মতো। কিন্তু তিনি নিজে তাঁর পূর্ব পুরুষদের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর অটল অবিচল ছিলেন। এ কারণে বোখারীতে হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনি আপনার চাচার কি কাজে আসলেন? তিনি তো আপনাকে হেফাযত করতেন, আপনার জন্যে অন্যদের সাথে ঝগড়া বিবাদ, শত্রুতার ঝুঁকি নিতেন। রসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তিনি জাহান্নামের একটি সাধারণ জায়গায় রয়েছেন। যদি আমি না থাকতাম, তবে তিনি জাহান্নামের সবচেয়ে গভীর গহ্বরে থাকতেন।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একবার তাঁর চাচার প্রসঙ্গ আলোচনা করা হলে তিনি বললেন, কেয়ামতের দিন আমার শাফায়াত হয়তো তার কিছু উপকারে আসবে। তাকে জাহান্নামের একটি উঁচু জায়গায় রাখা হবে যা শুধু তার উভয় পায়ের হাঁটু পর্যন্ত পৌছুবে।

টিকাঃ
২. সহীহ বোখারী, আবু তালেবের কিসসা অধ্যায় ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪৮
৩. সহীহ বোখারী, আবু তালেবের কিসসা অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪৮
৪. সহীহ বোখারী আবু তালেবের কিসসা অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪৮

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হ হযরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল

📄 হ হযরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল


জনাব আবু তালেবের ইন্তেকালের দু' মাস অথবা শুধু তিনদিন পর উম্মুল মোমেনীন খাদিজাতুল কোবরা (রা.) ইহলোক ত্যাগ করেন। নবুয়তের দশম বর্ষের রমযান মাসে তাঁর ইন্তেকাল হয়েছিলো সেই সময় তাঁর বয়স ছিলো ৬৫ বছর। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স সে সময় পঞ্চাশে পড়েছিলো।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্যে হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন আল্লাহর এক বিশিষ্ট নেয়ামত। সিকি শতাব্দী যাবত তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনসঙ্গিনী ছিলেন। এ সময় দুঃখে কষ্ট ও বিপদের সময় প্রিয় স্বামীর জন্যে তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠতো, বিপদের সময় তাঁকে তিনি ভরসা দিতেন, তাবলীগে দ্বীনের ক্ষেত্রে তার সঙ্গী থাকতেন। নিজের জানমাল দিয়েও তাঁর দুঃখ-কষ্ট দূর করতেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে সময় মানুষ আমার সাথে কুফুরী করছিলো সে সময় খাদিজা আমার ওপর ঈমান এনেছিলেন, যে সময় লোকেরা আমাকে অবিশ্বাস করেছিলো সে সময় খাদিজা আমাকে সত্যবাদী বলে গ্রহণ করেছেন, যে সময় লোকেরা আমাকে বঞ্চিত করেছিলো, সে সময় তিনি আমাকে নিজের ধন-সম্পদের অংশীদার করেছেন। তাঁর গর্ভ থেকে আল্লাহ আমাকে সন্তান দিয়েছেন, অন্য স্ত্রীদের গর্ভ থেকে আমাকে কোন সন্তান দেয়া হয়নি।'

সহীহ বোখারীতে হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিববরাঈল (আ.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, দেখুন, খাদিজা আসছেন। তাঁর কাছে একটি বরতন রয়েছে। সেই বরতনে আগুন, খাবার অথবা পানীয় রয়েছে। তিনি আপনার কাছে এলে আপনি তাঁকে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সালাম জানাবেন এবং জান্নাতে একটি মতিমহলের সুসংবাদ দেবেন। সেই মহলে কোন শোরগোল থাকবে না এবং ক্লান্তি ও অবসন্নতাও কাউকে গ্রাস করবে না।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 দুঃখ

📄 দুঃখ


দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও মনোবেদনা
উল্লিখিত দু'টি দুর্ঘটনা কয়েক দিনের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছিলো। এতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শোকে দুঃখে কাতর হয়ে পড়লেন। এছাড়া তাঁর স্বজাতীয়দের পক্ষ থেকেও নির্যাতন নিষ্পেষণ নিপীড়ন চলছিলো। কেননা আবু তালেবের ওফাতের পর তাদের সাহস বেড়ে গিয়েছিলো। তারা খোলাখুলিভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দিতে লাগলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ অবস্থায় তায়েফ গেলেন। মনে মনে আশা করেছিলেন যে, সেখানের জনসাধারণ হয়তো তাঁর প্রচারিত দ্বীনের দাওয়াত কবুল করবে, তাঁকে আশ্রয় দেবে এবং তাঁর স্বজাতীয়দের বিরোধিতার মুখে তাঁকে সাহায্য করবে।

কিন্তু সেখানে কোন সাহায্যকারী বা আশ্রয়দাতা তো পাওয়াই গেলো না, বরং উল্টো তাঁর ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালানো হলো। তাঁর সাথে এমন দুর্ব্যবহার করা হলো যে, তাঁর কওমের লোকেরাও এযাবত ওরকম ব্যবহার করেনি। এ সম্পর্কিত বিবরণ পরে উল্লেখ করা যাবে।

এখানে একথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, মক্কার অধিবাসীরা যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়েছিলো, তাঁর বন্ধুদের ওপরও একই রকম অত্যাচার চালিয়েছিলো। আল্লাহর রসূলের প্রিয় সহচর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সেই অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে হাবশা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। মক্কার এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ইবনে দাগানার সাথে পথে দেখা হলো। তিনি হযরত আবু বকর (রা.)-কে নিজের আশ্রয়ে রাখার- দায়িত্ব নিয়ে মক্কায় ফিরিয়ে আনলেন।

ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন যে, আবু তালেবের ইন্তেকালের পর কোরায়শরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর এতো বেশী নির্যাতন চালিয়েছিলো যা, তাঁর জীবদ্দশায় চিন্তাও করতে পারেনি। কোরায়শের এক বেকুব সামনে এসে আল্লাহর রসূলের মাথায় মাটি নিক্ষেপ করলো। তাঁর এক মেয়ে ছুটে এসে সে মাটি পরিষ্কার করলো।

মাটি পরিষ্কার করার সময়ে তিনি শুধু কাঁদছিলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সে সময়, সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, মা, তুমি কেঁদো না। আল্লাহ তায়ালা তোমার আব্বাকে হেফাযত করবেন। এ সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথাও বলছিলেন যে, কোরায়শরা আমার সাথে এমন কোন খারাপ ব্যবহার করেনি, যাতে আমার খারাপ লেগেছে। এমনি পরিস্থিতিতে আবু তালেব ইন্তেকাল করেন।

পর্যায়ক্রমে এ ধরনের অত্যাচার নির্যাতনের কারণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই বছরের নাম রেখেছিলেন 'আমুল হোযন' অর্থাৎ দুঃখের বছর। সেই বছরটি এ নামেই ইতিহাসে বিখ্যাত।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 দুশ্চিন্তা ও মনোবেদনা

📄 দুশ্চিন্তা ও মনোবেদনা


হযরত সাওদার সাথে বিবাহ
সেই বছর অর্থাৎ নবুয়তের দশম বর্ষে শওয়াল মাসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সাওদা বিনতে জাম'য়া (রা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত সাওদা নবুয়তের প্রথম দিকেই মুসলমান হয়েছিলেন। দ্বিতীয় হিজরীতে তিনি হাবশায় হিজরতও করেছিলেন। তাঁর স্বামীর নাম ছিলো ছাকরান ইবনে আমর। তিনিও প্রথম দিকে মুসলমান হন। হযরত সাওদা তাঁর সঙ্গে হাবশায় হিজরত করেন। কিন্তু তিনি হাবশাতেই মতান্তরে মক্কায় ফেরার পথে ইন্তেকাল করেন। এরপর হযরত সাওদার ইদ্দত শেষ হওয়ার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত খাদিজা (রা.)-এর ওফাতের পর তিনিই ছিলেন আল্লাহর রসূলের স্ত্রী। কয়েক বছর পর তিনি নিজের পালা হযরত আয়েশাকে হেবা করে দেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00