📄 হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণ
মক্কার পরিবেশ এমনি ধরনের যুলুম অত্যাচারে আচ্ছন্ন থাকার সময়ে হঠাৎ করে আলোর ঝলক দেখা গেলো। হযরত হামযা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করলেন। আল্লাহর রসূলের নবুয়ত লাভের ষষ্ঠ বছরের জিলহজ্জ মাসে এ ঘটনা ঘটে।
হযরত হামযা (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিলো এই যে, আবু জেহেল একদিন সাফা পাহাড়ের কাছাকাছি জায়গায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করে এবং তাঁকে কষ্ট দেয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নীরব রইলেন, কোন কথা বললেন না। দূর্বৃত্ত আবু জেহেল এরপর আল্লাহর রসূলের মাথায় এক টুকরো পাথর নিক্ষেপ করলো। এতে মাথা ফেটে রক্ত বের হলো। আবু জেহেল এরপর কাবার সামনে কোরায়শদের মজলিসে গিয়ে বসলো। আবদুল্লাহ ইবনে জুদয়ানের একজন দাসী এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলো। হযরত হামযা শিকার করে ফিরছিলেন। সেই দাসী তাঁকে সব কথা শোনালো। হযরত হামযা ক্রোধে অধীরে হয়ে উঠলেন। তিনি ছিলেন কোরায়শদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী যুবক। তিনি দেরী না করে সামনে পা বাড়িয়ে বললেন, আবু জেহেলকে যেখানেই পাব সেখানেই আঘাত করব। এরপর তিনি সোজা কাবাঘরে প্রবেশ করে আবু জেহেলের সামনে গিয়ে বললেন, ওরে গুহ্যদ্বার দিয়ে বায়ু ত্যাগকারী, তুই আমার ভাতিজাকে গালি দিচ্ছিস, অথচ আমিও তো তার প্রচারিত দ্বীনের অনুসারী। একথা বলে হাতের ধনুক দিয়ে আবু জেহেলের মাথায় এতো জোরে আঘাত করলেন যে, মাথায় মারাত্মক ধরনের জখম হয়ে গেলো। এ ঘটনার সাথে সাথে আবু জেহেলের গোত্র বনু মাখযুম এবং হযরত হামযা (রা.)-এর গোত্র বনু হাশেমের লোকেরা পরস্পরের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়ে উঠলো। আবু জেহেল এই বলে সবাইকে থামিয়ে দিল যে, আবু আমারাকে কিছু বলো না, আমি তার ভাতিজাকে আসলেই খুব খারাপ গালি দিয়েছিলাম।
প্রথমদিকে নিজের আত্মীয়কে গালি দেয়ায় ধৈর্যহারা হয়ে হযরত হামযা (রা.) রসূল (রা.)- এর প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে আল্লাহ তায়ালা তাঁর অন্তর খুলে দেন। তিনি ইসলামের বলিষ্ঠ প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। তাঁর কারণে মুসলমানরা যথেষ্ট শক্তি এবং স্বস্তি অনুভব করেন।
টিকাঃ
৬১. মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব, পৃ, ৬৬, রহমাতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, ৬৮, ইবনে হিশাম, ১১ ১ম খন্ড পৃ, ২৯১-২৯২
৬২. মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১০১
📄 হযরত ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ
যুলুম অত্যাচার নির্যাতনের কালোমেঘের সেই গম্ভীর পরিবেশে আলোর আরো একটি ঝলক ছিল হযরত ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা। হযরত হামযা (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের তিনদিন পর নবুয়তের ষষ্ঠ বছরের জিলহজ্জ মাসেই এ ঘটনা ঘটেছিলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ইসলাম গ্রহণের জন্যে দোয়া করেছিলেন।
ইমাম তিরমিযি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছে এ ঘটনাকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইমাম তিবরানি হযরত ইবনে মাসউদ এবং হযরত আনাস (রা.) থেকে এ ঘটনা বর্ণনা করেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করেছিলেন, 'হে আল্লাহ, ওমর ইবনে খাত্তাব এবং আবু জেহেলের মধ্যে তোমার কাছে যে ব্যক্তি বেশী পছন্দনীয়, তাকে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দাও এবং তার দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করো।'
আল্লাহ তায়ালা এ দোয়া কবুল করেন এবং হযরত ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। উল্লিখিত দু'জনের মধ্যে আল্লাহর কাছে হযরত ওমর (রা.) ছিলেন অধিক প্রিয়।
হযরত ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত সকল বর্ণনার ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ বিচারে প্রমাণিত হয় যে, তাঁর মনে পর্যায়ক্রমে ইসলাম জায়গা করে নিয়েছিলো। সে বিষয়ে আলোকপাত করার আগে হযরত ওমর (রা.)-এর মন মেজায ও ধ্যান-ধারণার প্রতি সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত দেয়া জরুরী মনে করছি।
হযরত ওমর (রা.) তাঁর রুক্ষ্ণ মেজায এবং কঠোর স্বভাবের জন্যে পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘকাল যাবত মুসলমানরা তাঁর হাতে নানাভাবে নির্যাতন ভোগ করেন। মনে হয়, তাঁর মধ্যে বিপরীতধর্মী স্বভাবের সমন্বয় সাধিত হয়েছিলো। একদিকে তিনি নিজের পিতা পিতামহের আবিষ্কৃত রুসম- রেওয়াজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, খেলাধূলার প্রতিও তাঁর যথেষ্ট আগ্রহ ছিলো, অন্যদিকে ঈমান-আকীদার প্রতি মুসলমানদের দৃঢ়তা এবং অত্যাচার নির্যাতনের মুখেও মুসলমানদের ধৈর্য সহিষ্ণুতা তিনি আগ্রহের দৃষ্টিতে দেখতেন। বুদ্ধি বিবেচনার মাধ্যমে তিনি মাঝে মাঝে ভাবতেন যে, ইসলাম ধর্মে যে বিষয়ে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে সম্ভবত সেটাই সত্য, অধিক পবিত্র ও উন্নত। এ কারণে হঠাৎ ক্ষেপে গেলেও হঠাৎ শান্ত হয়ে যেতেন।
হযরত ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত সকল বর্ণনার মূলকথা নিম্নরূপ,
একবার হযরত ওমরকে ঘরের বাইরে দিন কাটাতে হয়েছিলো। তিনি হারম শরীফে গমন করেন এবং কাবাঘরের পর্দার ভেতরে প্রবেশ করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সময় নামায আদায় করছিলেন। তিনি সূরা আল হাক্কা তেলাওয়াত করছিলেন। হযরত ওমর (রা.) কোরআন শুনতে লাগলেন এবং কোরআনের রচনাশৈলীতে মুগ্ধ ও অভিভূত হলেন। মনে মনে বললেন, এই ব্যক্তি দেখছি কবি, কোরায়শদের কথাই ঠিক। এমন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত করলেন, 'নিশ্চয়ই এই কোরআন এক সম্মানিত রসূলের কাছে বহন করে আনা বার্তা, এটা কোন কবির রচনা নয়, তোমরা অল্পই বিশ্বাস করো।' হযরত ওমর বলেন, আমি মনে মনে বললাম, এই ব্যক্তি তো দেখছি জ্যোতিষী। এমন সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত করলেন, 'এটা কোন গণকের কথাও নয়। তোমরা অল্পই অনুধাবন কর। এটি জগৎসমূহের প্রতিপালকের কাছ থেকে অবতীর্ণ।' রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরার শেষ পর্যন্ত তেলাওয়াত করলেন।
হযরত ওমর (রা.) বলেন, সেই সময়েই আমার মনে ইসলাম রেখাপাত করে। কিন্তু তখনো তাঁর মনে পূর্ব-পুরুষদের ধর্মের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা ছিলো অটুট। এ কারণেই হৃদয়ের গোপন গভীরে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার বীজ বোপিত হলেও ইসলামের বিরোধিতার প্রকাশ্য কাজকর্মে তিনি ছিলেন সোচ্চার।
তাঁর স্বভাবের কঠোরতা এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে শত্রুতার অবস্থা এমন ছিলো যে, একদিন তলোয়ার হাতে নিয়েরসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই বেরিয়ে পড়লেন। পথে নঈম ইবনে আবদুল্লাহ নাহহাম আদবীর বা বনি যোহরা বনি মানজুমের কোন এক লোকের সাথে তাঁর দেখা হলো। সেই লোক তার রুক্ষ্ণ চেহারা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ওমর, কোথায় যাচ্ছ? তিনি বললেন, মোহাম্মদকে হত্যা করতে যাচ্ছি। সেই লোক বললেন, মোহাম্মদকে হত্যা করে বনু হাশেম এবং বনু যোহরার হাত থেকে কিভাবে রক্ষা পাবে? তিনি বললেন, মনে হয় তুমিও পূর্ব পুরুষদের ধর্ম ছেড়ে বেদ্বীন হয়ে পড়েছো? সেই লোক বললেন, ওমর একটা বিস্ময়কর কথা শোনাচ্ছি। তোমার বোন এবং ভগ্নিপতিও তোমাদের দ্বীন ছেড়ে বেদ্বীন হয়ে গেছে। একথা শুনে হযরত ওমর ক্রোধে দিশেহারা হয়ে সোজা ভগ্নিপতির বাড়ী অভিমুখে রওয়ানা হলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন, তারা হযরত খাব্বাব ইবনে আরতের কাছে সূরা ত্বা-হা লেখা একটা সহীফা পাঠ করছেন। কোরআন শিক্ষা দেয়ার জন্যে হযরত খাব্বাব (রা.) সে বাড়ীতে যেতেন। হযরত ওমরের পায়ের আওয়ায শুনে সবাই নীরব হয়ে গেলেন। হযরত ওমরের বোন সূরা লেখা পাতাটি লুকিয়ে ফেললেন। কিন্তু ঘরের বাইরে থেকেই হযরত ওমর খাব্বাব (রা.)-এর কোরআন তেলাওয়াতের আওয়ায শুনেছিলেন। তিনি তাই জিজ্ঞাসা করলেন, কিসের আওয়ায শুনছিলাম? তারা বললেন, কই কিছু নাতো! আমরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলাম। হযরত ওমর বললেন, সম্ভবত তোমরা উভয়ে বেদ্বীন হয়ে গেছ। তার ভগ্নিপতি বললেন, আচ্ছা ওমর 'সত্য' যদি তোমাদের দ্বীন ছাড়া অন্য কোন ধর্মে থাকে তখন কি হবে? হযরত ওমর (রা.) একথা শোনা মাত্র ভগ্নিপতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাকে মারাত্মকভাবে প্রহার করলেন। তাঁর বোন ছুটে গিয়ে স্বামীকে ভাইয়ের হাত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেন, এক সময় তাকে সরিয়ে দিলেন। হঠাৎ হযরত ওমর (রা.) তার বোনকে এতো জোরে চড় দিলেন যে, তার চেহারা রক্তাক্ত হয়ে গেলো। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় রয়েছে যে, তার মাথায় আঘাত লেগেছিলো। তার বোন ক্রুদ্ধভাবে বললেন, ওমর, যদি তোমাদের ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মে সত্য থাকে, তখন কি হবে? আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রসূল। এ কথা শুনে হযরত ওমর (রা.) হতাশ হয়ে পড়লেন, বোনের চেহারায় রক্ত দেখে তার লজ্জাও হলো। তিনি বললেন, আচ্ছা, তোমরা যা পাঠ করছিলে, আমাকেও একটু পড়তে দাওতো। তার বোন বললেন, তুমি নাপাক। এই কেতাব শুধু পাক পবিত্র লোকই স্পর্শ করতে পারে। যাও গোসল করে এসো। হযরত ওমর গিয়ে গোসল করে এলেন। এরপর কেতাবের সেই অংশবিশেষ হাতে নিয়ে বসলেন এবং পড়লেন, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এরপর বললেন, এতো দেখি বড়ো পবিত্র নাম!
হযরত খাব্বাব (রা.) হযরত ওমর (রা.)-এর মুখে একথা শুনে ভেতর থেকে বাইরে এলেন এবং বললেন, ওমর, খুশী হও, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে যে দোয়া করেছিলেন, আমার মনে হয় এটা তারই ফল। এ সময়ে রসূল (রা.) সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী এক ঘরে অবস্থান করছিলেন।
একথা শুনে হযরত ওমর (রা.) তলোয়ার হাতে সেই ঘরের সামনে এসে দরোজায় করাঘাত করলেন। একজন সাহাবী দরজায় উঁকি দিয়ে দেখলেন যে, তলোয়ার হাতে হযরত ওমর। আশে-পাশেই সবাই একত্রিত হলেন। হযরত হামযা (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন কি ব্যাপার? তাঁকে বলা হলো যে, ওমর এসেছেন। তিনি বললেন, ওমর এসেছে? দরজা খুলে দাও। যদি ভালোর জন্যে এসে থাকে, তবে ভালোই পাবে। আর যদি খারাপ উদ্দেশ্যে এসে থাকে, তবে তার তলোয়ার দিয়েই আমরা তাকে শেষ করে দেবো। এদিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভেতরে ছিলেন, তাঁর ওপর ওহী নাযিল হচ্ছিলো। ওহী নাযিল হওয়ার পর তিনি এদিকের কামরায় হযরত ওমরের কাছে এলেন এবং তাঁর পরিধানের পোশাক এবং তলোয়ারের একাংশ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, ওমর, তুমি কি ততোক্ষণ পর্যন্ত বিরত হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তোমার ওপরও ওলীদ ইবনে মুগিরার মতো অবমাননাকর শাস্তি নাযিল না করবেন? হে আল্লাহ, ওমর ইবনে খাত্তাবের দ্বারা দ্বীনের শক্তি ও সম্মান দান করো। একথা বলার সাথে সাথে হযরত ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করে নিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং আপনি আল্লাহর রসূল। একথা শুনে ঘরের ভেতর যারা ছিলেন তারা এতো জোরে আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিলেন যে, কাবাঘরের মধ্যে যারা ছিলেন, তারাও সেই আওয়ায শুনতে পেলেন। আরবে কেউ তাঁর মোকাবেলা করার সাহস পেতো না। এ কারণে তাঁর ইসলাম গ্রহণের সংবাদে পৌত্তলিকদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে গেলো। তারা মারাত্মক সঙ্কট এবং অবমাননার সম্মুখীন হলো। অন্য দিকে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলমানদের গৌরব, শক্তি, মর্যাদা, সাফল্য ও আনন্দ বেড়ে গেলো। ইবনে ইসহাক তাঁর সনদে হযরত ওমর (রা.)-এর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, আমি যখন মুসলমান হলাম, তখন ভাবলাম, মক্কায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে বড় শত্রু কে? এরপর মনে মনে বললাম, সে হচ্ছে আবু জেহেল। এরপর আমি আবু জেহেলের বাড়ী গেলাম। ঘরের দরজায় করাঘাত করলে আবু জেহেল বেরিয়ে এলো। সে আমাকে দেখে বললো, স্বাগতম সুস্বাগতম। কি কাজে এসেছ ওমর? আমি বললাম, তোমাকে একথা জানাতে এসেছি যে, আমি আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসূল মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি। তিনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তার ওপরও বিশ্বাস পোষণ করেছি এবং সত্য বলে স্বীকার করছি। একথা শুনে আবু জেহেল দরোজা বন্ধ করে দিতে দিতে বললো, আল্লাহ তোমার মন্দ করুন এবং তুমি যা কিছু নিয়ে এসেছ, তারও মন্দ করুন।
ইমাম ইবনে জওযি হযরত ওমর ফারুক (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, কেউ যখন ইসলাম গ্রহণ করতো। তখন কোরায়শ কাফেররা তাদের পেছনে লেগে যেতো। তাকে নির্মমভাবে প্রহার করতো। প্রহৃত ব্যক্তিও প্রহার করতেন। আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর আমার মামা আদী ইবনে হাশেমের কাছে গিয়ে তাকে জানালাম। তিনি কোন কথা না বলে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন। এরপর কোরায়শের একজন বিশিষ্ট লোকের কাছে গেলেন। সম্ভবত আবু জেহেলের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। আমার মামা আদী কোরায়শের সেই লোককে খবর দেয়ার পর সেও ঘরের ভেতর ঢুকে গেলো।
ইবনে হিশাম এবং ইবনে জওযি বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর জামিল ইবনে মোয়াম্মার মাহমির কাছে গেলেন। কোন কথা প্রচারের ক্ষেত্রে কোরায়শদের মধ্যে এ লোক ছিলো বিখ্যাত। হযরত ওমর (রা.) তাকে জানালেন যে, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। একথা শোনার সাথে সাথে সে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠলো যে, খাত্তাবের পুত্র বেদ্বীন হয়ে গেছে। হযরত ওমর (রা.) বললেন, তুমি মিথ্যা বলছো, আমি মুসলমান হয়েছি। মোটকথা, লোকেরা হযরত ওমরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাকে প্রহার করতে লাগলো। হযরত ওমর প্রহৃত হচ্ছিলেন আবার নিজেও প্রহার করছিলেন। এক সময় সূর্য মাথার ওপর এলো। ক্লান্ত হয়ে তিনি বসে পড়লেন। এরপর বললেন, যা খুশি করো। আল্লাহর কসম, যদি আমরা সংখ্যায় তিনশজনও হতাম, তাহলে মক্কায় হয় তোমরা থাকতে অথবা আমরা থাকতাম।
পৌত্তলিকরা এরপর হযরত ওমর (রা.)-কে প্রাণে মেরে ফেলার জন্যে তাঁর বাড়ীতে চড়াও হলো। সহীহ বোখারীতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর (রা.) ভীত বিহ্বল হয়ে ঘরের ভেতর ছিলেন। এমন সময় আবু আমর আস ইবনে ওয়ায়েল ছাহমি এলেন। তিনি কারুকাজ করা ইয়েমেনি চাদর এবং রেশমী পোশাক পরিহিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ছাহাম গোত্রের অধিবাসী। সেইকালে তিনি ছিলেন আমাদের মিত্র গোত্রের লোক। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার, এতো হল্লা কিসের? হযরত ওমর (রা.) বললেন, আমি মুসলমান হয়েছি। একারণে ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চায়। আস বললেন, এটা সম্ভব নয়। আস-এর একথা শুনে আমি স্বস্তিবোধ করলাম। বহু লোক সে সময় আমার বাড়ীর আশে-পাশে ভিড় করে আছে। আস ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা সবাই কোথায় চলেছ? সবাই বললো, ওমর বেদ্বীন হয়ে গেছে, তার কাছে যাচ্ছি। আস বললেন, সেদিকে যাওয়ার কোন পথ নেই। একথা শুনে সবাই ফিরে চলে গেলো। ইবনে ইসহাকের একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তারা এমনভাবে সমবেত হয়েছিলো, মনে হচ্ছিলো যেন, তারা একই পোশাকের মধ্যে সবাই প্রবেশ করেছে।
হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণের পর পৌত্তলিকদের অবস্থা ছিলো এরূপ, যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলমানদের অবস্থার ধারণা এ ঘটনা থেকেই অনুমান করা যায়। মোজাহেদ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আমি ওমর ইবনে খাত্তাবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, কি কারণে আপনার উপাধি ফারুক হয়েছে? তিনি বললেন, আমার ইসলাম গ্রহণের তিন দিন আগে হযরত হামযা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর হযরত ওমর হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন, এরপর আমি ইসলাম গ্রহণ করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, হে আল্লাহর রসূল, মরে যাই বা বেঁচে থাকি, আমরা কি হক-এর ওপর বিদ্যমান নেই? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কেন নয়? সেই সত্বার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তোমরা বেঁচে থাকো বা মরে যাও, নিশ্চয়ই তোমরা হক-এর ওপর রয়েছো। হযরত ওমর (রা.) বলেন, এরপর আমি বললাম, তাহলে আমরা কেন পালিয়ে বেড়াবো? সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, নিশ্চয়ই আমরা বাইরে বের হবো। এরপর আমরা দুই কাতারে বিভক্ত হয়ে মিছিল করে আল্লাহর রসূলকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে বের হলাম। এক কাতারে ছিলেন হযরত হামযা, অন্য কাতারে আমি। আমাদের চলার পথে যাঁতার পেষা আটার মতো ধূলো উড়ছিলো। আমরা মসজিদে হারামে প্রবেশ করলাম। হযরত ওমর (রা.) বলেন, কোরায়শরা আমাদের দেখে মনে এতোবড় কষ্ট পেলো, যা ইতিপূর্বে পায়নি। সেই দিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে 'ফারুক' উপাধি দিলেন।
হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, এর আগে আমরা কাবাঘরের কাছে নামায আদায়ে সক্ষম ছিলাম না।
হযরত যোহায়ের ইবনে সেনান রূমী (রা.) বলেন, হযরত ওমর ফারুক (রা.) মুসলমান হওয়ার পর ইসলাম পর্দার বাইরে এলো এবং ইসলামের দাওয়াত প্রকাশ্যে দেয়া শুরু হলো। আমরা কাবাঘরের সামনে গোল হয়ে বসতে লাগলাম এবং কাবাঘর তওয়াফ করতে লাগলাম। যারা আমাদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছিলো, তাদের ওপর প্রতিশোধ নিলাম এবং অত্যাচারের জবাব দিলাম।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণের পর থেকে পরবর্তীকালে আমরা শক্তিশালী এবং সম্মানিত ছিলাম।
হযরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব এবং হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানদের ওপর পাইকারি নির্যাতন কমে গেলো, বুদ্ধি-বিবেচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যে পৌত্তলিকরা উদ্যোগী হলো। তারা চিন্তা করলো যে, ইসলামের দাওয়াত দেয়ার মাধ্যমে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা পেতে চান, সেই প্রাপ্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তা পূরণের মাধ্যমে তাঁকে হয়তো তাঁর কাজ থেকে বিরত রাখা যাবে। কিন্তু তারা জানতো না রসূলে খোদার দ্বীনের দাওয়াতের মোকাবেলায় সমগ্র বিশ্বজগতও সম্পূর্ণ মূল্যহীন। কাজেই, তাদের চেষ্টায় তারা স্বাভাবিকভাবেই ব্যর্থ হলো।
ইবনে ইসহাক ইয়াজিদ ইবনে যিয়াদের মাধ্যমে মোহাম্মদ ইবনে কাব কারাযির এই বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, আমাকে জানানো হয়েছে, কওমের নেতা ওতবা ইবনে রবিয়া স্বজাতীয়দের সামনে একদিন নতুন একটা প্রস্তাব দিল। সে সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে হারামের এক জায়গায় একাকী ছিলেন। ওতবা বললো, মোহাম্মদের সাথে আলোচনা করে এর ব্যবস্থা নাও। তার সামনে কয়েকটা প্রস্তাব পেশ করো, হয়তো তিনি কোন একটা প্রস্তাব মেনে নেবেন। তিনি যে দাবী করবেন, সেই দাবী আমরা পূরণ করবো। হামযা (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি দেখে তারা নিজেদের মধ্যে এ পরামর্শ করলো।
কোরায়শরা বললো, আবুল ওলীদ তুমি যাও, তুমি গিয়ে তাঁর সাথে কথা বলো। এরপর ওতবা উঠে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বসলো। ওতবা বললো, ভাতিজা, আমাদের কওমের মধ্যে তোমার যে মর্যাদা রয়েছে, সে কথা সবাই জানে। তুমি উচ্চ বংশের মানুষ। তুমি এমন একটা বিষয় প্রচার করছো যার কারণে কওমের মধ্যে বিভেদ, বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য দেখা দিয়েছে। তুমি কওমের নেতৃস্থানীয় লোকদের বুদ্ধিমত্তাকে নির্বুদ্ধিতা বলে অভিহিত করছো। তাদের উপাস্যকে নানাভাবে সমালোচনা করছো, তাদের ধর্ম বিশ্বাসকে বাতিল করে দিচ্ছো, তাদের পূর্ব-পুরুষদের কাফের বলে অভিহিত করছো। আমার কথা শোনো, আমি তোমাকে কয়েকটি প্রস্তাব দিচ্ছি তুমি এসব প্রস্তাব সম্পর্কে চিন্তা করো। হয়তো যে কোন একটা প্রস্তাব তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, বলো আবুল ওলীদ, আমি শুনবো।
ওতবা ওরফে ওলীদ বললো, ভাতিজা, তুমি যা প্রচার করছো, যদি এর বিনিময়ে ধন-সম্পদ চাও তবে আমরা তোমাকে এতো এতো ধন-সম্পদ দেবো যে, তুমি হবে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। যদি তুমি মর্যাদা চাও, তাও বলো, আমরা তোমাকে আমাদের নেতা হিসাবে বরণ করে নেবো। তোমাকে ছাড়া কোন ফয়সালা করা হবে না। যদি তুমি বাদশাহ হতে চাও তাও বলো, আমরা তোমাকে বাদশাহ হিসাবে মেনে নেবো। যদি তোমার কাছে আসা জিনিস জ্বীন ভূত হয়ে থাকে, তাও বলো, তুমি দেখো, অথচ তাড়াতে পারছো না, আমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো। যতো টাকা লাগে লাগুক, আমরা তোমার চিকিৎসা করাবো। কখনো কখনো এমন হয় যে, জ্বিন ভূতেরা মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে রাখে, সে অবস্থায় মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দেয়।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওতবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর বললেন, আবুল ওলীদ, তোমার কথা কি শেষ হয়েছে? আমার কথা শোনো। এরপর রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরা হা-মীম সাজদার প্রথম থেকে তেলাওয়াত শুরু করলেন। 'পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। হা-মীম। এই কেতাব দয়াময় পরম দয়ালুর কাছ থেকে অবতীর্ণ। এটি এক কেতাব, বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে এর আয়াতসমূহ আরবী ভাষায় কোরআনরূপে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে। সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে। কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিমুখ হয়েছে। কাজেই ওরা শুনবে না। ওরা বলে তুমি যার প্রতি আমাদের আহ্বান করছো। সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ আচ্ছাদিত, কানে আছে বধিরতা এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে কাজ করে অন্তরাল। সুতরাং তুমি তোমার কাজ করো এবং আমরা আমাদের কাজ করি।'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত করে যাচ্ছিলেন আর ওতবা দু'হাত পেছনের দিকে মাটিতে রেখে আরাম করে বসে শুনছিলো। সেজদার আয়াত তেলাওয়াত করার পর রসূল উঠে সেজদা করলেন। এরপর বললেন, আবুল ওলীদ, তুমি কিছু শুনতে চেয়েছিলে, আমি শুনিয়েছি, এবার তুমি জানো, আর তোমার কাজ জানে।
ওতবা উঠলো এবং নিজের সঙ্গীদের কাছে গেলো। তাকে দেখে তার সঙ্গীরা বলাবলি করতে লাগলো যে, খোদার কসম, আবুল ওলীদ যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিলো, সে চেহারা নিয়ে কিন্তু ফিরে আসছে না। ওতবা বসার পর সঙ্গীরা জিজ্ঞাসা করলো যে, কি খবর নিয়ে এসেছো? সে বললো, খবর হচ্ছে, আমি এমন কালাম শুনেছি যা অতীতে কোনদিনই শুনিনি। খোদার কসম সেটা কবিতাও নয়, যাদুমন্ত্রও নয়। তোমরা আমার কথা শোনো। ওকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দাও। যে কালাম আমি শুনেছি, ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে বড় ধরনের কোন ঘটনা ঘটবে। এরপর যদি ওকে আরবের লোকেরা মেরে ফেলে, তবে তোমাদের কাজ অন্য কেউ করবে। যদি তিনি আরবের ওপর জয়লাভ করেন, তবে তার সম্মান হবে তোমাদের সম্মান, তাঁর বাদশাহী হবে তোমাদের বাদশাহী। তাঁর অস্তিত্ব তোমাদের জন্যে সৌভাগ্যের কারণ হবে।
কোরায়শরা বললো, আবুল ওলীদ সে কালামের যাদু তোমাকেও প্রভাবিত করেছে। ওতবা বললো, তার ব্যাপারে আমি যা বুঝেছি, বলেছি। এখন তোমরা যা ভালো মনে করো, তা করো।
অপর এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন যে, তবুও যদি ওরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বল, আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করছি এক ধ্বংসকর শাস্তির, যা আদ ও সামুদের শাস্তির অনুরূপ। এই আয়াত তেলাওয়াতের সাথে সাথে ওতবা উঠে দাঁড়ালো এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে হাত চাপা দিয়ে বললো, আমি আপনাকে আল্লাহ এবং নিকট আত্মীয়ের দোহাই দিয়ে বলছি।
যে, আপনি এরূপ করবেন না। ওতবা আশঙ্কা করছিলো যে, ও রকম শাস্তি তার ওপর এসে না পড়ে। এরপর সে উঠে তার সঙ্গীদের কাছে গিয়ে উল্লিখিত কথা বললো।
টিকাঃ
৬৩. তারীখে ওমর ইবনুল খাত্তাব, ইবনে জওযি, পৃ. ১১
৬৪. তিরমিজি, মানাকেবে আবু হাফস ওমর ইবনে খাত্তাব ২য় খন্ড, পৃ. ২০৯
৬৫. হযরত ওমর সম্পর্কে এ পর্যালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন ইমাম গাযযালী। ফেকহুছ সীরাত, পৃ. ৯২-৯৩ দেখুঃ
৬৬. তারীখে ওমর ইবনে খাত্তাব, ইবনে জওযি, পৃ. ৬, সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খসন্ড, পৃ. ৩২৬-৩৪৮
৬৭. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ, ৩৪৪
৬৮. তারীখে ওমর ইবনে খাত্তাব, আল জওযি, পৃ ১৭
৬৯. মুখতাছারুছ সীরাত, পৃ. ১০২
৭০. তারীখে ওমর ইবনে খাত্তাব, পৃ.৭, ১০, ১১, সীরাতে ইবনে হিশাম, ১মখন্ড, পৃ, ৩৪৩, ৩৪৪
৭১. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৪৯-২৫০
৭২. তারীখে ওমর ইবনে খাত্তাব, পৃ. ৮
৭৩. ঐ, পৃ. ৮ ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৩৪৮-৩৪৯
৭৪. সহীহ বোখারী, ওমর ইবনে খাত্তাব অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ.৫৪৫
৭৫. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৩৪৯
৭৬. তারীখে ওমর ইবনুল খাত্তাব, ইবনে জওযি, পৃ. ৬, ৭
৭৭. মুখতাছারুছ সিরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১০৩
৭৮. তারীখে ওমর ইবনে খাত্তাব, ইবনে জওযি পৃ. ১৩
৭৯. সহীহ বোখারী, বাবে ইসলাম ওমর ইবনে খাত্তাব, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪৫
৮০. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৯৩-২৯৪
৮১. তাফসীরে ইবনে কাসির, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ, ১৫-, ১৬০, ১৬১
📄 বনু হাশেম ও বনু মোত্তালেবের সাথে আবু তালেবের বৈঠক
ইতিমধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। আবু তালেব তখনও ছিলেন শঙ্কিত। পৌত্তলিকদের পক্ষ থেকে তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ করছিলেন। তিনি এযাবত সংঘটিত ঘটনাবলী পর্যালোচনা করছিলেন। পৌত্তলিকরা তাঁকে মোকাবেলার হুমকি দিয়েছিলো। আম্মারা ইবনে ওলীদের বিনিময়ে তার ভ্রাতুষ্পুত্রকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার প্রস্তাব করেছিলো। আবু জেহেল একটা ভারি পাথর দিয়ে তাঁর ভাতিজার মস্তক চূর্ণ করার চেষ্টা করেছিলো। ওকবা ইবনে আবু মুঈত গলার চাদর পেঁচিয়ে তাঁর ভাতিজাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করতে চেয়েছিলো। খাত্তাবের পুত্র খোলা তলোয়ার হাতে তাঁকে হত্যা করতে বেরিয়েছিলো। পর্যায়ক্রমে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার প্রতি লক্ষ্য করে আবু তালেব এমন গুরুতর বিপদের আশঙ্কা করলেন যে, তাঁর বুক কেঁপে উঠলো।
তিনি ভালোভাবে বুঝতে পারলেন যে, পৌত্তলিকরা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে হত্যা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এমতাবস্থায় কোন কাফের যদি তাঁর ভাতিজার ওপর হঠাৎ করে হামলা চালায় তাহলে বিচ্ছিন্নভাবে হযরত হামযা বা হযরত ওমর বা অন্য কেউ কি করে তাঁকে রক্ষা করবে?
আবু তালেবের এ আশঙ্কা অমূলক ছিলো না। কেননা পৌত্তলিকরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করতে সঙ্কল্পবদ্ধ ছিলো। তাদের এ সঙ্কল্পের প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওরা কি কোন ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে? আমিই তো সিদ্ধান্তকারী।' (৭৯, ৪৩)
প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে আবু তালেবের কি করা উচিত? তিনি যখন দেখলেন যে, পৌত্তলিকরা চারিদিক থেকে তার ভাতিজাকে নাজেহাল করতে উঠে লেগেছে তখন তিনি তাঁর পিতামহের দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হাশেম এবং মোত্তালেবের বংশধরদের একত্রিত করলেন। তিনি সেই সমাবেশে তার ভ্রাতুষ্পুত্রকে রক্ষার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্যে সকলের প্রতি আহ্বান জানালেন। তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বললেন, যে দায়িত্ব এতোদিন আমি একা পালন করেছি, এবার এসো, আমরা সবাই মিলে সে দায়িত্ব পালন করি। আবু তালেবের এ আহ্বানে তাঁর দুই পূর্ব পুরুষের বংশধররা সাড়া দিলেন। আবু তালেবের ভাই আবু লাহাব শুধু ভিন্নমত পোষণ করলো। সে অস্বীকৃতি জানিয়ে পৌত্তলিকদের সাথে গিয়ে মিলিত হলো।
টিকাঃ
৫২. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ২৬৫, ২৬৬
৫৩. মোখতাসারুস্ সীরাত, শেখ মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব নজদী, পৃঃ ৬৮
৫৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, ২৬৬ ২৬৭
৮২. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৬৯, মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১০৬
📄 সর্বাত্মক বয়কট
চার সপ্তাহ বা তার চেয়ে কম সময়ের ভেতর পৌত্তলিকরা চারটি বড় ধরনের ধাক্কা খেলো। হযরত হামযা এবং হযরত ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। সর্বোপরি বনু হাশেম এবং বনু মোত্তালেব একত্রিত হয়ে আল্লাহর রসূলকে রক্ষার ব্যাপারে একমত হলো। পৌত্তলিকরা এতে অস্থির হয়ে উঠলো। অস্থির হবে না কেন, কারণ তারা বুঝতে পেরেছিলো যে, এখন যদি মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে তাঁকে রক্ষা করতে যে রক্তপাত হবে, এতে মক্কার প্রান্তর লাল হয়ে যাবে। তাদের নিজেদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা ছিলো। এ কারণে আল্লাহর রসূলকে হত্যা করার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে পৌত্তলিকরা অত্যাচার নির্যাতনের একটি নতুন পথ আবিষ্কার করলো। এটি ছিলো ইতিপূর্বে গৃহীত সব পদক্ষেপের চেয়ে আরো বেশী মারাত্মক।
ইবনে কাইয়েম লিখেছেন যে, বলা হয়ে থাকে, এই দলিল মনসুর ইবনে একরামা ইবনে আমের ইবনে হাশেম লিখেছিলো। কারো কারো মতে নযর ইবনে হারেস লিখেছিলো। কিন্তু সঠিক কথা হচ্ছে, এই দলিল বোগাইজ ইবনে আমের ইবনে হাশেম লিখেছিলো। এতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্যে বদদোয়া করায় তার হাত অবশ হয়ে গিয়েছিলো। লেখার পর দলিল কাবাঘরে টাঙিয়ে দেয়া হলো। তাতে আবু লাহাব ব্যতীত বনু হাশেম এবং বনু মোত্তালেবের মুসলিম অমুসলিম, নারী-পুরুষ শিশু সবাই শা'বে আবু তালেব নামক 'স্থানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। এটা ছিলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবী হিসাবে আবির্ভাবের সপ্তম বছরের ঘটনা।
টিকাঃ
১. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৪৬