📄 আবিসিনিয়ায় কোরায়শদের ষড়যন্ত্র
মুসলমানরা নিজেদের জীবন এবং ঈমান নিয়ে নিরাপদ এক জায়গায় চলে গেছে এটা ছিলো কোরায়শদের জন্যে মারাত্মক মনোবেদনার কারণ। অনেক আলোচনার পর তারা আমর ইবনুল আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়াকে এক গুরুত্বপূর্ণ মিশনে হাবশায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলো। এই দু'জন তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। এরা যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন। হাবশার বাদশাহকে দেওয়ার জন্যে কোরায়শরা এই দুজন দূতের হাতে মূল্যবান উপঢৌকন পাঠালো। এরা প্রথমে বাদশাহকে উপঢৌকন দিলেন, এরপর সেসব যুক্তি এবং কারণ ব্যাখ্যা করলেন, যার ভিত্তিতে তারা মুসলমানদের মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান। তারা বললো, 'হে বাদশাহ, আপনার দেশে আমাদের কিছু নির্বোধ যুবক পালিয়ে এসেছে। তারা স্বজাতির ধর্ম বিশ্বাস পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু আপনি যে ধর্ম বিশ্বাস পোষণ করেন সেই ধর্ম বিশ্বাসও তারা গ্রহণ করেনি। বরং তারা এক নব আবিষ্কৃত ধর্ম বিশ্বাস গ্রহণ করেছে। এ ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে আমরাও কিছু জানি না আপনিও কিছু জানেন না। ওদের পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন আমাদেরকে ওদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে পাঠিয়েছেন। তারা চান যে, আপনারা তাদের নির্বোধ লোকদের আমাদের সাথে ফিরিয়ে দেবেন। তারা নিজেদের লোকদের ভালো-মন্দ সম্পর্কে ভালোভাবে বোঝেন।' দরবারের সভাসদরাও চাচ্ছিলেন যে, বাদশাহ যেন মুসলমানদের ফিরিয়ে দেন।
নাজ্জাশী ভাবলেন যে, এ সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে সব দিক ভালোভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। তিনি মুসলমানদের তার দরবারে ডেকে পাঠালেন। মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তারা নির্ভয়ে সত্য কথা বলবে। এতে পরিণাম যা হয় হবে। মুসলমানরা দরবারে আসার পর নাজ্জাশী জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা যে ধর্ম বিশ্বাসের কারণে নিজেদের স্বজাতীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছো, সেটা কি? তোমরা তো আমার অনুসৃত ধর্ম বিশ্বাসেও প্রবেশ করোনি। মুসলমানদের মুখপাত্র হযরত জাফর ইবনে আবু তালেব (রা.) বললেন, 'হে বাদশাহ, আমরা ছিলাম মূর্তিপূজায় লিপ্ত একটি মূর্খ জাতি। আমরা মৃত পশুর মাংশ খেতাম, পাপ কাজে লিপ্ত থাকতাম, নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতাম, আমাদের মধ্যে শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করতো। আমরা যখন এরূপ অবস্থায় ছিলাম, তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের মধ্য থেকে একজনকে রসূলরূপে পাঠালেন। তাঁর উচ্চ বংশমর্যাদা, সত্যবাদিতা, সচ্চরিত্রতা, আমানতদারি ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে আমরা আগে থেকেই জানতাম। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর পথে ডেকে বুঝিয়েছেন যে, আমরা যেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহকে মানি এবং তাঁর এবাদাত করি, যেসব মূর্তি এবং পাথরকে আমাদের পিতা পিতামহ পূজা করতেন সেসব যেন পরিত্যাগ করি। তিনি আমাদেরকে সত্য বলা, আমানত আদায় করা, নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক স্থাপন, পাপ না করা এবং রক্তপাত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়া, মিথ্যা বলা, এতিমের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করা এবং সতী পুন্যশীলা মহিলার নামে অপবাদ না দেয়ার জন্যে নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, আমরা যেন শুধু আল্লাহর এবাদত করি। তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করি। তিনি আমাদের নামায আদায়, রোযা রাখা এবং যাকাত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত জাফর (রা.) ইসলামের পরিচয় এভাবে তুলে ধরার পর বললেন, 'আমরা সেই পয়গাম্বরকে সত্য বলে মেনেছি, তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন, আনীত দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্য করেছি। আমরা শুধুমাত্র আল্লাহর এবাদত করেছি এবং তার সাথে অন্য কাউকে শরিক করিনি। সেই পয়গাম্বর যেসব জিনিসকে নিষিদ্ধ বলেছেন, সেগুলোকে আমরা নিষিদ্ধ মনে করেছি যেগুলোকে হালাল বা বৈধ বলেছেন, সেগুলোকে হালাল মনে করেছি। এ সব কারণে আমাদের স্বজাতীয় লোকেরা আমাদের ওপর নাখোশ হয়েছে। তারা আমাদের উপর অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং পূর্ববতী ধর্মে ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে নানাভাবে চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চায়, আমরা যেন আল্লাহর এবাদত পরিত্যাগ করে মূর্তিপূজার প্রতি ফিরে যাই। যেসব নোংরা জিনিসকে ইতিপূর্বে হারাম মনে করেছিলাম, সেসব কিছুকে যেন হালাল মনে করি। ওরা যখন আমাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা বহুলাংশে বাড়িয়ে, পৃথিবীকে আমাদের জন্যে সঙ্কীর্ণ করে দিয়েছে এবং তারা আমাদের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন আমরা আপনার দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছি এবং অন্যদের তুলনায় আপনাকে প্রাধান্য দিয়ে আপনার আশ্রয়ে থাকা পছন্দ করেছি। আমরা এ আশাও পোষণ করেছি যে, আপনার এখানে আমাদের ওপর কোন প্রকার যুলুম অত্যাচার করা হবে না।'
নাজ্জাশী বললেন, আমাকে তোমাদের রসূলের আনীত গ্রন্থ থেকে একটু পড়ে শোনাও। হযরত জাফর (রা.) সূরা মরিয়মের প্রথম অংশের কয়েকটি আয়াত পাঠ করলেন। তা শুনে নাজ্জাশীর মন পরিবর্তন হলো, তিনি অবিরাম কাঁদতে লাগলেন, তাঁর দাঁড়ি অশ্রুতে ভিজে গেলো। তাঁর ধর্মীয় উপদেষ্টারাও এতো বেশী কাঁদলেন যে, তাদের সামনে মেলে রাখা ধর্মীয় গ্রন্থের ওপর অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। নাজ্জাশী এরপর বললেন, এই বাণী এবং হযরত মুসা (আ.) আনীত বাণী একই উৎস থেকে উৎসারিত। এরপর নাজ্জাশী আমর ইবনুল আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়াকে বললেন, তোমরা চলে যাও, আমি ওই সব লোককে তোমাদের হাতে তুলে দিতে পারবো না। এখানে তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার কারসাজি আমি সহ্য করব না।
বাদশাহর নির্দেশের পর কোরায়শদের উভয় প্রতিনিধি দরবার থেকে বেরিয়ে এলো। এরপর আমর ইবনুল আস আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়াকে বললো, আগামীকাল ওদের বিরুদ্ধে এমন কথা বাদশাহকে বলবো যে, ওদের সব চালাকি ছুটিয়ে দেবো। আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়া বললেন, না তার দরকার নেই। ওরা যদিও আমাদের ধর্ম বিশ্বাস পরিত্যাগ করেছে, কিন্তু ওরাতো আমাদের গোত্রের লোক। তবুও আমর ইবনুল আস তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন।
পরদিন আমর ইবনুল আস বাদশাহর দরবারে গিয়ে বললেন, হে বাদশাহ, ওরা ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে এক অদ্ভুত কথা বলে। এ কথা শুনে নাজ্জাশী পুনরায় মুসলমানদের ডেকে পাঠালেন। তিনি হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে মুসলমানদের মতামত জানতে চাইলেন। মুসলমানরা এবার ভয় পেয়ে গেলেন। তবু তারা ভাবলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা, যা হবার হবে, তারা কিন্তু সত্য কথাই বলবেন।
নাজ্জাশীর প্রশ্নের জবাবে হযরত জাফর (রা.) বললেন, আমরা হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে সেই কথাই বলে থাকি, যা আমাদের নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর বান্দা, তাঁর রসূল, তাঁর রূহ এবং তাঁর কালেমা। তাকে আল্লাহ তায়ালা কুমারী সতী সাধ্বী হযরত মরিয়ম (আ.)-এর ওপর ন্যস্ত করেছেন।'
এ কথা শুনে নাজ্জাশী মাটি থেকে একটি কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে বললেন, খোদার কসম, তোমরা যা কিছু বলেছ, হযরত ঈসা (আ.) এই কাঠের টুকরোর চাইতে বেশী কিছুই ছিলেন না। এ কথা শুনে ধর্মীয় উপদেষ্টাগণ হুঁ হুঁ শব্দ উচ্চারণ করে বিরক্তি প্রকাশ করলেন। বাদশাহ বললেন, তোমরা হুঁ হুঁ বললেও আমি যা বলেছি, একথাই সত্য।
এরপর নাজ্জাশী মুসলমানদের বললেন, যাও, তোমরা আমার দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ। যারা তোমাদের গালি দেবে, তাদের ওপর জরিমানা ধার্য করা হবে। আমি চাই না কেউ তোমাদের কষ্ট দিক, আর তার পরিবর্তে আমি সোনার পাহাড় লাভ করি।
এরপর নাজ্জাশী তার ভৃত্যদের বললেন, মক্কা থেকে আগত প্রতিনিধিদের আনীত উপঢৌকন তাদের ফিরিয়ে দাও, ওগুলোর কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহর শপথ, তিনি যখন আমাকে আমার দেশ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তখন আমার কাছ থেকে কোন ঘুষ নেননি। আমি কেন তাঁর পথে ঘুষ নেব। এছাড়া তিনি অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা আমার ব্যাপারে অন্য লোকদের কথা গ্রহণ করেননি। আমি কেন আল্লাহর ব্যাপারে অন্য লোকদের কথা মানবো?
এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হযরত উম্মে সালমা (রা.) বলেন, কোরায়শদের উভয় প্রতিনিধি এরপর তাদের আনীত উপঢৌকনসহ অসম্মানজনকভাবে দেশে ফিরে এলো। আমরা নাজ্জাশীর দেশে একজন ভালো প্রতিবেশীর ছত্রছায়ায় অবস্থান করতে লাগলাম।
টিকাঃ
৫১. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ ৩৩৪-৩৩৮
📄 আবু তালেবের প্রতি হুমকি
এ প্রস্তাবের পর কোরায়শ নেতারা আবু তালেবের কাছে গিয়ে বললেন, হে আবু তালেব, আপনি আমাদের মধ্যে মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। আমরা আপনাকে বলেছিলাম যে, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে ফিরিয়ে রাখুন, কিন্তু আপনি রাখেননি। আপনি মনে রাখবেন, আমাদের পিতা-পিতামহকে গালাগাল দেয়া হবে এটা সহ্য করতে পারব না। আমাদের বুদ্ধি বিবেক বিচার বিবেচনাকে নির্বুদ্ধিতা বলা হবে এবং উপাস্যদের দোষ বের করা হবে, এটাও আমাদের সহ্য হবে না। আপনি তাকে বাধা দিন এবং বিরত থাকুন। যদি এতে ব্যর্থ হন, তবে আপনার এবং আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে এমন লড়াই বাধিয়ে দেবো যে, এতে বহু প্রাণহানি ঘটবে।
এ হুমকিতে আবু তালেব প্রভাবিত হলেন। তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ডেকে বললেন, ভাতিজা, তোমার কওমের লোকেরা আমার কাছে এসে এসব কথা বলে গেছে। কাজেই, তুমি এবার আমার এবং তোমার নিজের প্রতি দয়া করো। তুমি এ বিষয়ে আমার ওপর এমন বোঝা চাপিও না, যা আমি বহন করতে পারবো না।
একথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পারলেন যে, এবার তাঁর চাচাও তাঁকে পরিত্যাগ করবে। তাঁকে সাহায্য করার ব্যাপারে তিনিও দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এ কারণে তিনি বললেন, 'চাচাজান, আল্লাহর শপথ, যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্র এনে দিয়ে কেউ বলে একাজ ছেড়ে দাও, তবুও আমি তা ছাড়তে পারব না। হয়তো এ কাজের পূর্ণতা বিধান করে আমি একে জয়ী করবো অথবা এ কাজ করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যাব।'
একথা বলে আবেগের আতিশয্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেঁদে ফেললেন। এরপর চলে যেতে লাগলেন। চাচা আবু তালেবের মন কেঁদে উঠলো। তিনি ভাতিজাকে ডেকে বললেন, যাও ভাতিজা, তুমি যা চাও, তাই করো। আল্লাহর শপথ, আমি কোন অবস্থায় কখনো তোমাকে ছাড়তে পারবো না।
'খোদার শপথ তোমার কাছে যেতে ওরা, পারবে না তো দলে দলে, যতোদিন না দাফন হবো আমি মাটির তলে। বলতে থাকো তোমার কথা খোলাখুলি, করো না আর কোনো ভয়', দু'চোখ তোমার শীতল হোক আর, খুশী হোক তোমার হৃদয়।
টিকাঃ
৫২. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ২৬৫, ২৬৬
৫৩. মোখতাসারুস্ সীরাত, শেখ মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব নজদী, পৃঃ ৬৮
📄 আবু তালেবের কাছে পুনরায় কোরায়েশ প্রতিনিধি দল
মারাত্মক রকমের হুমকি সত্তেও কোরায়শরা যখন দেখলো যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন তারা বুঝতে পারলো যে, আবু তালেব তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে পরিত্যাগ করতে পারবে না। বরং প্রয়োজনে তিনি কোরায়শদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন এবং শত্রুতার জন্যেও প্রস্তুত আছেন। এরূপ চিন্তা করে কোরায়শ নেতারা ওলীদ ইবনে মুগীরার পুত্র আম্মারাকে সঙ্গে নিয়ে আবু তালেবের কাছে হাযির হয়ে বললো, হে আবু তালেব, আম্মারাকে নিয়ে এলাম। আম্মারা কোরায়শ বংশের সুদর্শন যুবক, আপনি ওকে গ্রহণ করুন। সে আপনাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। আপনি ওকে নিজের পুত্র সন্তান হিসাবে গ্রহণ করুন। সে আপনার হবে আর আপনি নিজের ভাতিজা মোহাম্মদকে আমাদের হাতে তুলে দিন, যে আপনার পিতা- পিতামহের দ্বীনের বিরোধিতা করছে, আপনার জাতিকে ছিন্নভিন্ন করছে এবং তাদের বুদ্ধিমত্তাকে নির্বুদ্ধিতা বলে অভিহিত করছে। আমরা তাকে হত্যা করবো। ব্যস, এটা একজন লোকের পরিবর্তে একজন লোকের হিসাব হবে।
আবু তালেব বললেন, 'কি চমৎকার সওদা করতে তোমরা আমার কাছে এসেছো। নিজেদের পুত্রকে তোমরা আমার কাছে নিয়ে এসেছো, আমি তাকে পানাহার করাবো লালন পালন করে বড় করবো, আর আমি নিজের পুত্রকে তোমাদের হাতে দেবো তোমরা তাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করবে। আল্লাহর কসম, এটা হতে পারে না।'
একথা শুনে নওফেল ইবনে মাতয়ামের পুত্র আদী বললেন, খোদার কসম, হে আবু তালেব, তোমার সাথে তোমার কওম ইনসাফের কথা বলেছে এবং তুমি কল্যাণকর অবস্থা থেকে দূরে থাকতে চেয়েছো। কিন্তু আমি লক্ষ্য করছি যে, তুমি তাদের কোন কথাই গ্রহণ করতে চাচ্ছ না।
জবাবে আবু তালেব বললেন, খোদার শপথ, তোমরা আমার সাথে ইনসাফের কথা বলোনি, বরং তোমরাও আমার সঙ্গ ছেড়ে আমার বিরুদ্ধে লোকদের সাহায্য করতে উদ্যত হচ্ছ। ঠিক আছে, যা ইচ্ছা করো।
টিকাঃ
৫৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, ২৬৬ ২৬৭
📄 আল্লাহর রসূলকে হত্যা করার হীন প্রস্তাব
কোরায়শ নেতাদের উল্লিখিত উভয় আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের আক্রোশ বেড়ে গেলো। অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়লো। সে সময় কোরায়শ নেতাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের মধ্যে আরো নতুন মাত্রা যোগ হলো। তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার প্রস্তাব করলো। কিন্তু সেই সময়ে দুই বিশিষ্ট কোরায়শ নেতা হযরত হামযা (রা.) এবং হযরত ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ ইসলামের শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিবর্তে বরং এই দুই বীর কেশরী আল্লাহর রসূলের কাছে আত্মসমর্পণ করে ইসলামেরই শক্তি বাড়িয়ে দেন।
আল্লাহর রসূলের প্রতি পৌত্তলিকদের অত্যাচার নির্যাতনের দুটি উদাহরণ পেশ করছি।
একদিন আবু লাহাবের পুত্র ওতাইবা রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললো, 'ওয়াননাজমে ইযা হাওয়া এবং ছুম্মা দানা ফাতাদাল্লার' সাথে আমি কুফর করছি। সূরা নাজম-এর এ দুটি আয়াতের অর্থ হচ্ছে, 'শপথ নক্ষত্রের, যখন তা অস্তমিত হয়। অতপর, সে তার নিকটবর্তী হলো অতি নিকটবর্তী।' এরপর ওতাইবা আল্লাহর রসূলের ওপর অত্যাচার শুরু করলো। তাঁর জামা ছিঁড়ে দিলো এবং পবিত্র চেহারা লক্ষ্য করে থুথু নিক্ষেপ করলো। কিন্তু থুথু তাঁর চেহারায় পড়েনি। সে সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বদদোয়া দিলেন। তিনি বলেছিলেন,' হে আল্লাহ তায়ালা, ওর ওপর তোমার কুকুরসমূহের মধ্যে থেকে একটি কুকুর লেলিয়ে দাও।' রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বদদোয়া কবুল হয়েছিলো। ওতবা একবার কোরায়শ বংশের কয়েকজন লোকের সাথে এক সফরে সিরিয়া যাচ্ছিলো। যারকা নামক জায়গায় তারা একদা রাত্রি যাপনের জন্যে তাঁবু স্থাপন করলো। সে সময় একটি বাঘকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলো। ওতাইবা বাঘ দেখে বললো, হায়রে, আমার ধ্বংস অনিবার্য খোদার কসম, এই বাঘ আমাকে খাবে। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ওপর বদদোয়া করেছেন। দেখো আমি সিরিয়ায় রয়েছি, অথচ তিনি মক্কায় বসে আমাকে মেরে ফেলছেন। সতর্কতা হিসাবে সফরসঙ্গীরা তখন ওতাইবাকে নিজেদের মাঝখানে রেখে শয়ন করলো। রাত্রিকালে বাঘ এলো, সবাইকে ডিঙ্গিয়ে ওতাইবার কাছে গেলো এবং তার ঘাড় মটকালো।
ওকবা ইবনে আবু মুঈত ছিলো একজন প্রখ্যাত পৌত্তলিক। একবার এই দুর্বৃত্ত নামাযে সেজদা দেয়ার সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘাড় এতো জোরে পেঁচিয়ে ধরলো, মনে হচ্ছিলো যেন, তাঁর চোখ বেরিয়ে যাবে।
ইবনে ইসহাকের একটি দীর্ঘ বর্ণনায় কোরায়শদের চক্রান্ত সম্পর্কে জানা যায়। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যে ক্রমাগত চক্রান্ত করছিলো। উক্ত বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, একবার আবু জেহেল বলেছিলো, হে কোরায়শ ভাইয়েরা, আপনারা লক্ষ্য করছেন যে, মোহাম্মদ আমাদের ধর্মের সমালোচনা এবং আমাদের উপাস্যদের নিন্দা থেকে বিরত হচ্ছে না। আমাদের পিতা পিতামহকে অবিরাম গালমন্দ দিয়েই চলেছে। এ কারণে আমি আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করছি যে, আমি একটি ভারি পাথর নিয়ে বসে থাকবো, মোহাম্মদ যখন সেজদায় যাবে, তখন সেই পাথর দিয়ে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবো। এরপর যে কোন পরিস্থিতির জন্যে আমি প্রস্তুত। ইচ্ছে হলে আপনারা আমাকে বান্ধবহীন অবস্থায় রাখবেন অথবা আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন। এরপর বনু আবদে মান্নাফ আমার সাথে যেরূপ ইচ্ছা ব্যবহার করবে, এতে আমার কোন পরোয়া নেই। কোরায়শরা এ প্রস্তাব শোনার পর বললো, কোন অবস্থায়ই আমরা তোমাকে বান্ধবহীন অবস্থায় ফেলে রাখবো না। তুমি যা করতে চাও, করতে পারো।
সকালে আবু জেহেল একটি ভারি পাথর নিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অপেক্ষায় বসে থাকলো। কোরায়শরা একে একে সমবেত হয়ে আবু জেহেলের কর্মতৎপরতা দেখতে উৎকণ্ঠিত হয়ে রইলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যথারীতি হাযির হয়ে নামায আদায় করতে শুরু করলেন। তিনি যখন সেজদায় গেলেন তখন আবু জেহেল পাথর নিয়ে অগ্রসর হলো। কিন্তু পরক্ষণে ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় ফিরে এলো, এবং তার হাত পাথরের সাথে যেন আটকেই রইলো। কোরায়শের কয়েকজন লোক তার কাছে এসে বললো, আবুল হাকাম তোমার কী হয়েছে? সে বললো, আমি যে কথা রাতে বলেছিলাম, সেটা করতে যাচ্ছিলাম কিন্তু কাছাকাছি পৌছুতেই দেখতে পেলাম, মোহাম্মদ এবং আমার মাঝখানে একট উট এসে দাঁড়িয়েছে। খোদার কসম আমি কখনো অতো বড়, অতো লম্বা ঘাড় ও দাঁত বিশিষ্ট উট দেখিনি। উটটি আমার ওপর হামলা করতে চাচ্ছিলো।
ইবনে ইসহাক বলেন, আমাকে জানানো হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, উটের ছদ্মবেশে তিনি ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আ.)। আবু জেহেল যদি কাছে আসতো তবে তাকে পাকড়াও করা হতো।
এরপর আবু জেহেল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এমন ব্যবহার করছিলো যে, সেটা দেখে হযরত হামযা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। সে সম্পর্কে কিছুক্ষণ পরে আলোচনা করা হবে।
কোরায়শের অন্যান্য দুর্বৃত্তরাও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছিলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, একবার পৌত্তলিকরা কা'বার সামনে বসেছিলো। আমিও সেখানে ছিলাম। তারা আল্লাহর রসূলের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বললো, এই লোকটি সম্পর্কে আমরা যেরূপ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি তার উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে তার ব্যাপারে আমরা অতুলনীয় ধৈর্যধারণ করেছি। এ আলোচনা চলার সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত হলেন। তিনি প্রথমে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন এরপর কাবাঘর তওয়াফ করার সময়ে পৌত্তলিকদের পাশ দিয়ে গেলেন। তারা খারাপ কথা বলে তাঁকে অপমান করলো, আল্লাহর রসূলের চেহারায় সে অপমানের ছাপ ফুটে উঠলো। তওয়াফের মধ্যে পুনরায় তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে তারা পুনরায় একইভাবে অপমানজনক কথা বললো। সে অপমানের প্রভাব আমি তাঁর চেহারায় লক্ষ্য করলাম। তৃতীয়বারও একই রকম ঘটনা ঘটলো। এবার আল্লাহর রসূলের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, কোরায়শের লোকেরা শোনো, সেই আল্লাহর শপথ, তাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, আমি তোমাদের কাছে কোরবানীর পশু নিয়ে এসেছি।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একথায় কোরায়শরা দারুণ প্রভাবিত হলো। তারা সবাই নীরব হয়ে গেলো। কঠোর প্রাণের লোকেরাও তাঁর প্রতি নম্র নরম ভাষা ব্যবহার করতে লাগলো। তারা বলছিলো, আবুল কাসেম, আপনি ফিরে যান। আল্লাহর শপথ, আপনি তো কখনো নির্বোধ ছিলেন না।
পরদিনও কোরায়শরা একইভাবে সমবেত হয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রসঙ্গ আলোচনা করছিলো। এমন সময় তিনি এলেন, তিনি কাছে আসতেই তারা একযোগে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। একজন তাঁর চাদর গলায় জড়িয়ে শ্বাসরোধ করতে চাচ্ছিলো। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁকে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, তোমরা কি এমন একজন মানুষকে হত্যা করছো, যিনি বলেন যে, আমার প্রভু আল্লাহ? দুর্বৃত্তরা এরপর তাঁকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন, কোরায়শদের অত্যাচারের ঘটনাসমূহের মধ্যে আমার দেখা এ ঘটনাটি ছিলো সবচেয়ে মারাত্মক।
টিকাঃ
৫৫. মুখতাছারুছ সিয়ার, শেখ আবদুল্লাহ পৃ. ১৩৫, ১ম খন্ড, এস্তিয়ার, এছাবা দালায়েলুন নবুয়ত। আর ফওযুল আনফ
৫৬. ঐ, মুখতাছারুছ সিয়ার, পৃ. ১১৩
৫৭. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৯৮-২৯৯
৫৮. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৮৯-২৯০
৫৯. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪৪
৬০. মুখতাছারুস সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১১৩