📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরত

📄 আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরত


যুলুম অত্যাচার ও নির্যাতনের এ ধারা নবুয়তের চতুর্থ বছরের মাঝামাঝি বা শেষদিকে শুরু হয়েছিলো। প্রথমদিকে ছিলো মামুলি কিন্তু দিনে দিনে এর মাত্রা বেড়ে চললো। নবুয়তের পঞ্চম বছরের মাঝামাঝি সময়ে তা চরমে পৌছুলো। মক্কায় অবস্থান করা মুসলমানদের জন্যে অসম্ভব হয়ে উঠলো। সেই সঙ্কটময় এবং অন্ধকার সময়ে সূরা কাহাফ নাযিল হলো। এতে পৌত্তলিকদের উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে। তাতে বর্ণিত তিনটি ঘটনায় আল্লাহর পক্ষ থেকে মোমেন বান্দাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইংগিত দেয়া হয়েছে। আসহাবে কাহাফের ঘটনায় এ শিক্ষা মজুদ রয়েছে যে, দ্বীন ঈমান যখন আশঙ্কার সম্মুখীন হয় তখন কুফুরী এবং যুলুম-অত্যাচারের কেন্দ্র থেকে সশরীরে হিজরত করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তোমরা যখন ওদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে এবং ওরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের এবাদাত করে তাদের কাছ থেকে তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে তাঁর দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসূ করার ব্যবস্থা করবেন।' (১৬, ১৮)
হযরত মুসা (আ.) এবং হযরত খিযির (আ.)-এর ঘটনা থেকে এ শিক্ষা পাওয়া যায় যে, পরিণাম সব সময় প্রকাশ্য অবস্থা অনুযায়ী নির্ণিত হয় না। বরং কখনো কখনো প্রকাশ্য অবস্থার সম্পূর্ণ বিরপীতও হয়ে থাকে। কাজেই এ ঘটনায় সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে বর্তমানে যেসব যুলুম-অত্যাচার হচ্ছে, তার পরিণাম হবে সম্পূর্ণ বিপরীত। এসব পৌত্তলিক ও উদ্ধত বিদ্রোহী ঈমান না অনেলে একদিন তারা পরাজিত হয়ে বাধ্য হবে মুসলমানদের সামনে মাথা নত করতে এবং তাদের ভাগ্য নির্ধারণের জন্যে মুসলমানদের সামনে আত্মসমর্পণ করবে।
যুলকারনাইনের ঘটনায় নীচে উল্লিখিত কয়েকটি শিক্ষার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এক. যমিনের মালিকানা আল্লাহর। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান তাঁর অংশীদার করেন। দুই. সাফল্য একমাত্র ঈমানের পথে রয়েছে, কুফুরীর পথে নেই। তিন. আল্লাহ তায়ালা মাঝে মাঝে বান্দাদের মধ্য থেকে এমন মানুষদের উত্থান ঘটান যারা মযলুম ও উৎপীড়িত মানুষদের সেই কাফের 'ইয়াজুজ মাজুজদের' কবল থেকে মুক্তি দেন। চার. আল্লাহর পুণ্যশীল বান্দারা যমিনের অংশীদার হওয়ার সবচেয়ে বেশী উপযুক্ত।
সূরা কাহাফের পর আল্লাহ তায়ালা সূরা ঝুমার নাযিল করেন। এতে হিজরতের প্রতি ইশারা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, আল্লাহর যমিন সংকীর্ণ নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, বলো, হে আমার মোমেন বান্দারা, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর। যারা এ দুনিয়ায় কল্যাণকর কাজ করে তাদের জন্যে আছে কল্যাণ, প্রশস্ত আল্লাহর পৃথিবী, ধৈর্যশীলকে তো অপরিমিত পুরস্কার দেয়া হবে।'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জানা ছিলো যে, হাবশার বাদশাহ আসহামা নাজ্জাশী একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তার রাজ্যে কারো ওপর কোন যুলুম অত্যাচার করা হয় না। এ কারণে আল্লাহর রসূল মুসলমানদেরকে তাদের দ্বীনের হেফাযতের জন্যে হাবশায় হিজরত করার আদেশ দিলেন। এরপর পরিকল্পিত কর্মসূচী অনুযায়ী রজব মাসে সাহাবায়ে কেরামের প্রথম দল হাবশার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এ দলে বারো জন পুরুষ এবং চারজন মহিলা ছিলেন। হযরত ওসমান (রা.) ছিলেন দলনেতা। তাঁর সঙ্গে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যা হযরত রোকাইয়া (রা.)-ও ছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের সম্পর্কে বলেন, 'হযরত ইবরাহীম (আ.) এবং হযরত লুত (আ.)-এর পর আল্লাহর পথে হিজরতকারী এরা প্রথম দল।'
রাতের অন্ধকারে চুপিসারে এরা গন্তব্যস্থলের দিকে অগ্রসর হন। কোরায়শদের জানতে না দেয়ার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের সতর্কতার ব্যবস্থা করা হয়। প্রথমে তারা লোহিত সাগরের শুরাইবা বন্দরের দিকে অগ্রসর হন। সৌভাগ্যক্রমে সেখানে দুটি বাণিজ্যিক নৌকা পাওয়া গিয়েছিলো। সেই নৌকায় আরোহণ করে তারা নিরাপদে হাবশায় গমন করেন। তারা চলে যাওয়ার পর কোরায়শরা তাদের যাওয়ার খবর পায়। তারা খবর পাওয়ার পরই সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত ছুটে যায়। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আগেই চলে গিয়েছিলেন। এ কারণে তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। ওদিকে মুসলমানরা হাবশায় পৌছে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।
সেই বছরই রমযান মাসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারম শরীফে গমন করেন। সেখানে নেতৃস্থানীয় কোরায়শরা সমবেত হয়েছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকস্মিকভাবে উপস্থিত হয়ে সূরা 'নাজম' তেলাওয়াত শুরু করেন। একত্রে এতো পৌত্তলিক এর আগে কখনো কোরআন শোনেনি। কেননা তাদের সিদ্ধান্ত ছিলো এ রকম যে, কখনো কোরআন শোনা যাবে না, কোরআনের ভাষায়, কাফেররা বলে, 'তোমরা এই কোরআন শ্রবণ করো না, এবং তা যখন তেলাওয়াত করা হয়, তখন শোরগোল করো যাতে, তোমরা জয়ী হতে পারো।' (২৬, ৪১)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হঠাৎ করে মধুর স্বরে কোরআন তেলাওয়াত শুরু করলে পৌত্তলিকরা মোহিত হয়ে পড়ে। তারা কোরআনের লালিত্যে ভাষার মাধুর্যে ছিলো মুগ্ধ ও বিমোহিত। কারো মনে সে সময় অন্য কোন চিন্তাই আসেনি, সবাই এমনই অভিভূত হয়ে পড়েছিলো। সূরার শেষ দিকের এই আয়াত তিনি তেলাওয়াত করলেন, 'আল্লাহর জন্যে সেজদা করো এবং তাঁর এবাদত করো।' এই আয়াত পাঠ করার পরই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেজদায় চলে গেলেন। সাথে সাথে পৌত্তলিকরাও সেজদা করলো। সত্যের প্রভাব এবং মাধুর্য অমুসলিমদের অহংকার চূর্ণ করে দিয়েছিলো, তারা কেউই নিজের মধ্যে ছিলো না এ কারণে নিজের অজ্ঞাতেই সেজদায় নত হয়েছিলো।
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তারা অবাক হয়ে গেলো। যে দ্বীনকে নিশ্চিহ্ন করতে তারা সর্বতোভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো, সেই কাজেই তাদের নিয়োজিত হতে দেখে সেখানে অনুপস্থিত পৌত্তলিকরা তাদের তিরষ্কার করলো। তিরস্কারের কবল থেকে রক্ষা পেতে তারা তখন বললো, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মূর্তিগুলোর কথা সম্মানের সাথে উল্লেখ করেছেন। নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করতে তারা বললো, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'ওরা সব উচ্চমার্গের দেবী এবং তাদের শাফায়াতের আশা করা যেতে পারে।' অথচ এটা ছিলো সুস্পষ্ট মিথ্যা কথা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সেজদা করে তারা যে ভুল করেছিলো, তার একটা যুক্তিসঙ্গত ওযর পেশ করতে এ গল্প তৈরী করেছিলো।

টিকাঃ
৪৪. মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ
৪৫. রহমাতুল লিল আলামিন ১ম খন্ড, পৃ ৬১ যাদুল মায়াদ ১ম খন্ড, পৃ ২৪
৪৬. সহীহ বোখারী শরীফে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ রয়েছে।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরত

📄 আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরত


এরপর সেই হিজরতকারী মোহাজেরদের ওপর, বিশেষভাবে মুসলমানদের ওপর সাধারণভাবে পৌত্তলিকদের অত্যাচার আরো বেড়ে গেলো। পরিবারের অমুসলিমরা মুসলমানদের নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। কেননা কোরায়শরা খবর পেয়েছিলো যে, নাজ্জাশী মুসলমানদের সাথে খুব ভালো ব্যবহার করেছেন এবং হাবশায় মুসলমানরা ভালোভাবেই দিন কাটিয়েছেন। এ খবর তাদের অন্তর্জালা বাড়িয়ে দিয়েছিলো। কোরায়শদের অত্যাচার নির্যাতন বেড়ে যাওয়ায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় হাবশায় হিজরত করতে সাহাবাদের পরামর্শ দিলেন। তবে প্রথমবারের হিজরতের চেয়ে এটা ছিলো কঠিন। কারণ কোরায়শ পৌত্তলিকরা এবার ছিলো সতর্ক। তাদের ফাঁকি দিয়ে মুসলমানরা অন্যত্র চলে গিয়ে নিরাপদে জীবন যাপন করবে এটা তারা ভাবতেই পারছিলো না। কিন্তু মুসলমানরা অমুসলিমদের চেয়ে অধিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়ায় আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্যে হাবশায় যাওয়ার পথ সহজ করে দিলেন। ফলে হিজরতকারী মুসলমানরা কোরায়শদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগেই হাবশার বাদশাহর কাছে পৌঁছে গেলেন। এবার বিরাশি বা তিরাশি জনের একটি দল হিজরত করেন। হযরত আম্মার (রা.)-এর হিজরত এর চেয়ে ভিন্ন ঘটনা, এ হিজরতে আঠার উনিশ জন মহিলা ছিলেন। আল্লামা মুনসুরপুরী মহিলাদের সংখ্যা আঠারো বলে উল্লেখ করেছেন।

টিকাঃ
৪৭. উল্লিখিত বর্ণনা সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।
৪৮. যাদুল মায়াদ, ১ম খন্ড, পৃ ২৪, ২য় খন্ড, পৃ. ৪৪, হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৩৬৪
৪৯. যাদুল মায়াদ, ১ম খন্ড, পৃ. ১৪০, রহমাতুল লিল আলামিন ১ম খন্ড, পৃ. ৬০
৫০. রহমাতুল লিল আলামিন

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আবিসিনিয়ায় কোরায়শদের ষড়যন্ত্র

📄 আবিসিনিয়ায় কোরায়শদের ষড়যন্ত্র


মুসলমানরা নিজেদের জীবন এবং ঈমান নিয়ে নিরাপদ এক জায়গায় চলে গেছে এটা ছিলো কোরায়শদের জন্যে মারাত্মক মনোবেদনার কারণ। অনেক আলোচনার পর তারা আমর ইবনুল আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়াকে এক গুরুত্বপূর্ণ মিশনে হাবশায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলো। এই দু'জন তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। এরা যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন। হাবশার বাদশাহকে দেওয়ার জন্যে কোরায়শরা এই দুজন দূতের হাতে মূল্যবান উপঢৌকন পাঠালো। এরা প্রথমে বাদশাহকে উপঢৌকন দিলেন, এরপর সেসব যুক্তি এবং কারণ ব্যাখ্যা করলেন, যার ভিত্তিতে তারা মুসলমানদের মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান। তারা বললো, 'হে বাদশাহ, আপনার দেশে আমাদের কিছু নির্বোধ যুবক পালিয়ে এসেছে। তারা স্বজাতির ধর্ম বিশ্বাস পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু আপনি যে ধর্ম বিশ্বাস পোষণ করেন সেই ধর্ম বিশ্বাসও তারা গ্রহণ করেনি। বরং তারা এক নব আবিষ্কৃত ধর্ম বিশ্বাস গ্রহণ করেছে। এ ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে আমরাও কিছু জানি না আপনিও কিছু জানেন না। ওদের পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন আমাদেরকে ওদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে পাঠিয়েছেন। তারা চান যে, আপনারা তাদের নির্বোধ লোকদের আমাদের সাথে ফিরিয়ে দেবেন। তারা নিজেদের লোকদের ভালো-মন্দ সম্পর্কে ভালোভাবে বোঝেন।' দরবারের সভাসদরাও চাচ্ছিলেন যে, বাদশাহ যেন মুসলমানদের ফিরিয়ে দেন।
নাজ্জাশী ভাবলেন যে, এ সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে সব দিক ভালোভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। তিনি মুসলমানদের তার দরবারে ডেকে পাঠালেন। মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তারা নির্ভয়ে সত্য কথা বলবে। এতে পরিণাম যা হয় হবে। মুসলমানরা দরবারে আসার পর নাজ্জাশী জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা যে ধর্ম বিশ্বাসের কারণে নিজেদের স্বজাতীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছো, সেটা কি? তোমরা তো আমার অনুসৃত ধর্ম বিশ্বাসেও প্রবেশ করোনি। মুসলমানদের মুখপাত্র হযরত জাফর ইবনে আবু তালেব (রা.) বললেন, 'হে বাদশাহ, আমরা ছিলাম মূর্তিপূজায় লিপ্ত একটি মূর্খ জাতি। আমরা মৃত পশুর মাংশ খেতাম, পাপ কাজে লিপ্ত থাকতাম, নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতাম, আমাদের মধ্যে শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করতো। আমরা যখন এরূপ অবস্থায় ছিলাম, তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের মধ্য থেকে একজনকে রসূলরূপে পাঠালেন। তাঁর উচ্চ বংশমর্যাদা, সত্যবাদিতা, সচ্চরিত্রতা, আমানতদারি ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে আমরা আগে থেকেই জানতাম। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর পথে ডেকে বুঝিয়েছেন যে, আমরা যেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহকে মানি এবং তাঁর এবাদাত করি, যেসব মূর্তি এবং পাথরকে আমাদের পিতা পিতামহ পূজা করতেন সেসব যেন পরিত্যাগ করি। তিনি আমাদেরকে সত্য বলা, আমানত আদায় করা, নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক স্থাপন, পাপ না করা এবং রক্তপাত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়া, মিথ্যা বলা, এতিমের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করা এবং সতী পুন্যশীলা মহিলার নামে অপবাদ না দেয়ার জন্যে নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, আমরা যেন শুধু আল্লাহর এবাদত করি। তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করি। তিনি আমাদের নামায আদায়, রোযা রাখা এবং যাকাত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত জাফর (রা.) ইসলামের পরিচয় এভাবে তুলে ধরার পর বললেন, 'আমরা সেই পয়গাম্বরকে সত্য বলে মেনেছি, তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন, আনীত দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্য করেছি। আমরা শুধুমাত্র আল্লাহর এবাদত করেছি এবং তার সাথে অন্য কাউকে শরিক করিনি। সেই পয়গাম্বর যেসব জিনিসকে নিষিদ্ধ বলেছেন, সেগুলোকে আমরা নিষিদ্ধ মনে করেছি যেগুলোকে হালাল বা বৈধ বলেছেন, সেগুলোকে হালাল মনে করেছি। এ সব কারণে আমাদের স্বজাতীয় লোকেরা আমাদের ওপর নাখোশ হয়েছে। তারা আমাদের উপর অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং পূর্ববতী ধর্মে ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে নানাভাবে চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চায়, আমরা যেন আল্লাহর এবাদত পরিত্যাগ করে মূর্তিপূজার প্রতি ফিরে যাই। যেসব নোংরা জিনিসকে ইতিপূর্বে হারাম মনে করেছিলাম, সেসব কিছুকে যেন হালাল মনে করি। ওরা যখন আমাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা বহুলাংশে বাড়িয়ে, পৃথিবীকে আমাদের জন্যে সঙ্কীর্ণ করে দিয়েছে এবং তারা আমাদের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন আমরা আপনার দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছি এবং অন্যদের তুলনায় আপনাকে প্রাধান্য দিয়ে আপনার আশ্রয়ে থাকা পছন্দ করেছি। আমরা এ আশাও পোষণ করেছি যে, আপনার এখানে আমাদের ওপর কোন প্রকার যুলুম অত্যাচার করা হবে না।'
নাজ্জাশী বললেন, আমাকে তোমাদের রসূলের আনীত গ্রন্থ থেকে একটু পড়ে শোনাও। হযরত জাফর (রা.) সূরা মরিয়মের প্রথম অংশের কয়েকটি আয়াত পাঠ করলেন। তা শুনে নাজ্জাশীর মন পরিবর্তন হলো, তিনি অবিরাম কাঁদতে লাগলেন, তাঁর দাঁড়ি অশ্রুতে ভিজে গেলো। তাঁর ধর্মীয় উপদেষ্টারাও এতো বেশী কাঁদলেন যে, তাদের সামনে মেলে রাখা ধর্মীয় গ্রন্থের ওপর অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। নাজ্জাশী এরপর বললেন, এই বাণী এবং হযরত মুসা (আ.) আনীত বাণী একই উৎস থেকে উৎসারিত। এরপর নাজ্জাশী আমর ইবনুল আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়াকে বললেন, তোমরা চলে যাও, আমি ওই সব লোককে তোমাদের হাতে তুলে দিতে পারবো না। এখানে তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার কারসাজি আমি সহ্য করব না।
বাদশাহর নির্দেশের পর কোরায়শদের উভয় প্রতিনিধি দরবার থেকে বেরিয়ে এলো। এরপর আমর ইবনুল আস আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়াকে বললো, আগামীকাল ওদের বিরুদ্ধে এমন কথা বাদশাহকে বলবো যে, ওদের সব চালাকি ছুটিয়ে দেবো। আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়া বললেন, না তার দরকার নেই। ওরা যদিও আমাদের ধর্ম বিশ্বাস পরিত্যাগ করেছে, কিন্তু ওরাতো আমাদের গোত্রের লোক। তবুও আমর ইবনুল আস তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন।
পরদিন আমর ইবনুল আস বাদশাহর দরবারে গিয়ে বললেন, হে বাদশাহ, ওরা ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে এক অদ্ভুত কথা বলে। এ কথা শুনে নাজ্জাশী পুনরায় মুসলমানদের ডেকে পাঠালেন। তিনি হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে মুসলমানদের মতামত জানতে চাইলেন। মুসলমানরা এবার ভয় পেয়ে গেলেন। তবু তারা ভাবলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা, যা হবার হবে, তারা কিন্তু সত্য কথাই বলবেন।
নাজ্জাশীর প্রশ্নের জবাবে হযরত জাফর (রা.) বললেন, আমরা হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে সেই কথাই বলে থাকি, যা আমাদের নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর বান্দা, তাঁর রসূল, তাঁর রূহ এবং তাঁর কালেমা। তাকে আল্লাহ তায়ালা কুমারী সতী সাধ্বী হযরত মরিয়ম (আ.)-এর ওপর ন্যস্ত করেছেন।'
এ কথা শুনে নাজ্জাশী মাটি থেকে একটি কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে বললেন, খোদার কসম, তোমরা যা কিছু বলেছ, হযরত ঈসা (আ.) এই কাঠের টুকরোর চাইতে বেশী কিছুই ছিলেন না। এ কথা শুনে ধর্মীয় উপদেষ্টাগণ হুঁ হুঁ শব্দ উচ্চারণ করে বিরক্তি প্রকাশ করলেন। বাদশাহ বললেন, তোমরা হুঁ হুঁ বললেও আমি যা বলেছি, একথাই সত্য।
এরপর নাজ্জাশী মুসলমানদের বললেন, যাও, তোমরা আমার দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ। যারা তোমাদের গালি দেবে, তাদের ওপর জরিমানা ধার্য করা হবে। আমি চাই না কেউ তোমাদের কষ্ট দিক, আর তার পরিবর্তে আমি সোনার পাহাড় লাভ করি।
এরপর নাজ্জাশী তার ভৃত্যদের বললেন, মক্কা থেকে আগত প্রতিনিধিদের আনীত উপঢৌকন তাদের ফিরিয়ে দাও, ওগুলোর কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহর শপথ, তিনি যখন আমাকে আমার দেশ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তখন আমার কাছ থেকে কোন ঘুষ নেননি। আমি কেন তাঁর পথে ঘুষ নেব। এছাড়া তিনি অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা আমার ব্যাপারে অন্য লোকদের কথা গ্রহণ করেননি। আমি কেন আল্লাহর ব্যাপারে অন্য লোকদের কথা মানবো?
এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হযরত উম্মে সালমা (রা.) বলেন, কোরায়শদের উভয় প্রতিনিধি এরপর তাদের আনীত উপঢৌকনসহ অসম্মানজনকভাবে দেশে ফিরে এলো। আমরা নাজ্জাশীর দেশে একজন ভালো প্রতিবেশীর ছত্রছায়ায় অবস্থান করতে লাগলাম।

টিকাঃ
৫১. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ ৩৩৪-৩৩৮

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আবু তালেবের প্রতি হুমকি

📄 আবু তালেবের প্রতি হুমকি


এ প্রস্তাবের পর কোরায়শ নেতারা আবু তালেবের কাছে গিয়ে বললেন, হে আবু তালেব, আপনি আমাদের মধ্যে মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। আমরা আপনাকে বলেছিলাম যে, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে ফিরিয়ে রাখুন, কিন্তু আপনি রাখেননি। আপনি মনে রাখবেন, আমাদের পিতা-পিতামহকে গালাগাল দেয়া হবে এটা সহ্য করতে পারব না। আমাদের বুদ্ধি বিবেক বিচার বিবেচনাকে নির্বুদ্ধিতা বলা হবে এবং উপাস্যদের দোষ বের করা হবে, এটাও আমাদের সহ্য হবে না। আপনি তাকে বাধা দিন এবং বিরত থাকুন। যদি এতে ব্যর্থ হন, তবে আপনার এবং আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে এমন লড়াই বাধিয়ে দেবো যে, এতে বহু প্রাণহানি ঘটবে।
এ হুমকিতে আবু তালেব প্রভাবিত হলেন। তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ডেকে বললেন, ভাতিজা, তোমার কওমের লোকেরা আমার কাছে এসে এসব কথা বলে গেছে। কাজেই, তুমি এবার আমার এবং তোমার নিজের প্রতি দয়া করো। তুমি এ বিষয়ে আমার ওপর এমন বোঝা চাপিও না, যা আমি বহন করতে পারবো না।
একথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পারলেন যে, এবার তাঁর চাচাও তাঁকে পরিত্যাগ করবে। তাঁকে সাহায্য করার ব্যাপারে তিনিও দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এ কারণে তিনি বললেন, 'চাচাজান, আল্লাহর শপথ, যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্র এনে দিয়ে কেউ বলে একাজ ছেড়ে দাও, তবুও আমি তা ছাড়তে পারব না। হয়তো এ কাজের পূর্ণতা বিধান করে আমি একে জয়ী করবো অথবা এ কাজ করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যাব।'
একথা বলে আবেগের আতিশয্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেঁদে ফেললেন। এরপর চলে যেতে লাগলেন। চাচা আবু তালেবের মন কেঁদে উঠলো। তিনি ভাতিজাকে ডেকে বললেন, যাও ভাতিজা, তুমি যা চাও, তাই করো। আল্লাহর শপথ, আমি কোন অবস্থায় কখনো তোমাকে ছাড়তে পারবো না।
'খোদার শপথ তোমার কাছে যেতে ওরা, পারবে না তো দলে দলে, যতোদিন না দাফন হবো আমি মাটির তলে। বলতে থাকো তোমার কথা খোলাখুলি, করো না আর কোনো ভয়', দু'চোখ তোমার শীতল হোক আর, খুশী হোক তোমার হৃদয়।

টিকাঃ
৫২. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ২৬৫, ২৬৬
৫৩. মোখতাসারুস্ সীরাত, শেখ মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব নজদী, পৃঃ ৬৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00