📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রতিরোধের প্রথম

📄 সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রতিরোধের প্রথম


কোরায়শরা যখন লক্ষ্য করলো যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাবলীগে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখার কৌশল কাজে আসছে না তখন তারা নতুন করে চিন্তা করলো। দ্বীনের দাওয়াত চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার জন্যে ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলো। সে পন্থা ও পদ্ধতির সারমর্ম নিম্নরূপ,

প্রতিরোধের প্রথম ধরন
এটি ছিলো হাসি-ঠাট্টা, বিদ্রূপ-উপহাস এবং মিথ্যাবাদী বলে তাকে অভিহিত করা। এর উদ্দেশ্য ছিলো মুসলমানদের মনোবল নষ্ট করা। এ লক্ষ্য অর্জন পৌত্তলিকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অহেতুক অপবাদ গালাগাল দিতে শুরু করে। কখনো কখনো তারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাগল বলতো। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওসব কাফেররা বললো, যার ওপর কোরআন নাযিল হয়েছে, নিশ্চয়ই সে একটা পাগল।' (৬-১৫)
কখনো কখনো তাঁর ওপর যাদুকর এবং মিথ্যাবাদী হওয়ার অপবাদ দেয়া হতো। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওরা বিস্ময় বোধ করছে যে, ওদের কাছে ওদেরই মধ্য থেকে একজন সতর্ককারী এলেন এবং কাফেররা বলে, এতো এক যাদুকর, মিথ্যাবাদী।' (৪-৩৮)
কাফেররা আল্লাহর রসূলের সামনে দিয়ে পেছন দিয়ে ক্রুদ্ধভাবে চলাচল করতো এবং রোষ কষায়িত চোখে তাঁর প্রতি তাকাতো। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'কাফেররা যখন কোরআন শ্রবণ করে তখন তারা যেন তাদের তীক্ষ্ণদৃষ্টি দ্বারা তোমাকে আছড়িয়ে ফেলে দেবে এবং বলে, এতো পাগল।' (৫১-৬৮)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোথাও যেতেন এবং তাঁর সামনে পেছনে দুর্বল ও অত্যাচারিত সাহাবায়ে কেরাম থাকতেন, তখন পৌত্তলিকরা ঠাট্টা করে বলতো, 'আল্লাহ কি তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করলেন?' (৫৩, ৬)
'তাদের এ উক্তির জবাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ কি কৃতজ্ঞ লোকদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত নন?' (৫৩, ৬)
কোরআনে আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের অবস্থার চিত্র এভাবে অঙ্কন করেছেন, 'যারা অপরাধী, তারা তো মোমেনদের উপহাস করতো এবং ওরা যখন মোমেনদের কাছ দিয়ে যেতো, তখন চোখ টিপে ইশারা করতো এবং যখন ওদের আপনজনের কাছে ফিরে আসতো, তখন ওরা ফিরতো উৎফুল্ল হয়ে এবং যখন ওদেরকে দেখতো, তখন বলতো, এরা তো পথভ্রষ্ট। এদেরকে তো তাদের তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠানো হয়নি।' (২৯, ৩৩, ৮৩)

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 প্রতিরোধের দ্বিতীয় ধরন ও তৃতীয় ধরন

📄 প্রতিরোধের দ্বিতীয় ধরন ও তৃতীয় ধরন


প্রতিরোধের দ্বিতীয় ধরন
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষাকে বিকৃত করা, সন্দেহ অবিশ্বাস সৃষ্টি করা, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করা, দ্বীনের শিক্ষা এবং প্রচারকারীদের ঘৃণ্য সমালোচনা করা ছিলো তাদের নৈমিত্তিক কাজ। এসব কাজ তারা এতো বেশী করতো যাতে জনসাধারণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করার সুযোগ না পায়। পৌত্তলিকদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআন বলতো, 'ওরা বলেছে, এগুলোতো সে কালের উপকথা, যা সে 'লখিয়ে নিয়েছে, এগুলো সকাল সন্ধ্যা তার কাছে পাঠ করা হয়।' কাফেররা বলে, 'এটা মিথ্যা ব্যতীত কিছুই নয়, সে এটা উদ্ভাবন করেছে এবং ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছে।' পৌত্তলিকরা এ কথাও বলে যে, 'তাকে শিক্ষা দেয় এক মানুষ।' রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর তাদের অভিযোগ ছিলো এই, 'ওরা বলে, এ কেমন রসূল, যে আহার করে এবং হাটে বাজারে চলাফেরা করে।' কোরআন শরীফের বহু জায়গায় পৌত্তলিকদের অভিযোগসমূহ খন্ডন করা হয়েছে, কোথাও কোথাও তাদের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে, কোথাও কোথাও হয়নি।
প্রতিরোধের তৃতীয় ধরন
পূর্ববর্তী লোকদের ঘটনাবলী এবং কাহিনী উল্লেখ করে কোরআন তার অবিশ্বাসীদের মোকাবেলা করেছে। নযির ইবনে হারেসের ঘটনা এই যে, একবার সে কোরায়শদের বললো, হে কোরায়শরা, আল্লাহর শপথ, তোমাদের ওপর এমন আপদ এসে পড়েছে যে, তোমরা এখনো তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার কোন উপায় বের করতে পারোনি। মোহাম্মদ তোমাদের মধ্যে বড় হয়েছেন, তোমাদের সবচেয়ে পছন্দনীয় মানুষ ছিলেন, সবার চেয়ে বেশী সত্যবাদী এবং সবচেয়ে বড় আমানতদারও ছিলেন। আজ তাঁর কানের কাছে চুল যখন সাদা হয়েছে, তখন তিনি তোমাদের কাছে কিছু কথা নিয়ে এসেছেন। অথচ তোমরা বলছো, তিনি যাদুকর। আল্লাহর শপথ, তিনি যাদুকর নন। আমি যাদুকর দেখেছি এবং তাদের যাদুটোনাও দেখেছি। তোমরা বলছো যে, তিনি জ্যোতিষী, না তিনি জ্যোতিষীও নন। আমি জ্যোতিষীও দেখেছি। তাদের উল্টাপাল্টা কথাও শুনেছি। তোমরা বলছো, তিনি কবি, আল্লাহর শপথ, তিনি কবিও নন। আমি কবিদের দেখেছি এবং তাদের কবিতা শুনেছি। তোমরা বলছো, তিনি পাগল, না, আল্লাহর শপথ, তিনি পাগলও নন। আমি পাগল দেখেছি, পাগলের পাগলামিও দেখেছি। তাঁর মধ্যে পাগলামির কোন প্রকার চিহ্ন নেই। কোরায়শদের লোকেরা, তোমরা গভীরভাবে চিন্তা করো, তোমাদের ওপর বিরাট আপদ এসে পড়েছে।'

টিকাঃ
১০. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৯৯, ৩০০, ৩৫৮, মুখতাছুহু ছিয়ার, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১১৭, ১১৮
১১. ফাতহুল কাদির, ৪র্থ খন্ড, পৃ. ২৩৬

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 প্রতিরোধের চতুর্থ ধরন

📄 প্রতিরোধের চতুর্থ ধরন


কোরায়শরা একপর্যায়ে এ রকম চেষ্টা করেছিলো যে, ইসলাম এবং জাহেলিয়াতের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা করবে। অর্থাৎ পরস্পর পরস্পরকে কিছু ছাড় দেবে। আল্লাহুর রসূল পৌত্তলিকদের কিছু গ্রহণ করবেন এবং পৌত্তলিকরা ও আল্লাহর রসূলের কিছু আদর্শ গ্রহণ করবে। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে এ সম্পর্কে বলেন, 'ওরা চায় যে, আপনি নমনীয় হবেন, তাহলে তারাও নমনীয় হবে।' ইবনে জরীর এবং তিবরানির একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, পৌত্তলিকরা আল্লাহর রসূলের কাছে এ মর্মে প্রস্তাব দিল যে, এক বছর আপনি আমাদের উপাস্যদের উপাসনা করুন, আর এক বছর আমরা আপনার প্রভুর উপাসনা করবো। আবদ ইবনে হোমায়েদের একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, পৌত্তলিকরা বললো, আপনি যদি আমাদের উপাস্যদের মেনে নেন, তবে আমরাও আপনার খোদার এবাদাত করবো।
ইবনে ইসহাক বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবাঘরের তওয়াফ করছিলেন। এমন সময় আসওয়াদ ইবনে মোত্তালেব ইবনে আসাদ ইবনে আবদুল ওযযা, ওলীদ ইবনে মুগীরা, উমাইয়া ইবনে খালফ ও আসা ইবনে ওয়ায়েল ছাহমি তাঁর কাছে এলো। এরা ছিলো নিজ নিজ গোত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তি। এরা বললো, এসো মোহাম্মদ, তুমি যার পূজা করছো, আমরা তার পূজা করবো। আর আমরা যাকে পূজা করছি, তুমিও তাকে পূজা করবে। এতে আমরা উভয়ে সমপর্যায়ে উন্নীত হবো। যদি তোমার মাবুদ আমাদের মাবুদের চেয়ে ভালো হন তবে আমরা তার কাছ থেকে কল্যাণ লাভ করবো আর যদি আমাদের মাবুদ তোমার মাবুদের চেয়ে ভালো হন তবে তোমরা তার কাছ থেকে কল্যাণ লাভ করবে। তাদের এ হাস্যকর কথার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা 'সূরা কাফেরুন' নাযিল করেন। এতে ঘোষণা করা হয় যে, 'তোমরা যাদের উপাসনা করো, আমি তাদের উপাসনা করতে পারি না। 'এ সিদ্ধান্তমূলক জবাবের মাধ্যমে পৌত্তলিকদের হাস্যকর বক্তব্যের মূলোৎপাটন করা হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনার সম্ভাব্য কারণ এই যে, এ ধরনের চেষ্টা সম্ভবত বারবার করা হয়েছে।

টিকাঃ
১২. ফাতহুল কাদির, শাওকানি রচিত, ৫ম খন্ড, পৃ. ৫০৮
১৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৩৬২

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 যুলুম নির্যাতন

📄 যুলুম নির্যাতন


নবুয়তের চতুর্থ বছরে ইসলামের প্রকাশ্য দাওয়াত বন্ধ করতে পৌত্তলিকরা যেসব কাজ করেছে তার বিবরণ ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব অপতৎপরতা পৌত্তলিকরা পর্যায়ক্রমে এবং ধীরে ধীরে চালিয়েছে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস অতিরিক্ত কিছু করেনি এবং যুলুম অত্যাচারের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িও করেনি। কিন্তু তারা যখন লক্ষ্য করলো যে, তাদের তৎপরতা ইসলামের দাওয়াতের পথে বাধা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হচ্ছে তখন তারা পুনরায় সমবেত হয়ে পঁচিশজন কাফেরের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করলো। এরা ছিলো কোরায়শ বংশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। এ কমিটির প্রধান ছিলো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা। পারস্পরিক পরামর্শ এবং চিন্তা-ভাবনার পর কমিটি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবাদের বিরুদ্ধে একটি সিদ্ধান্তমূলক প্রস্তাব অনুমোদন করলো। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, ইসলামের বিরোধিতা করতে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়া এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের নির্যাতন করার ব্যাপারে কোন প্রকার শিথিলতার পরিচয় দেয়া হবে না :
পৌত্তলিকরা এ প্রস্তাব গ্রহণ করার পর সর্বাত্মকভাবে তা বাস্তবায়নের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করলো। মুসলমান বিশেষত দুর্বল মুসলমানদের ক্ষেত্রে পৌত্তলিকদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ ছিলো। কিন্তু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষেত্রে ছিলো কঠিন। কেননা তিনি ছিলেন অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী এক অসাধারণ মানুষ। সবাই তাকে সম্মানের চোখে দেখতো। তাঁর কাছে সম্মানজনকভাবেই যাওয়া সহজ এবং স্বাভাবিক ছিলো। তাঁর বিরুদ্ধে অবমাননাকর এবং ঘৃণ্য তৎপরতা বর্বর এবং নির্বোধদের জন্যেই ছিলো মানানসই। ব্যক্তিত্বের এ স্বাতন্ত্র্য এবং প্রখরতা ছাড়া আবু তালেবের সাহায্যও তিনি পাচ্ছিলেন। মক্কায় আবু তালেবের প্রভাব ছিলো অনতিক্রম্য। ব্যক্তিগত বা সম্মিলিতভাবে এ প্রভাব অতিক্রম করা এবং তাঁর সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করার সাহস কারো ছিলো না। এ পরিস্থিতিতে কোরায়শরা নিদারুণ মর্মপীড়ার মধ্যে দিন যাপন করছিলো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে দ্বীনের প্রচার প্রসার তাদের ধর্মীয় আধিপত্য এবং পার্থিব নেতৃত্ব কর্তৃত্বের শেকড় কেটে দিচ্ছিলো, সে দ্বীনের ব্যাপারে আর কতোকাল তারা ধৈর্যধারণ করবে? পরিশেষে পৌত্তলিকরা আবু লাহাবের নেতৃত্বে নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালাতে শুরু করলো। প্রকৃতপক্ষে প্রিয় নবীর সাথে আবু লাহাবের শত্রুতামূলক আচরণ আগে থেকেই ছিলো। কোরায়শরা আল্লাহর রসূলের ওপর নির্যাতনের কথা চিন্তা করারও আগে আবু লাহাব চিন্তা করেছিলো। বনি হাশেমের মজলিস এবং সাফা পাহাড়ের পাদদেশে এই দুর্বৃত্ত যা বলেছিলো, ইতিপূর্বে সেসব কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, সাফা পাহাড়ের পাদদেশে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার পর নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মারার জন্যে আবু লাহাব একটি পাথরও তুলেছিলো।
রসূলের নবুয়ত পাওয়ার আগে আবু লাহাব তার দুই পুত্র ওতবা এবং ওতাইবাকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুই কন্যা রোকাইয়া এবং উম্মে কুলসুমের সাথে বিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত পাওয়ার পর এবং দ্বীনের দাওয়াত প্রচারের শুরুতে আবু লাহাব নবীর দুই কন্যাকেই তালাক দিতে তার দুই পুত্রকে বাধ্য •করেছিলো।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বিতীয় পুত্র আবদুল্লাহর ইন্তেকালের পর আবু লাহাব এতো খুশী হয়েছিলো যে, তার বন্ধুদের কাছে দৌড়ে গিয়ে গদগদ করে বলেছিলো যে, মোহাম্মদ অপুত্রক হয়ে গেছে।
ইতিপূর্বে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, হজ্জ মৌসুমে আবু লাহাব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করতে বাজার এবং বিভিন্ন জনসমাবেশে তাঁর পেছনে লেগে থাকতো। তারেক ইবনে আবদুল্লাহ মুহাবেরীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, আবু লাহাব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা মিথ্যা প্রমাণ করতেই শুধু ব্যস্ত থাকত না বরং তাঁকে পাথরও নিক্ষেপ করতো। এতে তাঁর পায়ের গোড়ালি রক্তাক্ত হয়ে যেতো।
আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলের প্রকৃত নাম ছিলো আবওয়া। সে ছিলো হারব ইবনে উমাইয়ার কন্যা এবং আবু সুফিয়ানের বোন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্রে সে তার স্বামীর চেয়ে কোন অংশে কম ছিলো না। নবী (সঃ) যে পথে চলাফেরা করতেন, ঐ পথে এবং তাঁর দরজায় সে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো। অত্যন্ত অশ্লীল ভাষী এবং ঝগড়াটে ছিলো এ নোংরা মহিলা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালাগাল দেয়া এবং কুটনামি, নানা ছুতোয় ঝগড়া, ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করা ছিলো তার কাজ। এ কারণে কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 'এবং তার স্ত্রীও সে ইন্ধন বহন করে।'
আবু লাহাবের স্ত্রী যখন জানতে পারলো যে, তার এবং তার স্বামীর নিন্দা করে আয়াত নাযিল হয়েছে, তখন সে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খুঁজে খুঁজে কাবা শরীফের কাছে এলো। প্রিয় নবী সে সময় কাবাঘরের পাশে অবস্থান করছিলেন। তাঁর সাথে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-ও ছিলেন। আবু লাহাবের স্ত্রীর হাতে ছিলো এক মুঠি পাথর। আল্লাহর রসূলের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছুলে আল্লাহ তায়ালা তার দৃষ্টি কেড়ে নেন, সে আল্লাহর রসূলকে দেখতে পায়নি, হযরত আবু বকরকে দেখতে পাচ্ছিলো। হযরত আবু বকরের সামনে গিয়ে সে জিজ্ঞাসা করলো যে, তোমার সাথী কোথায়? আমি শুনেছি তিনি আমার নামে নিন্দা করছেন। আল্লাহর শপথ, যদি আমি তাকে পেয়ে যাই তবে তার মুখে এ পাথর ছুঁড়ে মারব। দেখো আল্লাহর শপথ, আমিও একজন কৰি। এরপর সে এ কবিতা শোনালো, 'মোযাম্মাম আছাইনা ওয়া আমরাহু আবাইনা ওয়া দ্বীনাহু কালাইনা'। অর্থাৎ মোযাম্মামের অবাধ্যতা করেছি, তার কাজকে সমর্থন করিনি এবং তার দ্বীনকে ঘৃণা ও অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি। এরপর সে চলে গেলো।
আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রসূল সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি? তিনি বললেন, না দেখতে পায়নি, আল্লাহ তায়ালা আমার ব্যাপারে তার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন।
আবু বকর রাযযারও এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি এটুকু সংযোজন করেছেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রী হযরত আবু বকরের সামনে গিয়ে একথাও বলেছিলো যে, আবু বকর, আপনার সঙ্গী আমার নিন্দা করেছেন। আবু বকর বললেন, একথা ঠিক নয়। এই ঘরের প্রভুর শপথ, তিনি কবিতা রচনা করেন না এবং কবিতা মুখেও উচ্চারণ করেন না। আবু লাহাবের স্ত্রী বললো, আপনি ঠিকই বলেছেন।
আবু লাহাব ছিলো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিবেশী এবং চাচা। তাঁর ঘর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরের কাছাকাছি ছিলো। অন্য প্রতিবেশীরাও রসূল 'সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দিতো।
ইবনে ইসহাক বলেন, যেসব লোক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘরের মধ্যে কষ্ট দিতো তাদের নাম হলো আবু লাহাব, হাকাম ইবনে আবুল আস ইবনে উমাইয়া, ওকবা ইবনে আবু মুঈত, আদী ইবনে হামরা, হাকাফি ইবনুল আছদা হুজালি প্রমুখ। এরা সবাই ছিলো তার প্রতিবেশী।
এদের মধ্যে হাকাম ইবনে আবুল আস ব্যতীত অন্য কেউ মুসলমান হয়নি। এদের কষ্ট দেয়ার পদ্ধতি ছিলো এ রকম যে, যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায আদায় করতেন তখন এদের কেউ বকরির নাড়িভুড়ি এমনভাবে ছুঁড়ে মারতো যে সেসব গিয়ে তাঁর গায়ে পড়তো। আবার উনুনের ওপর হাঁড়ি চাপানো হলে বকরির নাড়ি ভুড়ি এমনভাবে নিক্ষেপ করতো যে, সেগুলো গিয়ে সেই হাঁড়িতে পড়তো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরে নিরাপদে নামায আদায়ের জন্যে ঘরের ভেতর একটি জায়গা করে নিয়েছিলেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর এসব নাড়িভুড়ি নিক্ষেপের পর তিনি সেগুলো একটি কাঠির মাথায় নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে বলতেন, 'হে বনি আবদে মান্নাফ, এটা কেমন ধরনের প্রতিবেশী সুলভ ব্যবহার? এরপর সেসব নাড়িভুড়ি ফেলে দিতেন। '
ওকবা ইবনে আবু মুঈত ছিলো জঘন্য দুর্বৃত্ত ও দুষ্কৃতিতে ওস্তাদ। সহীহ বোখারীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবাঘরের পাশে নামায আদায় করছিলেন। আবু জেহেল এবং তার কয়েকজন বন্ধু সেখানে বসেছিলো। এমন সময় একজন অন্যজনকে বললো, কে আছো অমুকের উটের নাড়িভুড়ি এনে মোহাম্মদ যখন সেজদায় যাবে, তখন তার পিঠে চাপিয়ে দিতে পারবে? এরপর ওকবা ইবনে আবু মুঈত। উটের নাড়িভুড়ি এনে অপেক্ষা করতে লাগলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেজদায় যাওয়ার পর সেই নাড়িভুড়ি তাঁর উভয় কাঁধের দু'দিকে ঝুলিয়ে দিল। আমি সব কিছু দেখছিলাম, কিন্তু কিছু বলতে পারছিলাম না। কি যে ভালো হতো হায় যদি আমার মধ্যে তাঁকে রক্ষা করার শক্তি থাকতো।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, এরপর দুর্বৃত্তরা হাসতে হাসতে একজন অন্যজনের গায়ে ঢলে পড়ছিলো। এদিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেজদায় পড়ে রইলেন, মাথা তুললেন না। হযরত ফাতেমা (রা.) খবর পেয়ে ছুটে এসে নাড়িভুড়ি সরিয়ে ফেললেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেজদা থেকে মাথা তুললেন। এরপর তিনবার বললেন, 'আল্লাহুমা আলাইকা বে-কোরাইশ'। অর্থাৎ হে আল্লাহ তায়ালা, কোরায়শদের দায়িত্ব তোমার ওপর। এই বদদোয়া শুনে তারা নাখোশ হলো। কেননা তারা একথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতো যে, এই শহরে তার দোয়া কবুল হয়ে থাকে। এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাম ধরে ধরে বদদোয়া করলেন, হে আল্লাহ, আবু জেহেলকে পাকড়াও করো। ওতবা ইবনে রবিয়া, শায়বা ইবনে রাবিয়া, ওলীদ ইবনে ওতবা, উমাইয়া ইবনে খালফ এবং ওকবা ইবনে আবু মুঈতকেও পাকড়াও করো।'
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্ভবত আরো কয়েকজনের নাম বলেছিলেন। কিন্তু বর্ণনাকারী সেই নাম ভুলে গেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব কাফেরের নাম উচ্চারণ করে বদদোয়া করেছিলেন, আমি দেখেছি বদরের কূয়োয় তাদের সবার লাশ পড়ে আছে।
উমাইয়া ইবনে খালফ-এর অভ্যাস ছিলো যে, সে যখনই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতো তখনই নানা কটূক্তি করতো এবং অভিশাপ দিতো। আল্লাহ তayালা তার সম্পর্কে এই আয়াত নাযিল করেন, 'ওয়ায়লুল লেকুল্লি হুমাযাতিল লুমাযাহ। অর্থাৎ দুর্ভোগ প্রত্যেক্যের জন্যে, যে পেছনে ও সামনে লোকের নিন্দা করে। ইবনে হিশাম বলেন, 'হুমাযা' সেই ব্যক্তিকে বলা হয়, যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে গালাগাল দেয় এবং চোখ বাঁকা করে ইশারা করে। 'লুমাযা' সেই ব্যক্তিকে বলা হয়, যে পশ্চাতে মানুষের নিন্দা করে এবং কষ্ট দেয়।
উমাইয়ার ভাই উবাই ইবনে খালফ ছিলো ওকবা ইবনে আবু মুঈতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওকবা একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বসে ইসলামের কিছু কথা শুনেছিলো। উবাই একথা শুনে ওকবাকে সমালোচনা করলো এবং নির্দেশ দিলো যে, যাও, তুমি গিয়ে মোহাম্মদের মুখে থুথু দিয়ে এসো। ওকবা তাই করলো। উবাই ইবনে খালফ একবার একটি পুরনো হাড় গুঁড়ো করলো। এরপর সেই গুঁড়ো বাতাসে ফুঁ দিয়ে দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি উড়িয়ে দিল।
আখলাস ইবনে শোরাইক ছাকাফিও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়ার কাজে উৎসাহী ছিলো। কোরআনে করিমে তার নয়টি বদঅভ্যাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেই তার কর্মতৎপরতা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'এবং অনুসরণ করো না তার, যে কথায় কথায় শপথ করে, পশ্চাতে নিন্দাকারী, একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়, কল্যাণের কাজে বাধা প্রদান করে, সীমা লংঘনকারী, পাপিষ্ঠ, রূঢ়স্বভাব এবং তদুপরি কুখ্যাত।' (১০-১৩, ৬৮)
আবু জেহেল কখনো কখনো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে কোরআন শুনতো, কিন্তু শোনা পর্যন্তই। সে ঈমানও আনতো না ইসলামের শিক্ষাও গ্রহণ করতো না এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি আনুগত্যের পরিচয়ও দিতো না। বরং সে নিজের কথা দ্বারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দিতো এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করতো। এরপর নিজের এ কাজের জন্যে গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে নিতো। মনে হতো যে, বড় ধরনের কোন কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে ফেলেছে। পবিত্র কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ আল্লাহ তায়ালা তার সম্পর্কে নাযিল করেছেন। আল্লাহ বলেন, 'যে বিশ্বাস করেনি এবং নামায আদায় করেনি, বরং যে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিলো এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। এরপর সে তার পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে গিয়েছিলো দম্ভ ভরে। দুর্ভোগ, তোমার জন্যে দুর্ভোগ। (৩১-৩৫, ৭৫)
আবু জেহেল প্রথম দিনেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নামায আদায় করতে দেখে তাঁকে নামায থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। একবার নবী (সঃ) মাকামে ইবরাহীমের কাছে নামায আদায় করছিলেন। আবু জেহেল সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলো। সে বললো, মোহাম্মদ, আমি কি তোমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করিনি? সাথে সাথে সে হুমকিও দিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও হুমকি দিয়ে জবাব দিলেন। এরপর আবু জেহেল বললো, মোহাম্মদ, আমাকে কেন ধমক দিচ্ছো? দেখো এই মক্কায় আমার মজলিস হচ্ছে সবচেয়ে বড়। আবু জেহেলের এর উদ্ধত কথায় আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করেন, 'আচ্ছা সে যেন মজলিসকে ডাকে। আমিও শাস্তি দেয়ার ফেরেশতাদের ডাক দিচ্ছি।'
এক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু জেহেলের চাদর গলার কাছে ধরে বললেন, 'দুর্ভোগ, তোমার জন্যে দুর্ভোগ। আবার দুর্ভোগ, তোমার জন্যে দুর্ভোগ। 'একথা শুনে আল্লাহর দুশমন আবু জেহেলে বললো, হে মোহাম্মদ, আমাকে হুমকি দিচ্ছো? খোদার কসম, তুমি এবং তোমার পরওয়ারদেগার আমার কিছুই করতে পারবে না। মক্কার উভয় পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বেশী সম্মানিত মানুষ।
পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হুমকি সত্তেও আবু জেহেল তার নির্বুদ্ধিতামূলক আচরণ থেকে বিরত থাকেনি। বরং তার দুষ্কৃতি আরো বেড়ে গিয়েছিলো। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, কোরায়শ সর্দারদের কাছে একদিন আবু জেহেল বললো, মোহাম্মদ আপনাদের সামনে নিজের চেহারা ধুলায় লাগিয়ে রাখে কি? কোরায়শ সর্দাররা বললো, হাঁ। আবু জেহেল বললো, লাত এবং ওযযার শপথ, আমি যদি তাকে এ অবস্থায় দেখি, তবে তার ঘাড় ভেঙ্গে দেবো, তার চেহারা মাটিতে হেঁচড়াবো। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নামায আদায় করতে দেখে তাঁর ঘাড় মটকে দেয়ার জন্যে সে অগ্রসর হলো। কিন্তু সবাই দেখলো যে, আবু জেহেল চিৎকাত হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে এবং চিৎকার করে বলছে, বাঁচাও, বাঁচাও। পরিচিত লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো, আবুল হাকাম, তোমার কি হয়েছে? আবু জেহেল বললো, আমি দেখলাম যে, আমার এবং মোহাম্মদের মাঝখানে আগুনের একটি পরিখা। ভয়াবহ সে আগুনের পরিখায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা শুনে বললেন, 'যদি সে আমার কাছে আসতো, তবে ফেরেশতা তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ছিড়ে ফেলতো। '
একদিকে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এ ধরনের যুলুম অত্যাচারমূলক ব্যবহার করা হচ্ছিলো অন্যদিকে তাঁর প্রতি মক্কার যে সাধারণ মানুষের গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা ছিলো, তারা তাঁকে তাঁর মহান ব্যক্তিত্বের কারণে অসাধারণ মর্যাদা ও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতো। উপরন্তু তাঁর চাচা আবু তালেবের সমর্থন ও সহায়তা তাঁর প্রতি ছিলো। তা সত্তেও তাঁর প্রতি এসব অত্যাচার করা হচ্ছিলো। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণকারী মুসলমানদের প্রতি, বিশেষত দুর্বল মুসলমানদের প্রতি পৌত্তলিকদের অত্যাচার নির্যাতন ছিলো আরো ভয়াবহ। প্রত্যেক গোত্র তাদের গোত্রের ইসলাম গ্রহণকারীদের শাস্তি দিচ্ছিলো। যারা মক্কার গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলো না তাদের ওপর উচ্ছৃঙ্খল এবং নেতৃস্থানীয় লোকেরা নানাপ্রকার অত্যাচার নির্যাতন চালাতো। সেসব অত্যাচারের বিবরণ শুনলে শক্ত মনের মানুষও অস্থির হয়ে উঠতো।
কোন সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত মানুষের ইসলাম গ্রহণের কথা শুনলে আবু জেহেল তাকে গালমন্দ ও অপমান করতো। এছাড়া সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও ক্ষতিগ্রস্ত করার হুমকি দিতো। কোন দুর্বল মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে ধরে প্রহার করতো এবং অন্যদেরও প্রহার করতে অন্যদের উৎসাহিত করতো।
হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর চাচা তাঁকে খেজুরের চাটাইয়ের মধ্যে জড়িয়ে ধুয়ো দিতো।
হযরত মসয়াব ইবনে ওমায়ের (রা.)-এর মা তাঁর ইসলাম গ্রহণের খবর শোনার পর পুত্রের পানাহার বন্ধ করে দেয় এবং তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। হযরত মসয়াব ছোট বেলা থেকে স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে আরাম-আয়েশে জীবন কাটিয়েছিলেন। পরিস্থিতির কারণে তিনি এমন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন যে, তাঁর গায়ের চামড়া খোলস ছাড়ানো সাপের গায়ের মতো হয়ে গিয়েছিলো।
হযরত বেলাল (রা.) ছিলেন উমাইয়া ইবনে খালফের ক্রীতদাস। ইসলাম গ্রহণের পর উমাইয়া হযরত বেলাল (রা.)-কে গলায় দড়ি বেঁধে উচ্ছৃঙ্খল বালকদের হাতে তুলে দিত। বালকেরা তাঁকে মক্কার বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতো। এ রকম করায় তাঁর গলায় দড়ির দাগ পড়ে যেতো। উমাইয়া নিজেও তাকে বেঁধে নির্মম প্রহারে জর্জরিত করতো। এরপর উত্তপ্ত বালির ওপর জোর করে শুইয়ে রাখতো। এ সময়ে তাকে অনাহারে রাখা হতো, পানাহার কিছুই দেয়া হতো না। কখনো কখনো দুপুরের রোদে মরু বালুকার ওপর শুইয়ে বুকের ওপর ভারি পাথর চাপা দিয়ে রাখতো। এ সময় বলতো, তোমার মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত এভাবে ফেলে রাখা হবে। তবে বাঁচতে চাইলে মোহাম্মদের পথ ছাড়ো। কিন্তু তিনি এমনি কষ্টকর অবস্থাতেও বলতেন 'আহাদ, আহাদ'। তার ওপর নির্যাতন চলতে দেখে হযরত আবু বকর (রা.) একদিন খুবই ব্যথিত হলেন। তিনি হযরত বেলাল (রা.)-কে একটি কালো ক্রীতদাসের পরিবর্তে মতান্তরে দুশো দেরহামের পরিবর্তে ক্রয় করে মুক্তি দেন।
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা.) ছিলেন বনু মাখযুমের ক্রীতদাস। তিনি এবং তার পিতামাতা ইসলাম গ্রহণের পর তাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন শুরু করা হলো। আবু জেহেলের নেতৃত্বে পৌত্তলিকরা তাঁদেরকে উত্তপ্ত রোদে বালুকাময় প্রান্তরে শুইয়ে কষ্ট দিতো। একবার তাদের এভাবে শাস্তি দেয়া হচ্ছিলো। এমন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, 'হে ইয়াসের পরিবার, ধৈর্যধারণ করো, তোমাদের ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত।'
অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে হযরত ইয়াসের (রা.) ইন্তেকাল করেন। তাঁর স্ত্রী হযরত আম্মারের মা হযরত ছুমাইয়া (রা.)-এর লজ্জাস্থানে দূর্বৃত্ত আবু জেহেল বর্শা নিক্ষেপ করে। এতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। হযরত আম্মারের ওপর এখনো অব্যাহতভাবে অত্যাচার চালানো হচ্ছিলো। তাঁকে কখনো উত্তপ্ত বালুকার ওপর শুইয়ে রাখা হতো, কখনো বুকের ওপর ভারি পাথর চাপা দেয়া হতো, কখনো পানিতে চেপে ধরা হতো। পৌত্তলিকরা তাকে বলতো যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি মোহাম্মদকে গালি না দেবে এবং লাত ওযযা সম্পর্কে প্রশংসনীয় কথা না বলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তোমাকে ছাড়তে পারব না। হযরত আম্মার (রা.) বাধ্য হয়ে তাদের কথা মেনে নেন। এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কাঁদতে কাঁদতে হাযির হন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তখন পবিত্র কোরআনের এই আয়াত নাযিল করেন, 'কেউ তার ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফরীর জন্যে হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার ওপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তার জন্যে আছে সহজ শাস্তি কিন্তু তার জন্যে নয়, যাকে কুফরীর জন্যে বাধ্য করা হয়। কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচলিত থাকে। '
হযরত খাব্বাব ইবনে আরত (রা.) খোজায়া গোত্রের উম্মে আনসার নামে এক মহিলার ক্রীতদাস ছিলেন। পৌত্তলিকরা তাঁর ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালাতো। তাকে মাটির ওপর টানতো। তাঁর মাথার চুল ধরে টানতো এবং ঘাড় মটকে দিতো। কয়েকবার জ্বলন্ত কয়লার ওপরে তাঁকে শুইয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিলো যাতে, তিনি উঠতে না পারেন।
যিন্নীরাহ নাহদিয়া এবং তাদের কন্যা এবং উম্মে উবাইস ছিলেন ক্রীতদাসী। এরা ইসলাম গ্রহণ করে পৌত্তলিকদের হাতে কঠোর শাস্তি ভোগ করেন। শাস্তির কিছু দৃষ্টান্ত ওপরে তুলে ধরা হয়েছে। বনু আদী গোত্রের একটি পরিবার বনু মোযাম্মেলের একজন দাসী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি সেই দাসীকে অস্বাভাবিক প্রহার করে বিরতি দিয়ে বলতেন, তোমার প্রতি দয়ার কারণে নয় বরং নিজে ক্লান্ত হয়েই ছেড়ে দিলাম।
পরিশেষে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) হযরত বেলাল এবং আমের ইবনে ফোহায়রার মতোই এসব দাসীকেও ক্রয় করে মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
পৌত্তলিকরা বীভৎস উপায়েও ইসলাম গ্রহণকারীদের শাস্তি দিতো। তারা কোন কোন সাহাবাকে উট এবং গাভীর কাঁচা চামড়ার ভেতর জড়িয়ে বেঁধে রোদে ফেলে রাখতো। কাউকে লোহার বর্ম পরিয়ে তপ্ত পাথরের ওপর শুইয়ে রাখতো। কারো ইসলাম গ্রহণের খবর পেলে দুর্বৃত্ত পৌত্তলিকরা নানা উপায়ে তার ওপর অত্যাচার এবং নির্যাতন চালাতো। মোটকথা আল্লাহর মনোনীত দ্বীন গ্রহণকারীদের ওপর যে সব নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতন করা হয়েছিলো তার তালিকা খুবই দীর্ঘ এবং বড়োই বেদনাদায়ক।

টিকাঃ
১৪. রহমতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৯-৬০
১৫. তিরমিযি
১৬. তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন, সাইয়েদ কুতুব শহীদ ৩য় খন্ড, পৃ. ২৮২ তাফসীর তাফহীমুল কোরআন, মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী ষষ্ঠ খন্ড, ৫২২ (উর্দু সংস্করণ)
১৭. তাফসীর তাফহীমুল কোরআন, ষষ্ঠ খন্ড, পৃ. ৪৯০ (উর্দু সংস্করণ)
১৮. জামে তিরমিযি
১৯. পৌত্তলিকরা নবী করিম (স.)-কে মোহাম্মদ না বলে 'মোযাম্মাম' বলতো। মোহাম্মদ অর্থ প্রশংসিত। অথচ মোযাম্মাম শব্দের অর্থ এর বিপরীত। অর্থাৎ নিন্দিত।
২০. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৩৩৫-৩৩৬
২১. তিনি ছিলেন উমাইয়া খলিফা মারওয়ান ইবনে হাকামের পিতা।
২২. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪১৬
২৩. বোখারী শরীফের অন্য এক বর্ণনায় এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪৩ দেখুন,
২৪. সহীহ বোখারী কিতাবুল ওযু ১ম খন্ড, পৃ. ৩৭
২৫. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৩৫৬, ৩৫৭
২৬. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৩৬১-৩৬২
২৭. তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন, ২৯ খন্ড
২৮. তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন, সাইয়েদ কুতুব শহীদ, পারা ৩০, পৃ. ২০৮
২৯. ঐ
৩০. সহীহ মুসলিম
৩১. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৩২০
৩২. রহমাতুল লিল আলামীন ১ম খন্ড, পৃ. ৫৭
৩৩. ঐ পৃ. ৫৮
৩৪. রহমতুল লিল আলামীন ১ম খন্ড, পৃ. ৫৭, তালাকিহে ফুহুম, ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ৩১৮
৩৫. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ৩২০, ফেকহুছ সীরাত, মোহাম্মদ গাযযালি, পৃ. ৮২। আওফি হযরত ইবনে আব্বাস থেকে এর কিছু অংশ বর্ণনা করেছেন। দেখুন তাফসীরে ইবনে কাসির।
৩৬. রহমাতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৭, এ'জাযুত তানযিল পৃ. ৫৩
৩৭. ঐ ১ম খন্ড, পৃ. ৫৭, তালকিহুল ফহুম পৃ. ৬০
৩৮. যিন্নিরাহ মিসকিনার ওবনে অর্থাৎ ওই শব্দের মতোই হবে এ শব্দের উচ্চারণ।
৩৯. রহমাতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৭, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ ৩১৯
৪০. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৩১৮-৩১৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00