📄 দাওয়াতের প্রকাশ্য ঘোষণা
এই আওয়াযের স্পন্দন তখনো মক্কার আশে পাশে শোনা যাচ্ছিলো, এমন সময় আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করেন, 'তোমাকে যে আদেশ দেয়া হয়েছে, সেটা খোলাখুলি তুমি ঘোষণা করো এবং মোশরেকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।' (১৫, ৯৪)
এরপর রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৌত্তলিকতার নোংরামি ও অকল্যাণসমূহ প্রকাশ্যে তুলে ধরে মিথ্যার পর্দা উন্মোচিত করেন। তিনি মূর্তিসমূহের অন্তসারশূন্যতা ও মূল্যহীনতা তুলে ধরে তাদের স্বরূপও উদঘাটন করেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে দিয়ে বোঝাতে থাকেন যে, মূর্তিসমূহ নিরর্থক এবং শক্তিহীন। তিনি আরো জানান যে, যারা এসব মূর্তিপূজা করে এবং নিজের ও আল্লাহর মধ্যে এদেরকে মাধ্যম হিসাবে স্থির করে, তারা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে রয়েছে।
পৌত্তলিক এবং মূর্তির উপাসকদের পথভ্রষ্ট বলা হয়েছে একথা শোনার পর মক্কার অধিবাসীরা ক্রোধে দিশেহারা হয়ে পড়লো। তাদের ওপর যেন বজ্রপাত হলো, তাদের নিরুদ্বেগ শান্তিপূর্ণ জীবনে যেন ঝড়ের তান্ডব দেখতে পেলো। এ কারণেই কোরায়শরা অকস্মাৎ উৎসারিত এ বিপ্লবের শেকড় উৎপাটনের জন্যে উঠে দাঁড়ালো। কেননা এ বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পৌত্তলিক রুসম রেওয়াজ নির্মূল হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কোরায়শরা কোমর বেঁধে উঠে দাঁড়ালো। কারণ তারা জানতো যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য সকলকে মাবুদ হিসাবে অস্বীকার করা এবং রেসালাত ও আখেরাতের ওপর বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হচ্ছে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে রেসালাতের হাতে ন্যস্ত এবং তার কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করা। এতে করে অন্যদের তো প্রশ্নই আসে না, নিজের জানমাল সম্পর্কে পর্যন্ত নিজের কোন স্বাধীন অধিকার থাকে না। এর অর্থ হচ্ছে যে, আরবের লোকদের ওপর মক্কার লোকদের ধর্মীয় ক্ষেত্রে যে শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্ব ছিলো, সেটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এর ফলে আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের ইচ্ছা ও মর্জিই হবে চূড়ান্ত, নিজেদের ইচ্ছামতো তারা কিছুই করতে পারবে না। নীচু শ্রেণীর লোকদের ওপর তারা যে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে আসছিলো, সকাল সন্ধ্যা তারা যেসব ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত ছিলো সেসব থেকে তাদের দূরে থাকতে হবে। কোরায়শরা এর অর্থ ভালোই বুঝতে পারছিলো। তাই তাদের দৃষ্টিতে অবমাননাকর এরূপ অবস্থা তারা মেনে নিতে পারছিলো না। কিন্তু এটা কোন কল্যাণ বা মঙ্গলের প্রত্যাশায় নয়, বরং আরো বেশী মন্দ কাজে নিজেদের জড়িত করাই এর উদ্দেশ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'বরং এ জন্যে যে, মানুষ চায় ভবিষ্যতেও তারা মন্দ কাজে লিপ্ত হবে।' (৫, ৭৫)
কোরায়শরা এসব কিছুই বুঝতে পারছিলো। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যে, তাদের সামনে এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি ছিলেন, সত্যবাদী এবং বিশ্বাসী। তিনি ছিলেন আদর্শের উত্তম দৃষ্টান্ত। দীর্ঘকাল যাবত মক্কার অধিবাসীরা পূর্ব পুরুষদের মধ্যে এ ধরনের দৃষ্টান্ত দেখেনি, শোনেওনি। এমন এক ব্যক্তিত্বের সাথে তারা কিভাবে মোকাবেলা করবে, সেটাও ভেবে ঠিক করতে পারছিলো না। তারা ছিলো অবাক ও বিস্মিত। অবশ্য এভাবে বিস্মিত হওয়ার পেছনে কিছু কারণও ছিলো।
কোরায়শরা অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, তারা প্রিয় নবীর চাচা আবু তালেবের কাছে যাবে এবং তাকে এক মাস অনুরোধ করবে যে, তিনিই যেন নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রকে তাঁর এই কাজ থেকে বিরত রাখেন। নিজেদের দাবীকে যুক্তিগ্রাহ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করতে তারা এ দলিল তৈরী করলো যে, তাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করার দাওয়াত দেয়া এবং তারা যে ভালো-মন্দ কোন কিছু করার শক্তি রাখে না এ কথা বলা প্রকৃতপক্ষে তাদের উপাস্যদের প্রতি অবমাননাকর এবং মারাত্মক গালিস্বরূপ।
তাছাড়া এটা হচ্ছে আমাদের পিতা ও পিতামহ অর্থাৎ আমাদের পূর্ব পুরুষদের নির্বোধ এবং পথভ্রষ্ট আখ্যায়িত করার শামিল। কেননা বর্তমানে আমরা যে ধর্ম বিশ্বাসের ওপর রয়েছি, তারাও একই ধর্ম বিশ্বাসের ওপর জীবন যাপন করেছিলেন। অপরাপর কোরায়শদের এসব কথা বোঝানোর পর তারা সহজেই বুঝাতে পারলো এবং এতে দ্রুত সাড়া দিলো।
📄 আবু তালেবে সমীপে কোরায়েশ প্রতিনিধি দল
ইবনে ইসহাক লিখেছেন, কোরায়শদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ক'জন লোক আবু তালেবের কাছে গিয়ে বললো যে আবু তালেব, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র আমাদের উপাস্যদের গালাগাল করছে আমাদের দ্বীনকে পথভ্রষ্টতা বলছে এবং বিবেককে নির্বুদ্ধিতা বলে অভিহিত করছে। এমনকি আমাদের পিতা ও পিতামহদেরও পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করছে। কাজেই হয়তো আপনি তাকে বাধা দিন অথবা তাঁর এবং আমাদের মাঝখান থেকে আপনি সরে দাঁড়ান। কেননা আপনিও আমাদের একই ধর্মের বিশ্বাসী। তার সাথে বোঝাপড়ার জন্যে আমরা নিজেদেরই যথেষ্ট মনে করি।
এ আবেদনের জবাবে আবু তালেব নরম ভাষায় কথা বললেন এবং মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করলেন। ফলে তারা ফিরে গেলো। অন্যদিকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একই নিয়মে অব্যাহতভাবে দ্বীনের তাবলীগ করতে লাগলেন এবং দ্বীনের প্রচার প্রসারে মনোনিবেশ করলেন।
হাজীদের বাধা দেয়ার জন্যে জরুরী বৈঠক সেই সময়ে কোরায়শদের সামনে আরো একটি সমস্যা এসে উপস্থিত হলো। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এসে পড়লো হজ্জের মৌসুম। কোরায়শরা জানতো যে, আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিধিদল এ সময় মক্কায় আসবে। তাই তারা দরকার মনে করলো যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে এমন সব কথা বলবে যাতে তাদের মনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাবলীগের কোন প্রভাব না পড়ে। এ বিষয়ে আলোচনার জন্যে তারা ওলীদ ইবনে মুগীরার কাছে একত্রিত হলো। ওলীদ বললো, প্রথমে তোমরা সবাই একমত হবে, একজনের কথা অন্যজন মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেবে এমন অবস্থা যেন না হয়। তোমাদের মধ্যে কোন প্রকার মতপার্থক্য থাকতে পারবে না। আগন্তুকরা বললো, আপনিই আমাদের বলে দিন, আমরা কি বলব। ওলীদ বললো, তোমরা বলো, আমি শুনব। এরপর কয়েকজন বললো, আমরা বলব যে, তিনি একজন জ্যোতিষী। ওলীদ বললো, না তিনি জ্যোতিষী নন, আমি জ্যোতিষীদের দেখেছি, তার মধ্যে জ্যোতিষীদের মতো বৈশিষ্ট্য নেই। জ্যোতিষীরা যেভাবে আন্তসারশূন্য কথা বলে থাকে তিনি সেভাবে বলেন না। এ কথা শুনে আগন্তুকরা বললো, তাহলে আমরা বলব যে, তিনি একজন পাগল। ওলীদ বললো, না তিনি পাগলও নন। আমি পাগলও দেখেছি, পাগলের প্রকৃতিও দেখেছি। তিনি পাগলের মতো আচরণও করেন না। পাগলের মতো উল্টাপাল্টা কথাও বলেন না। লোকেরা বললো, তাহলে আমরা বলব যে, তিনি একজন কবি। ওলীদ বললো, তিনি কবিও নন। কবিত্বের বিভিন্ন রকম আমার জানা আছে। তাঁর কথা কবিতা নয়। লোকরা বললো, তাহলে আমরা বলব যে, তিনি একজন যাদুকর। ওলীদ বললো, না তিনি যাদুকরও নন। আমি যাদুকর এবং তাদের যাদু দেখেছি। তিনি ঝাড়ফুঁক করেন না এবং যাদুটোনাও করেন না। আগন্তুকরা বললো, তাহলে আমরা কি বলব? ওলীদ বললো, আল্লাহর শপথ তার কথা বড় মিষ্টি। তার কথার তাৎপর্য অনেক গভীরতাপূর্ণ। তোমরা যে কথাই বলবে, শ্রোতারা সবাই মিথ্যা মনে করবে। তবে তার সম্পর্কে একথা বলতে পারো যে, তিনি একজন যাদুকর। তিনি যেসব কথা পেশ করেছেন সেসব কথা স্রেফ যাদু। তাঁর কথা শোনার পর পিতা পুত্র, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে মত-পার্থক্য দেখা দেয়। পরিশেষে কোরায়শ প্রতিনিধিদল একথার ওপরেই একমত হয়ে সেখান থেকে ফিরে এলো।
কোন কোন বর্ণনায় বিস্তারিতভাবে একথাও উল্লেখ রয়েছে যে, ওলীদ যখন আগন্তুকদের সব কথা প্রত্যাখ্যান করলো তখন তারা বললো, তাহলে আপনিই সুচিন্তিত মতামত পেশ করুন। একথা শুনে ওলীদ বললো, আমাকে একটুখানি চিন্তা করার সময় দাও। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর ওলীদ উপরোক্ত মন্তব্য করেছিলো।
উল্লিখিত ঘটনার প্রেক্ষিতে ওলীদ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরা মোদদাসসেরের ষোলটি আয়াত নাযিল করেন। এসব আয়াতে ওলীদের চিন্তার প্রকৃতির চিত্ররূপ লক্ষ্য করা যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'সে তো চিন্তা করলো এবং সিদ্ধান্ত করলো। অভিশপ্ত হোক সে, কেমন করে সে এ সিদ্ধান্ত করলো। আরো অভিশপ্ত হোক সে, কেমন করে সে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। সে আগে চেয়ে দেখলো। অতপর সে ভ্রুকুঞ্চিত করলো এবং মুখ বিকৃত করলো। অতপর সে পেছন ফিরলো, দম্ভ প্রকাশ করলো এবং ঘোষণা করলো, এটাতো লোক পরস্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছু নয়, এটাতো মানুষেরই কথা।' (আয়াত ১৮-২৫)
উল্লিখিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়াও হয়। ক'জন পৌত্তলিক হজ্জ যাত্রীদের আসার বিভিন্ন পথে অবস্থান নেয় এবং নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তাদের সতর্ক করে।
এ কাজে সবার আগে ছিলো আবু লাহাব। হজ্জের সময়ে সে হজ্জযাত্রীদের ডেরায়, ওকায, মাজনা এবং যুল মায়াযের বাজারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেছনে লেগে থাকে। নবী (সঃ) আল্লাহর দ্বীনের তাবলীগ করছিলেন, আর আবু লাহাব পেছনে থেকে বলছিলো, তোমরা ওর কথা শুনবে না, সে হচ্ছে মিথ্যাবাদী এবং বেদ্বীন।
এ ধরনের ছুটোছুটির ফল এই হলো যে, হজ্জযাত্রীরা ঘরে ফিরে যাওয়ার সময় জানতে পারলো যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়ত দাবী করেছেন। মোটকথা, হজ্জযাত্রীদের মাধ্যমে সমগ্র আরব জাহানে আল্লাহর রসূলের আলোচনা ছড়িয়ে পড়লো।
টিকাঃ
৫. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৬৫
৬. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৭১
৭. তাফসীর ফি যিলাযিল কোরআন, সাইয়েদ কুতুব শহীদ, পারা ২৯, পৃ ১৮৮
৮. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ২৭১ পৃঃ
৯. তিরমিযী মোসনাদে আহমদ তৃতীয় খন্ড ৪৯২
📄 হাজীদের বাধা দেয়ার জন্য জরুরী বৈঠক
সেই সময়ে কোরায়শদের সামনে আরো একটি সমস্যা এসে উপস্থিত হলো। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এসে পড়লো হজ্জের মৌসুম। কোরায়শরা জানতো যে, আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিধিদল এ সময় মক্কায় আসবে। তাই তারা দরকার মনে করলো যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে এমন সব কথা বলবে যাতে তাদের মনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাবলীগের কোন প্রভাব না পড়ে। এ বিষয়ে আলোচনার জন্যে তারা ওলীদ ইবনে মুগীরার কাছে একত্রিত হলো। ওলীদ বললো, প্রথমে তোমরা সবাই একমত হবে, একজনের কথা অন্যজন মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেবে এমন অবস্থা যেন না হয়। তোমাদের মধ্যে কোন প্রকার মতপার্থক্য থাকতে পারবে না। আগন্তুকরা বললো, আপনিই আমাদের বলে দিন, আমরা কি বলব। ওলীদ বললো, তোমরা বলো, আমি শুনব। এরপর কয়েকজন বললো, আমরা বলব যে, তিনি একজন জ্যোতিষী। ওলীদ বললো, না তিনি জ্যোতিষী নন, আমি জ্যোতিষীদের দেখেছি, তার মধ্যে জ্যোতিষীদের মতো বৈশিষ্ট্য নেই। জ্যোতিষীরা যেভাবে আন্তসারশূন্য কথা বলে থাকে তিনি সেভাবে বলেন না। এ কথা শুনে আগন্তুকরা বললো, তাহলে আমরা বলব যে, তিনি একজন পাগল। ওলীদ বললো, না তিনি পাগলও নন। আমি পাগলও দেখেছি, পাগলের প্রকৃতিও দেখেছি। তিনি পাগলের মতো আচরণও করেন না। পাগলের মতো উল্টাপাল্টা কথাও বলেন না। লোকেরা বললো, তাহলে আমরা বলব যে, তিনি একজন কবি। ওলীদ বললো, তিনি কবিও নন। কবিত্বের বিভিন্ন রকম আমার জানা আছে। তাঁর কথা কবিতা নয়। লোকরা বললো, তাহলে আমরা বলব যে, তিনি একজন যাদুকর। ওলীদ বললো, না তিনি যাদুকরও নন। আমি যাদুকর এবং তাদের যাদু দেখেছি। তিনি ঝাড়ফুঁক করেন না এবং যাদুটোনাও করেন না। আগন্তুকরা বললো, তাহলে আমরা কি বলব? ওলীদ বললো, আল্লাহর শপথ তার কথা বড় মিষ্টি। তার কথার তাৎপর্য অনেক গভীরতাপূর্ণ। তোমরা যে কথাই বলবে, শ্রোতারা সবাই মিথ্যা মনে করবে। তবে তার সম্পর্কে একথা বলতে পারো যে, তিনি একজন যাদুকর। তিনি যেসব কথা পেশ করেছেন সেসব কথা স্রেফ যাদু। তাঁর কথা শোনার পর পিতা পুত্র, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে মত-পার্থক্য দেখা দেয়। পরিশেষে কোরায়শ প্রতিনিধিদল একথার ওপরেই একমত হয়ে সেখান থেকে ফিরে এলো।
টিকাঃ
৬. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৭১
📄 সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রতিরোধের প্রথম
কোরায়শরা যখন লক্ষ্য করলো যে, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাবলীগে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখার কৌশল কাজে আসছে না তখন তারা নতুন করে চিন্তা করলো। দ্বীনের দাওয়াত চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার জন্যে ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলো। সে পন্থা ও পদ্ধতির সারমর্ম নিম্নরূপ,
প্রতিরোধের প্রথম ধরন
এটি ছিলো হাসি-ঠাট্টা, বিদ্রূপ-উপহাস এবং মিথ্যাবাদী বলে তাকে অভিহিত করা। এর উদ্দেশ্য ছিলো মুসলমানদের মনোবল নষ্ট করা। এ লক্ষ্য অর্জন পৌত্তলিকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অহেতুক অপবাদ গালাগাল দিতে শুরু করে। কখনো কখনো তারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাগল বলতো। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওসব কাফেররা বললো, যার ওপর কোরআন নাযিল হয়েছে, নিশ্চয়ই সে একটা পাগল।' (৬-১৫)
কখনো কখনো তাঁর ওপর যাদুকর এবং মিথ্যাবাদী হওয়ার অপবাদ দেয়া হতো। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওরা বিস্ময় বোধ করছে যে, ওদের কাছে ওদেরই মধ্য থেকে একজন সতর্ককারী এলেন এবং কাফেররা বলে, এতো এক যাদুকর, মিথ্যাবাদী।' (৪-৩৮)
কাফেররা আল্লাহর রসূলের সামনে দিয়ে পেছন দিয়ে ক্রুদ্ধভাবে চলাচল করতো এবং রোষ কষায়িত চোখে তাঁর প্রতি তাকাতো। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'কাফেররা যখন কোরআন শ্রবণ করে তখন তারা যেন তাদের তীক্ষ্ণদৃষ্টি দ্বারা তোমাকে আছড়িয়ে ফেলে দেবে এবং বলে, এতো পাগল।' (৫১-৬৮)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোথাও যেতেন এবং তাঁর সামনে পেছনে দুর্বল ও অত্যাচারিত সাহাবায়ে কেরাম থাকতেন, তখন পৌত্তলিকরা ঠাট্টা করে বলতো, 'আল্লাহ কি তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করলেন?' (৫৩, ৬)
'তাদের এ উক্তির জবাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ কি কৃতজ্ঞ লোকদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত নন?' (৫৩, ৬)
কোরআনে আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের অবস্থার চিত্র এভাবে অঙ্কন করেছেন, 'যারা অপরাধী, তারা তো মোমেনদের উপহাস করতো এবং ওরা যখন মোমেনদের কাছ দিয়ে যেতো, তখন চোখ টিপে ইশারা করতো এবং যখন ওদের আপনজনের কাছে ফিরে আসতো, তখন ওরা ফিরতো উৎফুল্ল হয়ে এবং যখন ওদেরকে দেখতো, তখন বলতো, এরা তো পথভ্রষ্ট। এদেরকে তো তাদের তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠানো হয়নি।' (২৯, ৩৩, ৮৩)