📄 গোপনীয় দাওয়াতের তিন বছর
মক্কা ছিলো আরব দ্বীপের কেন্দ্রস্থল। এখানে কাবাঘরের পাসবান বা তত্ত্বাবধায়ক ছিলো। আরবরা মূর্তির নেগাহবানও ছিলো, যাদেরকে সমগ্র আরবের লোকেরা মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতো। এ কারণে অন্য সব স্থানের চেয়ে মক্কায় মূর্তির বিরুদ্ধে সংস্কার প্রচেষ্টা সফল হওয়া ছিলো অধিক কষ্টকর। এখানে এমন দৃঢ়চিত্ততার প্রয়োজন ছিলো যাতে, কোন প্রকার দুঃখ কষ্ট এবং বিপদ বাধা বিন্দুমাত্র সরাতে না পারে বরং বিপদ বাধায় অটল অবিচল থাকা যায়। কাজেই কৌশল হচ্ছে যে, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ প্রথমে গোপনীয়ভাবে সম্পন্ন করতে হবে যাতে, মক্কাবাসীদের মধ্যে হঠাৎ কোন কোলাহল সৃষ্টি না হয়।
📄 ইসলামের প্রথম পর্যায়ের কিছু সৈনিক
রসূল সর্বপ্রথম তাদের কাছেই দ্বীনের দাওয়াত দেবেন, যাঁরা তাঁর নিকটাত্মীয়, যাদের সাথে রয়েছে তাঁর গভীর সম্পর্ক, এটাই স্বাভাবিক। নিজের পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদের আগে দাওয়াত দেবেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে তাই এসব লোককে দাওয়াত দেন। চেনা পরিচিত লোকদের মধ্যে তাদেরকেই তিনি দাওয়াত দিয়েছেন, যাদের চেহারায় সরলতা এবং নমনীয়তার ছাপ দেখতে পেয়েছিলেন। এছাড়া তিনি যাদের সম্পর্কে জানতেন যে, তারা তাঁকে সত্যবাদী, ন্যায়নীতিপরায়ণ ও সৎ মানুষ হিসাবে জানে এবং শ্রদ্ধা করে তাঁদেরকেও।
আল্লাহর রসূলের দাওয়াতে তাদের কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেন। এরা প্রিয় রসূলের সততা, সত্যবাদিতা ও মহানুভবতা সম্পর্কে কখনোই কোন প্রকার সন্দেহ করতেন না। ইসলামের ইতিহাসে এরা 'সাবেকীনে আউয়ালীন' নামে পরিচিত। এদের মধ্যে শীর্ষ তালিকায় রয়েছেন রসূলের সহধর্মিনী উম্মুল মোমেনীন খাদিজা বিনতে খোয়াইলেদ, তাঁর মুক্ত করা ক্রীতদাস যায়েদ ইবনে সাবেত ইবনে শরাহবিল কালবি।¹ তাঁর চাচাতো ভাই হযরত আলী ইবনে আবু তালেব, যিনি সে সময় তাঁর পরিবারে প্রতিপালিত হচ্ছিলেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সুহৃদ হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) আজমাঈন। এরা সবাই প্রথম দিনেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।²
ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন সর্বজনপ্রিয় নরম মেজায, উত্তম চরিত্র এবং উদার মনের মানুষ। চমৎকার ব্যবহারের কারণে সব সময় তাঁর কাছে মানুষ যাওয়া আসা করতো। এ সময় বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য লোকদের কাছে হযরত আবু বকর (রা.) দ্বীনের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। তার চেষ্টায় হযরত ওসমান (রা.), হযরত যোবায়ের (রা.), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ, হযরত সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাসও, হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রা.) প্রমুখ ইসলাম গ্রহণ করেন। এরা ছিলেন ইসলামের প্রথম সারির সৈনিক।
প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে হযরত বেলাল (রা.)ও ছিলেন একজন। তাঁর পরে আমীনে উম্মত হযরত আবু ওবায়দা, আমের ইবনে জাররাহ, আবু সালমা ইবনে আবদুল আছাদ, আরকাম ইবনে আবুল আরকাম, ওসমান ইবনে মাজউন, এবং তাঁর দুই ভাই, কোদামা ও আবদুল্লাহ এবং ওবায়দা ইবনে হারেস, মোত্তালেব ইবনে আবদুল মান্নাফ, সাঈদ ইবনে যায়েদ এবং তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ ওমরের বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব, খাব্বাব ইবনে আরত, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং অন্য কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেন। এরা সম্মিলিতভাবে কোরায়শ বংশের বিভিন্ন শাখার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। ইবনে হিশাম লিখেছেন, এদের সংখ্যা ছিলো চল্লিশের বেশী। (দেখুন ১ম খন্ড, পৃ. ২৪৫-২৬২)। এদের মধ্যের কয়েকজনকেও 'সাবেকীনে আউয়ালীনের' অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, উল্লিখিত ভাগ্যবানদের ইসলাম গ্রহণের পর দলে দলে লোক ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয়গ্রহণ করেন। মক্কার সর্বত্র ইসলামের আলোচনা চলতে থাকে এবং ইসলাম ব্যাপকতা লাভ করে।³
এরা গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে ইসলাম শিক্ষা এবং পথ নির্দেশ দেয়ার জন্যে গোপনে গোপনে দেখা করতেন। কেননা তাবলীগের কাজ তখনো বিচ্ছিন্নভাবে এবং গোপনে চলছিলো। সূরা মোদদাসসের-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত নাযিল হওয়ার পর ঘন ঘন ওহী নাযিল হতে থাকে। এ সময়ে ছোট ছোট আয়াত নাযিল হচ্ছিলো। এসব আয়াত প্রায় একই ধরনের আকর্ষণীয় শব্দে শেষ হতো। এসব আয়াতে থাকতো চিত্তাকর্ষক গীতিধর্মিতা এবং কাব্যময়তা। পরিবেশের সাথে সেইসব আয়াত পুরোপুরি খাপ খেয়ে যেতো। এসব আয়াতে তাযকিয়ায়ে নফস বা আত্মার শুদ্ধি ও সৌন্দর্য এবং দুনিয়ার মায়াজালে জড়িয়ে যাওয়ার কুফল সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। এছাড়া বেহেশত ও দোযখের বিবরণ এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যেন চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে। এ সকল আয়াত এমন সব স্থান পরিভ্রমণ করিয়ে আনছিলো, যা ছিলো প্রচলিত পরিবেশে সম্পূর্ণ নতুন।
টিকাঃ
১. তিনি এসেছিলেন যুদ্ধে বন্দী দাস হয়ে। পরে হযরত খাদিজা তাঁর মালিক হন এবং স্বামীর জন্যে তাকে দান করে দেন। এরপর তাঁর পিতা ও চাচা তাঁকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিলেন কিন্তু পিতা ও চাচাকে ছেড়ে তিনি প্রিয় রসূল (স.)-এর সাথে থাকতে পছন্দ করেন। এরপর রসূল তাঁর ভৃত্য যায়েদকে আরব দেশীয় রীতি অনুযায়ী পালকপুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন। এ ঘটনার পর তিনি যায়েদ ইবনে মোহাম্মদ নামে পরিচিত হন। ইসলামের আগমনে পালক পুত্রের আরবদেশীয় প্রাচীন রীতির অবসান ঘটে।
২. রহমাতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড পৃ. ৫০।
৩. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, ২৬২
📄 নামাযের আদেশ
প্রথম যা কিছু নাযিল হয়েছিলো এরমধ্যে নামাযের আদেশও ছিলো। মোকাতেল ইবনে সোলায়মান বলেন, ইসলামের শুরুতে আল্লাহ তায়ালা দু'রাকাত নামায সকালে এবং দু'রাকাত নামায সন্ধ্যার জন্যে নির্দিষ্ট করেছিলেন। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'সকাল এবং সন্ধ্যায় তোমরা প্রতিপালকের প্রশংসার সাথে তাঁর সেজদা করো।'
ইবনে হাজার বলেন, প্রিয় রসূল এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম মে'রাজের ঘটনার আগেই নামায আদায় করতেন। তবে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আগে অন্য কোন নামায ফরয ছিলো কিনা। কেউ কেউ বলেন, সূর্য উদয় হওয়ার আগে এবং অস্ত যাওয়ার আগে এক এক নামায ফরয ছিলো।
হারেস ইবনে ওসামা হযরত যায়েদ ইবনে হারেছা থেকে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, প্রিয় নবীর কাছে প্রথম যখন ওহী এসেছিলো, সেই সময় জিবরাঈল এসে তাঁকে প্রথমে ওযুর নিয়ম শিক্ষা দেন। ওযু শেষ করার পর এক আঁজলা পানি লজ্জাস্থানে ছুঁড়ে মারেন। ইবনে মাজাও এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করেছেন। বারা' ইবনে আযেব এবং ইবনে আব্বাস (রা.) থেকেও এ ধরনের হাদীস বর্ণিত রয়েছে। ইবনে আব্বাসের বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ রয়েছে যে, এই নামায ছিলো প্রথম দিকের ফরযের অন্তর্ভুক্ত।
ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন যে, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম নামাযের সময়ে পাহাড়ে চলে যেতেন এবং গোপনে নামায আদায় করতেন। একবার আবু তালেব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আলী (রা.)-কে নামায আদায় করতে দেখে ফেলেন। তিনি এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তাঁকে জানানোর পর তিনি বলেন, এই অভ্যাস অব্যাহত রেখো।
কোরায়শদের সংবাদ প্রদান
বিভিন্ন ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, এ সময়ে তাবলীগের কাজ যদিও গোপনভাবে করা হচ্ছিলো, কিন্তু কোরায়শরা কিছু কিছু বুঝতে পারছিলো। তবে তারা ব্যাপারটিকে কোন গুরুত্ব দেয়নি।
ইমাম গাজ্জালী লিখেছেন যে, কোরায়শরা মুসলমানদের তৎপরতার খবর পাচ্ছিলো। কিন্তু তারা এর প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়নি। সম্ভবত তারা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন কোন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মনে করেছিলো, যারা বৈরাগ্যবাদ এবং সংসার বিরাগী হওয়ার বিষয়ে কথাবার্তা বলে থাকেন। আরব সমাজে এ ধরনের লোক ছিলো। যেমন, উমাইয়া ইবনে আবু ছালত, কুস ইবনে সা'দাহ, আমর ইবনে তোফায়েল প্রমুখ। তবে কোরায়শরা এটা লক্ষ্য করেছিলো যে, তাঁর তৎপরতা যেন একটু বেশী এবং ভিন্ন ধরনের। সময়ের গতিধারার সাথে সাথে কোরায়শরা প্রিয় নবীর ধর্মীয় তৎপরতা এবং তাবলীগের প্রতি ক্রমে ক্রমে দৃষ্টি বাড়িয়ে দিচ্ছিলো।
তিন বছর যাবত দ্বীনের কাজ গোপনভাবে চললো। এ সময়ে ঈমানদারদের একটি দল তৈরী হয়ে গেলো। এরা ভ্রাতৃত্ব এবং সহায়তার ওপর কায়েম ছিলো। তারা আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাচ্ছিলো এবং এ পয়গামকে একটা পর্যায়ে উন্নীত করতে চেষ্টা করছিলেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা ওহী নাযিল করেন এবং তাঁর কওমকে নির্দেশ প্রদান করেন। দ্বীনের দাওয়াতের সাথে সাথে কোরায়শদের বাতিল শক্তির সাথে সংঘাত এবং তাদের মূর্তির ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরারও নির্দেশ দেয়া হয়।
টিকাঃ
৪. মুখতাছারুছ ছিরাত, শেখ আবদুল্লাহ পৃ. ৮৮
৫. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ১৪৭
৬. ফেকহুস সিরাত পৃ; ৭৬
📄 কোরায়শদের সংবাদ প্রদান
বিভিন্ন ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, এ সময়ে তাবলীগের কাজ যদিও গোপনভাবে করা হচ্ছিলো, কিন্তু কোরায়শরা কিছু কিছু বুঝতে পারছিলো। তবে তারা ব্যাপারটিকে কোন গুরুত্ব দেয়নি।
ইমাম গাজ্জালী লিখেছেন যে, কোরায়শরা মুসলমানদের তৎপরতার খবর পাচ্ছিলো। কিন্তু তারা এর প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়নি। সম্ভবত তারা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন কোন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মনে করেছিলো, যারা বৈরাগ্যবাদ এবং সংসার বিরাগী হওয়ার বিষয়ে কথাবার্তা বলে থাকেন। আরব সমাজে এ ধরনের লোক ছিলো। যেমন, উমাইয়া ইবনে আবু ছালত, কুস ইবনে সা'দাহ, আমর ইবনে তোফায়েল প্রমুখ। তবে কোরায়শরা এটা লক্ষ্য করেছিলো যে, তাঁর তৎপরতা যেন একটু বেশী এবং ভিন্ন ধরনের। সময়ের গতিধারার সাথে সাথে কোরায়শরা প্রিয় নবীর ধর্মীয় তৎপরতা এবং তাবলীগের প্রতি ক্রমে ক্রমে দৃষ্টি বাড়িয়ে দিচ্ছিলো।
তিন বছর যাবত দ্বীনের কাজ গোপনভাবে চললো। এ সময়ে ঈমানদারদের একটি দল তৈরী হয়ে গেলো। এরা ভ্রাতৃত্ব এবং সহায়তার ওপর কায়েম ছিলো। তারা আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাচ্ছিলো এবং এ পয়গামকে একটা পর্যায়ে উন্নীত করতে চেষ্টা করছিলেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা ওহী নাযিল করেন এবং তাঁর কওমকে নির্দেশ প্রদান করেন। দ্বীনের দাওয়াতের সাথে সাথে কোরায়শদের বাতিল শক্তির সাথে সংঘাত এবং তাদের মূর্তির ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরারও নির্দেশ দেয়া হয়।