📄 ওহীর বিভিন্ন রকম
প্রিয় নবীর ওপর ওহী নাযিল হওয়ার পর অর্থাৎ তিনি নবুয়ত পাওয়ার পর তাঁর যে জীবন শুরু হয়, সে আলোচনায় যাওয়ার আগে ওহীর প্রকারভেদ সম্পর্কে আলোকপাত করা দরকার। এতে রেসালত ও নবুয়ত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। আল্লামা ইবনে কাইয়েম নিম্নোক্ত কয়েক প্রকারের ওহীর কথা উল্লেখ করেছেন: এক. সত্য স্বপ্ন-স্বপ্নের মাধ্যমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিল। দুই. ফেরেশতা তাঁকে দেখা না দিয়ে তাঁর মনে কথা বসিয়ে দিত। যেমন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, রুহুল কুদুস আমার মনে একথা বসিয়ে দিলেন যে, কোন মানুষ তার জন্যে নির্ধারিত রেযেক পাওয়ার আগে মৃত্যু বরণ করে না। কাজেই আল্লাহকে ভয় করো এবং ভালো জিনিস তালাশ করো। রেযেক পেতে বিলম্ব হলে আল্লাহর নাফরমানীর মাধ্যমে রেযেক তালাশ করো না। কেননা আল্লাহর কাছে যা কিছু রয়েছে, সেটা তাঁর আনুগত্য ছাড়া পাওয়া যায় না। তিন. ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধরে তাকে সম্বোধন করতেন। তিনি যা কিছু বলতেন, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা মুখস্ত করে নিতেন। এ সময় কখনো কখনো সাহাবারাও ফেরেশতাদের দেখতে পেতেন। চার. রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ওহী ঘন্টাধ্বনির মতো টন টন শব্দে আসতো। এটি ছিলো ওহীর সবচেয়ে কঠোর অবস্থা। এ অবস্থায় ফেরেশতা তাঁর সাথে দেখা করতেন এবং প্রচন্ড শীতের মওসুম হলেও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘেমে যেতেন। তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়তো। তিনি উটের ওপর সওয়ার থাকলে মাটিতে বসে পড়তেন। একবার হযরত যায়েদ ইবনে সাবেতের উরুর ওপর তাঁর উরু থাকা অবস্থায় ওহী এলো, হযরত যায়েদ এতো ভারি বোধ করলেন যে, তাঁর উরু থেতলে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো।
পাঁচ. তিনি ফেরেশতাকে তার প্রকৃত চেহারায় দেখতেন। সেই অবস্থায়ই আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর ওপর ওহী নাযিল হতো। দু'বার এরূপ হয়েছিলো। পাক কোরআনে সূরা নাজম-এ আল্লাহ তায়ালা সে কথা উল্লেখ করেছেন।
ছয়. মেরাজের রাতে নামায ফরয হওয়া এবং অন্যান্য বিষয়ক ওহী আকাশে নাযিল হয়েছিলো। প্রিয় নবী তখন আকাশে ছিলেন।
সাত. ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়া আল্লাহর সরাসরি কথা বলা। হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে আল্লাহ তায়ালা যেমন কথা বলেছিলেন। হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে আল্লাহর কথা বলার প্রমাণ কোরআনে রয়েছে। প্রিয় নবীর সাথে আল্লাহর কথা বলার প্রমাণ মে'রাজের হাদীসে রয়েছে।
আট. আর এক প্রকার কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। এটি হচ্ছে আল্লাহর মুখোমুখি পর্দা বিহীন অবস্থায় কথা বলা। কিন্তু এ ব্যাপারে মতপার্থক্যের অবকাশ রয়েছে। তাবলীগের নির্দেশ সূরা মোদদাসসের-এর প্রথম দিকের কয়েকটি আয়াতে প্রিয় নবীকে যেসব নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, এসব নির্দেশ দৃশ্যত সংক্ষিপ্ত এবং সহজ সরল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব নির্দেশ খুবই সুদূরপ্রসারী এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। বাস্তব জীবনে এসব নির্দেশের কার্যকারিতা ও প্রভাব অসামান্য। যথা-
এক. ভয় প্রদর্শন করতে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এই নির্দেশের শেষ মনযিল হচ্ছে এই যে, বিশ্বে আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেসব কাজ হচ্ছে, তার মারাত্মক পরিণাম সম্পর্কে সবাইকে জানিয়ে দেয়া। সেই ভয় এমনভাবে দেখাতে হবে যাতে, আল্লাহর আযাবের ভয়ে মানুষের মনে মগজে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
দুই. রব এর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনার শেষ মনযিল হচ্ছে আল্লাহর যমীনে শুধুমাত্র তাঁরই শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্ব অটুট থাকবে, অন্য কারোর শ্রেষ্ঠত্ব বহাল থাকতে দেয়া যাবে না বরং অন্য সব কিছুর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য নস্যাৎ করে দিতে হবে। ফলে আল্লাহর যমীনে একমাত্র তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, কর্তৃত্ব ও মহিমাই শুধু প্রকাশ পাবে এবং স্বীকৃত হবে।
তিন. পোশাকের পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতার শেষ মনযিল হচ্ছে এই যে, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল প্রকার পাক সাফ রাখতে হবে। এ অবস্থা এমন পর্যায়ে উন্নীত হতে হবে যাতে করে, আল্লাহর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় পাওয়া যায়। এটা শুধুমাত্র তাঁরই হেদায়াত ও নূরের দ্বারা সম্ভব হতে পারে। উল্লিখিত পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জনের পর অন্তর আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমাই অন্তরে জাগ্রত হবে। এর ফলে সমগ্র বিশ্বের মানুষ বিরোধিতা বা আনুগত্যে তাঁর কাছাকাছি থাকবে। তিনিই হবেন সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
চার. কারো প্রতি দয়া বা অনুগ্রহ করার পর অধিক বিনিময় প্রত্যাশা না করার শেষ মনযিল এই যে, নিজের কাজকর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করা যাবে না, বেশী গুরুত্ব দেয়া যাবে না। বরং একটির পর অন্য কাজের জন্যে চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যেতে হবে। বড় রকমের ত্যাগ ও কোরবানী করেও সেটাকে তুচ্ছ মনে করতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণ এবং তাঁর সামনে জবাবদিহির ভয়ের অনুভূতির সামনে নিজের চেষ্টাসাধনাকে ক্ষুদ্র ও সামান্য মনে করতে হবে।
পাঁচ. শেষ আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দাওয়াতের কাজ শুরু হওয়ার পর শত্রুরা বিরোধিতা, হাসিঠাট্টা, উপহাস বিদ্রূপ ইত্যাদির মাধ্যমে কষ্ট দেবে এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। তাঁকে এসব কিছুর সাথে মোকাবেলা করতে হবে। এমতাবস্থায় তাঁকে দৃঢ়তার সাথে ধৈর্যধারণ করতে হবে। এই ধৈয মনের শান্তির জন্যে নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর দ্বীনের প্রচার প্রসারের জন্যে। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 'ওয়া লিরাব্বেকা ফাছবের' অর্থাৎ তোমার প্রতিপালকের জন্যে ধৈর্যধারণ করবে।
কী চমৎকার! এ সকল নির্দেশ প্রকাশ্য ভাষায় কতো সহজ সরল এবং সংক্ষিপ্ত। শব্দ চয়ন কতো হালকা এবং কাব্যধর্মী। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা কতো ব্যাপক ও তাৎপর্যমন্ডিত। এই কয়েকটি শব্দের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যাবে এবং বিশ্বের দিকদিগন্তের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির সুদৃঢ় বন্ধন স্থাপিত হবে।
উল্লেখিত আয়াতগুলোতে দাওয়াত ও তাবলীগের উপাদানও বিদ্যমান রয়েছে। বনি আদমের কিছু আমল এমন রয়েছে, যার পরিণাম মন্দ। এ কথা সবাই জানে যে, মানুষ যা কিছু করে, তার সব কিছুর বিনিময় এ পৃথিবীতে তাকে দেয়া হয় না এবং দেয়া সম্ভবও না। স্বাভাবিকভাবেই এমন একটা দিন থাকা দরকার, যেদিন সব কাজের পুরোপুরি বিনিময় দেয়া হবে। সেই দিনের নাম হচ্ছে কেয়ামত। সেদিন বিনিময় দেয়ার একটা অনিবার্য প্রয়োজন এই যে, আমরা এ পৃথিবীতে যে জীবন যাপন করছি, এর চেয়ে একটা পৃথক জীবন থাকা দরকার।
অন্যান্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের কাছে নির্ভেজাল তাওহীদের অনুসারী হওয়ার দাবী জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বান্দা যেন তার সব ইচ্ছা-আকাঙ্খা আল্লাহর ওপরই ন্যস্ত করে। প্রবৃত্তির খায়েশ এবং মানুষের অন্যান্য ইচ্ছার ওপর সে যেন আল্লাহর ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেয়। এমনি করে দাওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্ব সম্পন্ন হতে পারে। এসব শর্ত নিম্নরূপ। ক, তাওহীদ। খ, পরকালের প্রতি বিশ্বাস। গ. তাযকিয়ায়ে নক্স এর ওপর গুরুত্বারোপ। অর্থাৎ সকল প্রকার অশ্লীলতা ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা। পুণ্য কাজ বেশী করে করা এবং তার ওপর অটল থাকার চেষ্টা। ঘ. নিজের সকল কাজ আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা। ঙ. এসব কিছু প্রিয় নবীর নবুয়ত ও রেসালাতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন এবং অসাধারণ নেতৃত্বের অনুসরণের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
এসব আয়াতে আসমানী নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় নবীকে এক মহান কাজের জন্যে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ঘুমের আরাম পরিত্যাগ করে জেহাদের কষ্টকর ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা মোদদাসসেরের প্রথম কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যেমন বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের জন্যে বাঁচবে, শুধু সেইতো আরামের জীবন কাটাতে পারে। কিন্তু যার ওপর বিশাল মানবগোষ্ঠীর পথনির্দেশের দায়িত্বের বোঝা সে কি করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকতে পারে? উষ্ণ বিছানার সাথে আরামদায়ক জীবনের সাথে তার কি সম্পর্ক? তুমি সেই মহান কাজের জন্যে বেরিয়ে পড়ো, যে কাজ তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। তোমার জন্যে প্রস্তুতকৃত বিরাট দায়িত্বের বোঝা তোলার জন্যে এগিয়ে এসো। সংগ্রাম করতে এগিয়ে এসো। কষ্ট করো। ঘুম এবং আরামের সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন সময় বিনিদ্র রজনী কাটানোর, সময় দীর্ঘ পরিশ্রমের। একাজ করতে তৈরী হও।
এ নির্দেশ বিরাট তাৎপর্য মন্ডিত। এই নির্দেশ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরামের জীবন থেকে বের করে তরঙ্গসঙ্কুল অথৈ সমুদ্রে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। মানুষের বিবেকের সামনে এবং জীবনের বাস্তবতার সামনে এনে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এরপর আল্লাহর রসূল উঠে দাঁড়িয়েছেন এবং সুদীর্ঘ বিশ বছরের বেশী সময় যাবত দাঁড়িয়েই থেকেছেন। এই সময়ে তিনি ছিলেন জীবন সংগ্রামে অটল অবিচল। আরাম আয়েশ পরিত্যাগ করেছেন, নিজ এবং পরিবার পরিজনের সুখ-শান্তি আরাম বিসর্জন দিয়েছেন। উঠে দাঁড়ানোর পর তিনি সেই অবস্থাতেই ছিলেন। তাঁর কাজ ছিলো আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়া। কোন প্রকার চাপ সৃষ্টি ছাড়াই এ দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। এই দায়িত্ব ছিলো পৃথিবীতে 'আমানতে কোবরা' অর্থাৎ বিরাট আমানতের বোঝা। সমগ্র মানবতার বোঝা, সমগ্র আকীদা বিশ্বাসের বোঝা। বিভিন্ন ময়দানে জেহাদের বোঝা। বিশ বছরেরও বেশী সময় তিনি এই সংগ্রামমুখর জীবন যাপন করেছেন। আসমানী নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে কখনোই তিনি এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থা সম্পর্কে অমনোযোগী বা উদাসীন ছিলেন না। আল্লাহ তায়ালা তাকে আমাদের এবং সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার দান করুন।
টিকাঃ
১২. যাদুল মায়াদ ১ম খন্ড, পৃ. ১৮।
১৩. তাফসীর ফি যিলালিল কোরআন, সাইয়েদ কুতুব শহীদ সূরা মোযযাম্মেল, সূরা মোদদাসসের, পারা ২৯, পৃ.
📄 তাবলীগের নির্দেশ
সূরা মোদদাসসের-এর প্রথম দিকের কয়েকটি আয়াতে প্রিয় নবীকে যেসব নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, এসব নির্দেশ দৃশ্যত সংক্ষিপ্ত এবং সহজ সরল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব নির্দেশ খুবই সুদূরপ্রসারী এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। বাস্তব জীবনে এসব নির্দেশের কার্যকারিতা ও প্রভাব অসামান্য। যথা-
এক. ভয় প্রদর্শন করতে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এই নির্দেশের শেষ মনযিল হচ্ছে এই যে, বিশ্বে আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেসব কাজ হচ্ছে, তার মারাত্মক পরিণাম সম্পর্কে সবাইকে জানিয়ে দেয়া। সেই ভয় এমনভাবে দেখাতে হবে যাতে, আল্লাহর আযাবের ভয়ে মানুষের মনে মগজে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
দুই. রব এর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনার শেষ মনযিল হচ্ছে আল্লাহর যমীনে শুধুমাত্র তাঁরই শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্ব অটুট থাকবে, অন্য কারোর শ্রেষ্ঠত্ব বহাল থাকতে দেয়া যাবে না বরং অন্য সব কিছুর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য নস্যাৎ করে দিতে হবে। ফলে আল্লাহর যমীনে একমাত্র তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, কর্তৃত্ব ও মহিমাই শুধু প্রকাশ পাবে এবং স্বীকৃত হবে।
তিন. পোশাকের পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতার শেষ মনযিল হচ্ছে এই যে, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল প্রকার পাক সাফ রাখতে হবে। এ অবস্থা এমন পর্যায়ে উন্নীত হতে হবে যাতে করে, আল্লাহর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় পাওয়া যায়। এটা শুধুমাত্র তাঁরই হেদায়াত ও নূরের দ্বারা সম্ভব হতে পারে। উল্লিখিত পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জনের পর অন্তর আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমাই অন্তরে জাগ্রত হবে। এর ফলে সমগ্র বিশ্বের মানুষ বিরোধিতা বা আনুগত্যে তাঁর কাছাকাছি থাকবে। তিনিই হবেন সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
চার. কারো প্রতি দয়া বা অনুগ্রহ করার পর অধিক বিনিময় প্রত্যাশা না করার শেষ মনযিল এই যে, নিজের কাজকর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করা যাবে না, বেশী গুরুত্ব দেয়া যাবে না। বরং একটির পর অন্য কাজের জন্যে চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যেতে হবে। বড় রকমের ত্যাগ ও কোরবানী করেও সেটাকে তুচ্ছ মনে করতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণ এবং তাঁর সামনে জবাবদিহির ভয়ের অনুভূতির সামনে নিজের চেষ্টাসাধনাকে ক্ষুদ্র ও সামান্য মনে করতে হবে।
পাঁচ. শেষ আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দাওয়াতের কাজ শুরু হওয়ার পর শত্রুরা বিরোধিতা, হাসিঠাট্টা, উপহাস বিদ্রূপ ইত্যাদির মাধ্যমে কষ্ট দেবে এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। তাঁকে এসব কিছুর সাথে মোকাবেলা করতে হবে। এমতাবস্থায় তাঁকে দৃঢ়তার সাথে ধৈর্যধারণ করতে হবে। এই ধৈয মনের শান্তির জন্যে নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর দ্বীনের প্রচার প্রসারের জন্যে। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 'ওয়া লিরাব্বেকা ফাছবের' অর্থাৎ তোমার প্রতিপালকের জন্যে ধৈর্যধারণ করবে।
কী চমৎকার! এ সকল নির্দেশ প্রকাশ্য ভাষায় কতো সহজ সরল এবং সংক্ষিপ্ত। শব্দ চয়ন কতো হালকা এবং কাব্যধর্মী। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা কতো ব্যাপক ও তাৎপর্যমন্ডিত। এই কয়েকটি শব্দের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যাবে এবং বিশ্বের দিকদিগন্তের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির সুদৃঢ় বন্ধন স্থাপিত হবে।
উল্লেখিত আয়াতগুলোতে দাওয়াত ও তাবলীগের উপাদানও বিদ্যমান রয়েছে। বনি আদমের কিছু আমল এমন রয়েছে, যার পরিণাম মন্দ। এ কথা সবাই জানে যে, মানুষ যা কিছু করে, তার সব কিছুর বিনিময় এ পৃথিবীতে তাকে দেয়া হয় না এবং দেয়া সম্ভবও না। স্বাভাবিকভাবেই এমন একটা দিন থাকা দরকার, যেদিন সব কাজের পুরোপুরি বিনিময় দেয়া হবে। সেই দিনের নাম হচ্ছে কেয়ামত। সেদিন বিনিময় দেয়ার একটা অনিবার্য প্রয়োজন এই যে, আমরা এ পৃথিবীতে যে জীবন যাপন করছি, এর চেয়ে একটা পৃথক জীবন থাকা দরকার।
অন্যান্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের কাছে নির্ভেজাল তাওহীদের অনুসারী হওয়ার দাবী জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বান্দা যেন তার সব ইচ্ছা-আকাঙ্খা আল্লাহর ওপরই ন্যস্ত করে। প্রবৃত্তির খায়েশ এবং মানুষের অন্যান্য ইচ্ছার ওপর সে যেন আল্লাহর ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেয়। এমনি করে দাওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্ব সম্পন্ন হতে পারে। এসব শর্ত নিম্নরূপ। ক, তাওহীদ। খ, পরকালের প্রতি বিশ্বাস। গ. তাযকিয়ায়ে নক্স এর ওপর গুরুত্বারোপ। অর্থাৎ সকল প্রকার অশ্লীলতা ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা। পুণ্য কাজ বেশী করে করা এবং তার ওপর অটল থাকার চেষ্টা। ঘ. নিজের সকল কাজ আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা। ঙ. এসব কিছু প্রিয় নবীর নবুয়ত ও রেসালাতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন এবং অসাধারণ নেতৃত্বের অনুসরণের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
এসব আয়াতে আসমানী নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় নবীকে এক মহান কাজের জন্যে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ঘুমের আরাম পরিত্যাগ করে জেহাদের কষ্টকর ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা মোদদাসসেরের প্রথম কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যেমন বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের জন্যে বাঁচবে, শুধু সেইতো আরামের জীবন কাটাতে পারে। কিন্তু যার ওপর বিশাল মানবগোষ্ঠীর পথনির্দেশের দায়িত্বের বোঝা সে কি করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকতে পারে? উষ্ণ বিছানার সাথে আরামদায়ক জীবনের সাথে তার কি সম্পর্ক? তুমি সেই মহান কাজের জন্যে বেরিয়ে পড়ো, যে কাজ তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। তোমার জন্যে প্রস্তুতকৃত বিরাট দায়িত্বের বোঝা তোলার জন্যে এগিয়ে এসো। সংগ্রাম করতে এগিয়ে এসো। কষ্ট করো। ঘুম এবং আরামের সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন সময় বিনিদ্র রজনী কাটানোর, সময় দীর্ঘ পরিশ্রমের। একাজ করতে তৈরী হও।
এ নির্দেশ বিরাট তাৎপর্য মন্ডিত। এই নির্দেশ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরামের জীবন থেকে বের করে তরঙ্গসঙ্কুল অথৈ সমুদ্রে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। মানুষের বিবেকের সামনে এবং জীবনের বাস্তবতার সামনে এনে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এরপর আল্লাহর রসূল উঠে দাঁড়িয়েছেন এবং সুদীর্ঘ বিশ বছরের বেশী সময় যাবত দাঁড়িয়েই থেকেছেন। এই সময়ে তিনি ছিলেন জীবন সংগ্রামে অটল অবিচল। আরাম আয়েশ পরিত্যাগ করেছেন, নিজ এবং পরিবার পরিজনের সুখ-শান্তি আরাম বিসর্জন দিয়েছেন। উঠে দাঁড়ানোর পর তিনি সেই অবস্থাতেই ছিলেন। তাঁর কাজ ছিলো আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়া। কোন প্রকার চাপ সৃষ্টি ছাড়াই এ দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। এই দায়িত্ব ছিলো পৃথিবীতে 'আমানতে কোবরা' অর্থাৎ বিরাট আমানতের বোঝা। সমগ্র মানবতার বোঝা, সমগ্র আকীদা বিশ্বাসের বোঝা। বিভিন্ন ময়দানে জেহাদের বোঝা। বিশ বছরেরও বেশী সময় তিনি এই সংগ্রামমুখর জীবন যাপন করেছেন। আসমানী নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে কখনোই তিনি এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থা সম্পর্কে অমনোযোগী বা উদাসীন ছিলেন না। আল্লাহ তায়ালা তাকে আমাদের এবং সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার দান করুন।
টিকাঃ
১২. যাদুল মায়াদ ১ম খন্ড, পৃ. ১৮।
১৩. তাফসীর ফি যিলালিল কোরআন, সাইয়েদ কুতুব শহীদ সূরা মোযযাম্মেল, সূরা মোদদাসসের, পারা ২৯, পৃ.