📄 রেসালাতের ছায়ায় হেরাগুহার অভ্যন্তরে
মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স চল্লিশ বছরের কাছাকাছি হলো। তাঁর পরিচ্ছন্ন অনমনীয় ব্যক্তিত্বের কারণে স্বজাতীয়দের সাথে তাঁর মানসিক ও চিন্তার দূরত্ব অনেক বেড়ে গেলো। এ অবস্থায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিঃসঙ্গপ্রিয় হয়ে উঠলেন। ছাত এবং পানি নিয়ে তিনি মক্কা থেকে দুই মাইল দূরে অবস্থিত হেরা পাহাড়ের গুহায় গিয়ে সময় কাটাতে লাগলেন। এটি একটি ছোট গুহা, এর দৈর্ঘ চার গজ এবং প্রস্ত পৌনে দুই গজ। নীচ দিক গভীর নয়। ছোট একটি পথের পাশে ওপরের প্রান্তরের সঙ্গমস্থলে এ গুহা অবস্থিত। রসূল 'সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই গুহায় যাওয়ার পর বিবি খাদিজাও সঙ্গে যেতেন এবং নিকটবর্তী কোন জায়গায় অবস্থান করতেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরো রমযান মাস এই গুহায় কাটাতেন। পথচারী মিসকিনদের খাবার খাওয়াতেন এবং বাকি সময় আল্লাহর এবাদাতে কাটাতেন। জগতের দৃশ্যমান এবং এর পেছনে কার্যকর কুদরতের কারিশমা সম্পকে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। স্বজাতির লোকদের মূর্তি পূজা এবং নোংরা জীবন যাপন দেখে তিনি শান্তি পেতেন না। কিন্তু তাঁর সামনে সুস্পষ্ট কোন পথ, পদ্ধতি অথবা প্রচলিত অবস্থার বিপরীত কোন কর্মসূচীও ছিলো না, যার ওপর জীবন কাটিয়ে তিনি মানসিক স্বস্তি ও শান্তি পেতে পারেন।¹
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ নিঃসঙ্গপ্রিয়তা ছিলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর হেকমতের একটি অংশবিশেষ। এমনি করে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ভবিষ্যতের গুরুদায়িত্বের জন্যে তৈরী করছিলেন। প্রকৃতপক্ষে মানব জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধান দিয়ে যিনি জীবনধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট হবেন, তিনি পারিপার্শ্বিক হৈ চৈ হট্টগোল থেকে দূরে নির্জনতায় কোলাহলমুক্ত পরিবেশে কিছুকাল থাকবেন এটাইতো স্বাভাবিক।
এই নিয়ম অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা ধীরে ধীরে তাঁর প্রিয় রসূলকে আমানতের বিরাট বোঝা বহন এবং বিশ্ব মানবের জীবনধারায় পরিবর্তনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্যে তৈরী করছিলেন। তাঁকে আমানতের জিম্মাদারী অর্পণের তিন বছর আগে নির্জনে ধ্যান করা তাঁর জন্যে আগেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। এই নির্জনতায় কখনো কখনো এক মাস পর্যন্ত তিনি ধ্যানমগ্ন থাকতেন। আধ্যাত্মিক রূহানী সফরে তিনি সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা ও গবেষণা করতেন যাতে, প্রয়োজনীয় নির্দেশ পেলে যথাযথভাবে সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম হন।²
টিকাঃ
১. রহমাতুল লিল আলামিন, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৭, ইবনে হিশাম ১ম খন্ড পৃ. ২৩৫, ২৩৬ তাফসীর ফি যিলালিল কোরআন-সাইয়েদ কুতুব শহীদ, পারা, ২৯, পৃ. ৬৬
২. তাফসীর ফি যিলালিল কোরআন, পারা ২৯, পৃ. ৬৬-১৬৭ (স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, এটা হচ্ছে এই তাফসীরের আরবী সংস্করণের পৃষ্ঠা। বাংলাদেশে আল কোরআন একাডেমী লন্ডন-এর যে বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছেন, তার পৃষ্ঠা এর সাথে নাও মিলতে পারে।)
📄 ওহী নিয়ে জিবরাঈলের আগমন
চল্লিশ বছর বয়স হচ্ছে মানুষের পূর্ণতা ওপরিপক্কতার বয়স। পয়গম্বররা এই বয়সেই ওহী লাভ করে থাকেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স চল্লিশ হওয়ার পর তাঁর জীবনের দিগন্তে নবুয়তের নিদর্শন চমকাতে লাগলো। এই নিদর্শন প্রকাশ পাচ্ছিলো স্বপ্নের মাধ্যমে। এ সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে স্বপ্নই দেখতেন, সেই স্বপ্ন শুভ্র সকালের মতো প্রকাশ পেতো। এ অবস্থায় ছয়মাস কেটে গেলো। এ সময়টুকু নবুয়তের সময়ের ৪৬তম অংশ এবং নবুয়তের মোট মেয়াদ হচ্ছে তেইশ বছর। হেরা গুহার নির্জনাবাসের তৃতীয় বছরে আল্লাহ তায়ালা জগতবাসীকে তাঁর করুণাধারায় সিঞ্চিত করতে চাইলেন। আল্লাহ তায়ালা তখন তাঁর রসূলকে নবুয়ত দান করলেন। হযরত জিবরাইল (আ.) কয়েকটি আয়াত নিয়ে হাযির হলেন।³
ইতিহাসের যুক্তি-প্রমাণ এবং কোরআনসহ বিভিন্ন গ্রন্থ অধ্যয়ন করে পাওয়া তথ্যানুযায়ী জানা যায় যে, প্রথম ওহী এসেছিলো রমযান মাসের ২১ তারিখ সোমবার রাতে। চান্দ্র মাসের হিসাব মোতাবেক সে সময় রসূলে করিম হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা আহমদ মুজতবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স হয়েছিলো ৪০ বছর ৬ মাস ১২ দিন।
ওহী নাযিলের সময়ে তাঁর বয়স প্রিয় নবী কি মাসে নবুয়ত লাভ করেছিলেন, এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশ সীরাত রচয়িতার মতে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসে নবুয়ত লাভ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন রমযান মাসে, আবার কেউ কেউ বলেছেন রজব মাসে। (দেখুন মুখতাছারুছ সিরাত, রচনা শেখ আবদুল্লাহ ১ম খন্ড, পৃ. ৭৫।) আমার বিবেচনায় রমযান মাসে ওহী নাযিল হওয়া অর্থাৎ নবুয়ত লাভ করার কথাই ঠিক। কেননা কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, রমযান মাসেই কোরআন নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেন, শবে কদরে কোরআন নাযিল করা হয়েছে। শবে কদর তো রমযান মাসেই হয়ে থাকে। তিনি আরো বলেছেন, আমি একটি বরকতময় রাতে কোরআন নাযিল করেছি এবং আমি লোকদের আযাবের আশঙ্কা সম্পর্কে অবহিত করি। রমযানে কোরআন নাযিল হওয়ার পক্ষে এ যুক্তিও রয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেরার গুহায় রমযানে ধ্যান করতেন। হযরত জিবরাইল (আ.) হেরার গুহাতেই এসেছিলেন।
যারা রমযান মাসে কোরআন নাযিল হওয়ার উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে রমযানের কতো তারিখে কোরআন নাযিল হয়েছিলো, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন সাত, আবার কেউ বলেন আঠারো তারিখ। (মুখতাছারুস ছিরাত ১ম খন্ড পৃ. ৭৫, রহমাতুল লিল আলামিন ১ম খন্ড পৃ. ৪৯ দেখুন,) আল্লামা হাযরামি লিখেছেন, সতের তারিখই নির্ভুল। (তারিখে হাযরামি ১ম খন্ড পৃ. ৬৯, এবং তারিখে আতৃতাশারিহ আল ইসলামী পৃ. ৫, ৬, ৭ দেখুন।) আমি এ ব্যাপারে ২১শে রমযান তারিখকে প্রাধান্য দিয়েছি। অথচ অন্য কেউই ২১ শে রমযান কোরআন নাযিলের শুরু বলে উল্লেখ করেননি। আমার যুক্তি হচ্ছে, অধিকাংশ সীরাত রচয়িতার মতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব ঘটেছিলো সোমবার দিনে। হযরত কাতাদা (রা.) বর্ণিত একটি হাদীসেও এর প্রমাণ রয়েছে। তিনি বলেন, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সোমবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি, এই দিনে আমাকে নবুয়ত দেয়া হয়েছে। (সহী মুসলিম ১ম খন্ড পৃ. ৩৬৮ মোসনাদে আহমদ ৫ম খন্ড, পৃ. ২৯৭, ২৯৯, বায়হাকী ৪র্থ খন্ড, পৃ. ২৮৬, ৩০০ হাকেম ২য় খন্ড, পৃ. ২, ৬।) সেই বছর রমযান মাস সোমবার পড়েছিলো ৭, ১৪, ২১ এবং ৮ তারিখে। সহীহ বর্ণনায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, শবে কদর রমযান মাসের বেজোড় রাতে হয়ে থাকে এবং বেজোড় রাতেই আবর্তিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, শবে কদরে কোরআন নাযিল হয়েছে। যে বছর তিনি নবুয়ত পেয়েছেন, সে বছরের সোমবারসমূহ পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় যে, তিনি ২১শে রমযান সোমবার জন্মগ্রহণ করেন এবং এই তারিখেই নবুয়তও লাভ করেন।
আসুন, হযরত আয়েশা (রা.)-এর যবানীতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শোনা যাক। কোরআন নাযিল ছিলো এক অলৌকিক আলোক শিখার আবির্ভাব, সেই আলোক শিখায় সকল গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতার অন্ধকার তিরোহিত হয়ে গিয়েছিলো। ইতিহাসের গতিধারা এই ঘটনায় বদলে গিয়েছিলো।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিলের সূচনা স্বপ্নের মাধ্যমে হয়েছিলো। তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন তা স্বপ্ন শুভ্র সকালের মতো প্রকাশ পেতো। এরপর তিনি নির্জনতাপ্রিয় হয়ে যান। তিনি হেরা গুহায় এবাদাত বন্দেগীতে কাটাতে থাকেন এবং এ সময় একাধারে কয়েকদিন ঘরে ফিরতেন না। পানাহার সামগ্রী শেষ হয়ে গেলে সেসব নেয়ার জন্যে পুনরায় বাড়িতে ফিরতেন। এমনি করে এক পর্যায়ে হযরত জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে আসেন এবং তাঁকে বলেন, পড়ো। তিনি বললেন, আমি তো পড়তে জানি না। ফেরেশতা তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে সজোরে চাপ দিলেন। তিনি বলেন, আমার সব শক্তি যেন নিংড়ে নেয়া হলো। এরপর ফেরেশতা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ো। তিনি বলেন, আমি তো পড়তে জানি না। পুনরায় ফেরেশতা আমাকে বুকে জড়িয়ে চাপ দিলেন।
এরপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ো। তৃতীয়বার তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সজোরে চাপ দিলেন এবং বললেন, 'ইকরা বে-ইসমে রাব্বিকাল্লাযি খালাক'।⁵ অর্থাৎ পড়ো সেই প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।
এই আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পর প্রিয় নবী ঘরে এলেন। তাঁর বুক ধুকধুক করছিলো। স্ত্রী হযরত খাদিজা বিনতে খোয়াইলেদকে বললেন, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও। বিবি খাদিজা প্রিয় নবীকে চাদর জড়িয়ে শুইয়ে দিলেন। তার ভয় কেটে গেলো।
এরপর বিবি খাদিজাকে সব কথা খুলে বলে প্রিয় রসূল বললেন, আমার কী হয়েছে? নিজের জীবনের আমি আশঙ্কা করছি। বিবি খাদিজা তাঁকে অভয় দিয়ে বললেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে অপমান করবেন না। আপনি আত্মীয় স্বজনের হক আদায় করেন, বিপদগ্রস্ত লোকদের সাহায্য করেন, মেহমানদারী করেন এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন।
বিবি খাদিজা এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আপন চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেল ইবনে আবদুল ওযযার কাছে নিয়ে গেলেন। ওয়ারাকা আইয়ামে জাহেলিয়তে ঈসায়ী ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি হিব্রু ভাষায় লিখতে জানতেন। যতোটা আল্লাহ তায়ালা তওফীক দিতেন, হিব্রু ভাষায় ততোটা ইঞ্জিল তিনি লিখতেন। সে সময় তিনি ছিলেন বয়সের ভারে ন্যুজ এবং দৃষ্টিহীন। বিবি খাদিজা বললেন, ভাইজান, আপনি আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। ওয়ারাকা বললেন, ভাতিজা তুমি কি দেখেছো?
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা যা দেখেছেন তাকে সব খুলে বললেন। সব শুনে ওয়ারাকা বললেন, তিনি সেই দূত, যিনি হযরত মূসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন। হায়, যদি আমি সেই সময় বেঁচে থাকতাম, যখন তোমার কওম তোমাকে বের করে দেবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবাক হয়ে বললেন, তবে কি আমার কওম আমাকে সত্যি সত্যিই বের করে দেবে? ওয়ারাকা বললেন, হাঁ, তুমি যে ধরনের বাণী লাভ করেছো, এ ধরনের বাণী যখনই কেউ পেয়েছে, তার সাথেই শত্রুতা করা হয়েছে। যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করবো। এর কিছুকাল পরই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন। এরপর হঠাৎ ওহীর আগমন বন্ধ হয়ে যায়।⁶
তাবারী এবং ইবনে হিশামের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ওহী নাযিল বন্ধ হওয়ার সময়েও তিনি হেরার গুহায় আরো কিছুকাল অবস্থান করে নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করেন। পরে মক্কায় ফিরে যান। তাবারীর বর্ণনায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘর থেকে বের হওয়ার ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। সে বর্ণনা নিম্নরূপ।
ওহী আসার পরের মানসিক অবস্থা আলোচনা করতে গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর মখলুকের মধ্যে কবি এবং পাগল ছিলো আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। প্রচন্ড ঘৃণার কারণে এদের প্রতি চোখ তুলে তাকাতেও আমার ইচ্ছা হতো না। ওহী আসার পর আমি মনে মনে বললাম, কোরায়শরা আমাকে কবি বা পাগল বলবে না তো? এরূপ চিন্তার পর আমি পাহাড়চূড়ায় উঠে ঝাপ দিয়ে নিজেকে শেষ করে দেয়ার চিন্তা করলাম। একদিন এক পাহাড়ে উঠলামও। পাহাড়ের মাঝামাঝি ওঠার পর হঠাৎ আসমান থেকে আওয়ায এলো, মোহাম্মদ আপনি আল্লাহর রসূল। আমি জিবরাঈল। প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এই আওয়ায শোনার পর আকাশের প্রতি তাকালাম। দেখলাম জিবরাঈল মানুষের আকৃতি ধরে দিগন্তে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলছেন, হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল, আমি জিবরাঈল বলছি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি থমকে দাঁড়িয়ে সেখানে জিবরাঈলকে দেখতে লাগলাম। যে ইচ্ছা করে এসেছিলাম সে ইচ্ছার কথা ভুলে গেলাম। আমি তখন সামনেও যেতে পারছিলাম না, পেছনেও না। আকাশের যেদিকেই তাকাচ্ছিলাম, সেদিকেই জibraঈলকে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। এর মধ্যে খাদিজা আমার খোঁজে লোক পাঠালেন। আমাকে খুঁজে না পেয়ে তারা মক্কায় ফিরে এলো।
জibraঈল চলে যাওয়ার পর আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম। খাদিজার উরুর পাশে হেলান দিয়ে বসলাম। তিনি বললেন, আবুল কাশেম, আপনি কোথায় ছিলেন? আপনার খোঁজে আমি একজন লোক পাঠিয়েছি, সে মক্কায় গিয়ে খুঁজে এসেছে, কিন্তু আপনাকে পায়নি। আমি তখন যা কিছু দেখেছি, খাদিজাকে তা বললাম। তিনি বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই, আপনি খুশি হোন এবং দৃঢ়পদ থাকুন, আমার আশা, আপনি এই উম্মতের নবী হবেন। এরপর তিনি ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে গেলেন। তাঁকে সব কথা শোনালেন। তিনি সব শুনে বললেন, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে ওয়ারাকার প্রাণ রয়েছে, তাঁর কাছে সেই ফেরেশতা এসেছেন, যিনি হযরত মুসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই উম্মতের নবী। তাঁকে বলবে, তিনি যেন দৃঢ়পদ থাকেন।
এরপর হযরত খাদিজা ফিরে এসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওয়ারাকার কথা শোনালেন। প্রিয় নবী হেরা গুহায় তাঁর অবস্থানের মেয়াদ পূর্ণ করে মক্কায় আসেন। এ সময় ওয়ারাকা ইবনে নওফেল তাঁর সাথে দেখা করে সব কথা বিস্তারিত শোনার পর বললেন, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, আপনি হচ্ছেন এই উম্মতের নবী। আপনার কাছে সেই বড় ফেরেশতা এসেছেন, যিনি হযরত মুসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন।⁷
সাময়িকভাবে ওহীর আগমন স্থগিত ঐ সময়ে ওহীর আগমন কতোদিন যাবত স্থগিত ছিলো? এ সম্পর্কে ইবনে সা'দ হযরত ইবনে আব্বাসের একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। এতে উল্লেখ রয়েছে যে, ওহী কয়েকদিনের জন্যে স্থগিত ছিলো। সবদিক বিবেচনা করলে এ বর্ণনাই যথার্থ মনে হয়। একটা কথা বিখ্যাত রয়েছে যে, আড়াই বা তিন বছর ওহী স্থগিত ছিলো, এই বিবরণ সত্য নয়। এ সম্পর্কিত যুক্তি প্রমাণ সম্পর্কে এখানে আলোচনার দরকার নেই।⁸
ওহী স্থগিত থাকার সময়ে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষণ্ণ এবং চিন্তাযুক্ত থাকতেন। তিনি মানসিক অস্থিরতা এবং উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। সহীহ বোখারী শরীফের কিতাবুত তাবীর-এর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ওহীর আগমন স্থগিত হওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতোটা অস্থিরতা এবং চিন্তার মধ্যে ছিলেন যে, কয়েকবার উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলেন যেখান থেকে লাফিয়ে নীচে পড়বেন। কিন্তু পাহাড়ে ওঠার পর জিবরাঈল আসতেন এবং বলতেন হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল। এ কথা শোনার পর তিনি থমকে দাঁড়াতেন। তাঁর উদ্বেগ অস্থিরতা কেটে যেতো। প্রশান্ত মনে তিনি ঘরে ফিরে আসতেন। পুনরায় ওহী না আসার কারণে তিনি অস্থির হয়ে উঠতেন এবং পাহাড়ে গিয়ে উঠতেন। সেখানে জিবরাঈল এসে হাযির হতেন এবং বলতেন, হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল।⁹
ওহী নিয়ে পুনরায় জিবরাঈলের আগমন হাফেজ ইবনে হাজার লিখেছেন, ওহী কিছুকাল স্থগিত থাকার কারণ ছিলো এই যে, তিনি যে ভয় পেয়েছিলেন সেই ভয় যেন কেটে যায় এবং পুনরায় ওহী প্রাপ্তির আগ্রহ এবং প্রতীক্ষা যেন তাঁর মনে জাগে।¹⁰
বিস্ময়ের ঘোর কেটে যাওয়ার পর, বাস্তব অবস্থা তার সামনে প্রকাশ পেলো। তিনি সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারলেন যে, তিনি আল্লাহর নবী হয়েছেন। তিনি আরো বুঝতে সক্ষম হলেন যে, কাছে যিনি এসেছিলেন তিনি ওহীর বাণী বহনকারী, আসমানী সংবাদবাহক। এইরূপ বিশ্বাস তাঁর মনে দৃঢ় হওয়ার পর তিনি আগ্রহের সাথে ওহীর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাঁকে দৃঢ় হয়ে থাকতে হবে এবং এ দায়িত্ব বহন করতে হবে। মানসিক অবস্থার এ পর্যায়ে হযরত জিবরাঈল (আ.) পুনরায় এসে হাযির হলেন। সহীহ বোখারী শরীফে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রিয় নবীর মুখে ওহী স্থগিত হওয়ার বিবরণ শুনেছেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি পথ চলছিলাম। হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়ায শোনা গেলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সেই ফেরেশতা যিনি হেরা গুহায় আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি আসমান যমীনের মাঝখানে একখানি কুরসীতে বসে আছেন। আমি ভয় পেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। এরপর বাড়ীতে এসে আমার স্ত্রীর কাছে বললাম, আমাকে চাদর জড়িয়ে দাও, আমাকে চাদর জড়িয়ে দাও। স্ত্রী আমাকে চাদর জড়িয়ে শুইয়ে দিলেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা সূরা মোদদাসসের-এর 'ওয়াররুজযা ফাহজুর' পর্যন্ত নাযিল করেন। এ ঘটনার পর থেকে ঘন ঘন ওহী নাযিল হতে থাকে।¹¹
ওহীর বিভিন্ন রকম প্রিয় নবীর ওপর ওহী নাযিল হওয়ার পর অর্থাৎ তিনি নবুয়ত পাওয়ার পর তাঁর যে জীবন শুরু হয়, সে আলোচনায় যাওয়ার আগে ওহীর প্রকারভেদ সম্পর্কে আলোকপাত করা দরকার। এতে রেসালত ও নবুয়ত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। আল্লামা ইবনে কাইয়েম নিম্নোক্ত কয়েক প্রকারের ওহীর কথা উল্লেখ করেছেন: এক. সত্য স্বপ্ন-স্বপ্নের মাধ্যমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিল। দুই. ফেরেশতা তাঁকে দেখা না দিয়ে তাঁর মনে কথা বসিয়ে দিত। যেমন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, রুহুল কুদুস আমার মনে একথা বসিয়ে দিলেন যে, কোন মানুষ তার জন্যে নির্ধারিত রেযেক পাওয়ার আগে মৃত্যু বরণ করে না। কাজেই আল্লাহকে ভয় করো এবং ভালো জিনিস তালাশ করো। রেযেক পেতে বিলম্ব হলে আল্লাহর নাফরমানীর মাধ্যমে রেযেক তালাশ করো না। কেননা আল্লাহর কাছে যা কিছু রয়েছে, সেটা তাঁর আনুগত্য ছাড়া পাওয়া যায় না। তিন. ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধরে তাকে সম্বোধন করতেন। তিনি যা কিছু বলতেন, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা মুখস্ত করে নিতেন। এ সময় কখনো কখনো সাহাবারাও ফেরেশতাদের দেখতে পেতেন। চার. রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ওহী ঘন্টাধ্বনির মতো টন টন শব্দে আসতো। এটি ছিলো ওহীর সবচেয়ে কঠোর অবস্থা। এ অবস্থায় ফেরেশতা তাঁর সাথে দেখা করতেন এবং প্রচন্ড শীতের মওসুম হলেও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘেমে যেতেন। তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়তো। তিনি উটের ওপর সওয়ার থাকলে মাটিতে বসে পড়তেন। একবার হযরত যায়েদ ইবনে সাবেতের উরুর ওপর তাঁর উরু থাকা অবস্থায় ওহী এলো, হযরত যায়েদ এতো ভারি বোধ করলেন যে, তাঁর উরু থেতলে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো।
পাঁচ. তিনি ফেরেশতাকে তার প্রকৃত চেহারায় দেখতেন। সেই অবস্থায়ই আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর ওপর ওহী নাযিল হতো। দু'বার এরূপ হয়েছিলো। পাক কোরআনে সূরা নাজম-এ আল্লাহ তায়ালা সে কথা উল্লেখ করেছেন।
ছয়. মেরাজের রাতে নামায ফরয হওয়া এবং অন্যান্য বিষয়ক ওহী আকাশে নাযিল হয়েছিলো। প্রিয় নবী তখন আকাশে ছিলেন।
সাত. ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়া আল্লাহর সরাসরি কথা বলা। হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে আল্লাহ তায়ালা যেমন কথা বলেছিলেন। হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে আল্লাহর কথা বলার প্রমাণ কোরআনে রয়েছে। প্রিয় নবীর সাথে আল্লাহর কথা বলার প্রমাণ মে'রাজের হাদীসে রয়েছে।
আট. আর এক প্রকার কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। এটি হচ্ছে আল্লাহর মুখোমুখি পর্দা বিহীন অবস্থায় কথা বলা। কিন্তু এ ব্যাপারে মতপার্থক্যের অবকাশ রয়েছে।¹² তাবলীগের নির্দেশ সূরা মোদদাসসের-এর প্রথম দিকের কয়েকটি আয়াতে প্রিয় নবীকে যেসব নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, এসব নির্দেশ দৃশ্যত সংক্ষিপ্ত এবং সহজ সরল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব নির্দেশ খুবই সুদূরপ্রসারী এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। বাস্তব জীবনে এসব নির্দেশের কার্যকারিতা ও প্রভাব অসামান্য। যথা-
এক. ভয় প্রদর্শন করতে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এই নির্দেশের শেষ মনযিল হচ্ছে এই যে, বিশ্বে আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেসব কাজ হচ্ছে, তার মারাত্মক পরিণাম সম্পর্কে সবাইকে জানিয়ে দেয়া। সেই ভয় এমনভাবে দেখাতে হবে যাতে, আল্লাহর আযাবের ভয়ে মানুষের মনে মগজে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
দুই. রব এর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনার শেষ মনযিল হচ্ছে আল্লাহর যমীনে শুধুমাত্র তাঁরই শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্ব অটুট থাকবে, অন্য কারোর শ্রেষ্ঠত্ব বহাল থাকতে দেয়া যাবে না বরং অন্য সব কিছুর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য নস্যাৎ করে দিতে হবে। ফলে আল্লাহর যমীনে একমাত্র তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, কর্তৃত্ব ও মহিমাই শুধু প্রকাশ পাবে এবং স্বীকৃত হবে।
তিন. পোশাকের পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতার শেষ মনযিল হচ্ছে এই যে, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল প্রকার পাক সাফ রাখতে হবে। এ অবস্থা এমন পর্যায়ে উন্নীত হতে হবে যাতে করে, আল্লাহর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় পাওয়া যায়। এটা শুধুমাত্র তাঁরই হেদায়াত ও নূরের দ্বারা সম্ভব হতে পারে। উল্লিখিত পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জনের পর অন্তর আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমাই অন্তরে জাগ্রত হবে। এর ফলে সমগ্র বিশ্বের মানুষ বিরোধিতা বা আনুগত্যে তাঁর কাছাকাছি থাকবে। তিনিই হবেন সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
চার. কারো প্রতি দয়া বা অনুগ্রহ করার পর অধিক বিনিময় প্রত্যাশা না করার শেষ মনযিল এই যে, নিজের কাজকর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করা যাবে না, বেশী গুরুত্ব দেয়া যাবে না। বরং একটির পর অন্য কাজের জন্যে চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যেতে হবে। বড় রকমের ত্যাগ ও কোরবানী করেও সেটাকে তুচ্ছ মনে করতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণ এবং তাঁর সামনে জবাবদিহির ভয়ের অনুভূতির সামনে নিজের চেষ্টাসাধনাকে ক্ষুদ্র ও সামান্য মনে করতে হবে।
পাঁচ. শেষ আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দাওয়াতের কাজ শুরু হওয়ার পর শত্রুরা বিরোধিতা, হাসিঠাট্টা, উপহাস বিদ্রূপ ইত্যাদির মাধ্যমে কষ্ট দেবে এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। তাঁকে এসব কিছুর সাথে মোকাবেলা করতে হবে। এমতাবস্থায় তাঁকে দৃঢ়তার সাথে ধৈর্যধারণ করতে হবে। এই ধৈয মনের শান্তির জন্যে নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর দ্বীনের প্রচার প্রসারের জন্যে। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 'ওয়া লিরাব্বেকা ফাছবের' অর্থাৎ তোমার প্রতিপালকের জন্যে ধৈর্যধারণ করবে।
কী চমৎকার! এ সকল নির্দেশ প্রকাশ্য ভাষায় কতো সহজ সরল এবং সংক্ষিপ্ত। শব্দ চয়ন কতো হালকা এবং কাব্যধর্মী। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা কতো ব্যাপক ও তাৎপর্যমন্ডিত। এই কয়েকটি শব্দের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যাবে এবং বিশ্বের দিকদিগন্তের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির সুদৃঢ় বন্ধন স্থাপিত হবে।
উল্লিখিত আয়াতগুলোতে দাওয়াত ও তাবলীগের উপাদানও বিদ্যমান রয়েছে। বনি আদমের কিছু আমল এমন রয়েছে, যার পরিণাম মন্দ। এ কথা সবাই জানে যে, মানুষ যা কিছু করে, তার সব কিছুর বিনিময় এ পৃথিবীতে তাকে দেয়া হয় না এবং দেয়া সম্ভবও না। স্বাভাবিকভাবেই এমন একটা দিন থাকা দরকার, যেদিন সব কাজের পুরোপুরি বিনিময় দেয়া হবে। সেই দিনের নাম হচ্ছে কেয়ামত। সেদিন বিনিময় দেয়ার একটা অনিবার্য প্রয়োজন এই যে, আমরা এ পৃথিবীতে যে জীবন যাপন করছি, এর চেয়ে একটা পৃথক জীবন থাকা দরকার।
অন্যান্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের কাছে নির্ভেজাল তাওহীদের অনুসারী হওয়ার দাবী জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বান্দা যেন তার সব ইচ্ছা-আকাঙ্খা আল্লাহর ওপরই ন্যস্ত করে। প্রবৃত্তির খায়েশ এবং মানুষের অন্যান্য ইচ্ছার ওপর সে যেন আল্লাহর ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেয়। এমনি করে দাওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্ব সম্পন্ন হতে পারে। এসব শর্ত নিম্নরূপ। ক, তাওহীদ। খ, পরকালের প্রতি বিশ্বাস। গ. তাযকিয়ায়ে নক্স এর ওপর গুরুত্বারোপ। অর্থাৎ সকল প্রকার অশ্লীলতা ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা। পুণ্য কাজ বেশী করে করা এবং তার ওপর অটল থাকার চেষ্টা। ঘ. নিজের সকল কাজ আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা। ঙ. এসব কিছু প্রিয় নবীর নবুয়ত ও রেসালাতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন এবং অসাধারণ নেতৃত্বের অনুসরণের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
এসব আয়াতে আসমানী নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় নবীকে এক মহান কাজের জন্যে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ঘুমের আরাম পরিত্যাগ করে জেহাদের কষ্টকর ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা মোদদাসসেরের প্রথম কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যেমন বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের জন্যে বাঁচবে, শুধু সেইতো আরামের জীবন কাটাতে পারে। কিন্তু যার ওপর বিশাল মানবগোষ্ঠীর পথনির্দেশের দায়িত্বের বোঝা সে কি করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকতে পারে? উষ্ণ বিছানার সাথে আরামদায়ক জীবনের সাথে তার কি সম্পর্ক? তুমি সেই মহান কাজের জন্যে বেরিয়ে পড়ো, যে কাজ তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। তোমার জন্যে প্রস্তুতকৃত বিরাট দায়িত্বের বোঝা তোলার জন্যে এগিয়ে এসো। সংগ্রাম করতে এগিয়ে এসো। কষ্ট করো। ঘুম এবং আরামের সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন সময় বিনিদ্র রজনী কাটানোর, সময় দীর্ঘ পরিশ্রমের। একাজ করতে তৈরী হও।
এ নির্দেশ বিরাট তাৎপর্য মন্ডিত। এই নির্দেশ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরামের জীবন থেকে বের করে তরঙ্গসঙ্কুল অথৈ সমুদ্রে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। মানুষের বিবেকের সামনে এবং জীবনের বাস্তবতার সামনে এনে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এরপর আল্লাহর রসূল উঠে দাঁড়িয়েছেন এবং সুদীর্ঘ বিশ বছরের বেশী সময় যাবত দাঁড়িয়েই থেকেছেন। এই সময়ে তিনি ছিলেন জীবন সংগ্রামে অটল অবিচল। আরাম আয়েশ পরিত্যাগ করেছেন, নিজ এবং পরিবার পরিজনের সুখ-শান্তি আরাম বিসর্জন দিয়েছেন। উঠে দাঁড়ানোর পর তিনি সেই অবস্থাতেই ছিলেন। তাঁর কাজ ছিলো আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়া। কোন প্রকার চাপ সৃষ্টি ছাড়াই এ দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। এই দায়িত্ব ছিলো পৃথিবীতে 'আমানতে কোবরা' অর্থাৎ বিরাট আমানতের বোঝা। সমগ্র মানবতার বোঝা, সমগ্র আকীদা বিশ্বাসের বোঝা। বিভিন্ন ময়দানে জেহাদের বোঝা। বিশ বছরেরও বেশী সময় তিনি এই সংগ্রামমুখর জীবন যাপন করেছেন। আসমানী নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে কখনোই তিনি এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থা সম্পর্কে অমনোযোগী বা উদাসীন ছিলেন না। আল্লাহ তায়ালা তাকে আমাদের এবং সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার দান করুন।¹³
টিকাঃ
৩. হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী লিখেছেন, বায়হাকী উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্ন দেখার মেয়াদ ছিল ছয় মাস। অর্থাৎ ছয় মাস যাবত বিভিন্ন সময়ে তিনি স্বপ্ন দেখেছেন। কাজেই স্বপ্নের মাধ্যমে নবুয়তের সূচনা চল্লিশ বছর পূর্তির পর রবিউল আউয়াল মাসে হয়েছিল। এ মাস ছিল প্রিয় রসূলের জন্মের মাস। জাগ্রতাবস্থায় তাঁর কাছে প্রথম ওহী এসেছিল রমযান মাসে। (ফতহুল বারী, ১ম খন্ড, পৃ. ২৭)
৫. 'আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়ালাম' পর্যন্ত নাযিল হয়েছিলো।
৬. সহীহ বোখারীতে 'কিভাবে ওহী নাযিল হয়েছিলম্ব (১ম খন্ড পৃ. ২, ৩) অধ্যায়ে ঈষৎ পরিবর্তিতভাবে এই বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. হিযাব, পৃ. ২০৭, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, ২৩৭-২৩৮, এ বর্ণনার সত্যতা সম্পর্কে আমি অবশ্য দ্বিধান্বিত। ওয়ারাকার সাথে আলোচনার ঘটনা ওহী আসার পরই ঘটেছিল। বোখারী বর্ণিত হাদীস পর্যালোচনার পর এ সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে হয় যে, ওয়ারাকার সাথে আলোচনা মক্কায় ওহী প্রাপ্তির পরেই হয়েছিল।
৮. ১১ নং টীকায় এ সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে।
৯. সহীহ বোখারী 'কিতাবুত তাবির, রুইয়া সালেহাম্ব ২য় খন্ড, পৃ. ১০৩৪।
১০. ফতহুল বারী, ১ম খন্ড, পৃ. ২৭
১১. সহীহ বোখারী 'কিতাবুত তাফসীর' অধ্যায় 'ওয়ার রুজযা ফাহজুরম্ব ২য় খন্ড পৃ. ৭৩৩। এ বর্ণনায় একথাও উল্লেখ রয়েছে যে, রসূল (স.) বলেছেন, আমি হেরা গুহায় এতেকাফ করেছি। এতেকাফ পূর্ণ করার পর নিচে নেমে এলাম। এরপর আমি যখন প্রান্তর ধরে অগ্রসর হচ্ছিলাম, তখন আমাকে ডাকা হলো। ডানে বাঁয়ে সামনে পেছনে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখি সেই ফেরেশতা। ........। সীরাত রচয়িতাদের সকল বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, রসূল তিন বছর রমযান মাসে হেরা গুহায় এতেকাফ করেন। তৃতীয় রমযানে তাঁর কাছে জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে আসেন। তিনি রমযানের পুরো মাস এতেকাফ করে ১ম শওয়ালে খুব ভোরে মক্কায় ফিরে আসতেন। উল্লিখিত রেওয়ায়েতের সাথে এ বিবরণ সংযুক্ত করলে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় যে, সূরা মোদদাসসেরের প্রথম অংশের ওহী-প্রথম ওহীর দশদিন পর নাযিল হয়েছিল। অর্থাৎ ওহী স্থগিত থাকার মেয়াদ ছিল দশদিন।
১২. যাদুল মায়াদ ১ম খন্ড, পৃ. ১৮।
১৩. তাফসীর ফি যিলালিল কোরআন, সাইয়েদ কুতুব শহীদ সূরা মোযযাম্মেল, সূরা মোদদাসসের, পারা ২৯, পৃ.
📄 ওহী নাযিলের সময়ে তাঁর বয়স
প্রিয় নবী কি মাসে নবুয়ত লাভ করেছিলেন, এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশ সীরাত রচয়িতার মতে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসে নবুয়ত লাভ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন রমযান মাসে, আবার কেউ কেউ বলেছেন রজব মাসে। (দেখুন মুখতাছারুছ সিরাত, রচনা শেখ আবদুল্লাহ ১ম খন্ড, পৃ. ৭৫।) আমার বিবেচনায় রমযান মাসে ওহী নাযিল হওয়া অর্থাৎ নবুয়ত লাভ করার কথাই ঠিক। কেননা কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, রমযান মাসেই কোরআন নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেন, শবে কদরে কোরআন নাযিল করা হয়েছে। শবে কদর তো রমযান মাসেই হয়ে থাকে। তিনি আরো বলেছেন, আমি একটি বরকতময় রাতে কোরআন নাযিল করেছি এবং আমি লোকদের আযাবের আশঙ্কা সম্পর্কে অবহিত করি। রমযানে কোরআন নাযিল হওয়ার পক্ষে এ যুক্তিও রয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেরার গুহায় রমযানে ধ্যান করতেন। হযরত জিবরাইল (আ.) হেরার গুহাতেই এসেছিলেন।
যারা রমযান মাসে কোরআন নাযিল হওয়ার উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে রমযানের কতো তারিখে কোরআন নাযিল হয়েছিলো, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন সাত, আবার কেউ বলেন আঠারো তারিখ। (মুখতাছারুস ছিরাত ১ম খন্ড পৃ. ৭৫, রহমাতুল লিল আলামিন ১ম খন্ড পৃ. ৪৯ দেখুন,) আল্লামা হাযরামি লিখেছেন, সতের তারিখই নির্ভুল। (তারিখে হাযরামি ১ম খন্ড পৃ. ৬৯, এবং তারিখে আতৃতাশারিহ আল ইসলামী পৃ. ৫, ৬, ৭ দেখুন।) আমি এ ব্যাপারে ২১শে রমযান তারিখকে প্রাধান্য দিয়েছি। অথচ অন্য কেউই ২১ শে রমযান কোরআন নাযিলের শুরু বলে উল্লেখ করেননি। আমার যুক্তি হচ্ছে, অধিকাংশ সীরাত রচয়িতার মতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব ঘটেছিলো সোমবার দিনে। হযরত কাতাদা (রা.) বর্ণিত একটি হাদীসেও এর প্রমাণ রয়েছে। তিনি বলেন, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সোমবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি, এই দিনে আমাকে নবুয়ত দেয়া হয়েছে। (সহী মুসলিম ১ম খন্ড পৃ. ৩৬৮ মোসনাদে আহমদ ৫ম খন্ড, পৃ. ২৯৭, ২৯৯, বায়হাকী ৪র্থ খন্ড, পৃ. ২৮৬, ৩০০ হাকেম ২য় খন্ড, পৃ. ২, ৬।) সেই বছর রমযান মাস সোমবার পড়েছিলো ৭, ১৪, ২১ এবং ৮ তারিখে। সহীহ বর্ণনায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, শবে কদর রমযান মাসের বেজোড় রাতে হয়ে থাকে এবং বেজোড় রাতেই আবর্তিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, শবে কদরে কোরআন নাযিল হয়েছে। যে বছর তিনি নবুয়ত পেয়েছেন, সে বছরের সোমবারসমূহ পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় যে, তিনি ২১শে রমযান সোমবার জন্মগ্রহণ করেন এবং এই তারিখেই নবুয়তও লাভ করেন।
আসুন, হযরত আয়েশা (রা.)-এর যবানীতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শোনা যাক। কোরআন নাযিল ছিলো এক অলৌকিক আলোক শিখার আবির্ভাব, সেই আলোক শিখায় সকল গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতার অন্ধকার তিরোহিত হয়ে গিয়েছিলো। ইতিহাসের গতিধারা এই ঘটনায় বদলে গিয়েছিলো।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিলের সূচনা স্বপ্নের মাধ্যমে হয়েছিলো। তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন তা স্বপ্ন শুভ্র সকালের মতো প্রকাশ পেতো। এরপর তিনি নির্জনতাপ্রিয় হয়ে যান। তিনি হেরা গুহায় এবাদাত বন্দেগীতে কাটাতে থাকেন এবং এ সময় একাধারে কয়েকদিন ঘরে ফিরতেন না। পানাহার সামগ্রী শেষ হয়ে গেলে সেসব নেয়ার জন্যে পুনরায় বাড়িতে ফিরতেন। এমনি করে এক পর্যায়ে হযরত জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে আসেন এবং তাঁকে বলেন, পড়ো। তিনি বললেন, আমি তো পড়তে জানি না। ফেরেশতা তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে সজোরে চাপ দিলেন। তিনি বলেন, আমার সব শক্তি যেন নিংড়ে নেয়া হলো। এরপর ফেরেশতা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ো। তিনি বলেন, আমি তো পড়তে জানি না। পুনরায় ফেরেশতা আমাকে বুকে জড়িয়ে চাপ দিলেন।
এরপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ো। তৃতীয়বার তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সজোরে চাপ দিলেন এবং বললেন, 'ইকরা বে-ইসমে রাব্বিকাল্লাযি খালাক'। অর্থাৎ পড়ো সেই প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।
এই আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পর প্রিয় নবী ঘরে এলেন। তাঁর বুক ধুকধুক করছিলো। স্ত্রী হযরত খাদিজা বিনতে খোয়াইলেদকে বললেন, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও। বিবি খাদিজা প্রিয় নবীকে চাদর জড়িয়ে শুইয়ে দিলেন। তার ভয় কেটে গেলো।
এরপর বিবি খাদিজাকে সব কথা খুলে বলে প্রিয় রসূল বললেন, আমার কী হয়েছে? নিজের জীবনের আমি আশঙ্কা করছি। বিবি খাদিজা তাঁকে অভয় দিয়ে বললেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে অপমান করবেন না। আপনি আত্মীয় স্বজনের হক আদায় করেন, বিপদগ্রস্ত লোকদের সাহায্য করেন, মেহমানদারী করেন এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন।
বিবি খাদিজা এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আপন চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেল ইবনে আবদুল ওযযার কাছে নিয়ে গেলেন। ওয়ারাকা আইয়ামে জাহেলিয়তে ঈসায়ী ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি হিব্রু ভাষায় লিখতে জানতেন। যতোটা আল্লাহ তায়ালা তওফীক দিতেন, হিব্রু ভাষায় ততোটা ইঞ্জিল তিনি লিখতেন। সে সময় তিনি ছিলেন বয়সের ভারে ন্যুজ এবং দৃষ্টিহীন। বিবি খাদিজা বললেন, ভাইজান, আপনি আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। ওয়ারাকা বললেন, ভাতিজা তুমি কি দেখেছো?
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা যা দেখেছেন তাকে সব খুলে বললেন। সব শুনে ওয়ারাকা বললেন, তিনি সেই দূত, যিনি হযরত মূসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন। হায়, যদি আমি সেই সময় বেঁচে থাকতাম, যখন তোমার কওম তোমাকে বের করে দেবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবাক হয়ে বললেন, তবে কি আমার কওম আমাকে সত্যি সত্যিই বের করে দেবে? ওয়ারাকা বললেন, হাঁ, তুমি যে ধরনের বাণী লাভ করেছো, এ ধরনের বাণী যখনই কেউ পেয়েছে, তার সাথেই শত্রুতা করা হয়েছে। যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করবো। এর কিছুকাল পরই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন। এরপর হঠাৎ ওহীর আগমন বন্ধ হয়ে যায়।
তাবারী এবং ইবনে হিশামের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ওহী নাযিল বন্ধ হওয়ার সময়েও তিনি হেরার গুহায় আরো কিছুকাল অবস্থান করে নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করেন। পরে মক্কায় ফিরে যান। তাবারীর বর্ণনায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘর থেকে বের হওয়ার ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। সে বর্ণনা নিম্নরূপ।
ওহী আসার পরের মানসিক অবস্থা আলোচনা করতে গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর মখলুকের মধ্যে কবি এবং পাগল ছিলো আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। প্রচন্ড ঘৃণার কারণে এদের প্রতি চোখ তুলে তাকাতেও আমার ইচ্ছা হতো না। ওহী আসার পর আমি মনে মনে বললাম, কোরায়শরা আমাকে কবি বা পাগল বলবে না তো? এরূপ চিন্তার পর আমি পাহাড়চূড়ায় উঠে ঝাপ দিয়ে নিজেকে শেষ করে দেয়ার চিন্তা করলাম। একদিন এক পাহাড়ে উঠলামও। পাহাড়ের মাঝামাঝি ওঠার পর হঠাৎ আসমান থেকে আওয়ায এলো, মোহাম্মদ আপনি আল্লাহর রসূল। আমি জিবরাঈল। প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এই আওয়ায শোনার পর আকাশের প্রতি তাকালাম। দেখলাম জিবরাঈল মানুষের আকৃতি ধরে দিগন্তে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলছেন, হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল, আমি জিবরাঈল বলছি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি থমকে দাঁড়িয়ে সেখানে জিবরাঈলকে দেখতে লাগলাম। যে ইচ্ছা করে এসেছিলাম সে ইচ্ছার কথা ভুলে গেলাম। আমি তখন সামনেও যেতে পারছিলাম না, পেছনেও না। আকাশের যেদিকেই তাকাচ্ছিলাম, সেদিকেই জibraईलকে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। এর মধ্যে খাদিজা আমার খোঁজে লোক পাঠালেন। আমাকে খুঁজে না পেয়ে তারা মক্কায় ফিরে এলো।
জিবরাঈল চলে যাওয়ার পর আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম। খাদিজার উরুর পাশে হেলান দিয়ে বসলাম। তিনি বললেন, আবুল কাশেম, আপনি কোথায় ছিলেন? আপনার খোঁজে আমি একজন লোক পাঠিয়েছি, সে মক্কায় গিয়ে খুঁজে এসেছে, কিন্তু আপনাকে পায়নি। আমি তখন যা কিছু দেখেছি, খাদিজাকে তা বললাম। তিনি বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই, আপনি খুশি হোন এবং দৃঢ়পদ থাকুন, আমার আশা, আপনি এই উম্মতের নবী হবেন। এরপর তিনি ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে গেলেন। তাঁকে সব কথা শোনালেন। তিনি সব শুনে বললেন, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে ওয়ারাকার প্রাণ রয়েছে, তাঁর কাছে সেই ফেরেশতা এসেছেন, যিনি হযরত মুসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই উম্মতের নবী। তাঁকে বলবে, তিনি যেন দৃঢ়পদ থাকেন।
এরপর হযরত খাদিজা ফিরে এসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওয়ারাকার কথা শোনালেন। প্রিয় নবী হেরা গুহায় তাঁর অবস্থানের মেয়াদ পূর্ণ করে মক্কায় আসেন। এ সময় ওয়ারাকা ইবনে নওফেল তাঁর সাথে দেখা করে সব কথা বিস্তারিত শোনার পর বললেন, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, আপনি হচ্ছেন এই উম্মতের নবী। আপনার কাছে সেই বড় ফেরেশতা এসেছেন, যিনি হযরত মুসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন।
টিকাঃ
৩. হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী লিখেছেন, বায়হাকী উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্ন দেখার মেয়াদ ছিল ছয় মাস। অর্থাৎ ছয় মাস যাবত বিভিন্ন সময়ে তিনি স্বপ্ন দেখেছেন। কাজেই স্বপ্নের মাধ্যমে নবুয়তের সূচনা চল্লিশ বছর পূর্তির পর রবিউল আউয়াল মাসে হয়েছিল। এ মাস ছিল প্রিয় রসূলের জন্মের মাস। জাগ্রতাবস্থায় তাঁর কাছে প্রথম ওহী এসেছিল রমযান মাসে। (ফতহুল বারী, ১ম খন্ড, পৃ. ২৭)
৫. 'আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়ালাম' পর্যন্ত নাযিল হয়েছিলো।
৬. সহীহ বোখারীতে 'কিভাবে ওহী নাযিল হয়েছিলম্ব (১ম খন্ড পৃ. ২, ৩) অধ্যায়ে ঈষৎ পরিবর্তিতভাবে এই বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. হিযাব, পৃ. ২০৭, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, ২৩৭-২৩৮, এ বর্ণনার সত্যতা সম্পর্কে আমি অবশ্য দ্বিধান্বিত। ওয়ারাকার সাথে আলোচনার ঘটনা ওহী আসার পরই ঘটেছিল। বোখারী বর্ণিত হাদীস পর্যালোচনার পর এ সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে হয় যে, ওয়ারাকার সাথে আলোচনা মক্কায় ওহী প্রাপ্তির পরেই হয়েছিল।
📄 সাময়িকভাবে ওহীর আগমন স্থগিত
ঐ সময়ে ওহীর আগমন কতোদিন যাবত স্থগিত ছিলো? এ সম্পর্কে ইবনে সা'দ হযরত ইবনে আব্বাসের একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। এতে উল্লেখ রয়েছে যে, ওহী কয়েকদিনের জন্যে স্থগিত ছিলো। সবদিক বিবেচনা করলে এ বর্ণনাই যথার্থ মনে হয়। একটা কথা বিখ্যাত রয়েছে যে, আড়াই বা তিন বছর ওহী স্থগিত ছিলো, এই বিবরণ সত্য নয়। এ সম্পর্কিত যুক্তি প্রমাণ সম্পর্কে এখানে আলোচনার দরকার নেই।
ওহী স্থগিত থাকার সময়ে প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষণ্ণ এবং চিন্তাযুক্ত থাকতেন। তিনি মানসিক অস্থিরতা এবং উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। সহীহ বোখারী শরীফের কিতাবুত তাবীর-এর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ওহীর আগমন স্থগিত হওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতোটা অস্থিরতা এবং চিন্তার মধ্যে ছিলেন যে, কয়েকবার উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলেন যেখান থেকে লাফিয়ে নীচে পড়বেন। কিন্তু পাহাড়ে ওঠার পর জিবরাঈল আসতেন এবং বলতেন হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল। এ কথা শোনার পর তিনি থমকে দাঁড়াতেন। তাঁর উদ্বেগ অস্থিরতা কেটে যেতো। প্রশান্ত মনে তিনি ঘরে ফিরে আসতেন। পুনরায় ওহী না আসার কারণে তিনি অস্থির হয়ে উঠতেন এবং পাহাড়ে গিয়ে উঠতেন। সেখানে জibraईल এসে হাযির হতেন এবং বলতেন, হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল।
ওহী নিয়ে পুনরায় জিবরাঈলের আগমন হাফেজ ইবনে হাজার লিখেছেন, ওহী কিছুকাল স্থগিত থাকার কারণ ছিলো এই যে, তিনি যে ভয় পেয়েছিলেন সেই ভয় যেন কেটে যায় এবং পুনরায় ওহী প্রাপ্তির আগ্রহ এবং প্রতীক্ষা যেন তাঁর মনে জাগে।
বিস্ময়ের ঘোর কেটে যাওয়ার পর, বাস্তব অবস্থা তার সামনে প্রকাশ পেলো। তিনি সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারলেন যে, তিনি আল্লাহর নবী হয়েছেন। তিনি আরো বুঝতে সক্ষম হলেন যে, কাছে যিনি এসেছিলেন তিনি ওহীর বাণী বহনকারী, আসমানী সংবাদবাহক। এইরূপ বিশ্বাস তাঁর মনে দৃঢ় হওয়ার পর তিনি আগ্রহের সাথে ওহীর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাঁকে দৃঢ় হয়ে থাকতে হবে এবং এ দায়িত্ব বহন করতে হবে। মানসিক অবস্থার এ পর্যায়ে হযরত জিবরাঈল (আ.) পুনরায় এসে হাযির হলেন। সহীহ বোখারী শরীফে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রিয় নবীর মুখে ওহী স্থগিত হওয়ার বিবরণ শুনেছেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি পথ চলছিলাম। হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়ায শোনা গেলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সেই ফেরেশতা যিনি হেরা গুহায় আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি আসমান যমীনের মাঝখানে একখানি কুরসীতে বসে আছেন। আমি ভয় পেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। এরপর বাড়ীতে এসে আমার স্ত্রীর কাছে বললাম, আমাকে চাদর জড়িয়ে দাও, আমাকে চাদর জড়িয়ে দাও। স্ত্রী আমাকে চাদর জড়িয়ে শুইয়ে দিলেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা সূরা মোদদাসসের-এর 'ওয়াররুজযা ফাহজুর' পর্যন্ত নাযিল করেন। এ ঘটনার পর থেকে ঘন ঘন ওহী নাযিল হতে থাকে।
টিকাঃ
৮. ১১ নং টীকায় এ সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে।
৯. সহীহ বোখারী 'কিতাবুত তাবির, রুইয়া সালেহাম্ব ২য় খন্ড, পৃ. ১০৩৪।
১০. ফতহুল বারী, ১ম খন্ড, পৃ. ২৭
১১. সহীহ বোখারী 'কিতাবুত তাফসীর' অধ্যায় 'ওয়ার রুজযা ফাহজুরম্ব ২য় খন্ড পৃ. ৭৩৩। এ বর্ণনায় একথাও উল্লেখ রয়েছে যে, রসূল (স.) বলেছেন, আমি হেরা গুহায় এতেকাফ করেছি। এতেকাফ পূর্ণ করার পর নিচে নেমে এলাম। এরপর আমি যখন প্রান্তর ধরে অগ্রসর হচ্ছিলাম, তখন আমাকে ডাকা হলো। ডানে বাঁয়ে সামনে পেছনে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখি সেই ফেরেশতা। ........। সীরাত রচয়িতাদের সকল বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, রসূল তিন বছর রমযান মাসে হেরা গুহায় এতেকাফ করেন। তৃতীয় রমযানে তাঁর কাছে জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে আসেন। তিনি রমযানের পুরো মাস এতেকাফ করে ১ম শওয়ালে খুব ভোরে মক্কায় ফিরে আসতেন। উল্লিখিত রেওয়ায়েতের সাথে এ বিবরণ সংযুক্ত করলে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় যে, সূরা মোদদাসসেরের প্রথম অংশের ওহী-প্রথম ওহীর দশদিন পর নাযিল হয়েছিল। অর্থাৎ ওহী স্থগিত থাকার মেয়াদ ছিল দশদিন।